লাবিবা ওয়াহিদ
[অন্যত্র কপি সম্পূর্ণ নিষেধ]
এশার গোপন কারবার ধরা খাবার দরুণ এশা কাচুমাচু হয়ে একপাশে দাঁড়ানো। আজ সকালে কি যেন একটা খুঁজতে গিয়ে খাটের নিচ থেকে এশার বস্তাটা খুঁজে পায়। সেখানে ছিল এশার গুপ্তধন। যেটায় সে ঘুষ এনে জমা করত। ইতিমধ্যেই এই ঘুষ দিয়ে বস্তার অর্ধেক ভরে গেছে। এ নিয়ে রাজিয়া শেখ মৌনোকেও ডেকে পাঠিয়েছেন। দুই মা-মেয়ে মিলে এখন এশার উপর চড়াও হয়েছে। আর ছোটোজন ভিক্টিম কার্ড খেলছে ইতিমধ্যেই তার চোখ দিয়ে নোনা-পানি গড়াচ্ছে। সে মিথ্যা বলতে পারে না। ঠাসঠুস বলে দিয়েছে,
–“সবাই মৌনো আপুর জন্য আমাকে ঘুষ দেয়। আমার কী দোষ?”
আহাম্মক বনে যান রাজিয়া শেখ। ইয়ামিন মামা তো খিটখিট করে হাসছে। তার পাশেই ইয়াসীন মামা দাঁড়ানো। ওনারও হাসি আটকাচ্ছে না। রাজিয়া শেখের সামনেই বলল,
–“ভালো একটা কনসেপ্ট পেয়েছি আপা। আমার সামনের কোনো সিনেমাতে এশার এই বুদ্ধিটা ঢুকিয়ে দিব। এরপর লিখব, ‘সত্য ঘটনা অবলম্বনে’।”
রাজিয়া শেখ এতে আরও ক্ষেপে গেলেন। মৌনোর কাছে এশাকে হস্তান্তর করে তিনি চলে গেলেন কাজে। দ্রুত প্রণভের বাসায় রিমঝিমের খাবার পাঠাবেন তিনি। মেয়ে তো অসুস্থ শরীর নিয়ে ওখানেই উঠেছে কিছুদিন হলো। রাজিয়া শেখ কিংবা রিয়াজ সাহেব এতে বাঁধা দেয়নি। অনেক ঝড়-ঝাপটা গিয়েছে মেয়েটার উপর। মেয়ে শ্বশুরবাড়ি থাকলে চাইলে তাদের আর অমত থাকতে পারে না। বরঞ্চ তারা দুজনেই ভীষণ খুশি মেয়েকে প্রণভের মতো দায়িত্বশীল ছেলের হাতে তুলে দিয়ে। ছেলেটাকে তারা ছোটো থেকেই বড়ো হতে দেখেছে, ভীষণ ভালো মানুষ। রাজিয়া শেখ তো আরও ভাবছেন এতদিন কেন প্রণভকে তাদের নজরে পড়েনি? সুপাত্র তাদের চোখের সামনেই ছিল অথচ এতদিন চোখের সামনে অদৃশ্য পর্দা টানা ছিল। রাজিয়া শেখ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। আল্লাহর অশেষ রহমতে তিনি ধৈর্যের সুফল উপহার দিয়েছেন। এর চাইতে আর বিশেষ কিছু চাওয়ার নেই। এখন রিমঝিমের চিন্তা পরিবর্তন হয়ে মৌনোর কাছে হস্তান্তর হয়েছে। রিমঝিমের মতো মৌনোও বেশ নাজুক। তবে ওনার বিশ্বাস আছে, রিমঝিমের মতো ঘটনা ছোটো মেয়ে ঘটাবে না। পরিবারের একটা ঘটনা ঘটার পর মৌনো অনেকটা চতুর হয়েছে বটে। এছাড়া রিমঝিম নিজেও বোনকে সেভাবেই মানুষ করেছে। রাজিয়া শেখ তো জুনায়েদ আর এশাকে ঠেলতে গিয়ে মৌনোকে সেভাবে কখনো সময় দিতে পারেননি৷ তবুও মেয়েটার কোনো অভিযোগ নেই। রিমঝিমের মতো করেই সবকিছু সামলে নেওয়ার তার অসীম ইচ্ছে।
রাজিয়া শেখ চলে যাওয়ার পর দুই মামা মিলে এশার সব ঘুষ ঘেটেঘুটে দেখছে। মৌনোও বোকা হয়ে চেয়ে আছে। তাদের এই হাসি-তামাশা কয়েকঘণ্টার মধ্যে ধামাচাপা পড়ে গেল। কোনো এক মাধ্যমে বাতাসের গতিতে পুরো এলাকাগ ছড়িয়ে পড়ল রিমঝিমের বিষাদময় অতীতের কথা। আগে যে বা যারা রিমঝিমকে সম্মান করত, পছন্দ করত তাদের হঠাৎ করেই রূপ পালটে গেল। সবাই ওকে ছি ছি করতে লাগল।
রিমঝিম প্রণভের ঘরে বিশ্রাম নেওয়ার অবস্থায় সেসব জানতে না পারেও প্রণভের কিছু কাজিনের দ্বারা খোঁচা শুনে বুঝে গেল কি হয়েছে। সে এই কঠিন মুহূর্তেও নির্লিপ্ত থাকল। যেন সে আগে থেকেই এসবের প্রস্তুতি নিয়ে ছিল। প্রণভও আসে হন্তদন্ত হয়ে। সে চায় না তার প্রিয়তমাকে কেউ ছি ছি করুক। সে তো জানে, নিজের চোখে দেখেছে সব.. রিমঝিমকে খারাপ ভাবে ছুঁয়ে দেওয়ার আগেই সেদিন সে পৌঁছে গেছিল। রিমঝিমকে বাঁচিয়ে নিয়েছিল, এক বিরাট জা(১)য়ারের হাত থেকে। এরপর খুবই গোপনে কয়েক স্বনামধন্য পরিবার মিলে সেই আবিরকে এলাকাছাড়া করে দিয়েছিল কেউ কিছু জানার আগেই। তবুও সবকিছু নীরব ছিল এতকাল। হঠাৎ কেন রিমঝিমের বিয়ের পরই এই খবর ছড়াতে হলো, ভেবে পেল না প্রণভ। তবে সে এটা বুঝেছে এটা কারো উদ্দেশ্যমূলক ভাবে করা। যেন রিমঝিমকে ধ্বংস করে দেওয়া তার মূল উদ্দেশ্য।
কিন্তু দেখা গেল প্রণভ যতটা ভয় পাচ্ছে রিমঝিমকে তার চাইতেও বেশি স্বাভাবিক দেখা যাচ্ছে। তার মধ্যে দুশ্চিন্তা, ভয়, লোকে কী বলবে এসব কিছুই দেখা যাচ্ছে না। প্রণভকে সে মিষ্টি করে বলল,
–“একটা হেল্প করবে?”
–“বলো!”
–“আগামীকাল তো শুক্রবার। মসজিদে খেঁজুর বণ্টন করিয়ো, সাথে মিলাদ পড়িয়ে দিয়ো আমাদের বিয়ে উপলক্ষে। বড়ো অনুষ্ঠান করার দরকার নেই, ওই টাকা সেভিংস হিসেবে রাখব।”
প্রণভ হেসে ফেলল। স্বস্তি পাচ্ছে সে, রিমঝিম কোনোপ্রকার রিয়েক্ট করেনি। অর্থাৎ সে লোকের কথা কানেই তোলেনি।
–“ঠিক আছে ম্যাডাম। স্বামীর কাছে আর কোনো আর্জি আছে?”
–“আগামীকাল আম্মাকে ইলিশ মাছ দিয়ে এসো। দুপুরে আমাকে ইলিশের সাথে সাদা ভাত খাইয়ে দিবে। পারবে না?”
প্রণভ রিমঝিমের চুল গুছিয়ে দিয়ে বলল,
–“শক্ত কাজ দিতে পারো না? এগুলো কোনো ব্যাপার?”
প্রণভ থেমে আবার বলল,
–“তোমার এসবে দুঃখ হচ্ছে না রিমঝিম?”
রিমঝিম আলতো করে হাসল। হাতের ব্যান্ডেজটা দেখিয়ে বলল,
–“আমি এই দিনের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে রেখেছিলাম। তবে যদি এই ঘটনা আমার এক্সিডেন্টের আগে হতো, আমি সত্যিই প্যানিক এট্যাক করতাম। কিন্তু আমি যে মৃ(১)ত্যুকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। যখন রাস্তায় পড়ে ছিলাম, ওই মুহূর্তে বারবার আল্লাহকে বলছিলাম যেন আমাকে বাঁচিয়ে দেয়। তাহলে আমার এই এক জীবনে আর কোনো আফসোস থাকবে না। আল্লাহ আমার কথা শুনেছিলেন হয়তো। উনার অশেষ রহমতে আমি বেঁচে ফিরেছি। শরীরের প্রতিটা জখম আমি সহ্য করছি, বাইরের মানুষ নয়। তুমি কী ভাবো আমার ভাঙা এতই সহজ? এছাড়া..”
রিমঝিম থেমে গেল। সময় নিয়ে মিনমিন করে বলল,
–“তুমি আমার জীবনের রং পালটে দিয়েছ। তোমার পাশে আমার নিজেকে সবথেকে সুখী মানুষটা মনে হয়। যে মানুষটা আমার ঢাল হয়ে আছে, আমি বাইরের জগতকে ভয় পাব কেন?”
প্রণভের চোখ-মুখে আচমকাই মুগ্ধতা, আবেগ এসে ভর করল। সে ঘূর্ণাক্ষরেও টের পায়নি রিমঝিম তাকে এতটা সমীহ করে, তাকে অন্ধবিশ্বাস করে। প্রণভ তাকে জড়িয়ে ধরে বলল,
–“কক্সবাজার যাবে? নাকি পাহাড়ে? চলো আমরা কোথাও গিয়ে ঘুরে আসি, একাকী। শুধুই মি. এন্ড মিসেস প্রণব। প্রপোজাল এক্সেপ্ট করছ?”
রিমঝিম খুবই আগ্রহ প্রকাশ করে বলল,
–“নিশ্চয়ই।”
অতঃপর দুই কপোত-কপোতী সমাজের কটুকথাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চলে গেল বান্দরবান।
জাবির এই খবর পেল রিপনের মুখে। জাবিরের এতে কোনো হেলদোল নেই৷ বাকিদের মতো তার জীবনেও কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। যা পুরোপুরি নেতিবাচক। মঞ্জু বলল,
–“ভাই, আপনের এই বুদ্ধি তো কাজে লাগল না। আপনে না কইছেন ভাবীরে আঘাত দিবেন? কিছুই তো অইলো না।”
জাবির এবার বিরক্তি প্রকাশ করল,
–“আহ! মঞ্জু! এত অধৈর্য অইলে অয় না। এডা তো হুদাই ছিল। এহন দ্যাখ না ওরে কেমনে তোগো ভাবি বানাই। অনেক উড়তাছে নিবিড়ের লগে। ওয় কি ভাবছে আমি ওরে ছাইড়া দিমু? এত সুজা?”
রিপন সহমত প্রকাশ করে বলল,
–“হক কথা কইছেন ভাই। ভাবীর নিবিড়ের লগে একটু বেশিই ঘেঁষাঘেঁষি। হুকুম কইরেন ভাই, এক্কেবারে হোতাই দিমু এলাকার সবডিরে।”
–“হ। এক বেডার লগে এত লাগালাগির কি আছে? এহন তো নিবিড়ের রত্নার লগে লুতুপুতুও নাই। আপনের লেইগ্যা তো দিনদিন চিন্তা বাড়তেছে ভাই।”
জাবির সাথে সাথে কিছু বলল না। বিড়িতে ফুক দিতে দিতে সে খুব গভীরভাবে কিছু ভাবার চেষ্টা করছে। সময় নিয়ে বলল,
–“নিবিড় শা**রে যাইতে দে। পরে দেহামু ফুলটুশিরে এই জাবির কি জিনিস। তহন জাবির ছাড় কাউরে ভালো পাইব না।”
রিমঝিমরা এখনো ফিরেনি। রাতের বেলা ইয়ামিন মামা কী করল, সালমা আর মৌনোকে নিয়ে বের হলো। মামা স্পষ্ট দেখেছে জুনাগেদ চুপিচুপি কোথাও যাচ্ছে। ইয়ামিন মৌনোর উদ্দেশে বলল,
–“তুই এখানে দাঁড়া। আমি তোর মামীকে নিয়ে জুনায়েদকে খুঁজে আনি। এতে আমাদের ঘুরাও হয়ে যাবে।”
বলেই ইয়ামিন মামা সালমার হাত ধরে ফুটপাত ধরে হাঁটছে। দুজনের হাত একে অপরের হাতে বন্দী। মৌনো আড়ালে হাসল। বোকা মামা, মৌনোকে কি এখনো সে বোকা ভাবে নাকি? সে আগেই দেখেছে জুনায়েদ নিবিড়দের বাড়ির দিকে যাচ্ছে। কিন্তু ইয়ামিন মামা তো মামীকে নিয়ে অন্যদিকে হাঁটা ধরেছে। মামার ধান্দা সে ধরতে পেরেছে। মৌনো যাতে পরে এটা বলতে না পারে যে মামা-মামী একা ঘুরতে গেছে অথচ মৌনোকে সাধেনি।
যাক, লুকোচুরির প্রেম করুক ওরা।
মৌনো তো জুনায়েদকে খুঁজতে চলে যায়। সে জানে জুনায়েদ আশেপাশেই আছে। কিন্তু তার এত রাতে বের হওয়ার কারণ খুঁজে পেল না। নিবিড়ের বাড়ির দিকে আসতেই দেখল জুনায়েদ হাতে দুটো আম নিয়ে পালিয়ে আসছে। জুনায়েদ মৌনোকে দেখতেই নীরব এলাকায় চেঁচিয়ে বলল,
–“আপা পালাও, আমি আম চুরি করে পালাচ্ছি। ধরা খেয়েছি।”
জুনায়েদ মৌনোর পালানোর অপেক্ষা করল না। সে আম নিয়ে মৌনোকে ফেলেই চলে গেল। আর হতবুদ্ধি মৌনো তখনো সেখানে দাঁড়িয়ে। টেরই পায়নি নিবিড় তার পেছনে দাঁড়িয়ে।
–“চোর হয়ে চুরি করতে এসেছিস আর জানিস না কীভাবে পালাতে হয়? স্ট্রেঞ্জ!”
মৌনো ভূত দেখার মতো চমকে উঠে পিছে ফিরে তাকাল। অবিশ্বাস্য সুরে বলল,
–“আপনি..”
–“হুঁ! চোর ধরতে এলাম। ভেতরে আয়। তোর হাত ধরে টেনে আনার ইচ্ছে নেই।”
বলেই নিবিড় গেটের ভেতরে চলে গেল। মৌনোর গলা শুকিয়ে এলো। নিবিড়ের পিছে যেতে যেতে বলল,
–“বিশ্বাস করুন, আমি কিছুই করিনি। আমি তো উলটো জুনায়েদকে খুঁজতে এলাম।”
নিবিড় গাছ থেকে হাত উঁচিয়ে পাকা আম পারল।
–“এত রাতে তুই বাহানা দিবি আর আমি বিশ্বাস করব?”
মৌনোকে এবার বেশ অসহায় লাগল। এখনো তার আঁচলের পেছনে লুকানো নিবিড়ের উপহারটা। সে আরও ভাবল উপহারটা জুনায়েদকে দিয়ে পাঠাবে আর এখানে সে নিজেই মুসিবতে পড়ে গেছে। মৌনো যখন আকাশ পাতাল ভাবছিল তখন নিবিড় তাকে দুটো আম এগিয়ে দিয়ে বলল,
–“নে, বাড়ি গিয়ে খেয়ে নিস। মেয়ে চোর হিসেবে শাস্তিও দিতে পারব না, তাই আমার গাছকে যাতে অভিশাপ না দিস এজন্য আম খেয়ে উদ্ধার কর।”
নিবিড়ের কথার মাঝে সে এক হিন্দি গান শুনল। দূর থেকে ভেসে আসছে। মোবাইলটা ওইতো, বাগানের ইজি চেয়ারে রাখা। খুব সম্ভবত নিবিড় এতক্ষণ গান শুনছিল, জুনায়েদের চুরি করা টের পেয়েই ফোন ফেলে এদিকে এসেছে। মৌনো কাচুমাচু হয়ে আম দুটো নিল৷ ব্যাকগ্রাউন্ডে নিবিড়ের ফোন থেকে ভেসে আসছে কিশোর কুমারের গান..
“তুঝে মিলকে ইয়ে দিল
মেরা বেহ জায়েগা
ইসসি বাতে কা ডার হ্যে মুঝকো
কে হোনা যায়ে পেয়ার তুমসে মুঝে..
কার দেগা বারবাদ
ইশক মুঝে।”
মুহূর্তেই আবছা আলোয় দুজনের চোখাচোখি হলো। মৌনো সেই চোখ জোড়ায় হারিয়ে বলতে চাইল যেন,
–“হয়ে গেছি বরবাদ, আপনার ভালোবাসা ইতিমধ্যেই আমাকে বরবাদে ঠেলে দিয়েছে।”
মৌনো ইতঃস্তত হয়ে তার আড়ালে রাখা উপহারটা নিবিড়ের দিকে এগিয়ে দিল। নিবিড় তা দেখে ভ্রু কুঁচকে বলল,
–“কি এটা?”
মৌনো থেমে থেমে বলল,
–“রোদ.. চ-চশমা।”
কামরুল দূরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পেয়ারায় কামড় বসাচ্ছে আর হাই তুলছে। নিবিড় তাকে দূরে দাঁড় করিয়ে রেখেছে। নিবিড়ের সাথে মৌনো একা, এটা নিবিড় ভালো চোখে দেখছে না। এমনিতেই রিমঝিমকে নিয়ে এত কাণ্ড হচ্ছে, তার ওপর সবাই এখন মৌনোর ক্ষতির জন্য ওঁৎ পেতে আছে। এজন্য সেইফটি হিসেবে কামরুলকে রাখা। কামরুল শেইনাকেও ডেকেছে। কিন্তু তার এখনো আসার খবর নেই। ঘুমিয়ে টুমিয়ে গেল নাকি কে জানে! তবে সে সেক্রেটারির দায়িত্ব অক্ষরে অক্ষরে পালন করে গেল। নিবিড় ভাইয়ের এক হাতে কথা শোনা মানে আরেক হাতে বখশিশ। কামরুল বখশিশের কথা শুনলে এভারেস্ট জয় করতেও প্রস্তুত। তাই ধৈর্য ধরে দাঁড়িয়ে আমের চুরি-বাটপারি দেখছে। যদিও আম নিবিড়ই পেড়েছে, তাই আপাতত চুরির কোনো সংকেত নেই। শেইনা আসল কিছুক্ষণ পর। সে অবাকই হলো মৌনো আর নিবিড়কে দূরে একসাথে দেখে। কামরুল তা দেখে বলল,
–“ওদিকে তাকাইয়েন না ছোডো আপা। হেরা যা করতাছে করুক গা, আমরা হইলাম গিয়া পাহারা দিমু।”
–“মৌনো আপু এই সময়ে কী করছে?”
–“বেশি জিগাইয়েন না। আমি খালি হুনছি জুনায়েদে আম চুরি করছে আর ধরা খাইছে আপায়। অন্য দিকে ফিরা আল্লার কাছে দুই তুইল্লা দুয়া কইরা কও যাতে মৌনো আপারে বকা খাওন বেশি না লাগে। পরে রাইতে গুমাইতে পারব না। পরে আবার কামরুলরে ডাকাডাকি লাগাই দিব। এর থেইকা ভালো পাহারা দেও।”
–“তোমাকে কেন ডাকবে?”
কামরুল খুব ভাব মেরে বলল,
–“নিবিড় ভাইয়ের বইকলে আমি এক কান দিয়া ঢুকাইয়া আরেক কান দিয়া বাইর কইরা লাই। এই শক্তি সবাই লইয়া জন্মাইতে পারে না। সবাই কি আর কামরুল নাকি?”
–“এটা কেমন শক্তি? আমাকেও শিখাও!”
–“ঠিক আছে। আপনে যেহেতু ছোডো আপনে তইলে একশো দিয়েন। আচ্ছা থাক, পঞ্চাশেই ছাইড়া দিমু পরামর্শ। এর বেশি কমাইতে পারমু না।”
শেইনা বিরক্ত হয়ে বলল,
–“তোমার মনে হয় না তুমি আজকাল একটু বেশিই টাকা টাকা করছ ভাই?”
–“ট্যাকা ছাড়া নিঃশ্বাস নেওন যায় না। এইল্লিগা ট্যাকা পানি খাওয়ার মরো গুরুত্বপূর্ণ অপরিসীম ছোডো আপা।”
এই দুই মাথা ভুলেই গেল এরা পাহারা দিতে দাঁড়িয়েছে। নিবিড় রোদচশমাটা উলটে পালটে দেখল মৌনোর সামনেই। মৌনোর অস্বস্তি হলো। এই চশমাটা সে দেখেছিল কামরুলকে কিনে দেওয়ার দিন। কিন্তু দান ছিল বেশি। তবুও সে এতদিন অল্প অল্প করে টাকা জমিয়ে কিনেছে এটা। আশা রাখছে নিবিড়ের পছন্দ হবে। নিবিড় বলল,
–“হঠাৎ উপহার?”
মৌনো চট্টগ্রামের চুড়িগুলোর কথা মনে করল। আমতা আমতা করে বলল,
–“আপনি আমাকে উপহার দিয়েছেন, আমি না দিলে খারাপ দেখাত।”
নিবিড় চুপ করে কিছু একটা ভেবে ভেতরে চলে যায়। আবার ফিরে আসে একট প্যাকেট নিয়ে। মৌনো চমকে যায়।
–“কি এটা?”
–“খুলে দেখ।
মৌনো খুলতেই চমকে গেল। একটা সুতির শাড়ি আর দুটো সিডি। একটা সিডি বিভিন্ন গানের আরেকটা মৌনোর পছন্দের একটা বাংলা সিনেমার। যেটার সিডি সে অনেক খুঁজেও পায়নি।
–“হঠাৎ?”
–“আগামীকাল তোর কুড়িতম জন্মদিন.. ভুলে গেলি?”
এই চমকটা ছিল চূড়ান্ত পর্যায়ের। এত বিষণ্ণতা, পারিবারিক কেচ্ছার ভীড়ে তার যে জন্মদিন এসে গেছে.. সে টেরই পায়নি। নিবিড় কী করে মনে রাখল? এশা খালি কলশিটায় বলে দেয়নি তো? এই মেয়ের স্মৃতিশক্তি অনেক চালু। কার কবে জন্মদিন সব টুকে রাখার স্বভাব আছে। নিবিড় নিজে থেকেই বলল,
–“এশা বলেছে জন্মদিনের কথা।”
নিবিড় থেমে আবারও বলল,
–“আগামীকালই ভেবেছিলাম কামরুলের হাত ধরে পাঠিয়ে দিব। এছাড়া ইয়ামিন মামার অনুরোধে মা তোর জন্য কেক বানাবে আগামীকাল। তাই ভাবলাম, তুই যেহেতু চোখের সামনেই আছিস.. তোকে সরাসরি উপহার দিয়ে দেই। অগ্রীম শুভ জন্মদিন, মৌনো।”
রাতের শীতল বাতাসের সাথে নিবিড়ের উইশটা মৌনোর গায়ে শিহরণ দিক৷ ধন্যবাদ জানাতেও ভুলে গেল সে। এর মাঝে কী হলো কে জানে, মৌনো জিজ্ঞেস করল..
–“কেন, কা-কামরুলকে দিয়ে পাঠাতেন কেন?”
নিবিড় রয়েসয়ে জবাব দিল,
–“আগামীকাল আমি চলে যাব। এবার সোজা জাহাজে..”
জাহাজের কথা শুনেই মৌনোর বুকটা ভঙ্গুর হয়ে এলো। তার সমস্ত উচ্ছ্বাস এক নিমিষে মাটিতে আছড়ে পড়ল। সুখের দিনগুলি বুঝি এত দ্রুত ফুরিয়ে গেল? মৌনোর চেহারার পরিবর্তন নিবিড়েরও নজরে পড়ল। ভ্রু কুঁচকে বলল,
–“আর ইউ অলরাইট, মৌনো?”
মৌনো কোনোমতে বলল,
–“বাড়ি যাব।”
নিবিড় কামরুলকে ডাকল, যেন মৌনোকে বাড়ি পৌঁছে দেয়। অবশ্য কামরুলের যাওয়া লাগল না। ইয়ামিন মামাই এসে মৌনোকে নিয়ে গেল। মৌনো যেতে যেতে ভাবল,
–“আপনার যাত্রা আল্লাহ সুস্থ-সবল রাখুক.. নিবিড় সাহেব। কোনো এক জন্মদিনে নিশ্চয়ই আপনার সাথে আমি কেক কাটব?”
নিবিড় চলে যেতেই মৌনোর ব্যস্ততা বাড়ল। ইয়ামিন মামারাও ইতিমধ্যে চলে গেছে। তার ফাইনাল শুরু হয়ে গিয়েছে। এ নিয়ে তার পুরো এক মাস দৌড়ঝাপের উপর কাটাতে হলো। কিন্তু শেষ পরীক্ষার দিন ভয়াবহ এক খবর শুনল। জুনায়েদের নাকি জাবিরের সাথে হাতাহাতি করেছে। জুনায়েদ এই মুহূর্তে হাসপাতালে ভর্তি। গায়ে যেন আগুন জ্বলে উঠেছিল মৌনোর। রিমঝিম, প্রণভ এখন এলাকায় নেই.. ওরা চট্টগ্রাম ঘুরতে গিয়েছে।
মৌনো রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে তখনই জাবিরের কাছে ছুটে গেল। রাগে সে হুঁশ খুইয়ে বসেছে। এতদিন জাবিরের সমস্ত অত্যাচার সে মুখ বুজে সহ্য করেছে, কিন্তু তার পরিবারে হাত ঢুকালে সে মোটেও সহ্য করবে না। জাবির তখন বাইকের সাথে হেলান দিয়ে গুণগুণ করে গান গাইছিল। মৌনোকে দেখতেই দুনিয়া জুড়ানো এক শ(১)তানি হাসি দিয়ে বলল,
–“আরে, আরে রিপন! যা যা নাস্তাপানি নিয়া আয়। তোর ভাবী আইছে। এত তাত্তাড়ি আইব এডা তো ভাবি নাই।”
মৌনো চেঁচাল,
–“সমস্যা কী আপনার? আমার ভাইয়ের গায়ে হাত তুলেছেন কোন সাহসে?”
–“হাত কই তুললাম গো সুন্দরী? ওগুলা শালা-দুলাভাইয়ের হইয়া থাকে। এত হাইপার হওয়ার কিছু নাই। রিপন যা ভাবীর লেইজ্ঞা কোক আন।”
মৌনো আরও রেগে গেল। গা ঘিনঘিন করে উঠল।
–“কিসের ভাবী! কে ভাবী? চটকনা দিয়ে দাঁত ফেলে দিব বেয়াদব!’
–“আহ সুন্দরী, রাগ করো ক্যা? তুমারে আমি বিয়া করুম এডা সবাই জানে।”
–“মুখ সামলে কথা বলেন! আপনার মতো চরিত্রহীন, গুণ্ডাকে কে বিয়ে করবে? এসব বিশ্রী স্বপ্ন দেখা বাদ দিন।”
মৌনো থেমে আবারও বলল,
–“আপনি যদি আর একবারও আমার পরিবার আর আমার উপর বাজে নজর দেন, এবার আমি কসম পুলিশে যাব! পুলিশের ডান্ডার বারি খেলে নেতাফেতা বেরিয়ে যাবে।”
বলেই মৌনো হনহন করে চলে আসল। জাবির মূর্তির মতো দাঁড়ানো। তার মুখে হাসি থাকলেও চোখগুলা ভয়াবহ দেখাচ্ছে। মৌনো তাকে আজ হুমকি দিয়েছে, তাকে মুখের ওপর প্রত্যাখান করে গেছে। স্বভাবতই, এগুলো জাবিরের পুরুষ ইগোতে খুব লেগে গেছে। রিপন তো রেগে-মেগে বলল,
–“ভাই, শালীরে ধইরা আনমু? সাহস কত্তবড়ো আপনেরে পুলিশের ডর দেহায়, থাপ্পড় মারতে চায়। হাত ভাইঙ্গা দিমু।”
জাবির ভয়াবহ সুরে বলল,
–“থাপ্পর দেওয়ার হুমকি দেয় নাই রে রিপন, কথা দিয়া থাপ্পড় না! জুতার বারি দিয়া গ্যাছে তোগো ভাবী। তোর ভাবীর রূপের খুব দেমাগ বুঝছিস? কী অয় যদি ওই রূপই না থাহে?”
বলেই জাবির হো হো করে হাসল। মঞ্জু, রিপনও বুঝে গেল তাদের ভাই ইঙ্গিতে কী বুঝিয়েছে।
মৌনোর প্রেক্টিক্যাল পরীক্ষা গুলো গেল ভীষণ চাপের মধ্যে। জুনায়েদ এখনো হাসপাতালে। বাসা আর হাসপাতালের পাশাপাশি ভার্সিটিতেও তার ছুটতে হয়েছে। খবর পেয়ে প্রণভ আর রিমঝিম দ্রুতই ফিরে এসেছে। আর একাডেমিকে হাফসা তার সাহায্য করেছে। মৌনো সত্যিই হাফসার প্রতি কৃতজ্ঞ। মেয়েটা না থাকলে যে কি হতো। মৌনো তো এক সেকেন্ডের জন্যেও ভাবতে পারছে না।
মৌনো সবেই বেলতুলির গলি দিয়ে ঢুকেছে। সকালে বৃষ্টি হয়েছিল, কেমন যেন মাটির স্যাঁতসেঁতে ঘ্রাণ নাকে বিঁধছে। এই মুহূর্তে তার স্বস্তি পাওয়ার কথা থাকলেও সে হঠাৎ ভড়কে গেল পেছন থেকে বাইরের শব্দ শুনে। বাইকে বসা মঞ্জু আর পেছনে জাবির। মৌনোকে দেখতেই লাল দাঁতগুলো বের করে হেসে বলল,
–“তোর রূপের খুব দেমাগ তাই না? এবার থেইকা দেহিস এই চেহারাতেই মাইনষে থুঁথুঁ ফেলব!”
বলেই মৌনোর দিকে জাবির এসি(১)ড ছুঁড়ে মারল।
®লাবিবা ওয়াহিদ
১ম খণ্ডের সমাপ্তি~~
[২য় খণ্ডের নাম বেলতুলি বদলে নাম হবে, “#বৃষ্টিছুঁয়েদিক_সন্ধ্যা”। ইদানীং বেলতুলি সোলেমান নামে বিচ্ছিরি এক গান ভাইরাল হয়েছে। আমার এই নামে গল্প আগাতে অস্বস্তি হয়। তাই ২য় খণ্ডে নাম বদলে দিলাম। এমনিতে গল্পের প্রেক্ষাপট ‘বেলতুলি’ ঠিকই থাকবে। কিছুদিনের মধ্যেই ইনশাআল্লাহ দ্বিতীয় খণ্ড নিয়ে হাজির হবো। আই রিপিট.. দ্বিতীয় খণ্ডের নাম ভালো করে দেখে নিবেন। পরে খুঁজে না পেলে আমার দোষ নেই। কেমন লেগেছে জানাবেন। ঘুমের কারণে আপাতত আমি অন্ধ। মন্তব্য না পেলে আড়ি!]
Share On:
TAGS: বেলতুলি, লাবিবা ওয়াহিদ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
বেলতুলি পর্ব ২২
-
বেলতুলি পর্ব ১৮
-
বেলতুলি পর্ব ৫
-
বেলতুলি পর্ব ২৬
-
বেলতুলি পর্ব ৩১
-
বেলতুলি পর্ব ১৩
-
বেলতুলি পর্ব ২
-
বেলতুলি পর্ব ৩
-
বেলতুলি পর্ব ৩২
-
বেলতুলি পর্ব ২৩