মনবোঝেনা (০৯)
সানা_শেখ
আবরার আস্তে ধীরে খাওয়া শেষ করে উঠে দাঁড়াল। তার চেহারায় হাসি হাসি ভাবটা এখনো বিদ্যমান। আমজাদ খান অবাক হয়ে শুধু ছেলেকেই দেখছেন। রাতের মধ্যে কী হলো এই ছেলের? এত খুশি কেন? অনেক বছর ছেলেকে এমন খুশি হতে দেখেন না তিনি। বাড়িতে যতক্ষণ থাকে তার বেশির ভাগ সময় নিজের রুমে নয়তো ছাদে থাকে। খাওয়ার সময়টা শুধু তাদের সঙ্গে খেতে বসে, তখন মুখটা একদম গম্ভীর হয়ে থাকে।
বাড়ি থেকে বের হয় গম্ভীর মুখে, বাড়িতে প্রবেশ করে গম্ভীর মুখে।
.
আবরার ভার্সিটির গেইটের কাছে এসে বাইক থামাল। ফারিশ আর সারাহ চলে এসেছে। সারাহ বাইক থেকে নেমে দাঁড়াল। ঘুরে দাঁড়াতেই আবরারকে দেখল, আর তাকে দেখেই তার হৃৎস্পন্দন বেড়ে গেল। বুকের ভেতর জোরে জোরে শব্দ হচ্ছে। আবরার যে তাকে পছন্দ করে সেটা সে বুঝতে পেরে গেছে। সে ভালোবেসেই চুড়িগুলো কিনে দিয়েছিল তাকে। সারাহ এক মুহুর্তও দাঁড়াল না, আবরারকে পাশ কাটিয়ে দ্রুত চলে গেল ভেতরে।
এতক্ষণ সারাহকেই দেখছিল আবরার। এই মেয়েটাকে দেখলে তার কী যে ভালো লাগে! মনের ভেতর হাজার প্রজাপতি ডানা মেলে উড়াউড়ি শুরু করে। মেয়েটাকে ভাবলেই সুখ সুখ লাগে। কী কিউট আর সুইট মেয়েটা, ইশ! মায়াবিনী চেরি ব্লসম!
আবরার ফারিশকে দাঁড়াতে বলে বাইক পার্ক করে রেখে ফারিশের কাছে ফিরে এলো। ফারিশ রাতে হাজারবার জিজ্ঞেস করেও আবরারের মনের কথা বের করতে পারেনি। শেষে হতাশ হয়েই বাড়ি ফিরে গিয়েছিল সে।
আবরারকে ফুরফুরে মেজাজে দেখে ফারিশের মনটাও খুশি হয়ে গেছে। আবরার তাকে আলিঙ্গন করে বলল,
“কেমন আছিস?”
“ভালো। তোর কী অবস্থা? মেজাজ ঠান্ডা হয়েছে?”
“হ্যাঁ।”
“কী হয়েছিল?”
“রাতে জানতে পারবি। চল আমার বন্ধুদের সঙ্গে তোর পরিচয় করিয়ে দেই।”
“বাইকটা সাইড করে রেখে যাই।”
ফারিশ বাইক সাইড করে রেখে আবরারের সঙ্গে ভেতরের দিকে এগোল।
.
সারাহ লাইব্রেরিতে এসেছে। একটা ফাঁকা টেবিলে একাই বসে আছে বইয়ে মুখ গুঁজে। হঠাৎ নিজের পাশে কেউ বসেছে বুঝতে পেরেই বই থেকে মুখ তুলে পাশে তাকাল, আবরার সাহিল খান! সারাহর হৃৎযন্ত্র তড়াক করে লাফিয়ে উঠল। আবরার হাসি মুখে বলল,
“কেমন আছো, চেরি ব্লসম?”
“আ আ আপনি এখানে কেন?”
“রিল্যাক্স, চেরি ব্লসম। উত্তেজিত হচ্ছো কেন?”
সারাহ নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করে কম্পিত অথচ চাপা স্বরে বলল,
“আপনি এখানে কেন?”
“তোমাকে দেখতে আর কথা বলতে এলাম।”
“ওই চুড়িগুলো আমাকে কেন দিয়েছেন?”
“বলেছিলাম তো। আরও ডিটেইলে বলতে হবে?”
“আমি ওগুলো নিতে পারব না। আপনি যা চাইছেন সেটা সম্ভবও নয়। আমি চুড়িগুলো আগামীকাল নিয়ে আসবো, আপনি ফিরিয়ে নিবেন।”
“প্রিয় চেরি ব্লসম, কাউকে কিছু দেওয়ার পর সেটা আমি আর ফিরিয়ে নিই না। চুড়িগুলোও নিব না, আর মনটাও না। এগুলো তোমার কাছেই থাকুক, যত্ন করে রাখো—বিনিময়ে তুমি আমার হইয়ো।”
“আমি এঙ্গেজড।”
“সো হোয়াট? বিয়ে হয়নি এখনো।”
সারাহ বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে রইল আবরারের মুখের দিকে। সে ছেলেদের সঙ্গে কথা বলে না, বলতেও পারে না। আবরার উল্টাপাল্টা ভাবছে তাই সে বিষয়টা পরিষ্কার করতে চাইছে, কিন্তু আবরার এসব কী বলছে?
আবরার টেবিলের উপর হাত রাখল, হাতের উপর মাথা রেখে পলকহীন তাকিয়ে রইল সারাহর মুখের দিকে। অস্বস্তিতে গাট হয়ে রয়েছে সারাহ। তার আসলে এখন কী করা উচিত সেটাও বুঝতে পারছে না, বোধবুদ্ধি সব যেন লোপ পেয়ে গেছে আবরারের কথা শুনে আর আচরণ দেখে।
সারাহ অন্যদিকে তাকাল, নিজেকে ধাতস্থ করে দ্রুত উঠে দাঁড়াল। ব্যাগটা কাঁধে তুলে দরজার দিকে পা বাড়াল হন্তদন্ত হয়ে।
আবরার সারাহর যাওয়ার পথে তাকিয়ে সোজা হয়ে বসল। সারাহ চোখের আড়াল হওয়ার পর টেবিলের উপর নজর রাখতেই দেখল একটা ফোন। বুঝতে পারল সারাহর ফোন এটা। তাড়াহুড়োয় নিতে ভুলে গেছে।
আবরার ফোনটা হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়াল। দরজার কাছাকাছি আসতেই দেখল সারাহ আবার ফিরে এসেছে, ফোনের কথা স্মরণ হয়েছে বোধহয়। আবরার হাতের ফোনটা বাড়িয়ে দিলো সারাহর দিকে। সারাহ ফোনটা হাতে নিয়ে আবার হাঁটা ধরল গেইটের দিকে।
আবরার সারাহর পিছু নিল না আর। মেয়েটা ঘাবড়ে গেছে। ফোন নেওয়ার জন্য যখন হাত বাড়িয়েছিল তখন হাতটা থরথর করে কাঁপছিল।
সারাহ রিকশায় চড়ে ফারিশের ফোনে কল করল। কল রিসিভ হতেই মৃদু স্বরে বলল,
“ভাইয়া, আপনাকে আসতে হবে না এখন, আমি রিকশা নিয়ে আসছি।”
“কেন? আমি বের হচ্ছি তো এখনই।”
“অনেকখানি চলে এসেছি।”
“কোনো সমস্যা হয়েছে?”
“না না, ভাইয়া। স…সমস্যা হবে কেন?”
“সত্যিই কোনো সমস্যা হয়নি?”
“না, ভাইয়া।”
“আচ্ছা, আসো। আর কোনোদিন এমন করবে না।”
“ঠিক আছে।”
ফারিশ কল কেটে বাইক থেকে নেমে দাঁড়াল। সে মাত্রই সারাহকে নিতে যাওয়ার জন্য বের হচ্ছিল।
.
আবরার ফারিশদের বাড়িতে এলো সাতটার পর পরই। আজ দরজা খুলে দিয়েছে কাজের লোক। ফাইয়াজ সোফায় বসে গেম খেলছে আজকেও। নিতু সুলতানা ফাহিমকে নিয়ে সোফায় বসে আছেন, উনার হাতে বাচ্চাদের বই, ছেলেকে পড়াচ্ছেন। ফাহিম পড়ার চেয়ে দুষ্টামি বেশি করছে, ফাইয়াজকে বিরক্ত করছে বারবার। আজ সারাহ নেই ড্রয়িংরুমে।
নিতু সুলতানা আবরারকে চিনতে পেরে দ্রুত উঠে দাঁড়ালেন হাতের বইটা রেখে। গতকাল আবরার এসেছিল শুনেছেন তিনি। আবরার সালাম দিলো উনাকে। নিতু সুলতানা সালামের জবাব দিয়ে বললেন,
“কেমন আছো, আবরার?”
“ভালো আছি, আন্টি। আপনি কেমন আছেন?”
“আলহামদুলিল্লাহ। কত বড়ো হয়ে গেছো তুমি!”
“ফারিশ ফাইয়াজ এত বড়ো হয়ে গেছে আমি বড়ো হবো না?”
মিষ্টি করে হাসলেন নিতু সুলতানা। ঠোঁটে হাসি ধরে রেখেই বললেন,
“তোমাকে হুট করে দেখছি তো তাই মনে হচ্ছে দ্রুত বড়ো হয়ে গেছো।”
আবরার মুচকি হাসল। নিতু সুলতানাকে তার বরাবরই ভালো লাগে। ফারিশ আর ফাইয়াজের পাশাপাশি তাকেও ভালোবাসতেন, আদর-যত্ন করতেন। সৎ মা দুই ধরনের হয় সেটা আবরার মহুয়া কবীর আর নিতু সুলতানাকে দেখে বুঝতে পেরেছে।
ফাইয়াজ গেম খেলতে খেলতে বলল,
“বসছো না কেন, ভাইয়া? আজকেও কী দাঁড়িয়ে থেকেই চলে যাবে নাকি?”
নিতু সুলতানা বললেন,
“দেখেছো এখনো দাঁড় করিয়ে রেখেছি তোমাকে! তুমি বসো, আমি ফারিশকে ডেকে দিচ্ছি।”
“ডাকতে হবে না, আন্টি। আমিই যাই উপরে।”
“আচ্ছা যাও।”
আবরার ফাহিমের দিকে তাকিয়ে বলল,
“ও?”
নিতু সুলতানা কিছু বলার আগেই ফাইয়াজ বলল,
“বাপের ছোটো পোলা। শিরায় শিরায় বাপের রক্ত, কিন্তু হয়েছে বড়ো ভাইয়ের ভক্ত।”
আবরার অবাক হয়ে দেখল ফাহিমকে। কাছে এগিয়ে এসে হাত বাড়াতেই ফাহিম ফাইয়াজের গলা জড়িয়ে ধরল শক্ত করে। সে অপরিচিত কারো কাছে যায় না। ফাইয়াজ ঘাড় ঘুরিয়ে ছোটো ভাইয়ের মুখ দেখার চেষ্টা করে বলল,
“ইনি তোর আরেকটা ভাইয়া, বড়ো ভাইয়ার মতন। যা, ভাইয়ার কাছে যা, আমাকে আর জালাস না।”
ফাহিম গেল না। আবরার হাত বাড়িয়ে তাকে জোর করে কোলে তুলে নিল। আদর করতে করতে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে বলল,
“নাম কী তোমার?”
“ফাহিম।”
“নাইস নেম।”
“থ্যাংক ইউ!”
“ওয়েলকাম।”
“তুমি কে?”
“আমি কে?”
“হ্যাঁ।”
“আমি তোমার একমাত্র বোনের হবু বর।”
ফাহিম বুঝল না আবরারের কথার মানে। সে কপাল-ভ্রু কুঁচকে আবরারের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে।
আবরার আর কিছু বলছে না দেখে বলল,
“ভাইয়া যে বলল তুমি আরেকটা ভাইয়া?”
“হ্যাঁ। তোমার ভাইয়া হই আমি।”
আবরার ফারিশের রুম ভেবে সারাহর রুমের দরজায় নক করল, যদিও দরজা লক করা না, শুধু ভেজানো রয়েছে। ফারিশ আগে এই রুমেই থাকতো। আবরার ভাবছে এখনো এই রুমেই থাকে সে।
সারাহ বিছানা ছেড়ে নেমে এসে দরজা খুলে দিতেই দেখল আবরার ফাহিমকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
সারাহকে দেখে আবরারের চোখজোড়া বড়ো বড়ো হলো, পরমুহূর্তেই চোখজোড়া স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এলেও তার গভীর চাহনি সারাহর উপরেই নিবদ্ধ রইল। আবরারকে দেখে সারাহ তো নিজের জায়গায় জমে গেছে। সে ভেবেছিল ফারিশ এসেছে, ফাইয়াজ এলে প্রথমেই গলা ছেড়ে ডাকতে শুরু করে।
ফাহিম আপু বলে ডাকতেই সারাহ নড়েচড়ে উঠল। তড়িৎ গতিতে দরজা লাগিয়ে দিলো আবরারের মুখের উপর। উল্টো ঘুরে বুকে হাত রেখে জোরে জোরে শ্বাস নিতে শুরু করল।
আবরার ফাহিমের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তোমার ফারিশ ভাইয়া কোন রুমে থাকে?”
ফাহিম হাত দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে বলল,
“ওই রুমে।”
আবরার ঘুরে ফারিশের রুমের দিকে এগোল।
রুমের দরজা ঠ্যালা দিতেই খুলে গেল বিনা শব্দে। ভেতরে ডিম লাইট জ্বলছে, ফারিশ খাটের উপর হেলান দিয়ে বসে ল্যাপটপে কিছু করছে। বড়ো ভাইকে দেখেই উচ্ছ্বসিত কন্ঠে ডেকে উঠল ফাহিম। সঙ্গে সঙ্গেই মুখ তুলে দরজার দিকে তাকাল ফারিশ। আবরারের অবয়ব দেখেই চিনতে পেরে গেল আবরারকে।
ফাহিম ধস্তাধস্তি করে আবরারের কোল থেকে নেমে দৌড়ে এলো ভাইয়ার কাছে। ফারিশ ল্যাপটপ সরিয়ে রেখে বিছানা ছেড়ে নেমে ফাহিমকে কোলে তুলে নিয়ে রুমের মেইন লাইট অন করল। আবরার ফারিশের দিকে এগিয়ে আসতে আসতে বলল,
“ভূতের মতো অন্ধকার করে বসে আছিস কেন?”
“আমার রুমে তো তাও ডিম লাইট জ্বলছে, তোর রুমে তো তাও জ্বলে না।”
“কে বলল তোকে?”
“জানি আমি। কখন এসেছিস?”
“এই তো কয়েক মিনিট আগেই।”
“বোস।”
আবরার বসল বিছানায়। তার সামনে বসল ফারিশ। ফারিশের কোলে ভদ্র ছেলের মতো বসে রইল ফাহিম। আবরার ফাহিমের দিকে তাকিয়ে বলল,
“ফাহিমকে দেখতে অনেকটা ফাইয়াজের মতন তাই না?”
“হুম।”
ফাহিম বলল,
“ফাহিম ফাইয়াজের মতো ব্যাড বয় না, ফাহিম গুড বয়।”
ফাহিমের কথা শুনে আবরার মুচকি হাসল, ফারিশ-ও মুচকি হেসে ভাইয়ের গালে চুমু খেলো ঠেসে ঠেসে।
আবরার ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে বলল,
“অফিসের কাজ করছিলি নাকি?”
“হুম।”
“অফিস জয়েন করেছিস?”
“না। মাঝেমধ্যে আব্বুর কাজে সাহায্য করি। লেখাপড়া শেষ করে জয়েন করব।”
আবরার বিস্মিত হয়ে বলল,
“এখনো শেষ হয়নি? তুই না প্রাইভেটে পড়িস।”
“শেষ হয়েই যেত। ঝামেলা করেছিলাম তাই আপাতত বন্ধ রয়েছে।”
আবরার আরও বেশি অবাক হয়ে বলল,
“তুই আর ঝামেলা! কী নিয়ে ঝামেলা করেছিলি?”
ফারিশ ছোটো ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে আবার আবরারের দিকে তাকাল। বলল,
“ভার্সিটির ভিসির ছেলেকে মে’রে আট দিনের জন্য আইসিইউতে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম, তাই দুই বছরের জন্য বহিষ্কার করে দিয়েছে।”
“তুই মা’রামা’রি করেছিস?”
“হ্যাঁ।”
“কেন?”
“আব্বুকে নিয়ে বাজে মন্তব্য করেছিল সেজন্য। কী রাগ যে উঠে ছিল সেদিন! নিজের হুশে ছিলাম না, এমন মা’র মে’রেছিলাম যে পুরো আট দিন আইসিইউতে ভর্তি ছিল।”
“ফুপা কিছু বলেনি?”
“না।”
“ভিসি এত সহজে ছেড়ে দিলো তোকে?”
“সহজে ছেড়েছে কোথায়? ওই টাকলার জন্য আমার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে রয়েছে। আব্বু চেয়েছিল টিসি নিয়ে অন্য ভার্সিটিতে ভর্তি করাতে কিন্তু ভার্সিটি থেকে টিসিও দেয়নি। দুটো বছর নষ্ট হলো, তবুও আফসোস হয় না।”
আবরার তাকিয়ে রইল ফারিশের মুখের দিকে।
“তাকিয়ে আছিস কেন এভাবে?”
“ভাবলাম।”
“কী?”
“কিছু না।”
ফারিশের ওষ্ঠজোড়া ফাঁকা হয়ে গেল। বলছে ভাবলাম এখন আবার বলছে কিছু না। অদ্ভুত ছেলে।
মায়ের ডাকাডাকিতে দরজা খুলল সারাহ। নিতু সুলতানা বললেন,
“অন্যদিন তো ড্রয়িংরুমেই পড়ে থাকিস নয়টা পর্যন্ত, আজকে রুমে কী করছিস?”
“পড়তে বসেছিলাম।”
“একটু নিচে আয়।”
“কেন?”
“এমন করছিস কেন?”
সারাহ নিজেকে শান্ত করে মৃদু স্বরে বলল,
“নিচে কেন যেতে বলছো?”
“ফারিশের মামাতো ভাই এসেছে। তার জন্য রান্নার আয়োজন চলছে, নিচে চল সালাদ কে’টে দিবি।”
“আ…আমি যাব না, আম্মু। আন্টিকে বলো করে দিতে।”
“তোর আন্টি রান্না করছেন, বেশি কথা না বলে চল দ্রুত।”
সারাহ আর কিছু বলতে না পেরে মায়ের পিছু পিছু নিচে নেমে এলো। ড্রয়িংরুমে কাউকে না দেখে স্বস্তির শ্বাস টেনে রান্নাঘরের দিকে এগোল।
সাড়ে নয়টা বাজতেই ডাইনিং টেবিল সাজানো হলো নানান ধরনের খাবার দিয়ে।
নিতু সুলতানা সোফার কাছে এগিয়ে এসে মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“চেরি, যা তোর ভাইয়াদের ডেকে নিয়ে আয়।”
“আমি কেন?”
চমকে উঠে প্রশ্ন করেই বাবার দিকে তাকাল সারাহ। ফুয়াদ হাসান আগে থেকেই তার দিকে তাকিয়ে আছেন। সারাহ এভাবে বলল কেন? মনে হলো নিতু সুলতানা তাকে মানুষ নয় জ্যান্ত বাঘ ধরে নিয়ে আসতে বলেছেন। সারাহ সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে মিনমিন করে বলল,
“ডেকে নিয়ে আসছি।”
হাত কচলাতে কচলাতে সিঁড়ির দিকে এগোল। তার হয়েছে যত জ্বালা। এই বাড়িতে যেই আসে তাকেই ডাকতে যেতে হবে, কেন যেতে হবে? আগে ফারিশকে ডাকতে যেতে বললে তার এমন অনুভূতি হতো। কলিজা লাফাতো, বুক ধড়ফড় করতো, ঘাম ছুটে যেত। ফারিশের মতো গম্ভীর মানুষ সারাহ দ্বিতীয় জন দেখেনি। না দেখেছে তো। আবরার সাহিল খানকে দেখেছে। আজকের আগে আবরারকে যতবার দেখেছে গম্ভীর হয়ে থাকতেই দেখেছে।
গম্ভীর মানুষ দেখলে সারাহর ভয় ভয় লাগে, মনে হয় তার উপর মানুষটা ভীষণ রেগে চোখমুখ অমন করে রেখেছে।
ফারিশের দরজার সামনে এসে দাঁড়াতেই ভেতর থেকে তিনজনের গলার আওয়াজ শুনতে পেল। আবরার, ফারিশ আর ফাইয়াজ তিনজনই গল্পে মশগুল হয়ে রয়েছে। ফাহিম বাবার সঙ্গে সোফায় বসে আছে এখন।
সারাহ দরজা নক করে দাঁড়িয়ে রইল। ফারিশ বলল,
“সারাহ, কিছু বলবে?”
“খাওয়ার জন্য ডাকছে আপনাদের।”
“যাও, আসছি আমরা।”
সারাহ হাঁফ ছেড়ে দ্রুত হাঁটা ধরল নিজের রুমের দিকে। আবরার বলল,
“তুই কীভাবে বুঝলি দরজার বাইরে তোর বোন দাঁড়িয়ে আছে?”
“আব্বু আম্মু থাকলে নাম ধরে ডাকে। মেইড হলেও স্যার স্যার বলে ডাকে। শুধু সারাহই প্রথমে দরজা নক করে, তারপর ডাকে। ফাইয়াজ আর ফাহিম সোজা দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে পড়ে।”
ফাইয়াজ উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“গল্প পড়ে করবে, এখন চলো খিদে পেয়েছে খুব।”
তিনজন একসঙ্গে বের হলো রুম থেকে। আবরার যা বলার জন্য এসেছিল তা এখনো বলতে পারেনি। বলার আগেই ফুয়াদ হাসান এসে পড়েছিলেন, তারপর আবার ফাইয়াজও চলে এসেছে।
সারাহ সকলের সঙ্গে এক টেবিলে বসে খেতে না চাইলেও লাভ হলো না। ফুয়াদ হাসান মেয়েকে ছাড়া খাবেন না, আর দুই ভাইও বোনকে ছাড়া খাবে না। সকালের নাশতা আর রাতের খাবার একসঙ্গেই খায় বাড়ির সবাই।
সারাহকে ছাড়া কেউ খেতে বসছে না তাই বাধ্য হয়ে সারাহকেও খেতে আসতে হলো।
খাওয়ার মাঝে একবারও এদিক ওদিক তাকাল না সারাহ। প্লেটের দিকে দৃষ্টি রেখে দ্রুত খাওয়া শেষ করল। ছোটো ভাইকে কোলে নিয়ে দ্রুত ছুটল নিজের রুমের দিকে।
আবরার বাড়িতে ফিরে যাওয়ার জন্য সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। ফুয়াদ হাসান বললেন,
“আবরার, থাকো এখানেই।”
“না, ফুপা। আবার আসবো, আজ আসি।”
সকলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে দরজার দিকে এগোল। তাকে এগিয়ে দিতে তার সঙ্গে এলো ফারিশ। বাইরে এসে ফারিশের চোখে চোখ রেখে বলল,
“তোকে কিছু বলার আছে।”
“বল। আমি তো শুনতেই চাচ্ছি। আগে তোর গতকালের আচরণের কারণে বল।”
আবরার একটু সময় নিয়ে বলল,
“আমি তোর বোনকে বিয়ে করতে চাই।”
“কোন বোন?”
“তোর বোন কয়টা?”
ফারিশের কয়েক সেকেন্ড সময় লাগল আবরারের কথার মানে বুঝতে। বুঝতে পেরেই সে বিস্ফোরিত নয়নে তাকাল। বলল,
“এসব কী বলছিস, আবরার? তুই তো জানিস সারাহর বিয়ে অলরেডি আবিরের সঙ্গে ঠিক হয়ে রয়েছে।”
“ঠিক হয়ে রয়েছে, হয়নি এখনো। আমি তোর বোনকে ভালোবাসি, আর ওকেই বিয়ে করব।”
“আর ইউ ক্রেজি, আবরার?”
“ইয়াহ।”
“কী বলছিস বুঝতে পারছিস?”
“আমি তোর বোনকে বিয়ে করব এটাই শেষ কথা।”
“আমার একটা বোন, আমি দুজনের সঙ্গে কীভাবে বিয়ে দিবো?”
“দুজনের সঙ্গে কেন দিবি? দিবি তো শুধু আমার সঙ্গে।”
“এটা অসম্ভব, ভাই।”
“চাইলে সবই সম্ভব।”
“বোঝার চেষ্টা কর সারাহ আর আবিরের এঙ্গেজমেন্ট হয়ে গেছে।”
“কিন্তু বিয়েটা আমার সঙ্গেই হবে। আপোষে না হলে ছিনিয়ে নিতে জানি আমি।”
জেদ ধরে কথাগুলো বলল আবরার। ফারিশ শকড হয়ে তাকিয়ে রইল আবরারের মুখের দিকে। সে আবরারের জেদ সম্পর্কে জানে। আবরার শান্ত চোখে ফারিশের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে।
ফারিশ নিজেকে সামলে বলল,
“আবরার, তুই বুঝতে পারছিস না কে—
আবরার মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে শান্ত গলায় বলল,
“মন বোঝে না।”
চলবে………
Share On:
TAGS: মন বোঝে না
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
মন বোঝে না পর্ব ৮
-
মন বোঝে না গল্পের লিংক
-
মন বোঝে না পর্ব ৬
-
মন বোঝে না পর্ব ১২
-
মন বোঝে না পর্ব ২
-
মন বোঝে না পর্ব ৭
-
মন বোঝে না পর্ব ১০
-
মন বোঝে না পর্ব ৫
-
মন বোঝে না পর্ব ১১
-
মন বোঝে না পর্ব ৪