#প্রণয়ঘোরের_সন্ধিতে
#লেখনীতে_সালমা_চৌধুরী
(২৯)
রাতের আকাশ ঘুটঘুটে আঁধারে ডুবে আছে। মৃদু বাতাসে জানালার পর্দাগুলো একাকী সরে যাচ্ছে। বিষাদে আচ্ছন্ন তাজের মন। অজানা আকুলতায় মন হাঁসফাঁস করছে। অদ্ভুত এক পিছুটান তাজের মনে তোলপাড় চালাচ্ছে। শুভ্র’র বলা কথাগুলো বার বার কানে বাজছে৷ আনমনে নিজেকে প্রশ্ন করছে,
” আমি কি সত্যি নৌমির প্রতি দূর্বল হয়ে যাচ্ছি! কিন্তু এটা তো হওয়ার কথা ছিল না। নৌমি আমার বোন। আমি কখনো নৌমিকে নিয়ে অন্য কিছু ভাবিনি। তবে শুভ্র’র মনে বারবার এ কথায় কেন আসছে? শুভ্র’র বলা কথাগুলোর একটাও যদি সত্যি হয় তবে আমার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন উঠা অস্বাভাবিক কিছু নয়৷ আমি নৌমিকে ভালোবাসতে পারি না। কখনোই না।”
তাজের নির্ঘুম রাতের সঙ্গী কেবল একটা পেঁচা। অসহায় চোখে তাকিয়ে আছে। ভোর রাতে বাড়ির সবাই ঘুম থেকে ওঠার আগেই তাজ বাসা থেকে বেরিয়ে গেছে। কোথায় গিয়েছে, কেন গিয়েছে কোনোকিছুই কাউকে বলেনি। সারারাতের ভাবনায় তাজের বারবার মনে হয়েছে কিছুদিনের জন্য হলেও একা থাকা প্রয়োজন। যেখানে নিলু, নৌমি কিংবা অন্য কোনো মেয়ের নামও শুনতে পাবে না। শুধুমাত্র নিজেকে সময় দিবে, নিজেকে নিয়েই ভাববে।
শুভ্র ঘুম থেকে উঠেই তাজকে খুঁজতে লাগল। রাতে রাগের মাথায় তাজকে যা-তা কথা বলে ফেলেছিল। এখন সেগুলোর জন্যই আফসোস হচ্ছে। তাজের সাথে শুভ্র’র সম্পর্ক কখনোই এত খারাপ ছিল না। ওঁরা বরাবরই বন্ধু ছিল। আর এই বন্ধুত্বের সম্পর্কের মাঝে তৃতীয় কারো আগমন ঝড়ে উড়ে আসা বালির মতোই ঠুনকো।
শুভ্র বাড়ির প্রতিটা রুমে রুমে তাজকে খুঁজে চলেছে। খুঁজতে খুঁজতে
ছাঁদে এসেছে কিন্তু তাজ কোথাও নেই। আচমকা শুভ্র’র বুকটা কেঁপে ওঠল। শুভ্র’র উপর রাগ করে তাজ কোথাও চলে গেল না তো!
শুভ্র এক ছুটে রুমে গেল। ফোন হাতে নিয়ে তাজের নাম্বারে কল করল। অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে ওয়ারড্রবের উপর ফোন বেজে ওঠল। তারমানে তাজ ফোনও নিয়ে যায় নি। ভয়ে, আতঙ্কে শুভ্র’র শরীর ঘামতে শুরু করেছে। দু’ হাতে মাথা চেপে বিছানায় বসে পড়েছে।
আর মাত্র তিনদিন পর শুভ্রদের ফ্লাইট। এবারের মতো বেড়ানো এখানেই সমাপ্ত। তিনদিন পর চলে গেলে নৌমিকে সময় দেওয়ার মতো একমাত্র তাজই থাকবে। তাছাড়া ওদের দু’জনের বন্ধুত্ব সেই ছোটোবেলা থেকে। শুভ্র কোনোভাবেই তাদের মাঝে বাঁধা হয়ে থাকতে চায় না। কিন্তু নিজের রাগের প্রতিও নিয়ন্ত্রণ আনতে ব্যর্থ সে।
দুপুর পেরিয়ে বিকেল হতে চলল এখনও তাজের কোনো খোঁজ পাচ্ছে না। বাড়ির সকলে ঘুরেফিরে বারবার শুভ্রকেই জিজ্ঞেস করছে,
” তাজ কোথায়?”
প্রতিত্তোরে শুভ্র জবাব দিতে পারছে না। বারবার ‘আমি জানি না’ বলতেও বিবেকের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হতে হচ্ছে।
শেষ বিকেলে ছাঁদের কিনারায় দাঁড়িয়ে আকাশের পানে তাকিয়ে আছে শুভ্র৷ খানিক বাদে নৌমি এসে পাশে দাঁড়িয়েছে। কণ্ঠস্বর খাদে নামিয়ে শুধালো,
” তুমি কি সত্যিই জানো না, তামজিদ ভাইয়া কোথায়?”
শুভ্র চমকে তাকাল। শুষ্ক ঠোঁট ভেজানোর চেষ্টা করল। মৃদুস্বরে জবাব দিল,
” আমাকে বলে যায় নি।”
” তোমাদের দু’জনের মধ্যে কি ঝগড়া হয়েছে?”
” কেন?”
” রাতে বেলকনিতে দাঁড়িয়ে ছিলাম। তখন দেখলাম তোমরা দু’জন চিৎকার করছো। যদিও কারণ শুনতে পাইনি। তবে এক্সপ্রেশন দেখে মনে হয়েছিল দু’জনের মধ্যে কোনো বিষয় নিয়ে তুমুল ঝগড়া চলছে।”
শুভ্র কয়েক মুহুর্ত নিঃশব্দে নৌমির দিকে তাকিয়ে রইল। মেয়েটা মাঝে মাঝে এত কোমল আচরণ করে মনে হয় সে সবকিছু বুঝে। বুকের ভেতর অদ্ভুত উষ্ণতা ছড়িয়ে জানান দেয় সেই কোমলপ্রাণ বার্তা। ভালোবাসার ইতিকথা। শুভ্র যে নৌমিকে ভালোবেসে ফেলেছে সে কথা নৌমিকে বলবে কিভাবে! সে কি বুঝে না শুভ্র’র মনের অপ্রকাশিত অনুভূতি।
নৌমি ভ্রু কুঁচকে ফের শুধাল,
” কথা বলছ না কেন?”
শুভ্র মলিন হেসে দৃষ্টি সরিয়ে নিল। দূরের ওই আকাশের পানে তাকিয়ে আস্তে করে বলল,
” তাজকে খুব বেশি মিস করছ?”
নৌমি স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,
” মিস করাটা কি অস্বাভাবিক কিছু?”
” একদম না। আমি যখন থাকব না তখন কি আমাকেও এভাবেই মিস করবে?”
” কিভাবে?”
” এইযে আজ সকাল থেকে তাজকে খুঁজতে তুমি ৮ বার এই বাসায় এসেছো। আমি ব্যতীত সবাইকে কয়েকবার করে জিজ্ঞেস করেছো। তাজের নাম্বারে ৫৭ বার কল করেছো। সবশেষে একপ্রকার বাধ্য হয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করতে এসেছো।”
নৌমি সন্ধিহান কণ্ঠে আওড়াল,
” আমি তামজিদ ভাইয়াকে ৫৭ বার কল দিয়েছি এটা তুমি কিভাবে জানলে?”
” তাজ রুমে ফোন রেখে গেছে।”
” ফোন নেয় নি?”
” না।”
” কোথায় গেল তাহলে?”
” জানি না। হয়তো আশেপাশে কোথাও নয়তো দূরে।”
” ঝগড়া করেছো কি নিয়ে? তামজিদ ভাইয়া তো ঝগড়া করার ছেলে না। কি হয়েছিল?”
” তবে ধরে নাও আমিই ঝগড়া করেছি। আমিই খারাপ। তোমার ভাইয়াকে রাগিয়ে দেওয়ার মূলে আমি। এখন আমাকে কি শাস্তি দিতে চাও বলো।”
নৌমি মৃদু হেসে বলল,
” তোমাকে শাস্তি দিতে চাই না। আমার তামজিদ ভাইয়াকে প্রয়োজন।”
“কেন?”
” এমনি। পার্সোনাল কথা আছে।”
শুভ্র স্তম্ভিত গলায় প্রশ্ন করল,
” পার্সোনাল কথা! “
” চমকে ওঠার কি আছে! তামজিদ ভাইয়ার বিয়ের বিষয়ে কথা আছে।”
” তুমি কি তাজকে বিয়ে করছো?”
” হ্যাঁ তো। তুমি জানো না? বাড়ির সবাই জানে আর তুমি জানো না?”
” সবার কথা আমি শুনতে চাইনি নৌমি। তুমি কি বিয়েতে রাজি?”
নৌমি আশেপাশে নজর বুলিয়ে ঠাণ্ডা কণ্ঠে বলল,
” নিলু আপু ডিভোর্স দিলে আমি বিয়ে করে নিব। আমার কোনো আপত্তি নেই।”
” মানে?”
নৌমি মুচকি হেসে বলল,
” মানে সিম্পল। খুব শীঘ্রই বিয়ের দাওয়াত পাচ্ছো। দাওয়াত পাওয়া মাত্র টিকেট কেটে বাসায় চলে আসবে। বুঝলে?”
শুভ্র উত্তর দিচ্ছে না। নৌমি ফের বলল,
” আর হ্যাঁ, তামজিদ ভাইয়া বাসায় আসামাত্র আমার সাথে যোগাযোগ করতে বলবে। ইমার্জেন্সি। ওকে?”
” ওকে।”
দেখতে দেখতে দুই দিন কেটে গেল। তাজ বাসার কারো সাথে যোগাযোগ করছে না। আজ সকালে শুভ্ররাও চলে গেছে। গত দুই দিন শুভ্র ঠিকমতো ঘুমাতে পারেনি। বারবার তাজের কথায় মনে হয়েছে। অনেক খুঁজে তাজের বন্ধুদের সাথেও যোগাযোগ করেছে। কিন্তু তাজের খোঁজ কারো কাছে নেই। শুভ্র ভেবেছিল তাজের সাথে ঠাণ্ডা মাথায় কথা বলবে। যাওয়ার আগে নৌমিকে নিজের অব্যক্ত অনুভূতির জানান দিয়ে যাবে। কিন্তু এইটুকু রাগের ফল এত নিকৃষ্ট হবে তা ভাবতে পারেনি। তাই পরিস্থিতির চাপে পড়ে নৌমিকেও কিছু বলতে পারেনি। যাওয়ার আগে শেষবারের মতো নৌমিকে বলেছিল,
” আমি খুব শীঘ্রই ফিরব। তোমাকে বলার মতো অনেক কথা আছে।”
নৌমি প্রতিত্তোর করেনি। শুধু মন খারাপ করে তাকিয়ে ছিল। নৌমি কি কিছু বুঝেছে? নাকি সবটাই মিছে মায়া।
★
১ সপ্তাহ হতে চলল। নৌমি সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তাজদের বাসায় পরে থাকে। টিভি দেখার নাম করে সর্বক্ষণ ড্রয়িং রুমে বসে থাকে৷ আর ক্ষণে ক্ষণে সদর দরজার দিকে তাকিয়ে থাকে। মনের কোনে কিঞ্চিৎ ভয়ের জন্ম হয়েছে। গত দুদিন যাবৎ মনে হতে লাগল,
” তাজ বোধহয় নিলুকে নিয়ে পালিয়েছে।”
এই বাড়ির মানুষদের কথাবার্তা। প্রতিদিনই নৌমি তাজের বিয়ের বিষয়ে আলোচনায় হয়তো বিরক্ত হয়ে তাজ এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে৷ আজ ভাবনাগুলো একটু বেশিই ঘুরপাক খাচ্ছে। হাবিজাবি ভাবনার এক পর্যায়ে নৌমির ঠোঁটের কোনে হাসি ফুটেছে। নৌমি কল্পনা করছে, তাজ নিলুকে নিয়ে এই বাড়ির দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে৷ নিলুর পড়নে লাল বেনারসি, দু’হাতে মেহেদী। একদম বিয়ের সাজে হাজির হয়েছে। এমতাবস্থায় বাসার পরিস্থিতি কি হবে!
আর পাঁচজন খলনায়কের মতো মামাও হয়তো বলে বসবেন,
” আজ থেকে তুই আমার ছেলে না।”
নাকি বলবেন,
” তুই এই মুহুর্তে এই মেয়েকে ডিভোর্স দিয়ে আমার পছন্দ করা মেয়েকে বিয়ে করবি। নয়তো আমার সম্পত্তি থেকে তোকে বহিষ্কার করে দিব।”
মামি কি বলবেন! হয়তো কাঁদতে কাঁদতে বলবেন,
” এই মেয়ে আমার সোনার সংসারটাকে ধ্বংস করে ফেলেছে। আমার অবুঝ ছেলেটাকে জাদু করেছে।”
বাড়ির প্রতিটা মানুষ যখন নিজেদের মতো রিয়াকশন দিতে ব্যস্ত থাকবে তখন নৌমিকেও কিছু না কিছু করতে হবে। যতই হোক সে এই বাড়ির বৌ হওয়ার যোগ্যতা রাখে। নৌমি ভাবছে সে কি করবে,
‘ হাউমাউ করে কাঁদবে, মাটিতে গড়াগড়ি করবে আর বলবে, আমার কপালে এত বড় শনিটা কে লাগালো। আমি যে বিয়ের আগেই বিধবা হয়ে গেলাম। সরি সরি, বিধবা না তো। শব্দটা কি হবে! অনাদরিণী। না ওই পরিস্থিতিতে এই শব্দটা ঠিক মানাবে না। তবে কি বলা যায়! কলঙ্কিনী? ‘
হঠাৎ তাজের মা ডাকলেন,
” এই নৌমি! একা একা হাসছিল কেন?”
তৎক্ষনাৎ ঘোর কাটল। থতমত খেয়ে তাকাল। হাসি থামিয়ে জোরে নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল,
” এমনি।”
তাজের মা সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন,
” আমার কেন যেন মনে হচ্ছে তাজ কোথায় আছে তুই জানিস। আমাদেরকে বলছিস না।”
” আমি কি করে জানবো? তোমার ছেলে কি আমাকে বলে গিয়েছে নাকি!”
” বলতেই পারে।”
” হ্যাঁ বলেছে তো। তোমাদের ছেলে বিয়ে করে বউ নিয়ে আসবে। হয়েছে? “
পেছন থেকে তাজের আব্বু গুরুগম্ভীর কণ্ঠে আওড়ালেন,
” কি বললে?”
নোট- পরবর্তী পর্ব আগামীকাল আসবে।
Share On:
TAGS: প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে, সালমা চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ২০+এক্সট্রা
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ১৭
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ৮
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ৩০
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ১৬
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ২৬
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ২
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ১৩
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ১০
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ১১