হামিদাআক্তারইভা_Hayat
চারপাশ টা কেমন যেন থমথমে। চৌধুরী বাড়ির বিশাল বাগান পেরোতে কায়নাতের রুহু কাপল। ঠান্ডা বাতাসে শরীর গুলিয়ে এলো। প্রেম ওর কাঁধ ধরল আলতো করে।
“ভাবি? ঠিক আছেন?”
কায়নাত শক্ত ঢোক গিলে দৃষ্টি নত করল।
“আমি হাঁটতে পারছি না। পুরো বাড়ি এমন থমথমে হয়ে আছে কেন?”
“আপনি আমাকে ধরুন!”
ওকে ধরেই কোনোরকম বাড়ির ভেতরে এলো কায়নাত। ড্রয়িংরুমে বাড়ির সবাই থমথমে মুখে বসে ছিল। কায়নাতকে দেখতে পেয়ে আতিয়া বেগম এগিয়ে এলেন। কপালে তার গাঢ় ভাঁজ।
“তোর কী হয়েছে?”
কায়নাতের হাঁটু ভেঙে এলো, তৎক্ষণাৎ প্রেম চেপে ধরল ওর নাজুক শরীরটা। এলোমেলো অস্থির আতঙ্কিত চোখটা চারপাশ বুলিয়েও কাঙ্খিত মানুষটার দেখা না পেয়ে অস্থির হলো পরাণ।
“তোমার নাতি কই দাদি? উনি কোথায়? কী হয়েছে তার?”
আতিয়া বেগম ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
“তেমন কিছু হয়নি। পায়ে একটু ব্যথা পেয়েছে। শরীরটা বেশ দুর্বল। কত করে বলেছি তোরা এখানে থাক কিন্তু অর্ণ আর আমার কথা শোনে?”
আতিয়া বেগম কিছু বলার আগেই কায়নাত ঠোঁট ভেঙে কেঁদে উঠল শব্দ করে। শরীর ছেড়ে দিয়েছে। আতিয়া বেগম বললেন সোফায় ওকে বসাতে কিন্তু কায়নাত বসবে না। সে অর্ণর কাছে যাবে। প্রেম বাধ্য হলো ভাবির আদেশ মানতে। ওকে নিয়ে এলো দুই তলায় অর্ণর ঘরের সামনে। কোল থেকে নামিয়ে দরজায় টোকা দিল বেশ কয়েকবার। দরজা খুলল না। কায়নাত দরজায় হাত থাপড়ে মৃদু গলায় বলল,
“শুনছেন? আমি এসেছি। দরজা তা খুলুন না!”
প্রেম বলল,
“আমি তাহলে নিচে যাই ভাবি? কিছু দরকার হলে নিধিকে ডেকে পাঠাবেন।”
কায়নাত মাথা নাড়ল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ঘরের দরজাটা খট শব্দ করে খুলে গেল। অন্ধকারে কায়নাত টের পেল সামনে এক বড় লম্বাটে ছাঁয়া। বুঝতে পারল স্বামী দাঁড়িয়ে আছে। দুর্বল হাত মেলে অর্ণর বাহু ছুলো।
“কী হয়েছে আপনার?”
অর্ণ উত্তর দিল না। টের পেল কায়নাত দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না। ঝাঁপসা অন্ধকারে স্ত্রীকে কোলে তুলে নিল সে। ছোট দেহ টা সুঠাম দেহে লেপ্টে আসতেই অর্ণ পা দিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল।
“পাশে নেই মাত্র কয়েক ঘণ্টা, তাতেই এই অবস্থা ম্যাডাম? আজীবন কী আপনার পাশে পাবেন আমায়?”
কায়নাত ফুঁপিয়ে উঠল। ওর গলা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল,
“আপনার এক্সি*ডেন্ট কী করে হলো? আঘাত পেয়েছেন বেশি?”
“উহুম।”
“কোথায় ব্যথা?”
অর্ণ ফিসফিস করে বলল,
“বুকে।”
কায়নাত ঠোঁট চাপল। নিজেকে আবিষ্কার করল এক অন্ধকারছন্ন আরামদায়ক নরম বিছানায়। হাতে ঠেকল নরম তাজা পাঁপড়ির মতো কিছু। ফুলের গন্ধে প্রাণ জুড়িয়ে এলো। অর্ণ বেসামাল। কায়নাত কিছু বুঝতে পারছে না। হঠাৎ অর্ণ দূরুত্ব বাড়িয়ে সরে গেল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই জ্বলে উঠল সম্পূর্ণ ঘরের লাইট। চমকে উঠল সে। পুরো ঘরে ফুলের বাহার। দেয়াল জুড়ে টাঙানো দুই স্বামী-স্ত্রীর কত-শত ছবি। বিছানায় লেপ্টে আছে গোলাপের স্পর্শ আর ঠিক তার উপরে ছোট একটা কেক। কায়নাত বিস্মিত হয়েই ঠোঁট কামড়ে ঝুঁকে দেখল কেকটা। ছোট ছোট ইংরেজি অক্ষরে লেখা, “Happy Birthday My World” কায়নাত পিটপিট করে অর্ণর দিকে তাকাল। অর্ণ প্যান্ট এর পকেটে হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে আছে সামনে। পর্যবেক্ষণ করছে বউকে। কায়নাত ফের কেঁদে উঠল শব্দ করে। অর্ণ কপাল কুঁচকে দেখে গেল কাঁদুনি বুড়ির বুক ভা*ঙা কান্না। অতঃপর, খানিক গমগমে গলায় বলল,
“খোলো।”
কায়নাত ফ্যালফ্যাল করে তাকাল। নাকের পানি অর্ণর তোয়ালে দিয়ে মুছে বলল,
“কী খুলব?”
“জামা খোলো।”
কায়নাত হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল। অর্ণ নিজেই হকচকাল নিজের কথায়। হালকা গলা কেঁশে বলল,
“বেয়াদব মহিলা, গায়ের বোরকা খুলতে বলেছি। খোলো ওটা।”
কায়নাত তাই করল। কপাল কুঁচকে অর্ণর শরীরে চোখ বুলাল, তেমন কিছু নজরে না পেয়ে অভিমানে বুক ভার হলো। সে কত ভয় পেয়েছিল! আর একটু হলে তো প্রাণ পাখিটাই উড়ে যেত। অভিমানী পা ফেলে এগোল খোলা বারান্দায়। বাইরে দমকা হাওয়ায় দুলছে গাছের রঙিন পাতা গুলো। হঠাৎ দেহে দুটো হাতের বাঁধন চেপে ধরতেই খেঁক করে উঠল কায়নাত।
“কাছে আসবেন না আমার। অসভ্য লোক!”
অর্ণ অবাধ্য পুরুষ। সহসা নাক ঘষল তার ঘাড়ে।
“সত্যি ব্যথা পেয়েছি পায়ে।”
“প্রেম আমায় ওইভাবে কেন বলল? আপনি জানেন আমি কত ভয় পেয়েছি?”
“খুব বেশি ভালোবাসো?”
“বাসি না। একটুও বাসি না। দূরে যান আমার থেকে।”
অর্ণ ঠোঁট টিপে হেসে উঠল।
“আজ আপনার ১৮ তম জন্মদিন ম্যাডাম। বড় হয়ে গেলেন যে।”
কায়নাত লম্বা একটা সময় চুপ রইল। তার কথা বলতে ইচ্ছে করছে না এখন। কতটা সময় পেরিয়ে গেছে কেউ-ই বলতে পারবে না। স্বামীর আলিঙ্গে মুচড়িয়ে উঠেছে অষ্টাদশী। আজ সব কিছু বড্ড শান্ত, ঠিক অর্ণর মতো।
ওরা ঘরে এলো। কায়নাত বিছানায় উবু হয়ে বসে হাঁটু জড়িয়ে ধরে কেকের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,
“এই কেক তো আমার একাই লাগবে। আপনি আমার বেলায় এত কীপটেমি করেন কেন?”
অর্ণ তখন ওর সামনা-সামনি বসেছে।
“আপনার বেলায় কীপটেমি করার সাধ্য আমার আছে?”
“আমার কী চোখ নেই? আমার বেলায় পকেট থেকে টাকা বের হয় না। শুধু একটাবার বাবুটা আসুক, দেখে ছাড়ব কত কীপটেমি করতে পারেন।”
অর্ণ ঠোঁট কামড়ে হাসল।
“আমার উপহার কোথায়?”
অর্ণ পলক পিটপিটিয়ে বলল,
“উপহারও লাগবে?”
“ওমাহ! লাগবে না মানে? আপনাকে কিন্তু বাড়ি ছাড়া করব আমি!”
অর্ণ এবার শব্দ করে হাসল। হেসেই হাত বাড়িয়ে বউকে টেনে আনল নিজের নিকটে। দুই হাতের মুঠোয় অষ্টাদশীর আনন চেপে ধরে নয়নে নয়ন মেলাল। অতঃপর, মিলিত হলো অধর। প্রথমে হালকা তারপর গভীরের চেয়েও গভীর। বেসামাল হলো দুজনের অনুভূতি। অর্ণ চাইল না এই মুহূর্ত নষ্ট করতে। ছেড়ে দিল ওকে। কায়নাত লজ্জায় দিশেহারা হয়ে আঁচড়ে পড়ল স্বামীর বুকে। অর্ণ মুচকি হেসে হাত বুলিয়ে দিল ওর মাথায়। চুলের ভাজে চুমু এঁকে বলল,
“এই আমার উপহার।”
কায়নাত হাঁসফাস করল। সে কিছু বলতে চায় অর্ণকে, কিন্তু বলার সাহস হচ্ছে না। অর্ণ কেক কাটল ওর সাথে। খাওয়া-দোয়া শেষে কায়নাতের ঠায় হলো স্বামীর বুকে। তার সব চেয়ে নিরাপদ জায়গায়। কায়নাত জানে, অর্ণ একটু বেসামাল। তার সানিধ্যে এলে নিজের মধ্যে থাকে না লোকটা। তখন কত কথা যে বলে, তা ধারণার বাইরে। ওসব ভাবলে কায়নাতের অস্থির লাগে, পরাণ ছটফট করে লাজে। আধো আঁধারে কায়নাত টের পেল অর্ণ গুনগুন করে গান গাইছে। তার অবাধ্য হাত বুলিয়ে যাচ্ছে ওর মাথা।
“শুনছেন?”
অর্ণর গুনগুন থেমে গেল।
“আমার একটা আবদার রাখবে?”
অর্ণর পাল্টা প্রশ্নে কায়নাত কপাল কুঁচকে ফেলল।
“কীসের আবদার?”
“একটাবার ‘তুমি’ বলে ডাকবে?”
“পারব না।”
“প্লিজ!”
“উহুম।”
“বলো না!”
কায়নাত উঠে বসল। অর্ণ অন্ধকারেই তাকিয়ে রইল। কায়নাত খানিক সময় নিয়ে বলল,
“আপনাকে পেয়ে জীবনের সব অপূর্ণতা গুলো পূর্ণতা পেয়েছে। ভালোবাসার চাদরে এমন ভাবে মুড়িয়েছেন যে, আমার এই বাঁধন থেকে মুক্ত হতেই ইচ্ছে করে না।”
অর্ণ বলল,
“এমন করে কেন বলছো? তুমি মুক্ত হতে চাইলেও কখনো মুক্ত করবো না আমি। খাঁচায় যখন একবার বন্দি করেছি, সেই খাঁচার দরজা কোনোদিন খুলবে না।”
কায়নাতের গলা কাঁপল একটু। শক্ত করে দাঁত চাপল। ঘুরে বসল ওর দিকে। অর্ণ তখনো শুয়ে আছে চুপটি করে। হাতের মুঠোয় পেঁচিয়ে রাখা বউয়ের ওড়না। কায়নাত হুট করেই ওর দিকে ঝুঁকে এলো। যতটা কাছে এলে বুকে কম্পন সৃষ্টি হয়, ঠিক ততটাই কাছে এলো সে। অর্ণ তাকিয়ে রইল, কিছু বলল না। বলার ইচ্ছেও হলো না। আজ অপাশের মানুষটা বলুক। নিজেকে উজাড় করে দিক প্রিয় পুরুষের নিকট। কায়নাত অর্ণর গলা জড়িয়ে ধরল। বাচ্চাদের মতো অর্ণর মুখ জুড়ে ছোট ছোট চুমুতে ভরিয়ে দিল ঠোঁটের ছোঁয়া। অর্ণ চোখ বন্ধ করে রেখেছে। বুঝতে পারছে কায়নাত কোনো ব্যাপার নিয়ে অস্থির হয়ে আছে। অর্ণর দুহাত কাছে টানল ওকে। যতটা কাছে টানলে কোনো দূরুত্ব থাকে না দুজনের মাঝে। কায়নাতের ঠোঁটের ছোঁয়া কমেছে ততক্ষণে। অর্ণ অনুভব করল তার কপালে পানির স্পর্শ। সঙ্গে সঙ্গে চোখ খুলে ফেলল। তাকাল চোখের দিকে। কায়নাত চোখ খিঁচে বন্ধ করে ফেলেছে। লম্বা শ্বাস ফিসফিস কণ্ঠে বলল,
“তুমি বাবা হবে অর্ণ। আমার এই ছোট্ট শরীরে তোমার ছোট্ট দুনিয়া বড় হচ্ছে।”
অর্ণ বুঝল না তৎক্ষণাৎ কায়নাতের কথা। হিংস্র বাঘের ন্যায় ঝাঁপিয়ে উঠল ওর উপর। সুঠাম দেহের নিচে আঁচড়ে পড়তেই চমকে উঠল সে। ভয়ে মিইয়ে এলো বিছানার সঙ্গে। অর্ণ ওর চোয়াল চেপে ধরে নিজের দিকে ফেরাল।
“কী বললে তুমি? আবার বলো?”
কায়নাত ভয় পেল এবার। মনে হলো অর্ণ রেগে গেছে হয়তো! চোখে টলমল পানি জমল ওর। নাকের পাতা লাল হয়ে ফুলছে একটু পরপর। অর্ণর সহ্য হলো না। তার উত্তর সে পেয়ে গেছে। কায়নাতের কান্না দেখার সময় কী তার আছে? অত বড় একটা ছেলে কায়নাতের পেটে মুখ গুঁজে কেঁদে উঠল শব্দ করে। কায়নাত হতভম্ব হয়ে ওর শরীরের কম্পন উপলব্ধি করল। অর্ণ কাঁদছে? খুশিতে কাঁদছে কে? বাবা হওয়ার খুশিতে লোকটা পাগল-ই হয়ে গেল বুঝি?
পরপর ছোট্ট শরীরে বয়ে গেল ভেজা ঠোঁটের স্পর্শ। শুকনো ঢোক গিলল কায়নাত। অর্ণ ভেজা চোখে তাকাল ওর দিকে। বলল,
“কবে..কবে হলো এসব?”
কায়নাত শুকনো ঢোক গিলে বলল,
“পরশু রাতে। পাশের বাড়ির নাজমা ভাবিকে দিয়ে আনিয়েছিলাম। শরীরটা ভালো যায় না, সন্দেহ হচ্ছিল। আম্মুকে কল করে জানানোর পর বললেন টেস্ট করতে।”
আর বলা হলো না কোনো কথা। অধর চেপে বসেছে ওষ্ঠে। অর্ণ বউকে সারপ্রাইস দিতে গিয়ে নিজেই হতবাক হয়ে গেছে। এই সংবাদ উপহারের কাছে অর্ণর দেয়া উপহার খুবই তুচ্ছ। খুবই!
(৯টার পর বাসায় আসছি। কাল আরেকটা পর্ব দিব কেমন? পুষিয়ে দেব আগামী পর্বে। মন্তব্য করুন। আজ আমার ইতিহাস পরীক্ষা খারাপ হয়েছে।💔)
চলবে…?
Share On:
TAGS: প্রেমবসন্ত সিজন ২, হামিদা আক্তার ইভা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৪৯
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৫
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৩
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৩৫
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ২৯
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ২৬
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ২৫
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৩৩
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৪৬
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৭