Golpo romantic golpo নূর এ সাহাবাদ

নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৩৮


jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস

পর্ব – ৩৮

“আআআআআআআ”
চিৎকার করে উঠে বসে মেহেরুন্নেসা।
তার নিঃশ্বাস দ্রুত, বুক ওঠানামা করছে জোরে জোরে। চোখ বড় বড় হয়ে আছে, যেন এখনো সেই ভয়ংকর দৃশ্যটা তার সামনে ভাসছে।
চারপাশ অন্ধকার, শুধু প্রদীপের ক্ষীণ আলো কাঁপছে। তার চিৎকারে পাশেই ঘুমিয়ে থাকা বাইজিদ হঠাৎ উঠে বসে।
“মেহের!”
এক ঝটকায় তার দিকে ঝুঁকে পড়ে সে।
দেখেই বুঝে যায় এটা সাধারণ কিছু না।
সে দু’হাতে শক্ত করে মেহেরুন্নেসাকে জড়িয়ে ধরে।
“কি হয়েছে? কি হয়েছে তোমার?”
তার কণ্ঠে স্পষ্ট উদ্বেগ। মেহেরুন্নেসা কাঁপছে। পুরো শরীর থরথর করে কাঁপছে। সে কিছু বলতে পারছে না, শুধু হাঁপাচ্ছে। বাইজিদ তাকে আরও কাছে টেনে নেয়, এক হাত তার পিঠে, অন্য হাত মাথায় রেখে ধীরে ধীরে শান্ত করার চেষ্টা করে।
“ভয় পেয়েছো?”
নরম গলায় জিজ্ঞেস করে সে
“খারাপ স্বপ্ন দেখেছো? কি দেখেছো?”
মেহেরুন্নেসা ধীরে মাথা তোলে। চোখ তুলে তাকায় বাইজিদের দিকে। এক মুহূর্ত তার দৃষ্টি থেমে যায় সেই পরিচিত সবুজ চোখে।
স্থির আশ্বাসভরা, এটা… সত্যিই বাইজিদ।

তার চোখের ভেতরের আতঙ্কটা ধীরে ধীরে গলতে শুরু করে। ঠোঁট কাঁপে। কিছু বলতে গিয়েও পারে না। পরের মুহূর্তেই সে হঠাৎ করে মুখ লুকিয়ে ফেলে বাইজিদের বুকে। দু’হাতে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে তাকে।
“আমি…”
গলা ভেঙে আসে তার,
“আমি খুব ভয় পেয়েছি…”
তার কণ্ঠ ভেঙে যায়। গুনগুন করে কাঁদতে থাকে। চোখের পানি ভিজিয়ে দেয় বাইজিদের পোশাক।
বাইজিদ কিছু বলে না। শুধু তাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে।
এক হাত দিয়ে তার মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দেয়।
“আমি আছি তো। সাহাবাদ এর বেগম কে ভয় পেলে বুঝি মানায়?
খুব নিচু গলায় বলে সে,
“আর আমি তো এখানেই আছি।”

কক্ষের ভেতর আবার নীরবতা নেমে আসে।
কিন্তু সেই নীরবতার ভেতরে মেহেরুন্নেসার কান্না ধীরে ধীরে থেমে আসে।

ভোরের আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে দুর্গের আকাশে। রাতের সেই ভয়, অস্থিরতা সব পেছনে ফেলে নতুন এক দিনের শুরু।
আজ থেকে শুরু হবে মেহেরুন্নেসার প্রশিক্ষণ।
প্রশিক্ষণ প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে আছে সে। চারপাশে হালকা কুয়াশা, ভেজা মাটি, আর দূরে অন্য যোদ্ধাদের প্রস্তুতির শব্দ।
তার সামনে দাঁড়িয়ে বাইজিদ।
চোখে কঠোর মনোযোগ আজ সে শুধু স্বামী না, একজন শিক্ষক।
“প্রথমে… তলোয়ার ধরতে শেখো”
বললো সে। একজন দাসী এগিয়ে এসে মেহেরুন্নেসার হাতে একটি হালকা তলোয়ার তুলে দিল। মেহেরুন্নেসা একটু ইতস্তত করলো। এটা তার জন্য একেবারেই নতুন। সে সাবধানে ধরলো কিন্তু ভঙ্গিটা ঠিক নয়। বাইজিদ এগিয়ে এলো।
তার হাত আলতো করে ধরে ঠিক করে দিলো
“এভাবে না… শক্ত করে ধরো, কিন্তু হাত শক্ত করে জমিয়ে ফেলো না।”

তার কণ্ঠে ধৈর্য।
“তলোয়ারকে নিজের অংশের মতো ভাবতে হবে।”
মেহেরুন্নেসা মন দিয়ে শুনছে। আস্তে আস্তে আবার চেষ্টা করলো।নএবার একটু ঠিক হলো। বাইজিদ হালকা মাথা নেড়ে বললো
“ভালো।”
তারপর সে সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।
“এখন দেখো।”
সে ধীরে তলোয়ার চালিয়ে দেখাতে লাগলো কিভাবে ভারসাম্য রাখতে হয়, কিভাবে পা ফেলতে হয়, কিভাবে আঘাত আসলে প্রতিরোধ করতে হয়। প্রতিটা চাল মসৃণ, হিসেবি। মেহেরুন্নেসা মুগ্ধ হয়ে দেখছে। তারপর তাকে ইশারা করলো
“চেষ্টা করো।”
মেহেরুন্নেসা ধীরে এগিয়ে এলো। প্রথম চাল ভুল।
দ্বিতীয়বার আবার ভুল। তলোয়ারটা ঠিকমতো ঘোরাতে পারছে না, ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছে।
সে একটু বিরক্ত হয়ে পড়লো।
“পারছি না…”
নিচু গলায় বললো। বাইজিদ থামলো না।
সে আবার কাছে এসে তার ভঙ্গি ঠিক করে দিলো।
“পারবে শুধু ধৈর্য লাগবে।”
সে তার পায়ের অবস্থান ঠিক করলো, কাঁধ সোজা করালো।
“লড়াই শুধু শক্তির না”
“বুদ্ধিরও।”
তারপর ধীরে ধীরে দেখাতে লাগলোবকিভাবে প্রতিপক্ষের আঘাত এড়িয়ে যেতে হয়, কিভাবে সুযোগ বুঝে আঘাত করতে হয়, কিভাবে শরীরের ভারসাম্য ধরে রাখতে হয়। মেহেরুন্নেসা এবার মন দিয়ে চেষ্টা করতে লাগলো। একটু একটু করে উন্নতি হচ্ছে। প্রথমে অনভ্যস্ত, তারপর ধীরে ধীরে তাল খুঁজে পাচ্ছে।
তার কপালে ঘাম জমেছে, নিঃশ্বাস দ্রুত কিন্তু চোখে একটা জেদ। বাইজিদ দূরে দাঁড়িয়ে দেখছে। তার ঠোঁটের কোণে হালকা সন্তুষ্টির ছাপ ফুটে উঠলো।
এই মেয়েটা শুধু কোমল না। ভেতরে শক্তিও আছে। আর আজ সেই শক্তির শুরু। বিকেলের শেষ আলো যখন ধীরে ধীরে মলিন হয়ে আসছে, তখন বাইজিদ দুর্গ ছেড়ে মহলের পথে রওনা হলো।
দীর্ঘদিনের মতো নয় আজ তার ফেরাটা যেন জরুরি, হিসেবি।
মহলে পৌঁছাতে পৌঁছাতে আকাশে সন্ধ্যার রঙ ছড়িয়ে পড়েছে।
প্রবেশ করতেই সে টের পেল আজ মহলে এক ভিন্ন ধরনের ব্যস্ততা। দরবারের পাশের প্রাঙ্গণে কয়েকজন অচেনা মানুষ দাঁড়িয়ে আছে।
বিদেশি বণিক। তাদের পোশাক আলাদা, ভাষা ভিন্ন চোখেমুখে তীক্ষ্ণ বুদ্ধির ছাপ। বাইজিদ সরাসরি তাদের কাছে গেল। কোনো অপ্রয়োজনীয় কথা নয়।
শুধু চোখের ইশারা। বুঝে গেল তারা কারা।

সঙ্গে থাকা প্রহরীরা সামনে এনে রাখলো একটি বড় কাঠের বাক্স। বাক্সটা খুলতেই ভেতরটা ঝলমল করে উঠলো। অনেকগুলো কাচের শিশি ছোট, মাঝারি, বড় সবগুলোই বিভিন্ন রঙে ভরা।
কোনোটায় গাঢ় নীল তরল, কোনোটায় সবুজ, কোথাও আবার রক্তিম আভা।

শিশিগুলো এমনভাবে সাজানো, যেন প্রতিটাই মূল্যবান কিছু। বণিকদের চোখ চকচক করে উঠলো। তারা একে একে শিশিগুলো পরীক্ষা করতে লাগলো। কেউ ঢাকনা খুলে গন্ধ নিল, কেউ আলোয় তুলে দেখলো গভীর মনোযোগে।

বাইজিদ দাঁড়িয়ে রইলো স্থির। তার মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই। সবকিছু যেন আগে থেকেই নির্ধারিত। কিছুক্ষণ পর একজন বণিক মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। তারপর তাদের দিক থেকে এগিয়ে এলো বিশাল এক পুটলা।
ভারী কাপড়ে বাঁধা। প্রহরীরা এনে রাখলো বাইজিদের সামনে। খোলা হলো পুটলা ঝনঝন করে উঠলো স্বর্ণ মুদ্রা। সোনালি আলোয় ঝলসে উঠলো চারপাশ।
বাকের শাহ্ দূর থেকে সব দেখছিলেন। তার ভ্রু কুঁচকে গেছে। তিনি বুঝতে পারছেন না এটা কি লেনদেন? এই রঙিন কাচের শিশিগুলোই বা কী? আর এর বিনিময়ে এত স্বর্ণ? কিসের ব্যাবসা করছে বাইজিদ? তার চোখে স্পষ্ট প্রশ্ন।
কিন্তু কেউ কিছু বলছে না।
বাইজিদ শুধু একবার তাকালো সেই স্বর্ণমুদ্রার দিকে তারপর ধীরে বললো
“নিয়ে যাও।”

বণিকরা মাথা নত করে বাক্সটা নিয়ে চলে গেল।
প্রাঙ্গণে আবার নীরবতা নেমে এলো। কিন্তু বাকের শাহ্-এর মনে তখন একটাই প্রশ্ন ঘুরছে— ঠিক কী হলো এখানে…? সন্ধ্যার আলো তখন ধীরে ধীরে মলিন হয়ে এসেছে। মহলের প্রধান ফটকের সামনে হঠাৎই এক পরিচিত অবয়ব দেখা দিল
সুনেহেরা।
প্রহরীরা প্রথমে যেন বিশ্বাসই করতে পারলো না।
তারপর একে একে সবার চোখে বিস্ময় ছড়িয়ে পড়লো। এই সময় সব ফটক বন্ধ করে দেওয়া হয়। বাড়ির মেয়ে বাইরে কি করে বেরোলো?

“শাহজাদি…!”
কেউ ফিসফিস করে উঠলো। সারাদিন সে কোথায় ছিল কেউ জানে না। কেউ দেখেনি তাকে বের হতে, আবার ফিরতেও না। সুনেহেরা কোনো দিকে না তাকিয়ে সোজা ভেতরে ঢুকে গেল।
তার চেহারায় ক্লান্তি, চোখে কঠোরতা যেন অনেক কিছু পেরিয়ে এসেছে সে। করিডোর পেরিয়ে নিজের কক্ষে ঢুকতেই দরজা বন্ধ করে দিলো।
কিছুক্ষণের মধ্যেই রত্নপ্রভা ছুটে এলো।
“সুনেহেরা!” তার কণ্ঠে উৎকণ্ঠা,
“কোথায় ছিলে তুমি এতক্ষণ?”

সুনেহেরা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো কিছুক্ষণ।
তারপর ধীরে বসে পড়লো। রত্নপ্রভা কাছে এসে বসলো, হাত ধরলো
“কি হয়েছে? বলো…”
সুনেহেরা গভীর নিঃশ্বাস নিল। তার চোখে এক ঝলক রাগ, এক ঝলক ভয়—দুটোই মিশে আছে।
“গত রাতে…”
সে শুরু করলো ধীরে
“কেউ আমার কক্ষে ঢুকেছিল।”
রত্নপ্রভার চোখ বড় হয়ে গেল।
“আমি টের পাইনি প্রথমে। হঠাৎ… পেছন থেকে মুখে কিছু চাপা দেওয়া হলো।”

সে হাত তুলে নিজের নাক-মুখের কাছে দেখালো
“একটা কাপড়… তীব্র গন্ধ… মাথা ঝিমঝিম করতে লাগলো।”
তার কণ্ঠ ভারী হয়ে উঠলো।
“আমি লড়ার চেষ্টা করেছিলাম… কিন্তু পারিনি…”
রত্নপ্রভা নিঃশব্দে শুনছে।
“চোখের সামনে সব ঝাপসা হয়ে গেল… তারপর আর কিছু মনে নেই।”

একটু থামলো সুনেহেরা। তারপর আবার বললো
“চেতনা ফিরলে দেখি… আমি একটা অচেনা জায়গায় বাঁধা।”
তার চোখে এবার আগুন জ্বলে উঠলো।
“হাত বাঁধা, চারপাশ অন্ধকার… আর দরজার বাইরে পাহারা।”
রত্নপ্রভার নিঃশ্বাস আটকে গেল।
“তারা ভেবেছিল আমি অজ্ঞানই থাকবো” সুনেহেরা বললো,
“কিন্তু… আমি সুযোগ খুঁজছিলাম।”
তার কণ্ঠে এবার দৃঢ়তা।
“একজন ভিতরে ঢুকতেই”
সে হাত মুঠো করে ধরলো
“আমি আক্রমণ করি।”
রত্নপ্রভা বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে।
“তার হাত থেকে অস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে… তাকে আঘাত করি। একজন মুখোশ ধারী ছিলো। হাতুড়ি মেরে দিয়েছি মাথায়। তারপর… আরেকজন আসার আগেই আমি বের হয়ে আসি।”
তার শ্বাস একটু ভারী হয়ে উঠলো।
“আজ তাকে মেরে আমি মুক্ত হয়ে এসেছি।”
কক্ষের ভেতর নীরবতা নেমে এলো। রত্নপ্রভা ধীরে তার হাতটা আরও শক্ত করে ধরলো। তার চোখে এখন ভয় আর স্বস্তি দুটোই। সুনেহেরার কথা শেষ হতেই রত্নপ্রভার চোখের দৃষ্টি বদলে গেল।
সে আর কিছু বললো না।
কিন্তু তার চোখে স্পষ্ট হয়ে উঠলো একটাই নাম
“অঙ্কুর।”

গতকালই বলেছিলো সুনেহেরা ওর কাছে বন্দি।
এক মুহূর্ত দেরি না করে সে উঠে দাঁড়ালো।
“আমি আসছি,”
শুধু এইটুকু বলেই দ্রুত কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেল।
করিডোরে তার পায়ের শব্দ তীব্র হয়ে প্রতিধ্বনিত হলো। কক্ষে গিয়ে যেই দরজা আটকালো। খুলল একেবারে সকালে।

বৈঠকে এসে বসতেই মহলের বাইরে হঠাৎ করে হইচই শুরু হয়ে গেল। চিৎকার, দৌড়ঝাঁপ, প্রহরীদের তড়িঘড়ি করে ছুটে চলা।
কিছু একটা ঘটেছে। রত্নপ্রভা দ্রুত এগিয়ে গেল উঠোনের দিকে। সেখানে পৌঁছাতেই এক রক্ষী দৌড়ে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বললো
“শাহজাদি নাসিরাবাদ থেকে…!”
“কি হয়েছে?”
রত্নপ্রভার কণ্ঠ তীক্ষ্ণ। রক্ষী গিললো, তারপর বললো
“একদল অদ্ভুত মানুষ,… মানুষ বললেও ঠিক হয় না…”
তার কণ্ঠ কেঁপে উঠলো।
“দেখতে… যেন আদিম যুগের মতো… দানবের মতো শক্তি…”
চারপাশে উপস্থিত সবাই থমকে শুনছে।
“ওরা সাহাবাদের কয়েকটা জায়গায় হামলা চালিয়েছে,”
আরেকজন বলল
“গ্রাম… প্রান্তিক এলাকা… সবকিছু ভেঙেচুরে দিচ্ছিল।”
রত্নপ্রভার চোখ কঠিন হয়ে উঠলো।
“রক্ষীরা?”
সে জিজ্ঞেস করলো। রক্ষী বলল
“প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু… ওরা অস্বাভাবিক শক্তিশালী…”
সে একটু থামলো।
“শেষমেশ… যখন ঘেরাও করা হয় ”
রত্নপ্রভা এগিয়ে এলো এক পা।
“তারপর?”
রক্ষী নিচু গলায় বললো
“ওরা পালিয়ে গেছে।”
“কোথায়?”
“নাসিরাবাদের দিকেই।”
রত্নপ্রভার মুখ আরও কঠোর হয়ে গেল।
সবকিছু এখন স্পষ্ট হতে শুরু করেছে।
অঙ্কুর সুনেহেরার অপহরণ আর এই অদ্ভুত আক্রমণ সবকিছু যেন একই খেলায় জড়িয়ে আছে। কিন্তু ও চাইছে টা কি?
মহলের ভেতর উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লো।
প্রহরীরা প্রস্তুত হচ্ছে, বার্তা পাঠানো হচ্ছে, সবাই বুঝে গেছে এটা কোনো সাধারণ ঘটনা না।
একটা বড় ঝড় সাহাবাদের দিকে এগিয়ে আসছে।

সবাই খেয়াল করলো মহলে নেই বাইজিদ।
প্রথমে কেউ গুরুত্ব দেয়নি। ভেবেছিল, হয়তো দরবারে আছেন, কিংবা কোনো কক্ষে বিশ্রাম নিচ্ছেন। কিন্তু একের পর এক খোঁজ নিয়েও যখন তাকে পাওয়া গেল না। এই সাত-সকালে গেল কোথায় সে?
উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়লো চারদিকে। রত্নপ্রভার কপাল কুঁচকে গেল।
“শাহজাদা কোথায়?”
প্রশ্নটা বারবার ঘুরতে লাগলো সবার মুখে। এই অস্থির পরিস্থিতিতে তার অনুপস্থিতি
আরও বিপজ্জনক করে তুললো সবকিছু।
ঠিক তখনই সামনে এগিয়ে এলো মাহাদি।
তার মুখে কোনো ভয় নেই, কোনো দ্বিধা নেই শুধু কঠিন স্থিরতা।
সে একবার চারপাশে তাকালো, পরিস্থিতি পরখ করলো। তারপর দৃঢ় কণ্ঠে আদেশ দিতে শুরু করলো
“প্রাসাদের চারদিকে দ্বিগুণ পাহারা বসাও।”
প্রহরীরা সঙ্গে সঙ্গে সাড়া দিল।
“প্রবেশপথ বন্ধ থাকবে। অনুমতি ছাড়া কেউ ঢুকবে না, কেউ বের হবে না।”
তার কণ্ঠে এমন কর্তৃত্ব কেউ প্রশ্ন করার সাহস পেল না। এরপর সে সৈন্যদের দিকে ঘুরে দাঁড়ালো।
“বাকি সৈন্যদের ভাগ করে দাও, রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে দাও।”

একজন সৈন্য এগিয়ে এলো
“হুজুর, কোথায় কোথায়?”
মাহাদি এক মুহূর্ত ভাবলো না।
“গ্রাম, বাজার, সীমানা অঞ্চল, সব জায়গায়। জনগণের নিরাপত্তা আগে।”

তার চোখে কঠোর দৃঢ়তা।
“যেখানে আক্রমণ হয়েছে সেখানে আগে পৌঁছাবে। যেখানে হয়নি সেখানে প্রস্তুতি নেবে।”

আদেশগুলো দ্রুত ছড়িয়ে পড়লো।
সৈন্যরা ছুটে গেল নিজেদের দায়িত্বে। মহলের ভেতর এখন টানটান উত্তেজনা। বাইজিদ নেই কিন্তু মাহাদি থেমে থাকেনি। সে নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে পুরো দায়িত্ব। প্রাসাদ এখন কড়া পাহারায়।

আর রাজ্যের প্রতিটা প্রান্তে সাহাবাদের সৈন্যরা ছড়িয়ে পড়ছে। একটা অদৃশ্য যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে
যেখানে প্রতিটা মুহূর্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রশিক্ষণ দুর্গে তখন সকাল গড়িয়েছে। মেহেরুন্নেসা অনুশীলনে ব্যস্ত তলোয়ারের চাল ধীরে ধীরে আয়ত্তে আনার চেষ্টা করছে। ঠিক সেই সময়ই এক রক্ষী হন্তদন্ত হয়ে এসে উপস্থিত হলো।
“হুজুর জরুরি খবর।”
বাইজিদ ঘুরে দাঁড়ালো। রক্ষী টি ফিসফিস করে কিছু বলল।
রক্ষী আর বাইজিদ এর মুখের অবস্থা দেখেই বোঝা গেল ঘটনা সাধারণ নয়। সংক্ষেপে সব শুনে তার মুখ কঠিন হয়ে গেল। আর এক মুহূর্ত দেরি করলো না।
মেহেরুন্নেসার দিকে তাকালো তার চোখে তখনও অনুশীলনের একাগ্রতা। বাইজিদ ধীরে এগিয়ে এলো। কিছু না বলেই, খুব আলতো করে তার কপালে ঠোঁট ছোঁয়ালো। মেহেরুন্নেসা থমকে গেল।
“আমি আসছি”
শুধু এইটুকু বললো সে। তারপর ঘুরে দাঁড়িয়ে রক্ষীর সঙ্গে দ্রুত বেরিয়ে গেল। আস্তাবলে গিয়ে ঘোড়ায় চড়ে বসতেই আর দেরি করলো না।
ক্ষিপ্র গতিতে ছুটে চললো প্রাসাদের দিকে।
পথে বাতাস কেটে যাচ্ছে, গাছপালা পিছিয়ে পড়ছে কিন্তু বাইজিদের মাথায় তখন একের পর এক চিন্তা।
নাসিরাবাদ একসময় সমৃদ্ধ রাজ্য ছিল।
তারপর এক ভয়ংকর যুদ্ধ হলো । এক বর্বর জাতির সাথে সংঘর্ষে মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল পুরো রাজ্য। কেউ টিকতে পারেনি প্রায়।
বেঁচে ছিল কেবল চন্দ্রা… আর অঙ্কুর।
বাকি সব। শেষ। এই ইতিহাস সে জানে।
তাহলে আজ হঠাৎ করে সেই নাসিরাবাদ দিক থেকেই এলো এই অদ্ভুত, নরপিশাচের মতো মানুষগুলো? কোথা থেকে এলো তারা?
কিভাবে এতদিন পর আবার জেগে উঠলো সেই ভয়ংকর ছায়া? বাইজিদের কপাল কুঁচকে উঠলো।
এটা শুধু একটা আক্রমণ না এর পেছনে বড় সড় কিছু আছে। আর সেই সব কিছুর সঙ্গে অঙ্কুর জড়িত কিনা, সেটা এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
ঘোড়ার গতি আরও বাড়ালো সে।
তার চোখে এখন একটাই সংকল্প এই রহস্যের শেষ দেখতে হবে। যে করেই হোক।

প্রাসাদে পৌঁছাতে পৌঁছাতে চারপাশে টানটান উত্তেজনা। প্রহরীরা সতর্ক, সৈন্যদের আনাগোনা সবকিছু যেন যুদ্ধের আগমনী বার্তা দিচ্ছে।
বাইজিদ সময় নষ্ট করলো না। সোজা চলে গেল সেই কক্ষে যেখানে থাকে চন্দ্রপ্রভা।
সে সবার কাছে রত্নপ্রভা নামেই পরিচিত।
দরজায় হালকা ধাক্কা দিতেই ভেতর থেকে কণ্ঠ এলো
“কে?”
“আমি,”
সংক্ষিপ্ত উত্তর বাইজিদের। দরজা খুলতেই চন্দ্রপ্রভা সামনে এলো।
তার চোখে ক্লান্তি, কিন্তু ভেতরে তীক্ষ্ণ সতর্কতা।
“তুমি ফিরে এসেছো”
সে ধীরে বললো। বাইজিদ ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করলো না
“কি হচ্ছে এগুলো?”
তার কণ্ঠে চাপা রাগ আর উদ্বেগ, চন্দ্রপ্রভা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলো। তার দৃষ্টি নিচু, যেন ভাবছে।বতারপর ধীরে মাথা নাড়লো।
“আমি নিজেও বুঝতে পারছি না”
“সবকিছু যেন হঠাৎ করেই বদলে যাচ্ছে।”
বাইজিদ তার দিকে গভীরভাবে তাকালো।
“কিন্তু একটা জিনিস পরিষ্কার,”
চন্দ্রপ্রভা চোখ তুলে তাকালো। দুজনের চোখে একই চিন্তা।
চন্দ্রপ্রভা ধীরে বললো
“অঙ্কুর…”
শব্দটা উচ্চারণ হতেই কক্ষের বাতাস ভারী হয়ে উঠলো। বাইজিদ মাথা নাড়লো।
“সে ই সব কিছু করছে”
চন্দ্রপ্রভা বলল
“আর আমরা পুরোটা এখনো ধরতে পারিনি। আস সব টা না জেনে কাওকে….”
বাইজিদ চোখ সরু করলো।
“নাসিরাবাদ এর সেই পুরনো ইতিহাস আবার ফিরে আসছে? নাকি কাকতালীয়? কোনটা বলবি তুই চন্দ্রা?”
চন্দ্রপ্রভা চুপ করে রইলো। তারপর কাঁপা কাঁপা গলায় বলল
“তুমি কি আমাকেও অবিশ্বাস করছো ভাইজান?”

বাইজিদ ফোঁস করে নিশ্বাস ছেড়ে চন্দ্রপ্রভার গালে হাত রাখলো। শীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল
“হয়তো তোর আর রত্নার আদল মেলে না। কিন্তু আমিও সবার মত মানি তুই ই আমার রত্না। বুঝলি? আমি তোকে কি করে অবিশ্বাস করবে?”

চন্দ্রার চোখ অশ্রুসিক্ত হয়। বাইজিদ এর হাতে হাত রেখে বলে
“এই গোটা লড়াইয়ে আমি তোমার সঙ্গে আছি ভাইজান। কেবল এক মায়ের পেটে জন্ম নিলেই ভাই হওয়া যায় না। নয়তো আমার নিজের ভাই আমায় হত্যা করতে চাইতো না। তুমি যেমন মানো আমিই রত্না, আমিও মানি। আমিই রত্না। তোমার বোন”

বাইজিদ উদ্বীগ্ন হয়ে বলে
“এসব অঙ্কুর ই করছে। অঙ্কুর শুধু একজন শত্রু না। সে একটা বড় খেলার শুরু করেছে। আর সেই খেলায়, সাহাবাদ এখন কেন্দ্রবিন্দু।”

“ভাইজান ও কেন এমন করবে? ও তো রাজ্য ছেড়েছে, রাজত্ব ছেড়েছে। ও এসব গড়তেও চায় না কখনো। তাহলে ও কি চাইবে বলো। ও তো….”

“চন্দ্রা ও মেহের কে চায়”

বাইজিদ এর কথাটা বজ্রপাত এর ন্যায় আঘাত হানলো চন্দ্রার বুকে। সরে গেলো কিছুটা। যেন পাথর হয়ে গেছে। ফিস ফিস করে একা একা আওড়ালো
“কিশোরী বয়স থেকে তোমার অপেক্ষা করলাম আমি। আর আজ তুমি ভালোবাসো মেহেরুন্নেসা কে?”

এমন কচু মার্কা রিয়্যাক্ট আসলে কাল থেকে ১ দিন পরপর গল্প দিবে। ৩-৪ ঘন্টা সময় নিয়ে লেখে এই রিয়্যাক্ট? আর নন ফলোয়ার যারা আছো ফলো দিয়ে দিও। গল্প হারিয়ে গ্রুপে গ্রুপে পোস্ট দিয়ে লিংক চাইতে হয় নয়তো। অবশ্যই ৩.৫k রিয়্যাক্ট পূরণ করবা। কপিবাজ দের যদি ৫k হয়। আমার ৩.৫k হবে না কেন?

কেমন হয়েছে জানাইও 💟🫶

Share On:

TAGS:



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply