মনবোঝেনা (১২)
সানা_শেখ
আবরারকে আরও বেশ কয়েকবার কল করল আবির, কিন্তু আবরার রিসিভ করল না।
আবির মেজাজ হারিয়ে সারাহর ফোনে কল করল। কিছুক্ষণ রিং হওয়ার পর রিসিভ হলো।
সারাহ কিছু বলার আগেই আবির বলল,
“চেরি, কেমন আছো?”
“ভালো, আপনি কেমন আছেন?”
“ভালো। ঘুমিয়ে পড়েছিলে?”
“হুম।”
“আচ্ছা ঘুমাও তাহলে, আগামীকাল কল করব।”
“কিছু বলবেন?”
“না। তেমন কিছু না, তুমি ঘুমাও।”
“আচ্ছা।”
“আই লাভ ইউ, চেরি ব্লসম।”
“হুম, ভালো থাকবেন।”
আবিরের গলার আওয়াজ পরিবর্তন হলো। কর্কশ গলায় ধমকের সুরে বলল,
“এ্যাই, আই লাভ ইউ বললে এর বিপরীতে আই লাভ ইউ টু বলতে হয় জানো না?”
“আবির!”
ডান হাতে নিজের মাথার চুল খামচে ধরল আবির। রাগের মাথায় কী করছে সে? চেরির সঙ্গে কেন রাগ দেখাচ্ছে? তার চেরি তো আজ পর্যন্ত তাকে ভালোবাসি বলেইনি। লাজুক মেয়ে কি-না, বলতে লজ্জা পায়। সারাহকে সে কিছুতেই হাত ছাড়া করবে না। সারাহ অন্য রকম।
আবির নিজেকে সামলে শান্ত কন্ঠে বলল,
“সরি, ডার্লিং আ—
“ডার্লিং!”
সারাহর কন্ঠে বিস্ময় খেলে গেল যেন। আবির তো কখনো তাকে ডার্লিং বলে না। সবসময় চেরি ব্লসম বা সাকুরা বলেই সম্বোধন করে।
“চেরি ব্লসম, তুমি ঘুমাও এখন, আগামীকাল কথা হবে। আবারও সরি।”
কল কেটে দিলো আবির। সারাহ ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে রইল। আবির তার সঙ্গে অমন রূঢ় হয়ে কথা বলল বিশ্বাস হচ্ছে না সারাহর।
পেরিয়ে গেছে কয়েকটা দিন। আবির অনলাইনে বিয়ে করে নিতে চাইলেও তার বাবা-মা কিছুতেই রাজি নয়। একমাত্র ছেলের বিয়ে তারা এভাবে করাতে রাজি না। আবির কোনোভাবেই তাদের রাজি করাতে না পেরে দুদিন ধরে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে।
তার একমাত্র ভরসা এখন সারাহ। সে যখনই সুযোগ পায় সারাহকে কল করে বোঝাতে শুরু করে। আবরার সারাহর সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করলে সারাহ যেন কোনোভাবেই কথা না বলে। সবসময় যেন ইগনোর করে চলে। একা যেন বাড়ির বাইরে বের না হয়।
ভার্সিটিতে আবরার মোটেও বিরক্ত করে না সারাহকে। রাস্তা ঘাটে কিংবা বাড়িতে এসেও করে না। সে সবসময় দূর থেকেই তাকে দেখে। কখনো বা ভার্সিটির ক্যাম্পাসে চুপচাপ তার পিছু পিছু হাঁটে। গত রাতে আবরার কল করেছিল সারাহর ফোনে। গলার আওয়াজ চিনতে পেরেই কল কেটে নাম্বার ব্লক করে দিয়েছে সারাহ। দ্বিতীয়বার আর কোনো নাম্বার থেকে কল করেনি আবরার।
পেরিয়ে গেছে অনেকগুলো দিন। এর মধ্যে ঘটে গেছে অনেক কাহিনী।
ক্লাস শেষে গেইটের দিকে এগোতেই একপ্রকার ছুটে এলো আবরার। সারাহর পাশ ঘেঁষে হাঁটতে হাঁটতে বলল,
“প্রিয় চেরি ব্লসম, আজকে তোমাকে দারুণ লাগছে।”
সারাহ দাঁড়িয়ে পড়ল। সে ঘাড় ঘুরিয়ে আবরারের মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু অথচ ঝাঁঝালো গলায় বলল,
“এই নামে দ্বিতীয়বার ডাকবেন না আপনি আমাকে। আর আপনি এত ছ্যাচড়া কেন? আপনার রুচিই বা এত খারাপ কেন? আপনি জানেন তো আমি এঙ্গেজড, তবুও কেন পেছনে পড়ে আছেন? আপনি না ভদ্র ঘরের ছেলে, তবে আচরণ এত অভদ্র কেন?”
হঠাৎ সারাহর এমন কথা আর আচরণে হতভম্ভ হলো আবরার। এটা কী সেই সারাহ যে কি-না তাকে দেখলেই জড়সড়ো হয়ে যেত, গলা দিয়ে আওয়াজ বের হতো না? আবরারকে চুপ থাকতে দেখে সারাহ আবার আগের মতো একই সুরে বলল,
“যদি আপনার আত্মসম্মান বলে কিছু থেকে থাকে তবে আর আমার পেছনে পড়ে থাকবেন না। আবিরকে কল করে একদম উল্টাপাল্টা কিছু বলবেন না।”
আবরার হতভম্ভ ভাব কাটিয়ে বলল,
“চেরি ব্লসম, আমি আবিরকে কল করি না, উল্টো আবির কল করে যা-তা বলে আমাকে।”
“বলবে না কেন? আপনি তার বাগদত্তার পেছনে পড়ে থাকবেন আর সে আপনাকে কল করে অভিনন্দন জানাবে? আপনার মতন ব্যক্তিত্বহীন নির্লজ্জ পুরুষ আমি আর একটাও দেখিনি। রুচিতে বাধে না অন্য একজনের হবু বউয়ের দিকে নজর দিতে? অসভ্যের মতন আচরণ না করে নিজেকে পরিবর্তন করুন।”
আবরার শীতল গলায় বলল,
“আমি অসভ্যের মতন আচরণ করি?”
সারাহ অগ্নিশর্মা হয়ে বলল,
“হ্যাঁ।”
“কী অসভ্যতা করেছি আমি?”
“অনেক কিছু করেছেন। আপনি আমার সামনে আসবেন না। আপনার চেহারা দেখতে ইচ্ছে করছে না আমার। আমি আবিরকে ভালোবাসি, আর উনাকেই বিয়ে করব। পিছু নিবেন না আমার।”
সারাহ চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই আবরার বলল,
“প্রিয় চেরি ব্লসম, আমি অনেক কষ্টে নিজের মনকে বুঝিয়ে তোমাদের মাঝখান থেকে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। আমার মনে হয়েছে আমার চেয়ে আবির তোমাকে বেশি ভালো রাখবে। আমি আজ তোমার কাছে নিজের ভালোবাসার দাবি নিয়ে আসিনি, এসেছিলাম ভালোবাসার শেষ বিদায় জানাতে। তুমি যখন চাইছো না তখন আর কোনোদিন তোমার সামনে আসবো না। এই দুনিয়ার সবচেয়ে বাজে অভিজ্ঞতা আর অনুভূতি কী জানো? পাগলের মতন ভালোবাসার পরও ভালোবাসার মানুষটিকে নিজের করে না পাওয়া, আর ভুল মানুষের প্রতি অনুভূতি তৈরি হওয়া। পৃথিবীর সব সুখ তোমার হোক। ভালো থেকো আমার ভালোবাসা।”
সারাহকে পেছনে ফেলে চলে গেল আবরার। সারাহ বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল একই জায়গায়। আবরারের বিষাদ মাখা গলার স্বর শুনে সারাহ যেন নিজেকেই হারিয়ে ফেলেছে। সে কী বেশি খারাপ আচরণ করে ফেলেছে আবরারের সঙ্গে? তার কথার চেয়ে কথা বলার ধরনটাই বেশি কষ্ট দিয়েছে আবরারকে। এভাবে কথাগুলো না বলে আরেকটু ভালোভাবেও তো বলতে পারতো।
বাড়িতে আসার পরও মনকে শান্ত করতে পারছে না সারাহ। বারবার আবরারের সেই করুণ চাহনি চোখের সামনে ভেসে উঠছে।
ফাইয়াজ সারাহকে কয়েকবার ডাকলেও সারাহ রুম থেকে বের হয়নি।
আটটা নাগাদ বাবা মায়ের রুমে এলো আবরার। আমজাদ খান বাড়িতে নেই, মহুয়া কবীর বিছানায় বসে বই পড়ছেন। আবরার অনুমতি নিয়ে ভেতরে ঢুকে মহুয়া কবীরের সামনে দাঁড়াল মাথা নিচু করে। মহুয়া কবীর বেশ অবাক হয়েছেন আবরারকে নিজেদের রুমে দেখে।
“কিছু বলবে, আবরার?”
আবরার মাথা নাড়ল। মহুয়া কবীর তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন কি বলবে শোনার জন্য। আবরার বেশ অনেকটা সময় দাঁড়িয়ে থাকার পর মৃদু স্বরে বলল,
“সরি।”
নড়ে চড়ে উঠলেন মহুয়া কবীর। আবরার সরি বলছে কেন? তিনি কিছু বলার জন্য উদ্যত হতেই আবরার আবার বলল,
“আমি ছোটো থেকে এখন পর্যন্ত অনেক বাজে আচরণ করেছি আপনার সঙ্গে। আমার ভুল ত্রুটি মাফ করে দিবেন। শুভ রাত্রি, আম্মু।”
আবরার আর এক মুহুর্তও দাঁড়াল না। দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেল রুম থেকে। মহুয়া কবীর আবরারের মুখে আম্মু ডাক শুনে নড়া চড়া করতেও ভুলে গেছেন বোধহয়। তিনি শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছেন দরজার দিকে। আবরার তার মুখের দিকে তাকিয়ে আম্মু ডেকেছে, চোখজোড়া লাল টকটকে ছিল। কিছু একটা হয়েছে আবরারের। দ্রুত বিছানা ছেড়ে রুম থেকে বের হলেন। আবরারের রুমে এসে দেখলেন আবরার রুমে নেই। ব্যালকনিতে খুঁজেও পেলেন না। আবরারের নাম ধরে ডাকতে ডাকতে নিচে নেমে এলেন। একজন মেইড জানাল আবরার বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল মাত্রই। তিনি দ্রুত পায়ে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এসেও আবরারকে পেলেন না।
রাত গভীর হলেও সারাহর ঘুম আসছে না। অপরাধ বোধ হচ্ছে। সে আজকের আগে কোনোদিন কারো সঙ্গে এত খারাপ আচরণ করেনি। কী হয়ে গিয়েছিল তার? কেন অমন আচরণ করে ফেলল?
শোয়া থেকে উঠে বসে ফোন হাতে তুলে নিল। আবরারের নাম্বার আছে তার কাছে। কল করে একবার সরি বলে দিবে। আবরার তো বললোই সে তার আর আবিরের মাঝখান থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
নাম্বার আনব্লক করে কল করে দেখল কল ঢুকছে না। ফোন বন্ধ বলছে। বেশ কয়েকবার কল করে ঝিম ধরে বসে রইল। সিদ্ধান্ত নিল আমাগীকাল ভার্সিটিতে গিয়ে আবরারকে খুঁজে সরি বলবে।
ছেলের লেখা চিঠি হাতে বিছানায় বসে আছেন আমজাদ খান। এখন সকাল আটটা। তিনি রাতেই বাড়ি ফিরেছেন। বাড়িতে ফেরার পর ছেলে কী করেছে আর বলেছে শুনেছেন স্ত্রীর কাছে। শুনে বেশ খুশী হয়েছিলেন, কিন্তু এখন তার বুক ভার হয়ে রয়েছে। আবরার রাতে বাড়িতে ফেরেনি। কোথায় গেছে কেউ জানে না। রাত থেকে তার ফোন বন্ধ।
ছেলের রুমে প্রবেশ করার পর স্টাডি টেবিলের কাছে এগিয়ে আসতেই প্রথমে নজরে পড়েছে চিঠিটা। পেপার ওয়েট দিয়ে চাপা দেওয়া ছিল। এলোমেলো হাতে চিঠিতে লেখা রয়েছে,
আব্বু। আচ্ছা আমি আপনাকে কতগুলো দিন পর আব্বু ডাকছি খেয়াল আছে আপনার? আমার খেয়াল নেই। সরি, আব্বু। সত্যি বলতে ছোটো বেলায় আমিই ভুল ছিলাম, আপনাকে বোঝার চেষ্টা করিনি। তখন বোঝার মতন বয়সও ছিল না আমার। বড়ো হওয়ার পরও বোঝার চেষ্টা করিনি। আপনি কাকে ভালোবাসেন, কাকে নিয়ে ভালো থাকবেন সেটা একান্তই আপনার সিদ্ধান্তই হওয়া উচিত, যা হয়েছেও। আপনার প্রতি আমার আর কোনো অভিযোগ নেই। আপনার সঙ্গে অনেক খারাপ আচরণ করেছি আমি। মাফ করে দিবেন আমাকে। ভালো থাকবেন।
ইতি
আপনার আবরার সাহিল
চলবে………..
Share On:
TAGS: মন বোঝে না, সানা শেখ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
মন বোঝে না পর্ব ৫
-
দিশেহারা পর্ব ৪৭
-
মন বোঝে না পর্ব ৪
-
তোমার সঙ্গে এক জনম পর্ব ১৩
-
মন বোঝে না গল্পের লিংক
-
দিশেহারা পর্ব ৬৮
-
দিশেহারা পর্ব ৬৫
-
দিশেহারা পর্ব ৪৯
-
তোমার সঙ্গে এক জনম পর্ব ১৬
-
তোমার সঙ্গে এক জনম গল্পের লিংক