Golpo ডিফেন্স রিলেটেড মেজর ওয়াসিফ

মেজর ওয়াসিফ পর্ব ৩৮


#মেজর_ওয়াসিফ

#লেখনীতে_ঐশী_রহমান

পর্ব (৩৮)

❝দুলহে রাজা সজ-ধজ কে আয়ে হ্যায়,

মাথে পে সেহরা, হাথোঁ মেঁ মেহেন্দী সাজায়ে হ্যায়।

দুলহন কি সখিয়াঁ রাহেঁ রোকে খড়ী হ্যায়,

নেক কি খাতির দেখো ও তো অড়ী হ্যায়।

আজ খুশিওঁ কা প্যায়গাম আয়া হ্যায়,

রব নে দো দিলোঁ কো পাস লায়া হ্যায়।❞

গানটা মাঝপথে থেমে গিয়ে এবার চলতে শুরু করলো __

❝ সানাইয়ের সুরে সুরে কাঁপছে মনের কোণ,

নতুন রঙে সাজলো আজকে কনের আপনজন।

বরের চোখে স্বপ্ন হাজার, কনের মুখে লাজ,

সবাই মিলে গাইবো মোরা আনন্দেরই গান আজ।❞

ধারার চুলগুলো ওরা দুইজন লুইপা আর জুই মিলে কতগুলো ক্লিপ, কাটা দিয়ে বাঁধতে ব্যস্ত। ধারা চুপচাপ বসে থেকে অপলক তাকিয়ে আছে ওর দু’হাতের তালুতে। মেহেদী’র রঙ গত কয়েক ঘন্টা পর দারুণ এসেছে। একদম কালছে খয়েরী। দু’হাতে তালুর মধ্যে সুন্দর করে লেখা আছে ঐ পুরুষটার নাম, একহাতে বাংলাতে ‘ ওয়াসিফ’ অন্য হাতে ইংরেজিতে ‘ owashif’। ধারা পলকহীন চোখে তাকিয়ে থাকে ঐ লেখা নামটির দিকে। ওভাবে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে আসে।

আচমকা লুইপা টের পায়, মাথা ঘুরিয়ে তাকিয়ে দেখতে পেয়েই ছুটে গিয়ে দরজা আঁটকে দাড়িয়ে থেকে বলে।

‘ গতকাল থেকে আমরা ভাই বোনেরা কোনোকিছু নিয়ে তোমার উপর দাবি করিনি ভাইজান। এখন করছি, এঘরে এখন ঢোকা যাবে না। বৌ কে একেবারে তিন কবুল বলার পর ঘোমটা তুলে দেখবে এর আগে নয়’

ওয়াসিফ সামান্য চমকেছে, ও তো বেশ ফুরফুরে মনে ঘরে ঢুকছিলো, আচমকা লুইপা এসে পথ আটকে দাঁড়ালো। তবুও লম্বা পুরুষটি বোনের মাথার উপর দিয়ে একপলক তাকালো ঠিকই কিন্তু কিছুই দেখতে পেলোনা। তার বৌকে বাকি মেয়েরা আড়াল করে রেখেছে। ওয়াসিফ সামান্য হেঁসে মাথা চুলকে বলে।

‘ টাকা লাগবে আগে বলবি না? কত দাবি তোদের বল, এখন দিচ্ছি ‘

লুইপা রাগে ফেটে পড়লো এক প্রকার, বললো।

‘ টাকা চাইনি তো, এখন ধারা কে দেখা যাবেনা সেটা বলেছি’

ওয়াসিফ পকেট থেকে বের করা ওয়ালেট আবার পকেটে ঢুকিয়ে রাখতে রাখতে বলে।

‘ আচ্ছা, আচ্ছা। তবে আমিও তো রেডি হবো। আমার সব জিনিসপত্র তো এঘরে’

‘ কি কি লাগবে বলো আমাকে, তারপর ওগুলো নিয়ে আপাতত আমার ঘরে যাও, ঐখানে গিয়ে তৈরি হও’

‘ এতোকিছু ওঘরে টেনে নিবো কিভাবে? আমি গোসল করবো, ক্লিন সেইভ করবো, বহুত ঝামেলা ‘

লুইপা তাকিয়ে দেখে ভাই কে। গত কয়েকমাস ধরে দেখছে, ভাইজান আগের মতো ক্লিন সেইভ করে না, মুখে সুন্দর মতো চাপ দাড়িয়ে মিটিয়ে আছে। যা হয়তো ১৫/২০ দিন পরপর ছেটে ফেলে, তবে ডিফেন্সের মতো এখন আর ক্লিন সেইভ করে না তবে আজ কেনো করবে? বিয়ে বলে? নিজের কৌতূহল দমিয়ে রেখে লুইপা বলে।

‘ তোমাকে এভাবে মানাচ্ছে ভালো ভাইজান, তুমি শুধু গোসল সেরে রেডি হও’

‘ না তা হয় কি করে? তুই সর’

লুইপা পুনরায় পথ আটকে দাঁড়ালো।

‘ না এভাবে হবে না, বললাম না ওকে এখন দেখা যাবেনা’

ওয়াসিফ বোনের কথায় হেঁসে ফেলে বলে।

‘ বৌ তো আমারই, এখন দেখলেও ও আমার বৌ, আরেকটু পর দেখলেও সেই আমার বৌ ই থাকবে। এটা নিয়ে এতো ছলাকলা করছিস কেনো’?

‘ ছলাকলা না, বিয়েতে ভাই বোনেরা একটুআধটু মজা করতেই পারে। তোমার বৌ, বৌ ই থাকবে। কিন্তু এখন আমরা ওকে কিছুতেই দেখতে দেবো না। দেবো না মানে দেবোনা’

ওয়াসিফ আর জোর করে না,

‘ আচ্ছা, আমি তাকাবো না ওর দিকে, সোজা চোখ নামিয়ে খুঁটে খুঁটে আমার জিনিস পত্র গুলো নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছি। আমাকে একটু সাইড দে।’

লুইপা গটগট পায়ে ভেতরে ডুকে আরেকপাশ দিয়ে ধারাকে আড়াল করে রেখে ভাইয়ের উদ্দেশ্যে বলে।

‘ আমি জানি, আমাদের ভাই কথার খেলাপ করবেনা। এসো নিয়ে যাও’

এই পুরোটা সময় ধারা নিরব রয়েছে। একটা কথাও বলেনি। এই মুহূর্তে কোথা থেকে যেনো লজ্জারা এসে ওর উপর ভিড় করেছে। যা হয়েছে বেশ ভালো ই হয়েছে। এই মুহূর্তে মানুষটার সঙ্গে ওর চোখাচোখি হলে ভীষণ লজ্জায় পড়তো ও।

__________

বিয়ের আসরে তখন পিনপতন নীরবতা। থরে থরে সাজানো রজনীগন্ধা আর গোলাপের সুবাসে চারপাশটা ম ম করছে। সোফায় সাদা পাজামা পাঞ্জাবি পরে বসে আছে আর্মি অফিসার মেজর শাহেদ ওয়াসিফ , চোখে-মুখে এক অদ্ভুত শান্ত অথচ গম্ভীর ভাব। ঠিক সেই আগের মতো।তার ঠিক উল্টো পাশে বসা কাজী সাহেব বড় চশমাটার ওপর দিয়ে তাকিয়ে খাতা-পত্র গোছাচ্ছেন।

কাজী সাহেব গলা ঝেড়ে ওয়াসিফের দিকে তাকিয়ে বললেন, “বাবাজি, সব কাগজপত্রের কাজ তো শেষ। দেনমোহর ধার্য করা হয়েছে পাঁচ লক্ষ টাকা, যার মধ্যে দুই লক্ষ টাকা গহনা বাবদ উসুল (নগদ)। আপনার আপত্তি নেই তো?”

ওয়াসিফ মৃদু হেসে মাথা নাড়ল, “না, বাকি তিনলক্ষ টাকা ও উশুল লিখুন, ওটা দিয়ে দেওয়া হয়েছে বৌকে আগেই ।”

“আচ্ছা, এবার তাহলে কনের সম্মতি নিয়ে আসি।” কাজী সাহেব কনের বাবা এবং দুজন সাক্ষীকে সাথে নিয়ে ভেতরের ঘরের দিকে রওনা হলেন, যেখানে লাল বেনারসি আর ভারী গহনায় পরিপাটি হয়ে বসে আছে ধারা। বিয়ের ওড়নায় মুখটা একটু ঢাকা থাকলেও তার হাতের আঙুলগুলোর অস্থিরতা স্পষ্ট বুঝিয়ে দিচ্ছিল ভেতরে কতটা ঝড় বইছে।

কাজী সাহেব পর্দার ওপাশ থেকে গম্ভীর কিন্তু স্নেহমাখা কণ্ঠে বললেন, “মা ধারা, উপস্থিত সাক্ষীগণের সামনে, পাঁচ লক্ষ টাকা দেনমোহর ধার্য করে, জনাব ওসমান শরীফের সুপুত্র জনাব শাহেদ ওয়াসিফের সাথে আপনার বিবাহের প্রস্তাব এসেছে। আপনি কি এই শর্তে উনাকে স্বামী হিসেবে কবুল ও মঞ্জুর করলেন?”

কক্ষের ভেতর এক মুহূর্তের জন্য সময় থমকে গেল। ধারা লম্বা একটা শ্বাস নিয়ে, নিজের সবটুকু আবেগ কণ্ঠে ঢেলে দিয়ে নরম সুরে বলল, “আলহামদুলিল্লাহ, কবুল।”

সাক্ষীগণ সমস্বরে বলে উঠলেন, “আলহামদুলিল্লাহ!”

বাইরের আসরে ফিরে এসে কাজী সাহেব ওয়াসিফের মুখোমুখি বসলেন। পুরো মজলিশকে শান্ত হতে ইশারা করে তিনি উচ্চস্বরে “নিকাহর খুতবা” পাঠ করতে শুরু করলেন। পবিত্র কুরআনের আয়াত তিলাওয়াত করে তিনি স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক অধিকার, ভালোবাসা আর বিশ্বাসের গুরুত্ব সংক্ষেপে বুঝিয়ে দিলেন। ওয়াসিফ একমনে শুনছিল, প্রতিটি শব্দ যেন তার হৃদয়ে গিয়ে বিঁধছিল।

খুতবা শেষ হতেই কাজী সাহেব খাতাটা হাতে নিয়ে ওয়াসিফেরর দিকে তাকালেন। আসরের সবাই তখন উন্মুখ হয়ে আছে।

কাজী সাহেব বললেন, “জনাব শাহেদ ওয়াসিফ , আপনাকে জানানো যাচ্ছে যে, জনাব মইনুল ওয়াহীদের একমাত্র কন্যা মুমতাহিনা ধারাকে, উপস্থিত সাক্ষীগণের সামনে, পাঁচ লক্ষ টাকা দেনমোহর ধার্য করে আপনার নিকট বিবাহ দেওয়া হচ্ছে। আপনি কি উনাকে আপনার স্ত্রী হিসেবে কবুল ও মঞ্জুর করলেন?”

ওয়াসিফ ধারার ঘরের দিকে একবার তাকাল, তারপর কাজী সাহেবের দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট ও দৃঢ় কণ্ঠে বলল, “আলহামদুলিল্লাহ, আমি তাকে স্ত্রী হিসেবে কবুল ও মঞ্জুর করলাম।”

কাজী সাহেব বললেন, “দ্বিতীয়বার বলুন।”

ওয়াসিফ আবার বলল, “কবুল করলাম।”

“তৃতীয়বার…”

“আলহামদুলিল্লাহ, কবুল করলাম।”

মুহূর্তের মধ্যে পুরো বাড়ি আনন্দধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠল। কাজী সাহেব আর দেরি না করে হাত তুললেন, “আসুন, আমরা নবদম্পতির জন্য দোয়া করি।” সবাই হাত তুলল। কাজী সাহেব রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-এর সেই চিরন্তন দোয়াটি পাঠ করলেন—“বারাকাল্লাহু লাকা ওয়া বারাকা আলাইকা, ওয়া জামা’আ বাইনাকুমা ফী খাইর।” (আল্লাহ তোমাদের জীবনে বরকত দিন এবং তোমাদের কল্যাণময় বন্ধনে আবদ্ধ রাখুন)।

দোয়া শেষ হতেই কাজী সাহেব কাবিননামার বড় খাতাটা ওয়াসিফের দিকে এগিয়ে দিলেন, “বাবাজি, এখানে একটা স্বাক্ষর করুন।”

ওয়াসিফ কলমটা হাতে নিয়ে সই করল। এরপর খাতাটা ভেতরে গেল ধারার স্বাক্ষরের জন্য। উকিল এবং সাক্ষীদের সই শেষে কাজী সাহেব নিজের সিল আর স্বাক্ষর বসিয়ে দিয়ে মুচকি হাসলেন, “আলহামদুলিল্লাহ, বিবাহ সম্পন্ন। এখন থেকে আপনারা অফিশিয়ালি স্বামী-স্ত্রী।”

সঙ্গে সঙ্গে অস্ফুটস্বরে ওয়াসিফ বলে ওঠে।

‘ আমরা আগেও স্বামী-স্ত্রী ই ছিলাম’

কাজী পুরো কথাটা শুনতে না পেরে বলে উঠলো।

‘ কিছু বললে বাবা’?

ওয়াসিফ সামান্য হেঁসে দুপাশে কেবল মাথা নাড়িয়ে বলে ‘ না, আপনাকে কিছু বলিনি’

সবাই যখন নতুন বর-কনেকে অভিনন্দন জানাতে ব্যস্ত, ওয়াসিফ তখন মনে মনে এক নতুন দায়িত্বের অনুভূতি টের পাচ্ছিল। এ দায়িত্বশীল বছর দুয়েক আগে নিয়েছিল কিন্তু আজ আবার নতুন করে এই অনুভূতি তার মধ্যে আসছে। জীবনের এক নতুন সমুদ্রযাত্রা শুরু হলো তার, যেখানে তার নৌকার সহযাত্রী এখন থেকে তার স্ত্রী ও সন্তান।

বিবাহের কাজ শেষ হতেই বড়োরা অতিথি আপ্যায়নে ব্যস্ততা হয়ে পড়লো। আজকের এমন শুভদিনে দুপুর থেকে টুপটাপ বৃষ্টি পড়ছে। দাওয়াতের সকল মেহমান এসেছে। ওয়াসিফ সোফা ছেড়ে উঠে উঠানের দিকে যেতে নিলেই পেছন থেকে লুইপা বলে।

‘ ভাবীকে দেখবে না? এখন দেখতে পারো ভাইজান, এখন আর আটকাবো না’

ওয়াসিফ বোনের দিকে তাকিয়ে বলে।

‘ ওদিকে চাচারা হিমশিম খাচ্ছে, একেবারে রাতে দেখবো’

আচমকা সামির এসে খপ করে লুইপার হাতটা ধরে টেনে এক কোণায় নিয়ে বলে।

‘ স্যার না হয় তার বৌ রাতে দেখবে কিন্তু আমি আমার বৌ কে গতকাল থেকে একবার ও নিজের মন মতো সময় নিয়ে দেখতে পারছিনা। ঘরে এসোতো, তোমাকে একটু দেখি’

ওই বলেই লুইপার হাত ধরে টেনে নিলো সামির, লুইপা আস্তে গলায় বলে।

‘ ছাড়ুন, পরে দেখবেন, এটা বিয়ে বাড়ি। আমার কাজ আছে ‘

সামির শোনেনা ওর কথা, ‘ কোনো কথা হবেনা, আগে দেখবো আমি তোমাকে, তারপর বাকিসব কাজ’

#চলবে

শুভ বিবাহ সম্পন্ন। আজকের পর্বে সকলে রেসপন্স করে যাবেন। অবশ্যই লাইক কমেন্ট করবেন

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply