#প্রণয়ঘোরের_সন্ধিতে (২০)
#লেখনীতে_সালমা_চৌধুরী
নিস্তব্ধ রাত। আঁধারে ঢাকা আকাশ। প্রিয় মানুষকে হারানোর ভয়ে এক বীরপুরুষের নির্ভীকতার পরিচয় জ্ঞাপন। এবার প্রতিত্তোরের প্রতীক্ষা।
ভাবাবেগ শূন্য তাজ। চেহারার রঙ বিবর্ণ হলো না, চোয়াল শক্ত হলো না। মন-মেজাজ বিক্ষিপ্ত হওয়ার পরিবর্তে শান্ত ছেলের মতো শার্টের বোতাম খুলতে ব্যস্ত হলো৷ যেন শুভ্র’র কথা কানেই পৌঁছায় নি। তাজের মৌনাবলম্বন অবস্থা দেখে শুভ্র ‘র মাথায় দুশ্চিন্তা চাপলো। নৌমিকে ভালোবাসে বলার বদলে অন্য কোনো মেয়ের নাম নিয়ে ফেলে নি তো!
তাজ হালকা রঙের একটা টিশার্ট পরে ওয়াশরুমে চলে গেল। এদিকে শুভ্র’র মাথায় রক্ত উঠে যাচ্ছে। তাজের রিয়াকশন নেই কেনো? তাজ কি কিছু শুনে নি! বাকি কথা শুনলে এই কথা কেনো শুনবে না?
দূর-দূরান্তের দুই-একটা মসজিদে ফজরের আজান দিচ্ছে। তখনই তাজের ফোনে নৌমির কল এলো। ফোন ভাইব্রেট হতেই শুভ্র ফোন হাতে নিল। মুসকান নামের সাথে নৌমির শাড়ি পরা সুন্দর একটা ছবি সেট করা। শুভ্র’র মেজাজ চরম মাত্রায় খারাপ হলো। ক্ষণিকের ব্যবধানে তাজের উপর রাগ তীব্র হতে লাগল। কল রিসিভ করে ফোন কানে ধরতেই ওপাশ থেকে নৌমি বলল,
“সরি, তোমাকে ধন্যবাদ দিতে মনে ছিল না। অনেক অনেক ধন্যবাদ তোমাকে। দোয়া করি তোমার মনের সব ইচ্ছে পূরণ হোক, আমিন।”
শুভ্র দাঁতে দাঁত পিষছে। নৌমি ফের বলল,
” বলো আমিন।”
শুভ্র আমিন বলছে না। উল্টো নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে। দুচোখ রক্তাভ। চাউনিতে পরিষ্কার রুষ্টতা। তাজ ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এক ঝটকায় শুভ্রর হাত থেকে নিজের ফোন কেড়ে নিয়ে রাগান্বিত কণ্ঠে চ্যাঁচিয়ে উঠল,
” কাকে কল দিয়েছিস?”
” আমি কাউকে কল দেয় নি।”
নৌমি আমতা আমতা করে বলল,
” হ্যালো।”
তাজ স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,
” হ্যাঁ, বল।”
” আমিন বলতে বলেছি তোমাকে।”
তাজ আগেপিছে না ভেবেই বলে দিল,
” আমিন। কিন্তু কেনো?”
” আগে কি বলেছি শুনো নি তুমি?”
” না। আবার বল।”
“এক কথা বার বার বলতে ভালো লাগে না।”
” ঘুমাস না কেনো?”
” ঘুম উড়ে গেছে নীল আকাশে।”
” ভণ্ডামি রেখে ঘুমাতে যা।”
শুভ্র খড়খড়ে গলায় তাজকে ধমক দিল,
” নিজে ভণ্ড অন্যকে কি সাজেশন দেস তুই?”
শুভ্র’র কথা শুনে নৌমি মিষ্টি হেসে জিজ্ঞেস করল,
” শুভ্র ভাইয়া কি সজাগ? “
” হ্যাঁ।”
” ভাইয়াকে ফোনটা দাও তো।”
” কেনো?”
” আরে দাও তুমি।”
তাজ অনিচ্ছা স্বত্তেও শুভ্র’র হাতে ফোন দিল। শুভ্র মৃদুস্বরে আওড়াল,
” কি ব্যাপার?”
” তুমি নাকি সকালে বিয়েতে যাবে?”
” হ্যাঁ৷ তোমায় কে বলল?”
” তামজিদ ভাইয়া বলেছে। তা কখন যাবে?”
” ১১ টার দিকে।”
নৌমি কৌতুহলী কণ্ঠে আওড়াল,
” সেইজন্য ই কি ভোররাতে উঠে বসে আছো?”
” না, সেজন্য না। রাতে কল দিয়েছিলে আমাকে?”
নৌমি আশ্চর্য চোখে চাইল। উচ্ছ্বসিত কণ্ঠস্বর তৎক্ষনাৎ নিভে এলো৷ কি উত্তর দিবে। এত রাতে কল দেওয়ার কারণে তাজ যে ইচ্ছেমতো ঝেড়েছে সেই কথা তো শুভ্রকে বলা যাবে না। যদি বলে ঘুরতে যাওয়ার জন্য কল দিয়েছিল তাহলে তো আরেক বিপদ। দুই দিন পর যদি মাঝরাতে কল দিয়ে বলে, “চলো ঘুরে আসি!” তখন কি বলবে। তাজ তো গলা টিপে মেরেই ফেলবে। নৌমি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল৷ গলা ঝেড়ে শান্ত গলায় বলল,
” হ্যাঁ, তোমার খোঁজ নেওয়ার জন্য কল দিয়েছিলাম। তারপর তামজিদ ভাইয়া বলল তুমি ঘুমে তাই আর বিরক্ত করি নি৷”
” ওহ আচ্ছা।”
” শুভ্র ভাইয়া, শুনো।”
” হুমমম বলো।”
” তুমি না বলেছিলে আমাদের সবাইকে নিয়ে ট্যুরে যাবে।”
” হ্যাঁ যাব তো! বিয়ের ঝামেলা মিটিয়ে আসি তারপর যাব।”
তাজ গম্ভীর কণ্ঠে আওড়াল,
” কোথায় যাবি?”
শুভ্র ঠোঁটের কোনে হাসি টেনে বলল,
” সে কথা তোকে বলবো কেনো? আমার আর নৌমির সিক্রেট প্ল্যান।”
তাজ সঙ্গে সঙ্গে কপাল কুঁচকালো। শুভ্র’র থেকে ফোন নিতে চাইল। কিন্তু এবার আর পারলো না। শুভ্র শক্ত হাতে ফোন ধরে রেখেছে আর মুচকি মুচকি হাসছে। তাজ অগ্নি চোখে শুভ্র’র দিকে তাকালো। কিছু না বলেই বারান্দায় চলে গেলো। নৌমির রুমে এখনও আলো জ্বলছে। ভারী পর্দা ভেদ করেও তা স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে। কাঁচের জানালার এক পার্ট খোলা। তাজ কণ্ঠস্বর দ্বিগুণ ভারী করে জোরে চিৎকার দিল,
“নৌমি, ১০ সেকেন্ডের মধ্যে রুমের আলো না নিভলে তোর সব প্ল্যানের ১২ টা বাজাবো আমি।”
কথা সম্পূর্ণ শেষ হওয়ার পূর্বেই রুমের আলো নিভে গেল। তাজ তখনও বারান্দায় দাঁড়ানো। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে জানালার পর্দা কিছুটা সরে গেলো। নৌমির উত্তর এলো,
” ১০ মিনিটের মধ্যে তুমি না ঘুমালে আমিও মামাকে বিচার দিব।”
কথাটা বলেই পর্দা ছেড়ে দিল। তাজ মুচকি হেসে রুমে ঢুকল। শুভ্র’র হাতে তাজের ফোন। নৌমি কল কেটেছে অনেকক্ষণ আগে। শুভ্রর মুখ গোমড়া অথচ তাজের মুখে বিশ্বজয়ের হাসি৷ শুভ্র বিছানায় হেলান দিয়ে তপ্ত স্বরে আওড়াল,
” তোকে কি বলেছি! শুনিস নি?”
তাজের সাদামাটা জবাব,
” শুনেছি।”
“কিছু বললি না যে!”
“কি বলব!”
” আমি নৌমিকে ভালোবাসি। এই ব্যাপারে কিছুই বলার নেই তোর?”
তাজ ছোট করে নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল,
” যে নিজেকে ভালোবাসতে পারে না, তার অন্য কাউকে ভালোবাসার আগে লক্ষকোটি বার ভাবা উচিত। তুই এখনও ১০ বারই ভাবিস নি৷ সময় নে, ধৈর্য ধর লক্ষকোটি বার চিন্তা কর। তারপর মনকে জিজ্ঞেস করবি, নিজেকে ভালোবাসতে পেরেছিস কি না!”
“কি বলতে চাচ্ছিস?”
” আমি কি বলতে চাচ্ছি সেটা বুঝার বয়স তোর হয়েছে, শুভ্র। আবেগে ভেসে নিজের জীবনের সাথে সাথে একটা নিষ্পাপ জীবনকে ধ্বংস করার চেষ্টা করিস না। আগে নিজে মানুষ হ তারপর..! “
” আমি কি অমানুষ?”
তাজ মুচকি হেসে বলল,
” তুই যা ঠিক মনে করিস।”
“মানে?”
তাজ আর কথা বাড়ালো না। চুপচাপ আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়লো।
★
নৌমি ঘুম থেকে উঠে না খেয়েই ভার্সিটিতে চলে গেছে। গুরুত্বপূর্ণ ক্লাস আছে আজ। শুভ্র, সুমিরা তাদের কাজিনের বিয়ের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে। পার্কের এক কোনে তাজ বসে আছে। টিউশনে থাকাকালীন নিলু কল দিয়েছিল। দেখা করার জন্য খুব করে রিকুয়েষ্ট করছিল। নিলুর কথা মতোই পার্কে উপস্থিত হয়েছে। কিছুক্ষণ বাদেই নিলু এসেছে। তাজ দুচোখ বন্ধ করে বসে আছে। নিলু তাজের কাঁধে হাত রাখতেই চমকাল তাজ। ঘাড় ফিরিয়ে চাইল একবার৷ মৃদুস্বরে বলল,
“এসো।”
নিলু জিজ্ঞেস করল,
” কখন এসেছো?”
” ২০ মিনিট হতে চলল।”
” সরি, একটু দেরি হয়ে গেলো।”
” নো প্রবলেম। বলো।”
” আগামী সপ্তাহে আমার বিয়ের তারিখ ঠিক হবে।”
তাজের হৃদপিণ্ডটা ধপ করে উঠল। বক্রদৃষ্টিতে নিলুর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,
” এই কথা শুনাতে এসেছো আমায়?”
” তুমি কিছু করো নয়তো বিয়েতে দাওয়াত খেতে এসো।”
” বাহ! কি অসাধারণ কথা। আমি বার বার বলেছি তোমাকে আংকেলের সাথে কথা বলি আমি। কিন্তু না! তুমি সবসময় আমাকে আঁটকে রেখেছো। কথা বলতে দাও নি৷ বার বার বলেছো পারিবারিকভাবে সম্বন্ধ না আসলে তোমার কিছুই করার নেই।
একটা বার কথা বলার সুযোগই দিচ্ছো না। তোমার আব্বু আমার মতো জবলেস ছেলের কাছে বিয়ে দিবেন কি না সেটাও তো আমার জানা দরকার। আমার বাবাকে নিয়ে গেলেই যে ওনি রাজি হবেন সেটাও তো নিশ্চিত নয়। আমার আব্বু যে অসুস্থ এই খেয়াল কি তোমার আছে?
এতদিনে এসে বলছো কিছু করার হলে করতে!”
“তুমি আমার আব্বুকে চিনো না, তাজ।”
” তোমার আব্বুকে আমি খুব ভালো মতো চিনি। বরং দিনকে দিন তোমাকে আমার অচেনা লাগছে! তুমি কি সত্যিই সেই নীলু? যে আমার পেছনে পাগলের মতো ছুটতো। আমাকে নিজের করে পাওয়ার জন্য দেওয়ানা হয়েছিল। আজ কোথায় গেলো সে?
ইচ্ছে হলে যোগাযোগ করো, ইচ্ছে হলে দিনের পর দিন ফোন বন্ধ করে রাখো। তুমি কি আদোও আমাকে বিয়ে করতে চাও?”
নিলু অন্যদিকে মুখ করে নিভু নিভু কণ্ঠে বলল,
” আমি বাসায় কিছু বলতে পারব না। আব্বুর চোখে চোখ রেখে কথা বলার সাহস আমার নেই।”
” তোমার বলতে হবে না। আমি কথা বলি?”
” নাহ। তোমাকে প্রথম প্রশ্নটায় করবে, তোমার যোগ্যতা কি? কি উত্তর দিবে তুমি?”
” আমি ৩ টা পরীক্ষার রিটেন দিব। ২ টার ভাইবা দিব৷ ইনশাআল্লাহ সবকিছু ঠিক থাকলে একটা না একটা চাকরি হবে আমার।”
” এখন তো তুমি বেকার।”
তাজ জোরে নিঃশ্বাস ছেড়ে প্রশ্ন করল,
” তবে কেনো এসেছো আমার কাছে? কি চাও তুমি?”
” আমি শান্তি চাই তাজ। শান্তি!”
তাজ উঠে দাঁড়াল। ভারী কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
” তুমি কি আমাকে বিয়ে করতে চাও কি না বলো। হ্যাঁ অথবা না বলো।”
” না মানে… শুনো।”
” হ্যাঁ কি না?”
নিলু আমতা আমতা করে জবাব দিল,
” হ্যাঁ”
“বাসায় যাও এখন।”
” কি করবে তুমি?”
” সেসব তোমার জানতে হবে না। বাসায় যাও। আর হ্যাঁ বাসায় গিয়ে জানিয়ো আমাকে।”
” জি আচ্ছা।”
চলবে…..
#প্রণয়ঘোরের_সন্ধিতে ( এক্সট্রা)
#লেখনীতে_সালমা_চৌধুরী
নৌমির মন বিষন্নতায় ঢেকে আছে। রেজাল্ট প্রকাশের সময় যত এগিয়ে আসছে, হাত-পা তত ঠান্ডা হয়ে আসছে। বার বার শুধু মনে পড়ে। ভর্তির সময় তাজ খুব করে রিকুয়েষ্ট করেছিল,
” নৌমি, এই সাবজেক্ট নিস না। তোর কষ্ট হবে।”
নৌমি জবাবে বলেছিল,
” পৃথিবীর কোনো কষ্ট আমার আশেপাশে আসতেই পারবে না। বরং কষ্ট আমাকে দেখেই ভয়ে লুকিয়ে পড়বে।”
সেই নৌমি এখন পদে পদে বুঝতে পারছে তাজ কি বলেছিল!
তাজ বাসায় ফিরেছে বেশ কিছুক্ষণ হলো। নৌমি পড়ার টেবিলে বসে ছিল। হঠাৎ তাজের রুমের দিকে নজর পরায় উঠে গেলো জানালার কাছে। তাজ বেলকনিতে হেলান দিয়ে বসে আছে। নৌমি ডাকল,
” এইযে ভাইয়া… শুনছেন।”
তাজ শুনতে পেয়েও ঘুরে তাকায় নি। নৌমি কপাল কুঁচকে আবারও ডাকল,
” ঐ নিলুর তাজ…..”
তাজ চমকে উঠে নৌমির রুমের দিকে ঘুরে দাঁড়াল৷ রাগান্বিত কণ্ঠে হুঙ্কার দিল,
” মুসকান….”
“আমি জানি আমার নাম মুসকান।”
” তোর সাহস বড্ড বেড়ে গেছে।”
নৌমি ফিক করে হেসে বলল,
” আমার সাহস কম ছিল কবে? তাছাড়া তুমি শুনছিলে না বলেই এভাবে ডেকেছি।”
” কেনো ডেকেছিস?”
নৌমি খানিক চিন্তিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
” তোমার কি মন খারাপ?”
” না।”
” মনে তো হচ্ছে খুব মন খারাপ।”
” বললাম না কিছু না। চিৎকার করে কথা বলিস না। জানালা বন্ধ কর।”
“আমার জানালা আমি খুলে রাখব৷ তোমার কি সমস্যা? “
“থাক তুই। আমিই চলে যাচ্ছি।”
নৌমি তৎক্ষনাৎ চিৎকার করল,
” এই এই শুনো। তুমি চলে গেলে আরও জোরে চিৎকার করব।”
তাজ গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
” করতে থাক।”
তাজ দ্রুত পায়ে নিজের রুমে চলে গেল। তাজের আচরণে নৌমির মেজাজ আরও বেশি খারাপ হলো। রাগে কটমট করে বলল,
” দাঁড়াও দেখাচ্ছি।”
নৌমি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে চেঁচাল,
” মেজো মামা, মামি দেখো তোমাদের ছেলের কি হয়েছে! মনে হয় বাইরে ঝগড়া করে এসেছে।”
তাজ সঙ্গে সঙ্গে বেলকনিতে ফিরে গেলো। রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে বলল,
” নৌমি, আমি আসলে খুব খারাপ হয়ে যাবে!”
“তোমার কি হয়েছে বলো না কেনো?”
নৌমি- তাজের চিৎকার শুনে তাজের আব্বু বাসা থেকে বেড়িয়ে খোলা জায়গায় গেলেন। পেছন পেছন তাজের আম্মুও ছুটে গেলেন। তাজের আব্বু শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
” নৌমি! কি হয়েছে মা?”
আব্বুর কণ্ঠ শুনেই তাজ নৌমিকে ইশারা করল। নিজের ঠোঁটে আঙুল চেপে নৌমিকে চুপ করতে বলে ঝটপট রুমে চলে গেল।
নৌমি এবার রুম থেকে বেরিয়ে বেলকনিতে গেল। মামা-মামিকে উদ্দেশ্য করে বলল,
” তেমন কিছু না। আমি দেখছিলাম তোমাদের ছেলের জন্য কোনো চিন্তা আছে কি না! আমি ডাকলে ছুটে আসো কি না সেটায় পরীক্ষা করছিলাম।”
তাজের আম্মু মুখ গোমড়া করে বললেন,
” তুই জানিস না, তোর মামা অসুস্থ।”
” হ্যাঁ, জানি৷ কিন্তু তোমাদের ছেলের মনে হয় কথাটা মনে থাকে না। দুইদিন পর পর মুখ ফুলিয়ে বসে থাকে। আমি ডাকলে কথা বলে না। বাইরের মানুষের রাগ আমার উপর কেনো দেখাবে সে! এত শখ থাকলে বাইরের মানুষকে ঘরে আনার ব্যবস্থা করুক। সে চেষ্টাও তো করছে না।”
রুম থেকে নৌমির সব কথায় শুনতে পাচ্ছে তাজ। রাগে দুচোখ রক্তাভ হয়ে আছে। আব্বু আম্মুর সামনে নৌমিকে কিছু বলতেও পারছে না। তাজের আম্মু চিন্তিত হয়ে জানতে চাইল,
” কি বলেছিস? ঠিক বুঝতে পারি নি। বাসায় এসে কথা বল। দেখছি বিষয়টা।”
“আমি ৩ দিন তোমাদের বাসায় যাব না।”
” কেনো?”
” তোমার ছেলের সাথে রাগ করেছি।”
তাজ উঠে এসে রুমের দরজায় দাঁড়াল। নৌমিকে উদ্দেশ্য করে বলল,
” আসবি না তো আসিস না। এভাবে চিৎকার করে কথাও বলবি না। ভেতরে যা।”
নিচে আব্বু আম্মুর দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
” আম্মু, আব্বুকে নিয়ে বাসায় আসো। ঐ এক পাগল তোমরা আবার তাঁর কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছো! বাসায় আসো।”
তাজের মা কিছু বলতে গেল। কিন্তু তাজের আব্বু ওনাকে থামিয়ে দিয়ে ধীর গলায় বললেন,
” তুমি ওদের মধ্যে কথা বলতে যেও না। ওরা এখন ঝগড়া করছে একটু পরই দেখবে ঘুরতে বেরিয়ে গেছে। এটাই ওদের মধ্যেকার সম্পর্ক। শুধুমাত্র এই কারণে আমি ওদের দু’জনকে এক করে দিতে চাই।”
তাজের আম্মু বললেন,
” ওরা সুখে থাকুক এটা আমিও চাই। কিন্তু তাজ কেনো যেন সব সময় আপসেট থাকে৷ কিছু জিজ্ঞেস করলে বলে না। নৌমিকে বিয়ের কথা বলেছি তাতেও কোনো উত্তর দেয় না। উল্টে আমাকে বলে,
এত অধৈর্য হচ্ছো কেন!
তুমি একটু তাজের সাথে কথা বলো। কারো যেহেতু কোনো আপত্তি নেই তাহলে আমরা শুধু শুধু দেরি করছি কেনো!”
” আচ্ছা। আমি কথা বলব। তুমি চিন্তা করো না, এখন বাসায় চলো।”
তাজের আব্বু- আম্মু দু’জনেই বাসায় চলে গিয়েছেন। তাজ আর নৌমি এখনও দাঁড়িয়ে আছে৷ দু’জনের দৃষ্টিতে তীব্র আক্রোশ। নৌমি বিড়বিড় করে বলতে লাগল,
” আমি পাগল হলে তুমি পাগলের ভাই। তোমার বউ পাগলের ভাবি৷ তোমার হবু ছেলে পাগলের ভাতিজা।
পাগলের গোষ্ঠীর সবাই পাগল। “
তাজ গলা ঝেড়ে তপ্ত স্বরে আওড়াল,
” বিড়বিড় করছিস কেনো?”
” তাতে তোমার কি!”
“রুমে যা। আর একবার যদি বারান্দায় এসেছিস আর আমাকে ডেকেছিস তাহলে বাসায় এসে পিটাবো তোকে। “
” আহাগো। কত শখ! আসো আসো! দেখি কেমন পিটাতে পারো।”
” যাবি? ভাগ্যের কোন ফেরে আমার আর তোর রুম সামনাসামনি হলো এটায় বুঝতে পারি না।”
” আল্লাহ চান আমি তোমাকে দেখে রাখি তাই।”
” আমাকে দেখে রাখতে হবে না তোর।”
” হ্যাঁ হ্যাঁ। দেখব না। বউ নিয়ে আসো বাড়িতে। একবারও দেখব না। দরকার হয় জানালা ভেঙে দেওয়াল তুলে দিব। বারান্দায় কাঁটা ফেলে রাখব৷ একবারের জন্যও দেখব না।”
” ঠিক আছে যা এখন।”
নৌমি পরপর তিনবার ভেঙচি কেটে বারান্দা থেকে রুমে চলে গেল। জোরে শব্দ করে জানালা বন্ধ করে সঙ্গে সঙ্গে পর্দা টেনে দিল। নৌমি বিছানায় বসে ফোন হাতে নিতেই দেখল শুভ্রর ২ টা মিসকল ভেসে আছে৷ নৌমির রাগ কিছুটা কমল। শুভ্রকে কল দিতেই রিসিভ হলো। শুভ্র মৃদুস্বরে আওড়াল,
” এতক্ষণ কি করছিলে? কল দিলাম রিসিভ করলে না।”
” কল রিসিভ করব কিভাবে! আমি তো তামজিদ ভাইয়ার সঙ্গে ঝগড়া করতে ব্যস্ত ছিলাম৷ তোমার কল শুনতেই পাই নি। “
তাজের নাম শুনতেই শুভ্রর মাথায় রক্ত উঠে গেল। শ্বাস টেনে নিজেকে কোনোমতে নিয়ন্ত্রণ করে প্রশ্ন করল,
” তুমি কি আমাদের বাসায়?”
” না না। আমি তামজিদ ভাইয়ার সাথে রাগ করেছি। তিনদিন তোমাদের বাসায় যাব না।”
কথাটা শুনতেই শুভ্র’র ঠোঁটে কিঞ্চিৎ হাসি ফুটল। স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে মলিন হেসে বলল,
” ঠিক আছে। আমি বাসায় ফিরলে তারপর এসো কেমন!”
” তিনদিন না গেলে আসবোই না।”
” আচ্ছা বাবা!”
নৌমি প্রশ্ন করল,
” তুমি না বিয়ে বাড়িতে গেলে? আশেপাশে এত নীরব কেনো? বিয়ে বাড়ির কোনো শব্দ নেই। গানবাজনা নেই। কোথায় তুমি?”
” বিয়ে বাড়িতে ভালো লাগছিল না তাই বাড়ি থেকে চলে এসেছি। একটা চায়ের দোকানের বাইরে বসে তোমাকে কল দিলাম।”
” ওমা! বিয়ে বাড়ি ভালো লাগে না। এটা কেমন কথা! দেখতে আমি থাকলে বিয়ে বাড়ি কেমন জমজমাট হতো।”
” তুমি নেই বলেই হয়তো ভালো লাগছে না।”
শুভ্র তৎক্ষনাৎ জানতে চাইল,
” খেয়েছো?”
” না, খাবো। তুমি?”
“নাস্তা করেছিলাম।”
নৌমি শক্ত কণ্ঠে বলল,
” এখানে বসে না থেকে বিয়ে বাড়িতে যাও দেখবে খুব ভালো লাগবে।”
“তুমি যেহেতু বলছো তাহলে যাচ্ছি। “
” গুড। তুমি কত ভালো! আমি বললেই কি সুন্দর রাজি হয়ে যাও। অথচ তামজিদ ভাইয়া! পঁচা ছেলে একটা। সর্বক্ষণ আমার সাথে ঝগড়া লেগে থাকে।”
“ও তো এমনই।”
নৌমি ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে থতমত খেয়ে বলল,
” শুভ্র ভাইয়া, রাখছি এখন। তামজিদ ভাইয়া কল দিচ্ছে। মনে হয় সরি বলবে! টা টা।”
চলবে…..
Share On:
TAGS: প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে, সালমা চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ১৯
-
আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে গল্পের লিংক
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে সূচনা পর্ব
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ২৭
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ৫
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ৮
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ৭
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ২১(প্রথমাংশ+শেষাংশ)
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ৩০
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ৩১