শেষপাতায়সূচনা [৫৭.১]
সাদিয়াসুলতানামনি
—”ক্ষমা? মান-অভিমান? এসব কেন বলছেন মি.জাফর? এসব তে আপনজনদের সাথে করা হয়। আর আপনি আমার আপন কেউ?
আমার তো মনে হয় না। আপনার আমার মধ্যকার সম্পর্কের সূত্র হলো, আমি আপনার মেয়ের শিক্ষক। এরচেয়ে বেশি কিছু নই। এক্সকিউজ মি. আমার ক্লাসের সময় হয়ে গিয়েছে। পরে একসময় কথা হবে।”
অনেকটা পরিচিতের ন্যায় কথাগুলো বলে টনি সেখান থেকে চলে যায় কলেজের ভেতরে। জাফর সাহেব ছলছল চোখে ছেলের প্রস্থান দেখেন। সে আজ বেশ ভালো করেই বুঝতে পারছেন, তার অবহেলা থেকে পাওয়া একাকিত্ব টনিকে কতটা কঠোর করে তুলেছে। আজকের টনি নিজের জায়গায় একদম ঠিক আছে। কেন সে এত সহজে তাকে মাফ করে দিবে? বাবা হিসেবে করেছেটা কি সে টনির জন্য? মাস শেষে শুধু পড়ালেখা ও থাকা-খাওয়ার খরচটাই দিতো। তাও বন্ধ করে দিলো, স্ত্রী-বোনের কান পড়া শুনে।
জাফর সাহেবের বর্তমান স্ত্রী রত্না তারই বোন বান্ধবী। সেই বোন যার মেয়ের টনির বিয়ের কথা উঠেছিল। জীবনের একটা লম্বা সময় পর্যন্ত সে শুধু ভুলই করে গেলো। আর আজ সেই ভুলের জন্য আফসোস করে চোখের পানি ফেলছে।
জাফর সাহেব একটা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে ভঙ্গুর কদম ফেলে গাড়িতে উঠে বসেন। সে উঠে বসতেই ড্রাইভার গাড়ি চালাতে শুরু করে দেয়।
—”আদরের মাম্মা, অ্যাঁই পূর্ণ, বিদায় নেওয়া হলো তোমার? রওনা দিতে হবে তো আমাদের এখন। নাহলে ঢাকায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে দেরি হয়ে যাবে তো আবার।”
গাড়ির থেকে বের হয়ে বাড়ির সদর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে স্ত্রীকে হাক দিতে থাকে জাওয়াদ। আজ তারা চলে যাচ্ছে ঢাকায়। সবকিছু গুছিয়ে-গাছিয়ে গাড়িতে তোলাও শেষ। সে আর তাজওয়াদ গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে পূর্ণতার। কিন্তু পূর্ণতা সবার থেকে বিদায় নিতে দেরি করছে বড্ড। তারা গ্রামে ছিলো হাতে গোনা কয়েকদিন, কিন্তু পূর্ণতা তার চাচী-কাজিনদের সাথে এতটা গভীরভাবে মিশে গিয়েছে যে, না চাচীরা তাদের শহুরে বউমাকে সহজে বিদায় দিচ্ছে, আর নাই বা পূর্ণতা তাদেরকে ছেড়ে আসছে।
একদফা কান্না কাটি করাও শেষ ইতিমধ্যে, কিন্তু বিদায় পালা শেষ হয়নি এখনও। অপেক্ষা করতে করতে জাওয়াদ নিরক্ত হয়ে গিয়ে না পারতে অবশেষে ডেকেই বসে স্ত্রীকে।
জাওয়াদের চাচীদের সাথে করেই পূর্ণতা বাড়ি থেকে বের হয়। সকলের চোখই সিক্ত। তাদের সকলের সাথে জাওয়াদের দাদীও এসেছে। পূর্ণতা শেষবারের মতো সবার থেকে বিদায় নিয়ে গাড়িতে উঠে বসলে তাজওয়াদ ভদ্র বাচ্চার মতো তার কোলে এসে চুপচাপ বসে থাকে। জাওয়াদের দাদী পূর্ণতার পাশের জানালায় এসে হাত বাড়িয়ে তাজওয়াদকে আদর করে দেন। তারপর স্মিত হেঁসে বললেন–
—”পরের বার বইন রে সাথে কইরা নিয়া আইবা, ঠিক আছে তাজ ভাই?”
—”আচ্চা বম্মা। তাহলে তুমিও কিন্তু আমাদেল সাতে আমাদেল বাসায় যাবে। তিক আচে?”
—”ইনশা আল্লাহ, আল্লাহ যদি কিসমতে রাখে তাহলে যামু। এখন রওনা দেও তোমরা, নইলে পৌঁছাতে দেরি হইয়া যাইবো। “
বৃদ্ধা গাড়ির সামনে থেকে সরে দাঁড়ালে জাওয়াদ গাড়ি স্টার্ট দেয়। জাওয়াদের গাড়ির পেছন পেছন আরিয়ানও গাড়ি চালাতে শুরু করে। সময়ের ব্যবধানে তার গ্রামের মেঠোপথ পাড়ি দিতে দিতে একসময় মেইন সড়কে উঠে আসে।
আজ সকাল সকালই ঘুম থেকে উঠে গিয়েছে তাজওয়াদ। তাই গাড়ি চলতে থাকার কিছুক্ষণ পরই সে মায়ের বুকেতে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে। পূর্ণতার তন্দ্রাভাব পাচ্ছে বলে, সে সিটে মাথা এলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করে রাখে।
সড়কে অতিরিক্ত জ্যাম থাকার কারণে, পূর্ণতাদের ঢাকায় পৌঁছাতে সন্ধ্যা হয়ে যায়। জাওয়াদ, পূর্ণতা, তাজওয়াদ তিনজনই ভীষণ ক্লান্ত থাকায় এসেই শাওয়ার নিয়ে ফ্রেশ হয়ে নেয়। তাজওয়াদকে শাওয়ার নিয়ে দিতেই সে যেন নিজের পূর্বের সব হারানো শক্তি ফিরে পেয়েছে। লাফিয়ে-কুদিয়ে রুম ছেড়ে বের হয়ে চলে যায় তার পিপি ও দাদা ভাইয়ের সাথে দুষ্টুমি করতে।
পূর্ণতা-জাওয়াদ ফ্রেশ হয়ে কাজা নামাজ গুলো রুমেই বসে আদায় করে তারপর নিচে নামে। নিচে এসে দেখে, তাজওয়াদ পুরো উদ্যমে নির্জীব হয়ে যাওয়া বাড়িটাকে মাতিয়ে তুলেছে আপন কীর্তিতে। কখনো দাদাভাইয়ের সাথে চোর-পুলিশ খেলছে, কখনো বা হাত নাড়িয়ে চোখ ট্যারাব্যাকা করে গ্রামের বিভিন্ন ঘটনা শোনাচ্ছে। মি.শেখ ক্লান্তি বা বিরক্ত না হয়ে মনোযোগ দিয়ে নাতির সঙ্গ উপভোগ করছে।
পূর্ণতা চলে যায় কিচেনের দিকে, আর জাওয়াদ বসে পড়ে বাবার পাশে। সে বসতেই তাজওয়াদ তাইরে-নাইরে করতে করতে বাবার কোলে গিয়ে বসে। এতক্ষণ ছুটোছুটি করে বেচারা হাঁপিয়ে উঠেছে, কিন্তু থামার বা চুপ করার কোন লক্ষ্মণ তার মধ্যে দেখা গেলো না তখনও।
জাওয়াদ সেন্টার টেবিলের উপর থেকে কতগুলো টিস্যু নিয়ে একসাথে করে তাজওয়াদের ঘর্মাক্ত মুখ, গলা মুছে দেয় সযত্নে। তাজওয়াদ তখন তার দাদাভাইকে ভীষণ আগ্রহ নিয়ে বলে ওঠে–
—”দাদু দানো, বম্মা আমাল বোনুল জন্য গিপ্ট দিয়েচে। আল বলেচে, পলেলবাল বোনুকে সাতে কলে নিয়ে দেতে।”
মি.শেখ বুঝলেন না, তার মা তার নাতিকে কোন বোনের কথা বলেছে। সে তাই জিজ্ঞেস করলেন–
—”তোমার কোন বোন দাদুভাই?”
দাদার প্রশ্ন শুনে তাজওয়াদ তার কপালে হাত রেখে মাথা এদিক-ওদিক নাড়াতে থাকে। বড়ই হতাশ সে এত আলাভোলা দাদা পেয়ে। সে তার দাদাভাইকে বুঝাতে বলল–
—”আলেএএ! আমাল বোনু গো, আমাল ছোটু বোনু। যেতা মাম্মা-পাপা এনে দিবে আমাল সামনেল বার্থ ডে-তে। একুন বুদেতো?”
এবার সবটা বুঝতে পারলেন তিনি। নাতির প্রশ্নের জবাবে ভদ্রলোক মাথা স্বল্প নাড়িয়ে স্মিত হেঁসে বললেন–
—”হ্যাঁ, হ্যাঁ বুঝেছি। তা আমার দিদি ভাই বুঝি তোমার পরবর্তী জন্মদিনে আসতে চলেছে?”
—”হুউউম। মাম্মা আমাকে বলেছে, নেক্সট বার্থ ডে-তে বেবি সিস্টার গিফট করবে।”
—”বাহ, বাহ। তাহলে তো ভীষণ ভালো উপহার হবে সেটা।”
জাওয়াদ নিজের বাবা ও ছেলের কথোপকথন শুনতে নিঃশব্দে মিটিমিটি হাসতে থাকে। সবাই একদম উঠে-পরে লেগেছে আরেকটা নতুন প্রাণকে নিজেদের পরিবারে স্বাগতম জানাতে। এক রাজপুত্রকে নিয়ে সবাই খুশি থাকলে, রাজকন্যার অভাববোধ করছে এখন সকলেই। সুখের রাজ্যে রাজকন্যা নেই, বিষয়টি আসলেই চোখে লাগার মতোই।
কিন্তু যার মাধ্যমে আসবে রাজকন্যা সে রাজি তো? নাকি সবাই নিজেদের ভাবনা তার উপর চাপিয়ে দিচ্ছে, আর সে পরিবারের খুশিতে সেটা মেনে নেওয়ার প্রচেষ্টা করছে? জাওয়াদের মনে আচানকই প্রশ্নটির আগমন ঘটে। যার দরুন তার কপালে চিন্তার রেখা ফুটে ওঠে।
—”তোমার মা’কে আসতে বলবে না তোমার বিয়েতে?”
রাতের খাবার খেয়ে আরিয়ান আর আহনাফ সাহেব ড্রয়িংরুমে বসে ছিলেন। তখনই আহনাফ সাহেব আরিয়ানকে উক্ত প্রশ্নটি করেন।
মিসেস আহমেদ বর্তমানে জামিনে কারাগারের বাহিরে রয়েছেন। কিন্তু তাঁকে নিয়মিত থানায় হাজিরা দিতে হতে হয় এবং তার শহরের বাহিরে যাওয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। জামিন পাওয়ার পর মিসেস আহমেদ আহমেদ বাড়িতে আসলেও, আহনাফ সাহেব তাঁকে তাড়িয়ে দেন তার পূর্বের অপকর্মের কারণে। মিসেস আহমেদ এখন গ্রামের বাড়িতে রয়েছে কিন্তু তিনি পুনরায় নিজের সংসার ফেরার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এমনকি পূর্ণতার সাথেও সে ইতিমধ্যে যোগাযোগ করেছে। অনেক আকুতি-মিনতি করেছে পূর্ণতার কাছে, যাতে সে আহনাফ সাহেব ও আরিয়ানকে বুঝায় তাকে বাড়িতে ফেরত নেওয়ার জন্য। পূর্ণতা তাঁকে কোন আশ্বাস না দিয়েই ফোন কেটে দিয়েছে।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আরিয়ান পাল্টা নিজের বাবাকে জিজ্ঞেস করে–
—”তুমি কি বলো? কি করা উচিত আমার?”
—”আমার কাছে পরামর্শ চাইলে বলবো, তাকে আরেকটা সুযোগ দেওয়া উচিত। দুইমাস কারাগারে থেকে তার মধ্যে আমি অনেক পরিবর্তন দেখতে পেয়েছি, যেদিন সে এসেছিল। তোমার মামারাও ফোন দিয়ে বললো, সে এখন আর আগের মতো বদমেজাজী, অহংকারী নেই।”
—”বউ ছাড়া দিনকাল ভালো কাটছে না বুঝি বাবা?”
আহনাফ সাহেবের মজা নিতে আরিয়ান কথাটি বলে। অন্যদিকে আরিয়ানের প্রশ্নটি শুনে আহনাফ সাহেব থতমত খেয়ে যায়। তার যৌবন ও বৃদ্ধ বয়সের একমাত্র সঙ্গী নিজের অর্ধাঙ্গিনীকে ছাড়া আহনাফ সাহেবের দিনগুলো যে কতটা বেদনাবিধুর ভাবে কাটছে, সেটা একমাত্র তিনিই জানেন। একদিকে, মিসেস আহমেদের অপকর্মের জন্য তাকে ক্ষমা করতে না পারার কষ্ট। অন্যদিকে, প্রিয়তমা স্ত্রীর অনুপস্থিতি। উভয়ই তাঁকে ভীষণ ভাবে পীড়া দিচ্ছে।
—”বউ ছাড়া দিনগুলো কেমন কাটে, সেটা ভবিষ্যতে তুমি টের পাবে বেটা। কিন্তু আমি এসব ভেবে বলি। শত হোক, অজান্তা তোমার জন্মদায়িনী। আর সন্তানের বিয়েতে মা থাকবে না, বিষয়টা একটু কেমন কেমন হয়ে যায় না?”
আরিয়ান বুঝতে পারে বাবার মনঃকষ্টের বিষয়টা। তার বাবা যে স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনতে চাইছেন, সেটা সে বেশ ভালোই বুঝতে পারছেন। সে গোপনে এক দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে, সোফা ছেড়ে যাওয়ার আগে বলল–
—”তোমার বাড়ি, তোমার স্ত্রী। সবই তোমার। তোমার ইচ্ছে হলে, তোমার স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনতে পারো। আমার এতে কোন মতামত দেওয়ার ইচ্ছে নেই। কিন্তু আমার মনে হয় না, আমি এত সহজে তোমার স্ত্রীকে ক্ষমা করতে পারব। বোনুও যদি তাকে ক্ষমা করে দাও, তাও মনে হয় না আমি পারব।
আমি সত্যিটা জানার পর থেকে বোনুর চোখে চোখ রাখতে পারি না, তোমার স্ত্রীর অপকর্মের কথা মনে করে। তখন নিজেকেও কেমন যেন লোভী, স্বার্থপর লাগে। ঐ যে বললে না, শত হোক আমার জন্মদায়িনী। জন্মদায়িনীর পাপের গ্লানি আমাকেও টানতে হচ্ছে।
আরওয়ার সাথে আমার বিয়ে হওয়াটার বিষয়টায় সবচেয়ে বেশি কে অবদান রেখেছে জানো বাবা? বোনু আর জাওয়াদ ভাই। এই বিয়ে হওয়ায় আমার চেয়েও তাদের অবদান। পূর্ণতার মতো মেয়েকে বোন হিসেবে পাওয়া ভাগ্যের বিষয় বাবা। মেয়েটা নিজের কষ্টগুলো হাসির আড়ালে লুকিয়ে রাখে সর্বদাই। আর নিজেকে উজার করে আপনজনদের ভালোবাসে। অথচ দেখো, সেই মেয়েটাই কিনা জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোতে আপনজনদের পাশে পায়নি। কেনো? কার জন্য? আমার জন্মদায়িনীর অতিরিক্ত লোভের জন্য।
আমি না সত্যিই বলছি, আমি মিসেস আহমেদকে এত সহজে ক্ষমা করতে পারব না বাবা।”
আরিয়ান কথাগুলো বলে সিড়ি বেয়ে নিজের রুমে চলে যায়। ফাঁকা ড্রয়িংরুমে বসে থাকেন আহনাফ সাহেব। তাট মস্তিষ্কে তখনও বিদ্যুৎ বেগে ছুটে চলছে তার ছেলের কথাগুলো।
আজ রাতে তাজওয়াদ তার পিপির কাছেই ঘুমিয়ে গিয়েছে। এতটা পথ জার্নি করে এসে আবারও দুষ্টুমি করতে লেগে পড়ায়, বেচারা প্রচন্ড ক্লান্ত হয়ে নয়টা বাজেই জিনিয়ার রুমে ঘুমিয়ে গিয়েছে। ভাগ্যিস পূর্ণতা সাড়ে আটটার দিকে তাজওয়াদকে ধরে বেঁধে ভাত খাইয়ে দিয়েছিল, নাহলে ছেলে একবার ঘুমালে আর খেতো না।
তাজওয়াদ ঘুমিয়ে যাওয়ার বেশ কিছুক্ষণ পর বাকিরা খেতে বসে। পূর্ণতা সবাইকে বেড়ে দিয়ে নিজেও স্বামীর পাশে প্লেট নিয়ে বসে পড়ে খেতে। ঘুমে তার চোখ ভেঙে আসছে।
খাবার খাওয়া শেষে সবাই যখন ড্রয়িংরুমে বসে রেস্ট করার জন্য, তখনই মি.শেখ জিনিয়াকে পাত্রপক্ষ দেখতে আসার কথাটা তুলেন।
—”আমাদের এলাকার একদম প্রথম বাড়ির আলম সাহেব আছেন না, উনি আমাদের জিনিয়ার হাত চেয়েছেন তার ছোট ছেলের জন্য। আমি যদিও তাদের কথা-টথা কিছু দেই নি সম্পর্ক আগানো বিষয়ে, কিন্তু ভদ্রলোক সেদিন মসজিদের বাহিরে এত পীড়াপীড়ি করছিল স্ত্রী-ছেলেকে নিয়ে আমাদের জিনিয়াকে দেখতে আসার। আমি ভদ্রতার খাতিরে তাদের সামনের শনিবার আসতে বলে দিয়েছি। এত তোমাদের কি মনে হয় এই বিষয়ে? কাজটা কি আমি ঠিক করেছি?”
জাওয়াদ-পূর্ণতা একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে থাকে মি.শেখের কথা শুনে। তারা বেশ বিভ্রান্তিতে পড়ে যায় ভদ্রলোকের কথা শুনে। টনির সাথে জিনিয়ার সম্পর্কের কথা তারা উভয়েই জানে। জাওয়াদ জানে মূলত পূর্ণতার মাধ্যমে। সে জানার পর অবশ্য খুশিই হয়েছে। টনি ছেলেটাকে তার নিজেরও যথেষ্ট ভালো লাগে। সৎ, কর্মঠ, বুদ্ধিমান। একদম যেনো তার নিজেরই প্রতিবিম্ব। তার বিশ্বাস এতিম তার কলিজার বোনটাকে বেশ সুখেই রাখবে।
জাওয়াদ তার বাবার প্রশ্নের জবাবে কিছু বলতে নিবে, তখনই জিনিয়া প্রতিদিনের ন্যায় মি.শেখের জন্য রঙ চা বানিয়ে নিয়ে আসেন। চায়ের কাপটা বাবার হাতের ধরিয়ে দিয়ে মেকি রাগ দেখিয়ে বলল–
—”আমাকে তোমরা পর করতে উঠে পড়ে লেগেছো কেনো বলো তো? আমি মাত্রই আমার পুচকোটার সাথে থাকা শুরু করলাম, আর এখনই তোমার আমার বিয়ে-শাদি নিয়ে কথা শুরু করে দিয়েছো। তোমরা শুনে রাখো, আমি এত তাড়াতাড়ি বিয়ে করবো নাআআআ। এখনও আমার পুচকির সাথে খেলা বাকি আছে। সো নো বিয়ে-শাদি।”
জিনিয়ার বাচ্চামিতে সবাই হেঁসে দেয়। অন্যদিকে জিনিয়ার কথা কেউ সিরিয়াসলি নিচ্ছে না দেখে জিনিয়া রাগ করে সেখান থেকে চলেই যায়। তাঁকে মুখ ফুলিয়ে চলে যেতে দেখে পূর্ণতাচ জাওয়াদ আর মি.শেখ আবারও হেঁসে দেয়। মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে হয়েও জিনিয়া ছোট থেকে যথেষ্ট আদর, ভালোবাসা, সৌখিনতায় বড় হয়েছে। একপ্রকার বলা চলে, সে বাবা-ভাইয়ের আহ্লাদী রাজকন্যা। মি.শেখ নিজেও চাইছেন না, মেয়েকে এত তাড়াতাড়ি পরের ঘরে পাঠাতে। কিন্তু মেয়ে হয়ে জন্মগ্রহণ করেছে, তখন এমন দুই-একটা বিয়ের সম্বন্ধ তো আসবেই মাসান্তর।
জাওয়াদ হাসাহাসি থামিয়ে গলা খাঁকারি দিয়ে মি.শেখের উদ্দেশ্যে বলল–
—”বাবা, জিনু একজন ছেলেকে পছন্দ করে।”
মি.শেখ ছেলের কথা শুনে বেশ অবাকই হন। তার মেয়ে যে প্রেম-ভালোবাসার দিকে যাবে সেটা সে কখনোই কল্পনা করেন নি। কিন্তু নিজের অবাক ভাবটাকে সে দ্রুতই কাটিয়ে উঠেন। কারণ, মেয়ে যথেষ্ট বড় হয়েছে। আর ভার্সিটিতে পড়ছে। এমতাবস্থায় কোন সম্পর্কে জড়ানো বড় বিষয় না। তবে টেনশনের বিষয়টা হলো, তার মেয়ে যেই ছেলের সাথে সম্পর্কে জড়িয়েছে সে কেমন? তার চরিত্র ভালো নাকি খারাপ? সে কর্মঠ নাকি বাউণ্ডুলে? সৎ নাকি বাটপার?
—”কে সেই ছেলে? তুমি কি তাকে চেনো?”
—”হুম বাবা। টনির কথা মনে আছে। পূর্ণর বডিগার্ড ছিলো যে। উঠা-লম্বা করে ছেলেটা। “
মি.শেখ ব্রেনে চাপ খাটিয়ে টনির চেহারা মনে করে। হ্যাঁ, তার মনে পড়েছে তার। ছেলেটাকে দেখতে তার ভদ্র-সভ্যই মনে হয়েছে। পূর্ণতার সাথে প্রথম প্রথম দেখা করার সময়, ছেলেটা কিছুতেই তাদের দেখা করতে দিত না পূর্ণতার সাথে। সবসময় সে একটাই কথা বলত, “ম্যামের পারমিশন ব্যতীত আমি কিছুতেই আপনাদের তার সাথে দেখা করতে দিতে পারব না। আমার দায়িত্বের প্রতি আমি অঙ্গীকারবদ্ধ।” তার এই কথা শুনেই বিচক্ষণ মি.শেখ বুঝতে পেরেছিলেন, ছেলেটা নিজের দায়িত্ব-কর্তব্যের প্রতি যথেষ্ট নিষ্ঠাবান।
—”হ্যাঁ, মনে পড়েছে। কিন্তু ছেলেটা কেমন? দেখো আমি আমার সন্তানদের ভালোবাসায় কাটা হয়ে দাঁড়াতে চাই না। টনি ছেলেটা ভালো হলে আমার কোন আপত্তি নেই ওদের সম্পর্ক মেনে নিতে।”
শান্ত অথচ গুরুগম্ভীর গলায় কথাটা বললেন মি.শেখ। তার কথা শুনে এবার মুখ খুলে পূর্ণতা নিজেই। সে শ্বশুরের উদ্দেশ্যে বলল–
—”বাবা টনি ছেলেটার চরিত্র আর পারিবারিক শিক্ষার গ্যারান্টি আমি দিচ্ছি আপনাকে। ও নিজেও একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারের ছেলে। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে ওকে আজ এতিম মতো একাকী জীবনযাপন করতে হচ্ছে।”
এরপর পূর্ণতা সংক্ষিপ্ত আকারে টনির জীবনবৃত্তান্ত শোনায় মি.শেখকে। কীভাবে তার সাথে টনির দেখা হয়েছে? এরপর থেকে পূর্ণতাদের বাংলাদেশে আসা পর্যন্ত সবটা ঘটনা শোনায়। সবশেষে পূর্ণতা বলে–
—”বাবা, ও বর্তমানে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করার জন্য আমার আন্ডার থেকে বেরিয়ে গিয়ে একটি প্রাইভেট কলেজে জব নিয়েছে। যাতে ও মাথা উঁচু করে এসে, আপনাদের থেকে জিনিয়ার হাত চেয়ে নিতে পারে।”
পূর্ণতার থেকে টনির জীবন কাহিনী শুনে মি.শেখের মনে টনির সম্পর্কে ইতিবাচক মনোভাব সৃষ্টি হয়।
কেটে গিয়েছে আরো দুটো দিন। আজ শুক্রবার আরিয়ান ও আরওয়ার শুভ পরিণয় ঘটতে চলেছে। আরিয়ানরা ইতিমধ্যে বরযাত্রী নিয়ে চলে এসেছে শেখ ম্যানশনে। বরযাত্রী বলতে একান্তই আপন কয়েকজন আত্নীয়-স্বজন ও আরিয়ানের দুয়েকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু। পূর্ণতা ও জাওয়াদ বেশ ভালোভাবেই তাদের আতিথেয়তা করতে থাকে। পূর্ণতা আরিয়ানের বোন হলেও, আজ সে আরওয়ার ভাবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে। যেহেতু সিলেটে জাওয়াদ আরওয়াকে নিজের বোন বলেছিল।
আরিয়ানরা আসার দেড় ঘন্টা পর, কাজী সাহেব রেজিষ্ট্রেশন পেপারসহ যাবতীয় লেখালেখি শেষ করে কনেকে নিয়ে আসতে বললে, পূর্ণতা জানায় আরওয়া পার্লার থেকে এখনও আসেনি। পূর্ণতার কথা শুনে সবার কপালে চিন্তার রেখা ফুটে ওঠে।
পার্লারে আরওয়া ও তার ভাবী গিয়েছে। একদম কম সময় পার্লারে ব্রাইডাল মেকআপ বুক করায়, মেক-আপ আর্টিস্টরা বাসায় এসে সাজাতে না পারার বিষয়টি জানালে, পূর্ণতা পার্লারে গিয়েই সাজার এ্যাপয়েন্টমেন্ট নেয়। বাসায় অনেক কাজ থাকায়, পূর্ণতা বাড়ির গাড়িতে আরওয়া ও তার ভাবীকে পাঠিয়ে দেয় পার্লারের উদ্দেশ্যে। কিন্তু সাড়ে চার ঘন্টা হয়ে যাওয়ার পরও এখনও তারা আসছে না।
তাদের সকলের চিন্তাকে ভয়ে রূপান্তর করে একটি ফোনকল, যেটা আসে আরওয়ার ভাই রাসেলের ফোনে। রাসেল ফোনটা পকেট থেকে বের করে দেখে, তার স্ত্রী কল করেছে। সে চটজলদি ফোনটা রিসিভ করে কানে চাপলে, ফোনের অপরপাশ থেকে আরওয়ার ভাবী কাঁদতে কাঁদতে বলে–
—”ওগো সর্বনাশ হয়ে গিয়েছে গো! অনেক বড় সর্বনাশ হয়ে গিয়েছে।”
কথাটুকু বলেই সে আবারও উচ্চস্বরে কাঁদতে শুরু করে দেয়। এদিকে স্ত্রীকে এমন করে কাঁদতে শুনে, রাসেল ঘাবড়ে যায়। সে উত্তেজিত গলায় জিজ্ঞেস করে–
—”কি সর্বনাশ হয়েছে আয়েশা? আর কাঁদছ কেন তুমি? কি হয়েছে বলো আমায়।”
রাসেল উচ্চস্বরে কথাগুলো বলায় উপস্থিত সকলেই তার কথা শুনতে পায়। সবাই ভীত ও প্রশ্নবোধক চাহনি নিয়ে রাসেলের দিকে তাকিয়ে থাকে, কি হয়েছে জানার জন্য।
ফোনের অপর পাশে থাকা রাসেল পত্নী আয়েশা কাঁদতে কাঁদতে বলে–
—”আমি আর আরু সেজে পার্লার থেকে বের হতেই, একটা গাড়ি এসে থামে আমাদের সামনে। আমি কিছু বুঝে উঠার আগেই, সেটার ভেতর থেকে চার-পাঁচজন গুন্ডা মতো লোক বের হয়ে আসে, আর আরওয়াকে টেনেহিঁচড়ে ওদের গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়। আমি বাঁধা দিতে গেলে, আমায় সজোড়ে ধাক্কা দিয়ে রাস্তায় ফেলে দিয়ে চলে যায় গাড়ি নিয়ে।”
[গল্পটি ভালো লাগলে বেশি বেশি শেয়ার করে আপনার গল্প প্রেমী বন্ধুদের নিকট পৌঁছে দিন।]
শব্দসংখ্যা~২৩৫০
চলবে?
[কে আরওয়াকে কিডন্যাপ করলো আবার? গেস করুন আপনারা।
ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। গঠনমূলক মন্তব্য করবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স।
] See less
Share On:
TAGS: শেষ পাতায় সূচনা, সাদিয়া সুলতানা মনি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২৫
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৫৭.২
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১৪
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৬০.১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৫৬.২
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৫১.২
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৪৮.১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২৪
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২৩