Golpo কষ্টের গল্প শেষ পাতায় সূচনা

শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৫৬.২


শেষপাতায়সূচনা [৫৬.২]

সাদিয়াসুলতানামনি

সকালের নাস্তা সেড়েই পূর্ণতারা আরওয়াদের বাসায় চলে আসে। আহনাফ সাহেবের সাথে আরওয়ার মা-ভাই প্রাথমিকভাবে কিছু আলোচনা শেষ করে। আলোচনার এক পর্যায়ে আরওয়ার ভাবী বলে ওঠে–
—”আরওয়ার বিয়ে হলে তাকে তো বাড়িতে নিয়ে আসা লাগবে ঢাকা থেকে। কিন্তু চেয়ারম্যান সাহেব এখনও কু”ত্তা খোঁজা খুঁজছে আরওয়াকে। এই সময় আরওয়াকে গ্রামে আনা কি ঠিক হবে?”
আরওয়ার ভাবীর কথা শুনে সকলের কপালেই চিন্তার রেখা ফুটে ওঠে। চেয়ারম্যানের ছেলে আপাতত সুস্থ হলেও সে নপুংসক হয়ে গিয়েছে। এছাড়া তার চোখ দুটোও নষ্ট হয়ে গিয়েছে। একমাত্র ছেলের এমন করুণ অবস্থা চেয়ারম্যান সাহেবকে লাগামহীন পা”গল ষাড়ে পরিণত হয়েছে। আরওয়াদের বাসায় এসেও কতদিন হুমকি দিয়ে চেয়ারম্যান সাহেব বলে গিয়েছে, আরওয়াকে পেলেই চিল শকুনের ন্যায় ছিঁড়ে খাবে।
এসব শুনে আরিয়ানদের চিন্তা আরো বেড়ে যায় আরওয়াকে নিয়ে। সবচাইতে বেশি পেরেশানি বোধ করে আরিয়ান। কারণ তার মনে এখনও আরওয়াকে হারিয়ে ফেলার একটা ভয় কাজ করছে। এই ভয় ততদিন পর্যন্ত থাকবে, যতদিন না আরওয়াকে কালামে পড়ে তিন বার কবুল বলে নিজের অর্ধাঙ্গিনী করে নিচ্ছে।
—”আচ্ছা, আমার পেইন্ট হাউজে আরওয়ারা উঠলে কেমন হয়? সেটা তো এখন খালিই থাকে। আরওয়া আর ওর পরিবার আমার পেইন্ট হাউজেই উঠুক। সেখান থেকেই বিদায় হবে ওর।”
সকলে যখন আরওয়ার সেইফটি নিয়ে চিন্তিত, ঠিক তখনই জাওয়াদ উক্ত কথাটি বলে সব সমস্যার সমাধান যেন এক চুটকিতেই করে দেয়। পূর্ণতার জাওয়াদের প্রস্তাবটি এতটাই পছন্দ হলো যে, তার ইচ্ছে করছে বরকে একটা স্পেশাল আদর দিতে। কিন্তু পরিস্থিতির কারণে এখন না দিতে পারলেও, সুযোগ বুঝে অবশ্যই এই স্পেশাল আদরটা দিবে বলে মনে মনে সে ঠিক করে রাখে।
জাওয়াদের প্রস্তাবটি আরিয়ান ও আহনাফ সাহেবেরও মনপুত হয়। কিন্তু রাসেল ইতস্ততবোধ করে এমন আচানক পরিচিত কারোর বাসায় গিয়ে উঠে বোনের বিয়ে দিতে। তাই সে আমতা আমতা করে জাওয়াদের প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েমবলল–
—”এতটা কেমন দেখায় জাওয়াদ ভাই? আমাদের একমাত্র মেয়ের বিয়ে অন্য কারোর বাড়িতে থেকে দিবো বিষয়টা আমাদের কাছে একটু বেশিই অস্বস্তির হয়ে ওঠে।”
উপস্থিত সকলেই বুঝে রাসেলদের অস্বস্তি। কিন্তু করার তো কিছুই নেই। রাসেলরা যদি কোন হোটেল বা রিসোর্টে থাকে তাহলে সেটা হবে অতিরিক্ত খরচ। এমনিতেই বলা চলে, তাদের পরিবার মধ্যবিত্ত। সংসারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি একমাত্র রাসেল ও আরওয়া। আরওয়ার বিয়ে হয়ে গেলে সে সংসার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যাবে, তখন কি আর চাকরি-বাকরি করতে পারবে? হয়ত পারবে, নয়ত নয়। রাসেল ও তার মা এমনিতেও ভেবে রেখেছেন, আরওয়ার বিয়ের পর তাকে চাকরি ছেড়ে দিয়ে সংসারে মনোযোগী হতে বলবে। ইতিমধ্যেই আরওয়ার মা, একবার কথাটি মেয়ের কানে তুলেছে। প্রতিত্তোরে আরওয়া তার মাকে বলেছে, বিয়ের পরও যতদিন বেবি না হয় ততদিন সে চাকরি করবে এবং সংসারে একটা ইনকাম পাঠাবে। তারও তো একটা কর্তব্য রয়েছে মা-ভাইয়ের প্রতি।
জাওয়াদ স্মিত হেঁসে বলল–
—”আমরা বুঝতে পারছি আপনাদের বিষয়টা। কিন্তু বর্তমানে আমাদের ভাবনার মূল বিষয় হলো, সুষ্ঠভাবে আরওয়া ও আরিয়ানের বিয়েটা দেওয়া। চেয়ারম্যান সাহেবের সাথে ঝামেলা না হলে হয়ত আমার এই প্রস্তাব রাখার কোন প্রয়োজনই পড়ত না। কিন্তু পরিস্থিতি যেহেতু কিছুটা অস্বাভাবিক তাই আপনারা আমার প্রস্তাবটা একটু ভেবে দেখেন।
তাছাড়া, আরওয়াকে আমি আমার বোনই ভাবি। সেই বোনের বিয়েতে ভাই হয়ে এইটুকু করতে চাচ্ছি। যদি আপনারা সম্মতি দেন।”
জাওয়াদ এত বিনয়ী ভাবে কথাটা বলে যে, তাঁকে এই মুহূর্তে মানা করে দিলে নিতান্তই তাকে অসম্মান করা হবে। রাসেল ও তার মা তারপরও সম্মতি দিতে ইতস্তত করতে থাকলে পূর্ণতা, আরিয়ান ওরাও বিষয়টা বুঝায়। তারপর তারা রাজি হন আরওয়ার বিদায় জাওয়াদের বাড়ি থেকে মানে পেইন্ট হাউজ থেকেই হবে।
বিয়ের দিন ঠিক করা হয়, সামনের সপ্তাহের শুক্রবার। আগামীকাল মঙ্গলবার জাওয়াদরা ঢাকায় চলে যাবে। রাসেলরা নিজেদের বাড়ি-ঘর ও দোকান গুছিয়ে বুধবার সকাল সকাল রওনা হয়ে যাবে। বৃহস্পতিবার স্বল্প পরিসরে ঘরোয়া ভাবে আরিয়ান ও আরওয়ার হলুদ সন্ধ্যা করিয়ে, শুক্রবার বাদ জুম্মা বিয়ে পড়ানো হবে।
সেদিন দুপুরে আহনাফ সাহেবসহ সবাই রাসেলদের বাড়িতেই মধ্যাহ্নভোজ সারেন। গ্রামের আন্তরিক আপ্যায়নে ভরপুর সেই ভোজ শেষে বিকেলের দিকে তারা নিজেদের বাড়িতে ফিরে আসে। যেহেতু পরদিনই ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার কথা, তাই বাড়িজুড়ে তখন বিদায়ের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে।
জাওয়াদের চাচিরা রান্নাঘরে বসে পড়েছেন নানা রকম পিঠা, মিষ্টান্ন আর শুকনো খাবার তৈরির কাজে। কেউ নারকেল কুরচ্ছেন, কেউ চালের গুঁড়া মাখছেন, কেউ বা চুলার আগুনে ব্যস্ত হাতে পিঠা উল্টেপাল্টে দিচ্ছেন।
গ্রামের মানুষদের এই একটি দিক সত্যিই ভীষণ সুন্দর। তারা হয়তো অনেক কিছু ভুলে যেতে পারে, কিন্তু কেউ গ্রাম ছেড়ে শহরে ফিরবে আর তার সঙ্গে বস্তাভর্তি টাটকা শাকসবজি, মৌসুমি ফল, ঘরে বানানো পিঠাপুলি কিংবা নানান রকম খাবার তুলে দেবে না, এমনটা প্রায় কল্পনাই করা যায় না। যেন এসব খাবারের ভাঁজে ভাঁজে তারা নিজেদের মমতা, টান আর আশীর্বাদ গুঁজে দেয়। মুখে সব কথা বলা যায় না বলেই হয়তো ভালোবাসা প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে তারা বেছে নেয় এই আন্তরিক আয়োজনগুলোকে।
পরদিন যেহেতু চলে যেতে হবে, তাই পূর্ণতাও দিনের পুরোটা সময় কাটাল চাচী শাশুড়িদের সঙ্গেই। কখনো রান্নাঘরে বসে গল্প করল, কখনো পিঠা বানানোর ফাঁকে ফাঁকে তাদের কাজে হাত লাগাল, আবার কখনো নিছক গল্প শুনেই সময় পার করল।
জাওয়াদের বাবারা তিন ভাই একই বাড়িতে বসবাস করে।জাওয়াদের পিতা শুধু শহরে বসবাস করেন। এছাড়া তাট বাকি দুই ভাই এই বাড়িতে বসবাস করলেও তাদের সংসার আলাদা, হাঁড়িও আলাদা। তবে বাড়িতে অতিথি এলে সেই ভিন্নতার দেয়াল যেন আপনা-আপনিই সরে যায়। তখন সবার জন্য একসঙ্গেই রান্না হয়, এক চুলার আগুনে, এক হাঁড়ির খাবারে। মেহমানরা যতদিন থাকে, ততদিন এই নিয়মই চলে।
এর পেছনের কারণটাও বেশ সরল, অথচ গভীর। অতিথিদের যেন এ-ঘর ও-ঘর করে খাবারের জন্য ঘুরতে না হয়, কিংবা কার বাড়িতে খাবে আর কার বাড়িতে খাবে না এমন কোনো অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয়। তাই নিজেদের আলাদা সংসার ভুলে তারা তখন এক হয়ে যায়, ঠিক যেমন একসময় ছিল। আর এই ছোট ছোট প্রথাগুলোই গ্রামের পারিবারিক বন্ধনকে এত উষ্ণ, এত আপন করে তোলে।


—”কি গো বউমা! কোন অসুবিধা হচ্ছে না তো গ্রামে বাড়িতে?”
জাওয়াদের বড় চাচা সন্ধ্যায় মসজিদ থেকে এসে বারান্দায় মাদুর বিছিয়ে ননদ-দেবরদের সাথে আড্ডারত পূর্ণতাকে জিজ্ঞেস করে। পূর্ণতা শাড়ির আঁচলটা মাথায় আরেকটু টেনে দিয়ে স্মিত হেঁসে বলল–
—”না চাচা। বরংচ এতদিন পর এত মানুষ আর প্রকৃতির মাঝে থাকতে পেরে ভীষণ ভালো লাগছে। ঢাকায় তো জানেনই কতটা বন্দিজীবন আর রুটিনের মাঝে কাটাতে হয়।”
—”হ্যাঁ, তা তো জানিই। সন্ধ্যার নাস্তা করেছো মা?”
—”না চাচা। আসলে…”
পূর্ণতার কথা মাঝ পথে থামিয়ে দিয়ে আকরাম সাহেব স্বীয় পত্নীকে হাঁক-ডাক পারতে পারতে বললেন–
—”ও মা! সে কি কথা! অ্যাঁই সজীবের আম্মা, বউমা গো সন্ধ্যার নাস্তা দেও নাই কেন এখনও?”
আকরাম সাহেবের পত্নী স্বামীর ডাক শুনে হন্তদন্ত হয়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দায় এসে প্রশ্নবোধক চাহনি নিয়ে স্বামীর দিকে তাকিয়ে থাকেন। আকরাম সাহেব স্ত্রীকে ভর্ৎসনা করে কিছু বলতে নিবে তখনই পূর্ণতা বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে, বড় চাচা শ্বশুরের সম্মুখে এসে তাকে বুঝানোর ভঙ্গিমায় বলল–
—”চাচী আম্মারা এই দুইদিন আমাকে এত পরিমাণ ঠুসে ঠুসে খাইয়েছে যে, আমার তিন কেজি ওজন বেড়ে গিয়েছে বোধহয়। আমিই বলেছি সন্ধ্যায় নাস্তা করব না, তাহলে রাতের খাবার খেতে পারব না।”
আকরাম সাহেবের স্ত্রী স্বামীর কাছে মেকি নালিশ দিয়ে বললেন–
—”আরে সজীবের বাপ জানো না, বউমা যেই দুইডা ভাত খায়। ওর মতো বয়সে আমরা এক গামলা করে ভাত খাইয়া বড় করে একটা ঢেঁকুর তুলতাম। আর বউমা রে দুই চামচ ভাত দিলেই খাইতে পারে না।”
স্ত্রীর কথা শুনে আকরাম সাহেব হেঁসে দেন। আকরাম সাহেবের স্ত্রী পুনরায় নিজের কাজে চলে গেলে, তিনি বারান্দায় রাখা একটা চেয়ারে বসে পড়েন। তারপর পূর্ণতাকে উদ্দেশ্য করে বলেন–
—”মা জননী, তুমি আমাদের বংশের বড় ছেলের বউ। বিয়ের এত বছর পর আসলে আমাদের ভিটায়। ক’টা দিন থেকে তোমাদের আপ্যায়নের সুযোগ দিবে কি, তা না করে দুই দিনের জন্য আসলে। নাতি টার সাথে তেমন করে মেশার আগেই চলে যাচ্ছো।”
পূর্ণতা বিনয়ী ভঙ্গিতে বলল–
—”বছরের এই সময়টাতে চাচা আমার আর তাজের পাপার দু’জনেরই অফিসে প্রচন্ড কাজের চাপ থাকে। ছেলেটাকে এই বছর স্কুলে দিয়েছি, ও তো পড়ালেখা না করতে পারলেই খুশি। আর আমরাও এখনই ওকে এত চাপ দিচ্ছি না পড়াশোনা নিয়ে। কিন্তু আমার আর আপনাদের ছেলের অফিস নিয়েই যত প্যারা। এবার এসেছিলাম ভাইয়ার বিয়ে নিয়ে কথা বলতে। নাহলে এখনও আসা হতো না।
তবে শীতের ছুটিতে বেশি সময় নিয়ে আবারও গ্রামে আসব ইনশা আল্লাহ। তখন নাহয় আপনাদের আফসোস দূর করে দিবো।”
আকরাম সাহেব পূর্ণতাকে কথা বলার সময় নমনীয়তা ও বিনয়ীভাব দেখে মুগ্ধ হয়ে যায়। সে তার ছেলের কাছ থেকে শুনেছে পূর্ণতার বাবা ঢাকার শহরের মস্ত বড় ব্যবসায়ী। মেয়েটাও কম বয়সেই বাবার ব্যবসার হাল ধরে সেটিকে উন্নতির উঁচু শিখরে নিয়ে গিয়েছে। কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক এই মেয়ে, অথচ তার কথাবার্তা, চালচলন কিছুতেই অহংকার বা ঔদ্ধত্যের লেশ মাত্র নেই।
—”তা নাতবৌ, ব্যবসার পিছুনে ছুটলে খালি হইবো? ঘর-সংসার সামলাতেই হইবো না শক্ত হাতে? তোমার তো শাউড়ীও নাই যে, হের ভরসায় ঘর-সংসারের দায়িত্ব দিয়া তুমি অফিস-আদালতে দৌড়াদৌড়ি করবা।
তাছাড়া, বাচ্চা আরেকটা নিতাছ না ক্যা রে? একটা পোলা দিয়া সংসার মজবুত হয় নাকি? মনে রাইখো এই বুড়ির কথা, বাচ্চা যত বেশি সংসারের সাথে তোমার বন্ধন ততই মজবুত। সেই সাথে সোয়ামীর সাথেও।”
আকরাম সাহেব আর পূর্ণতার কথার মাঝেই জাওয়াদের দাদী এসে উপস্থিত হয়। বৃদ্ধা এতক্ষণ নামাজ শেষ করে তসবিহ পাঠ করছিল। সেটা সম্পূর্ণ করেই নিজের ঘরের সামনে অনেকের গলার আওয়াজ পেয়ে বের হয়ে আসেন রুম থেকে।
আকরাম সাহেব মা’কে দেখে একটু থতমত খেয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ান। বৃদ্ধার বয়স সত্তর পেরিয়েছে বহু পূর্বে। বয়সের ভারে বিভিন্ন রোগ-বালাইয়ে জর্জরিত হয়ে মাথার স্ক্রু’টাও খানিক ঢিলে হয়ে গিয়েছে। কোথায় কি বলতে হয়, সেই বোধ এখন খুব কমই রয়েছে। আকরাম সাহেব জানেন, তার মা একটা বেফাঁস কথা বলে পরিস্থিতি অস্বস্তিকর তৈরি করতে পটু। আর তিনি বর্তমানে চান না, ভাগনা বউয়ের সামনে কোন অস্বস্তি বা বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে। তাই তিনি একটা অজুহাত দিয়ে দ্রুত সেই স্থান ত্যাগ করেন।
পূর্ণতার চাচাতো ননদেরাও একে একে কেটে পড়ে। দাদীকে সবাই অজ্ঞাত এক কারণে ভয় পায় তারা। এমন না সে শুধু বকেই, নাতি-নাতনীদের যথেষ্ট আদরও করেন। কিন্তু তাও তারা ভয় পায়।
পূর্ণতাও দাদী শ্বাশুড়ির কথা শুনে থতমত খেয়ে যায়। জাওয়াদের দাদী দরজার সামনে দাড়িয়েই পূর্ণতাকে বলেন–
—”আমার রুমে আহো নাতবৌ।”
কথাটা বলে সে আগে আগে রুমে ঢুকে যায়। পূর্ণতাও তার পেছন পেছন যায়। পূর্ণতা রুমে এসে দেখে জাওয়াদের দাদী বেশ বড়সড় একটা কাঠের বক্স নিয়ে বিছানার উপর বসেছেন। পূর্ণতা যেতেই তাঁকেও ইশারা করেন বিছানায় বসতে।
পূর্ণতা বিছানার কিনারায় বসতেই জাওয়াদের দাদী পাশে রাখা পুরোনো কাঠের বাক্সটি খুললেন। সময়ের ছাপ লেগে থাকা বাক্সটির ভেতর থেকে তিনি যত্ন করে একে একে বের করলেন কয়েকটি পুরাতন নকশার স্বর্ণালংকার। নিজের হাতে পরিয়ে দিলেন ভারী দু’টি বালা, গলায় মাঝারি আকারের একটি হার, কানে মানানসই একজোড়া দুল। এমনকি কোমরেও জড়িয়ে দিলেন সোনার বিছা।
সবকিছু পরানো শেষ হলে বৃদ্ধা খানিকটা দূরে সরে দাঁড়িয়ে পূর্ণতার দিকে তাকালেন। আর তাকিয়েই যেন মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলেন।
উজ্জ্বল সাদা আলোর নিচে কলাপাতা রঙের শাড়িতে মোড়ানো মেয়েটিকে ঠিক যেন কোনো প্রাচীন রাজবাড়ির নববধূ মনে হচ্ছিল। পুরোনো দিনের ঐতিহ্যবাহী অলংকারগুলো তার সৌন্দর্যকে আড়াল তো করেইনি, বরং আরও কয়েকগুণ বাড়িয়ে তুলেছে। তার গায়ের উজ্জ্বল আভা আর লাজুক মুখশ্রী মিলেমিশে এমন এক মোহনীয় রূপের জন্ম দিয়েছে, যেখান থেকে সহজে চোখ ফেরানো দায়।
বৃদ্ধা মুগ্ধ বিস্ময়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তারপর ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে মনে মনে বললেন—
—”যেই রূপে আমারই হুঁশ উড়ে যাওয়ার উপক্রম, সে রূপ দেখে আজ আমার নাতির রাতের ঘুম টিকবে কী করে?”
পূর্ণতার সৌন্দর্য আগের থেকেও কয়েক গুণ বেড়েছে বিগত কয়েক মাসে। স্বামীর সোহাগে থাকার কারণে তার চোখে-মুখে সুখী সুখীভাব স্পষ্ট। জাওয়াদের দাদী মন ভরে দোয়া করেন পূর্ণতা ও জাওয়াদের জন্য। তিনিসহ শেখ পরিবারের সবাই জানেন পূর্ণতা-জাওয়াদের এত বছরের বিচ্ছেদের ঘটনা। তাই তারা সকলেই চান, একসময় দুঃখের সাগরে ভেসে থাকা এই জুটি যেন নিজেদের ভাগ্যের সকল সুখ টুকু ভোগ করে।
জাওয়াদের দাদী পূর্ণতার থুঁতনি ধরে তার মুখটা কিছুটা উপরে উঠিয়ে রসিকতা করে বলেন–
—”আইজ আমার নাতির ঘুম হারাম কইরা দিলি রে বইন। তোর এমন রূপ দেইখা আমার ভাইয়ে তোরে আইজ ঘুমাতে দিলে হয়।”
দাদীর এমন কথায় পূর্ণতার মুহূর্তেই লজ্জায় লাল হয়ে যায়। সে নজর লুকাতে এদিক-ওদিক তাকিতুকি করে বলল–
—”দাদী কি সব বলছেন!”
জাওয়াদের দাদী পূর্ণতাকে লজ্জা পেতে দেখে হেঁসে দেয় শব্দ করে। তার হাসির শব্দ শুনে পূর্ণতা আরেকটু মিইয়ে যায় লজ্জায়। কিয়তক্ষণ পর জাওয়াদের দাদী হাসা-হাসি থামিয়ে গহনার বক্সটা আবারও খুলেন। তারপর সেখান থেকে আরও একজোড়া স্বর্ণের চুড়ি বের করে সেগুলো পূর্ণতার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন–
—”নে ধর তো এগুলো।”
পূর্ণতা হাত বাড়িয়ে চুড়ি গুলো নিজের হাতে তুলে নেয়। সে জিরো সাইজের চুড়ি গুলো একবার দেখে, খানিক বিস্ময় ও প্রশ্নবোধক চাহনি নিয়ে দাদীর দিকে তাকালে, বৃদ্ধা বললেন–
—”পরের বার এই চুড়ির মালিক রে সাথে নিয়া আসবি। তিনজন আইলে বাড়িত ঢুকতে দিতাম না। চারজন হওয়া চাই। আমার কালামানিকের শখ, মাইয়ার বাপ হইব। আর সেই শখ পূরণ করবার দায়িত্ব তোর। স্বামীর শখ-আহ্লাদ পূরণ করলে উপরওয়ালাও তোর ঝুলিতে সব সুখ ঢাইলা দিবো। বুঝছোস নি বইন?”
পূর্ণতা ঠোঁটের কোণে লাজুক হাসি নিয়েই সম্মতি দিয়ে বলল–
—”জি, দাদী। আপনি দোয়া রাখবেন আমাদের জন্য।”
দাদী পূর্ণতার মাথায়, গালে স্নেহের হাত বুলিয়ে দিয়ে ভেজা গলায় বললেন–
—”দোয়া করি বইন, তোরা অনেক সুখী হ। আমার কালামানিকের এত বছরের দুঃখ-কষ্ট মিটে যাক, সাথে তোরও। স্বামী সোহাগী হ, তোদের ঘর সুখ-শান্তি আর সন্তানসন্ততিতে ভরপুর থাকুক।”
দাদী আর পূর্ণতা আরো কিছুক্ষণ গল্পগুজব করে। তারপর পূর্ণতাকে নিজের ঘরে চলে আসে। দাদীর রুম থেকে বের হওয়ার পূর্বে সে পূর্ণতাকে পইপই করে বলে দেন–
—”আমার দাদুভাই আসার আগে এসব খুলবি না নাতবউ। আমার দাদু ভাই আগে মন ভরে তোরে দেখবো, প্রশংসা করব। পরে নাহয় সে নিজেই খুলে দিবো।”
লাস্টের কথাটা বলার সময় তার কণ্ঠে ছিল একপ্রকার রসিকতা। পূর্ণতা তার কথার মানে বুঝতে পেরে লজ্জায় দ্রুত কদম ফেলে চলে আসে দাদীর রুম থেকে।
কাল সকাল সকাল তারা রওনা দিবে, তাই পূর্ণতা এখনই ব্যাগটা গুছিয়ে রাখে। তার গোছগাছের মাঝেই জাওয়াদ রুমে আসে। আজ হাঁট বসেছিল গ্রামে, সে ও আরিয়ান তাজওয়াদকে নিয়ে হাঁটে দেখতে গিয়েছিল।
জাওয়াদ বেখেয়ালি ভাবে রুমে ঢুকেই ধপ করে বিছানায় শুয়ে পড়ে। সে তখনও পূর্ণতার সাজ দেখেনি। জাওয়াদ শব্দ করে শোয়ায় পূর্ণতা ব্যাগ গোছানো রেখে তার দিকে ফিরে বলল–
—”কোথায় গিয়েছিলেন আপনারা? ছেলে কই?”
জাওয়াদ চোখ বন্ধ রেখে বলল–
—”হাঁটে গিয়েছিলাম, আর ছেলে ওর আলু মামার কাছে আছে।”
—”ওহ্হ। মুখ হাত ধুয়েছেন?”
জাওয়াদের কাছে আসতে আসতে জিজ্ঞেস করে পূর্ণতা। জাওয়াদ উত্তরে বলে–
—”হুম, কিন্তু মুছি নি। গরম লাগছে অনেক।”
পূর্ণতা ফ্যানের রেগুলেটর ঘুরিয়ে ফ্যানটা আরেকটু বাড়িয়ে দেয়। তারপর ঘরের দরজাটা ভিড়িয়ে দিয়ে নিজেও জাওয়াদের পাশে বিছানায় উঠে বসে। পূর্ণতা বিছানায় বসতেই জাওয়াদ নিজের মাথাটা তার কোলে তুলে দেয়। তারপর ক্লান্ত গলায় বলল–
—”ও বউ, চুলগুলো টেনে দাও না একটু।”
পূর্ণতা বিনা বাক্য ব্যয়ে তাই করতে থাকে। বারবার হাত নাড়ানোর কারণে পূর্ণতার হাতের চুড়িগুলো শব্দ হওয়ায়, জাওয়াদ কপাল কুঁচকে বলে–
—”ঘরের মধ্যে চুড়ি পরে আছো কেন?”
—”আমি পরি নি, দাদী পরিয়ে দিয়েছে।”
—”দাদী?”
জাওয়াদ ফট করে চোখ খুলে পূর্ণতার দিকে তাকালে, বিস্ময়ে কথা বলতে ভুলে যায়। সে তড়াক করে লাফ দিয়ে উঠে বসে হা করে তাকিয়ে থাকে বউয়ের দিকে। পূর্ণতাকে এমন পরিপাটি হয়ে সেজেগুজে থাকতে লাস্ট কবে দেখেছিল সে, তা ভুলে গিয়েছে জাওয়াদ।
জাওয়াদ বড় বড় শ্বাস ফেলে নিজের বুকের ভেতরে ওঠা ঝড়টাকে শান্ত করার চেষ্টা করে। কিন্তু এই ঝড় কি আর থামে সহজে? বউয়ের কোমল স্পর্শেই শান্ত হবে এই প্রলয়ঙ্কারী ঝড়।
জাওয়াদ ঘন ঘন ঢোক গিলো গলাটা ভিজিয়ে নেয়। হাস্কি গলায় বলল–
—আজ আমার রাতের ঘুম হারাম করে, ঠিক করলেন না মিসেস শেখ। কাল ভালোয় ভালোয় সিলেট থেকে ঢাকায় পৌঁছাতে পারলে হয় ড্রাইভ করে।
একটু থেমে গভীর একটা শ্বাস ত্যাগ করে জাওয়াদ আবারও বলল–
—”বর্তমানে দাদা বাড়িতে রয়েছেন বলে বেঁচে গেলেন মিসেস, আপনাকে তো আমি ঢাকায় গিয়ে ধরবো। আমার মন পিঞ্জিরায় বন্দি করে নিজেকে উজার করে ভালোবাসবো আপনাকে। আপাতত আমায় শান্ত করুন জনাবা। নিজের রূপের মহিমায় আপনার বরের বুকে তোলপাড় করা যেই ঝড় শুরু করেছেন, তা আপনাকেই থামাতে।”
জাওয়াদের ঘোর লাগা কণ্ঠস্বর শুনে পূর্ণতার চোখ বড় বড় হয়ে যায়। রুমের দরজা শুধু ভিড়িয়ে রেখেছে, লক করেনি। এমতাবস্থায় জাওয়াদ উল্টাপাল্টা কিছু করা শুরু করে আর কেউ একজন যদি এসে পড়ে রুমে নক না করেই। তাহলে পূর্ণতা লজ্জায় কাউকে মুখ দেখাতে পারবে কিনা সন্দেহ। সে হুরতুর করে বিছানা ছেড়ে উঠতে চায়, কিন্তু তার আগেই জাওয়াদ তার উপর উঠে এসে তাকে শুয়ে দেয় বিছানায়। পূর্ণতা জাওয়াদকে থামানোর উদ্দেশ্যে বলে–
—”জাওয়াদ, দরজা খোলা।”
—”বেশি সময় নিবো না জান, ভীষণ তৃষ্ণা পেয়েছে তোমার স্পর্শের। তুমি কো-অপারেট করলে, তাড়াতাড়ি ছেড়ে দিবো প্রমিস।”
—”কিন…..”
পূর্ণতাকে তার কথাটা অসম্পূর্ণ রাখতে হয় জাওয়াদের পাগলামির জন্য। জনাব দিনকে দিন বড়ই অধৈর্য, অশান্ত, উন্মাদে পরিণত হচ্ছে বউয়ের প্রেমে পড়ে। আর বেচারি পূর্ণতাকে এবারও তার পাগল বরমশাইকে শান্ত করতে বেশ হিমসিম খেতে হয়।


—”টনি বাবা, একটা বার আমার কথাটা শুনে যাও।”
একরাশ আকুতি নিয়ে কথাটি বলেন টনির নামমাত্র পিতা। কলেজে ঢোকার সময় অন্যান্য দিনের ন্যায় আজও জাফর সাহেবকে দাড়িয়ে থাকতে দেখে, টনি তাঁকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে নেয়। কিন্তু তখনই জাফর সাহেব তার পথরোধ করে উপরোক্ত কথাটি বলে।
টনি মস্তিষ্ক বলে, এই আকুতিভরা ডাককে চরমভাবে উপেক্ষা করে চলে যেতে। কিন্তু মন বলে, শুনে যা কি বলতে চায় তোর নামমাত্র পিতা তোকে। শত হোক অন্যায়ের পরও তুই অস্বীকার করতে পারবি না যে, এই লোক তোর জন্মদাতা।
টনি তার মনের কথাই শোনে। জাফর সাহেবের কথা শোনার জন্য থামিয়ে দেয় হাঁটা, তবে পেছন ফিরে তাকায় না তার দিকে।
টনিকে থামতে দেখে জাফর সাহেব নিজেই বড় বড় পা ফেলে ছেলের কাছে এগিয়ে আসে। তারপর মায়া ও আকুতি নিয়ে বললেন–
—সব ভুলে বাড়ি ফিরে চলো বাবা। আমি পিতা হয়ে ভুল করেছি, মানছি তা। তুমি আমার ভুলটাকে ক্ষমা করে দিয়ে বাড়ি ফিরে চলো বাবা। আমার এত কোটি টাকার সম্পদের একমাত্র ওয়ারিশ কিনা পয়ত্রিশ হাজার টাকার চাকরি করে। বিষয়টা আমার জন্য অনেক লজ্জার ও অস্বস্তির। প্লিজ সব মান-অভিমান ভুলে বাড়ি ফিরে আসো বাবা।
টনি চোখ তুলে বাবার দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। জাফর সাহেবের চোখের পানি স্পষ্ট বলে দিচ্ছে, সে নিজের পূর্বের ভুলের জন্য কতটা অনুতপ্ত।
[গল্পটি ভালো লাগলে বেশি বেশি শেয়ার করে আপনার গল্প প্রেমী বন্ধুদের নিকট পৌঁছে দিন।]
শব্দসংখ্যা~২৭৩৬

চলবে?

[মানুষের হায়াত কখন, কবে শেষ হয়ে যায় সেটা শুধু আল্লাহ রাব্বুল আলামিনই জানেন। আপনারা অনেকেই অবগত, গত শুক্রবার আমার নানু আল্লাহর মেহমান হয়েছেন। ছোট বেলা থেকেই দাদী-দাদা আর নানা এই তিনজনের ভালোবাসা দিয়েছেন আমাদের নানুই। নাতি-নাতনীদের মাঝে আমাকেই বেশি ভালোবাসতেন আমার নানু। আমিও তাই। সেই প্রিয় মানুষটির হঠাৎ প্রস্থানে আমি কতটা ভেঙে পড়েছি, আপনাদের হয়ত তা লিখে বুঝাতে পারব না।
আপনারা আমার এতদিনের গ্যাপটাকে ভুল ভাববেন না। আমি শুধু আপনজন বিয়োগের শোকে শোকাহত ছিলাম। আপনারা সকলে আমার মরহুমা নানুর জন্য দোয়া করবেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যেন, তাকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসীব করেন।
ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। গঠনমূলক মন্তব্য করবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স। ] See less

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply