Golpo romantic golpo মন বোঝে না

মন বোঝে না পর্ব ৭


মনবোঝেনা (০৭)

সানা_শেখ

সারাহ রুম থেকে বেরিয়ে দেখল ফারিশ প্রায় সিঁড়ির কাছে চলে গেছে। সে এগিয়ে যেতে যেতে পিছু ডেকে বলল,

“ভাইয়া, আমার ফোনটা খুঁজে পাচ্ছি না।”

ফারিশ উল্টো ঘুরে এগিয়ে এলো দ্রুত পায়ে। নিজের ফোন এগিয়ে দিয়ে বলল,

“এটা দিয়ে কথা বলো, কথা বলা শেষে খুঁজে নিও তোমারটা।”

সারাহ ফোনটা হাতে নিয়ে নিজের রুমের দিকে এগিয়ে এলো আবার। ফারিশ এগিয়ে গেল নিচের দিকে।
সারাহ দরজাটা ভিজিয়ে দিতে দিতে কল করল নিজের হবু বরের নাম্বারে। সঙ্গে সঙ্গেই রিসিভ হলো কল। ওপাশ থেকে ভেসে এলো সারাহর হবু বর প্লাস ফারিশের আপন ফুপাতো ভাই আবিরের গলার আওয়াজ। সে অস্থির গলায় বলল,

“ভাই, তোর বোন কই? কল রিসিভ করছে না কেন এখনো?”

“ভাইয়া না, আমি।”

আবিরের গলার আওয়াজ কিছুটা শান্ত হলো, বলল,

“চেরি ব্লসম, কোথায় ছিলে এতক্ষণ? কখন থেকে কল করছি, রিসিভ করছিলে না কেন?”

“নিচে ছিলাম ফাইয়াজ ভাইয়ার সঙ্গে। ফোনটা যেন কোথায় রেখেছি ভুলে গেছি।”

“আরেকটু হলেই তো হার্ট অ্যাটাক হয়ে যেত আমার।”

“এত অস্থির হওয়ার কী আছে? আমি উড়ে হারিয়ে যাব নাকি?”

“উড়ে না গেলে—যদি কেউ তুলে নিয়ে যায়?”

“সবসময় শুধু বাজে কথা। কেমন আছেন?”

“তোমার সঙ্গে কথা বলতে পেরে এখন ভালো লাগছে, এতক্ষণ তো টেনশনে টেনশনে পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম। তুমি কেমন আছো?”

“ভালো। খেয়েছেন দুপুরে?”

“হুম। তুমি খেয়েছো?”

“হ্যাঁ।”

কথা বলতে বলতে সারাহ বারান্দায় এসে দাঁড়াল। আবিরের সঙ্গে কথা বলতে বলতে লজ্জায় লাল হয়ে উঠছে তার ফরসা গাল দুটো।

ফারিশ সিঁড়ির গোড়ায় এসে দাঁড়াল। আবরার গম্ভীর মুখে কথা বলছে ফাইয়াজের সঙ্গে। ফারিশ তার দিকে এগিয়ে উচ্ছ্বসিত কন্ঠে ডেকে উঠল,

“আবরার!”

আবরার সঙ্গে সঙ্গেই তাকাল তার দিকে। ফারিশ এগিয়ে এসে জাপটে ধরল তাকে। আবরার নিজেও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। কয়েক মিনিট দুজন কোনো কথা বলল না শুধু জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে রইল।
ফারিশ নিজেই বলল,

“এতগুলো বছর পর তোর রাগ অভিমান কমলো?”

আবরার বলল,

“তুইও তো আর নিজে থেকে যাসনি?”

“তুই নিষেধ করেছিলি তো।”

“আমি নাহয় রাগের মাথায় বলেছিলাম, তাই বলে তুই যাবি না?”

“আমি যাইনি ঠিক আছে, তুইও তো আসিস নি।”

“এই যে আজ এসেছি।”

“কেমন আছিস, ভাই?”

“ভালো। তুই?”

“ভালো।”

দুজন একে অপরকে ছেড়ে দাঁড়াল মুখোমুখি হয়ে। একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল আর কিছু না বলে। ফারিশ, আবরার আর আবির ছোটো বেলার বন্ধু। তবে ফারিশ আর আবরারের সম্পর্ক বেশি গভীর ছিল। দুজন একে অপরের জানের বন্ধু। তিনজনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সুদর্শন আবরার। তিনজনের মধ্যে আবরারের রাগ, তেজ, জেদ আর ইগোও বেশি। তবে তিনজনের মধ্যে কখনো কোনো কিছু ঝামেলা বা মনোমালিন্য হতো না। কিন্তু একটা ঘটনার পর তিনজনের মধ্যকার সম্পর্কে ফাটল ধরে। শুধু তিনজনের মধ্যকার সম্পর্কে নয়, সকলের কাছ থেকেই দূরে সরে যায় আবরার।

আট বছর আগের ঘটনা। আবিরের যমজ বোন অহি আবরারকে পছন্দ করত তখন। চারজনই এক ক্লাসে এক স্কুলে পড়াশোনা করত। মামার বাড়ির সুবাদে অহির যাতায়াত ছিল এই বাড়িতে। মা না থাকায় আর বাবার উপর জেদ করে আবরার নিজেও এই বাড়িতেই বেশি থাকত ছোটো বেলা থেকেই। বলতে গেলে ফুপুর কাছেই তার বড়ো হওয়া। ফুপু চলে যাওয়ার পর আবরার দ্বিতীয়বারের মতো গভীর শোক পেয়েছিল কাছের মানুষ হারানোর।

চারজন তখন এইচএসসি পরীক্ষা শেষ করে ফারিশদের বাড়িতে ছিল। আবরার আগে থেকেই ছিল, অহি আর আবির নিজেদের বাড়ি থেকে মামার বাড়িতে ঘুরতে এসেছিল। পরের দিন সকাল বেলা হুট করেই অহি আবরারকে প্রোপোজ করে বসে। তার এমন কাজে হতভম্ভ হয়ে গিয়েছিল আবরার। অহিকে সে ছোটো বোন বা বন্ধুর বোন ব্যতীত অন্য কিছু ভাবেনি কখনো। সে কখনো অহির দিকে সেভাবে তাকাতোও না। সে ভালোভাবে বুঝিয়ে অহিকে নিষেধ করে দেয়। কিন্তু অহি নাছর বান্দা। সে নানানভাবে আবরারকে বিরক্ত করতে শুরু করে আর এতে করে আবরার ভীষণভাবে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। তৃতীয় দিন সন্ধ্যায় আবরার গেস্ট রুমের সামনে দিয়ে হেঁটে যেতে নিতেই অহি আচমকা আবরারকে টেনে নিয়ে গেস্ট রুমে ঢুকে যায়, আবার বোঝানোর চেষ্টা করতেই আবরার মেজাজ হারিয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে অহিকে বকাবকি করে সঙ্গে কয়েকটা বাজে কথাও শুনিয়ে দেয়। আবরারের কথায় অহির ইগো হার্ট হয়। সে আবরারের কথা, আর তার বারবার রিজেকশন মেনে নিতে না পেরে আবরারকে সকলের চোখে খারাপ বানানোর জন্য ফন্দি আটে।

হুট করেই নিজের ঘাড়ে গলায় আঁচড় কেটে জামা কাপড় এলোমেলো করে চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করে। স্তব্ধ আবরার শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিল কিছু বুঝতে না পেরে। অহি এমন কেন করছে সেটা তার মাথায় তখন ঢুকছিল না।
মানুষের পায়ের শব্দ পেতেই অহি আরও নিচে নেমে যায়।
ফারিশ আর আবির রুমের সামনে এসে দাঁড়াতেই দুজনকে ধস্তাধস্তি করতে দেখতে পায়। রুমের ভেতরে আলো ছিল না। করিডোরের আলোয় আবছা আলোকিত রুম। পেছন থেকে দেখে এমন মনে হচ্ছিল আবরার জোর করে অহির সঙ্গে কিছু করার চেষ্টা করছে।
এমন দৃশ্য দেখে দুজনের পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যায়। অহির চিৎকার শুনে ততক্ষণে নিতু সুলতানা আর ফুয়াদ হাসানও চলে এসেছিলেন।

আবরার অহির কাছ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে ঠাস করে এক চড় দিয়ে নিচে ফেলে দেয়। পেছন থেকে গর্জে ওঠেন ফুয়াদ হাসান। আবির ছুটে এসে বোনকে ধরে। নিতু সুলতানা নিজেও দ্রুত পায়ে এগিয়ে এসে অহিকে ধরেন।

বাড়ির সবাই ড্রয়িংরুমে এসে জড়ো হয়। ফুয়াদ হাসানের বোন আর বোনের স্বামীও চলে আসেন ছেলের ফোন পেয়ে।
আবরার বারবার বোঝানোর চেষ্টা করেছে তার কোনো দোষ নেই, কিন্তু কেউ শোনেইনি তার কথা। অহি কাঁদতে কাঁদতে এমনভাবে সবকিছু বলছিল যে তার কথা বিশ্বাস না করে উপায় নেই, তাছাড়া নিজ চোখে দেখা ঘটনাই বা অস্বীকার করবে কী করে সকলে?
ফারিশ পুরো স্তব্ধ হয়ে ছিল। নিজের চোখে দেখা ঘটনা অবিশ্বাস করতে পারছিল না, আবার অহির কথাও অবিশ্বাস করার মতো ছিল না। আর আবরার এমন কিছু করবে সেটাও সে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিল না। সে আবরারকে খুব ভালো করেই চেনে, আর সে এটাও জানে আবরার কেমন ছেলে। এমন ঘটনায় সে গোলক ধাঁধায় আটকে গেছে।

আমজাদ খানকে কল করলেও পাওয়া যায় না। অহির মা রাগের মাথায় গালাগালি তো করেনই, আবরারের গায়েও হাত তোলেন। অহির বাবাও কয়েকটা চড় মা’রেন। আবির নিজেও রাগের মাথায় হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে বন্ধুকে অনেক কিছু বলে ফেলে। ফুয়াদ হাসান, যিনি আবরার আর নিজের ছেলেকে কখনো আলাদা নজরে দেখেননি, ছোটো বেলা থেকেই নিজের ছেলের মতো আদর যত্নে বড়ো করেছেন তিনিও রাগে ফেটে পড়ে যা-তা বলেছিলেন আবরারকে। আবরার মুখ তুলে তাকাতে পারছিল না কারো দিকে, তার গলা দিয়ে কোনো আওয়াজ বের হচ্ছিল না, শুধু রাগে অপমানে তার শরীর কাঁপছিল থরথর করে। রক্ত লাল চোখজোড়া হতে টুপটাপ পানি গড়িয়ে পড়ছিল।

ফুয়াদ হাসান আবরারের সবকিছু গুছিয়ে দিয়ে বলেছিলেন আবরার যেন আর কোনোদিন তার বাড়িতে পা না রাখে, কোনোদিন তার সামনে না আসে। সে আর তার চেহারা দেখতে চায় না।
আবরার চলে যাওয়ার আগে ফারিশের রুমে যায় একবার। চারটা চিঠি হাতে ফিরে আসে নিচে। চিঠিগুলো ফুপার দিকে এগিয়ে দেয় ঠিকই কিন্তু তার মুখের দিকে না তাকিয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে থাকে। জড়ানো গলায় থেমে থেমে বলে, “এই চিঠিগুলো অহি আমাকে দিয়েছে গত দুদিনে। ও আমাকে প্রোপোজ করেছিল, আমি নিষেধ করার পরও ও থামেনি, বারবার আমাকে বিরক্ত করে গেছে। গেস্ট রুমে আমি অহিকে টেনে নিয়ে ঢুকিনি, বরং অহি হুট করে এসে আমাকে টেনে নিয়ে ঢুকে গিয়েছিল। অহি যা যা বলেছে সবকিছু মিথ্যা কথা।”

ফুয়াদ হাসান চিঠিগুলোর লেখা দেখেই চিনতে পেরে গিয়েছিলেন এগুলো অহির হাতের লেখা। চিঠিগুলো পড়ে তিনি দ্বিতীয়বারের মতো আবার ধাক্কা খান। আবরারের মুখের দিকে তাকিয়ে অহির দিকে তাকাতেই দেখেন অহি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। উত্তেজনার বশে অহি চিঠিগুলোর কথা ভুলেই গিয়েছিল, তাছাড়া সে ভাবেইনি আবরার চিঠিগুলো নিজের কাছে রেখে দিয়েছে।
অহির মা, বাবা আর আবির নিজেও চিঠিগুলো পড়ে।

আবরার বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে অহির মুখোমুখি হয়। সর্বশক্তি প্রয়োগ করে আরেকটা চড় বসায় ডান গালে। আঙুল তুলে বলে, “তুই আজ আমার সঙ্গে যা করলি এসবের ফল একদিন অবশ্যই ভোগ করবি। শান্তি পাবি না তুই জীবনে।”

ফুয়াদ হাসান আর ফারিশ আবরারকে থামানোর চেষ্টা করলেও পারে না। আবরার কারো কোনো কথাই শোনে না। ফুয়াদ হাসান তাকে টেনে ধরতেই সে রাগে গর্জন করতে শুরু করে। রাগে হুশ জ্ঞান হারিয়ে আবরার যেন নিজের মধ্যেই ছিল না। সে নিজের সবকিছু রেখেই খালি হাতে বেরিয়ে যায় বাড়ি থেকে।

ফুয়াদ হাসান রাগে ক্ষোভে এবার অহির উপর চিৎকার করতে শুরু করেন। শান্তশিষ্ট ফারিশও অনেক রাগারাগি করে। অপমানে মাথা নিচু করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় আবির। অহির মা রাগের চোটে অহিকে ধরে মা’রধর করেন ড্রয়িংরুমে দাঁড়িয়েই। ফুয়াদ হাসান বোনকেও কথা শোনাতে ছাড়েন না।
সেদিন দুই ভাই-বোনের সম্পর্ক নষ্ট হয়।

রাতেই ফারিশ আর ফুয়াদ হাসান খান বাড়িতে আসেন আবরারের কাছে মাফ চেয়ে তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে। বাড়ির ভেতর প্রবেশ করে দেখেন পুরো ড্রয়িংরুম তছনছ হয়ে রয়েছে, বোঝাই যাচ্ছে ঝড় বয়ে গেছে ড্রয়িংরুমের উপর দিয়ে। আবরার বাড়িতে এসে যা সামনে পেয়েছে ভাঙচুর করেছে। তার এমন আচরণের কারণ বুঝতে পারছিলেন না মহুয়া কবীর। আমজাদ খান বাড়িতে নেই।
হাজারবার মাফ চাওয়ার পরও আবরার রুমের দরজা খোলে না, একটা কথাও বলে না। ফুয়াদ হাসান অনেক রিকুয়েস্ট করেন একটাবার দরজা খুলে তার সঙ্গে কথা বলার জন্য, কিন্তু জেদি আবরার টু শব্দ অবধি করে না।
ফারিশ কত কাকুতি মিনতি করে কিন্তু আবরার? সে তবুও চুপ যেন কারো কোনো কথাই তার কানে পৌঁছাচ্ছে না। ফারিশ ভয় পেয়ে যায়, আবরার নিজের কোনো ক্ষতি করে ফেলেনি তো? নাহলে সে এতক্ষণ ধরে তাদের কীভাবে উপেক্ষা করছে?
দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে দেখে আবরার নিজের হাতের শিরা কে’টে ফেলেছে। অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে ফ্লোরে, রক্তে সাদা ধবধবে টাইলস ভেসে যাচ্ছে।

আবরারকে হসপিটালে নিলে বাঁচানো সম্ভব হয়। শরীর থেকে অনেক রক্ত বেরিয়ে গিয়েছিল। জ্ঞান ফিরতে বেশ সময় লেগেছিল।
পরেরদিন সকালে ফারিশ কথা বলতে গেলে আবরার কথা বলে না। ফারিশ বারবার রিকুয়েস্ট করার পর আবরার অনুভূতিহীন গলায় রোবটের ন্যায় বলে,

“তোরা কেউ কোনো কথা বলবি না আমার সঙ্গে, আমার সামনেও আসবি না। তোদের আবরার ম’রে গেছে গতকাল। তোরা কীভাবে তাকাচ্ছিলি আমার দিকে! তোরা কেউ আমার কোনো কথা শোনার বা বোঝার চেষ্টা করিসনি। তোরা কেউ আমার কাছে আসার চেষ্টা করলে আমি নিজেকে শেষ করে ফেলব। তুই জানিস আবরার সাহিল খান যা বলে তাই করে।”

“আমি…. আমি—

“তুই জানিস না আমি কেমন? তুই না আমার বেস্টফ্রেন্ড, তোর চেয়ে ভালো কে চেনে আমাকে? তুই আমার পক্ষ নিয়ে একটা কথাও বলিসনি। কেন বললি না তখন? তুই কোনোদিন আসবি না আমার সামনে, যা এখান থেকে।”

“আমি তখন কথা বলতে চেয়েও পারছিলাম না। আমার গলা দিয়ে আওয়াজ বের হচ্ছিল না। আমি বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম।”

“তাই থাক সারা জীবন। যা, কোনোদিন আসবি না আমার সামনে।”

মুখ ফিরিয়ে নেয় আবরার। ফারিশ নিজেকে শক্ত করে বলে,

“ঠিক আছে। তুই যতদিন পর্যন্ত নিজে থেকে আমার কাছে না আসবি, ততদিন পর্যন্ত আমি আসবো না তোর কাছে বা তোর সামনে। ভালো থাকিস, ভুলে যাস না আমাকে।”

সেই ঘটনার পর এতগুলো বছর পেরিয়ে গেছে দূরে দূরে থেকেই। নিজের ইগো আর জেদকে ঠেলে আবরার আসেনি, আর তার কথা রাখতে ফারিশ নিজেও যায়নি। ফুয়াদ খান আর আমজাদ খানের মধ্যে আগে থেকেই সম্পর্ক খারাপ ছিল, আবরারের ওই ঘটনার পর আরও খারাপ হয়ে যায়। আমজাদ খান ফুয়াদ হাসানকে অনেক অপমান করেছিলেন হসপিটালে দাঁড়িয়েই। তার একমাত্র সন্তানের কিছু হয়ে গেলে কাউকে ছাড়বেন না বলে হুমকিও দিয়েছিলেন।

ফারিশ আবার জড়িয়ে ধরল আবরারকে। তার চোখজোড়া পানিতে টইটম্বুর হয়ে উঠেছে। ভার্সিটিতে গিয়ে আবরারকে দেখার পরও তার সামনে যেতে না পেরে, কথা বলতে না পেরে কত যে কষ্ট হয়েছে সে কাউকে বোঝাতে পারবে না। তার বারবার ইচ্ছে করত একটাবার ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরতে, কথা বলতে। কিন্তু সে যেতে পারেনি, কথা বলতে পারেনি—যদি আবরার নিজের কথা রাখতে নিজের কোনো ক্ষতি করে ফেলে? যা জেদখোর ছেলে! মুখ দিয়ে যা একবার বের করবে সেটা পালন করবেই, সেটা যত দেরি করেই হোক না কেন।

সেদিন ইচ্ছে করেই হেলমেটের গ্লাস উপরে তুলে আবরারের দিকে তাকিয়ে ছিল ফারিশ, সে বুঝতে পেরেছিল আবরার তাকে চিনতে পেরেছে। ভেবেছিল তার সঙ্গে কথা বলবে আবরার, কিন্তু আবরারকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ফিরে এসেছিল।
আবরার ফারিশের কাছ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলল,

“আচ্ছা ভালো থাকিস, আমি আসি এখন। বাড়ির সবাইকে নিয়ে যাস আমাদের বাড়িতে।”

ফারিশ তার হাত টেনে ধরে বিস্মিত হয়ে বলল,

“এখনই কেন যাবি? আজ থাক এখানে।”

আবরার হাত ছাড়িয়ে নিতে নিতে বলল,

“অন্য কোনোদিন আসবো।”

আবরার আর এক মুহুর্তও দাঁড়াল না। দ্রুত পায়ে দরজার দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। তার চেরি ব্লসম এঙ্গেজড! এর চেয়ে শকিং নিউজ দুনিয়ায় বোধহয় আর একটাও নেই। সে এত ভালো কাকে বাসলো? কাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখল? অন্য কারো হবু স্ত্রী! আবরারের মনে হচ্ছে তার বুকের ভেতর হাত ঢুকিয়ে কেউ তার হৃৎপিণ্ড খামচে ধরেছে। বারবার এত দুঃখ কষ্ট কেন তার কাছেই ফিরে ফিরে আসে?
প্রথমে মাকে হারাল, তারপর বাবার সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হলো, কিছু বছর পর ফুপুকেও হারাল। যাদের আঁকড়ে ধরে থাকতে চেয়েছিল তাদের সঙ্গেও দূরত্ব তৈরি হলো। শেষ পর্যন্ত যাকে ভালোবাসলো সেও কি-না আরেকজনের বাগদত্তা!
এত ব্যাড লাক নিয়েও কেউ জন্মায়?

চলবে……….

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply