Golpo কষ্টের গল্প পরগাছা

পরগাছা পর্ব ৩১


ইসরাত_তন্বী

(অনুমতি বিহীন কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ)

দিনের আলো ফুরিয়েছে বেশ অনেক্ষণ হলো। গুঞ্জরিকা বসে আছে সেই কলপাড়ের কাছেই একটা বেঞ্চে। পাশেই একটা ল্যাম্পপোস্ট জ্বলছে।‌ চারপাশ ঘুরে বেড়িয়ে অবশেষে আবারও এখানেই ঘাঁটি বেঁধেছে মেয়েটা। মাথার আঘাতটা তখন তেমন উপলব্ধি করতে পারেনি। কিন্তু আস্তে ধীরে সেটা ক্রমশ প্রকট হয়ে ওঠে। অবশেষে অসহায় হয়ে আগন্তুক সেই নারীর কথা মোতাবেক হেঁটে যেয়ে হাসপাতালে উপস্থিত হয়। সেখানে কিছুক্ষণ অবুঝের মতো দাঁড়িয়ে ছিল। অতঃপর দীর্ঘ একটা সময় নিয়ে একজন নার্সের সাহায্য নিয়ে ডাক্তার দেখাতে সক্ষম হয়। ঔষধ ও কিনে এনেছে। টাকা যা এনেছিল তার অর্ধেক ওখানেই রেখে এল। চিন্তিত মস্তিষ্ক, ক্লান্ত শরীর টেনে কোনোরকমে হেঁটে এখানে এসে উপস্থিত হয়েছে। তাছাড়া আর কিছু চেনে না তো গুঞ্জরিকা। কোথায় যাবে? কার কাছে যাবে?

ল্যাম্পপোস্টের নিয়ন হলদে আলোয় চারিদিক আলোকিত হয়ে আছে। আলোর সংস্পর্শে থাকলে ভয় কিছুটা হলেও কম হয়। গুঞ্জরিকা একেবারে নিস্তব্ধ হয়ে গেছে। মাঝ নদীতে সে ভাসছে। জীবনটা প্রতিমুহূর্তে অসহনীয় হয়ে উঠছে। এখন একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই এবং একটা কাজের ভীষণ প্রয়োজন। কিন্তু কীভাবে কী করবে? হঠাৎ সেই সময় মনে পড়ল বস্তির কথা। সে শুনেছে ঢাকা শহরে আলাদা করে বস্তি এলাকা আছে। আচ্ছা সেখানে কি কোনোভাবে একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই হবে? আজ কোনোরকমে এখানে রাতটা কাটিয়ে আগামীকাল বস্তি এলাকার সন্ধানে বেরোবে। ভাবনার অথৈ সাগরে নিজেকে ভাসিয়ে চুপচাপ বসে রইল মেয়েটা। আর কিই বা করার আছে।

আরিকা গুঞ্জরিকার পাশেই বেঞ্চে বসে ছিল। আজ সারাদিনে এইসবের চক্করে তার পেটে কিচ্ছুটি পড়েনি। অবশ্য গুঞ্জরিকা নিজেও অভুক্ত আছে। এই পর্যায়ে আরিকা ডাকল,
“মা, মা।”
গুঞ্জরিকা ভাবনা চ্যুত হলো। ঘাড় ঘুরিয়ে পাশে দেখল। আরিকার শুকনো মুখ দেখতেই বুকটা ব্যথিত হলো। আয়হায় বাচ্চাটাকে আজ সে খেতে দেয়নি। মুখে বলল,
“দুঃখিত সোনা। ভুল হয়ে গেছে আমার।”
ব্যস্ত হাতে ব্যাগ থেকে শস্য দানা বের করে আরিকাকে খেতে দিল গুঞ্জরিকা। সঙ্গে নিয়েই এসেছিল। আরিকা চুপচাপ খেতে লাগল। গুঞ্জরিকা একদৃষ্টে তাকিয়ে ওর খাওয়া দেখছে। ভাবল আরিকার খাওয়া হলে নিজেও কিছু কিনে এনে খাবে। নয়ত শরীর সকাল অবধি আর সায় দিবে না। চারপাশের নীরব পরিবেশ দেখে এমনিতেই ভয়ে সিটিয়ে আছে গুঞ্জরিকা। চোখ কান খোলা রেখেছে। কিন্তু ওই যে বলে না যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই সন্ধ্যা হয়। ওর ক্ষেত্রেও তাই হলো।

একজন পুরুষ গুটি গুটি পায়ে হেঁটে এসে বেঞ্চের অপর মাথায় বসল। গুঞ্জরিকা আড়চোখে দেখল তাকে। দেখতে কেমন ভয়ংকর। নোংরা দাঁতগুলো বের করে বিশ্রীভাবে হাসছে। গুঞ্জরিকার শরীর গুলিয়ে এল। স্বাভাবিক আর পাঁচজন মানুষের মতো নয় দেখতে। মেয়েটার অন্তঃস্থল ভীত হলো। দ্রুত পুঁটলি তুলতে নেওয়ার আগেই যা ঘটার ঘটে গেল। গুঞ্জরিকার হাত থেকে পুঁটলিটা কেড়ে নিয়ে ছুটে পালাল সেই চোরটা। গুঞ্জরিকা চিৎকার করে উঠল,
“আল্লাহ! আমার পুঁটলি।”
দৌড়াল চোরের পিছু পিছু অথচ শেষ রক্ষা হলো না। কিছুদূর দৌড়ে গেল মেয়েটা কিন্তু চোরটা কোথায় যেন হাওয়া হয়ে গেল। চোখের পলকে সবটা ঘটে গেল। পরাজিত সৈনিকের ন্যায় ফিরে এসে ধপ করে বেঞ্চে বসে পড়ল। বুক ফেটে কান্না আসছে গুঞ্জরিকার। শেষ সম্বল টুকু ছিল ওখানে। সেটাও খুইয়ে বসল। এখন কীভাবে বেঁচে থাকবে এই কনক্রিটের শহরে! এখানে মানুষ মরে পড়ে থাকলেও কেউ মুখ ফিরিয়ে দেখে না। আল্লাহ আবার নতুন এই কোন বিপদে ফেলল? গুঞ্জরিকার ভীষণ কান্না পেল। ওর উচ্চ গলার আওয়াজ শুনে কয়েকজন এগিয়ে এসেছে ততক্ষণে। ঘটনা তারা বুঝল।‌ নিজেরাই কানাঘুষা করে প্রস্থান করল। গুঞ্জরিকা একখণ্ড পাথরের ন্যায় বসে রইল। চারপাশে থেকে ভাসমান হলো আরুষের বলা সেই কথাটা। ছেলেটা ঠিকই বলেছিল সে ব্যতীত গুঞ্জরিকার জন্য আর কেউ নেই। গুঞ্জরিকা ফুঁপিয়ে উঠল। আজ এখন এই মুহূর্তে গুঞ্জরিকা উপলব্ধি করল আরুষের ছায়া ব্যতীত তার জীবন বড়ো কঠিন। এই মানব কুলের মারপ্যাঁচে বেঁচে থাকা বড্ড জটিল তারজন্য। হয়ত এভাবেই এখানে প্রাণটা খুইয়ে বসবে। শক্ত মনের মেয়েটা এক মুহুর্তের জন্য মাটির মতো নরম হয়ে এল। নতুন জীবনের সব আশা ভরসা ছেড়ে দিল। পা দুটো তুলে বসল বেঞ্চে। বুকের মাঝে আঁকড়ে সেথায় মাথা রেখে আঁখি জোড়া বুঁজে ঠায় বসে রইল। আরিকা উড়ে এসে কাঁধে পা দুটো রেখে মাথায় মাথা ঠেকিয়ে বসল।

সেভাবে কতক্ষণ পেরিয়েছে কে জানে! অকস্মাৎ সামনে কারোর উপস্থিতি অনুভব করতেই গুঞ্জরিকা নড়েচড়ে বসল। এইবার আর ভয় পেল না। বক্ষস্থল সংকুচিত হলো না। সে আপাতত নিঃস্ব। নিজ ব্যতীত হারানোর মতো কিছুই নেই। নিষ্প্রাণ চোখে সম্মুখে চাইল। দেখল একজন মধ্যবয়স্ক পুরুষকে। দেখতে ভদ্রলোক লাগছে। শরীরে জড়ানো শহরের পোশাক শার্ট প্যান্ট। মুখটা পরিচিত মনে হলো গুঞ্জরিকার নিকট। ভ্রু কুঁচকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। চেনার চেষ্টা করল। ঠিক তক্ষুনি ভদ্রলোক বললেন,
“ভয় নেই মা। আমি হায়দার আলী। তোমার কোনো ক্ষতি করব না আমি। আমাকে বড়ো মা পাঠিয়েছেন।”
গুঞ্জরিকা কিছুই বুঝল না। বড়ো মা কে? তার সাথে গুঞ্জরিকার কী সম্পর্ক? স্বভাবসুলভ কণ্ঠে প্রশ্ন করল,
“কে বড়ো মা?”
মেয়েটার প্রশ্নে হায়দার আলী হাসলেন। জবাব দিলেন,
“আজ সকালে যার গাড়ির সাথে তোমার ধাক্কা লাগল। যেই মানুষটা তোমার সাথে কথা বলল তিনিই আমাদের বড়ো মা।”
গুঞ্জরিকা একটু অবাক হলো বৈকি! এতক্ষণে স্মরণ হলো আব্বার বয়সী এই ভদ্রলোক ছিলেন চার চাকা গাড়ির চালক। গুঞ্জরিকা ফের জানতে চাইল,
“তিনি আপনাকে কেন পাঠিয়েছেন? কী প্রয়োজনে?”
হায়দার আলী বললেন,
“তোমাকে দেখে বড়ো মার বড্ড মায়া হয়েছিল। তবে কী কারণে ডেকেছে জানি না। সম্ভবত তোমাকে কাজ দেবে।”
গুঞ্জরিকা অবাকের উপর অবাক হচ্ছে। বড়ো মা নামক মানুষটাকে দেখে গুঞ্জরিকা বুঝেছিল অনেক বড়ো ঘরের কেউ হবে‌। কিন্তু হঠাৎ গুঞ্জরিকার প্রতি এত মায়া, এত চিন্তা ঠিক হজম হলো না মেয়েটার। অন্য কোনো ধান্দা আছে নাকি পিছনে? তাকে ভুলিয়ে নিয়ে যেয়ে বিক্রি করে দিবে না তো? গুঞ্জরিকা এরকম অনেক শুনেছে। গ্রামের ভোলা ভালা মানুষগুলোকে শহরে নিয়ে এসে অন্যদেশে বিক্রি করে দেয় বড়োলোকেরা। ওর মনোভাব হয়ত হায়দার আলী বুঝলেন। মুচকি হাসলেন,
“ভয় পেও না। এই শহরের অপরাধ রোধ করেন বড়ো মা। তোমার সাথে কোনো অন্যায় হবে না।‌ আশ্বাস রাখো। আমার বাড়িতে তোমার বয়সী দুটো মেয়ে আছে। একজন পিতা হয়ে মেয়ের বয়সী কাউকে আমি বিপদে ফেলতে পারি না।”
গুঞ্জরিকা জবাবে নীরবতা বেছে নিল। ভাবল অত্যল্প। অতঃপর যাওয়ার সিদ্ধান্তে উপনীত হলো। অনেক তো ঝুঁকি নিল একজীবনে। শেষ বারের মতো না হয় আরও একবার নিল। ভাগ্যে যা আছে তাই হবে। চুপচাপ উঠে দাঁড়াল। ইশারায় সম্মতি দিল। এতে হায়দার আলী নামের ভদ্রলোক ভীষণ খুশি হলেন। রাস্তায় রাখা গাড়ির দিকে এগিয়ে গেলেন।‌ গাড়ির দরজা খুলে দাড়িয়ে রইলেন। গুঞ্জরিকা গাড়ির দরজার সামনে এসে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। এইসব কখনো চোখে দেখেনি সে। অথচ আজ চড়বে। ভাগ্যের কী লীলা খেলা! নীরবে গাড়িতে উঠে বসল। হায়দার আলী দরজা লাগিয়ে সামনে এসে বসলেন। গাড়ি স্টার্ট দিলেন। গাড়িটা চলতে শুরু করল নিজ গন্তব্যে।
.

অন্ধকারাচ্ছন্ন বদ্ধ কক্ষের মেঝেতে একটা অবয়ব আবছা দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘ কেশ মেলে দিয়ে শুয়ে আছে মেঝেতে। শাড়ির আঁচল সহ চুলগুলো এলোমেলো হয়ে অবলীলায় পড়ে আছে সেখানে। আয়েশা শেখের দাফন সম্পন্ন হয়েছে। শেখ বাড়ির পরিবেশ থমথমে। গাঢ় নিস্তব্ধতা সবকিছুকে গ্রাস করে নিচ্ছে। সেই নীরবতা খণ্ডিত করে ক্ষণে ক্ষণে ভেসে আসছে সালেহা শেখের করুন কান্নার সুর। এই পৃথিবীতে মায়ের মতো কেউ হয় না। মাকে হারিয়ে পাগলপ্রায় সালেহা শেখ। এই বিষ এত সহজে কমার নয়। খারাপের মাঝেও ভালো থাকে। একজন মানুষের মধ্যে সব খারাপ একসাথে বসবাস করতে পারে না। দোষ গুণ মিলিয়েই আমরা গড়ে উঠি। এই যে আয়েশা শেখ কখনোই চন্দ্রার সাথে দুর্ব্যবহার করেননি। আরুষের কাছে একজন সেরা দাদী হয়ে দেখিয়েছিলেন। এটা কি তার ভালো দিক ছিল না? তিনি অবশ্য এক রুপে ভালো হলেও শতরুপে খারাপ ছিলেন।

চন্দ্রা মেঝেতে শুয়ে একচিত্তে ছাদের দিকে তাকিয়ে আছে। দেহটা নিথর হয়ে পড়ে আছে। হঠাৎ করেই বন্ধ কক্ষের চারিদিক কাঁপিয়ে শোনা গেল কান্নার শব্দ।‌ মিনিট দুই পেরোতেই সেটা থেমে গেল। পরক্ষণেই কক্ষের সর্বখানে ভাসমান হলো হাসির আওয়াজ। মেয়েটা ভীষণ বিক্ষিপ্ত অনুভব করছে। নিজের মধ্যে নেই যেন। আয়েশা শেখের বিদায় বেলায় নিচে যেয়ে এরকম অস্বাভাবিক আচরণ করছিল। তখন অদিতি জোরপূর্বক কক্ষে রেখে গেছে। চন্দ্রা হাসির মাঝেই উপলব্ধি করল কেউ একজন ওর মাথাটা তুলে নিজের হাঁটুর উপর রাখল। পরপরই শুনতে পেল তাইমুরের গলা,
“আমায় ঠকিয়ে খুব ভালো আছ চন্দ্রাবতী তাই না? খুব বেশি ক্ষতি হতো সেদিন সত্য বললে?”
চন্দ্রা দৃষ্টি সরিয়ে তাইমুরের দিকে তাকাল। চোখের কোণে জল চিকচিক করছে। জবাব দিতে পারল না মেয়েটা। মুখে লেপ্টে থাকা হাসি টুকু উবে গেল। একভাবে চেয়ে রইল। সময় নিয়ে চোখের পলক ফেলল। অধর নাড়াতে যেয়ে খেয়াল করল ওর মাথাটা মেঝেতে পড়ে আছে। কক্ষের কোথাও কেউ নেই। হাউমাউ করে কেঁদে উঠল চন্দ্রা।‌ দুহাতে নিজের চুল খামচে ধরল। কাঁদতে কাঁদতে জপে চলল,
“আমার একটা মানুষ হইল না। পৃথিবীতে এত মানুষের ভীড়ে আমি নিঃসঙ্গ রয়ে গেলাম।”
তক্ষুনি এক দমকা হাওয়ায় চন্দ্রার কানের কাছে এসে কে যেন বলে গেল,
“ভুলি সিদ্ধান্তের খেসারত আমৃত্যু দিতে হয়। এর থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায় না।”
.

চার চাকার গাড়িটা এসে থামল একটা বাগান বাড়ির আঙিনায়। হায়দার আলী নেমে দাঁড়ালেন। পিছনে যেয়ে গুঞ্জরিকার পাশের দরজা খুলে দিলেন। গুঞ্জরিকা আলগোছে নেমে দাঁড়াল। চারপাশে চোখজোড়া ভাসমান হলো। অমনিই নেত্র যুগল কপালে উঠে গেল। তিনতলা বিশিষ্ট একটা বড়ো বাড়ি। বাড়িটা আলোকিত সফেদ রঙা আলোয়। সেই তীব্র আলোয় চারপাশ একেবারে স্পষ্ট। গুঞ্জরিকা দেখল বাড়িটার চারপাশ বেষ্টিত সবুজ গাছপালা এবং ফুলের সমাহারে। হায়দার আলী বললেন,
“ভেতরে চলো মা। বড়ো মা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন।”
গুঞ্জরিকা মাথা নেড়ে সায় জানাল। হায়দার আলী হেসে বাড়ির দিকে অগ্রসর হলেন। গুঞ্জরিকা শ্লথগতিতে ওনার পিছু পিছু হাঁটা ধরল।

বড়ো ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই প্রকট আলোর তোপে পড়ে খিচে আঁখি যুগল বন্ধ করে নিল গুঞ্জরিকা। সবটা একটু সহনীয় হতেই আস্তে ধীরে নেত্রপল্লব মেলে তাকাল। চোখের পাতায় ভাসল রাজকীয় সবকিছু। ছোট বেলায় মায়ের থেকে রুপকথার গল্পে যেরকম বাড়িঘরের কথা শুনত ঠিক সেরকমই সবকিছু। সফেদ রঙের দেওয়াল গুলো সজ্জিত নানা ধরণের ছবিতে। মাঝারি আকারের বেশ কয়েক ধরণের জীবন্ত ফুলের গাছ ড্রয়িং রুমের কোণায় কোণায় রাখা আছে। ইয়া বড়ো জায়গার একপাশে বসার জন্য সোফা রাখা হয়েছে। অপরপাশে খাবার খাওয়ার জন্য ডাইনিং টেবিল। গুঞ্জরিকা বাড়িতে ঢোকার সময় দেখেছে বাড়িটা চারিদিক থেকে পুলিশ কর্তৃক ঘেরাওকৃত। ভেতরেও তাই। অনেকগুলো সাধারণ মানুষ একই রকমের পোশাক পড়ে ঘোরাঘুরি করছে। কয়েকজন এটা সেটা কাজ করছে। বাড়িটা অদ্ভুত শৌখিনতায় মোড়ানো। দেখলেই শান্তি অনুভূত হচ্ছে। গুঞ্জরিকা যখন অবাক চোখে সবকিছু দেখতে ব্যস্ত সেই সময়ে কর্ণগোচর হলো মেয়েদের উঁচু হিল জুতোর শব্দ।‌ সেই আওয়াজ লক্ষ্য করে সেদিকে তাকাল গুঞ্জরিকা। দেখল সিঁড়ি বেয়ে অর্ধ পরিচিত সেই মানুষটি নামছে। যাকে হায়দার আলী বড়ো মা হিসেবে সম্বোধন করেছেন। শরীরে জড়ানো কালো রঙের সাদা পাড়ের শাড়ি। তার সাথে মিলিয়ে শুভ্র রঙা ব্লাউজ পরিধান করা। সুদীর্ঘ কৃশলা হাত খোপা করে রাখা। সেখানে ঠাঁই পেয়েছে একটা বেলী ফুলের মালা। ভদ্রমহিলার প্রতিটা কদম অদমনীয়। চলাফেরায় রাজকীয় ভাব প্রকাশ পাচ্ছে। গুঞ্জরিকার ঘোমটা টানা তবে মুখটা খোলা রাখা। সে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ওনার দিকে তাকিয়ে রইল।

বড়ো মা এগিয়ে এসে গুঞ্জরিকার মুখোমুখি দাঁড়ালেন। মুচকি হেসে জিজ্ঞাসা করলেন,
“আসতে কোনো সমস্যা হয়নি তো মা?”
চারপাশে চলাফেরা করা সকলে মাথা নুইয়েছে ততক্ষণে। বড়ো মার এত নরম কথায় সবাই বিস্মিত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু চোখ তুলে তাকানোর সাহস কারোর হয়নি। গুঞ্জরিকা ছোট্ট করে জবাব দিল,
“জি না।”
বড়ো মা শুনলেন। জানতে চাইলেন,
“তোমার নাম কী মেয়ে?”
“গুঞ্জরিকা শে…”
পুরোটা বলতে যেয়েও থেমে গেল গুঞ্জরিকা। নিজের আচরণে নিজেই বড়ো অবাক হলো। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“গুঞ্জরিকা প্রামাণিক।”
গুঞ্জরিকার দোটানায় অপরপক্ষের ঠোঁটজোড়া একপাশে কিঞ্চিত উঁচু হলো। বলল,
“ইসলামে স্বামীর পদবী ব্যবহারে একটু বিধিনিষেধ আছে।”
গুঞ্জরিকার দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হলো। বড়ো মা সেদিকে পাত্তা দিলেন না। পাশ ফিরে হায়দার আলীকে বললেন। কণ্ঠস্বরে পরিবর্তন এল। তুলনামূলক গম্ভীর, শান্ত শোনাল,
“হায়দার চাচা অতিথি কক্ষটা একবার দেখে আসুন। সবটা ঠিকঠাকভাবে গোছানো হয়েছে কি-না দেখবেন। এখন থেকে ওখানেই থাকবে আমাদের নতুন অতিথি।”
মানুষ অনুযায়ী ভদ্রমহিলার ব্যবহারে গুঞ্জরিকা তাজ্জব বনে গেল। পরক্ষণেই বড়ো মাকে থামিয়ে দিল,
“থামুন।”
একটু থেমে প্রশ্ন ছুঁড়ল,
“আমার মতো একজন অপরিচিত মেয়েকে এতটা আদরযত্ন করে জায়গা দেওয়ার কারণ কী?”
এই প্রশ্নে অপরপক্ষ কিছুক্ষণ চুপ রইল। গুঞ্জরিকা খেয়াল করল সামনে দাঁড়ানো ভদ্রমহিলার দৃষ্টি বাজপাখির মতো তীক্ষ্ণ। কেমন অদ্ভুত যেন। অন্তরাত্মা কাঁপিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে সে। বড়ো মা মৃদু হাসলেন,
“কারণ আমরা পূর্বপরিচিত।”
গুঞ্জরিকার মসৃণ কপাল গুটিয়ে এল। ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে শুধাল,
“সেটা কীভাবে?”
“সকালেই না আমাদের দেখা হলো? সেই হিসেবে তো আমরা পূর্বপরিচিত হচ্ছি তাই না?”
কথাগুলো বলে হায়দার আলীকে ইশারা করলেন বড়ো মা। হায়দার আলী মাথা নুইয়ে প্রস্থান করলেন। গুঞ্জরিকার কাছে বড়ো মা নামক মানুষটাকে সুবিধার মনে হচ্ছে না। কথাবার্তা কেমন প্যাঁচানো ধরণের। রহস্যের বেড়াজালে নিজেকে আবিষ্কার করল মেয়েটা। আরেকটু নিশ্চিত হতে জানতে চাইল,
“আমি কোথায় আছি? আপনি কে? আমাকে কেন এত সাহায্য করছেন?”
এবারও প্রশ্নের পিঠেই প্রত্যুত্তর করলেন বড়ো মা,
“আমি নিশিগন্ধা চৌধুরী। এটা বানিজ্য মন্ত্রীর বাসভবনের একটি। আমি তার একমাত্র কন্যা।”
গুঞ্জরিকা আকাশ থেকে পড়ল। বিষ্ময়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ল। আশ্চর্যান্বিত হয়ে তাকিয়ে রইল। কীভাবে কী! এত বড়ো মানুষের বাড়িতে সে দাঁড়িয়ে আছে। নিজের হতভম্ব ভাব কাটাতে এইবার একটু সময় লাগল। বেশ রয়ে সয়ে গুঞ্জরিকা বলল,
“সবকিছু ধোঁয়াশা লাগছে। আপনি কোনো কারণ ছাড়া কেন সাহায্য করবেন আমায়? এই স্বার্থের পৃথিবীতে স্বার্থ ছাড়া কেউ কাউকে সাহায্য করে না। স্বার্থান্বেষীদের ভীড়ে আপনি সত্যিই কি ভিন্ন?”

গুঞ্জরিকা সোজাসাপ্টা কথা বলে অভ্যস্ত। তার কথার মধ্যে কোনো ছলচাতুরি থাকে না। এখনো তার ব্যতিক্রম নয়। ওর এমন কথাতে নিশিগন্ধ্যা চৌধুরী অধর মেলে হাসলেন। এরকম স্পষ্টবাদী মানুষদের তিনি ভীষণ রকমের পছন্দ করেন। তাই তো স্বেচ্ছায় মেয়েটাকে আশ্রয় দিচ্ছেন। মুখে বললেন,
“ভুল জানো মা। সবাই স্বার্থ বোঝে না। দুপুরে প্রথম সাক্ষাতে তোমার ব্যবহার আমার ভীষণ ভালো লেগেছিল। মুগ্ধ হয়েছি আমি। ঠিক আমার মতোই তুমি। এই যে আমার কোনো সন্তান নেই। থেকে যাও আমার মেয়ে হয়ে। আল্লাহর ইচ্ছা হয়ত এটাই।”
গুঞ্জরিকা আরেকদফা চমকাল। এইসব হচ্ছে কী ওর সাথে! কী করবে, উত্তরে কী বলবে ভেবে পেল না মেয়েটা। হয়ত সিদ্ধান্ত নিতে একটু সময়ের প্রয়োজন। হুটহাট আর কিছুই করতে চায় না সে। নিশিগন্ধ্যা চৌধুরী একটু এগিয়ে এসে গুঞ্জরিকার চোখে চোখ রেখে দাঁড়ালেন। ফিসফিস করে বললেন,
“অতীত মুছে ভালো থাকার উত্তম উপায় হলো জায়গা পরিবর্তন করা। আশাকরি গুঞ্জরিকা প্রামাণিক বোকা নয়।”
গুঞ্জরিকার সম্পূর্ণ শরীর শিউরে উঠল। সামনে দাঁড়ানো নারীর বিচক্ষণতায় নিজেকে হারিয়ে বসল। নিজেকে ভীষণ এলোমেলো অনুভূত হলো। ওর অবস্থাটা খুব সহজেই অপরপক্ষ বুঝল। নিশিগন্ধ্যা চৌধুরীর ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা হাসি বাড়ল,
“হাতে অফুরন্ত সময় আছে। সময় নিয়ে একে অপরের সম্পর্কে জানা যাবে। আপাতত আজকের রাতটা এখানে বিশ্রাম নাও।”

চলবে

(আশাকরি আগামী পর্বেই উপন্যাসিকার ইতি টানতে পারব। ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন পাঠক। রিচেক নেই। আপনাদের রেসপন্স ও গঠনমূলক মন্তব্যের আশা রাখি।)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply