Golpo romantic golpo নতুন প্রেমের গান

নতুন প্রেমের গান পর্ব ২৭


নতুনপ্রেমেরগান

পর্ব_২৭

সুপ্রভার মৌখিক সম্মতির পর পুরো বাড়িতে প্রাণ ফিরে এলো। ঈশিতা চৌধুরী আর দেরি করতে চাইলেন না। তিনি জানেন, লোহা গরম থাকতেই পিটিয়ে নিতে হয়। সিয়াদাত আইনিভাবে কাজটা সেরে রাখলেও, পরিবারের সবার মনে একটা ধর্মীয় পূর্ণতা পাওয়ার তৃষ্ণা ছিল।

তিনি সিয়াদাতের দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় কী যেন বললেন। সিয়াদাত মাথা নেড়ে সায় দিল। রহমত মিয়া দ্রুত কাজী সাহেবকে ভেতরে নিয়ে এলেন। ড্রয়িংরুমের একপাশে অত্যন্ত চমৎকারভাবে একটি বিয়ের স্টেজ করা হয়েছে।।সাদা আর সোনালী রঙের সিল্কের কাপড়ে মোড়ানো দুটি রাজকীয় সোফা রাখা হয়েছে সেখানে। চারপাশটা টাটকা রজনীগন্ধা আর লাল গোলাপের ঝালরে ঘেরা। সিয়াদাত ধীর পায়ে গিয়ে একটি সোফায় বসল। তার চোখে এখন রাজ্যের স্বস্তি। অন্যদিকে সুপ্রভাকে নিয়ে আসা হলো। লাল বেনারসি আর গয়নায় তাকে অপার্থিব সুন্দর লাগছে।যদিও তার চোখের কোণে জল শুকানোর দাগটা এখনো স্পষ্ট। তাকে সিয়াদাতের পাশের সোফায় বসানো হলো। চারদিকের ঝাড়বাতির আলো যখন সুপ্রভার ওপর পড়ল, সিয়াদাত এক মুহূর্তের জন্য তার দিক থেকে চোখ সরাতে পারল না।

এহেন দৃশ্য দেখে নোরার মনে হলো কেউ যেন তার কলিজায় বিষাক্ত তলোয়ার দিয়ে আঘাত করছে। সিয়াদাতের সেই মুগ্ধ দৃষ্টি,যে দৃষ্টির জন্য নোরা বছরের পর বছর চাতক পাখির মতো চেয়ে ছিল।তা আজ অবলীলায় সুপ্রভার ওপর নিবদ্ধ।নোরা দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে নখ দিয়ে দেয়াল খামচে ধরল। তার বুকের ভেতরটা ঈর্ষায় জ্বলছে। সুপ্রভার এই অভাবনীয় ভাগ্য দেখে তার ভেতরে এক আগ্নেয়গিরি জন্ম নিল। সে মনে মনে বিড়বিড় করে বলতে লাগল,

“কী অদ্ভূত ভাগ্য তোমার সুপ্রভা! যে মানুষটাকে আমি হাজারবার চেয়েও পেলাম না, যার একটুখানি সানিধ্য পাওয়ার জন্য আমি নিজেকে বিলিয়ে দিতে রাজি ছিলাম, তাকে তুমি না চাইতেও কত সহজে পেয়ে গেলে! তোমার চোখের ওই নোনা জলের দাম এত বেশি যে সিয়াদাত শাহারিয়ার নিজের সব আদর্শ বিসর্জন দিয়ে তোমাকে আগলে নিল? আমি কী কম ছিলাম?”
এই রাজকীয় সাজ, এই সম্মান, সিয়াদাত শাহারিয়ার ওই গভীর চাউনি,এসবই তো আমার হওয়ার কথা ছিল। অথচ তুমি মাঝখান থেকে এসে সব দখল করে নিলে! আজ তুমি কাঁদছো? এই কান্না তোমার আনন্দের হওয়া উচিত সুপ্রভা, কারণ তুমি এমন একজনকে পেয়েছো যাকে পাওয়ার যোগ্যতা তোমার কোনোদিনই ছিল না।”

নোরা আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াতে পারল না। অপমানে আর রাগে তার শরীর কাঁপছে। সে গজগজ করতে করতে হনহনিয়ে নিজের রুমের দিকে এগিয়ে গেল।রুমে ঢুকেই সে সজোরে দরজাটা টেনে দিল। শব্দটা এতটাই জোরে হলো যে বাইরের উৎসবের আমেজেও তা এক মুহূর্তের জন্য ছন্দপতন ঘটাল। দরজাটা ভেতর থেকে আটকে দিয়ে সে দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে বসে পড়ল। দাঁতে দাঁত চেপে ক্রুদ্ধ গলায় বলল, “এত সহজে তোমাকে জিততে দেব না সুপ্রভা। সিয়াদাত শাহারিয়ার আমার ছিল, আর আমারই থাকবে। এই রাজকীয় বাসর আমি তোমাদের জন্য বিষাক্ত করে তুলব, দেখে নিও!”

কাজী সাহেবের গা থেকে ভেসে আসা আতরের কড়া ঘ্রাণ পুরো ঘরে ম ম করছে।তিনি খাতা খুলে গম্ভীর গলায় বললেন, “বিসমিল্লাহ। তাহলে শুরু করা যাক।”

সুপ্রভার বুকটা দুরুদুরু কাঁপছে। যদিও সে আগে বলেছিল মেনে নেবে, কিন্তু এই মুহূর্তে তার মনে হচ্ছে সে কোনো এক গোলকধাঁধায় ঢুকে পড়েছে। সিয়াদাত একপলক সুপ্রভার দিকে তাকাল। সুপ্রভার কাঁপতে থাকা আঙুলগুলো সিয়াদাতের নজর এড়াল না।

কাজী সাহেব সিয়াদাতকে সম্বোধন করে বললেন, “বাবা শেখ সিয়াদাত শাহরিয়ার, আপনি কি সুপ্রভাকে নির্দিষ্ট দেনমোহর ধার্য করিয়া আপনার স্ত্রী হিসেবে কবুল করিয়া নিতে রাজি আছেন?”

সিয়াদাত এক মুহূর্তও দেরি করল না। সে সুপ্রভার চোখের দিকে নরম গলায় বলল, “আলহামদুলিল্লাহ, কবুল।”

তিনবার কবুল বলার পর সিয়াদাতের মুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি নেমে এলো। এবার কাজী সাহেব সুপ্রভার দিকে ফিরলেন। পুরো ঘর নিস্তব্ধ। সবাই নিশ্বাস বন্ধ করে সুপ্রভার কবুল বলার অপেক্ষায় রয়েছে। আলেয়া বেগম মেয়ের কাঁধে হাত রেখে অভয় দিলেন।

কাজী সাহেব কোমল স্বরে বললেন, “মা সুপ্রভা, আপনি কি শেখ সিয়াদাত শাহরিয়ারকে স্বামী হিসেবে কবুল করে নিচ্ছেন?”

সুপ্রভা ঠোঁট কামড়ে ধরে রইল। সে চোখ বুজল। চোখের কোণ দিয়ে এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল তার লাল শাড়ির আঁচলে। সে অনুভব করল সিয়াদাতের স্থির দৃষ্টি তার ওপর নিবদ্ধ ।সে নিজেকে ধাতস্থ করে অস্ফুট বলল—
“কবুল।”

দ্বিতীয়বার বলার সময় গলাটা একটু পরিষ্কার হলো, আর তৃতীয়বার যখন সে কবুল বলল, তখন সিয়াদাত একটা লম্বা শ্বাস ছাড়ল। মনে হলো যেন বুকের ওপর থেকে কয়েক মণ ওজনের পাথর নেমে গেছে।

দোয়া শেষ হতেই পুরো ঘরে পরম প্রশান্তি নেমে এল। সিয়াদাত পকেট থেকে একটা হীরের আংটি বের করল। সবার সামনেই সে সুপ্রভার বাম হাতটা নিজের হাতের ওপর তুলে নিল। সুপ্রভা সামান্য কেঁপে উঠল।সে হাত সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে সিয়াদাত আরও শক্ত করে ধরল।সিয়াদাত আংটিটা সুপ্রভার অনামিকায় পরিয়ে দিয়ে নিচু গলায় বলল, “আইনত তো অনেক আগেই দখল নিয়েছিলাম, আজ সামাজিকভাবেও সিলমোহর পড়ে গেল মিসেস সিয়াদাত শাহরিয়ার।আজ থেকে শুধু কাগজে-কলমে নয়, তুমি আমার প্রতিটি নিশ্বাসে মিশে গেলে লাল চমচম। রাগটা এবার একটু কমালে হয় না?”

সুপ্রভা রাগী চোখে তাকাল, কিন্তু সিয়াদাতের মায়াবী চাউনির সামনে সেই রাগ বেশিক্ষণ টিকল না। সে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বলল, “মনে রাখবেন, আমি কিন্তু এখনো বলেছি আমি আপনাকে ক্ষমা করিনি।”

সিয়াদাত বাঁকা হেসে বলল, “ক্ষমা করার জন্য তো সারাজীবন পড়ে আছে লাল চমচম। আপাতত এই ভন্ড প্রফেসরের মিষ্টি শাসন সহ্য করার প্রস্তুতি নাও!”

ঈশিতা চৌধুরী দূর থেকে এই দৃশ্য দেখে হাসলেন। তিনি জানেন, এই ঝগড়া আর অভিমানের আড়ালেই জন্ম নেবে এক নতুন প্রেমের গান।

সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ। এবার বিদায় নেওয়ার পালা। ড্রয়িংরুমের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সুপ্রভা। তার দুচোখ বেয়ে অবিরল ধারায় জল পড়ছে। সচরাচর মেয়েরা বাপের বাড়ি থেকে বিদায় নেয়, কিন্তু সুপ্রভার বিদায়টা আজ বড় বিচিত্র। সে বিদায় নিচ্ছে তার শ্বশুর শাশুড়ির কাছ থেকে, যারা তাকে আগলে রেখেছিলেন নিজের সন্তানের মতো।

ঈশিতা চৌধুরী সুপ্রভার সামনে এসে দাঁড়ালেন। তাঁর চোখ দুটোও লাল হয়ে আছে। তিনি সুপ্রভার চিবুক ধরে মুখটা উঁচিয়ে ধরলেন। অত্যন্ত মমতায় বললেন, “কাঁদিস না মা। আজ থেকে তুই আর এই বাড়ির বউ নোস। আজ থেকে তুই আমাদের মেয়ে হয়ে অন্য বাড়িতে যাচ্ছিস। তোর মৃত স্বামীর স্মৃতিগুলো তোর মনে থাক, কিন্তু তোর জীবনটা যেন থমকে না থাকে।
সিয়াদাত তোকে অনেক সুখে রাখবে রে মা।”

সুপ্রভা ঈশিতা চৌধুরীর বুকে মাথা রেখে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। ধরা গলায় বলল, “মা, আপনারা ছাড়া আমি কীভাবে থাকব? এই বাড়িতেই তো আমার জীবনের সবটুকু জড়িয়ে আছে। আপনাদের ফেলে রেখে আমি অন্য কোথাও যাব, এটা কোনোদিন ভাবিনি।”

র‌ওনক চৌধুরী পাশে দাঁড়িয়ে চশমার কাঁচটা মুছলেন। নিজেকে শক্ত করে বললেন, “আমরা তো কোথাও হারিয়ে যাচ্ছি না মা। আমাদের ছেলেটা নেই বলে কি তুমি সারাজীবন সাদা শাড়ি আর একাকীত্বের মধ্যে নিজেকে বন্দি করে রাখবে? আমরা সেটা সইতে পারছিলাম না বলেই তো সিয়াদাতের হাতে তোমার হাতটা হাতটা তুলে দিলাম। যা‌ও মা, নতুন জীবন শুরু কর। আমাদের দোয়া সবসময় তোমার সাথে আছে।”

সিয়াদাত এগিয়ে এসে র‌ওনক চৌধুরী আর ঈশিতা চৌধুরীর সামনে দাঁড়াল। অবলীলায় র‌ওনক চৌধুরীর হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল, “ আপনারা যে বিশ্বাসে সুপ্রভাকে আমার হাতে তুলে দিয়েছেন, আমি কথা দিচ্ছি আমার নিঃশ্বাস থাকা পর্যন্ত সেই বিশ্বাসের মর্যাদা রাখব। ও আপনাদের মেয়ে হয়েই থাকবে, শুধু ওর ঠিকানাটা বদলাচ্ছে।”

সুপ্রভা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে র‌ইলো। ঈশিতা চৌধুরী নোরার অভিমান ভাঙ্গাতে উপরে গেলেন।র‌ওনক চৌধুরীর ফোনে কল আসায় তিনিও সরে গেলেন।সিয়াদাত দুষ্টু হেসে সুপ্রভার দিকে ঝুঁকে এলো।তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল, “রাতে লাল চমচম খাওয়া হবে কিন্তু।বি রেডি ফর দিস।”

চলবে ?

® Nuzaifa Noon

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply