নূরএসাহাবাদ
jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস
পর্ব – ৩৭
স্নানাগার থেকে বেরিয়ে এসে বাইজিদ দ্রুত পোশাক বদলালো।
মুখে আবার সেই চেনা গাম্ভীর্য ফিরে এসেছে৷ কিন্তু ভেতরে কোথাও একটা অস্থিরতা রয়ে গেছে।বসে চারপাশে তাকিয়ে মনে মনে ভাবলো
চন্দ্রার সাথে তার কথা বলা দরকার। অনেক কিছু জানার আছে।
বাইজিদ কক্ষ থেকে বেরিয়ে পড়লো।
প্রথমে পাশের দালান, তারপর বাগান, তারপর উঠোন এক এক করে মহলের প্রায় সব জায়গা খুঁজে ফেললো সে।
কিন্তু চন্দ্রপ্রভার কোনো খোঁজ নেই। তার ভ্রু কুঁচকে উঠলো। কোথায় গেল? একটু থেমে সে ভাবলো সুনেহেরা?ওর কাছে হয়তো জানা যেতে পারে।
এই ভেবে সে সুনেহেরার কক্ষের দিকে রওনা দিল। কিন্তু দাসীদের থেকে জানলো সে বাগানে গেছো মাত্রই। বাইজিদ ও গেলো সেদিকে। কিন্তু মাঝপথেই হঠাৎই ভেসে এলো তীব্র কণ্ঠস্বর।
কেউ যেন রেগে চিৎকার করছে। বাইজিদ থেমে গেল। শব্দটা যে দিক থেকে আসছে, সেদিকে তাকিয়ে সে এগিয়ে গেল ধীরে। কাছাকাছি যেতেই দৃশ্যটা পরিষ্কার হলো।
দূর থেকেই বোঝা যাচ্ছে সুনেহেরা দাঁড়িয়ে আছে, চোখে আগুন, হাত নেড়ে নেড়ে কারও ওপর চড়াও হয়ে কথা বলছে। বাইজিদ আরেকটু এগিয়ে দেখলো সামনে
মাহাদি।
সেনাপতি মাহাদি সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মাথা সামান্য নত, মুখ শান্ত একটাও কথা বলছে না। সবকিছু চুপচাপ শুনে যাচ্ছে।
“আপনি ভাবেন কি নিজেকে?”
সুনেহেরার কণ্ঠে স্পষ্ট ক্ষোভ।
“কেউ কিছু বলার অধিকার রাখে না?”
মাহাদি নীরব। তার দৃষ্টি নিচের দিকে, কিন্তু ভেতরে কী চলছে বোঝা যায় না। বাইজিদ কয়েক পা দূরে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল।নতার ভ্রু কুঁচকে উঠলো। এটা কি হচ্ছে?
সুনেহেরা দিন দিন যেন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। সে এক পা এগিয়ে এলো। তার দৃষ্টি এবার কঠোর। সে রাজ্যের সম্মানিত সেনাপ্রধান। তার সাথে এভাবে কথা বলছে? বাইজিদের ভেতরে বিরক্তি জমে উঠলো। সে আর দাঁড়িয়ে থাকলো না। সোজা এগিয়ে গেল তাদের দিকে
দেখার জন্য, ঠিক কী নিয়ে এই তর্ক।
বাইজিদ এগিয়ে আসতেই দৃশ্যটা বদলে গেল।
সুনেহেরা ঠিক যেন মুহূর্তেই থেমে গেল। তার চোখে যে আগুনটা একটু আগেও জ্বলছিল, সেটা যেন হঠাৎ নিভে গেল। সে একবার বাইজিদের দিকে তাকালো তারপর চোখ নামিয়ে নিল।
চারপাশে হালকা অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এলো।
বাইজিদ কাছে এসে দাঁড়ালো।
“কি হচ্ছে এখানে?”
তার কণ্ঠে চাপা কঠোরতা। সুনেহেরা কোনো উত্তর দিল না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর হঠাৎই বললো
“কিছু না।”
এবং কোনো ব্যাখ্যা না দিয়ে, কারও দিকে না তাকিয়ে সোজা সরে গেল সেখান থেকে।
বাইজিদ কিছুটা বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে রইলো তার পেছনের দিকে। ওর এই আচরণটা স্বাভাবিক না।
সে ধীরে মাহাদির দিকে ফিরলো।
“কি বলছিল ও ?”
প্রশ্নটা সংক্ষিপ্ত, কিন্তু ভেতরে স্পষ্ট অনুসন্ধান।
মাহাদি মাথা তুললো না পুরোপুরি। তার ভঙ্গি আগের মতোই সংযত।
“বাদ দিন, হুজুর,”
শান্ত গলায় বললো সে
“উনি যা ভালো মনে করেছে, তাই বলেছেন।”
কথাটা এমনভাবে বললো, যেন বিষয়টা গুরুত্ব দেওয়ার মতো কিছুই না। বাইজিদ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো তার দিকে। মাহাদির মুখে কোনো বিরক্তি নেই, কোনো রাগ নেই শুধু এক ধরনের স্থিরতা। এই মানুষটাকে বোঝা কঠিন। বাইজিদ আর চাপ দিলো না।
“চলো,”
দুজন পাশাপাশি হাঁটা শুরু করলো। পথিমধ্যে বাইজিদ দাঁড়াল। মাহাদিও দাড়ালো। পিছনে ঘুরে বাইজিদ আচমকা জড়িয়ে ধরলো মাহাদি কে। কিন্তু মাহাদি এখনো পাহাড়ের ন্যায় স্থির।
“ধন্যবাদ ভাই। তুমি মিথ্যা বলে আমায় না পাঠালে আজ আমার মেহের এর অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যেত।”
মাহাদি বর্মের আড়ালে মৃদু হাসলো। বাইজিদ ধরলেও সে ধরলো না। বাইজিদ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে মাহাদির দুই কাধে হাত রেখে বলল
“জীবনে যদি এই পাথর মানব টা কাওকে ভালোবাসে। তবে যেন সবার আগে আমাকেই জানায়। নিজের সর্বস্ব দিয়ে হলেও তার ভালো বাসা কে রক্ষা করবে এই বাইজিদ। এটা শাহজাদার প্রতিজ্ঞা।”
মাহাদি শীতল কন্ঠে বলল
“হুজুর। এই ধন্যবাদ আমার পাওনা নয়। সব টা নায়েব নেওয়াজে আবিদ এর পরিকল্পনা। তিনিই আমাকে বাধ্য করেছে আপনাকে এই মিথ্যা টা বলতে। তাই সবটুকু কৃতিত্ব তার”
মাহাদির অকপট স্বীকারোক্তি বাইজিদের কপালে ভাজ ফেলল।
“নেওয়াজ এই পরিকল্পনা করেছে?”
মহলের পেছনের দিক দিয়ে তারা পৌঁছালো প্রশিক্ষণ প্রাঙ্গণে। সেখানে ঢুকতেই অন্যরকম এক পরিবেশ। তলোয়ারের ঠকঠক শব্দ, ধাতব সংঘর্ষের ঝনঝন, আর যোদ্ধাদের হাঁকডাক সব মিলিয়ে জায়গাটা জীবন্ত, তীব্র। কিন্তু বাইজিদের দৃষ্টি হঠাৎ থেমে গেল। প্রাঙ্গণের মাঝখানে
রত্নপ্রভা দাঁড়িয়ে আছে যুদ্ধের ভঙ্গিতে।
হাতে তলোয়ার।
তার চলন দৃঢ়, দ্রুত একেবারে একজন যোদ্ধার মতো। তলোয়ার ঘুরছে তার হাতে নিখুঁত ছন্দে, বাতাস কেটে যাচ্ছে তীক্ষ্ণ শব্দে। তার মুখে ঘাম, চোখে একাগ্রতা। কোনো দুর্বলতা নেই বরং একটা জেদ, একটা শক্তি। ৫ জন পুরুষ যোদ্ধার সঙ্গে একাই লড়ছে।
বাইজিদ কিছুক্ষণ নিঃশব্দে তাকিয়ে রইলো।
এই চন্দ্রা কে সে আগে দেখেনি। মাহাদিও তাকিয়ে আছে, কিন্তু তার দৃষ্টি নিরপেক্ষ।
আর প্রাঙ্গণের মাঝে রত্নপ্রভা নিজের ছন্দে তলোয়ার চালিয়ে যাচ্ছে, যেন চারপাশের পৃথিবী তার জন্য থেমে গেছে। বাইজিদ কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে রইলো।
রত্নপ্রভা তখনও নিজের জগতে তলোয়ারের প্রতিটা চাল নিখুঁত করার চেষ্টা করছে। তার চোখে এমন একাগ্রতা, যেন এই মুহূর্তে চারপাশের কিছুই তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ না।
বাইজিদ ধীরে মাথা নাড়লো। সে বুঝলো এখন তাকে থামানো ঠিক হবে না। এই মনোযোগ, এই চেষ্টার মাঝখানে হস্তক্ষেপ করলে বরং ক্ষতি হবে।
কোনো শব্দ না করে, কাউকে না ডেকে সে ধীরে ঘুরে দাঁড়ালো। মাহাদি এক ঝলক তার দিকে তাকালো, কিন্তু কিছু বললো না। দুজনেই নীরবে প্রাঙ্গণ থেকে বেরিয়ে এলো।
বাইরে এসে বাইজিদের মুখের ভাব বদলে গেল।
আবার সেই দায়িত্বশীল, কঠোর শাসকের রূপ।
“আজ দরবারে জরুরি আলোচনা আছে,” সংক্ষিপ্তভাবে বললো সে।
মাহাদি মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো।
তারপর বাইজিদ সোজা দরবারের দিকে এগিয়ে গেল।
মহলের ভেতরের ব্যস্ততা তখন বাড়তে শুরু করেছে। প্রহরীরা জায়গা নিচ্ছে, কর্মচারীরা ছুটোছুটি করছে সবাই জানে, আজকের বৈঠকটা গুরুত্বপূর্ণ। দরবার কক্ষে প্রবেশ করতেই পরিবেশটা একদম ভিন্ন। গম্ভীর, ভারী।
এক এক করে সবাই আসন গ্রহণ করছে নায়েব, উপদেষ্টা, সেনাপতি। বাইজিদ নিজের আসনে বসল। তার মুখে কোনো ব্যক্তিগত ভাবনা নেই এখন। সবকিছু সরিয়ে রেখে সে প্রস্তুত
রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য।
সারাদিন কাটলো সেই দরবারেই।
আলোচনা, পরিকল্পনা, মতবিনিময়।
সময় কিভাবে পেরিয়ে গেল, টেরই পাওয়া গেল না।
বাইরের পৃথিবী, ব্যক্তিগত সম্পর্ক, অনুভূতি
সব যেন দূরে সরে গেল এই দায়িত্বের ভিড়ে। রাত গভীর হয়ে গেছে। দরবারের দীর্ঘ আলোচনা শেষে ক্লান্ত শরীর নিয়ে বাইজিদ নিজের কক্ষে ফিরলো। চারপাশ নিস্তব্ধ মহলের কোলাহল থেমে গেছে অনেক আগেই। দরজা বন্ধ করে সে ধীরে আরাম কেদারায় গা এলিয়ে দিল। একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস বেরিয়ে এলো তার বুক থেকে।
কিন্তু পরের মুহূর্তেই তার ভ্রু কুঁচকে গেল।
মনে হলো এই কক্ষে কেউ আছে। এই অনুভূতিটা সে ভুল করে না কখনো। তার দৃষ্টি ধীরে ধীরে ঘরের অন্ধকার কোণায় ঘুরলো। একটুও দেরি করলো না। ঝট করে উঠে দাঁড়িয়ে কোষ থেকে তরবারি টেনে বের করলো। চকচকে ফলাটা সরাসরি তাক করলো সামনে।
“কে?”
তার কণ্ঠ নিচু, কিন্তু তীক্ষ্ণ। অন্ধকারের ভেতর থেকে ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হলো এক অবয়ব।
সম্পূর্ণ আবৃত। মুখ ছায়ায় ঢাকা। কিন্তু তার দাঁড়ানোর ভঙ্গি, উপস্থিতি একটা অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস ছড়িয়ে দিচ্ছে। বাইজিদের চোখ সরু হয়ে এলো। কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকতেই সে চিনে ফেললো।
“অঙ্কুর…”
তার কণ্ঠে বিস্ময় মিশে গেল। নাসিরাবাদের শাহজাদা অঙ্কুর আল মাহের। বাইজিদ ধীরে তলোয়ারটা নামালো, কিন্তু সতর্কতা কমালো না।
“তুমি এখানে? এই সময়ে?”
অঙ্কুর স্থির দাঁড়িয়ে রইলো। তার ঠোঁটে হালকা, অস্পষ্ট এক হাসি ফুটে উঠলো।
“শুভ কাজ। বসে আলাপ করি?”
বাইজিদ হ্যা সূচক মাথা নেড়ে সোফায় বসলো। পাশে বসলো অঙ্কুরও।
“একটা চুক্তি করি… চলো।”
তার কণ্ঠ শান্ত কিন্তু ভেতরে লুকানো তীক্ষ্ণতা স্পষ্ট।
কক্ষের বাতাস যেন হঠাৎ ভারী হয়ে উঠলো।
দুজন রাজপুত্র মুখোমুখি। আর তাদের মাঝখানে অজানা এক প্রস্তাবের সূচনা। বাইজিদ কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইলো। তারপর ধীরে তলোয়ারটা নামিয়ে রাখলো, কিন্তু চোখের দৃষ্টি একটুও নরম হলো না।
“কি?”
সংক্ষিপ্তভাবে বললো সে। প্রদীপের ম্লান আলোয় অঙ্কুর আল মাহেরের মুখটা এবার স্পষ্ট চোখে অদ্ভুত এক চাহনি, ঠোঁটে অর্ধেক হাসি, যা সহজে বিশ্বাস জাগায় না। বাইজিদ তার দিকে তাকিয়ে বুঝে গেল এই মানুষটা ভালো উদ্দেশ্য নিয়ে আসেনি।
“বলো দ্রুত”
তার কণ্ঠ ঠান্ডা, সংযত,
“কি চাও?”
অঙ্কুর একটু হেলান দিয়ে বসল।
“তোমার খোঁজেই এসেছিলাম। কিন্তু… ভাগ্যটা আমার ভালো ছিল বোধহয়।”
বাইজিদের ভ্রু কুঁচকে গেল।
অঙ্কুর চোখ তুলে সরাসরি তাকালো তার দিকে।
“প্রথমবার সেই মোহিনীময় নারী কে দেখেছিলাম সেদিনই।”
কথাটা শেষ হতেই কক্ষের বাতাস যেন জমে গেল। বাইজিদের দৃষ্টি মুহূর্তে কঠিন হয়ে উঠলো।
অঙ্কুর থামলো না। তার কণ্ঠে মিশে গেল এক ধরনের লোভী বিস্ময়
“এমন রূপ… খুব কম দেখেছি আমি।”
সে যেন নিজের মনে বলছে, কিন্তু প্রতিটা শব্দ বাইজিদের কানে গিয়ে বিঁধছে।
“চোখ সরানো যায় না একবার দেখলে আবার দেখতে ইচ্ছে করে যেন সাদা মাখন। হাতে নিয়….”
“চুপ।”
বিকট একটা শব্দে অঙ্কুর কথা থামালো। কিন্তু সেই শব্দে স্পষ্ট আগুন। বাইজিদের হাত শক্ত হয়ে গেছে, আঙুলগুলো মুঠো হয়ে উঠেছে। তার চোখে এখন খাঁটি রাগ। অঙ্কুর থামলো। তারপর ধীরে ধীরে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো। সেই হাসিতে ছিল শয়তানি স্পষ্ট।
“রাগ করছো?”
খুব নরম গলায় বললো সে
“কেন? সত্যিটা শুনতে খারাপ লাগছে? আমি তো ভাবি অত সুন্দর স্ত্রী কে তুমি দূরে কী করে রাখো বাইজিদ?”
বাইজিদ উঠে দাঁড়াতে যাচ্ছিল কিন্তু নিজেকে থামালো। সে দাঁতে দাঁত চেপে বললো
“মূল কথায় আসো। আমার স্ত্রীর ব্যাপারে আর একটা….”
“রক্ষে রক্ষে বাপ রক্ষে”
অঙ্কুর এবার সোজা হয়ে বসল। তার চোখে ঠান্ডা হিসেবি দৃষ্টি। বাইজিদ এর দিকে সামান্য ঝুকে এলো।
“তোমার সব নাটক… আমি ফাঁস করে দিতে পারি।”
বাইজিদের চোখ সরু হয়ে এলো।
“কিসের নাটক?”
তার কণ্ঠ নিচু, বিপজ্জনক। অঙ্কুর ধীরে হেসে বললো
“ওসব তুমি ভালোই জানো।”
তারপর খুব পরিষ্কারভাবে বললো
“মেহেরুন্নেসাকে আমার হাতে তুলে দাও।”
এক সেকেন্ড থামলো। তার চোখ সরাসরি বাইজিদের চোখে
“নইলে তোমার মুখোশ খুলে যাবে সবার সামনে।”
অঙ্কুরের কথা শেষ হতেই বাইজিদ আর এক মুহূর্তও নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না।
ঝট করে উঠে দাঁড়িয়ে তলোয়ার টেনে নিলো।
এক নিঃশ্বাসে এগিয়ে গিয়ে অঙ্কুরের গলায় ঠেকিয়ে দিল ধারালো ফলাটা।
“একটা শব্দ আর বললে তোর কল্লাটা এখান থেকে হাতে করে নিতে হবে। জানোয়ার, আমার তোর মত কোনো মুখোশ নেই রে। যে টেনে খুলবি। আমি আমিই। শাহজাদা বাইজিদ শাহ্”
তার কণ্ঠে এমন রাগ, যেন সত্যিই আর এক মুহূর্ত দেরি করবে না। অঙ্কুর প্রথম ধাক্কায় একটু থমকালো। কিন্তু পরের মুহূর্তেই হো হো করে হেসে উঠলো। সেই হাসিতে ভয় নেই, বরং অদ্ভুত এক দম্ভ।
“মারবি?”
ঠোঁট বাঁকিয়ে বললো সে
“আমায়?”
বাইজিদের চোখ লাল হয়ে উঠেছে। তলোয়ারের চাপ আরও বাড়লো।
ঠিক তখনই অঙ্কুর ধীরে, খুব হিসেব করে বললো
“পারবি না।”
একটু থামলো। তারপর নিচু গলায় যোগ করলো
“কারণ তোর ছোট বোন… আমার কাছে বন্দি।”
কথাটা যেন বজ্রপাতের মতো পড়লো।
বাইজিদের হাত থমকে গেল।
তলোয়ারের চাপটা অল্প ঢিলে হয়ে এলো। চোখে মুহূর্তের জন্য এক ঝলক বিস্ময় তারপরই আবার কঠোরতা। সে দাঁতে দাঁত চেপে বললো
“শুধু ওর জন্য তোকে ছেড়ে দিলাম।”
কণ্ঠে বিষাক্ত সতর্কতা।
“নইলে…”
সে আরও ঝুঁকে এলো অঙ্কুরের দিকে।
“সাহাবাদের ছোট শাহজাদি সুনেহেরার জাহ্নবীকে তুই কেন?…”
তার চোখে আগুন জ্বলছে
“তোর বাপও বন্দি করার হিম্মত রাখে না।”
কথাটা শেষ হতেই অঙ্কুরের মুখের হাসিটা একটু কেঁপে উঠলো। সে অবচেতনেই পিছনে তাকালো।
আর ঠিক তখনই দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক অবয়ব স্পষ্ট হয়ে উঠলো।
চন্দ্রপ্রভা।
চন্দ্রপ্রভা আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালো না।
তার চোখে ছিল তীক্ষ্ণ, অদ্ভুত এক দৃষ্টি কিছু না বলেও যেন অনেক কথা বলে গেল।
ধীরে ঘুরে সে কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেল। অঙ্কুর এক ঝলক বাইজিদের দিকে তাকালো ঠোঁটে সেই একই শয়তানি হাসি।
তারপর সেও দ্রুত পিছু নিলো চন্দ্রপ্রভার।
দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দটা কক্ষে প্রতিধ্বনিত হলো।
বাইজিদ স্থির দাঁড়িয়ে রইলো কিছুক্ষণ।নতার কপাল কুঁচকে গেছে চোখে গভীর চিন্তা।
অঙ্কুরের কথাগুলো বারবার মাথার ভেতর ঘুরতে লাগলো। পরিস্থিতি জটিল হয়ে যাচ্ছে। সময় নষ্ট করার সুযোগ নেই। সে দ্রুত কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলো। আস্তাবলের দিকে যাওয়ার কথা মাথায় এলো কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই থেমে গেল।
রাত গভীর। এই সময় মহল থেকে ঘোড়া নিয়ে বের হওয়া নিষিদ্ধ। শকুন গুলো নজর রাখছে।
সে অন্য পথ ভাবলো।
গোপন সুড়ঙ্গ!
এক মুহূর্ত দেরি না করে সে মহলের পেছনের নির্জন অংশে চলে গেল। পাথরের দেয়ালের আড়ালে লুকানো সেই পুরনো পথ যেটা খুব কম মানুষই জানে। দরজাটা খুলে ভেতরে ঢুকে গেল সে। অন্ধকার, স্যাঁতসেঁতে সুড়ঙ্গ। শুধু নিজের নিঃশ্বাসের শব্দ আর পায়ের আওয়াজ।
দীর্ঘ পথ পেরিয়ে অবশেষে সে বাইরে বের হলো। রাত তখন আরও গভীর। চারপাশে ভয়ংকর নিস্তব্ধতা। সামনে জঙ্গল। বাইজিদ থামলো না।
দ্রুত পা বাড়ালো। জঙ্গলটা ঘন কোথাও আলো নেই, শুধু অন্ধকার আর অজানা শব্দ। ঝোপের শব্দ, দূরে পশুর ডাক সব মিলিয়ে পরিবেশটা বিপজ্জনক।
তবুও সে এগিয়ে চললো।
তার মনে এখন একটাই চিন্তা, মেহেরুন্নেসার আজ কঠিন বিপদ। সময় যেন তার শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাইজিদ এর মনে একটা কথা আসে
“সময় যেখানে সুযোগ নেয়,
ভালোবাসা টাও সেখানে অন্যায়”
রাত ধীরে ধীরে কেটে গেল। অন্ধকার ফিকে হতে শুরু করলো। ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই
দূরে দেখা গেল সেই দুর্গ। সাহাবাদের সীমানায়, নির্জন দাঁড়িয়ে থাকা সেই পুরনো স্থাপনা।
বাইজিদ থামলো না। শেষ শক্তিটুকু নিয়ে এগিয়ে গেল সেদিকে।
অবশেষে ভোর রাতের নরম আলোয় সে পৌঁছে গেল সেই দুর্গে। এক নতুন ঝড়ের সামনে।ভোরের আলো তখন পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি।
ধুলোমাখা, ক্লান্ত শরীর নিয়ে বাইজিদ দুর্গের ফটক পেরিয়ে ভেতরে ঢুকলো। তার নিঃশ্বাস ভারী, চোখে অস্থিরতা স্পষ্ট।
“মেহেরুন্নেসা কোথায়?”
প্রবেশ করেই সে জিজ্ঞেস করলো। চারপাশে থাকা কয়েকজন নারী যোদ্ধা থমকে তাকালো। কেউ বিস্মিত, কেউ অপ্রস্তুত।
“হয়তো নিজ কক্ষেই আছে হুজুর,”
একজনে বললো ধীরে। আরেকজন বলল
“না আমি ভোর রাতে ওনাকে উঠতে দেখেছি। তারপর থেকে আর দেখছি না”
বাইজিদের ভ্রু আরও কুঁচকে গেল। সে এক মুহূর্তও দেরি করলো না। দুর্গের ভেতরে ছুটে চললো। পুরনো এই দুর্গ, বহু বছরের সাক্ষী। মোটা পাথরের দেয়াল, জায়গায় জায়গায় শ্যাওলা জমে গেছে। সরু করিডোর, অন্ধকার সিঁড়ি, কোথাও ভাঙা ছাদ দিয়ে সূর্যের আলো তির্যকভাবে ঢুকে পড়ছে। বাতাসে ধুলো আর পুরনো কাঠের গন্ধ।
এক কক্ষ থেকে আরেক কক্ষ, বাইজিদ একটার পর একটা দরজা ঠেলে খুলছে।
“মেহেরুন্নেসা!”
তার কণ্ঠ প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসছে দেয়ালে।
কোথাও নেই। প্রশিক্ষণ প্রাঙ্গণ খালি। ভেতরের হলঘর নীরব। ছোট ছোট কক্ষ, সব ফাঁকা। সে থামছে না। তার পায়ের শব্দ ভারী হয়ে উঠছে, নিঃশ্বাস দ্রুত হচ্ছে। মনে হচ্ছে, এই বিশাল পাথরের দেয়ালগুলো যেন তাকে গিলে ফেলছে।
সময় যত যাচ্ছে তার ভেতরের অস্থিরতা ততই বেড়ে উঠছে।
কোথায় গেল সে? কিছু হয়েছে নাকি? তার চোখে ভয় স্পষ্ট হয়ে উঠলো। শেষমেশ সে দুর্গের এক প্রান্তে এসে থামলো। চারপাশে তাকালো কোথাও কোনো চিহ্ন নেই। তার হাত মুঠো হয়ে গেল। মাথার ভেতর যেন ঝড় বইছে। এক মুহূর্তের জন্য সে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো ঠিক যেন দিশেহারা।
না, এটা হতে পারে না।
ঠিক তখনই পেছন দিক থেকে পায়ের শব্দ।
হালকা, ধীর। বাইজিদ ঘুরে দাঁড়ালো। দুর্গের প্রবেশপথ দিয়ে ভেতরে ঢুকছে মেহেরুন্নেসা।
তার হাতে অনেকগুলো তাজা পদ্মফুল।
ভোরের আলোয় ভেজা সেই ফুলগুলো ঝলমল করছে। চুলে হালকা বাতাস লেগে উড়ছে, মুখে ক্লান্তির ছাপ নেই বরং এক ধরনের শান্তি। বাইজিদের চোখ স্থির হয়ে গেল। এক মুহূর্তের জন্য যেন বিশ্বাসই করতে পারলো না।
সে আর নিজেকে সামলাতে পারলো না।
দ্রুত এগিয়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরলো।
এত শক্ত করে। যেন আবার হারিয়ে ফেলবে এই ভয়টা এখনো কাটেনি।
মেহেরুন্নেসা প্রথমে চমকে উঠলো।
তার হাতে ধরা পদ্মফুলগুলো কাঁপলো।
“কি হয়েছে….? শাহজাদা? আপনি ঠিক আঋেন তো?”
কথাটা শেষ করার আগেই বাইজিদের আঁকড়ে ধরা আরও শক্ত হলো। তার শ্বাস ভারী, কণ্ঠ ভাঙা
“কোথায় ছিলে তুমি…?”
সেই প্রশ্নে লুকিয়ে ছিল ভয়, উদ্বেগ, আর অদ্ভুত এক স্বস্তি, যে সে ফিরে এসেছে।
মেহেরুন্নেসা ধীরে স্থির হলো। তারপর আস্তে করে বললো
“পদ্ম তুলতে গিয়েছিলাম…”
দুর্গের ভেতরে যারা ছিল যোদ্ধা নারী, দাসীরা তারা এক ঝলক তাকিয়ে সব বুঝে নিল। বাইজিদ যেভাবে মেহেরুন্নেসাকে জড়িয়ে ধরেছে, সেই দৃশ্যটা একান্তই ব্যক্তিগত। একজন আরেকজনের দিকে তাকিয়ে নীরবে সরে যেতে লাগলো সবাই।
মুহূর্তের মধ্যেই জায়গাটা প্রায় ফাঁকা হয়ে গেল।
মেহেরুন্নেসা তখনও অবাক হয়ে আছে।
“কি হয়েছে আপনার?”
আবার বলতে গেল সে। কিন্তু বাইজিদ কোনো উত্তর দিল না। তার হাত এখনো শক্ত করে ধরা।
“চলো,”
শুধু এইটুকুই বললো।
সে আর দেরি করলো না মেহেরুন্নেসাকে টেনে নিয়ে দ্রুত ভেতরের দিকে হাঁটতে লাগলো।
করিডোর পেরিয়ে, পাথরের দেয়াল ছুঁয়ে তারা পৌঁছালো সেই কক্ষে। দরজা বন্ধ হতেই বাইজিদ থামলো। মেহেরুন্নেসা এবার ঠিকভাবে তাকালো তার দিকে। আর তখনই তার চোখ স্থির হয়ে গেল। বাইজিদের পোশাকের ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে শরীরের ক্ষতচিহ্ন। কোথাও আঁচড়, কোথাও কেটে যাওয়া দাগ, কোথাও শুকনো রক্তের চিহ্ন।
জঙ্গলের পথ, রাতের সেই বিপদ সবকিছুর ছাপ যেন শরীরে লেগে আছে।
“এগুলো…!”
মেহেরুন্নেসার কণ্ঠ কেঁপে উঠলো। সে দ্রুত এগিয়ে এলো, হাত তুলে ছুঁতে গিয়েও থেমে গেল। ভয় পাচ্ছে, ব্যথা লাগবে।
“কি হয়েছে আপনার?”
তার চোখে স্পষ্ট উৎকণ্ঠা।
“এভাবে… এই অবস্থায়… আপনি কোথায় ছিলেন?”
সে আর নিজেকে সামলাতে পারলো না।
“বসুন। আমি এক্ষুণি গরম পানি আনাচ্ছি”
এক দাসীকে দিয়ে গরম পানি আনিয়ে নিলো। বাইজিদ এর শরীর থেকে পাঞ্জাবি টা খুলে ক্ষত স্থানে উষ্ণ গরম পানিতে পরিষ্কার কাপড় ভিজিয়ে মুছে দিতে লাগলো।
“কী যে করেন না আপনি? এক্ষুণি যদি……”
কথা বলতে বলতে বাইজিদ এর দিকে তাকাতেই কথা থেমে গেলো মেহেরুন্নেসার। লোকটার চোখের মণি কালো। এ তো বাইজিদ না। চোখ ছানা বড়া হয়ে আসলো মেহেরুন্নেসার। লোকটার ঠোঁটে ফুটলো শয়তানি হাসি। মেহেরুন্নেসা দু পা পিছিয়ে গিয়ে চিৎকার করে উঠলো।
“আআআআআআআ”
পরবর্তী পর্বে ধামাকা থাকবে। নেগেটিভ ভাবনা আনবেন না। গল্পটা হারিয়ে না ফেলতে পেইজে ফলো দিয়ে রাখুন। আর কেমন হলো জানাবেন। আমি যদি এত বড় পর্ব লিখতে পারি, আপনারা এক লাইন কমেন্ট কেন করতে পারবেন না?
নন ফলোয়ার পাঠিকারা, পেইজে ফলো দিয়ে রাখবেন 💟
Share On:
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE