Golpo romantic golpo প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা

প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা অন্তিম পর্ব (প্রথমাংশ)


প্রণয়ের_মায়াতৃষ্ণা ( অন্তিম পর্ব) প্রথমাংশ

ফারজানারহমানসেতু

(বাসর পর্ব)

নদীর পাড়ে সেই মুহূর্তটা যেন সময়ের গায়ে আটকে গিয়েছিল। বাতাসে হালকা ঠান্ডা ছোঁয়া, আর তূর্জানের কণ্ঠে ভেসে আসা গানের সুর—সবকিছু মিলিয়ে রোজার ভেতরটা অদ্ভুতভাবে নরম হয়ে যাচ্ছিল।কিছুক্ষণ পর তূর্জান থেমে গেল। এতক্ষন রোজার কোলে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে নদীর পাড়ে শুয়ে ছিল।

হঠাৎ রোজার দিকে তাকিয়ে হালকা হেসে বলল,
“চলো বউ, আরেকটা জায়গা বাকি আছে।”

রোজা কিছু না বলে মাথা নাড়ল। তার চোখে এখন কোনো প্রশ্ন নেই, শুধু বিশ্বাস। গাড়িতে উঠে বসার কিছুক্ষণের মধ্যেই রোজার চোখ দুটো ভারী হয়ে এলো। সারাদিনের ক্লান্তি, আবেগ, আর এই অদ্ভুত প্রশান্তি—সব মিলিয়ে সে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে, সে নিজেও জানে না। ফ্রন্টসিটের পিছনের দিকে মাথা হেলিয়ে রেখেছে। হয়তো ঘুমের শান্তি হচ্ছে না। তূর্জান রোজাকে এনে তার কোলে বসিয়ে দিল। রোজা হঠাৎ উষ্ণতা পাওয়ায় তূর্জানকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরল।বুকে মাথা রেখে ঘুমের দেশে পাড়ি জমালো।

তূর্জান একবার তাকিয়ে মুচকি হাসল। রোজার পিঠে একহাতে জড়িয়ে, অন্য হাতে ড্রাইভ করতে লাগল।পরপর কপালে ঠোঁট ছুইয়ে আওড়াল,“পাগলী একটা…”


এদিকে আরিয়ানদের গাড়ি ছুটে চলছে মির্জা বাড়ির উদ্দেশ্যে। রাত প্রায় দশটা বেজে চল্লিশ। তুবা আর আরিয়ান এক গাড়িতে। আর পিছনে আত্মীয়রা সব অন্য গাড়ি করে আসছে।আরিয়ান ড্রাইভ করছে। পাশে তুবা বসে। তুবা এখনো কান্না করেই যাচ্ছে। আরিয়ান একটু পরপর টিস্যু এগিয়ে দিচ্ছে, আর মুচকি হাসছে। আরিয়ানের হাসি যেন তুবার আগুনে ঘি ঢালার মতো।

এই লোক দিব্বি হাসছে। আবার তুবাকে টিস্যু এগিয়ে দিচ্ছে, মানে কি? তুবা যেন আরো কান্না করে, তাই বোঝাচ্ছে? তুবা একধ্যানে বাইরে তাকিয়ে থাকল। সে প্রিয়জন ছেড়ে এসেছে, কষ্ট তো তার হবেই। পাশে বসা লোক তো আর প্রিয়জন ছাড়েনি। তুবা বাইরে তাকিয়েই ডেস্কে টিস্যু বক্স থেকে টিস্যু নেওয়ার জন্য হাত বাড়ালো ভাগ্যক্রমে টিস্যু আর নেই। সব শেষ করে ফেলেছে। আরিয়ান আবার শব্দ করে হেসে ফেলল। তুবা অগ্নিভ চোখে তাকাতেই আরিয়ান থেমে গেল।
“ বিশ্বাস করো বউ, তুমি যে এভাবে কান্না করবে জানলে আমি আরো, টিস্যু বক্স নিয়ে আসতাম। আফসোস আমি জানতাম না। “

“ আমি কান্না করছি, তাতে আপনার কি? আপনার তো ভালোই লাগছে। “

“ তা লাগবে না। বউ পেলে কার না ভালো লাগে, বলো? “

“ অসভ্য পুরুষ। “

“ সভ্য হয়ে লাভ কি? “

বলেই একটা মেয়েলি রুমাল বের করে, এগিয়ে দিল তুবার দিকে। এই রুমাল তো সেদিন তুবা ওই অচেনা লোকটার হাত বেধে দিয়েছিলো। তুবা আবার কিছু বলতে উদ্দত হতেই, আরিয়ান একহাতে তুবাকে টেনে কোলে বসালো। তুবা এতক্ষন রেগে থাকলেও, এখন ভীষণ লজ্জা পাচ্ছে। হঠাৎ কেমন অনুভূতিরা জমা হচ্ছে। ছটফট করতেই আরিয়ান তুবার কপালে ঠোঁট ছুইয়ে দিল। তুবা লজ্জায় এখন মরিমরি অবস্থা।একদম নিস্তেজ হয়ে রইলো।রুমালের দিকে তাকিয়ে বলল,

“ রুমাল খানা এক প্রেয়সী দিয়েছিলো, তাই যত্ন করে রেখেছিলাম।কিন্তু এখন প্রেয়সীর চেয়ে বউকে বেশি আপন মনে হচ্ছে, তাই আপনাকে দিলাম। ফেরত দিয়েন কিন্তু। ম্যাডাম কি লজ্জা পাচ্ছেন? “

তুবাকে চুপ থাকতে দেখে আরিয়ান মজা করে আবার বলল, “ লজ্জা পাচ্ছেন ম্যাডাম। লজ্জা ভেঙে দিবো। “

লজ্জায় তুবার চোখমুখ দিয়ে লাভা বের হচ্ছে। এমন অসভ্য পুরুষ আছে পৃথিবীতে। পরপর নিজের কানের কাছে ঠোঁটের ছোয়া পেতেই তুবা হকচকিয়ে গেল। নিজে ঘুরে তাকাতে গিয়ে বাধল আরেক বিপত্তি, আরিয়ানের ঠোঁট প্রায় ছুঁয়ে দিচ্ছিলো তার ঠোঁট। ভাবনার মাঝেই আরিয়ান ব্রেক কষলো। তুবা হকচকালো বটে, তবে তার আগেই আরিয়ান তাকে তার সিটে বসিয়ে দিল।

তারা মূলত মির্জা গেটের সামনে উপস্থিত হয়ে গেছে। তুবার শাশুড়ি সহ বেশ কিছু আত্মীয় এগিয়ে এসে তুবাকে বরণ করে নিল। বরণ শেষ করে, তুবাকে ভিতরে নিয়ে যাওয়া হলো। তুবা আজ থেকে মির্জা পরিবারের বৌমা। তার পুরো পৃথিবী পাল্টে গেছে। কি অদ্ভুত নিয়ম তাই না?

রাত আরও গভীর হয়েছে।মির্জা বাড়ির ভেতর আলো, হাসি, কোলাহল,সব মিলিয়ে এক অন্যরকম উষ্ণতা। তুবাকে নিয়ে সবাই ব্যস্ত। কেউ মিষ্টি খাওয়াচ্ছে, কেউ নাম জিজ্ঞেস করছে, কেউ আবার মজা করে বলছে,

“বউমা, এত কাঁদলে কিন্তু চোখ ফুলে যাবে!”

তুবা জোর করে একটা হালকা হাসি দিল। কিন্তু ভেতরে ভেতরে এখনো একটা শূন্যতা কাজ করছে। নতুন ঘর, নতুন মানুষ,সবকিছুই যেন অপরিচিত অথচ এটাই এখন তার নিজের জায়গা। কিছুক্ষণ পর সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলে, তুবাকে নিয়ে যাওয়া হলো তার ঘরে।
ঘরটা সাজানো,ফুলের গন্ধে ভরে আছে চারপাশ। বিছানায় লাল-সাদা ফুল ছড়ানো, নরম আলোয় ঘরটা যেন স্বপ্নের মতো লাগছে।

তুবা খাটের পাশে দাঁড়িয়ে রইল। বুকটা আবার ধড়ফড় করছে। এই ঘর, এই রাত,সবকিছুই নতুন, অচেনা।ঠিক তখনই দরজাটা ধীরে বন্ধ হওয়ার শব্দ হলো।আরিয়ান। বন্ধ দরজার সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, ঠোঁটে সেই পরিচিত দুষ্টু হাসি।“কি ম্যাডাম? এবার আবার কাঁদবেন? টিস্যু নিয়ে আসবো?না একটু আমাকেও সময় দেবেন?”

তুবা মুখ ঘুরিয়ে নিল। এভাবে হঠাৎ তার অস্থিরতা বৃদ্ধি হচ্ছে,“আপনি সবসময় এমনই থাকেন?”

আরিয়ান ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে এল।
“না। সবার সাথে না। শুধু আমার বউয়ের সাথে।”

তুবা কিছু বলল না। তার আঙুলগুলো কাঁপছে। আরিয়ান সেটা খেয়াল করল।একটু কাছে এসে নরম গলায় বলল,
“এত ভয় পাচ্ছো কেন?”

তুবা খুব আস্তে বলল,“ভয় না… সবকিছু নতুন লাগছে, তাই আর কি।”

আরিয়ান এক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল তার দিকে। তারপর আলতো করে তুবার হাতটা নিজের হাতে নিল।
“নতুন তো হবেই। কিন্তু একটা জিনিস পুরনো আছে,আমি। কিন্তু তুমি তো মনে হচ্ছে আমাকেও ভুলে গেছো। নাথিং, আমি মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য আছি তো! আজ থেকে আমি তোমার সেই একান্ত অপরিচিত মানুষ, পরিচিত হওয়ার জন্য দাড়িয়ে।”

তুবা ধীরে ধীরে তাকাল তার দিকে। চোখে পানি নেই, কিন্তু এক ধরনের শান্তি আছে।আরিয়ান হালকা করে হাসল।“আর একটা কথা বলি?”

“কি?

“ আমার না ভীষণ ঘুম ঘুম পাচ্ছে, তুমি চেঞ্জ করে এসো। ঘুমিয়ে যাও, বড্ডো টায়ার্ড লাগছে তোমাকেও।”

বলেই সে আলতো করে তুবার কপালে ঠোঁট ছোঁয়াল।তুবা চোখ বন্ধ করে ফেলল।এই ছোঁয়ায় কোনো দুষ্টুমি নেই, কোনো তাড়াহুড়ো নেই,শুধু একটুখানি আশ্বাস।বাইরে তখনও আত্মীয়দের হাসির শব্দ ভেসে আসছে। কিন্তু এই ঘরের ভেতর, দুটো মানুষ ধীরে ধীরে একে অপরের সাথে মানিয়ে নিচ্ছে,অচেনা থেকে আপন হওয়ার পথে।
আরিয়ান প্রথমে তুবার ভারী গহনা খুলতে সাহায্য করল। তারপর নিজে চেঞ্জ করে এসে, বেডে গা এলিয়ে দিলো। তুবাকেও ফ্রেশ হয়ে আসতে বলল। তুবা বেশ খানিকক্ষণ সময় নিয়ে একেবারে শাওয়ার নিয়ে বেরোলো। তার কেমন অসস্তি হচ্ছিলো। একটা জরজেটের শাড়ি গায়ে জড়ালো। ভেজা কাপড় বেলকনিতে দিয়ে দিল। ফর্সা গায়ে মেরুন রঙা শাড়ি বেশ লাগছে।

তুবা রুমে এসে দেখল, আরিয়ান তার শোয়ার জায়গা রেখে এককোনে ঘুরে শুয়ে আছে। দেখে মনে হচ্ছে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। তুবাও আর দেরি করলো না, নিজের জায়গাতে শুয়ে পড়ল। চোখের কার্নিশে এইমাত্র ঘুমের রেশ এসেছে। হঠাৎ নিজের ঘাড়ে তপ্ত নিশ্বাস আর পেটের উপর কারো হাতের ভার দেখে তড়িৎ বেগে চোখ খুললো। দেখলো আরিয়ান একদম তুবার দিকে সরে এসে গা ঘেসে শুয়েছে। শুধু তাই নয়,তুবাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে রেখেছে।

তুবা কিছু বলার আগেই আরিয়ান তুবার মুখের উপর ঝুকে বলল, “ একটু বেসামাল হই, বিশ্বাস করো একটু। “

তুবা লজ্জায় তাকাতেই পারল না। আরিয়ানের বুকে মুখ গুজে দিল। আরিয়ান হেসে তুবার নেত্রপল্লবে শব্দ করে চুমু একে দিল।


গাড়ি ধীরে ধীরে থামল একটা নির্জন, শান্ত জায়গায়। সামনে একটা ছোট কিন্তু অসাধারণ সুন্দর বাড়ি। চারপাশে নরম আলো, গেটের দুপাশে সাদা ফুল, আর বারান্দায় ঝুলছে ছোট ছোট লাইট।যেন গল্পের ভেতরের কোনো জায়গা।
তূর্জান ইঞ্জিন বন্ধ করে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল। রোজার মুখটা একবার ভালো করে দেখল। ঘুমন্ত মুখে একদম শিশুসুলভ শান্তি।

আস্তে করে বলল,“এই ঘরটা… আজ থেকে আমাদের। তোর বিষন্ন দিনের ছুটি হিসেবে এখানে যখন তখন চলে আসবি। আর আমি ঠিক তোকে খুজে নিবো।”

তারপর খুব যত্ন করে রোজাকে কোলে তুলে নিল।
রোজা অচেতন ঘুমে আচ্ছন্ন, তবুও তার হাতটা অজান্তেই তূর্জানের শার্ট আঁকড়ে ধরল। বুকে মুখ গুজে নিল, পরম আবেশে। যেন বুকের ভিতরে যেতে চায়ছে। তূর্জানূর সেই Roja Perfums Haute Luax এর গন্ধ যেন রোজার সর্বাঙ্গে ছড়িয়ে আছে। মেয়েটা যেন ওই পারফিউমের ঘ্রান কে ইচ্ছে করে নাসারন্ধে টেনে নিচ্ছে।

তূর্জান দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল। ভিতরে ঢুকতেই দেখা গেল,একটা বড় বেডরুম, চারপাশে নরম লাইট, ছাদের একপাশে কাচ,যেখান দিয়ে আকাশ দেখা যাচ্ছে। বিছানায় হালকা ফুল ছড়ানো। ভালোবাসায় সাজানো। বিছানার উপর হালকা গোলাপের পাপড়ি, পুরো রুমে সুইটনেস রোজ দিয়ে সাজানো। খাট থেকে শুরু করে, দেয়াল অব্দি।
পাশে মোমবাতির নরম আলো,সবকিছুতেই এক ধরনের শান্ত, মিষ্টি আবহ।

মিরান নিশ্চই করেছে এসব। তাকে শুধু রুম পরিষ্কার করার কথা বলেছিল তূর্জান। আর ও কি করে রেখেছে এইসব। ভাই হয়ে বোনের জন্য রুম সাজিয়ে রেখে গেছে। কি চিন্তা ভাবনা মিরানের?

তূর্জান ধীরে ধীরে রোজাকে ফুলের উপরি বিছানায় শুইয়ে দিল।
একটু ঝুঁকে কানের পাশে ফিসফিস করে বলল,
“স্বপ্নেও যদি হারিয়ে যাস, আমি কিন্তু খুঁজে আনবো…”


রাত অনেকটা গড়িয়ে গেছে। হঠাৎ মাঝরাতে রোজার ঘুম ভাঙল। চারপাশটা অচেনা। হালকা আলো, নতুন ঘর, পাশে ঘুমের ঘোরেই হাতড়ালো। তবে তূর্জান নেই। তবে বিছানায় নরম পাপড়ি জাতীয় হাতে বাধছে।রোজার মস্তিস্ক সজাগ হতেই উঠে বসল। সে কোথায়? কে নিয়ে এসেছে? এর আগে তো এমন বাড়িতে সে আসেনি। হঠাৎ বাথরুম থেকে পানির কলকলানি শোনা গেল। রোজা বাদে আর কে আছে এই রুমে। তূর্জান কোথায়? রোজা তো রীতিমতো ভয়ে জড়োসড়ো। এদিকে পুরো বেডে সুইটনেস রোজের গড়াগড়ি। পুরো বেড বললে ভুল হবে, পুরো রুমে এই একটা ফুলই বেশি।

রোজার মাথায় কি সব চিন্তা আসছে, ছেহহ! নষ্ট মাইন্ড। এই রাহেলা নেওয়াজ এইসব ঢুকিয়েছে মাথায়। তার তূর্জান ভাই মোটেও এমন না। রাগী,গম্ভীর, বদমেজাজি, কিন্তু ওইসব কাজ তার দ্বারা সম্ভব না। রোজা একটু বেশিই ভাবছে।
হঠাৎ দরজা খোলার শব্দে তাকাতেই দেখল, তূর্জান শাওয়ার নিয়ে বেরিয়েছে। কি স্নিগ্ধ লাগছে। এই পুরুষ কেবল তার একান্ত। দেখা তো দূরে থাক কেউ তাকে ছুতেও পারবে না। রোজা এই পুরুষের পাশে কাউকে আসতেই দেবে না।

রোজার ভাবনার মাঝেই তূর্জান বেরিয়ে এসেছে। এমনকি তার সামনে দাড়িয়ে অথচ রোজার তা খেয়ালই নেই। তূর্জান ঝুকে বলল, “ বউ এভাবে নজর দেয় না। আমি তো তোরই! আমার সব ও তোর, এভাবে তাকানোর কি আছে? “

রোজা হঠাৎ এমন উত্তরে কেশে উঠল। এমনটা আশা করেনি। রোজা প্রসঙ্গ পাল্টে বলল, “ আমরা কোথায় এসেছি? “

“ স্বপ্ননীড়ে। “

“ এটা কোথায়? আমরা এখন কোথায়?“

“ বাড়িতে!”

রোজার সব গুলিয়ে যাচ্ছে। তাও বলল,“ কার বাড়িতে? “

তূর্জানের গায়ে টিশার্ট আর প্যান্ট। গলায় এখনো টাওয়াল ঝুলছে, মাথার অবাধ্য পানি রাশি ফোটা ফোটা তূর্জানের গা বেয়ে ধাবিত হচ্ছে। রোজা একবার মাথা মোছার কথা বলতে চাইলো, কিন্তু কি ভেবে বললো না। তূর্জান বেডে বসে, রোজাকে একটানে তার উরুতে বসালো। রোজার দিকে খানিকটা ঝুকে বলল, “ তোর লেহেঙ্গা বড্ডো বিরক্ত করছে, এটাকে আগে সরাতে হবে। “

“ ম. মানে? “

তূর্জান মাথায় গাট্টা মেরে বলল, “ ভুলভাল চিন্তা বাদ দিয়ে দে। তোর থেকে তোর লেহেঙ্গার ওয়েট বেশি। “

রোজা যেন হাপ ছেড়ে বাচল। সে কি না কি ভেবেছে। তূর্জান নিজের হাত রোজার কোমড়ের কাছে বন্ধনী বানিয়ে একেবারে নিজের সাথে এটে নিল। মাঝে খুব কম দুরুত্ব এখন। রোজা অন্যদিকে মুখ করে চোখ বন্ধুরা করে রইলো। ঠোঁট তিরতির করছে। হাতের নখ খুটছে। তূর্জানের শীতল হাত রোজার কোমড় চেপে ধরতেই রোজা চোখ বড় করে তাকালো। তূর্জান স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল, “ জ্বর চলে আসবে আমার, তাড়াতাড়ি মাথা মুছে দে।”

মাথা মুছে দেওয়ার কথা শুনেই রোজার মনে পড়ল, সেই ছোটবেলার কথা। তূর্জানের ভেজা মাথা থেকে পানি চুইয়ে চুইয়ে কান, নাকের উপর দিয়ে নামছে। তূর্জান একপলক দেখে নিল রোজাকে এই মেয়ের জেদ অতিমাত্রা। তবে তূর্জানের এই মেয়ের রাগ, জেদ, অভিমান বড্ড ভালো লাগে।তাইতো সব অপছন্দের জিনিসও ইদানিং পছন্দের তালিক যুক্ত হচ্ছে। তূর্জান রোজার দিকে তাকিয়ে বলল,

“ আমার ঠান্ডা লাগলে কিন্তু তোর দোষ। দেখ ভিজে গেছি। “

রোজা তাকিয়ে দেখল সত্যিই তূর্জানের টিশার্ট ভিজে যাচ্ছে।কথা না বলে উঠে দাড়াল। মাথা মুছে দিতে লাগলো দুহাতে।

আজও তার ব্যতিক্রম নয়। বরং তূর্জানের গলা থেকে টাওয়াল নিয়ে মাথা রোজা মুছে দিতে থাকল।

রোজার আঙুলগুলো ধীরে ধীরে তূর্জানের চুলের ভেতর দিয়ে চলতে লাগল। টাওয়ালের নরম ছোঁয়ায় পানি শুকোতে থাকলেও, অদ্ভুত এক নীরবতা জমে উঠল দুজনের মাঝে। সেই নীরবতায় শুধু শোনা যাচ্ছে,দুজনের নিঃশ্বাসের শব্দ।

রোজা মাথা নিচু করে বলল,“এভাবে ভিজে থাকেন কেন সবসময়… ঠান্ডা লাগবে তো।”

তূর্জান হালকা হাসল। তার চোখ দুটো একদৃষ্টিতে রোজার দিকে স্থির। রোজা তাকাতেই রোজার হাত থেমে গেল এক মুহূর্তে। বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। রোজা টাওয়াল রেখে আসতে চাইলো, তবে তূর্জান সে সুযোগ দিল না। টাওয়াল পাশের সেন্টার টেবিলে ছুড়ে মারল। রোজা এখনো তূর্জান নেওয়াজের বাহুডোরে আবদ্ধ। কোমড়ের হাত সরাতে চাইলেও যেন তূ্র্জান নির্বিকার। কিছু বুঝতেই পারছে না। আবার নিজের উরুতে এভাবে বসিয়ে রেখেছে।

রোজার আবার বাড়ির কথা মনে পরতেই বলল, “ বললেন না তো কার বাড়িতে আমরা? “

তূর্জান ফোনে কিছু একটা বের করল, বাড়ির সব জায়গায় সেট করা সিসিটিভি কন্ট্রোলার, তূর্জানের ফোনে।গেটের সিসিটিভি ফুটেজ বের করতেই রোজার চোখ বড় বড় হয়ে গে। সে বিশ্বাসই করতে পারছে না। বাড়ির সামনে বড় বড় মার্বেল পাথরে লেখা ‘স্বপ্ননীড়’। রোজার সেই ছোট্ট খেলার ঘরের মতোই প্রায়। তূর্জানের দিকে তাকাতেই বলল, “ বউ এভাবে তাকায় না। কিছু-মিছু হয়ে গেলে, দায়ভার কিন্তু তোর। “

রোজা এবার তূর্জানকে দুহাতে ঠেলে দিল। এই লোক কি অসভ্য, ভাবা যায়? এই না-কি গম্ভীর, রাগী, বদমেজাজি তূর্জান নেওয়াজ। কেউ এনাকে দেখলে বিশ্বাসই করবে না। এমনিতে এমন ভাবে থাকে, যেন কিছুই জানে না। অথচ এই লোকটা কি লাগামছাড়া। তূ্র্জানকে ঠেলে দিলো, কিন্তু তূর্জানের হাত থেকে ছুটতে পারল না। তূর্জান রোজাকে নিয়েই বেডে পড়ে গেল। তূর্জানের বুকের উপর পরে আছে রোজা। কি অবস্থা? এই লোক এমন আঠার মতো চিপকে আছে কেন?

রোজাকে অবাক করে দিয়ে, তূর্জান রোজাকে বেডে শুইয়ে দিল। নিজে ঝুকে গেল, রোজার উপর। রোজা দুহাতে মুখ ঢেকে রেখেছে। তূর্জান আবার লাগামছাড়া কথা বলতেই রোজা তূর্জানের ঘাড়ে কামড় বসালো। তূর্জান ছাড়ালো না, রোজা খানিকবাদে নিজেই ছেড়ে দিল। তূর্জান নাকে নাক ঘসতেই রোজা বলল, “ সরি আর এমন করবো না। এখানে এন্টিসেপটিক নেই। আমি লাগিয়ে দিচ্ছি। “

“ কে জানত এখানে এসে, তুই এভাবে লাভবাইট বসিয়ে দিবি। আগে জানলে অবশ্যই এন্টিসেপটিক রাখতাম। “

“ সরুন তূর্জান ভা…”

কথা শেষ করার আগেই রোজার ঘাড়ে কামড় পড়ল। রোজা চোখমুখ কুচকে নিল। তূর্জান রোজার কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, “ আমি তোর কি? “

রোজা চুপ। তূর্জান আবার বলল, “ বল, আমি তোর কি হই? ভাই? “

রোজা তড়িঘড়ি করে উত্তর দিল। “ না। “

“ তাহলে আমি তোর কি? “
“ হাজবেন্ড। “
“ হাজবেন্ড কে ভাই ডাকে কে? “
“ ভুল হয়ে গেছে, আর বলবো না। “
“ তাহলে কি বলবি? “
“ জানিনা। সরুন তো। “
“ যদি না সরে যাই? “

“ আবার কামড় দিবো। “

“ ভালো, এবার আমাকে ডাক তো। জাস্ট তূর্জান।”

“ আপনি আমার থেকে কতবড়। এভাবে ডাকতে পারবো না। “

“ তাহলে তুমি করে ডাক। “

“ উহু, পারবো না। “

“ প্লিজ, বউ। একবার। “

“ সরুন আগে। “

“ আগে ডাক। “

“ এভাবে বাচ্চাদের মতো আবদার করছেন কেন?”

“ বাচ্চাদের মতো জেদ করলে, এতক্ষন যা করার নিজেই করে নিতাম। তুমি অর তূর্জান। “

“ তু.. তুমি। হয়েছে? এবার সরুন আমি ঘুমাবো। “

“ তুমি করে বল। “

রোজা চোখ বন্ধ করে বলল,“ তু.. তুমি স.. সরে যাও।আমি ঘুমাবো।“

বলতেই তূর্জান বলল,“ দুইবার তো ঘুমাতে দিলাম, একবার না হয় জেগে থাক। “

রোজা তূর্জানকে ধাক্কা দিল। “ অসভ্য, সরুন। কি লাগামছাড়া কথাবার্তা। “

তূর্জান মাতোয়ারা কণ্ঠে জবাব দিল, “ বউ, একটু অসভ্য এলাউ কর। একটু লাগামছাড়া হবো, বিশ্বাস কর একটু লাগামছাড়া। “

রোজা ওই চোখের দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে পারলো না। রোজা যেন আসাড় হয়ে পরেছে। ঠোঁট তিরতির করে কাপছে,
নিশ্চুপতা দেখে তূর্জান উঠে বসতে বসতে বলল, “ সরি, আ’ম এক্সট্রিমলি সরি। বেশি খারাপ লাগছে। তুই রেস্ট নে। আমি বেলকনিতে আছি।“

বলেই বেলকনির উদ্দেশ্যে পা বাড়াতে গেল। হঠাৎ আচমকা রোজা তূর্জানের হাত ধরে টান দিল। হ্যাচকা টানে, তূর্জান আবার বেডে পরে গেল। তূরোজার্জান কি হয়েছে এখনো বুঝতেই পারল না। একধানে সিলিং এর দিকে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ রোজা তূর্জানের মুখের উপর ঝুকে বলল,” তোমার একটু অসভ্য এলাউ করছি, বাট একটুই কিন্তু…

কথা শেষ করার আগেই কারোর বক্ষভাজের তলে ঠাঁই হলো। বাইরে তুমুল বর্ষন, সাথে দমকা হাওয়া। রুমের জানালা গুলো খোলা থাকায় পর্দা দুলছে। বজ্রপাত হচ্ছে, পুরোরুম আলোকিত হয়ে আবার তিমির অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে।সাথে রুমের ভিতরে ভারী নিশ্বাস। আজ বজ্রপাত হলেও রোজা একটুও ভয় পাচ্ছে না। বরং বজ্রপাতের শব্দে আরো গভীরভাবে কারোর বুকে মিশে যেতে চাইছে।

ইনশাআল্লাহ চলমান…

আর একটা পর্ব আছে। হাহহহ দুষ্টদের পর্ব।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply