Golpo romantic golpo বাঁধন রূপের অধিকারী

বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ২০


#বাঁধন_রূপের_অধিকারী

#লেখিকা_সুমি_চৌধুরী [২০]

[•••অনুমতি কপি করা নিষিদ্ধ•••]

ইশতিয়াকের হনহনিয়ে এগিয়ে যাওয়া পা দুটো মাঝপথেই আচমকা থমকে গেল। সে তীব্র এক জড়তা আর অবিশ্বাস নিয়ে ঘাড় বাঁকিয়ে তার নিজের জন্মদাত্রী মায়ের দিকে তাকাল। তার মা বিলকিস বানু তখনো পাথরের মতো শক্ত চোখে ছেলের দিকে তাকিয়ে শান্ত কিন্তু হাড়হিম করা গলায় বলেন।

“এখন সিদ্ধান্ত তোর। মাকে বেছে নিবি নাকি তোর ওই সাজানো পৃথিবীকে বেছে নিবি, সেটা তুই-ই ঠিক কর। তোকে আর নতুন করে আমি কোনো জোর করবো না।”

মায়ের মুখে এমন মরণকামড় দেওয়া কথা শুনে ইশতিয়াক যেন নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারল না। সে চরম ক্ষোভ আর তীব্র এক অসহায়ত্ব নিয়ে দুই হাত ছুড়ে চেঁচিয়ে বলে।

“জোর করছো না, কিন্তু ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল তো ঠিকই করছো মা! তুমি আমার মনের অবস্থাটা কেন একটুও বুঝতে চাইছো না? আমি সীমাকে কোনোভাবেই নিজের স্ত্রী হিসেবে মেনে নিয়ে বিয়ে করতে পারবো না, কারণ আমি রূপ…..।”

নিজের ভেতরের জমে থাকা সত্যিটা আর রূপার নামটা মুখ ফুটে পুরোটা শেষ করার আগেই বিলকিস বানু দুই হাত তুলে ছেলের কথা মাঝপথেই থামিয়ে দিয়ে ঝাঁঝালো গলায় বলেন।

“থাক! আমি তোর ওই অতো শত অজুহাতের গল্প শুনতে চাই না! যদি বিয়ে না করিস, তবে এখনই আমার চোখের সামনে থেকে চলে যা। আর গিয়ে নিজের অভাগী মায়ের দাফনের কাপড়ের ব্যবস্থাটা পাকা করে রাখিস!”

মায়ের মুখের এই মারাত্মক অভিশাপের মতো কথাটা শোনা মাত্রই ইশতিয়াকের গলার ভেতরের সুর এক নিমেষেই গলাতেই আটকে গেল। সে হাজার চেষ্টা করেও নিজের মুখ ফুটে একটা শব্দও উচ্চারণ করতে পারল না। চরম এক মানসিক যন্ত্রণায় নিজের দুই চোখ জোরে বন্ধ করে ফেলল সে। চোখ দুটো বন্ধ করতেই বন্ধ চোখের পাতায় মুহূর্তে রূপার সেই নিষ্পাপ মায়াবী চেহারাটা আবার নতুন করে ভেসে উঠল। রূপার ওই হাসিমুখটা মনে পড়তেই এক ঝটকায় ইশতিয়াকের বুকের ভেতরটা তীব্র ব্যথায় মোচড় দিয়ে উঠল মনে হলো যেন তার জীবন্ত কলিজার ওপর কেউ ধারালো কোনো অস্ত্র দিয়ে সজোরে আঘাত করল! নিজের অজান্তেই তার দুই চোখের কোনা বেয়ে টপ টপ করে নোনা জল গড়িয়ে মাটিতে আছড়ে পড়ল। সে মনে মনে খুব ভালো করেই পরিষ্কার বুঝে গেল, হয়তো আজকের এই অভিশপ্ত দিনটার পর থেকে তার সাজানো চেনা জীবনটা চিরতরে কানাগলিতে বদলে যাবে।

ভেতরের সমস্ত স্বপ্ন আর ভালোবাসাগুলোকে নিজের হাতে গলা টিপে খুন করে, অনেক কষ্টে সে আলতো করে নিজের চোখ দুটো খুলল। তারপর নিজের ভেতরের প্রবল ঝড়টাকে কোনোমতে আড়াল করে, নিজেকে যথাসম্ভব স্বাভাবিক রাখার ব্যর্থ চেষ্টা করে ভাঙা কিন্তু একরোখা গলায় বলে।

“ওকে, আমি সীমাকে বিয়ে করবো। তোমরা বিয়ের ব্যবস্থা করো।”

ইশতিয়াকের মুখ থেকে রাজির কথাটা শোনা মাত্রই ওখানকার পুরো পরিবেশটাই যেন এক নিমিষে বদলে গেল। উপস্থিত সবার বিষণ্ণ মুখে এক টুকরো স্বস্তির হাসি ফুটল, সমস্বরে সবাই একসাথে মস্ত বড় একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে উচ্চস্বরে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলে উঠল। তারপর গ্রামের সব নিয়ম-কানুন আর রীতিনীতি মেনে ইশতিয়াক আর সীমা’র বিয়েটা সম্পূর্ণ হলো। কিন্তু কাজী সাহেবের শেষ ‘কবুল’ শব্দটা উচ্চারণ করার পরপরই ইশতিয়াক এক সেকেন্ডও আর ওই বিয়ের মণ্ডপে বসেনি, সোজা বাড়ি থেকে হনহনিয়ে বেরিয়ে গেছে। এই অবস্থায় বাড়ির বড়রা তাকে আর নতুন করে আটকায়নি সবার মনেই এক ধারণার জন্ম নিয়েছে যে প্রথম প্রথম এমন জোরজবরদস্তির বিয়েতে সবাই একটু ওরকম রাগ করবেই, পরে বাসর ঘরে বউ কাছে গেলে ঠিকই সব রাগ পানি হয়ে যাবে! এটাই আপাতত বাড়ির সবাই সহজভাবে ধরে নিল।

রাতের বেলা আকাশ ধীরপায়ে হেঁটে বাঁধনের রুমে আসলো। রুমে ঢুকেই সে দেখে বাঁধন বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে একমনে ফোন গাড়ছে৷ তার মুখটা অদ্ভুত রকমের শান্ত, শরীরে জড়িয়ে আছে একটা কফি রঙের টি-শার্ট আর পরনে সাদা ট্রাউজার। রুমের ভেতরের এসির হিমশীতল বাতাসে তার সামনের চুল গুলো অবাধ্য ভাবে উড়ছে৷আকাশ কোনো রকম ভণিতা না করে বাঁধনের পাশেই ধপ করে শুয়ে পড়ল। নিজের প্যান্টের পকেট থেকে ফোনটা বের করতে করতে একটু খোঁচা মেরে বলল।

“কিরে শা’লা, ফোন দেখি এক্কেবারে গিলে খেয়ে ফেলবি! কি এমন কাজ করছিস ফোনে যে দুনিয়ার কোনো হুঁশ নাই তোর?”

বাঁধন ফোনের স্ক্রিন থেকে নিজের চোখ জোড়া এক চুলও না সরিয়ে বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল।

“ফালতু কথা একদম বলবি না।”

আকাশ হাসতে হাসতে বলল।

“ওকে ওকে, আর বলবো না ভাই। , আয় আজকে দুজনে মিলে একটু ফ্রী ফায়ার খেলি। অনেক দিন ধরে এই খেলায় বসা হয় না, আজ পুরা কোপাবো!”

বাঁধন এবার বিরক্তি নিয়ে ফোনের স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে আকাশের দিকে তাকাল। কিছুটা কৌতূহল আর চ্যালেঞ্জিং সুরে জানতে চাইল।

” কি নিয়ে খেলবি ? র‍্যাংকড ম্যাচ খেলবি না কি সিএস মোড? আর ম্যাপ কোনটা দিবি বারমুডা নাকি নেক্সটেরা?”

আকাশ নিজের ফোনের স্ক্রিনটা বাঁধনের মুখের সামনে অনলক করে এক গাল হেসে উত্তর দিল।

“অবশ্যই বারমুডাতে ল্যান্ড করবো শা’লা! আর মোড হবে ফুল ম্যাপ র‍্যাংকড ম্যাচ। অনেক দিন তোর সাথে ডুও ম্যাচ খেলা হয় না। তুই জাস্ট লবিতে আয়, স্টার্ট দিচ্ছি।”

কথা শুনতে শুনতেই বাঁধন নিজের ফোনে গেমটা অন করে লবিতে ঢুকে গেল। আকাশ তাকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে দুজনে মিলে একটা ডুও ম্যাচ স্টার্ট দিয়ে দিল।পরক্ষণেই দুজনেই পুরোদমে ফ্রী ফায়ার খেলা শুরু করল। তারা প্লেন থেকে সোজা ‘ক্লক টাওয়ার’ নামক একটা ডেঞ্জারাস জায়গায় ল্যান্ড করল। মাটিতে পা রাখতেই আকাশ চিল্লিয়ে উঠল,

“কিরে বাঁধন, জলদি গান লুট কর! আশেপাশে এনিমি নামছে!”

বাঁধনও আর দেরি না করে ঘরের ভেতর থেকে একটা MP40 আর AK47 তুলে নিল। ঠিক তখনই সামনে একটা এনিমি আসতেই বাঁধন নিখুঁত নিশানা করে ড্র্যাগ হেডশট মেরে ওটাকে নক করে দিল। আকাশ ওপাশ থেকে চিৎকার দিয়ে বলল,

“ওরে জোস শা’লা! পুরা হ্যাকার শট দিলি!”

ওদিকে আকাশও ওপাশ থেকে একটা স্কোয়াডকে একা সামলাতে গিয়ে গ্রেনেড ছুড়ে দিল। বোমার বিকট আওয়াজে স্ক্রিনের ভেতর চারপাশ ধোঁয়া হয়ে গেল। দুজনে মিলে একে অপরকে কাভার দিয়ে, গ্লু-ওয়াল ফেলে এনিমিদের কড়া ফাইট দিতে লাগল। গেমের সেই থরথরে উত্তেজনায় ঘরের ভেতরের এসির ঠান্ডাও যেন এক নিমেষে উধাও হয়ে গেল, দুজনে স্ক্রিনের ভেতর বুঁদ হয়ে তুমুল লড়াইয়ে মেতে উঠল।

দুজনে যেন এক নিমেষে সেই দুরন্ত কিশোর জগতে ডুবে গেল। পুরো বিছানার চাদর, বালিশ সব এলোমেলো করে দিয়ে দুজনে একমনে ফ্রী ফায়ার খেলছে। দুজনের হাতের আঙুলগুলো তখন ফোনের স্ক্রিনের ওপর একদম মেশিনের মতো দ্রুত গতিতে চলছে। গেমের ভেতরের সেই ‘ঠাসস ঠাসস’ গুলির শব্দে পুরো ঘর যেন বারবার কেঁপে উঠছে। আকাশ উত্তেজনার চোটে নিজের দুই পা সোজা দেয়ালের ওপর তুলে নিল, আর মাথাটা বিছানায় গুঁজে দিয়ে অদ্ভুত এক ভঙ্গিতে খেলতে লাগল। ওদিকে বাঁধন বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে থেকেই একদম একমনে স্ক্রিনের ওপর হাত চালাচ্ছে, তার পুরো মনোযোগ তখন এনিমি স্কোয়াড খতম করার দিকে।তাদের এই টানটান খেলার মাঝেই শিল্পী রহমান হঠাৎ করে রুমে ঢুকলেন। কিন্তু দুজনে তখন এতটাই মগ্ন যে তারা এই বাস্তব পৃথিবীর কোনো জগতেই নেই। শিল্পী রহমান বিছানার ওপর দুজনের এই পাগলাটে কায়দায় গেম খেলার ভঙ্গিটার দিকে কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে থেকে বেশ চড়া গলায় বলেন।

“কিরে, তোদের কি এখনো ওই ফোন টেপাই চলবে? রাত তো অনেক হলো, এবার নিচে খেতে আয়।”

আকাশ নিজের বুড়ো আঙুল দুটো স্ক্রিনে অনবরত নাচাতে নাচাতে, গেমের ভেতর থেকেই চোখ না সরিয়ে চেঁচিয়ে উত্তর দিল।

“পরে খাবো মা! এখন প্লিজ যাও তো এখান থেকে, ডিস্টার্ব করো না!”

ছেলের এমন উটকো জবাব শুনে শিল্পী রহমান এবার বাঁধনের দিকে তাকিয়ে একটু নরম গলায় বলেন।

“বাঁধন, তুই কখন খাবি বাবা?”

বাঁধন তখন সামনের এনিমিটাকে নক করার জন্য নিজের দাঁতে দাঁত চেপে ধরে অনবরত গুলি করতে করতে ওভাবেই উত্তর দিল।

“পরে খাবো কাকিয়া।”

শিল্পী রহমান আর কিছু না বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে বুঝলেন দুজনেই এখন ফোনে মারাত্মক লেভেলে ব্যস্ত, এখন ডাকলে এরা কেউই উঠবে না।

______

অন্য দিকে রূপা আর বৃষ্টি পড়তে বসেছে। দুজনে এক টেবিলেই খাতা-কলম আর বইপত্র নিয়ে বসেছে, আর তাদের ঠিক পাশেই ক্যান্ডি একদম লক্ষ্মী বাচ্চার মতো চুপচাপ বসে আছে। অনেকক্ষণ একটানা পড়ার পর বৃষ্টি ক্লান্ত গলায় নিজের হাত দুটো টানটান করে বলল।

“আর পারছি না রে, প্রচণ্ড খিদে পেয়েছে। চল, আগে কিছু খেয়ে আসি। রাত মনে হয় অলরেডি বারোটা বেজে গেছে।”

রূপা নিজের বই থেকে চোখ না সরিয়ে খাতার ওপর দ্রুত কলম চালাতে চালাতে বলল।

“আর এক মিনিট। ‘রাইট ফর্ম অব ভার্বস’ অংশটুকু কমপ্লিট করেই যাচ্ছি,প্রাই শেষ।”

বৃষ্টির চোখ এক ঝটকায় কপালে উঠল। এইটা তো খোদ আকাশ স্যারের দেওয়া পড়া, আর সে কিনা এটাই এতক্ষণ ধরে আলসেমি করে শিখছে না। বৃষ্টি মাথায় হাত দিয়ে আতঙ্কিত গলায় বলল।

“এই রে রূপা। আমার একদম মনেই ছিল না। এখন আমি কি করি।”

রূপা খাতায় একমনে লিখতে লিখতেই একটু টিপ্পনী কেটে উত্তর দিল।

“কাঁচকলা খাও। আজকের মতো কালও কলেজের ক্লাসরুমে গিয়ে কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকবে।”

বৃষ্টি এবার পড়ে গেল মহা বিপদে। এখন এই মাঝরাতে পড়া শিখতে বসলেও মাথায় কিচ্ছু ঢুকবে না, আর ওদিকে পেটের ভেতর প্রচণ্ড খিদে চাড়া দিয়ে উঠেছে। পরক্ষণেই ভয়ের চিন্তাটা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে বলল।

“ধুর যা হওয়ার হবে। আমার এখন খুব খিদে লেগেছে। এই চল তো ভাই আগে।”

প্রায় ১০ মিনিটের মধ্যে রূপা নিজের পড়াটা পুরোপুরি কমপ্লিট করে বই বন্ধ করতে করতে বলল।

“চল।”

বৃষ্টি এতক্ষণ ধরে অপেক্ষা করতে করতে ততক্ষণে গাল ফুলিয়ে বসে পড়েছে। সে মুখভার করে বলল।

“তুই একাই যা, আমি খাবো না।”

রূপা অবাক হয়ে বলল।

“তোর আবার কি হলো। একটু আগেই তো চিল্লাপাল্লা করলি খুব খিদে পেয়েছে, আর এখন বলছিস খাবি না।”

বৃষ্টি অভিমানী গলায় বলল।

“তখন বলেছি তুই কি তখন গিয়েছিস। আমার পেটের খিদের থেকে তোর ওই পড়াটাই বেশি হয়ে গেল। যা আমি খাবো না, তুই একাই গিয়ে খেয়ে আয়।”

রূপা ওর এমন বাচ্চার মতো অভিমান দেখে খিলখিল করে হেসে উঠল। তারপর বৃষ্টির দুই গাল টেনে দিয়ে আলতো করে বলল।

“ওরে আমার বাবুটা বুঝি রাগ করেছে। আচ্ছা বাবা সরি। তুই তো জানিসই আকাশ ভাইয়া কেমন খিটখিটে। পড়া না পেলে সোজা বাবার কাছে গিয়ে কমপ্লেন করে দেবে। এই ভয়েই আগে ভাইয়ার পড়াটা জলদি কমপ্লিট করলাম। এখন চল তো।”

বৃষ্টি চেয়ার ছেড়ে হনহনিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে রাগী গলায় বলল।

“তোর ওই আকাশ ভাইয়াটা একদম একটা আস্ত হিটলার। ওই আকাশ ভাইয়া আমাদের কলেজে আসার পর থেকে আমার কলেজের সব শান্তি এক্কেবারে উবে গেছে। তুই দেখে নিস, তোর ওই খিটখিটে ভাইয়ার জীবনে কোনোদিন বিয়ে হবে না। শা’লা সারাজীবন কুমার থেকেই মরবে।”

রূপা হেসে কুটিপাটি হয়ে বৃষ্টির কাঁধের ওপর নিজের ডান হাত ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে বলল।

“আচ্ছা বাবা। যদি বিয়ে না হয়, তবে তোকে দিয়েই ওনার বিয়েটা করিয়ে ফেলবো। তারপর তুই আমার বেস্টু থেকে এক লাফে ভাবি হয়ে যাবি। ব্যাপারটা বেশ সুন্দর হবে না বল।”

বৃষ্টি নাক সিটকে বলল।

“সারাজীবন আমি কুমারী হয়ে থাকবো, তবুও ওই হিটলারকে আমি কোনো জন্মেও বিয়ে করবো না। আমার তো বর চাই একদম বাঁধন ভাইয়ের মতো। উনি কি সুন্দর চুপচাপ, গম্ভীর হয়ে নিজের মতো থাকেন। আমার খুব ভালো লাগে উনাকে।”

বৃষ্টির মুখ থেকে বাঁধনের প্রতি এই ভালোলাগার কথা শুনতেই মুহূর্তে রূপার মুখের চেনা হাসিটা একদম নিভে গেল। বুকের ভেতরটা অজ্ঞাত এক শঙ্কায় ছাৎ করে কেঁপে উঠল তার। সে কোনোমতে নিজের ভেতরের অস্থিরতাটুকু সামলে নিয়ে শুকনো গলায় বলল।

“হয়েছে, অনেক বকবক করেছিস। চল এখন। একটু আগে তো নিজেই বললি খুব খিদে পেয়েছে।”

তারপর দুজনেই হালকা গল্প করতে করতে সিঁড়ি বেয়ে নিচে ড্রয়িং রুমে নেমে এলো৷ মাঝরাতে পুরো বাড়ি একদম নিঝুম, নীরব হয়ে আছে; হয়তো বাড়ির সবাই রাতের খাওয়া-দাওয়া শেষ করে এতক্ষণে গভীর ঘুমে তলিয়ে পড়েছে। রূপা আর বৃষ্টি ডাইনিং টেবিলে পাশাপাশি বসে এবার শান্ত মনে নিজেদের মতো করে খাওয়া শুরু করল।

অন্য দিকে বাঁধন আকাশ গেমের শেষ মুহূর্তে এসে দুজনে যেন আরও বেশি হিংস্র হয়ে উঠল। একদম ছোট হয়ে আসা সেফ জোনের ভেতর তখন শেষ এনিমি স্কোয়াডটা পিকের পাহাড়ের ঢাল থেকে অনবরত স্নাইপার দিয়ে ওদের দিকে গুলি ছুড়ছিল।আকাশের স্ক্রিনে তখন লাল দাগ ভেসে উঠতেই সে চিল্লাইয়া বলল।

“বাঁধন রে, কু’ত্তাটা আমারে স্নাইপার দিয়ে ড্যামেজ করে দিছে! আমার হেলথ একদম শেষ, কভার দে!”

বাঁধন এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট না করে আকাশের ঠিক সামনে একটা গ্লু-ওয়াল ফেলে ওকে সেভ করল। তারপর নিজে ক্রৌচ পজিশনে গিয়ে পকেট থেকে একটা স্মোক গ্রেনেড ছুড়ে চারপাশ ধোঁয়ায় অন্ধকার করে দিল। এনিমিটা যখন ধোঁয়ার কারণে ওদের পজিশন বুঝতে পারছিল না, ঠিক তখনই বাঁধন পাহাড়ের পাশ দিয়ে ঘুরে ওয়ান-ট্যাপ হেডশট মারল!

স্ক্রিনে জলজ্বল করে মস্ত বড় অক্ষরে ভেসে উঠল

—BOOYAH!

ম্যাচটা জিতেই আকাশ বিছানার ওপর বালিশ ছুড়ে দিয়ে খুশিতে এক্কেবারে লাফিয়ে উঠল। সে বাঁধনের পিঠে সজোরে একটা চাপড় মেরে চিল্লাইয়া বলল।

“ইয়া হু জিতছি।”

বাঁধন এতক্ষণ পর ফোনের স্ক্রিন থেকে চোখ সরাল। তার গম্ভীর মুখেও তখন এক চিলতে বিজয়ী হাসির রেখা ফুটে উঠেছে। সে ফোনটা বিছানায় রেখে দুই হাত মাথার পেছনে দিয়ে আরাম করে হেলান দিয়ে বলল।

“তোর ওই ফালতু ড্রাইভের কারণেই জোনে আটকে মরতাম আজ। শা’লা নেক্সট টাইম খেলতে আসলে ভালো করে শিকে আসবি।”

আকাশ এক গাল হেসে বলল।

“এত শিখে কি করব, তুই আছিস না! আমি বিপদে পড়লে সবসময় তুই আমাকে বাঁচাবি, সেটা হোক গেমে কিংবা বাস্তবে।”

বাঁধন বিছানা থেকে ধীরপায়ে উঠে দাঁড়িয়ে নিজের ট্রাউজারের দুই পকেটে হাত ঢুকিয়ে দিল। তার শান্ত গম্ভীর মুখে কোনো ভাবান্তর না এলেও চোখের কোণে আবছা একটা প্রশ্রয়ের টান ফুটে উঠল। সে আকাশের দিকে তাকিয়ে কড়া গলায় বলল।

“বক বক না করে নিচে আয়, খাবো। খিদে পেয়েছে খুব।”

আকাশ মুহূর্তে এক লাফে বিছানা থেকে উঠে পড়ল। ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ডান হাত দিয়ে অবাধ্য চুল গুলো আলতো করে পিছনে ঠেলে দিল। তারপর আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে এক চিলতে বাঁকা হেসে, বাঁধনের মতো নিজেও প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে বেশ ভাব নিয়ে বলল।

“চল।”

দুজনে মিলে এরপর রুম থেকে বের হলো। কাঁধ মিলিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে নামতে দুজনেই বেশ অবাক হলো পুরো ড্রয়িং রুমে ঝলমলে বাতি জ্বালানো। মাঝরাতের এই নিঝুম নীরবতার মাঝে এত রাতে ড্রয়িং রুমে কে থাকতে পারে, ভেবে দুজনেরই ভুরু হালকা কুঁচকে গেল।সিঁড়ি দিয়ে নামা শেষ করতেই মিষ্টি মেয়েলি খিলখিল হাসির শব্দ শুনতে পেল তারা। আচমকা এই শব্দে বেশ অবাক হয়ে দুজনেই এক সাথে ঘাড় ঘুরিয়ে বাম দিকে তাকাল। আর তাকানো মাত্রই দুজনের চোখ যেন এক নিমিষে সেখানেই আটকে গেল।

ডাইনিং টেবিলে বসে রূপা আর বৃষ্টি মগ্ন হয়ে গল্প করছে আর নিজেদের মতো খাচ্ছে। গল্প করতে করতে মাঝে মাঝেই দুজনেই আপন মনে খিলখিল করে হেসে উঠছে। রূপার পরনে সাধারণ একটা অ্যাশ রঙের কামিজ, আর মাথার ঘন কালো চুলগুলো পিঠ বেয়ে একদম ছেড়ে দেওয়া। রূপার ওই ঘন লম্বা চুলগুলো এতটাই দীর্ঘ যে, তা ডাইনিং চেয়ার পেরিয়ে প্রায় ফ্লোর অব্দি ছুঁইছুঁই হয়ে গড়াগড়ি খাচ্ছে!

মেয়েটার ওই চুলের দিকে তাকিয়ে বাঁধন সত্যি ভীষণ অবাক হয়। এই আধুনিক যুগে এসেও এত লম্বা আর সুন্দর চুল আজও কোনো মেয়ের থাকতে পারে কিনা, তা তার জানা নেই। ঠিক তখনই বৃষ্টি’র কোনো একটা কথায় হঠাৎ রূপা আবারও খিলখিল করে হেসে উঠল, আর সাথে সাথেই তার ছোট্ট কিউট ঘ্যাচ দাঁতটা সেই হাসির আড়ালে মিষ্টি করে উঁকি দিল।

রূপার ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠা সেই মায়াবী হাসিটা যেন সোজা গিয়ে বাঁধনের হৃদস্পন্দনে লাগল। বুকের ভেতরটা এক অদ্ভুত ভালোলাগায় একদম কেঁপে উঠল তার। সে কেমন যেন এক অদ্ভুত ঘোরলাগা নয়নে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল রূপার দিকে। কেন জানি না, এই মেয়েটার দিকে তাকালে শুধুই তাকিয়ে থাকতেই ইচ্ছে করে, কোনোভাবেই আর চোখ ফেরাতে ইচ্ছে করে না।

অন্য দিকে বৃষ্টির পরনে একটা টিয়া রঙের কামিজ, তার মাথার চুলগুলোও পিঠের ওপর আলগা করে ছাড়া। তার মুখেও মিষ্টি হাসি লেগেই আছে, সে খাচ্ছে আর হাত নেড়ে নেড়ে এটা-সেটা অনর্গল বলে চলেছে। আকাশ ডাইনিংয়ের দিকে পা বাড়াতে গিয়ে বৃষ্টির ওই প্রাণবন্ত মুখের দিকে কিছুক্ষণ একদম একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। বৃষ্টির সেই চঞ্চলতা আর হাসিটুকু নিজের চোখে বন্দি করে নেওয়ার পর, সে একটা গভীর শ্বাস নিয়ে পাশে থাকা বাঁধনের দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বলে।

“চল।”

বাঁধন ভেতর থেকে আলতো একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর দুজনেই কোনো শব্দ না করে চুপচাপ হেঁটে এসে রূপা আর বৃষ্টির ঠিক পিছনে এসে দাঁড়াল—একদম গা ঘেঁষে পিছনে। রূপা আর বৃষ্টি তখনো খেয়াল করেনি তাঁদের , তারা তখনো মগ্ন হয়ে আছে নিজেদের গভীর এক গল্পের জগতে। রূপা চামচ দিয়ে খেতে খেতে হঠাৎ বেশ আক্ষেপের সুরে বলল।

“জানিস, আমি কিছুদিন আগে একটা উপন্যাস পড়েছি, নাম ছিল ‘পদ্মজা’। লেখিকা ইলমা বেহরোজ। গল্পটা যখন প্রথম পড়তে শুরু করেছি, উফফ কী যে ভালো লাগছিল! জাস্ট প্রেমে পড়ে যাচ্ছিলাম আমিরের । কিন্তু উপন্যাসের একদম শেষে গিয়ে যখন আমিরের ভয়ঙ্কর গোপন সত্যটা জানলাম, তখন এক কথায় পুরাই বাঁ’শ খাইলাম! এই বাঁ’শ জিনিসটা যে শুধু আমাদের এই কঠিন বাস্তবে না, উপন্যাসের জগতেও ফ্রিতে পাওয়া যায়, তা ওইটা না পড়লে বুঝতামই না!”

বৃষ্টি রূপার এমন উপন্যাসের চরিত্র নিয়ে সিরিয়াস আফসোস দেখে আবার খিলখিল করে হেসে উঠল। সে নিজের হাসি থামিয়ে রূপার কথায় সায় দিয়ে বলল।

“আসলেই! বাঁ’শ মানে কি, কল্পনাতে বোধহয় আরো বড় আক্কাওয়ালা বাঁ’শ খাওয়া লাগে! আর তুই যেই ‘পদ্মজা’র কথা বললি না, ওই উপন্যাসটা আমিও পড়েছি। আমার সব থেকে বেশি খারাপ লেগেছে মৃদুল আর পূর্ণার কাহিনীটা পড়ে। ইসস বাস্তবেও মানুষ এমন জীবন দিয়ে কাউকে ভালোবাসতে পারে, তা আসলেই আমার জানা নেই রে!”

রূপা গ্লাসের পানিটুকু ঢকঢক করে খেয়ে একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে বলল।

“আরে, ইলমা আফা একটা জুটিরও তো পূর্ণতা দেয় নাই! সবগুলার ভালোবাসার মাঝেই মস্ত বড় বড় বোমা ফাটিয়েছে। যেমন ধর লিখন শাহ্, সে পদ্মজারে কিন্তু সত্যিই মনেপ্রাণে ভালোবাসতো, অথচ সেও শেষমেষ ভালোবাসা পেলো না। ওদিকে মৃদুল পূর্ণাকে জান দিয়ে ভালোবেসেছে, সেও তাকে পেলো না। আর পদ্মজা নিজে আমিরকে এত ভালোবেসেও দিনশেষে আমিরকে নিজের করে পেলো না এক কথায় বলতে গেলে নিজেই নিজের স্বামীকে মেরে ফেলল!”

বৃষ্টি আফসোসের সুরে মাথা নাড়াতে নাড়াতে বলল।

“পদ্মজা চাইলেই কিন্তু আমিরকে ওভাবে না মেরে বাঁচিয়ে রাখতে পারতো রে।”

রূপা গালে এক লোকমা ভাত নিয়ে মুখে রেখেই বৃষ্টিকে ভেংচি কেটে বলল।

“উহু, যা করেছে একদম ভালোই করেছে! ওই পাপিষ্ঠ পুরুষের পৃথিবীতে বেঁচে থাকার কোনো অধিকারই নেই।”

বৃষ্টি একটা গভীর শ্বাস ফেলে টেবিলের দিকে তাকিয়ে বলল।

“কিন্তু বিশ্বাস কর, ওই পাপিষ্ঠ পুরুষটাকে আমি আজও কোনোভাবে ভুলতে পারি না।”

রূপা নিজের খাতার পেজের গল্পটার মতোই সায় দিয়ে বলল।

“সেম ভাই!”

দুজনের এই মাঝরাতে বসে উপন্যাসের কথাকপন শুনে বাঁধন আর আকাশ একে অপরের দিকে তাকাল। বাঁধনের চোখে-মুখে তখন স্পষ্ট বিরক্তি খাওয়ার সময় মানুষ এত কথা কেমনে বলে, আর এত কথা বলতে হয় কেন, সেটা তার মাথায় ঢুকছে না।হঠাৎ খাওয়ার মাঝেই বৃষ্টি একটা লম্বা শ্বাস ফেলে বলল।

“যাহ বাবা, অনেক হাসতাছি! বড়রা বলে না বেশি হাসলে নাকি পরে কাঁদতে হয়? না জানি কাল আমার কপালে কত বড় কান্নাকাটি আছে! বুঝেছি, ওই হিটলার আকাশ স্যার আমার কপালে জ্যান্ত দুঃখ লিখে রেখেছে রে। ওই লোকটা আমার জীবনটা পুরাই জাহান্নাম বানিয়ে দিল! এখন শান্তিতে যে দুটো ভাত মুখে দেব, সেই উপায়টাও রাখেনি।”

রূপা ওর কথা শুনে হালকা হেসে অভয় দিয়ে বলল।

“এক কাজ কর, এখন জলদি খেয়ে নিয়ে পড়াটা একটু শিখে নে। আর এখন যদি ঘুম পায়, তবে ভোরে ফজরের সময় উঠে শিখে নিবি। কিন্তু প্লিজ, পড়া না শিখে কাল কলেজে যাস না। নাহলে সত্যি বলছি, আকাশ ভাইয়া এবার মারাত্মক রেগে যাবে।”

বৃষ্টি এবার রাগে আর ক্ষোভে দাঁতে দাঁত চেপে, হাতের চামচটা প্লেটে ঠাস করে রেখে বলল।

“আর ভালো লাগছে না রে ভাই! তোর ওই খিটখিটে ভাইটাকে কোন দুঃখে যে আমাদের কলেজের স্যার হতে হলো! উনি আমাদের কলেজে পা রাখার পর থেকে আমি একটু শান্তিতে হাসতেও পারছি না। ভাইরে ভাই, উনি এক ঝটকায় আমার জীবনের সব স্বাধীনতা কেড়ে নিলেন! তার ওপর আবার কথায় কথায় ওনার এক জপমালা’তোমার বাবাকে বলে দেব!’ আল্লাহ, আমি আজ এই একদম খাঁটি আর মাসুম মন নিয়ে মন থেকে বদদোয়া করছি উনি যদি কখনো আমার নামে বাবার কাছে কোনো উল্টাপাল্টা কমপ্লেন করে, তবে ওনার মাথার সব চুল হড়হড় করে পটাপট ঝরে গিয়ে পুরো মাথা একদম চকচকে আয়নার মতো টাকলা হয়ে যাবে।আর সামনের সবগুলা দাঁত একদম গোড়া থেকে খসে পড়ে যাবে! দু-একটা চুল যদি ভুল করে মাথাতেও থাকে, সেগুলা যেন বুড়োদের মতো ধবধবে সাদা হয়ে যায়! তখন যখন উনি ক্লাসে এসে হিহি করে হাসবেন, ওনাকে দেখতে একদম আমাদের পাড়ার ওই ফোকলা দাঁত পড়া দাদুর মতো লাগবে! তখন ওনাকে আর কেউ ভয় পাবে না, সবাই ওনাকে দেখে মুখ চেপে হাসবে।”

রানিং…!

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply