Golpo romantic golpo নূর এ সাহাবাদ

নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৪৯


#নূর_এ_সাহাবাদ

#jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস

পর্ব – ৪৯

ভোর হওয়ার আগেই সাহাবাদ এর সৈন্য বহর প্রস্তুত। চারপাশ এখনও অন্ধকার। আকাশে ফজরের আগের সেই নীলচে আবছা আলো।

ঘোড়ার নাসারন্ধ্র থেকে ধোঁয়ার মত শ্বাস বের হচ্ছে। সৈন্যদের শরীরে ভারী বর্ম। হাতে তলোয়ার, বর্ষা, তীর ধনুক। প্রত্যেকে সারি সারি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাইজিদ তার শ্বেত অশ্বের পিঠে বসে আছে। তার ডানপাশে মাহাদি। আর বামপাশে কালো আবরণে মুখ ঢাকা মেহেরুন্নেসা। তার পেটের দিকে বারবার চোখ চলে যাচ্ছে বাইজিদের। তবুও আজ কিছু বললো না।

কারণ এ মেয়েকে থামানো যাবে না। হাত উঠাতেই সৈন্যদল এগিয়ে চললো উত্তরের জঙ্গলের দিকে।

ঘোড়ার খুরের শব্দে কেঁপে উঠছে মাটি। জঙ্গল পেরিয়ে যখন উত্তরের প্রাসাদ চোখে পড়লো সবাই আরও সতর্ক হয়ে উঠলো।

অদ্ভুত ব্যাপার, আজ কোনো প্রহরী নেই। প্রাসাদটা দূর থেকে মৃত মৃত মত লাগছে। যদিও এটা মৃত্যুপুরীর চেয়ে কম না। কিন্তু কি হলো? এতক্ষণে তো ওদের প্রতিরোধ করতে বেড়িয়ে আসার কথা ছিল। অঙ্কুরের বাহিনী এতটাও হেলা ফেলায় থাকে না মহলে?

মাহাদি নিচু গলায় বলল

“কিছু বুঝতে পারছি না শাহজাদা। এরা এত চুপচাপ কেন?”

বাইজিদ চোখ সরু করলো।

“তবুও সাবধানে আগাও। হতে পারে এটাও ওদের কোনো চাল”

মূল ফটকের সামনে এসে দাঁড়ালো তারা। ফটকটা আধখোলা। এত বড় প্রাসাদ। যেখানে সবসময় পাহারা থাকতো। সেখানে বিনা পাহাড়ায় অঙ্কুর নিশ্চিন্তে বসে আছে? মাহাদি ইশারা করতেই কয়েকজন সৈন্য এগিয়ে গিয়ে ফটক পুরো খুললো। ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ তুলে দরজা খুলতেই ধুলা উড়ে উঠলো। সবাই অস্ত্র শক্ত করে ধরলো। মেহেরুন্নেসার বুক ধকধক করছে। কিন্তু ভিতরে ঢুকে সবাই আরও অবাক হলো। পুরো প্রাসাদ ফাঁকা। না কোনো সৈন্য। না কোনো দাস। না কোনো বিজ্ঞানী। কেউ নেই। মারজান অঙ্কুর কেউ নেই। না আছে কোনো গবেষণা সামগ্রী।

মাহাদি দ্রুত সৈন্য ছড়িয়ে দিলো চারদিকে। একেকটা কক্ষ তল্লাশি শুরু হলো। গবেষণাগারে ঢুককে তো বোকা বনে গেল সব। এখানে কত শত কাঁচের শিশি, কত রকমের যন্ত্রণাংশ সেসব কিচ্ছু নেই। এই ঘরটাতে ভয়ংকর রাসায়নিকের গন্ধে দম বন্ধ হয়ে যেত। সেরকম কোনো গন্ধ ও পাওয়া যাচ্ছে না। টেবিল, ঠেলা গাড়ির মত লোহার বিছানা। সব ফাঁকা। সব সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। একটা যন্ত্রও নেই। একফোঁটা ওষুধও না।

মনে হচ্ছে বহু আগেই সব গুছিয়ে নেওয়া হয়েছে।

মেহেরুন্নেসা ঘরের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়ালো।

তার চোখে অবিশ্বাস।

“এ কি করে সম্ভব। এরা এত দ্রুত কি করে মহল ছাড়লো। তাও আবার সব সঙ্গে নিয়ে”

বাইজিদ দেয়ালের দিকে তাকালো। কিছু জায়গায় তাড়াহুড়ো করে জিনিস সরানোর দাগ। মেঝেতে টেনে নেওয়ার চিহ্নও আছে।

মানে ওরা পালিয়েছে অনেক আগেই। মাহাদি রাগে দেয়ালে ঘুষি মারলো।

“ধুর! নির্ঘাত খবর পেয়ে গেছে!”

বাইজিদের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠলো। পুরো প্রাসাদটা অস্বাভাবিকভাবে পরিষ্কার। ইচ্ছা করেই সব মুছে দেওয়া হয়েছে। কোনো প্রমাণ রাখা হয়নি। মেহেরুন্নেসা নিচু স্বরে বলল

“অঙ্কুর আমাদের একধাপ আগেই খেলছে।”

বাতাসে একটা দরজা ধীরে ধীরে শব্দ করে নড়লো। একে একে বেরিয়ে আসে প্রহরী রা। মেহেরুন্নেসা বাইজিদ কে বলল মহল টা দখল করাতে। যাতে ওরা ফিরে আসতে না পারে আর। মহল পরুত্যক্ত থাকলে ওরা আবার ঘাঁটি গাড়বে এখানে। তার আর সুযোগ দেওয়া যাবে না।

অগত্যা খালি হাতেই ফিরতে হলো তাদের। উত্তরের প্রাসাদ পুরো তন্নতন্ন করে খুঁজেও কিছু পাওয়া গেল না। না অঙ্কুর।ননা মারজান। না সেই বিজ্ঞানীরা। এমনকি নরপিশাচ গুলোরও কোনো অস্তিত্ব নেই। মনে হচ্ছে রাতারাতি পুরো প্রাসাদ গিলে খেয়েছে তাদের। ফেরার পথে পুরো সৈন্যদল নীরব। কারও মুখে কথা নেই।

এত বড় প্রস্তুতি, এত পরিকল্পনা সব যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। সাহাবাদে ফিরেই চারদিকে সৈন্য ছড়িয়ে দিলো বাইজিদ। পাহাড়ি অঞ্চল, জঙ্গল, নদীপথ, সীমান্ত সবখানে খোঁজ শুরু হলো।

গোপনচর পাঠানো হলো আশেপাশের রাজ্যগুলোতেও। দিনের পর দিন কেটে গেল।

কিন্তু কোথাও কোনো সন্ধান নেই।

অনেকে বলছে অঙ্কুর ভয় পেয়ে পালিয়েছে।

কেউ বলছে অন্য কোনো অঞ্চলে গিয়ে আবার শক্তি জোগাড় করছে।

আবার কেউ কেউ করে বলছে ওরা মানুষ না।

শয়তান। শয়তানরা এভাবে হাওয়া হয়ে যাবে সেটাই স্বাভাবিক।

তবে এতে শান্তি পেয়েছিল প্রজারা। ধীরে ধীরে সাহাবাদে স্বস্তি ফিরতে শুরু করলো। রাতে আর নরপিশাচের গর্জন শোনা যায় না। মানুষ নিখোঁজও হচ্ছে না আর। বহুদিন পর প্রজারা একটু শান্তির নিঃশ্বাস ফেললো। সুনেহেরাও সুস্থ হয়ে উঠছে। মাহাদি কাজের বাইরের পুরোটা সময় তার কক্ষের আশেপাশেই থাকে। সামনে পড়লে দুজনেই এমন ভাব করে যেন কিছুই হয়নি।

জমিদারি দ্বায়িত্ব বাইজিদ ই পালন করছে। স্ত্রী গর্ভবতী। সময় এগিয়ে আসছে ধীরে ধীরে। বাইজিদ ঘোষণা দিল

“যুদ্ধের ছায়া সরে গেছে। শান্তিপ্রিয় সাহাবাদ আবার তার নিজ রুপে ফিরেছে। তাই সাহাবাদে এবার আনন্দ আনন্দ উৎসব হওয়া উচিত”

সবাই উৎসুক হয়ে তাকিয়ে তাদোর পানে। মেহেরুন্নেসা হেসে বলল

“আগামী জুমাবার নায়েব নেওয়াজে আবিদ এবং শাহজাদী রত্নপ্রভার বিবাহ অনুষ্ঠিত হবে।”

দরবারে আলহামদুলিল্লাহ ধ্বনি উঠলো। আবিদ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। চন্দ্রার চোখ মুখ কঠিন। মেহেরুন্নেসার দিকে রাগী চোখে তাকালো। এ বিয়ে বোধহয় আটকানো সম্ভব হবে না।

শুরু হলো সাহাবাদে বিয়ের আয়োজন।

অনেকদিন পর আবার মহলজুড়ে আনন্দ পড়েছে। মহল চনমনে হয়ে উঠছে সাজসজ্জায়।

রান্নাঘরে দিনরাত রান্না চলছে। আঙিনাজুড়ে মানুষজন। যুদ্ধবিধ্বস্ত মহলটা যেন আবার একটু করে বাঁচতে শিখছে। জুমাবারের বিকেলে অবশেষে অনুষ্ঠিত হলো বিয়ে। সাদা পোশাকে নেওয়াজে আবিদকে আজ অদ্ভুত সুন্দর লাগছে।

মাহাদি পাশে দাঁড়িয়ে বারবার খোঁচা দিচ্ছে তাকে।

আর আবিদ চোখ পাকাচ্ছে বারবার। ওদিকে রত্নপ্রভাকে সাজাচ্ছে দাসীরা। গা ভর্তি গয়না। লাল পোশাকে তাকে একেবারে রাজকন্যার মত লাগছে। আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখলো সে। এক ধ্বংস প্রায় প্রতিবিম্ব। পুরোপুরি ধ্বংস হওয়ার সাজ দেখছে। মেহেরুন্নেসা এলো কক্ষে। দাসীদের ইশারা দিলো বেড়িয়ে যেতে। একে একে বেড়িয়ে গেল সব। মেহেরুন্নেসা চন্দ্রার কাধে হাত রেখে পাশে বসলো। পেট টা উঁচু হয়েছে। চন্দ্রা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলে

“তুমি ঠিকই বলতে মেহের। ভাগ্য বড়ই অদ্ভুত। নয়তো কোন গরীবানা পরিবার থেকে এসে তুমি হয়েছি সম্রাজ্ঞী, জমিদার গিন্নি। আর শাহজাদি হয়ে আমার বিয়ে হচ্ছে একজন নায়েব এর সাথে।”

মেহেরুন্নেসা যে সবটা জানে তা চন্দ্রপ্রভার অজানা। মেহেরুন্নেসা খোঁচা দিয়ে বলল

“একজন বিধবা শাহজাদি কে নায়েব বিয়ে করছে এই কি যথেষ্ট নয়? তোমাকে বড় জোর রাজ্যের কোনো প্রজা সম্পত্তির লোভে বিয়ে করতো আপা।”

“মেহের।”

চেচিয়ে উঠে চন্দ্রপ্রভা। রক্তচক্ষু নিয়ে মেহেরুন্নেসার দিকে তাকিয়ে বলে

“ভুলে যেও না আমার বাবা এখনো জীবিত। আর আমার সম্পূর্ণ অধিকার আছে এই মহলে। জমিদার স্বয়ং আমার ভাইজান।”

মেহেরুন্নেসা নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল

“শুনেছিলাম শাহজাদি রত্নপ্রভার ব্যবহার অমায়িক ছিল। কিন্তু আপনাকে তো একদম সেরকম লাগছে না শাহজাদি।”

চন্দ্রার আর বুঝতে বাকি নেই মেহের সবটা জেনে গেছে। মৃদু হেসে বলল

“তোমার তো অবাক হওয়ার কিছু নেই মেহের। তুমি আমাকেই দেখে এসেছো শুরি থেকেই। রত্না কে তুমি কখনোই দেখো নি। তাই আমার আগের রুপ টা তোমার ভালো লাগলেও, যখন শুনেছো আমি রত্না নই। তখন থেকে তোমার বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়েছে আমাকে নিয়ে তাই না?”

“তোমার প্রতি আমার কোনো বিদ্বেষ নেই আপা। আমি যা করছি, তোমার ভালোর জন্য”

চন্দ্রপ্রভার চোখ টলমল করে পানিতে

“অথচ তুমি জানতে আমি অঙ্কুর কে ভালোবাসি!”

“হুমম। আর এ ও জানি ভালোবাসায় অন্ধ হয়ে দিনকে দিন তুমি নিরীহ মানুষ গুলোর ক্ষতি করতে সাহায্য করেছো। প্রথম যেদিন আমি তোমায় সিড়ি ঘরে শিশি গুলো রাখতে দেখেছিলাম। সেদিন ই সন্দেহ হয়েছিল তোমায় নিয়ে। পরদিনই তিলোত্তমার লাশ এলো বাড়িতে”

চন্দ্রপ্রভা চোখের পানি মুছল।

“আমাকে পাঠানো হয়েছিল তোমার ভাইয়ের বাড়িতে একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজে। মহল থেকে যাওয়া সব ওষুধ কাঁটাতার এর বেড়া পার করে আমিরাবাদ এ পাঠানো ছিল বড়ই দুষ্কর। আমিরাবাদ এর সম্রাট বড়ই বিচক্ষণ আর কঠিন। সুযোগ বুঝে পাহাড়া দার টপকে ওই পাড়ে ওষুধ পাঠাতে তোমাদের বাড়িটাই ছিল সবচেয়ে উপযোগী। আর এই ব্যাবসায় তোমার ভাইও ছিল সামিল। দুইটা বছর আমি তোমাদের বাড়িতে বউ এর পরিচয়ে থেকেছি। কিন্তু আমার আর মাহবুব এর মধ্যে কোনো সম্পর্ক ছিল না। শেষ মূহুর্তে মাহবুব কে লোভে পেয়ে বসে। অঙ্কুরকে জানায় আমি ওষুধ এর কার্যকারীতা নষ্ট করছি। অঙ্কুর ছোট মার সাথে বুদ্ধি করে তিলোত্তমা কে পাঠায়। আর আমাকে আটকে দেয়। সেই সময় তোমার জন্য আমি বেঁচে ফিরেছিলাম।”

মেহেরুন্নেসার রক্ত হিম হয়ে আসে এসব শুনে। আরেকটু এগিয়ে বসে চন্দ্রার হাত চেপে ধরে বলে

“তিলোত্তমা কে কে মারলো? আর আমার ভাইজান কে?”

চন্দ্রপ্রভা শুকনো ঢোক গিলে বলল

“তিলোত্তমা কে মেরেছে অঙ্কুরের লোক। কারণ টা অতি সামান্য। অনেক টা মানুষের রক্তের প্রয়োজন ছিলো অষুধ পরিক্ষা করার জন্য। ওর শরীর থেকে সব রক্ত সুচ ফুটিয়ে সরু নল দ্বারা টেনে নিয়ে মারা হয়েছে। আর মাহবুব কে মেরেছে ভাইজান। তোমার স্বামী। যদিও সে নিজ হাতে খু’ন করেনি। তার আদেশে মাহাদি খুনটা করেছিল। মাহবুব তোমায় অঙ্কুরের কাছে বেচবে কথা দিয়ে মোটা অংকে অর্থ নিয়ে ছিল। কিন্তু সেদিন ভাইজান তোমায় নিয়ে আসে। নয়তো সেদিনই বেঁচে দিতো তোমায়। তারপরেও বহু চেষ্টা করেছে তোমায় মহল থেকে বের করে নিয়ে যাওয়ার। পারে নি। পরে ভাইজান নিজেই…..”

মেহেরুন্নেসা গাঢ় করে চোখ বুজলো

“বাদ দাও। অঙ্কুর তোমায় ভালোবাসে না। নায়েব এর কাছে ভালো থাকবে তুমি। মানুষটা ভালো। আসছি আমি। সময় মত তোমায় ডাকা হবে”

মেহেরুন্নেসা বেড়িয়ে গেল ঘর থেকে। চন্দ্রা কিছুক্ষণ বসে থেকে আয়নার দিকে তাকাতেই দেখতে পেল সুনেহেরা কে। চোখ জোড়া দিয়ে পানি পড়ছে বেয়ে। প্রভার চোখ কপালে উঠে যায় শুনে ফেলেছে নাকি সব? নাকি বোনের বিয়ে হচ্ছে বলে কাঁদছে। প্রভা উঠে এগিয়ে যেতেই সুনেহেরা এক পা পিছিয়ে গেল। হাত উঁচু করে থামতে বলল প্রভা কেও। প্রভা কথা কাটতে বলল

“একি? তুই উঠেছিস কেন? হেকিম বলেছে তোর শরীর খুব দুর্বল। যা শুয়ে পর গিয়ে। সুনে…

“তুই আমার আপা না? তুই রুবায়েত এর বোন চন্দ্রা? তুই রত্না আপা না?”

চন্দ্র প্রভার মুখ শুকিয়ে আসে

“বোন, বোন আমার কথাটা শোন একবার। আমিই তোর আপা। আমি…..”

“তাই তো বলি? আপা তোর আদল আর আগের মত নেই কেন? সবাই বলে তুই গায়ে আগুন লাগানোর পর বিদেশ থেকে চিকিৎসক আনা হয়েছিল। তারা তোকে সারিয়ে তুলেছে। তখন তাদের চিকিৎসার ফলে তোর চেহারা বদলে গেছে। কিন্তু আসল সত্যিটা হলো তুই রত্নপ্রভা নোস?”

“সুনেরাহ, সুন….

“আমার আপা কোথায়? কোথায় আমার আপা বল না। কোথায় লুকিয়ে রেখেছিস তাকে?”

তাদের কথোপকথন এর মধ্যেই কয়েকজন সখি দৌড়ে এলো।

“শাহজাদি সকলে অন্দরে ডাকছে আপনাকে”

ওরা চন্দ্রা কে নিয়ে গেল। সুনেহেরা সেখানেই বসে কাঁদতে লাগলো। অন্দরে খুব বড়সর আয়োজন নেই। বাইজিদ এর ইচ্ছে ছিল ভীষণ ধুমধাম করার। কিন্তু মেহেরুন্নেসার কথা ভেবে অতটাও হলো না। তবে একেবারে কম ও। নিয়ম মাফিক নবীর কালেমা পড়ে দুইজন এর বিবাহ সম্পন্ন হলো। এখন কনে বিদায়ের পালা। রাত অনেকটা গভীর হয়ে এসেছে তখন। প্রাসাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে জমিদার বাড়ির রাজকীয় ঘোড়ার গাড়ি। চারপাশে মশালের আলো। বিদায়ের মুহূর্তে রত্নপ্রভার চোখ বারবার ভিজে উঠছে। এতদিনের পরিচিত মহল, পরিচিত কক্ষ, পরিচিত জীবন সব ছেড়ে আজ অন্য এক জীবনে পা রাখছে সে। কী এক জীবন তার। এ যেন ভাসমান জীবন। একবার অন্য রাজ্য ছেড়ে এই রাজ্যে এসে নিজের পরিচয় গড়লো। এখন আবার এখান থেকেও অন্য আরেক জায়গা যাচ্ছে।

নেওয়াজে আবিদ গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে আছে চুপচাপ। তার মুখের বোকাসোকা হাসিটা নেই আজ। অন্দরের ফটকের দিকে কয়েকবার তাকালো। সুনেহেরা আসছে না। বোনের বিদায় বেলাও কি আসবে না সে? তার মনে চাড়া দিয়ে ওঠে অন্যায়ের আভাস। অন্য কারো স্বামী হয়ে কোনো নারীর জন্য এত উতলা হওয়া যাবে না।

অবশেষে সুনেহেরার দেখা মিলল। সুনেহেরা বারবার কান্নারত মুখশ্রী নিয়ে তাকিয়ে আছে তাদের পানে। কোনো কথা বলছে না। রত্নপ্রভা জোর করে হাসলো।

“তুই আসবি তো আমায় দেখতে সুনেহেরা? তোকে আমার অনেক কথা বলার আছে রে বোন”

শেষমেশ বিদায়ের সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলে গাড়িতে উঠলো দুজন। ঘোড়ার গাড়িটা মহল ছেড়ে দূরে মিলিয়ে গেল।নেওয়াজের বাড়িটা সাহাবাদ প্রাসাদের মত বিশাল না। ছোট্ট একটা দালান। তবে অসম্ভব পরিপাটি। সামনে ছোট ফুলের বাগান। বেলি আর জুঁই ফুলের গন্ধে পুরো উঠান ভরে আছে। দেয়ালের পাশে ঝুলছে কয়েকটা হারিকেন। আলো গুলো নরমভাবে কাঁপছে বাতাসে। ঘোড়ার গাড়ি থামতেই দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন নেওয়াজের মা। বয়স হয়েছে। তবুও মুখে অদ্ভুত মায়া। রত্নপ্রভাকে দেখে চোখ ভিজে উঠলো তার। হালকা হেসে বললেন “আসো মা।”

তারপর মিষ্টি আর পানির থালা নিয়ে বরণ করে ঘরে তুললেন তাকে। রত্নপ্রভা চুপচাপ সব দেখছে। তার মাথার ভিতরটা প্রচন্ড ভারী।

নেওয়াজ নিজের কক্ষের সামনে এসে চন্দ্রা কে ইশারা করলো এদিকে আসতে। দরজাটা খুলতেই প্রভা কিছুটা অবাক হলো। কক্ষ টা ছোট্ট কিন্তু সুন্দর। খুব সুন্দর। সাদা পরিষ্কার বিছানার চারপাশে ফুল ছড়ানো। জানালার পাশে মাটির ফুলদানি। সেখানে কৃষ্ণচূড়া রাখা। হয়তো ইচ্ছে করেই এনেছে নেওয়াজ। কক্ষটায় রাজকীয়তা

না থাকলেও শান্তি আছে। নেওয়াজ অপ্রস্তুত গলায় বলল

“ইয়ে… খুব বড় কিছু করতে পারি নি।”

রত্নপ্রভা কোনো উত্তর দিলো না। ধীরে ধীরে গিয়ে বিছানার একপাশে বসলো। তারপর কিছুক্ষণ পর শুয়েও পড়লো। নেওয়াজের দিকে ফিরলো না একবারও। উল্টো পাশে মুখ ঘুরিয়ে নিলো।

নেওয়াজ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো ওভাবেই। সে শাহজাদি, নায়েব কে কি মেনে নেবে? আর না সে জোর করতে পারবে বা স্বামীর অধিকার খাটাতে পারবে। যদিও সেসবের কোনো ইচ্ছেই নেই তার।

ছোট্ট করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। মেয়েটার অবস্থাটা ও সে বুঝতে পারছে। চুপচাপ আলমারি থেকে একটা চাদর বের করলো। মেঝেতে নিচে বিছানা করতে করতে ধীর স্বরে বলল

“ভয় পাবেন না। আপনি যতদিন সময় নিতে চান নিন।”

প্রভা তাও কিছু বললো না। হারিকেনের ক্ষীণ আলোয় ছাদের দিকে তাকিয়ে রইলো। কিছুক্ষণ পর নিচে শুয়ে পড়লো নেওয়াজ। বাইরে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। মেঘের তর্জন গর্জন শোনা যায়। বছরের শেষ বৃষ্টি বোধহয়। সামনেই শীত। চাপা কান্নার শব্দ আসে নেওয়াজের কানে। রত্নপ্রভা মুখ চেপে কাঁদছে। বালিশটা ভিজে যাচ্ছে একের পর এক অশ্রুতে। চোখ বন্ধ করতেই বারবার ভেসে উঠছে অঙ্কুরের মুখ। তার কথা, তার স্পর্শ তার প্রতারণা সব কিছুই ছিল মারাত্মক। নিজেকে বোঝাতে চাইছে সে, ঘৃণা করে অঙ্কুরকে। তবুও বুকের ভিতরটা কেন এমন জ্বলছে? কেন ভুলতে পারছে না? অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে একসময় বালিশে মুখ গুঁজে ফেললো প্রভা।

মেঝেতে শুয়ে থাকা নেওয়াজ চুপচাপ ছাদের দিকে তাকিয়ে ভাবছে, সে হয়তো বিয়েটা করে ঠিক করে নি। আগে রত্নপ্রভার সাথে কথা বলা উচিত ছিল। পর পর দুই জায়গা থেকে ঠকে আসা মেয়েটা এত সহজে কী করে সব টা মেনে নেবে?

মুচকি হেসে বলল

“কাঁদবেন না শাহজাদি, আপনি তবুও পেয়ে হারিয়েছেন। আর আমি যাকে হারিয়েছি, সে কখনো আমার ছিলই না। হা হা হা”

নেওয়াজ জানে এই মেয়েটার হৃদয়ে পৌঁছাতে অনেক সময় লাগবে। দেখা যাক কতদূর কি করে। ততক্ষণে ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে বাইরে।

******

কক্ষের ভিতরে বড় জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখছে মেহেরুন্নেসা। কালো রেশমি পোশাকে তাকে ভীষণ সুন্দর লাগছে। আগের থেকে স্বাস্থ্য একটু বেড়েছে। শাহজাদা বলে এতে নাকি তাকে আরও বেশি সুন্দর দেখায়। এক হাত আলতো করে নিজের পেটের ওপর রাখা। চোখে মুখে কোমলতা। পিছন থেকে এসে জড়িয়ে ধরলো বাইজিদ। চিবুক রাখলো তার কাঁধে।

“কি ভাবছেন সম্রাজ্ঞী?”

মেহেরুন্নেসা হালকা হেসে বলল

“সত্যিই আমি মা হতে চলেছি?”

বাইজিদ আলতো করে তার পেটের ওপর হাত রাখলো।

“ওমা! এতদিনেও আপনার বিশ্বাস হচ্ছে না?”

মেহেরুন্নেসা চোখ সরু করে তাকালো

“আপনি খুশি হননি?”

বাইজিদ বোকা বোকা হেসে বলল

“অতিরিক্ত খুশি হয়ে গেছি বলে বোধহয় মাথা কাজ করছে না।”

মেহেরুন্নেসা মৃদু হেসে মাথা নামিয়ে ফেললো।

বাইজিদ তাকে ঘুরিয়ে নিজের দিকে ফেরালো। “তবে একটা কথা।”

“কি?”

“আমার মেয়ে হলে কিন্তু ওর নাম আমি রাখবো।”

“ওমা! ছেলে হলে?”

“ছেলে হলেও আমি রাখবো।”

মেহেরুন্নেসা ভ্রু কুঁচকে বলল

“তাহলে আমি কি করবো?”

“আপনি শুধু ওকে আদর করবেন।”

“বাহহহ। কষ্ট আমি করবো, আর নাম আপনি রাখবেন?”

বাইজিদ হেসে ফেললো।

“আচ্ছা ঠিক আছে। তোমার সাথে মিলিয়েই রাখবো।”

পেটের ভিতর বেড়ে ওঠা অস্তিত্ব টার নড়াচড়া টের পেতেই মেহেরুন্নেসার চোখে খুশির ঝিলিক দেখা গেল। বাইজিদ এর হাত নিজের পেটে ধরে বলল

“দেখুন দেখুন, আপনার ছেলে কেমন লাথি মারছে আমার পেটে”

বাইজিদ চোখ সরু করে

“তুমি কি করে জানলে ছেলেই হবে?”

মেহেরুন্নেসা লজ্জা মাখা গলা বলল

“গত রাতেই স্বপ্ন দেখলাম। একটা পুচকে শাহজাদা আপনার সাথে তলোয়ার চালাচ্ছে। চোখ জোড়াও আপনার মতই সবুজাভ”

মেহেরুন্নেসা বিছানায় গিয়ে বসলো।

“বলুন তো কী নাম রাখবেন?”

বাইজিদও পাশে বসে অনেক ভেবে বলল

“মেয়ে হলে জান্নাত আর… ছেলে হলে”

মেহেরুন্নেসা সাথে সাথে মুখ কুঁচকালো।

“ছেলে হলে নাম আমি রাখবো”

মেহেরুন্নেসা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বল “ছেলে হলে আমি চাই ও আপনার মত হোক। চোখ জোড়া সবুজাভ হোক। আর হোক অসীম সাহসী।”

বাইজিদ আলতো করে মেহেরুন্নেসার কপালে চুমু রাখলো। জড়িয়ে ধরলো একে অপরকে। তাদের এই আবেগঘন মুহূর্তে দূর থেকে শোনা যায় জাহাজের শব্দ।

কেমন হয়েছে জানিও। আর ছবিটা দেখো 🥹🫶

কাদের মত লাগবে বলো তে?

রিয়্যাক্ট পূরণ করিও পাখিরা।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply