#প্রণয়ঘোরের_সন্ধিতে
#লেখনীতে_সালমা_চৌধুরী
(০৪)
আজ বৈশাখের প্রথমদিন। প্রতিবছর বৈশাখ মাসের প্রথম দিন বৈশাখী মেলা উদযাপন করা হয় যার মাধ্যমে বাঙালির সংস্কৃতি ফুটে উঠে। শুধুমাত্র বাংলাদেশেই নয় বাংলাদেশ ছাড়াও বিভিন্ন দেশে বসবাসরত বাঙালী প্রবাসীরা এ উৎসব পালন করে থাকেন। চারদিকে আনন্দমুখর উৎসবের আয়োজন। বাহারি রঙের শাড়িতে সেজেছে মেয়েরা, সবার মতো নৌমিও আজ লাল পাড়ের সাদা রঙের শাড়ি পড়েছে। কানে আর গলায় মাটির গহনা পড়ে একদম বাঙালি সাজে সেজেছে। আন্নি এখনও সাজছে, এই সুযোগে নৌমি তাজের রুমের সামনে আসছে। একটু থেমে দরজা ধাক্কা দিতেই দেখল তাজ বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে আছে, বিছানার বাহিরে মাথা উল্টে রেখেছে। উল্টানো অবস্থায় শাড়ি পড়া নৌমিকে দেখে তাজের অদ্ভুত লাগল। সঙ্গে সঙ্গে সোজা হয়ে শুয়ে স্পষ্ট চোখে নৌমির দিকে তাকালো। নৌমির একহাত কোমড়ে অন্য হাতে দরজায় ধরে পরপর দু’বার ভ্রু নাচিয়ে জানতে চাইল,
” কেমন লাগছে আমাকে?”
তাজ মুচকি হেসে বলল,
” অতিরিক্ত ভদ্র যা কল্পনার বাহিরে।”
নৌমি হেসে বলল,
” ধন্যবাদ, তামজিদ ভাইয়া।”
তাজ প্রশস্ত নেত্রে তাকিয়ে বলে উঠল,
“এত ভালো হয়েছিস কবে?”
” আজই। ভাবলাম বছরের প্রথম দিন নতুন একটা বছর তাই সম্পর্কের আবেগগুলোও নতুন হোক।”
” ঠিক আছে। তোর মাথায় যেহেতু সুবুদ্ধি এসেছে তাহলে আজ থেকে আমিও তোকে মুসকান ডাকব। সম্পর্ক পুরোনো হলেও ডাকটা নতুন হবে। “
“দেখো ভুল করে আবার মুসকিল ডেকো না যেন!”
“আমি তোর মতো উন্মাদ না।”
“এখন উঠে তাড়াতাড়ি রেডি হও।”
” আমি তো ভেবেছিলাম নিলুর সাথে বের হবো।”
” ভাবিকে আমাদের সাথে ডেকে নাও, সমস্যা কোথায়?”
” আরে না, আন্নি, রাফি, রাদ ওরা দেখলে বাসায় বলে দিবে।”
” আমরা কি তাহলে একা যাব?”
” না না, তোদের একা ছাড়া সম্ভব না। আমি গোসল করে আসছি, একটু অপেক্ষা কর।”
“তোমার ফোনটা দাও, ছবি তুলবো।”
তাজ সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,
“ফোন নিতে আমার অনুমতি চাইছিস? ইম্প্রেসিভ।”
নৌমি ফোন নিয়ে যেতে যেতে বলল,
” ভাবছি বিনম্র হবো।”
” এত বেশি বিনম্র হতে যাস না যেটাতে তোর আশেপাশের মানুষের বদহজম হয়।”
নৌমি ফোন নিয়ে নিচে চলে গেছে। রাফি আর রাদের সাথে কতগুলো ছবি তুলেছে। নিজেও বেশকিছু সেলফি তুলেছে। এদিকে আন্নি এখনও রেডি হয় নি। নৌমি সোফায় বসে বসে ছবিগুলো দেখছিল এমন সময় কানাডা থেকে শুভ্রর কল আসছে। শুভ্রর ছবি ভাসতেই নৌমি দ্রুত কল রিসিভ করল। শুভ্র স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,
” শুভ নববর্ষ, ভাই।”
নৌমিকে দেখেই থমকালো। নৌমি মিষ্টি হেসে বলল,
“শুভ নববর্ষ, শুভ্র ভাইয়া। “
শুভ্র কিছুটা তপ্ত স্বরে বলে উঠল,
” তুমি?”
” তামজিদ ভাইয়া গোসল করতেছে, আমি ছবি তোলার জন্য ফোন নিয়ে আসছিলাম।”
“ওহ আচ্ছা। শুভ নববর্ষ, মিস তানজিদা মুসকান নৌমি।”
নৌমি মৃদু হেসে বলল,
” এই পৃথিবীতে মনে হয় একমাত্র তুমিই আছো যে আমার পুরো নাম জানে। বাকিরা তো নৌমি ডেকেই কুল-কিনারা পায় না। কত কত বন্ধুরা তো নুমিও ডাকে। “
শুভ্র নিরেট দৃষ্টিতে তাকিয়ে অনুষ্ণ কন্ঠে বলল,
” তোমাকে আজ খুব মায়াবী লাগছে। মাটির গহনা আর সাদামাটা সাজে বাঙালি মেয়ে লাগছে। মাথায় ঘোমটা দিলে একদম নববধূ লাগবে। তুমি শাড়ি পড়েছো নাকি? দেখি।”
তাজ উপর থেকে নামতে নামতে কথাগুলো শুনছিলো। নৌমি সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,
” হ্যাঁ, দাঁড়াও তোমাকে দেখাচ্ছি।”
নৌমি ফোনটা ফুলদানির সাথে রেখে যেই পেছাতে যাবে ওমনি তাজ ফোনটা টান দিয়ে নিয়ে গেছে। শুভ্রর দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা কন্ঠে বলল,
” শুভ নববর্ষ।”
“শুভ নববর্ষ কিন্তু তুই ফোনটা নিয়ে নিলি কেনো? নৌমি নাকি শাড়ি পড়েছে, দেখতে চেয়েছিলাম। “
“দেখার ইচ্ছে হলে দেশে এসে দেখবি। বিদেশের মাটিতে শুয়ে শুয়ে বাঙালির ঐতিহ্য দেখতে হবে না।”
“আমি বাঙালির ঐতিহ্য দেখতে চাই নি, নৌমিকে দেখতে চেয়েছি।”
” নৌমি বাঙালি সাজে সেজেছে তাই নৌমিও আজ বাঙালির ঐতিহ্য। হয়েছে?”
“একবার দেশে আসি শুধু, তারপর বুঝাবো।”
” সবসময়ের মতো আজও বলছি, ওয়েলকাম। “
নৌমি নির্বাক চোখে চেয়ে আছে, তাজের কাণ্ডে রাগ হলেও আজ তা প্রকাশ করল না। বছরের প্রথমদিন সে কোনোভাবেই ঝগড়া করতে চায় না। আন্নি রেডি হয়ে আসতেই সবাই একসঙ্গে বের হলো। মেলায় ঘুরে কিছু কেনাকাটা করেছে, খাওয়াদাওয়া করে বাসায় আসতে আসতে দুপুরের পর হয়ে গেছে। সবাইকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে তাজ আবারও বেড়িয়েছে।
★
ভালো খারাপের মাঝে কাটছে দিন, বৈশাখের তপ্ত গরমে অতিষ্ঠ সবাই। সাথে হুটহাট কালবৈশাখী ঝড় তো আছেই৷ নৌমির ক্লাস শেষ অনেকক্ষণ হলো, আজ বাসায় যেতে একদম ইচ্ছে করছে না। ডিপার্টমেন্টের দু’একটা বান্ধবীর সাথে বসে গল্প করছিল আর আইসক্রিম খাচ্ছিলো। হঠাৎ একটা ছেলে কোথা থেকে দৌড়ে আসছে। নৌমিদের সামনে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
” এই তুমি তানজিদা না?”
নৌমি ভ্রু কুঁচকে বলল,
” হ্যাঁ, কিন্তু কেনো?”
“তুমি আগে মহিলা কলেজে পড়তে না?”
“হ্যাঁ।”
“আমাকে চিনতে পেরেছো?”
“না, কে আপনি?”
” চিনো নি? গতবছর প্রাইভেটে দেখা হয়েছিল, সিটে বসা নিয়ে তোমার আমার তুমুল ঝগড়া হয়েছিল। স্যার এসে আমাদের ঝগড়া থামিয়েছিল। মনে নেই?”
“ওহ হ্যাঁ, মনে পড়েছে। তুমিও কি এই ভার্সিটিতে পড়ো?”
“yes, Management Subject.”
“ও আচ্ছা।”
“তুমি?”
“Accounting.”
“ভালোই হলো, মাঝে মাঝে দেখা হচ্ছে তাহলে। চলো কিছু খায়?”
“না, অন্যদিন।”
“তোমার ইচ্ছে। “
এমন সময় তাজ আসছে। নৌমিকে দেখেই তপ্ত স্বরে বলল,
“বাসায় চল।”
নৌমি আঁতকে উঠে বলল,
” তুমি এ সময় ভার্সিটিতে!”
“কাজ ছিল।”
নৌমি সবাইকে টাটা দিয়ে তাজের সাথে যেতে যেতে আবারও জিজ্ঞেস করল,
” তুমি যে ভার্সিটিতে আসবে এটা সকালে বলো নি কেনো?”
” না বলে এসে বিরক্ত করলাম বুঝি?”
“বিরক্ত কেনো করবে!”
“ছেলেটা কে ছিল?”
“তোমাকে বলছিলাম না, গতবছর প্রাইভেটে এক ছেলের সাথে সিটে বসা নিয়ে ঝগড়া হয়ছিলো। ঐ ছেলে টা।”
” ভালো তো। গোপনে রিলেশনও করিস নাকি?”
“তুমি কি পাগল? আমি রিলেশন করবো তাও আবার এমন ছেলের সাথে? ঝগড়াটে ছেলে আমি দুচোখে সহ্য করতে পারি না। এই ছেলে যখন গতবছরের কথা মনে করিয়ে দিল তখন ইচ্ছে করছিল ঠাস করে একটা থা*প্পড় দিয়ে দেয়। অবশ্য তুমি না আসলে মেরেই দিতাম৷”
” তোর কেমন ছেলে পছন্দ বল, খোঁজে দেখব নে।”
“আমার শান্তশিষ্ট ছেলে পছন্দ যে আমার সব কথা মানবে। আমার সাথে কখনো রাগ করবে না কিন্তু আমার দিকে কেউ কুনজর দিলে সে ঐ জায়গাতেই তাকে মেরে আধম*রা করে দিবে। তার চোখে আমি হবো বিশ্ব সুন্দরী বাকি মেয়েরা হবে পেত্নী।”
তাজ হেসে বলল,
” উপরে দেখ তো কি”
নৌমি তাকিয়ে বলল,
” আকাশ। কেন?”
“তোর স্বপ্নের প্রেমিক এখনও আকাশে।”
নৌমি ফোঁস করে বলল উঠল,
” দেখো, একদিন আমার টানে আকাশ থেকে উঁড়ে উঁড়ে আসবে।”
তাজ উচ্চশব্দে হেসে বলল,
” হ্যাঁ, কাক হয়ে।”
নৌমি রাগে তাজের হাতে চিমটি কেটে বলল,
” তুমি আসলেই একটা ফাজিল।”
“আমি ফাজিল হলে তুই কি?”
“আমি ভদ্র মেয়ে মুসকান।”
“আচ্ছা। “
★
রাত ৯ টার দিকে নিলুর কল আসছে। তাজ কল রিসিভ করতেই নিলু বলল,
” তুমি কি সত্যি সত্যি বিয়ে করবে আমাকে?”
“কেনো? কি হয়েছে?”
” আব্বু আমার কথা মানতেছে না। তুমি যেভাবেই হোক ম্যানেজ করো।”
“আমি কাল তোমাদের বাসায় আসি?”
“তুমি একা আসলে হবে না। তাছাড়া তুমি তো বেকার।”
তাজের মেজাজ খারাপ হয়ে গেছে, রাগান্বিত কন্ঠে বলে উঠল,
” এই মেয়ে, যখন রিলেশন করেছিলে তখন কি আমি চাকরিজীবী ছিলাম? নাকি কোনো মিথ্যা স্বপ্ন দেখিয়েছিলাম? বন্ধুত্বের সম্পর্কটাকে তুমি নিজে থেকে রিলেশনে টেনে নিয়েছো। তখন তোমার পরিবার কোথায় ছিল? তখন যে বার বার বলেছিলাম, চাকরির আগ পর্যন্ত আমার পাশে থাকতে হবে। কথা কানে যায় নি? এখন উঠতে বসতে বিয়ে বিয়ে করে মাথা খেয়ে নিচ্ছো। চাকরি কি আমার বাপের সম্পত্তি যে বললাম আর দিয়ে দিল।”
নিলু কিছু না বলেই কল কেটে দিয়েছে। তাজও ফোন বন্ধ করে রাগে শুয়ে পরেছে। কিছুক্ষণ পরেই আন্নি পড়তে আসছে বাটিতে পুডিং নিয়ে আসছে। তাজকে ডাকতেই তাজ বলে উঠল,
” আজ তোকে পড়াতে পারবো না, বাসায় যা। “
” আচ্ছা কিন্তু আপু তোমার জন্য পুডিং পাঠিয়েছে দরজা খুলে এটা রাখো।”
” আমি খাবো না, নিয়ে যা।”
” আমি কি নিচে রেখে যাব? যদি রাদরা খেয়ে ফেলে? “
” বাসায় নিয়ে যা, আমি খাব ন।”
“আপু যে বলল,”
“আন্নি, আমি বের হলে কিন্তু খুব খারাপ হবে।”
আন্নি সঙ্গে সঙ্গে চলে গেছে। বাসায় গিয়ে নৌমিকে বলতেই নৌমি রাগে কটমট করতে শুরু করেছে। নিজের ফোন থেকে তাজের নাম্বারে কল দিতেই দেখল ফোন বন্ধ। নৌমির মেজাজ আরও বেশি খারাপ হলো। আগে নৌমি পুডিং বানালে তাজ কাউকে দিতেই চাইতো না, বেশি অর্ধেকটা নিজে খেয়ে বাকিটা সবার জন্য রাখতো। তাই আজ নৌমি আলাদা করে তাজের জন্য একটা পুডিং বানিয়েছে অথচ তাজ খেয়েও দেখল না। নৌমি রাগে গজগজ করে পুডিং নিয়ে তাজদের বাসায় আসছে। তাজের আম্মু ড্রয়িংরুমে বসে ছিলেন। নৌমিকে রাগে বাসায় ঢুকতে দেখেই চিন্তিত স্বরে জানতে চাইলেন,
” তুই এত রেগে আছিস কেনো?”
“তোমার ছেলে আমাকে অপমান করেছে। আমার কষ্টের কি কোনো মূল্য নেই? এর বদলা আমি নিয়েই ছাড়বো।”
নৌমি তাজের রুমের দরজা ধাক্কা দিচ্ছে। তাজ ভেতর থেকে রাগে বলল,
” আমাকে বিরক্ত করো না।”
নৌমি এবার জোরে চেঁচাল,
” দরজা না খুললে তোমার কপালে শনি আছে। তুমি আমার পুডিং কে অপমান করেছো৷ দরজা তোমাকে খুলতেই হবে।”
তাজ বাধ্য হয়ে দরজা খুলে দিল, কারণ বাড়িতে আব্বু আছে। ওনার কানে নৌমির চিৎকারের শব্দ গেলে যাচ্ছেতাই কান্ড হবে। দরজা খুলতেই নৌমি মুচকি হাসলো। তাজের শুকনো চোখ মুখ দেখে আতঙ্কিত কন্ঠে শুধালো,
“কি হয়েছে তোমার? “
“কিছু না।”
“খাও নি কিছু?”
“খিদে নেই। দে তোর পুডিং, পরে খেয়ে নিব।”
“না না, এটা সম্ভব না। তোমার কি হয়েছে না জেনে আমি যাচ্ছি না। তুমি এখন আমার সামনে পুডিং খাবে তারপর কি হয়েছে বিস্তারিত বলবে।”
তাজ দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে পুডিং হাতে নিয়ে বিছানায় বসে পুডিং খাচ্ছে। নৌমি সামনেই চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে।
চলবে…..
Share On:
TAGS: প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে, সালমা চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ২২+বর্ধিতাংশ
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ২
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ২৫
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ১৭
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ১৩
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ৬
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ২৪(প্রথমাংশ+শেষাংশ)
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ২৬
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ১৫
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ১৯