#নীভৃতে_প্রেম_আমার_নীলাঞ্জনা
#নাজনীন_নেছা_নাবিলা
#পর্ব ৪০
অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষেধ
মিহাল তখনো ফোনের ওপাশে ইরফানকে জ্বালিয়ে মারতে ব্যস্ত, তাই সে টেরই পায়নি যে ওয়াশরুমের দরজাটা অনেক আগেই খুলে গেছে। নীলার গোসল তো অনেক আগেই শেষ হয়েছিল। সে চুল মুছতে মুছতে বের হতেই দেখতে পায়, মিহাল তার ফোনটা কানে দিয়ে মনের সুখে কথা বলে যাচ্ছে। আর ওপাশ থেকে ভেসে আসা ইরফানের কণ্ঠস্বর শুনে সে থমকে দাঁড়ায়।
মিহাল আর ইরফানের মধ্যকার যাবতীয় লাগামহীন কথাবার্তা নীলার কান এড়াতে পারল না। ‘বাচ্চা বউ’, ‘সারা রাত ঘুমাতে দিইনি’, ‘বুকে মাথা রেখে ঘুমাচ্ছে’—মিহালের মুখ থেকে বের হওয়া এই চরম মিথ্যা আর কাল্পনিক বাসর রাতের বর্ণনা শুনে নীলার মনে হলো তার দুই কান দিয়ে বুঝি আক্ষরিক অর্থেই গরম ধোঁয়া বের হচ্ছে! লজ্জা আর চরম অস্বস্তিতে তার ফর্সা মুখটা মুহূর্তের মধ্যে টকটকে লাল হয়ে উঠল।
তার ইচ্ছে করছিল ঠিক এই মুহূর্তে মাটি ফুঁড়ে ভেতরে ঢুকে যেতে।
মিহাল, এই একটা মানুষ এতটা নির্লজ্জ আর বানিয়ে বানিয়ে কথা বলতে পারে, তা নীলার ভাবনারও বাইরে ছিল। সে নিজের কপালে হাত দিয়ে চোখ দুটো বন্ধ করে ফেলল। মনের ভেতর তীব্র ইচ্ছে জাগল—আবারও ওয়াশরুমে ঢুকে দরজাটা লক করে দেয় এবং নিজেকে আজীবনের জন্য সেখানে বন্দি করে রাখে, যেন এই ধরাধামে আর কোনোদিন মিহালের মুখোমুখি হতে না হয়।
ঠিক তখনই মিহাল ফোনটা কান থেকে নামিয়ে পেছনে ঘুরতেই নীলাকে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল। নীলার অগ্নিদৃষ্টি আর লাল হয়ে থাকা মুখ দেখে মিহালের মুখের সেই চওড়া হাসি মুহূর্তেই হাওয়া হয়ে গেল।
মিহাল ঢোক গিলে ফোনটা কেটে বিছানায় ছুড়ে দিল। চোরের মতো মুখ করে সে নীলার দিকে তাকাল। তার এতক্ষণের বীরত্ব যেন এক নিমেষে কর্পূরের মতো উবে গেছে। ঘরের এসি চালু থাকা সত্ত্বেও মিহালের কপালে এখন বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করেছে।
নীলা এক পা এক পা করে মিহালের দিকে এগিয়ে এল। তার ভেজা চুলের দু-এক ফোঁটা জল তখনও চিবুক বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু তার চোখের সেই চণ্ডী রূপ দেখে মিহাল দু-কদম পিছিয়ে গেল।
নীলা দাঁতে দাঁত চেপে গলার স্বর যতটা সম্ভব নিচু রেখে বলল,
“কী বলছিলেন এতক্ষণ ফোনে? আমি আপনার বুকে ঘুমাচ্ছিলাম? আপনি আমাকে সারা রাত ঘুমাতে দেননি? এত বড় মিথ্যা কথা একটা মানুষ মুখে আনে কী করে, মি প্রফেসর?”
মিহাল আমতা আমতা করে নিজের চুল চুলকাতে লাগল। তারপর একটা কাঁচুমাচু হাসি দিয়ে বলল,
“আরে নীলাঞ্জনা শান্ত হও। আমি তো জাস্ট ইরফানকে একটু শিক্ষা দিচ্ছিলাম। ও তো তোমাকে চিট করেছে, তাই না? ওকে একটু হিংসে না করালে আমার পেটের ভাত হজম হচ্ছিল না।”
“তাই বলে এই সব নোংরা মিথ্যা বলবে?”
নীলার গলা এবার কিছুটা চড়ে গেল,
মিহাল এবার একটু সাহস সঞ্চয় করে নীলার ঠিক সামনে এসে দাঁড়াল। নীলার ভেজা চুলের সুবাস তার নাকে আসতেই সে আবার একটু আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল। তবে এবার সে আর রসিকতা করল না। বেশ গম্ভীর হয়ে বলল,
“নীলা, ও তোমার অতীত। আর অতীতকে আঘাত করার জন্য মাঝে মাঝে বর্তমানের ঘটনাকে একটু বানিয়ে কথা বলতে হয়। ও ভাবুক না আমরা খুব সুখে আছি।
কথাগুলো বলে একটু থেমে তারপর কন্ঠে দুষ্টুমি এনে বলতে লাগলো___
“আর তাছাড়াও আমি তো কোন নোংরা মিথ্যে বলিনি। এগুলো তো তোমার প্রতি আমার অধিকার এবং আমার প্রতি তোমার অধিকার তাই না?
মিহালের কথ শুনে নীলার কান গরম হয়ে গেল। সে তাকাতে পারছে না মিহালের দিকে। তবুও কথা ঘোরানোর জন্য বলল___
আর আপনি ইঁদুর কাকে বলছিলেন?
নীলা তো আগে থেকেই জানি যে ইরফান কে মিহাল ইঁদুর বলে ডাকে। তবুও সে এখন কথাগুলো ঘুরানোর জন্য এই প্রশ্নটা করল। মিহাল খানিকটা ঘাবড়ে গিয়ে বলতে
লাগলো __
ওই ইরফান কে ইঁদুর বলে ডাকি।
নীলা ভ্রু কুঁচকে দৃপ্ত পায়ে মিহালের দিকে এগিয়ে এলো। তার চোখেমুখে তখন তীব্র অসন্তোষের আভা। মিহালের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কণ্ঠস্বরে একরাশ ঝাঁঝ ঢেলে সে বলল,
“একটা মানুষকে পশুর নামে ডাকা যে কতটা অভদ্রতা, সেটা কি আপনার জানা নেই?”
মিহাল নীলার এই অগ্নিশর্মা রূপ দেখে বিন্দুমাত্র বিচলিত হলো না। উল্টো সে অত্যন্ত নির্লিপ্ত মুখে, একজোড়া নিষ্পাপ চোখ মেলে এক পরম বোকা বোকা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল,
“আচ্ছা, ইঁদুর কি আদেও কোনো পশু?”
মিহালের এমন আকস্মিক ও অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্নে নীলা মুহূর্তের জন্য ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেল। তার ভেতরের রাগটা যেন এক লহমায় হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। মনে মনে সে নিজেই কিছুটা বিভ্রান্ত বোধ করল—আসলেই তো, ইঁদুর কি পশুর পর্যায়ভুক্ত, নাকি অন্য কিছু? এই বৈজ্ঞানিক সত্য তো তার নিজেরও এই মুহূর্তে জানা নেই। তবে মিহালের সামনে নিজের ব্যক্তিত্বের কোনো খামতি সে প্রকাশ পেতে দেবে না। তাই চটজলদি মনের দ্বিধা আড়াল করে, মুখে একরাশ কৃত্রিম গাম্ভীর্য ফুটিয়ে বলল,
“আপনি নিজে একজন শিক্ষক হয়ে উল্টো আমাকে কেন এই প্রশ্ন করছেন?”
মিহাল কয়েক মুহূর্ত গম্ভীর হয়ে চুপ করে রইল। যেন সে কোনো গভীর তত্ত্ব নিয়ে ভাবছে। তারপর ওষ্ঠকোণে মৃদু হাসি ফুটিয়ে বলল,
“দেখুন ম্যাডাম, আমি ইকোনমিক্সের প্রফেসর। পশুপাখি বা জীববিজ্ঞানের কোনো বিশেষজ্ঞ নই।”
তারপর একটু থেমে আবার বলতে লাগলো __
আর তাছাড়াও আমি যেহেতু প্রফেসর তারমানে প্রশ্ন আমিই করব তুমি নও।
মিহালের এই অনড় যুক্তিতে নীলা এবার চরম বিরক্ত হলো। কথার পিঠে কথা বাড়িয়ে সময় নষ্ট করার কোনো ইচ্ছে তার নেই। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ত্যক্ত বিরক্ত কণ্ঠে বলল, “উফ! আমাকে আর না জ্বালিয়ে এবার দয়া করে গোসল করতে যান তো। বেলা তো আর কম হলো না! আর কতক্ষণ এভাবে রুমের ভেতর আটকে থাকবেন?”
নীলার তাগাদায় মিহালের মাথায় এক চিলতে দুষ্টু বুদ্ধি খেলে গেল। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক চিলতে চতুর ও মোহনীয় হাসি। সে ধীর পায়ে নীলার একদম কাছাকাছি এসে দাঁড়াল। দুজনের মাঝের দূরত্বটুকু ঘুচিয়ে, নিজের মুখটা নীলার কানের খুব কাছে নিয়ে গিয়ে ফিসফিসিয়ে গভীর কণ্ঠে বলল,
“বিয়ের পরের দিন সকালে গোসল করার পেছনে তো একটা জোরালো কারণ লাগে, নীলাঞ্জনা। এই সাতসকালে আমি খামোখা কেন শুধু শুধু গোসল করতে যাবো বলো? তার চেয়ে বরং এক কাজ করো না গো… বিয়ের পরের দিন সকালে গোসল করার একটা সুন্দর কারণ তুমি নিজেই তৈরি করে দাও না, নীলাঞ্জনা!”
মিহালের মুখ থেকে এমন আকস্মিক ও লাগামহীন রোমান্টিক কথাবার্তা শুনে নীলা স্তম্ভিত হয়ে গেল। বুকের ভেতরটা তার দুরুদুরু করে কেঁপে উঠল, আর গণ্ডদেশ ছেয়ে গেল লজ্জার রক্তিম আভায়। তবে সে দমে যাওয়ার পাত্রী নয়। অতি দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে, ওষ্ঠাধরে এক বাঁকা ও চতুর হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলল। মিহালের চোখের দিকে চেয়ে অবলীলায় বলল,
“এক কাজ করি প্যারেল্যাল, আমি আপনার গায়ে ছেপ মারি? তাহলে এই সকাল সকাল গোসল করার একটা জুতসই কারণ আপনি অনায়াসেই পেয়ে যাবেন।”
নীলার মুখে এমন রোমান্স-বিধ্বংসী কথা শুনে মিহালের চোখ দুটো বিস্ময়ে চড়কগাছ হয়ে গেল। তার সমস্ত রোমান্টিকতার বেলুন এক মুহূর্তে ফুস করে ফেটে গেল। সে রীতিমতো আঁতকে উঠে চিৎকার করে বলে উঠল, “ইয়াখখখ! ছিঃ নীলাঞ্জনা! রোমাঞ্চের বারোটা না বাজালে কি তোমার মনের শান্তি হয় না?”
নীলা বিজয়ের হাসিতে নিজের দুই হাতের বাহু বুকের ওপর ভাঁজ করল। তারপর কৌতুকভরে দু-বার ভ্রু নাচিয়ে বলল, “ভাবছি কথা না বাড়িয়ে আপনার সকালের গোসলের কারণটা আমি সত্যিই তৈরি করে ফেলি!”
বলেই নীলা যেই না মুখে থুতু দেওয়ার একটি কৃত্রিম ভঙ্গি করল, অমনি মিহাল প্রাণভয়ে এক লাফে ছিটকে সোজা বাথরুমের দিকে দৌড় লাগাল। মিহালের এই চরম ভীতি ও অসহায় আত্মসমর্পণ দেখে নীলা আর নিজের হাসি চেপে রাখতে পারল না; সারা ঘর কাঁপিয়ে সে এক চিলতে খিলখিল ও অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল।
নীলা হাসতে হাসতে বিছানায় লুটিয়ে পড়ল। তার খিলখিল হাসির শব্দে যেন ঘরের চারপাশের বাতাসও মেতে উঠল। হাসির বেগ কিছুটা সামলে নিয়ে সে বাথরুমের দরজার দিকে তাকিয়ে বেশ রসিকতার সুরে চেঁচিয়ে বলল,
“বেশি দেরি করবেন না কিন্তু প্রফেসর সাহেব! তা না হলে আমি কিন্তু বাইরে থেকে বাথরুমের লাইটটা একদম নিভিয়ে দেব!”
নীলার এই চপল হুমকির জবাবে বাথরুমের ভেতর থেকে পানির শব্দের মাঝেই ভেসে এল মিহালের উদাত্ত কণ্ঠের গান। সে নিজের চেনা সুরে বেশ দরদ ঢেলে গাইতে লাগল:
“তুমি দিও নাগো বাসর ঘরের বাত্তি নিভাইয়া…
আমি বন্ধ ঘরে অন্ধকারে যাবো মরিয়া…”
এক লাইন গেয়েই মিহাল হঠাৎ থমকে গেল। তারপর বাথরুমের ভেতর থেকেই কিছুটা অনুশোচনার স্বরে বলল, “ও আচ্ছা, সরি নীলাঞ্জনা! আমাদের তো বাসরটাই ঠিকঠাক হলো না, আর তুমি কিনা মহা খুশিতে বাসর ঘরের বাতি নিভিয়ে দেবে? ধুর, আমি একদম ভুল লিরিক্সে গাইলাম! ওয়েট, ওয়েট… আবার গাইছি।”
মিহাল মুহূর্ত খানেক দম নিয়ে, এবার লাইট নেভানোর বাস্তব পরিস্থিতির সাথে মিলিয়ে নতুন করে সুর ভাঁজল__
“তুমি দিও নাগো বাথরুমের বাত্তি নিভাইয়া…
আমি বন্ধ ঘরে অন্ধকারে যাবো মরিয়া।
তুমি চাইলে নীলাঞ্জনা জয়েন করো আমার সঙ্গে,
তোমায় নিয়ে আমি ডুব দিব খুশির…
শেষের লাইনের অন্ত্যমিল মেলাতে গিয়ে মিহাল চরম বিপাকে পড়ে গেল। ‘খুশির’ শব্দের সাথে ছন্দ মেলানোর মতো কোনো যুতসই শব্দ তার মাথায় এল না। অনেক চেষ্টা করেও লাইনটা মেলাতে না পেরে অগত্যা তাকে ওখানেই গান থামিয়ে দিতে হলো।
এতক্ষণ বিছানায় শুয়ে শুয়ে নীলা খুব মনোযোগ দিয়ে মিহালের এই স্বরচিত অদ্ভুত গান শুনছিল। মিহালের বানানো লিরিক্সগুলো যতই উদ্ভট আর সস্তা হোক না কেন, তার কণ্ঠের সহজাত মাধুর্যের কারণে গানটা শুনতে কিন্তু বেশ ভালোই লাগছিল। তবে গানের ভেতরের ওই ডাবল মিনিং আর দুষ্টুমিভরা কথাগুলো শুনে নীলার হাসির বাঁধ ভাঙল। সে হাসতে হাসতে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বাথরুমের দরজার উদ্দেশে বলল,
“আপনার এই অদ্ভুত কবিপ্রতিভা আর লিরিক্সের হাত থেকে আমাকে রেহাই দিন! আপনি বরং বাথরুমের ভেতরে ওই ঝরনার পানির সাথেই রোমান্স করুন, আমি বাইরে গেলাম।”
কথাটা শেষ করেই নীলা আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়াল না। নিজের পরনের ওড়নার আঁচলটা টেনে মাথায় একটা হালকা ঘোমটা টেনে নিল সে। নববধূর সলজ্জ ভঙ্গিতে রুমের দরজা খুলে সে বাইরে পা বাড়াল। তার মনে এখন দুটি উদ্দেশ্য—প্রথমত, তার ফুফুর সাথে দেখা করে সকালের সালামটা সেরে নেওয়া, আর দ্বিতীয়ত, চঞ্চল ইকরার খোঁজ নেওয়া যে সে এই সকাল সকাল কোথায় ঘাপটি মেরে বসে আছে।
নীলা ধীরে ধীরে ফুফুর ঘরের দিকে এগিয়ে চলল। তার বুকের ভেতর তখন এক অদ্ভুত, অজানা শিহরণ। মনের ভেতর স্মৃতির পাতাগুলো ওলটপালট হতে লাগল। জীবনের হিসাব-নিকাশগুলো বড় অদ্ভুত! যে ফুফুকে সে এর আগে কখনো দেখেনি, এমনকি যাঁর অস্তিত্বের কথাও সে জানত না, আচমকা তাঁর সাথে দেখা হতে না হতেই ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস বা মধুর মিলন—সেই ফুফুর ছেলের সাথেই তার বিয়ে হয়ে গেল! সবকিছুই যেন তার কাছে কোনো রূপকথার গল্প বা সিনেমার কাহিনীর মতো অবাস্তব লাগছিল। তার ওপর বিয়ের সেই বিশেষ মুহূর্তে নিজের পরিবার সামনাসামনি ছিল না, তারা উপস্থিত ছিল কেবল মুঠোফোনের ভিডিও কলের ওপারে। এক রাতের ব্যবধানে একটা অচেনা বাড়ি, কিছু নতুন মানুষ তার কতটা আপন হয়ে উঠেছে, ভাবতেই নীলার গা শিউরে উঠল।
এসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতেই সে পা টিপে টিপে মিনা মির্জার ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল। ঘরের কাঠের দরজাটা খোলাই ছিল। তবুও শিষ্টাচার বজায় রাখতে সে বাইরে থেকে দরজায় মৃদু নক করল। ভেতর থেকে তখনই ফুফুর স্নেহমাখা কণ্ঠের অনুমতি ভেসে এল।
নীলা ধীর পায়ে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করল। তাকে দেখামাত্রই মিনা মির্জা শশব্যস্ত হয়ে বিছানা থেকে নেমে এলেন এবং স্নেহার্দ্র কণ্ঠে অনুযোগের সুরে বলে উঠলেন, “এমা! আমার ঘরে আসার জন্য তোর আবার অনুমতি নেওয়ার কী প্রয়োজন রে পাগলী? মনে রাখিস, আমি শুধু তোর ফুফু নই, তোর মা-ও বটে। আর মায়ের ঘরে আসতে সন্তানের কখনো অনুমতির প্রয়োজন হয় না।”
ফুফুর মুখ থেকে এমন নিঃশর্ত মাতৃত্বের বাণী শুনে নীলার ভেতরের বাঁধভাঙা আবেগ আর আটকে রাখা গেল না। তার চোখের কোণ অশ্রুতে ভিজে উঠল। কোনো বাক্যব্যয় না করে সে পরম শান্তিতে ফুফুকে জড়িয়ে ধরল। রক্তের টান যে কতটা তীব্র হতে পারে, তা সে এই মুহূর্তে প্রতি ফোঁটায় অনুভব করতে পারল। কিছুক্ষণ সেই চেনা ও ওম ছড়ানো বুকে মুখ লুকিয়ে থাকার পর নীলা নিজেকে একটু সামলে নিয়ে অপরাধী কণ্ঠে বলল,
“আই অ্যাম সরি ফুফু… আজ সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠতে আমার একটু দেরি হয়ে গেল।”
মিনা মির্জা আলতো করে নীলার চিবুক ছুঁয়ে, মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে পরম মমতায় বললেন,
” প্রথমত আমাকে মা বলে ডাকার চেস্টা করবি।আর হ্যাঁ এতে সরি বলার কী আছে? এটা এখন তোর নিজের বাড়ি, তোর নিজের সংসার। তুই যখন খুশি তখন ঘুম থেকে উঠবি, তোর সুবিধামতো সবকিছু করবি। নিজের বাপের বাড়িতে যেমন স্বাধীনভাবে থাকতি, এখানেও ঠিক তেমনি থাকবি। সো, ডোন্ট ওয়ারি মাই ডিয়ার! আর এখন এসব নিয়ে বেশি কথা না বাড়িয়ে জলদি গিয়ে তোর বান্ধবীকে ডেকে নিয়ে আয় দেখি। সকালের নাস্তার সময় তো পার হয়ে যাচ্ছে। এমনিতেও কাল রাতে তোরা দুটোর কেউই ঠিকমতো কিছু খাসনি। এখন তো পেট পুরে খেতে হবে, চল।”
নাস্তার কথা উঠতেই নীলার মনে ফুফার কথা উদয় হলো। সে কিছুটা ইতস্তত করে ফুফুর কাছে তার ফুফার ব্যাপারে জানতে চাইল। মিনা মির্জা মৃদু হেসে উত্তর দিলেন,
“উনি একটা জরুরি কাজের জন্য সকাল সকাল খাওয়া-দাওয়া সেরেই বাইরে চলে গেছেন।”
শ্বশুরের অনুপস্থিতির কারণ জানতে পেরে নীলা আশ্বস্ত হলো। এরপর আর কথা না বাড়িয়ে, ফুফুর হাত ধরে তারা দুজনে ড্রয়িংরুমের দিকে এগোতে লাগল।
মিহাল সবে গোসল করে বের হয়েছে। টাওয়াল দিয়ে চুল মুছতে মুছতে বারিন্দায় চলে গেল। তখনই তার পেছনে মুনভি এসে ঠোঁটে দুষ্টু হাসি নিয়ে জিজ্ঞেস করল ___
বাসর রাতে বউ কি করলো?
মিহাল নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল __
কি আর করবে? বরাবরের মতন আমার প্যান্ট ভিজিয়ে দিয়েছে।
মিহালের কথা শুনে মুনভি অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো। সে হাসতে হাসতে বলল __
তোর বউ শুধু তোর প্যান্টই ভিজিয়ে দেয়। সেইটা বিয়ের আগে হোক কিংবা বিয়ের পরে।
মুনভির কথা শুনে মিহাল বাঁকা হাসলো এবং বলল___
আমার প্যান্ট ভেজানোর জন্য তবুও বউ আছে, তোর তো তাও নেই।
মিহালের কথা অনেকটা মুনভির কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দেওয়ার মত লাগলো। সে দুঃখে দুই হাত দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে নিলো এবং মিহালের কাঁধে মাথা রেখে বলল__
তোর বউয়ের বান্ধবীর সাথে আমার সেটিং করিয়ে দে না রে ভাই। তুই যে জায়গায় প্যান্ট ভিজাস সেই জায়গায় আমাকে অন্তত শার্ট ভেজানোর সুযোগ দে।
মুনভির কথা শুনে মিহাল শব্দ করে হেসে উঠলো। তার হাসি থামতেই চাইছে না। সে সন্দেহ একবার করেছিল যে হয়তো মুনভি ইকরা কে পছন্দ করে। কিন্তু আজকে তার সন্দেহ সত্যি তে রুপান্তর হলো।সে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল __
তার মানে তুই আমার নীলাঞ্জনার বান্ধবী ইকরাকে পছন্দ করিস? এর জন্যই আমার নীলাঞ্জনার পেছনে এরকম ঘুরঘুর করিস। যাতে নীলাঞ্জনার সাথে থাকার মাধ্যমে ইকরার কাছাকাছি থাকতে পারিস তাই না?
মুনভি মুখ থেকে হাত সরিয়ে মাথার চুল চুলকিয়ে বলল ___
তুই যেদিন নীলাকে প্রথম দিন ইউনিভার্সিটিতে দেখেছিলি সেদিনই আমি ইকরাকে ইউনিভার্সিটিতে দেখেছিলাম সেই ক্যান্ট্টিনেই। প্রথম দেখাতে ইকরা কে আমার মনে ধরে। এবং তারপর নীলার সাথে তোর ঝগড়া হলো, আবার অনুষ্ঠানের দিন সেই ঘটনার পর নীলা এবং ইকরার সাথে আমার সম্পর্ক ভালো হলো এবং যখন তুই আর নীলা ফুটেজ দেখার জন্য আলাদা রুমে গেলি তখন ইকরার সাথে কথা বলতে বলতে জানতে পারলাম তারা সিঙ্গেল। তারপর তুই এসে যখন বলি এই মেয়েই তোর নীলাঞ্জনা, অর্থাৎ নীলা মির্জা। তখনই আমি বলতে নিয়েছিলাম যে নীলা বিবাহিত নয়। কিন্তু কিছু একটা ভেবে বলিনি।
এতটুকু বলেই মুনভি থেমে গেল। দুজনের মধ্যেই পিন পতন নীরবতা। এই নীরবতা ভেঙ্গে মিহাল বলল__
ভেবেছিলি আমাকে একটু জ্বালিয়ে আমাকে শায়েস্তা করবে তাই না?
মুনভি হাসলো।মিহাল ও নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। কিছু না বলেই মুনভি কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলে এবং নিজের করা ভুলের জন্য ক্ষমা চাইতে লাগল। আর মুনভি? সে তো এই দিনে জন্য অপেক্ষা করছিল।
চলবে??? ভুল ত্রুটি হলে ক্ষমা করবেন।
ইন শা আল্লাহ কলাকে সকালে না পারলেও বিকালে একটি পর্ব আসবে
Share On:
TAGS: নাজনীন নেছা নাবিলা, নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ১৪
-
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৩৫
-
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৭
-
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৩০
-
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৩২
-
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ২৪
-
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা গল্পের লিংক
-
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ১১
-
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ১৫
-
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ১