Golpo romantic golpo বাঁধন রূপের অধিকারী

বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ৪৩


বাঁধনরূপেরঅধিকারী

লেখিকাসুমিচৌধুরী [৪৩]

ড্যানি রূপাকে নিয়ে স্টেজে গিয়ে বসল। চারপাশে তখনও তুমুল শব্দে বাজছে মিউজিক। প্রফেশনাল ড্যান্সারদের সঙ্গে একই ছন্দে নাচতে থাকা রহস্যময় যুবকটির দিকেই একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে রূপা। যতই তাকাচ্ছে, ততই মনে হচ্ছে ছেলেটা তার ভীষণ চেনা। খুব কাছের। বড্ড আপন।
ঠিক তখনই।
ঠাস! ঠাস! ঠাস!
পরপর কয়েক রাউন্ড গুলির বিকট শব্দে যেন কেঁপে উঠল পুরো স্টেজ হল।মিউজিক মুহূর্তেই চাপা পড়ে গেল গুলির প্রচণ্ড শব্দে। একের পর এক বুলেট গিয়ে আঘাত করতে লাগল দেয়াল, ঝাড়বাতি, কাঁচের শোকেস আর স্টেজের চারপাশে। কাঁচ ভেঙে চারদিকে ছিটকে পড়ছে। দামি সাজসজ্জা মুহূর্তের মধ্যেই চুরমার হয়ে যেতে লাগল।চারদিকে হুড়োহুড়ি পড়ে গেল। আতঙ্কে চিৎকার করে যে যেদিকে পারছে দৌড়ে পালাতে শুরু করল অতিথিরা। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আনন্দমুখর পরিবেশটা পরিণত হলো বিভীষিকাময় এক যুদ্ধক্ষেত্রে।হতভম্ব হয়ে চারপাশে তাকিয়ে গর্জে উঠল ড্যানি।
—-“হোয়াট দ্য হেল! এসব কী হচ্ছে? গুলি কে করছে?”
গুলির তীব্রতা আরও বাড়তে লাগল।ভয়ে পুরো শরীর কাঁপতে শুরু করল রূপার। দুই হাত দিয়ে কান চেপে শক্ত করে চোখ বন্ধ করে ফেলল।চারপাশে দ্রুত দৃষ্টি বুলিয়ে নিজের সশস্ত্র গার্ডদের দিকেই তাকাল ড্যানি। পরের মুহূর্তেই বিস্ময়ে তার চোখ বড় হয়ে গেল।তার নিজের লোকেরাই চারদিকে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে সবকিছু ধ্বংস করে দিচ্ছে!
রাগে উন্মত্ত হয়ে চিৎকার করে উঠল।
—-“এই! কী করছিস তোরা? থাম বলছি! তোদের সাহস তো কম না!”
কিন্তু তার গর্জন যেন কারও কানেই পৌঁছাল না। কেউ একবারের জন্যও তার দিকে তাকাল না। সবাই যেন অদৃশ্য কারও নির্দেশ মেনে একের পর এক গুলি চালিয়েই যাচ্ছে।

সেই বিশৃঙ্খলার মাঝেই নিঃশব্দে রূপার পেছনে এসে দাঁড়াল কেউ একজন।একটি রুমাল আলতো করে চেপে ধরল তার নাক-মুখের ওপর।তীব্র এক ঝাঁঝালো গন্ধ নাকে ঢুকতেই কয়েক সেকেন্ডের জন্য ছটফট করে উঠল।তারপর ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে যেতে লাগল চারপাশ।ভারী হয়ে এলো চোখের পাতা।শেষবারের মতো দূরে দাঁড়িয়ে থাকা সেই রহস্যময় যুবকটির অস্পষ্ট অবয়ব চোখে পড়তেই সম্পূর্ণ অচেতন হয়ে পড়ল রূপা।এরপর কী ঘটেছিল।তার কিছুই আর জানা হলো না।

ধীরে ধীরে জ্ঞান ফিরল রূপার।চোখ মেলে তাকাতেই নিজেকে একটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, প্রশস্ত ও অভিজাত রুমের নরম বিছানায় শুয়ে থাকতে দেখল। চারপাশটা অদ্ভুত রকমের নিস্তব্ধ। এতটাই নীরব যে নিজের শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দও স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। মাথাটা এখনো কেমন ভারী লাগছে। মনে হচ্ছে, অনেকক্ষণ ঘুমিয়ে ছিল।হঠাৎ নিজের দিকে তাকাতেই থমকে গেল রূপা।তার পরনে আর আগের সেই ভারী বধূবেশ নেই।পরনে রয়েছে আকাশি-নীল রঙের একটি স্লিভলেস, স্মকড বডিসের লং ফ্লেয়ারড গাউন। পুরো গাউনজুড়ে ছড়িয়ে আছে সাদা ফুলেল নকশা। নিচের বর্ডারজুড়ে ফুটে আছে বড় বড় সাদা ফুল আর লতাপাতার সূক্ষ্ম কারুকাজ। তার ওপর পরা রয়েছে দুধ-সাদা রঙের হালকা শিফনের একটি শ্রাগ। ঢিলেঢালা থ্রি-কোয়ার্টার কিমোনো-স্টাইল হাতা শ্রাগটিকে আরও অভিজাত করে তুলেছে। সামনের দিকে কোমরের কাছে বাঁধা বড় একটি সাদা বো পুরো পোশাকটিতে এনে দিয়েছে এক কোমল, স্নিগ্ধ ও নান্দনিক সৌন্দর্য।অবাক বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল চোখ।
এত সুন্দর পোশাক সে জীবনে খুব কমই দেখেছে। কয়েক মুহূর্তের জন্য যেন কথা বলার ভাষাই হারিয়ে ফেলল।ঠিক তখনই হাতে হালকা সুড়সুড়ি অনুভব করল।চমকে নিচের দিকে তাকাতেই চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল রূপার।
তার ছোট্ট ক্যান্ডি!এক মুহূর্তও দেরি না করে ক্যান্ডিকে দুই হাতে তুলে শক্ত করে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরল। বুকের ভেতরে এতক্ষণ ধরে জমে থাকা সব কষ্ট যেন অশ্রু হয়ে বেরিয়ে এলো। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
—-“ক্যান্ডি সোনা আমার ক্যান্ডি!”
কিছুক্ষণ পর হঠাৎ মাথায় প্রশ্ন জাগল।ক্যান্ডি এখানে এলো কীভাবে? এটা তো বিদেশ! তাহলে।অসংখ্য প্রশ্ন একসঙ্গে ঘুরপাক খেতে লাগল মাথার ভেতর।কৌতূহল আর ধরে রাখতে না পেরে বিছানা থেকে নামতে যাবে, ঠিক তখনই দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করল অ্যান্সি ও নিক্সি।বিছানা থেকে নামতে দেখে দ্রুত এগিয়ে এসে বলল অ্যান্সি,
—-“আরে রূপা, কোথায় যাচ্ছো?”
অ্যান্সি আর নিক্সির দিকে তাকিয়েই স্তব্ধ হয়ে গেল রূপা।
অবিশ্বাসে বড় হয়ে গেল চোখ। যেন নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছে না।পরের মুহূর্তেই আনন্দ, বিস্ময় আর আবেগে চিৎকার করে উঠল,
—-“অ্যান্সি আপু, নিক্সি আপু।”
নিক্সি এগিয়ে এসে রূপার সামনে দাঁড়াল। ঠোঁটে মিষ্টি হাসি ফুটিয়ে বলল,
—-“হ্যাঁ সোনা, আমরা।”
অবিশ্বাসে কাঁপতে লাগল রূপার চোখ। তোতলাতে তোতলাতে বলল,
—-“কিন্তু তো-তোমরা এখানে কি-কীভাবে?”
মৃদু হেসে উত্তর দিল অ্যান্সি,
—-“তোমার হিরোর সঙ্গে এসেছি।”
কথাটা শুনে ভ্রু কুঁচকে তাকাল রূপা। কিছুই বুঝতে পারল না।তার মুখের অভিব্যক্তি দেখেই হেসে আবার বলল অ্যান্সি,
—-“মানে বাঁধনের সঙ্গে এসেছি।”
‘বাঁধন’ নামটা কানে পৌঁছাতেই যেন মুহূর্তের মধ্যে থেমে গেল পৃথিবী।বুকের ভেতরটা হঠাৎ করেই কেঁপে উঠল রূপার। হৃদস্পন্দন একবার প্রচণ্ড বেগে লাফিয়ে উঠে পরক্ষণেই যেন থমকে গেল।বাঁধন এসেছে।এই মানুষটাকে একবার দেখার জন্য কত শত রাত নীরবে কেঁদেছে। কত অসহায়ভাবে ছটফট করেছে। কতবার চোখ বন্ধ করে শুধু একটুখানি মুখ দেখার আকুতি করেছে। আজ সেই মানুষটা কি সত্যিই এসেছে! যদি আসে তাহলে আজ সে প্রাণ ভরে দেখবে তাকে।যতক্ষণ না চোখের সব তৃষ্ণা মিটে যায়।
ছলছল চোখে অ্যান্সির দিকে তাকিয়ে কাঁপা কণ্ঠে বলল রূপা,
—-“আপু উনি,উনি, কি সত্যিই এসেছেন?”
মুচকি হেসে উত্তর দিল নিক্সি,
—-“কেন, বিশ্বাস হচ্ছে না? তাহলে নিচে গিয়ে দেখো। তোমার হিরো নিচেই আছে।”
আর এক মুহূর্তও দেরি করল না রূপা।প্রায় দৌড়ে রুম থেকে বেরিয়ে এলো। সামনে পড়তেই সিঁড়ির দিকে ছুটে গেল। এক নিঃশ্বাসে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো।কিন্তু নিচে পা রাখতেই আচমকা থমকে দাঁড়াল।যেন কেউ মুহূর্তের মধ্যে তার সমস্ত শরীর পাথর বানিয়ে দিয়েছে।অবিশ্বাসে ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠল তার দুটি চোখ।সামনের দৃশ্যটা দেখে যেন নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছে না।রূপার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।বিশাল হলরুমের মাঝখানে হাঁটু গেড়ে বসে আছে মুভিন আর ড্যানি। দুজনের হাতই পেছন দিকে শক্ত করে বাঁধা। তাদের চারপাশ ঘিরে অস্ত্র হাতে সতর্ক ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য প্রশিক্ষিত গার্ড।আর তাদের ঠিক সামনে।
দুই হাত প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে নিশ্চিন্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে সেই রহস্যময় যুবক।তাকে দেখেই আবারও থমকে গেল রূপা।এবার তার সাজটা আগের থেকে কিছুটা আলাদা।ধবধবে সাদা শার্টের ফুল-স্লিভ হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত গোটানো। মাথার সাদা ক্যাপটাও এবার সোজা করে পরা। মুখের অর্ধেকটা এখনো ঢেকে রেখেছে সেই কুচকুচে কালো মাস্ক।কিন্তু এবার আরও একটি বিষয় চোখ এড়াল না।দুই কবজির নিচ থেকে শুরু করে বাহু পর্যন্ত কালো ট্যাটু আঁকা। ঘাড়ের দুই পাশ জুড়েও রয়েছে গাঢ় কালো ট্যাটুর নকশা।অজানা এক শিহরণ বয়ে গেল সারা শরীরে।নিঃশ্বাস যেন ধীরে ধীরে ভারী হয়ে আসছে।কে এই যুবক?কেন তাকে দেখলেই বুকের ভেতরটা এভাবে কেঁপে ওঠে?কেন বারবার মনে হয়, এই মানুষটা তার খুব চেনা খুব আপন?
হাঁটু গেড়ে বসে থাকা ড্যানি রাগে দাঁত চেপে তাকাল যুবকটির দিকে।
—-“তুই এসব ভালো করছিস না। তুই জানিস না আমি কে?”
কথাগুলো শুনেও মুখের কোনো ভাবান্তর হলো না যুবকটির।একই রকম স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে শান্ত কণ্ঠে বলল,
—-“তোকে চেনার প্রয়োজন নেই আমার।”
পাশ থেকে ক্ষোভে গর্জে উঠল মুভিন,
—-“আছে! তুই জানিস না, এ ড্যানি! এই শহর ড্যানির নাম শুনে কাঁপে। আর তুই সেই ড্যানির সঙ্গেই পাঙ্গা নিচ্ছিস? ড্যানি একজন বিখ্যাত মাফিয়া!”
মুভিনের কথা শেষ হতেই যুবকটির চোখে তীব্র শীতলতা নেমে এলো।ঠান্ডা, নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলল,
—-“ও যদি বিখ্যাত হয়”
কয়েক সেকেন্ড থেমে ড্যানির চোখে চোখ রেখে বাকিটা উচ্চারণ করল,
—-“তাহলে শুনে রাখ আমি কুখ্যাত।”
রাগে-ক্ষোভে ফুঁসতে ফুঁসতে দাঁত চেপে বলল ড্যানি,
—-“তুই কে? আর তুই কী চাস?”
ধীরে ধীরে নিচু হয়ে ড্যানির মুখের একেবারে কাছে ঝুঁকে এলো যুবকটি।কালো মাস্কের আড়াল থেকে ক্ষুরধার চোখ দুটো সরাসরি গেঁথে দিল তার চোখে।কয়েক সেকেন্ড কোনো কথা বলল না। শুধু তাকিয়েই রইল।তারপর ঠান্ডা, কণ্ঠে বলল,
—-“আমি যা চাই, তুই সেটা দিবি?”
এক মুহূর্তও দেরি না করে বলে উঠল ড্যানি,
—-“হ্যাঁ, বল! কত টাকা চাস? কয়টা ফ্ল্যাট চাস? যা চাইবি, সব দিব!”
হালকা করে মাথা কাত করল যুবকটি।মাস্কের আড়ালেও যেন ঠোঁটের কোণে বিদ্রূপের হাসি ফুটে উঠল।
—-“ইন্টারেস্টিং”
একটু থেমে আবার বলল,
—-“আমি কি একবারও বলেছি, আমার টাকা চাই? কিংবা ফ্ল্যাট?”
কথাটা শুনে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল ড্যানি।তারপর কপাল কুঁচকে বলল,
—-“তাহলে তুই চাস কী?”
আরও একবার ধীরে ধীরে ঝুঁকে এলো যুবকটি।এবার দুজনের মুখের দূরত্ব মাত্র কয়েক ইঞ্চি।শীতল, ধারালো দৃষ্টিতে ড্যানির চোখের ভেতর তাকিয়ে খুব নিচু স্বরে বলল,
—-“তোর প্রাণ”
এক সেকেন্ড থেমে মাথাটা সামান্য কাত করল।
—-“গেম ওভার, ড্যানি।”
হঠাৎ গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠল ড্যানি,
—-“এইইই…!”
ধীরে ধীরে সোজা হয়ে দাঁড়াল যুবকটি।চোখে-মুখে বিরক্তির ছাপ ফুটে উঠল। মাথা আবারো সামান্য কাত করে বিরক্ত কন্ঠে বলল,
—-“আস্তে কথা বল। ইটস অ্যানয়িং। বিরক্ত লাগে আমার।”
দূর থেকে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে সবকিছু দেখছে আর শুনছে রূপা। কিন্তু কিছুতেই বুঝতে পারছে না, আসলে কে এই রহস্যময় যুবক।হঠাৎ বাঁধনের কথা মনে পড়তেই অস্থির হয়ে উঠল।অ্যান্সি তো বলেছিল, বাঁধন নিচেই আছে!
তাহলে কোথায় সে?অস্থির চোখে চারপাশে তাকাতে লাগল রূপা। কিন্তু কোথাও তার পরিচিত মানুষটাকে দেখতে পেল না।ঠিক তখনই সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো অ্যান্সি আর নিক্সি।এভাবে চারদিকে খুঁজতে দেখে মুচকি হেসে বলল অ্যান্সি,
—-“কী? তোমার হিরোকে খুঁজছো বুঝি?”
লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলল রূপা।মুখের কোণে দুষ্টু হাসি টেনে আবার বলল অ্যান্সি,
—-“তোমার হিরো তো এখানেই আছে। তোমার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে। ফাইন্ড হিম।”
কথাটা শুনে আবার চারদিকে তাকাল রূপা।না, এখানে তো শুধু অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে থাকা গার্ডগুলো, মুভিন, ড্যানি। আর সেই রহস্যময় যুবক।ভাবনাটা মাথায় আসতেই বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।তাহলে কি এই যুবকটাই বাঁধন?
অবিশ্বাসে ধীরে ধীরে আবার তার দিকেই তাকাল রূপা।
ঠিক সেই মুহূর্তেই ড্যানির চোখ গিয়ে পড়ল তার ওপর।
বুকভরা আকুতি নিয়ে চিৎকার করে উঠল,
—-“প্রিসিয়া।”
শব্দটা কানে পৌঁছাতেই মুহূর্তের মধ্যে ঘাড় ঘুরিয়ে রূপার দিকে তাকাল যুবকটি।পরের মুহূর্তেই দুজনের চোখ এক হয়ে গেল।সময় যেন থমকে দাঁড়াল।যুবকটির চোখে জমে আছে বহু দিনের অপেক্ষা, অদম্য তৃষ্ণা আর সীমাহীন ভালোবাসা।আর রূপার চোখে শুধুই অবিশ্বাস।ধীরে ধীরে তার দিকেই এগিয়ে যেতে লাগল রূপা।চারপাশে কী হচ্ছে, কে কী বলছে কিছুই আর কানে ঢুকছে না।তার একটাই লক্ষ্য এই মুখোশটা খুলে দেখা।দেখতে হবে, কে এই মানুষ?কেন তাকে এত আপন লাগে?কেন বারবার মনে হচ্ছে এই মানুষটাই তার বাঁধন?
এক পা…
দুই পা…
ধীরে ধীরে একেবারে যুবকটার সামনে এসে দাঁড়াল রূপা।
কয়েক মুহূর্ত স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল দুজন। যুবকটি সামান্য মাথা নিচু করল।ঝাপসা হয়ে আসা চোখে চেয়ে রইল রূপার মুখের দিকে।কাঁপতে কাঁপতে হাত বাড়িয়ে দিল রূপা।আঙুলগুলো ধীরে ধীরে গিয়ে ছুঁয়ে ফেলল কালো মাস্কের কিনারা।আঙুলগুলো স্থির রাখতে পারছে না রূপার।কালো মাস্কের কিনারায় স্পর্শ করতেই হাতটা আরও বেশি কেঁপে উঠল। বুকের ভেতরের হৃদস্পন্দন যেন চাবুকের আঘাতের মতো ধপধপ করে বাজছে। নিজের কানেই স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে সেই শব্দ। শ্বাস ভারী হয়ে এসেছে। শুকিয়ে গেছে ঠোঁট।সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা সম্পূর্ণ নিশ্চুপ।কোনো নড়াচড়া নেই।কোনো বাধা নেই।শুধু গভীর, তৃষ্ণার্ত চোখে তাকিয়ে আছে রূপার দিকে।তার উপস্থিতিটাই যেন চারপাশের বাতাসকে আরও শীতল করে তুলেছে।ধীরে খুব ধীরেকাঁপতে থাকা হাত দিয়ে মাস্কটা খুলতে শুরু করল রূপা।
প্রতিটি সেকেন্ড যেন এক একটি যুগ।অবশেষে এক টানে খুলে ফেলল মাস্কটা মুহূর্তেই উন্মোচিত হলো সেই সুপরিচিত মুখ।সময় যেন থেমে গেল।ওষ্ঠ কেঁপে উঠল রূপার।
চোখের পাতা কেঁপে উঠল।অবিশ্বাসে বড় হয়ে গেল দুটি চোখ।যবুকটি আর কেউ নয় তারই বাঁধন,তারই তিন কবুল বলা স্বামী। কিন্তুএ কেমন বাঁধন?আগের সেই পরিপাটি, নিয়মমাফিক চলা মানুষটার সঙ্গে আজকের এই মানুষটার যেন আকাশ-পাতাল তফাত। চোখে তীক্ষ্ণতা, মুখে কঠিন স্থিরতা, শরীরজুড়ে কালো ট্যাটু, পোশাকে অন্যরকম এক দাপট।মনে হচ্ছে কেউ যেন নতুন করে তৈরি করেছে তাকে।
কিছুক্ষণ শুধু তাকিয়েই রইল দুজন।চারপাশের পৃথিবী যেন তাদের কাছে অস্তিত্বহীন।ধীরে ধীরে রূপার চোখের দিকে তাকিয়ে কৃশ কণ্ঠে শুধাল বাঁধন,
—-“সিইং ইউ ব্রিংস পিস টু মাই হার্ট।”
কথাটা শুনতেই টলমল করে উঠল রূপার চোখ।এতদিন পর অবশেষে তার মানুষটা ফিরে এসেছে।পাশে হাঁটু গেড়ে বসে থাকা মুভিন বাঁধনের মুখের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ হেসে উঠল।
রজনী রহমান আগে থেকেই বাঁধনের ছবি পাঠিয়েছিল তাকে। তাই চিনতে একটুও সময় লাগল না।ব্যঙ্গভরা কণ্ঠে বলল,
—-“ওহ বাঁধন! সিরিয়াসলি? ওই দেশের এসপি হয়ে এই দেশে ক্ষমতা দেখাচ্ছো? ভুলে যেও না, তোমার ক্ষমতা ওই দেশ পর্যন্তই। এটা তোমার দেশ নয়।”
কিন্তু কথাগুলো যেন বাঁধনের কানেই পৌঁছাল না।তার সমস্ত মনোযোগ আটকে আছে শুধু রূপার মুখে।যেন বহুদিনের তৃষ্ণার পর আজ প্রথমবার প্রাণ ভরে তাকিয়ে আছেমুভিনের কথা শুনে ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এলো অ্যান্সি।দুই হাত বুকের ওপর ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
—-“ওই বুড়ো, বেশি নাক গলিও না।”
একটু থেমে বাঁধনের দিকে তাকিয়ে হালকা হাসল।
—-“আর এখন যাকে দেখছ, সে কোনো এসপি না। সেই পরিচয় তো অনেক আগেই শেষ।”
‘এসপি না’ কথাটা কানে যেতেই বিস্ময়ে তাকাল রূপা।চোখেমুখে স্পষ্ট প্রশ্ন।মুভিনও ভ্রু কুঁচকে বলল,
—-“মানে?”
অ্যান্সি নিশ্চিন্ত ভঙ্গিতে পাশের সোফায় গিয়ে বসল।এক পা আরেক পায়ের ওপর তুলে টেবিল থেকে একটি আপেল হাতে নিল। এক কামড় দিয়ে ধীরে ধীরে চিবোতে চিবোতে বলল,
—-“ভালোবাসা মানুষকে দিয়ে কী না করায়, ? তা আমি নিজের চোখে দেখেছি।”
আরেক কামড় দিয়ে মুচকি হাসল।
—-“এই দেশে আসতে পারছিল না চাকরির জন্য। তারপর কী করল জানো? জাস্ট কুইট। এক নিমিষে নিজের বহু কষ্টে গড়ে তোলা চাকরিটা ছেড়ে দিল।”
আপেলের টুকরোটা হাতে ঘুরিয়ে মুভিনের দিকে তাকাল।
—-“বলো তো, বুড়ো আঙ্কেল,ইথান প্রিসিয়া কতটা ভাগ্যবতী মেয়ে হলে একজন মানুষ নিজের স্বপ্নের ক্যারিয়ার ছেড়ে দিয়ে শুধু তার কাছে চলে আসে?”
চোখ জোড়া বড় বড় হয়ে গেল রূপার। স্তব্ধ চোখে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বাঁধনের দিকে তাকিয়ে রইল । চাকরি ছেড়ে দিয়েছে বাঁধন! তাও কি না ‘ইথান প্রিসিয়া’র জন্য? কিন্তু এই ইথান প্রিসিয়া আবার কে? ঘটনার এই আকস্মিকতায় রূপার মাথার ভেতর সব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে, কোনো কিছুই মাথায় ঢুকছে না তার।ঠিক তখনই, চারপাশের থমথমে পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ড্যানি নিঃশব্দে নিজের হাতের বাঁধনটা আস্তে আস্তে ঢিলে করে পুরোপুরি খুলে ফেলল। তারপর চটজলদি উঠে দাঁড়িয়ে, টেবিল থেকে ধারালো ছুরিটা তুলে নিয়ে কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই এক ঝটকায় দৌড়ে এসে রূপাকে শক্ত করে চেপে ধরল! হিমশীতল ছুরিটার ধারালো ফলা সরাসরি রূপার গলায় চেপে ধরে বাঁধনের দিকে তাকিয়ে হিংস্র গর্জন করে উঠল ড্যানি,
—-” তোদের খেলা এখানেই শেষ! যদি একে জ্যান্ত বাঁচাতে চাস, তবে আমার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবি না!”
বলেই সে রূপাকে গায়ের জোরে হিঁচড়ে দরজার দিকে টানতে টানতে নিয়ে যেতে লাগল।অ্যান্সি আর নিক্সি চরম আতঙ্কে হাত দিয়ে মুখ ঢেকে চিৎকার করে উঠল। কিন্তু সবথেকে অবিশ্বাস্য বিষয় বাঁধনের বরফশীতল চোখে-মুখে বিন্দুমাত্র আতঙ্কের ছাপ ফুটে উঠল না! সে যেন বড্ড স্বাভাবিক, যেন কিছুই ঘটেনি। অত্যন্ত ধীরপায়ে সোফায় গিয়ে বসল সে। তারপর পকেট থেকে সিলভার রঙের লাইটারটা বের করে, ঠোঁটের ফাঁকে একটা সিগারেট চেপে ধরে আগুন জ্বালালো।দূর থেকে রূপা অপলক চোখে দেখে চলেছে তার পুরুষটাকে। তাকে যে ড্যানি গলায় ধারালো ছুরি ঠেকিয়ে টেনে-হেঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে, সেদিকে রূপার কোনো খেয়ালই নেই! সে যেন সম্পূর্ণ অন্য কোনো রহস্যময় জগতে বিলীন হয়ে গেছে। বাঁধনকে এভাবে নিপুণ ভঙ্গিতে সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে দেখে রূপা বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে! সে তো কখনো দূর-দূরান্তেও বাঁধনকে একটা সিগারেট ছুঁতে দেখেনি! আজ এ কোন বদলে যাওয়া দাপুটে বাঁধনকে দেখছে সে? এ কি সত্যিই তার সেই সোজা-সাপ্টা স্বামী? নাকি সে ভীষণ কোনো দুঃস্বপ্ন দেখছে?অ্যান্সি আর সহ্য করতে না পেরে ছুটে এসে বাঁধনের সামনে দাঁড়িয়ে অস্থির গলায় বলল,
—-” বাঁধন, কিছু একটা কর! ড্যানি বুড়োটা রূপাকে নিয়ে চলে যাচ্ছে!”
বাঁধন সিগারেটের একরাশ নীলচে ধোঁয়া আকাশে উড়িয়ে অ্যান্সির দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,
—-” রিলাক্স অ্যান্সি, চলে আসবে।”
অ্যান্সি অবাক ও বিরক্ত হয়ে বলল,
—-” মানে? কী চলে আসবে?”
বাঁধন ঠোঁটের কোণে হালকা হাসির রেখা টেনে ধীরস্বরে বলল,
—-” ওয়েট কর।”
কথাটা বলেই আবার নিশ্চুপ হয়ে গেল।অ্যান্সি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।কিছুতেই বুঝতে পারছে না এমন পরিস্থিতিতেও বাঁধন এতটা শান্ত থাকে কীভাবে।অন্য দিকে ড্যানি রূপাকে নিয়ে দরজার কাছে আসতেই হঠাৎ কোথা থেকে এক ঝাঁক কালো ভয়ংকর ডবারম্যান কুকুর এসে ড্যানির পথ আটকে দাঁড়াল! এতগুলো হিংস্র কুকুর একসঙ্গে সামনে দেখে ড্যানি ভয়ে একবারে জমে বরফ হয়ে গেল। কুকুরগুলো লাল লাল চোখে ড্যানির দিকে জিভ বের করে হাঁ করে তাকিয়ে আছে যেন কোনো লোভনীয় শিকার পেয়েছে তারা!ড্যানি কুকুরগুলোকে তাড়াতে মুখ দিয়ে ভয় দেখানোর চেষ্টা করল, কিন্তু তারা তো নড়লই না, উল্টো আরও ভয়ংকর গর্জন তুলে ড্যানিকে কামড়ে দিতে এক পা এগিয়ে এল! ড্যানি নিজের প্রাণভয়ে রূপাকে এক ঝটকায় ছেড়ে দিয়ে উল্টো দৌড়ে ঘরের ভেতরে চলে এল। তার পেছন পেছন সবকটা কুকুরও ঘেউ ঘেউ করতে করতে তাড়া করল তাকে! ড্যানি ঘরের চারপাশে পাগলের মতো দৌড়াতে লাগল আর প্রাণপণে চিৎকার করতে লাগল,
—-” কেউ বাঁচাও আমায়! প্লিজ বাঁচাও!”
এই হাস্যকর দৃশ্য দেখে অ্যান্সি আর নিক্সি আর নিজেকে ধরে রাখতে না পেরে খিলখিল করে হেসে উঠল!সোফায় বসে থাকা বাঁধন ধোঁয়ার রিং ছেড়ে সামনে বসে থাকা মুভিনের দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা কণ্ঠে বলল,
—-” তোর বিখ্যাত মাল!”
মুভিন অবিশ্বাসে চোখ বড় বড় করে দেখছে এই দৃশ্য! যে পুরো কানাডা শহর এই ড্যানির নাম শুনলে ভয়ে কাঁপত, আর সেই মাফিয়া ড্যানি কি না কুকুরের ভয়ে বাচ্চার মতো চিৎকার করে চারপাশে ছুটছে!রূপা ধীরপায়ে হেঁটে ঘরের ভেতরে এসে এক কোণে দাঁড়াল।ঠিক তখনই ড্যানি হাঁপাতে হাঁপাতে একদম নিুপায় হয়ে দৌড়ে এসে সোফায় বসে থাকা বাঁধনের পায়ের কাছে আছড়ে পড়ল! বাঁধনের পায়ের কাছে মাথা নত করে কাকুতি-মিনতি করে বলল,
—-” আমাকে মাফ করে দিন! আমার বড় ভুল হয়ে গেছে দয়া করে তাড়ান ওই কুকুরগুলোকে!”
বাঁধনের ঠোঁটের কোণে এক নিষ্ঠুর, বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। কুকুরগুলো যখনই রক্তচক্ষু নিয়ে ড্যানিকে কামড়ে দিতে একদম গায়ের ওপর এসে পড়ল, ঠিক তখনই গম্ভীর কণ্ঠে কমান্ড দিল বাঁধন,
—-” স্টপ! গো ব্যাক টু ইউর প্লেসেস!”
আশ্চর্যের বিষয়, আদেশ পাওয়া মাত্রই কুকুরগুলো সাথে সাথে থমকে দাঁড়িয়ে গেল! মুহূর্তের মধ্যে অনুগত পশুর মতো ঘুরে আবার দরজার বাইরে দৌড়ে বের হয়ে গেল তারা।বাঁধন এবার নিচে ঝুঁকে এক হাতে ড্যানির মাথার চুল শক্ত করে খামচে ধরে তার মুখটা সোজা করে ওপরে তুলল। তারপর চোখে শীতলতা নিয়ে বলল,
—-” তুই বিখ্যাত না, তুই হচ্ছিস এই দেশের আবর্জনা! আর তোর মতো আবর্জনা দুর্গন্ধ ছড়ায় বেশি। আমি আবার বেশি দুর্গন্ধ সহ্য করতে পারি না, তোর শরীরের দুর্গন্ধ তো আমি আরও সহ্য করতে পারছি না! কী করি বল তো?”
একটু ভেবে, ঠোঁট বাঁকিয়ে আবার বলল,
—-” আইডিয়া! তোকে বরং পরপারে পাঠিয়ে দিই? ওখানে গিয়ে সারাজীবন শান্তিতে গিয়ে ঘুমাস!”
ড্যানি শিউরে উঠে ভয়ে সাথে সাথে বাঁধনের পা দুটো জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠল,
—-” আমাকে মারবেন না, প্লিজ! আমার ভুল হয়ে গেছে! আমি আর কখনো কোনো খারাপ কাজ করব না, ভালো হয়ে যাব, প্লিজ!”
বাঁধন এক চরম বিরক্তি আর ঘৃণায় মুখ কুঁচকে বলল,
—-” ডিসগাস্টিং! এই বা’লটাকে আমার সামনে থেকে সরা তো!”
সাথে সাথে দুজন গার্ড এসে পশুর মতো টেনে হিঁচড়ে ড্যানিকে তুলে ধরল। বাঁধন অলসভাবে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে শুধু একটি হাত বাড়াল। গম্ভীর গলায় উচ্চারণ করল,
—-” গান।”
তৎক্ষণাৎ একজন গার্ড নিপুণ ভঙ্গিতে একটা ভারী সিলভার রিভলবার তুলে দিল বাঁধনের প্রসারিত হাতের তালুতে। বাঁধন রিভলবারটা হাতে নিয়ে এক নজর ঘুরিয়ে দেখে চেম্বারটা সেট করল। তারপর চোখের পলকে সরাসরি রিভলবারটা তাক করল ড্যানির কপাল বরাবর!ড্যানি ভয়ে চিৎকার করে আর্তনাদ করে উঠল,
—-” আমাকে মারবেন না, প্লিজ! আমি হাত জোড় করছি!”
বাঁধন মৃদু হেসে ঠান্ডা চোখে ড্যানির দিকে তাকিয়ে বলল,
—-” তোকে বাঁচিয়ে রাখা যাবে না ড্যানি।তোকে বাঁচিয়ে রাখলে আবার তুই আমার কলিজায় হাত দিবি!”
ড্যানি বাঁচাল আকুতিতে আবার কিছু একটা বলতে চাইল, কিন্তু তার আগেই বাঁধন তার দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে শেষবারের মতো বাঁকা হাসি ফুটিয়ে দুটো শব্দ উচ্চারণ করল।
—-” হ্যাপি জার্নি!”
ঠাসস! ঠাসস!
মুহূর্তেই নীরবতা ভেঙে প্রতিধ্বনিত হলো গুলির শব্দ।দুটো তাজা বুলেট সরাসরি কপাল ভেদ করে ড্যানির মাথার পেছনে চলে গেল! মুহূর্তের মধ্যে তার শরীরটা ধনুকের মতো বেঁকে গিয়ে ধপাস করে নিথর হয়ে ফ্লোরে আছড়ে পড়ল। চোখের পলকে রক্তে ভেসে গেল চারপাশ। এই কানাডা শহরের সবথেকে কুখ্যাত আর পাপী লোকটাকে এক নিমিষে ধ্বংস করে দিল বাঁধন! যাকে ধ্বংস করা তো দূরের কথা, যার নাম শুনলেই গোটা শহর ভয়ে কাঁপত, সেই শক্তিশালী মাফিয়া ড্যানির অধ্যায়ের মাত্র এক সেকেন্ডে ইতি ঘটিয়ে দিল স্বয়ং জাওয়াদ অধীর বাঁধন!শোচনীয় এই দৃশ্য দেখে দু’হাতে কান চেপে ধরে আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল রূপা! চোখের সামনে রক্তাক্ত, নিস্পন্দ অবস্থায় পড়ে আছে ড্যানি! বাঁধন নিজের হাতে সরাসরি গুলিটা চালিয়ে দিল? রূপার সারা শরীর থরথর করে কাঁপতে লাগল। সে অবিশ্বাসে, থমকে যাওয়া চোখে তাকাল বাঁধনের দিকে। বাঁধনের এই রক্ত হিম করা হিংস্র রূপ দেখে রূপার বুকের ভেতরটা হঠাৎ হাহাকার করে কেঁপে উঠল যেন এতদিনের চেনা, আদরের মানুষটা এক মুহূর্তের মধ্যে একদম অচেনা এক দানব হয়ে গেছে! রূপার চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এলো, চারপাশের সবকিছু বনবন করে ঘুরে উঠল। পুরো শরীরটা নিস্তেজ হয়ে ধীরে ধীরে মেঝেতে ঢলে পড়তে লাগল সে।ঠিক তখনই বিদ্যুতের মতো ছুটে এলো বাঁধন! এক মুহূর্ত দেরি না করে আলতো কিন্তু দৃঢ় হাতে রূপাকে জড়িয়ে ধরে ফেলল যেন একটুখানি নিচে পড়ে গেলেই কাঁচের পুতুলের মতো ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে সে! ধপ করে দু’জনেই ফ্লোরে বসে পড়ল।
চারপাশে তখন এক অদ্ভুত, থমথমে নিস্তব্ধতা শুধু দু’জনের দ্রুত চলা ঘন নিঃশ্বাসের শব্দ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। বাঁধন খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরল রূপাকে, এতটাই শক্ত যে তাকে চিরতরে হারানোর ভয়টা এখনো তার বুকের ভেতর আছড়ে পড়ছে। সে রূপার মাথাটা নিজের চওড়া বুকে টেনে চেপে ধরল, তারপর তার কপালে ধীরে, মায়াময় একটা ভারী চুমু আঁকল।চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করল বাঁধন। রূপাকে নিজের বুকের ভেতর মিশিয়ে নিয়ে এক দীর্ঘ, নিঃশব্দ ও গভীর নিশ্বাস টেনে নিল যেন এতদিন ধরে জমে থাকা সমস্ত ঝড়, আতঙ্ক আর অস্থিরতা এক নিমিষে ফুসফুস থেকে বের করে দিতে চাইছে সে!তারপর এক বুক হালকা হয়ে, একদম নিচু ও ভারী কণ্ঠে ফিসফিসিয়ে বলে উঠল,
—-” উফফ… শান্তি!”
সময় যেন থমকে গেছে, চারপাশের পুরো পৃথিবীটাই যেন স্তব্ধ হয়ে এক জায়গায় আটকে গেছে। কোলজুড়ে থাকা রূপসী রমণীকে কতক্ষণ ধরে এভাবে ব্যাকুল হয়ে জড়িয়ে ধরে রেখেছে, সে খেয়াল যেন বাঁধনের একেবারেই নেই।ঠিক তখনই এক গার্ড ইতস্তত করে বলে উঠল।
—-” স্যার, মুভিন…।”
কথাটা পুরোপুরি শেষ করার আগেই গর্জে উঠল বাঁধন! চাবুকের মতো বরফশীতল কণ্ঠে শাসিয়ে বলল,
—-” হুশশশ! একদম চুপ!”

গার্ডটি সাথে সাথে রক্তহিম হয়ে থমকে গেল এবং নিজের জায়গায় চুপচাপ গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।নিজের ভালোবাসার রমণীকে ফিরে পেয়ে পুরুষটি যেন সত্যি পাগল হয়ে গেছে! বুকের ভেতরের সমস্ত আকুলতা দিয়ে অত্যন্ত শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে এই অবচেতন হয়ে থাকা রূপসীকে। যেন কত শত দিন কত নির্মমভাবে ছটফট করেছে সে এই মেয়েটাকে একটিবার নিজের চোখে দেখার জন্য! কত দীর্ঘ রাত তার বুকের ভেতর হাহাকার করে চিৎকার করেছে! আর আজ সেই প্রাণের মানসীকে বুকের মাঝে ফিরে পেয়ে পুরুষটি তাকে ছেড়ে দিতেই ভুলে গেছে যেন হাত একটুখানি শিথিল হলেই সে আবার কোনো এক অজানা অচিন দেশে হারিয়ে যাবে!দূরে দাঁড়িয়ে অ্যান্সি আর নিক্সি মুগ্ধ চোখে দৃশ্যটা দেখছে। দুজনের ঠোঁটের কোণেই ফুটে উঠেছে মায়াময় মিষ্টি হাসি। তারা তো খুব ভালো করেই জানে এই একটা মাত্র মেয়ের জন্য বাঁধন কতটা ছটফট করেছে, কতটা নরক যন্ত্রণা নীরবে সহ্য করে এসেছে।

রাতের কানাডা শহর যেন কোনো নিপুণ শিল্পীর ক্যানভাসে আঁকা এক মায়াবী আলো-আঁধারির কাব্য। উপর থেকে তাকালে মনে হয়, নিঝুম মাটির ওপর কোটি কোটি রূপালী ও সোনালী নক্ষত্র একজোটে নেমে এসেছে।
শহরের আঁকাবাঁকা ও প্রশস্ত রাস্তাগুলো কুয়াশার পাতলা চাদরে ঢাকা। সেই ভেজা রাজপথের বুক চিরে চলে যাওয়া সোডিয়াম আর নিয়ন বাতিগুলোর আলো পিচঢালা রাস্তায় এক অদ্ভুত, চকচকে বিচ্ছুরণ তৈরি করে। উঁচু উঁচু কাঁচের তৈরি আকাশচুম্বী স্কাইস্ক্র্যাপারগুলো রাতের আঁধার ভেদ করে দাঁড়িয়ে আছে সগৌরবে। সেগুলোর প্রতিটি জানালায় জ্বলতে থাকা ছোট্ট ছোট আলো যেন শহরের জেগে থাকার গল্প বলে।
শহরের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া শান্ত নদী বা লেকের পানিতে উঁচু অট্টালিকাগুলোর রঙিন আলোর প্রতিফলন এক মায়াবী জলছবি এঁকে দেয়। হাওয়ায় ভেসে আসে হিমশীতল এক স্নিগ্ধ বাতাস, যা গায়ে লাগলেই এক অচেনা প্রশান্তি ছড়িয়ে পড়ে। মাঝরাতে চারপাশ যখন নিস্তব্ধ হয়ে আসে, তখন নিওনের রঙিন আলো, হালকা কুয়াশা আর ঠাণ্ডা বাতাসের এই অপূর্ব ককটেল পুরো শহরটাকে বানিয়ে তোলে এক মোহনীয়, রহস্যময় আর শান্ত সৌন্দর্যের স্বর্গরাজ্য।
ধীরে ধীরে রূপার আবার জ্ঞান ফিরল। চোখের ভারী পাতা দুটো মেলে তাকাতেই সে নিজেকে আবিষ্কার করল সেই নিস্তব্ধ, সুসজ্জিত রুমের নরম বিছানায়।পাশে তাকাতেই দেখতে পেল ফেন্সি ইয়ারা পরম মমতায় বসে আছেন। তারপর তার চোখ গেল রুমের এক কোণে থাকা সোফাটার দিকে। সোফায় বসে আছে অ্যান্সি, নিক্সি, ওমর, জেইন আর আকাশ। মানে আকাশও এসেছে!রূপাকে চোখ খুলতে দেখে ফেন্সি ইয়ারা স্নেহের হাসিতে আকুল হয়ে বলে উঠলেন,
—-” এখন কেমন লাগছে, দিদিভাই?”
কথাটা শুনেই রুমের সবাই একযোগে রূপার দিকে তাকাল। রূপার অবশেষে জ্ঞান ফিরেছে দেখে ওমর স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তারপর নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল,
—-” ফাইনালি জ্ঞান ফিরেছে তাহলে! উফফ বাবা, এতক্ষণ টেনশনে আমি তো শেষ! আমি বাবা আসি এখন।”
বলেই ওমর দ্রুত রুম থেকে বেরিয়ে গেল। তার দেখাদেখি আকাশ আর জেইনও ধীরপায়ে ঘর ছেড়ে চলে গেল।রূপা অত্যন্ত অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল এই বয়স্ক বিদেশি ফেন্সি ইয়ারা নামের মহিলাটার দিকে। প্রবীণ এই মহিলাকে দেখে সত্যিই যেন মনের ভেতর এক অদ্ভুত, অচেনা টানের সৃষ্টি হয়। মনে হয়, সত্যি সত্যিই তিনি রূপার খুব আপন কেউ! সে আস্তে করে মহিলার মুখের দিকে তাকিয়ে আকুল কণ্ঠে শুধাল,
—-” আপনি কে? আপনাকে দেখে আমার কেন এমন মনে হচ্ছে, যেন আপনি আমার খুব কাছের কেউ?”
ফেন্সি ইয়ারা মায়াময় হেসে পরম স্নেহে রূপার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,
—-” কারণ রক্তের টান জিনিসটাই এমন, রে দিদিভাই! মানুষ মানুষকে যতই দূরে রাখুক না কেন, রক্তে রক্তে যখন দেখা হয়, তখন কাছের মানুষ বলে অনুভূতি হতে বাধ্য যেমনটা এখন তোর হচ্ছে। তুই তো আমাদেরই রক্ত, রে বোন!”
বিস্ময়ে চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল রূপার, মুখটা হা হয়ে রইল! সে কীভাবে এদের রক্তের মানুষ হতে পারে? সে তো পুরোদস্তুর একজন বাংলাদেশি মেয়ে! তাহলে এই অচেনা বিদেশি মানুষদের রক্তের সাথে তার সম্পর্ক কীভাবে সম্ভব?
ঠিক তখনই নিক্সি এসে বিছানার এক পাশে গা এলিয়ে বসল। এক হাত কোমরে দিয়ে ক্লান্ত ভঙ্গিতে বলল,
—-” তোমার তাহলে অবশেষে জ্ঞান ফিরল? ওফ, এখানে একভাবে বসে থাকতে থাকতে তো আমার কোমরটাই শেষ হয়ে গিয়েছিল!”
রূপা বিভ্রান্ত হয়ে বলল,
—-” কেন, আপু?”
অ্যান্সিও এগিয়ে এসে বিছানায় রূপার গা-ঘেঁষে বসল। তারপর মুচকি হেসে বলল,
—-” আর বলো না! ডাক্তার এসেছিল তোমাকে দেখে পরীক্ষা করে জানিয়েছে যেকোনো সময় তোমার জ্ঞান ফিরবে। তাই তুমি চোখ মেলা না পর্যন্ত বাঁধন আমাদের সবাইকে হুকুম দিয়ে তোমার এই রুমেই বসিয়ে রেখেছিল”
‘বাঁধন’ নামটা কানে যেতেই রূপার স্মৃতির ঝাঁপি যেন এক লহমায় খুলে গেল! ড্যানির করুণ পরিণতি, বুলেটের বিকট শব্দ আর সেই হিংস্র দৃশ্য—সব একে একে মনে পড়ে গেল তার। কিন্তু বাঁধন হঠাৎ কেন এমন রক্তহিম করা মাফিয়া রূপ ধারণ করল, তার কিছুই মাথা-মুণ্ডু বুঝতে পারছে না রূপা। সে অ্যান্সির দিকে ব্যাকুল দৃষ্টিতে তাকিয়ে আকুল কণ্ঠে বলল,
—-” উনি এখন কোথায়?”
নিক্সি বিছানায় হেলে পড়ে হাত থেকে ফোনটা নাড়াচাড়া করতে করতে অলস গলায় বলল,

—-” বাইরে সুইমিংপুলের সামনে ব্যায়াম করছে।”

রাতের নিঝুম অন্ধকারে সুইমিংপুলের তলার নীলচে আলোগুলো যেন এক মায়াবী জলছবি এঁকে দিয়েছে। নীল মণির মতো চমকাতে থাকা সেই পানির ঠিক ধারেই, শক্ত মার্বেলের ফ্লোরে একছন্দে, বিরামহীনভাবে পুশআপ দিয়ে চলেছে বাঁধন। ঘামে ধুয়ে-মুছে শরীর ভিজে একাকার হয়ে গেছে, কিন্তু থামার কোনো নামগন্ধ নেই! পেশিগুলো টানটান হয়ে উঠছে প্রতিটি উঠানামার সাথে।ইদানীং এটা বাঁধনের এক কঠিন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে গভীর রাতে আর একদম ভোরে শরীরকে এভাবে নিংড়ে নেওয়া। এতে বুকের ভেতরের অশান্ত আগ্নেয়গিরিটা যেন কিছুটা হলেও ঠান্ডা থাকে। তার পরনে একটা কালো ফিটেড স্পোর্টস টি-শার্ট আর ডার্ক রানিং শর্টস। ফর্সা, চওড়া শরীরটা ঘামের বিন্দুতে চিকচিক করছে, যার ফলে গায়ের কুচকুচে কালো ট্যাটুগুলো যেন আরও হিংস্র ও তপ্ত হয়ে উঠেছে! কপালে ভেজা চুলগুলো লেপ্টে আছে, শরীরের প্রতিটি খাঁজে তাকে এখন মারাত্মক রকমের বিপজ্জনক ও প্রলয়ংকরী আকর্ষণীয় লাগছে!ঠিক তখনই ওমর, জেইন আর আকাশ ধীরপায়ে হেঁটে এসে বাঁধনের সামনে দাঁড়াল। পাশে রাখা বেতের চেয়ারগুলো দেখে তিনজনেই গা এলিয়ে বসে পড়ল। জেইন ঠোঁটের কোণে হাল্কা দুষ্টু হাসি এনে বলল,
—-” বাঁধন, তোর জানের জ্ঞান ফিরেছে রে!”
মুহূর্তের মধ্যে পুশআপ দেওয়া থামিয়ে দিল বাঁধন! থমকে গেল তার প্রতিটি পেশি। হাঁপাতে হাঁপাতে এক ঝটকায় ফ্লোর থেকে সোজা হয়ে উঠে দাঁড়াল । একদম নিস্তব্ধ, বরফশীতল পায়ে এসে দাঁড়াল জেইনের ঠিক সামনে। তারপর জেইন কিছু বুঝে ওঠার কিংবা নিজেকে সামলে নেওয়ার এক সেকেন্ড আগেই চেয়ারসহ জেইনকে শূন্যে তুলে ফেলল সে!
জেইন আতঙ্কে চিৎকার করে কিছু একটা বলতে যাবে, কিন্তু তার আগেই বাঁধন চরম আক্রোশে এক ধাক্কায় জেইনকে সোজা সুইমিংপুলের মাঝখানে ছুড়ে মারল!
ছপাৎ, একটি বিকট শব্দে রাতের নিস্তব্ধতা চুরমার হয়ে গেল! জেইন গিয়ে পড়ল বরফের মতো হিমশীতল পানিতে। হাবুডুবু খেয়ে, মুখ থেকে পানি ছিটিয়ে ওপরে উঠে বাঁধনের দিকে আড়ষ্ট চোখে তাকাল জেইন,
—-” এটা কী করলি তুই? আমাকে অকারণে এভাবে পানিতে কেন ছুড়ে ফেললি?”
বাঁধন এক হাত কোমরে রেখে, অন্য হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে কপাল থেকে গড়িয়ে পড়া ঘাম মুছতে মুছতে চোখ দুটো ছোট ছোট করে বলল,
—-” ‘জান’ শব্দটা শুধু আমার মুখে শোভা পায়! আমি ওকে ‘জান’ বলব। তুই কোন সাহসে ওকে ‘জান’ বললি,? এখনই ওই পানিতে কান ধরে দণ্ডায়মান হ!”
বাঁধনের এমন উগ্র ও পাগলটে অধিকারবোধ দেখে পাশে বসে থাকা ওমর আর আকাশ নিজেদের আর ধরে রাখতে পারল না, হো হো করে হেসে উঠল!জেইন যেন মহাকাশ থেকে পড়ল! চোখ দুটো গোল গোল করে, হাঁ হয়ে অবিশ্বাসের সুরে বলল,
—-” সিরিয়াসলি? আমি কোথায় ওকে ‘জান’ বললাম? আমি তো বললাম ‘তোর জানের’ জ্ঞান ফিরেছে!”
মেঝেতে রাখা ঠান্ডা পানির বোতলটা এক টানে কুড়িয়ে তুলে নিল বাঁধন। ক্যাপটা মোচড় দিয়ে খুলতে খুলতে রগচটা গলায় বলল,
—-” ‘জান’ শব্দটা তোর মুখ থেকে বেরই বা হবে কেন, ইডিয়ট? ‘জান’ শব্দটা শুধুই আমার পেটেন্ট করা! তুই বলবি ‘ভাবি’! তুই কেন ‘জান’ বলবি?তুই কি সোজা বাংলায় বলতে পারতি না যে বাঁধন, ভাবির জ্ঞান ফিরেছে’? মা’দারচো’দ, এখনই কান ধর! নয়তো ওই রক্তখেকো কুকুরগুলোকে এখনই তোর সাথে সাঁতার কাটতে পানিতে নামিয়ে দেব।”
জেইন ভয়ে আর এক সেকেন্ডও দেরি না করে পানির মধ্যেই দুই হাত দিয়ে সোজা কান ধরে ফেলল! বাঁকা চোখে তাকাল বাঁধনের দিকে, কিন্তু টু শব্দ করার সাহস পেল না।বাঁধন পানির বোতলটা মুখে ঢেলে ঢকঢক করে গিলে খেতে লাগল।ঠিক তখনই বিশাল বাড়িটির ভারী কাঠের দরজা ঠেলে বাইরে বের হয়ে এলো রূপা। নীলচে মায়াবী আলোয় চারপাশের পরিবেশটা দেখে মুগ্ধতায় তার চোখ জোড়া আটকে গেল! এটা কোনো সাধারণ বাড়ি নয়, যেন রাজকীয় কোনো রাজপ্রাসাদ! এত সুন্দর, দৃষ্টিনন্দন বাড়ি সে জীবনে কখনো দেখেছে কি না তার জানা নেই। কিন্তু মনের অজান্তেই প্রশ্ন জাগল এই প্রাসাদসম বাড়িটা আসলে কার?তার এই গভীর ভাবনার মাঝেই নজর গেল চারপাশের বিস্তৃত আঙিনার দিকে। থরে থরে সাজানো শক্তিশালী সশস্ত্র গার্ডরা ঘাড় সোজা করে একদম সতর্ক ভঙ্গিতে পাহারা দিচ্ছে। একটি ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রাসাদে যে এত এত পেশাদার গার্ড থাকতে পারে, তা রূপার একদমই কল্পনার বাইরে ছিল!
হঠাৎ ঘুরতে ঘুরতে রূপার থমকে যাওয়া নজর গিয়ে পৌঁছাল আলোঝলমলে সুইমিংপুলের ঠিক ধারে। বাঁধন একমনে বোতল থেকে পানি খাচ্ছে দৃশ্যটা দেখা মাত্রই মুহূর্তের মধ্যে রূপার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল! আর তার ঠিক পরপরই চোখ চলে গেল কনকনে ঠান্ডা সুইমিংপুলের স্ফটিক পানিতে।সেখানে একদম প্যাঁচার মতো করুণ মুখ বানিয়ে, ঠান্ডা পানিতে কাঁপতে কাঁপতে কান ধরে দাঁড়িয়ে আছে জেইন! অবেলায়, এই মাঝরাতে জেইনকে সুইমিংপুলের জমে যাওয়া পানিতে এভাবে অসহায় অবস্থায় কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রূপার ভীষণ হাসি পেয়ে গেল!সে দুই ঠোঁট শক্ত করে চেপে ধরে, ভেতরের ফিনফিনে হাসিটা কষ্ট করে আটকে রেখে ধীরপায়ে হেঁটে বাঁধনদের কাছাকাছি চলে এলো।রূপাকে কাছে আসতে দেখেই জেইন একগাল কাঁদো কাঁদো মুখ করে, অবুঝ বাচ্চার মতো সুরে কাকুতি-মিনতি করে ডেকে উঠল,
—-” ও ভাবি গো, বাঁচাও আমায়! এই বরফশীতল পানিতে আর কিছুক্ষণ এভাবে দাঁড়িয়ে থাকলে আমি নিশ্চিত নিউমোনিয়া হয়ে মরেই যাব!”
জেইনের ব্যাকুল কথা শুনে পানি খাওয়া থামাল বাঁধন। ঘাড় সামান্য বাকিয়ে আড়চোখে তাকাল রূপার দিকে। রূপা বিস্ময় নিয়ে জেইনের দিকে তাকিয়ে শুধাল,
—-” কী হয়েছে, ভাইয়া? আপনি এভাবে পানিতে কেন?”
পাশে বসে থাকা ওমর হাসতে হাসতে পেট চেপে ধরে বলল,
—-” এ শালা তোমাকে ‘জান’ বলছে দেখে বাঁধন পানিতে ফেলে এভাবে কান ধরিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখছে!”
কথাটা শুনে চরম বিস্ময় নিয়ে বাঁধনের দিকে তাকাল রূপা। এই লোকটা কি পুরোপুরি সাইকো হয়ে গেছে? একটা সামান্য শব্দের জন্য এমন শাস্তি!বাঁধন পানির বোতলটা পাশে রেখে, ভ্রু জোড়া সামান্য নাচিয়ে খোঁচা মেরে বলল,
—-” এভাবে কী দেখছিস? একদম গিলে খেয়ে ফেলবি নাকি? নিজেকে কি একটু লবণ-মরিচ দিয়ে মেখে মাখিয়ে নিয়ে আসব, যাতে খেতে তোর সুবিধা হয়?”
এমন হুট করে সামনাসামনি নির্লজ্জ কথা শুনে এক মুহূর্তের জন্য একদম থমকে গেল রূপা! লজ্জায় আর অস্বস্তিতে মুখ লাল হয়ে উঠল তার। সে এক লহমায় মাথা নিচু করে নিজেকে সামলে নিয়ে ধীরস্বরে বলল,
—-” জেইন ভাইয়াকে উঠতে বলুন। আমার আপনার সাথে কিছু জরুরি কথা আছে।”
বাঁধন একটা লম্বা নিশ্বাস টানল। তারপর সুইমিংপুলের পানিতে থাকা জেইনের দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় ওপরে উঠে আসার সংকেত দিল। জেইন যেন হাতে চাঁদ পেল! আর এক সেকেন্ডও দেরি না করে সাথে সাথে পানি থেকে উঠে পড়ল সে। হিমশীতল পানিতে ভিজে সারা শরীর তার থরথর করে কাঁপছে। সে দ্রুত গা মুছতে মুছতে নিজের রুমের দিকে দৌড় দিল।আকাশ হালকা হেসে রূপা আর বাঁধনের দিকে তাকিয়ে বলল,
—-” আমরা তা হলে ভেতরে যাই? তোরা দুজন কথা বল।”
বলেই আকাশ আর ওমরও ধীরপায়ে বাড়ির ভেতরে চলে গেল।মুহূর্তের মধ্যে চারপাশ আবার নিস্তব্ধ হয়ে এলো। চেয়ারের ওপর শরীরটা আলতো করে এলিয়ে দিয়ে বসল বাঁধন। রূপার মায়াবী চোখের দিকে নিজের গাঢ় দৃষ্টি সোজা গেঁথে দিয়ে বরফশীতল মিহি কণ্ঠে বলল,
—-” প্রশ্ন শুরু করুন। যা যা প্রশ্নের বিশাল তালিকা নিয়ে এসেছেন আমার কাছে, ঝটপট এক এক করে ছুড়ে দিন।”
অবিশ্বাসে চোখ দুটো আরও বড় বড় হয়ে গেল রূপার। লোকটা কত সহজে বুঝে গেল যে সে মনে মনে একগাদা প্রশ্ন জমিয়ে নিয়ে এসেছে! রূপা আর এক মুহূর্তও দেরি করল না, সোজা বাঁধনের চোখের দিকে তাকিয়ে বুক কাঁপানো গলায় প্রশ্ন করল,
—-” ইথান প্রিসিয়া কে?”
চেয়ারের হাতলে অলস ভঙ্গিতে হাতের আঙুলগুলো ঠকঠক করে নাচাতে নাচাতে হালকা সুরে বলল বাঁধন,
—-” আমার বউ।”
এক নিমিষে রূপার বুকের ভেতরটা যেন কেউ নিংড়ে মুচড়ে দিল! ইথান প্রিসিয়া তার বউ মানে? তাহলে সে কে? লোকটা কি এতদিনে আবার নতুন কাউকে জীবনসঙ্গী করে নিল? ভাবতেই রূপার কলিজাটা যেন ছিঁড়ে ফেটে আসার মতো এক অসহ্য যন্ত্রণার অনুভূতি শুরু হলো। নোনা জলে চোখ দুটো এক লহমায় টলমল করে উঠল। কাঁপতে থাকা ঠোঁট জোড়া কোনোমতে সামলে কাঁপা গলায় শুধাল,
—-” তাহলে আমি কে?”
বাঁধন খুব নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,
—-” কী জানি ! আমার বউয়ের নাম তো রূপা না, আমার বউয়ের নাম ইথান প্রিসিয়া।”
রূপা নিজের নিচের ঠোঁটটা শক্ত করে দাঁত দিয়ে চেপে ধরে ধেয়ে আসা কান্নাটা আটকে রাখার বোকামি চেষ্টা করল। তারপর কান্নাভেজা কণ্ঠে বলে উঠল,
—-” মিথ্যা বলছেন আমার সাথে! ঠাট্টা করছেন, তাই না?”
বাঁধন চোখ ছোট ছোট করে তড়পিয়ে বলল,
—-” ওই মাফিয়ার বাচ্চা তোর সাথে মজা করে কি আমি কোনো পয়সা পাব যে তোর সাথে ফালতু মজা করতে যাব? এক মিনিট দাঁড়া দেখাচ্ছি তোকে। আমার বউ শুধু যে আমার মনেই থাকে তা নয়, আমার শরীরেও সে জড়িয়ে থাকে।”
বলেই বাঁধন দাঁড়িয়ে পরলো। তারপর এক ঝটকায় তার গায়ে ঘামে ভেজা টি-শার্টটা খুলে ছুড়ে ফেলল!লজ্জায় আর আচমকা অশ্বস্তিতে এক লহমায় চোখ জোড়া শক্ত করে বন্ধ করে ফেলল রূপা! লোকটা হুট করে গায়ের টি-শার্ট খুলতে গেল কেন? সে মনে মনে অস্থির হয়ে ওঠার আগেই বাঁধনের রূঢ় কণ্ঠ ভেসে এল,
—-” রোমান্স করার জন্য টি-শার্ট খুলিনি, চোখ খোল !”
রূপা থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে ধীরপায়ে আধা-বোজা চোখ দুটো খুলল। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বাঁধনের উন্মুক্ত চওড়া বুকের দিকে তাকাতেই যেন তার পায়ের তলা থেকে এক লহমায় পুরো মাটি সরে গেল!উন্মুক্ত বুকে দাঁড়িয়ে আছে বাঁধন। তার ছাতি বাঁ পাশে, একদম বুকের ভেতরের হৎপিণ্ডের ঠিক ওপরে অত্যন্ত নিখুঁত ও গাঢ় অক্ষরে ট্যাটু করে লেখা,
—– প্রিসিয়া—-
বাঁধনের নিজের বুকে রক্ত দিয়ে যেন অন্য এক নারীর নাম খোদাই করা! তার মানে এই প্রিসিয়া নামের মেয়েটার সাথেই বাঁধনের সম্পর্ক সত্যি? নিজের প্রাণের পুরুষ, একমাত্র ভালোবাসার মানুষটার বুকে অন্য কোনো নারীর নাম খোদাই করা দেখে রূপা আর কোনোভাবেই নিজেকে সামলাতে পারল না! তার বুকের ভেতরটা এক নিমিষে চুরমার হয়ে ভেসে গেল নোনা জলে, ব্যাকুল হয়ে ডুকরে কেঁদে উঠল সে।
এক মুহূর্তে নিজের সমস্ত হুশ-জ্ঞান হারিয়ে উন্মাদের মতো বাঁধনের একদম সামনে ছুটে এলো রূপা। যেখানে বাঁধনের বুকের বাঁ পাশে ওই ‘প্রিসিয়া’ নামটা লেখা, ঠিক সেখানে নিজের দুটো ছোট ছোট হাত দিয়ে একের পর এক কিল-ঘুষি মারতে মারতে তীব্র কান্নায় চিৎকার করে উঠল,
—-” ব্যাড পুরুষ! তুই একটা ভীষণ ব্যাড পুরুষ!”
রূপার ছোট্ট দুটো হাতের পাগলাটে মারগুলোকে বাঁধনের কাছে মনে হচ্ছে যেন বডি মাসাজ! সারাদিনের ক্লান্তি আর ব্যায়ামের পর শরীরটা যেন কেউ পরম যত্নে একটু হালকা করে দিচ্ছে। রূপার উন্মাদের মতো কাণ্ড আর অবুঝের মতো ক্ষোভের কথাগুলো শুনে বাঁধন নিজের ঠোঁট দুটো শক্ত করে চেপে ধরে ভেতরের উদ্দাম হাসিটা কোনোমতে চেপে রাখল।রূপা আরও ব্যাকুল হয়ে কাঁদতে কাঁদতে, বাঁধনের শক্ত বুকে এলোপাথাড়ি আঘাত করতে করতে আবারো বলে উঠল,
—-” কেন এমন করলি তুই আমার সাথে? ছেড়েই যখন দিবি, অন্য কাউকে বুকে বসাবি তবে আমাকে কেন বিয়ে করেছিলি, বল? ব্যাড পুরুষ, তোকে একদম খুন করে ফেলব আমি! দাঁড়া, আগে তোকে নয়, আগে খুঁজে বের করে মারব তোর ওই প্রিসিয়াকে! তারপর এসে তোকে খুন করব!”
চলবে…!
[সাপোর্ট করিও বাচ্চারা,তোমরা বেশি বেশি সাপোর্ট করলেই তো গল্পটা আমি তাড়াতাড়ি দেয়,বুঝ না কেন৷ অবঝ নাকি তোমরা
] See less

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply