#নতুন_প্রেমের_গান
#পর্ব_৩৪
“ বউ ! একটা চুমু দিবা?”
সৌরভের এই চরম যন্ত্রণার মুহূর্তেও এমন রোমান্টিক আর বেহায়া আবদার শুনে নোরা যেন পাথর হয়ে গেল। দুপুর থেকে বুকের ভেতর জ্বলতে থাকা হিংসের আগুনটা এক নিমিষেই নিভে গেল।সিয়াদাত সুপ্রভা যাওয়ার পর থেকেই নোরা রুমবন্দি হয়ে ছিল। ঈশিতা চৌধুরী, রওনক চৌধুরী বারকয়েক এসে দরজায় কড়া নেড়েছেন। কিন্তু নোরা কোনো রেসপন্স করে নি।সে কাঁদতে কাঁদতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিল , সে নিজেও জানে না।তার ঘুম ভাঙ্গে দরজার কপাট খোলার শব্দে।সে অগ্নিদৃষ্টি নিয়ে দরজার দিকে তাকাতেই দেখল, সৌরভ এক পা খোঁড়াতে খোঁড়াতে ঘরের ভেতর ঢুকছে। তার পরনে তখনো বিয়ের শেরওয়ানি, তবে অবিন্যস্ত। পায়ে ব্যান্ডেজ থাকার কারণে সে ঠিকমতো ভর দিতে পারছে না।
ভেতরে এসেই সৌরভের চোখ গেল ঘরের মেঝেতে। চারদিকে কাঁচের টুকরো আর ফুলদানির ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দেয়ালের সুইচে চাপ দিতেই পুরো ঘর আলোয় আলোকিত হয়ে উঠল।
হঠাৎ আলো আসায় নোরা চোখ জোড়া ছোট করে সৌরভের দিকে তাকাল। সৌরভ মেঝেতে পড়ে থাকা ভাঙা কাঁচগুলো এড়িয়ে কোনোমতে খাটের কোনায় গিয়ে বসল। নোরার দিকে তাকিয়ে হালকা হেসে বলল,
“বাপ রে বাপ! রুমের এ কী হাল করেছ? বাসর রাতে বরের জন্য এত বড় সারপ্রাইজ রেডি করে রেখেছ জানলে তো আরও আগেই চলে আসতাম!”
নোরার এমনিতেই মাথা ঠিক ছিল না। সৌরভের বাঁকা কথা শুনে তার শরীরের রক্ত মাথায় চড়ে গেল। সে কয়েক পা এগিয়ে এসে চিৎকার করে বলল,
“তোমার সাহস হয় কী করে আমার রুমে আসার? কার পারমিশন নিয়ে তুমি এই ঘরে ঢুকেছ? গেট আউট ফ্রম মাই রুম রাইট নাউ!”
নোরার চিৎকারে বিন্দুমাত্র দমলো না সৌরভ। সে খাটে আরাম করে হেলান দিয়ে বসল। শান্ত গলায় বলল,
“আরে, রাগছ কেন? আর পারমিশন কিসের? তুমি হয়তো ভুলে যাচ্ছ নোরা তুমি এখন আমার লিগ্যাল ওয়াইফ, মানে বিবাহিত স্ত্রী। আর আজ আমাদের বাসর রাত। তো, বাসর রাতে নিজের বউয়ের কাছে আসব না তো কি পাশের ফ্ল্যাটের ভাবীর কাছে যাব ?”
সৌরভের এমন সস্তা রসিকতা নোরা সহ্য করতে পারল না। তার এতদিনের অহংকার, সিয়াদাতকে হারানোর কষ্ট আর সৌরভের প্রতি ঘৃণা,সব এক হয়ে তাকে অন্ধ করে দিল। সে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে সৌরভের দিকে তেড়ে এলো। তার শেরওয়ানির কলার দুটো শক্ত মুঠোয় চেপে ধরল। দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিসি করে উঠল,
“মুখ বন্ধ করো তোমার! তুমি কোন সাহসে নিজেকে আমার স্বামী দাবি করো? এই বিয়ে আমি মানি না, কোনোদিন মানব না!”
সে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে এত জোরে সৌরভের শেরওয়ানির কলার টেনে ধরে ঝাঁকুনি দিল যে, সৌরভের বুকের সদ্য সেলাই করা গভীর ক্ষতটা তীব্র টানে আবার হাঁ হয়ে গেল। ভেতরের তাজা লাল র’ক্ত সেই ব্যান্ডেজ ভেদ করে, শুষে নিয়ে দ্রুত বাইরের সাদা শেরওয়ানির ওপর ফুটে উঠতে লাগল। চোখের পলকে সাদা কাপড়ের ওপর র’ক্তের একটা বড় লাল বৃত্ত তৈরি হলো, যা ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ে সৌরভের পুরো বুক ভিজিয়ে দিতে লাগল।
লাল র’ক্ত নজরে আসতেই নোরা হকচকিয়ে গেল। তার হাতের মুঠো শিথিল হয়ে এল। সে স্তম্ভিত হয়ে প্রথমে সৌরভের বুক বেয়ে ছড়িয়ে পড়া র’ক্তের দিকে, তারপর সৌরভের মুখের দিকে তাকাল। ভয়ে ও আশঙ্কায় নোরার ফর্সা মুখটা মুহূর্তেই ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
তীব্র যন্ত্রণায় সৌরভের শ্যাম মুখটা মুহূর্তে নীল হয়ে গেছে। কপালে জমে উঠেছে বিন্দু বিন্দু ঘাম। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, এত কষ্ট আর তীব্র যন্ত্রণার মাঝেও সৌরভ তার ঠোঁটের সেই শয়তানি হাসিটা হারাল না। সে ব্যথায় চোখ দুটো বুজে আবার মেলল। নোরার ভীত ও কাঁপতে থাকা চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে মাদকতাভরা গলায় বলল,
“ বউ একটা চুমু দিবা?”
নোরা কিছু বলতে পারলো না। ফ্যালফ্যাল নয়নে সৌরভের দিকে তাকিয়ে রইলো।
সৌরভ ব্যাথাতুর গলায় বলল, “ বাসর রাতে বউয়ের থেকে একটা চুমু তো পেতেই পারি , তাই না? দিবা চুমু?”
নোরার মেজাজ চড়া হলো।সে কুপিত কণ্ঠে বলল, “ গু দেব।খাবি গু?”
*******
খাওয়া দাওয়া শেষ করে সুপ্রভা প্লেট আর ট্রে গুছিয়ে টেবিলের এক কোণে রেখে দিল। এতক্ষণ খাবারের ব্যস্ততায় সময়টা কেটে গেলেও, এখন ঘরজুড়ে আবার সেই চেনা নীরবতা নেমে এলো।
সুপ্রভা খাটের এক কোণে গুটিসুটি মেরে বসে নিজের শাড়ির আঁচল নিয়ে কাঁচুমাচু করতে লাগল। তার ভেতরের অস্বস্তি আর দ্বিধা এখন স্পষ্ট। রাত বাড়ছে, আর সেই সাথে বাড়ছে তার বুকের ভেতরের ধুকপুকানি।সিয়াদাত শাহারিয়ার যদি স্বামীর অধিকার নিয়ে আসে…!
সিয়াদাত সুপ্রভার কাঁচুমাচু ভাব আর চোখের চাউনি দেখে সুপ্রভার মৌন ভাষ্যটুকু এক লহমায় বুঝে ফেলল। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সুপ্রভার দিকে এগিয়ে এলো।সুপ্রভার খুব কাছে না গিয়ে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে নরম গলায় বলল,
“সকাল থেকে তোমার ওপর দিয়ে অনেক ধকল গেছে। শরীর, মন দুটোই ক্লান্ত। তুমি এক কাজ করো, ফ্রেশ হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ো।”
সিয়াদাতের কথায় সুপ্রভা একটু চমকে চোখ তুলে তাকাল। আমতা আমতা করে নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল,
“আর আপনি? আপনি কোথায় থাকবেন?”
সিয়াদাত সুপ্রভার চোখের ভয়টুকু দূর করার জন্য আলতো করে হাসল। ঘরের কোণে রাখা বড় সোফাটার দিকে ইশারা করে বলল,
“তোমার যদি কোনো প্রবলেম না হয়, তবে আমি এই ঘরেই থাকব। তবে তোমার চিন্তার কোনো কারণ নেই, আমি ওই সোফাটায় শুয়ে রাতটা কাটিয়ে দেব। আর যদি আমার এই ঘরে থাকা নিয়ে তোমার বিন্দুমাত্র অস্বস্তি হয়, তবে নির্দ্বিধায় বলতে পারো। আমি অন্য কোনো রুমে চলে যাচ্ছি।”
সিয়াদাতের কথা শুনে সুপ্রভার ভীষণ খারাপ লাগল। নিজের ওপরই এক ধরনের অপরাধবোধ কাজ করতে লাগল তার। সে মনে মনে বলল,‘যে মানুষটা আমার জন্য এত কিছু করতে পারল, আমার একটুখানি শান্তির জন্য সোফায় ঘুমাতে রাজি হয়ে গেল, তার জন্য আমি এতটুকুও করতে পারব না?’
সুপ্রভা একবার আলতো করে চোখ তুলে খাটটার দিকে তাকাল। কিং সাইজের খাটটি বিশাল, দুজনে অনায়াসে অনেকখানি দূরত্ব বজায় রেখেও শুয়ে থাকা সম্ভব।
সুপ্রভা নিজের সমস্ত লজ্জা আর সংকোচ এক পাশে সরিয়ে রেখে কাঁপা গলায় বলল,
“অন্য রুমে যাওয়ার বা সোফায় ঘুমানোর দরকার নেই। খাটটা অনেক বড় আপনি বিছানায় থাকুন।”
বিষ্ময়ে চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল সিয়াদাতের। সে অবাক গলায় বলল, “ আর ইউ শিওর?”
সুপ্রভা সম্মতি সূচক মাথা নাড়ল।সুপ্রভার সম্মতিসূচক মাথা নাড়া দেখে সিয়াদাতের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে স্বস্তির হাসি ফুটে উঠল। সে আর কথা না বাড়িয়ে আলমারি থেকে নিজের জন্য একটি বালিশ আর হালকা কাঁথা টেনে নিল। সুপ্রভাও আর এক মুহূর্ত দেরি না করে ওয়াশরুমে গিয়ে হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে এল।
বিছানাটা আসলেই অনেক বড়। সুপ্রভা একদম ডানদিকের প্রান্ত ঘেঁষে শুয়ে পড়ল। আর সিয়াদাত বামদিকের শেষ প্রান্ত ধরে নিজের শরীরটা বিছানায় এলিয়ে দিল। মাঝখানে রইল এক বিশাল দূরত্বের শূন্যতা।
সুপ্রভা সোজা হয়ে শুয়ে সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে রইল। ঠিক তখনই সিয়াদাতের দিক থেকে হালকা বাতাসের ঝাপটার সাথে এক তীব্র সুবাস ভেসে এলো সুপ্রভার নাকে। ঘ্রাণটা নাকে আসতেই সুপ্রভার চট করে বাসের সেই জার্নির কথা মনে পড়ে গেল। সিলেট যাওয়ার পথে বাসে তার পাশের সিটের যাত্রী মোতালেবের গা থেকেও হুবহু এই একই কড়া গন্ধ আসছিল।সিয়াদাতের মতো এত বড় ঘরের ছেলের গা থেকে মোতালেবের সেই চেনা গন্ধ পেয়ে সুপ্রভার কেমন যেন গুলিয়ে গেল।সে তড়িঘড়ি করে উঠে বসল।
সিয়াদাতও দ্রুত উঠে বসে বেডসাইড ল্যাম্পের হালকা আলোটা জ্বেলে দিল। সুপ্রভার দিকে তাকিয়ে কিছুটা চিন্তিত গলায় বলল,
“অ্যানি প্রবলেম, সুপ্রভা?”
সুপ্রভা সিয়াদাতের দিকে আড়চোখে তাকালো। সরল গলায় বলল,
“আপনার গা থেকে কেমন যেন মোতালেব মোতালেব গন্ধ আসছে।”
মোতালেব সম্পর্কে জানতে হলে বইটই অ্যাপ থেকে পড়তে হবে #আমি_মোতালেবের_বেগম ।
লিংক: https://link.boitoi.com.bd/dvt3l
চলবে ইনশাআল্লাহ।।
Share On:
TAGS: নতুন প্রেমের গান, নুজাইফা নূন
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নতুন প্রেমের গান পর্ব ৬
-
নতুন প্রেমের গান পর্ব ১৬
-
নতুন প্রেমের গান পর্ব ২২
-
নতুন প্রেমের গান পর্ব ১৩
-
নতুন প্রেমের গান পর্ব ২৯
-
নতুন প্রেমের গান পর্ব ৩২
-
নতুন প্রেমের গান পর্ব ৯
-
সুপ্রভা পর্ব ৩
-
নতুন প্রেমের গান গল্পের লিংক
-
নতুন প্রেমের গান পর্ব ২৩