#যেখানে_প্রেম_নিষিদ্ধ
#ইশরাত_জাহান_জেরিন
মীর বাড়ির ড্রয়িংরুমটা আজ যেন একটা কুরুক্ষেত্র। আব্রাজের হঠাৎ বিয়ে আর বিশ টাকার কাবিন নিয়ে বাড়ি ফেরার রেশ এখনো কাটেনি। তার ওপর নৈশি ইসলামের মতো দাপুটে নেত্রীকে বাড়ির বউ করে আনা মানেই ঘরে আস্ত একটা আগ্নেয়গিরি পুষে রাখা।
সোফায় পা ছড়িয়ে বসে আছে সাঁঝ। তার কাঁধে চিরস্থায়ী শত্রু কাম বন্ধু শালিক পাখি ‘চিকু’। চিকু কিছুক্ষণ পর পর সাঁঝের কান কামড়ে ধরছে আর সাঁঝ বিকট শব্দে চিৎকার করছে। আরযান পাশ থেকে একটা খবরের কাগজ পড়ার চেষ্টা করছিল, কিন্তু সাঁঝের চিৎকারে তার ধৈর্যচ্যুতি ঘটল। আরযান কাগজ নামিয়ে ধমক দিয়ে বলল, “এই মেয়ে, তোর এই ড্রাগনটাকে কি একটু শান্ত রাখা যায় না? কানে তালা লেগে যাচ্ছে!”
সাঁঝ মুখ ফুলিয়ে বলল, “ড্রাগন হবে কেন? ও তো আমার কিউট চিকু! ও আসলে আব্রাজ ভাইয়ের ওই ‘বিশ টাকার ভাবী’র আগমনে খুব উত্তেজিত। ও বোধহয় বুঝতে পারছে এই বাড়িতে এখন রাজনীতির ঝড় বইবে।” ঠিক তখনই আরভিদ এক প্লেট শিঙাড়া নিয়ে ঘরে ঢুকল। আরভিদকে দেখেই চিকু ডানা ঝাপটিয়ে উড়ে গিয়ে সরাসরি আরভিদের শিঙাড়ার প্লেটে হাগু করে দিল। আরভিদ স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ড্রয়িংরুমে হাসির রোল পড়ে গেল।
আরভিদ চিৎকার করে উঠল, “সাঁঝ! তোর এই উড়ন্ত টয়লেটটাকে এখনই খাঁচায় ভর! আমার শিঙাড়াগুলো সব শেষ করে দিল!”
সাঁঝ হেসে কুটিপাটি হয়ে বলল, “আরে ভাইয়া, ও তো ওটা সস মনে করেছে! তুমিও না কেমন!”
সাঁঝ জিভ কামড়ে চুপ হয়ে গেল। সে চিকুকে ইশারা করে বলল, “চল চিকু, আমরা আব্রাজ ভাইয়ের ঘরের দরজায় গিয়ে আড়ি পাতি। ওখানে মনে হয় এখন ভোটের পুনর্গণনা চলছে!”
–
মীর বাড়ির সেই বিখ্যাত ‘দরজা ভাঙা’ কাণ্ডের পর তাজ আর সিয়ার সম্পর্কের সমীকরণও বদলে গেছে। তবে তাজের ডিক্টেশন আর ডিসিপ্লিনে কোনো কমতি আসেনি, বরং সিয়াকে শাসন করার বাহানা যেন আরও বেড়ে গেছে।
আজ রাতের ফ্লাইটের আগে ব্রিফিং রুমে সিয়া মন দিয়ে ফাইল দেখছিল। তার চুলে এখন আর আগের মতো অগোছালো ভাব নেই, পোশাকেও নিখুঁত ডিসিপ্লিন। তাজের সেই ‘বিমানের চাকা’র হুমকির পর সে যেন আরও বেশি সতর্ক হয়ে গেছে।
তাজ রুমে ঢুকল। পরনে ক্যাপ্টেনের ইউনিফর্ম, চোখে সেই চিরচেনা গাম্ভীর্য। সিয়াকে দেখেই সে হালকা একটু থমকাল, তবে পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিল।
“ফ্লাইট লগ চেক করা হয়েছে, মিস সিয়া?” তাজের কড়া আওয়াজ।
“ইয়েস স্যার। এভরিথিং ইজ রেডি,” সিয়া সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ফাইলটা এগিয়ে দিল।
তাজ ফাইলটা নিল, কিন্তু সিয়ার আঙুলের সাথে তার আঙুল সামান্য ছোঁয়া লাগতেই সিয়া দ্রুত হাত সরিয়ে নিল। মীর বাড়ির সেই সন্ধ্যার পর থেকে সিয়া তাজকে আরও বেশি ভয় পায়, আবার কেমন যেন একটা অদ্ভুত অনুভূতিও কাজ করে।
তাজ ফাইলের ওপর চোখ বুলিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল, “সেদিন মীর বাড়িতে গিয়ে যে ড্রামাটা ক্রিয়েট করেছিলে, সেটার জন্য আমার মা এখনো প্রতিদিন তোমার খোঁজ নেয়। কী জাদুটোনা করেছ মায়ের ওপর?”
সিয়া চোখ বড় বড় করে বলল, “আমি কোনো জাদুটোনা করিনি, স্যার! আন্টি নিজেই আমাকে ভালোবেসেছেন। আর সেদিন তো আমি শুধু ছুটির কথা বলতে গিয়েছিলাম। আপনার বাড়ির লোক যে অমন…।” সিয়া জিভ কেটে চুপ হয়ে গেল।
তাজের ঠোঁটের কোণে খুব সূক্ষ্ম একটা হাসির রেখা ফুটে উঠেই মিলিয়ে গেল। সে টেবিলের ওপর ঝুঁকে সিয়ার একদম কাছে চলে এলো। সিয়া ভয়ে আবার এক পা পিছিয়ে গেল, কিন্তু এবার পেছনে দেয়াল নয়, জানালার কাঁচ।
“আমার বাড়ির লোক কেমন, সেটা তো সেদিন দেখেছ,” তাজ নিচু, গম্ভীর গলায় বলল। “তবে একটা কথা মাথায় রেখো। মা যতই তোমার খোঁজ নিক, ককপিটে কিন্তু আমিই বস। এখানে কোনো ফাঁকিবাজি চলবে না। আজ যদি ফ্লাইটে একটাও ভুল হয়, তবে চুক্তিপত্র অনুযায়ী শাস্তি কিন্তু কড়া হবে।”
সিয়া আমতা আমতা করে বলল, “আজ আমি কোনো ভুল করব না, স্যার। আর… আমি আর কখনো ছুটিও চাইব না।”
তাজ সিয়ার মুখের দিকে তাকাল। সিয়ার চোখে এখন ভয়ের চেয়েও বেশি আছে এক অদ্ভুত জেদ। তাজ ধীরে ধীরে তার হাতটা সিয়ার কানের পাশের জানালার কাঁচে রাখল। সিয়া যেন নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেল।
“ছুটি না চাইলে শাস্তি থেকে বাঁচা যাবে না, মিস সিয়া,” তাজ ফিসফিস করে বলল, “আমার মন মর্জির ওপর তোমার ডিউটি নির্ভর করে। আর আমার মুড সুইং কেমন, তা তো জানোই।”
সিয়া কাঁপা গলায় বলল, “স্যার… সবাই দেখে ফেলবে।”
তাজ সিয়ার চোখের দিকে তাকিয়ে এক সেকেন্ড থামল, তারপর ধীরে হাতটা সরিয়ে নিল। নিজেকে স্বাভাবিক করে বলল, “ফ্লাইটের সময় হয়ে গেছে। চলো।”
তাজ আগে আগে হেঁটে বেরিয়ে গেল। সিয়া নিজের বুকের ওপর হাত রাখল, যেখানে হৃদপিণ্ডটা অনবরত ড্রাম বাজাচ্ছে। এই মানুষটার ডিসিপ্লিনের আড়ালে যে কী চলে, তা বোঝা বড় দায়। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাজের পেছন পেছন হাঁটা দিল।
–
সেদিনের সেই নাটকীয় ক্লাইম্যাক্স শুটিং আর আরিয়ানের সেটে মাতলামি কাণ্ডের পর কেটে গেছে বেশ কয়েকটা দিন। সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে এখন একটাই গরম খবর ডিরেক্টর মীর আরবিন প্রাণ নিজেই তার ছবির নতুন নায়ক! এই কয়েকদিনে প্রাণের ভেতরের দুনিয়াটা পুরোপুরি ওলটপালট হয়ে গেছে। এখন চোখ বন্ধ করলেই সে স্ক্রিপ্টের অক্ষরের বদলে প্রত্যাশার সেই মায়াবী চোখ জোড়া দেখতে পায়। প্রাণ নিজেকে হাজার বুঝিয়েও ব্যর্থ হয়েছে। সে বুঝে গেছে, প্রত্যাশাকে ছাড়া তার আর কোনো গতি নেই। কিন্তু সমস্যা হলো, সরাসরি প্রেমের প্রস্তাব দেওয়া বা দুর্বলতা প্রকাশ করা প্রাণের ডিকশনারিতে নেই। সে চায় প্রত্যাশা নিজেই তার এই মায়াজালে জড়িয়ে পড়ুক, অথচ টের যেন না পায় যে পুরো সুতোটা আসলে প্রাণের হাতে।
আজ নতুন সেটের পেছনের লনে একটা ডামি রিহার্সালের আয়োজন করেছে প্রাণ। তবে চতুর ডিরেক্টর আজ পুরো ইউনিটকে ছুটি দিয়ে দিয়েছে, শুধু ডেকে পাঠিয়েছে প্রত্যাশাকে।
লনের এক কোণে কাঠের চেয়ারে বসে কফি খাচ্ছিল প্রাণ। পরনে কালো শার্ট, হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত গোটানো। দূর থেকে প্রত্যাশাকে আসতে দেখেই তার বুকের ভেতরটা এক অদ্ভুত ছন্দে নেচে উঠল। তবে মুখে সে ফুটিয়ে তুলল সেই চেনা গম্ভীর আর কঠোর ভাব।
প্রত্যাশা এসে একটু দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়াল। চারিদিক ফাঁকা দেখে সে কিছুটা অবাক। “প্রাণ ভাইয়া… দুঃখিত, প্রাণ । আজকে সেটে আর কেউ নেই কেন? কো-আর্টিস্টরা কোথায়?”
প্রাণ কফির কাপে একটা চুমুক দিয়ে অত্যন্ত উদাসীন গলায় বলল, “আজকে কোনো কো-আর্টিস্টের শট নেই। আজ শুধু একটা ইমোশনাল সিনের স্ক্রিপ্ট রিডিং আর ক্লোজ-আপ রিহার্সাল হবে। ভিড়ের মধ্যে ইমোশন আসে না, তাই সবাইকে ছুটি দিয়েছি।”
“ওহ।” প্রত্যাশা বুক থেকে একটা হালকা নিঃশ্বাস ফেলল। এই মানুষটাকে সে এখনো পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেনি। কখনো সে এত কেয়ারিং, আবার কখনো এমন বরফের মতো ঠান্ডা।
“বসো এখানে।” প্রাণ তার পাশের খালি চেয়ারটা দেখিয়ে দিল।
প্রত্যাশা বসার পর প্রাণ একটা স্ক্রিপ্টের পাতা তার দিকে এগিয়ে দিল। “সিনটা ভালো করে বোঝো। এখানে নায়ক-নায়িকার মধ্যে কোনো সংলাপ নেই। শুধু আই-কন্টাক্ট। নায়ক এক দৃষ্টিতে নায়িকার দিকে তাকিয়ে থাকবে, আর নায়িকা তার চোখের ভাষা পড়ে রিঅ্যাক্ট করবে। এটা একটা সাইকোলজিক্যাল টেস্টের মতো। শুরু করো।”
প্রত্যাশা স্ক্রিপ্টটা হাতে নিয়ে একটু অস্বস্তিতে পড়ল। “কোনো সংলাপ ছাড়া শুধু তাকিয়ে থাকা? এটা কীভাবে সম্ভব স্যার?”
“একজন ভালো অভিনেত্রীর জন্য সব সম্ভব, প্রত্যাশা।” প্রাণ চেয়ারটা টেনে প্রত্যাশার একদম মুখোমুখি নিয়ে এলো। দুজনের মাঝখানের দূরত্ব এখন এক হাতও নয়। প্রাণের শরীর থেকে আসা মৃদু পুরুষালি পারফিউমের গন্ধটা প্রত্যাশার মগজে গিয়ে ধাক্কা দিল।
“ক্যামেরা রোলিং… ইন মাই মাইন্ড। অ্যাকশন।” প্রাণ ফিসফিস করে বলল।
প্রাণ নিজের চোখের সমস্ত কঠোরতা এক নিমেষে ধুয়ে মুছে ফেলল। সেখানে এখন খেলা করছে এক মহাসমুদ্রের মতো গভীরতা, তীব্র ব্যাকুলতা আর এক অদ্ভুত মায়া। সে পলকহীনভাবে তাকিয়ে রইল প্রত্যাশার চোখের দিকে। প্রাণের সেই চোখের চাউনি এত তীব্র এবং এত জীবন্ত ছিল যে, প্রত্যাশার মনে হলো সে যেন কোনো এক অতল গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছে।
প্রত্যাশা প্রথমে পেশাদারিত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু প্রাণের চোখের সেই অবাধ্য ওলটপালট করা চাহনির সামনে সে বেশিক্ষণ টিকতে পারল না। তার নিজের অজান্তেই বুকের ভেতর ধকধকানি বেড়ে গেল, চোখের পাতা কাঁপতে লাগল। সে দৃষ্টি সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতেই প্রাণ খুব আলতো করে, পরম মমতায় প্রত্যাশার থুতনিটা ধরে আবার নিজের দিকে ফেরাল। স্পর্শটা এতটাই মৃদু ছিল যে মনে হলো একটা প্রজাপতি এসে বসল।
“দৃষ্টি সরাবে না, প্রত্যাশা। চরিত্রের ভেতরে ঢোকো। অনুভব করো, এই লোকটা তোমাকে কতটা চায়,” প্রাণের গলার স্বর এখন মখমলের মতো নরম, অথচ মাদকতায় ভরা।
প্রত্যাশা ঢোক গিলল। তার সারা শরীরে এক অদ্ভুত শিহরণ বয়ে গেল। সে কাঁপা গলায় বলল, “স্যার… এটা কি সত্যিই শুধু অভিনয়? আপনার চোখ… অন্য কিছু বলছে।”
প্রাণ মনে মনে হাসল। বাজিটা সে জিততে শুরু করেছে। মেয়েটা গলতে শুরু করেছে। কিন্তু মুখে সে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে একটা পেশাদারী বিরক্তি ফুটিয়ে তুলল। হাতটা সরিয়ে নিয়ে একটু পেছনে হেলান দিয়ে বসল।
“অবশ্যই অভিনয়, মিস প্রত্যাশা! তুমি কি ভেবেছ আমি তোমার প্রেমে পড়ে হাবুডুবু খাচ্ছি?” প্রাণ কড়া গলায় বলল, যদিও তার নিজের ভেতরে তখন আনন্দের তুফান বইছে। “আমি একজন ডিরেক্টর। আমার কাজ হলো অভিনেতার ভেতর থেকে বেস্ট ইমোশনটা বের করে আনা। আমি তোমাকে শুধু গাইড করছিলাম। কিন্তু তোমার রিঅ্যাকশন দেখে মনে হলো, তুমি নিজেই ক্যারেক্টারটাকে পার্সোনালি নিয়ে ফেলেছ। তোমার হার্টবিট তো আমি এখান থেকেই শুনতে পাচ্ছি!”
প্রত্যাশার মুখটা মুহূর্তেই লজ্জায় এবং অপমানে লাল হয়ে গেল। সে যে মনে মনে এই রাগী মানুষটার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ছে, সেটা প্রাণ এভাবে সবার সামনে ফাঁস করে দেবে, সে ভাবেনি। যদিও এখানে কেউ নেই। সে নিজেকে সামলাতে না পেরে দাঁড়িয়ে পড়ল।
“আমি কোনো পার্সোনালি নেইনি! আপনি… সবসময় মানুষকে কনফিউজড করে দেন।” সে আর এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে উল্টো ঘুরে হনহন করে লন ছেড়ে চলে যেতে লাগল।
প্রাণ চেয়ার ছেড়ে উঠল না। সে কফির কাপটা হাতে নিয়ে তৃপ্তির এক চিলতে হাসি হাসল। প্রত্যাশার এই রাগ, এই চলে যাওয়া আর তার চোখের ওই বিভ্রান্তিই বলে দিচ্ছে তীর একদম ঠিক জায়গায় লেগেছে। মেয়েটা বুঝতেও পারেনি যে ডিরেক্টর প্রাণের পাতা রোমান্টিক স্ক্রিপ্টের ফাঁদে সে ইতিমধ্যেই পা দিয়ে ফেলেছে। প্রাণ কফিতে শেষ চুমুক দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল, “রাগ করো না, আমার সিনেমার নায়িকা। খুব শীঘ্রই এই সিনেমার স্ক্রিপ্ট বাস্তবে রূপ নেবে। তখন আর মানে খুঁজতে হবে না।”
–
মীর বাড়ির দোতলার শেষ প্রান্তের ঘরটা আজ রাতে কোনো বাসর ঘর নয়, বরং একটা আন্তর্জাতিক যুদ্ধক্ষেত্র। ঘরের ভেতর দামি পারফিউম আর গোলাপের সুবাস থাকলেও, বাতাসটা গুমোট এবং তপ্ত। আব্রাজ শার্ট আর নতুন লুঙ্গি পড়েছে। বাসর ঘরে এমন কিছু পড়া উচিত যার কারনে হাওয়া চলাচলের সুযোগ পায়। তার পরনে এখন একটা সাদা শার্ট, যার ওপরের দুটো বোতাম খোলা। সে খাটের ঠিক মাঝখানে এসে অত্যন্ত দম্ভের সাথে বসল, যেখানে লাল বেনারসি শাড়ি পরে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে ছিল নৈশি। তার এসব পড়ার কোনো ইচ্ছে ছিল না। বাড়ির মানুষ জোর করে এইসব করেছে। এই ঝামেলার হাত থেকে যে কি করে মুক্তি পাবে?
নৈশির চোখের ভেতরের তাপ এই ঘরের এসি-র বাতাসকেও গরম করে তুলছে। সে আব্রাজের দিকে তাকিয়ে দাঁত কিড়মিড় করে বলল, “আপনার এত বড় সাহস কী করে হলো মীর আব্রাজ? আপনি আমার বাবা আর ভাইকে দিয়ে ওই সবার সামনে অমন নিচু কাজ করিয়েছেন? আমাকে জোর করে মিষ্টি খাইয়েছেন?”
আব্রাজ নিজের এক পা ওপরে তুলে বেশ আরাম করে বসল। সে বলল, “আরে এমপির বউ, আপনি তো দেখছি বড্ড ইমোশনাল! রাজনীতিতে যেমন শেষ মুহূর্তে পল্টি খাওয়া জায়েজ, নতুন শ্বশুরবাড়িতে জামাইয়ের পা চাটা তেমনই ফরজ। আপনার বাবা আর ভাই তো এখন আমার খাস গোলাম। আর মিষ্টি? ওটা তো জাস্ট শুরু ছিল বউ, আসল সিনেমা তো এখন এই বদ্ধ ঘরে শুরু হবে।”
“খবরদার! আমাকে বউ বলে ডাকবেন না!” নৈশি চিৎকার করে উঠল, তার পুরো শরীর রাগে কাঁপছিল। “এই বিয়েটা একটা পলিটিক্যাল ক্রাইম ছিল। আপনি ভাববেন না যে সাতটা ভোটে জিতে আপনি আমার ওপর রাজত্ব করবেন! আপনাকে ধ্বংস যদি না করি।”
আব্রাজ খাট থেকে ধীর পায়ে উঠে দাঁড়াল। তার লম্বা, চওড়া অবয়বটা যখন নৈশির সামনে এসে দাঁড়াল, তখন নৈশিকে মনের অজান্তেই এক পা পিছিয়ে যেতে হলো। কিন্তু তার চোখের জেদ কমল না। আব্রাজ হঠাৎ করেই অত্যন্ত দ্রুততার সাথে নৈশির কোমরটা এক হাতে জড়িয়ে ধরে তাকে নিজের বুকের সাথে লেপ্টে নিল। নৈশি চমকে উঠে আব্রাজের বুকে ধাক্কা দিতে চাইল, কিন্তু আব্রাজের লোহার মতো শক্ত হাত তাকে এক ইঞ্চিও নড়তে দিল না।
“ধ্বংস করতে চাইলে নিজের ইগোটা আগে বিসর্জন দিতে হয় নৈশি ইসলাম,” আব্রাজ নৈশির চিবুকটা নিজের অন্য হাতের আঙুল দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরে মুখটা উঁচু করল। দুজনের চোখাচোখি তখন যেন দুটো তলোয়ারের লড়াই। আব্রাজ অত্যন্ত ঠান্ডা কিন্তু কড়া গলায় বলল, “আপনি এখন মাত্র সাত ভোটে হেরে আমার ঘরে বন্দি এক কয়েদি। আর এই ঘরের জেলার হচ্ছি আমি। কাল সকাল থেকে এই মীর বাড়ির প্রাচীন নিয়ম অনুযায়ী আপনাকে চলতে হবে। ওই মডার্ন থ্রি-পিস আর পলিটিক্যাল ভাষণ ভুলে গিয়ে মীর বাড়ির বউয়ের মতো ডাইনিং টেবিলে আসবেন। মনে থাকে যেন।”
নৈশি এক ঝটকায় আব্রাজের হাতটা সরিয়ে দিয়ে নিজের শাড়িটা ঠিক করল। সে অত্যন্ত তপ্ত গলায় বলল, “আমি হারিনি আব্রাজ, মনে রাখবেন। সময় আসুক, এই সাত ভোটের হিসাব আমি আপনার কাছ থেকে সুদে-আসলে উসুল করব।”
“আগে আমি বাসর সেরে ২০ টাকা উসুল তো করি।”
আব্রাজ এগিয়ে আসতে গেলেই হোটচ খেয়ে তার লুঙ্গি খুলে যায়। সে লুঙ্গির বেহাল দশা দেখে বলে উঠে, “সর্বনাশ।” তারপর নৈশির দিকে তাকাতেই নৈশি বলে উঠে, “ছিঃ লুঙ্গি সামলাতে পারে না, আসছে দেশ সামলাতে।”
আব্রাজ জলদি লুঙ্গি গিট দিয়ে ভালো করে পড়ে নেয়। লুঙ্গির নিচে ভাগ্যিস ওটা পড়েছিল। সে ভালো করে গিট দিয়ে নৈশিকে চোখ মেরে বলল, “একটু পর তো আপোষহীন নৈত্রী, আপনার শাড়িও ঠিক থাকবে না। দেখব তখন, আপনি কি করে শাড়ি সামলান।”
চলবে?
Share On:
TAGS: ইশরাত জাহান জেরিন, যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ১৩
-
প্রেমতৃষা পর্ব ১৫+১৬
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৩৭+৩৮
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ২৬
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৪৩
-
পরগাছা পর্ব ২৪
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ১৯
-
প্রেমতৃষা সারপ্রাইজ পর্ব
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ২০
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ৩