#সুহাসিনি মিমি
ডেসটেনি পর্ব ২২
শপিং মলের কাঁচের স্বয়ংক্রিয় দরজাটা সরে যেতেই ঠান্ডা এয়ারকন্ডিশনের হিমেল বাতাস মুখে এসে লাগল প্রিয়ন্তীর। বাইরের গরম আবহওয়াটা গুচল খানিকটা। ব্যাগের স্ট্র্যাপটা একটু শক্ত করে কাঁধে তুলে নিয়ে ভেতরে পা রাখল ও। ওর ঠিক পেছনেই ঢুকল তাজধীর। চোখ দুটো স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে চারপাশটা একবার স্ক্যান করে নিল মুহূর্তেই। এই সেকেন্ড খানিকের ব্যবধান হবে হয়তো। এর মধ্যে আশেপাশের মানুষ, দোকান, ক্রেতাদের চলাফেরা সবকিছুই তার দৃষ্টির ভেতর দিয়ে নিঃশব্দে যাচাই হয়ে গেল। অতঃপর ধীর পায়ে এগিয়ে এল প্রিয়ন্তীর পাশে। অকারণে কথোপকথনের চেষ্টা করার মানুষ সে নাহলেও এই মেয়েটার আশপাশে থাকলে ঘটে তার উল্টোটাই। তবে স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে চুপই রইল আপাতত।
লিফটের সামনে এসে থামল ওরা। দু’জন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকলেও দুজনের মাঝখানে দূরত্ব ছিল যথেষ্ট। লিফটের আয়নায় একবার চোখ পড়ল প্রিয়ন্তীর। নিজের পাশেই তাজধীরের প্রতিবিম্ব আবিষ্কার করল ও। গম্ভীর, স্থির, নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে লোকটা। তৎজলদি চোখ সরিয়েও নিলো।
“কোন ফ্লোর?”
গম্ভীর স্বরে জিজ্ঞেস করল তাজধীর। প্রিয়ন্তী উত্তরে ছোট করে বলল,
“আই থিঙ্ক থার্ড!”
তৃতীয় তলায় নেমে সোজা হাঁটা দিল প্রিয়ন্তী। চারপাশে সারি সারি শাড়ির দোকান।মলের রঙিন আলোয় ঝলমল করছে কাপড়গুলো।প্রিয়ন্তী একটুও সময় নষ্ট না করে একটা বড় শাড়ির শোরুমে ঢুকে পড়ল উল্টো ঘুরে।
“আসসালামু আলাইকুম ম্যাডাম, কি দেখাবো?”
সাথে সাথে এগিয়ে এল এক সেলসম্যান।প্রিয়ন্তী একটু ইতস্তত করে বলল,
“গায়ে হলুদের জন্য কিছু শাড়ি দেখান। একটু ইউনিক হলে ভালো হয়।”
“অবশ্যই ম্যাডাম!”
মুহূর্তের মধ্যেই টেবিলের উপর একের পর এক শাড়ি বের করে দেখাতে লাগল সেলসম্যান। হলুদ, মস্তার্ড, গোল্ডেন, লেমন, সাথে লাল-সবুজের কাজ করা ঝলমলে রঙের বাহারি শাড়ি। প্রিয়ন্তী একটার পর একটা হাতে নিচ্ছে, দেখছে, আবার সরিয়ে রাখছে।কোনোটাই পছন্দ হচ্ছেনা তেমন।পাশেই একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে তাজধীর। হাত দুটো প্যান্টের পকেটে, ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে চুপচাপ। মাঝে মাঝে চোখ যাচ্ছে শাড়ির দিকে।শাড়ি থেকে চোখ সরিয়ে নিস্পলক অবলোকন করে যাচ্ছে মেয়েটার ভারী উদ্বিগ্ন চেহারাটা।এরমাঝেই প্রয়োজনীয় ফোন কল আসলে রিসিভ করে একটু দূরে সরে দাঁড়ায় সে। ওদিকে সেলসম্যান আরও কিছু শাড়ি বের করে রাখল। এর মধ্যে একটা ছিল হালকা নেভি ব্লু তার উপর সূক্ষ্ম সাদা আর গোল্ডেন এমব্রয়ডারি কাজকরা।আঁচলটার দুইপাশে মোটা করে গোল্ডেন বর্ডার। মোদ্দাকথা চোখে লাগার মতোই সুন্দর শাড়িটা। প্রিয়ন্তী সেটার দিকে একটু বেশি সময় ধরে তাকিয়ে থেকে ঠোঁট কামড়ে ধরল। একটার পর একটা শাড়ি—সবই ভালো লাগছে, কিন্তু কোনটা নেবে বুঝতে পারছে না ঠিক।শেষমেশ বিরক্ত হয়ে ফোন বের করল।মেসেঞ্জারে ভিডিও কল লাগালো মিতালী কে।ভিডিও কল কানেক্ট হতেই ওপাশে মিতালীর মুখ ভেসে উঠল।মিতালী ভীষণ উচ্ছ্বাসিত হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“ পেয়েছো কিছু?পছন্দ হয়েছে?”
প্রিয়ন্তী একে একে কয়েকটা শাড়ি ক্যামেরার সামনে ধরে ধরে দেখালো। বলল দ্বিধা নিয়ে,
“এইগুলো দেখো ভাবি। কোনটা নেবো বুঝতে পারছি না।”
ওপাশে মিতালী মন দিয়ে দেখছে। ঠিক তখনই তার ফোনে একটা মেসেজের নোটিফিকেশন ভেসে উঠল। ভ্রু কুঁচকে খুলে মেসেজটা দেখতেই দুই সেকেন্ড চুপ থেকে হঠাৎ বলল,
“ওই যে, ব্লু আর হলুদের কম্বিনেশনেরটা—ওটাই নেও। আর পাশেরটাও।”
প্রিয়ন্তী অবাক হয়ে বলল,
“এইটা? নিশ্চিত?”
“হ্যাঁ হ্যাঁ, ওইটাই। খুব সুন্দর লাগবে তোমায়।”
প্রিয়ন্তী এবার ভালো করে দেখল শাড়িটা। সত্যিই, খারাপ না।চুপচাপ মাথা নেড়ে সেলসম্যানকে বলল,
“এই দুটো প্যাক করে দিন।”
দূরে দাঁড়িয়ে সবটা সূক্ষ চোখেই দেখল তাজধীর । ঠোঁটের কোণে খুব হালকা একটা হাসি ফুটে উঠল মানবের। সেসব আপাতত আড়াল রইলো প্রিয়ন্তীর।
:
:
:
শাড়ির ব্যাগগুলো হাতে নিয়ে দোকান থেকে বের হতেই প্রিয়ন্তী একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল অবশেষে।তবে সেই স্বস্তিটুকুও স্থায়ী হলো না বেশিক্ষন।অমনি মনে পড়ল, শাড়ির সঙ্গে ম্যাচিং ব্লাউজ তো কেনাই হয়নি।একটু ভ্রু কুঁচকে চারপাশে তাকাল একবার। তারপর সরাসরি হাঁটা দিল মলের এক পাশের দিকে যেখানে স্পষ্ট করে লেখা, “Ladies Corner”। তাজধীর স্বাভাবিকভাবেই ওর পেছন পেছন এগিয়ে যাচ্ছে।প্রিয়ন্তী ঠিক দরজার সামনে এসে থামল। এক পা ভেতরে দিতে গিয়েও হঠাৎ যেন কিছু মনে পড়তেই পেছন ফিরে তাকাল। দেখল, তাজধীরও প্রায় তার ঠিক পেছনেই ঢুকতে যাচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে ভ্রু কুঁচকে উঠল ওর। প্রচন্ড আক্রোশে উঁচু বাক্যয় বলল,
“আপনি ওখানে কোথায় যাচ্ছেন?”
তাজধীরও থমকে দাঁড়াল একপল। স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই বলল,
“আপনি যেখানে যাচ্ছেন।”
প্রিয়ন্তী ঠোঁট চেপে এক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল লোকটার দিকে। তারপর একটু ঝুঁকে দরজার ওপরে থাকা সাইনবোর্ডটার দিকে ইশারা করে বলল,
“আমি মেয়েদের কর্নারে যাচ্ছি। আপনিও কি আমার সঙ্গে ওখানে যাবেন?”
কথাটার ভেতরের খোঁচাটা এতটাই স্পষ্ট ছিল যে,কীয়তক্ষণের জন্য সত্যিই অপ্রস্তুত হয়ে গেল তাজধীর। চোখ তুলে সাইনবোর্ডটার দিকে তাকাতেই ব্যাপারটা বুঝতে পারল। হালকা কেশে গলা পরিষ্কার করে একপা সরিয়ে পিছনে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল,
“ওহ!”
শব্দটা সংক্ষিপ্ত শুনালেও ভিতরে ভিতরে খানিকটা বিব্রতবোধ করল ঠিকই। প্রিয়ন্তী আর কিছু বলল না। চলে গেল ভিতরে। প্রিয়ন্তী যেতেই তখন ঠোঁটের কোনে বিড়বিড় করে উচ্চারিত হয়েছিল কিছু বাক্যদয়,
“একটা সময় তো আমাকেই সব কিনে দিতে হবে,ম্যাডাম!”
তবে সেটা শোনা হলোনা প্রিয়ন্তীর। তার আগেই মেয়েটা চলে যায়। ভেতরে ঢুকতেই চারপাশে নানান রঙের ব্লাউজ পিস, লেইস, অ্যাক্সেসরিজ চোখে পড়ল ওর। ওদিকে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে রইল তাজধীর।
হাত দুটো বুকের ওপর গুটিয়ে, দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে। পাক্কা বিশ মিনিট সময় নিয়ে বের হলো প্রিয়ন্তী। হাতে তখন ছোট-বড় কয়েকটা ব্যাগ।
প্রিয়ন্তী বের হতেই সোজা হয়ে দাঁড়াল তাজধীর। বলল তাড়া দিয়ে,
“হয়েছে? নাকি আর কিছু বাকি আছে?”
প্রিয়ন্তী বিরক্ত গলায় বলল,
“না!”
“আর কিছুই বাকি নেই?”
পরের প্রশ্নটায় চোখ সরু করে তাকাল তাজধীর।
প্রিয়ন্তীও চোখ তুলে বলল,
“না-ই নেই বললাম তো!”
তাজধীর মাথা নেড়ে হাঁটা দিল সামনে।দু’জন পাশাপাশি হাঁটছে। হঠাৎ করেই তাজধীর থেমে গেল একটা দোকানের সামনে। প্রিয়ন্তী খেয়াল না করায় প্রায় ধাক্কা লেগেই যাচ্ছিল।কোনোমতে সামলে নিলো মেয়েটা।তাজধীর পেছনে না তাকিয়েই বলল তখন,
“আপনার সাইজ কত?”
“কিহ!?”
প্রচণ্ড বিস্ময়ে চোখ কপালে তুলে চেঁচাল প্রিয়ন্তী।তাজধীর কিঞ্চিৎ ঘুরে সোজাসাপ্টা গলায় জানাল,
“আপনার হাতের সাইজ।আপনার আর মিতালির তো প্রায় একই হবে, তাই না? ওর জন্য চুড়ি না নিয়ে গেলে মুখ ফুলিয়ে বসে থাকবে।”
ফুস করে দম ছাড়ল প্রিয়ন্তী। ব্যাটার এহেন কথায় তো মাথাটাই হ্যাং হয়ে যাচ্ছিলো বেচারির। পরোক্ষনে মনে পড়ল, সত্যিই তো শাড়ির সঙ্গে ম্যাচিং করে চুড়ি তো কেনাই হয়নি!আর এখানে তো ওর চুরিও নেই যে ম্যাচিং করে পড়বে। তাজধীর ততক্ষনে চুরির দোকানটায় ঢুকে পড়েছে লম্বা লম্বা পা ফেলে। বাঙালি মেয়েদের মন ভালো করার জন্য বোধহয় একটা শাড়ি আর একথোকা চুরি`ই যথেষ্ট। কাঁচের শেলফে সাজানো নানান রঙের চুড়ি। লাল, হলুদ, সোনালি, নীল, কাঁচের ঝিকিমিকি, পাথরের কাজ, কাশঁমেরি সব ধরণের চুরিই সাজানো প্রত্যেকটা শেলফে।ওদের দেখতেই দোকানদার ডেকে বিনয়ী কণ্ঠে বলল,
“কি রঙ দেখাবো, আপা?”
প্রিয়ন্তী একটু ইতস্তত করে বলল,
“এই শাড়িগুলোর সঙ্গে ম্যাচিং কিছু দেখান!”
ব্যাগ থেকে শাড়িগুলো বের করে টেবিলে রাখতেই একের পর এক চুড়ি সাজিয়ে দিল দোকানদার। তবে শাড়ির সঙ্গে বেছে বেছে নীল আর হলুদের কম্বিনেশন, চুরিগুলো পছন্দ করল প্রিয়ন্তী। নিলোও নিজের জন্য। সাথে পছন্দ করে ভাবীর জন্যও নিলো।এরপর বিল মিটিয়ে বের হয়ে এলো ওরা।
তাজধীরের হাতে তখন একগাদা শপিং ব্যাগ।প্রায় সবগুলোই নিজের হাতে তুলে নিয়ে—দুই হাতে ভার সামলে দ্রুত পা ফেলছে পার্কিংয়ের দিকে। প্রিয়ন্তী একটু পিছনেই হাটছে। পার্কিংয়ের ভেতরে ঢুকে ব্যাগগুলো গাড়ির ভেতর গুছিয়ে রাখল তাজধীর। তারপর দরজা বন্ধ করে খুব স্বাভাবিক গলায় বলল,
“আপনি এখানে দাঁড়ান। আমি গাড়িটা নিয়ে আসছি সামনে।”
কথা শেষ করেই চলে গেল সে। প্রিয়ন্তী দাঁড়িয়ে রইল একা। রাস্তার অপর প্রান্তে থাকা ফুটপাথের ধারে ছোট ছোট দোকান বসানো। ওখানে থাকা টিপ, ক্লিপ, কানের দুল, রঙিন ছোটখাটো জিনিসে ভর্তি।প্রিয়ন্তীর মনে পড়ল টিপ আর, সেইফটিপিন তো কেনাই হয়নি!
সবকিছুই যেন তাড়াহুড়োয় বাদ পড়ে যাচ্ছে। এক মুহূর্ত দেরি করল না আর। রোদ মাথার উপর ঝলসে পড়ছে তখন। গরমে চারপাশ হাঁসফাঁস করছে।তবুও রাস্তা পার হয়ে চলে গেল ওদিকে। ফুটপাথে যথেষ্ট ভিড়। মানুষের ভিড়, দোকানের ভিড়,যানবাহনের শব্দের ভিড়ে এক বিশৃঙ্খল বিকেল। গরমে অস্থির হয়ে প্রিয়ন্তী নিজের খোলা চুলগুলো হাত দিয়ে তুলে একটা এলোমেলো খোঁপা করে বেঁধে নিল। গলার পেছনটা খালি হয়ে গেল তাতে। গোল গলার পোশাকের ফাঁক দিয়ে ঘাড়ের ফর্সা ত্বকটা স্পষ্ট হয়ে উঠল রোদের আলোয়। দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে টিপ বাছতে শুরু করল ও । একটার পর একটা তুলে দেখছে। লাল, মেরুন, সোনালি কোনটা নেবে ভাবছে। ঠিক সেই সময় ভিড়ের আড়াল থেকে একটা হাত ধীরে ধীরে এগিয়ে এল ওর পিঠের দিকে। স্বভাবতই জামারে পেছনে চেইন দিয়ে পড়ে প্রিয়ন্তী। ওর জামার গলার পিছনে থাকা চেইনটার উদ্দেশ্য সেই হাতটা উপরে উঠতেই আকস্মিক ঝড়ের বেগে একটা ভারী পুরুষালি শক্ত হাত চেপে ধরলো সেই আগন্তুকের বাড়ানো হাতের আঙ্গুলগুলো।
এতটাই শক্ত করে ধরল যে লোকটার মুখ বিকৃত হয়ে গেল ব্যথায়। মধ্যবয়স্ক লোকটা কিছু বলতে যাবে ঠিক তখনই তার মুখের সামনে আরেকটা হাত উঠিয়ে ইশারায় শব্দ করতে না করল তাজধীর। চোখদুটো ঠান্ডা। ভয়ংকর ঠান্ডা সেই চাহুনি। লোকটার হাতটা এমনভাবে চেপে ধরেছে যে মনে হচ্ছে হাড়গুলো একে অপরের সঙ্গে পিষে যাচ্ছে। আঙুলগুলো ধীরে ধীরে বেঁকে যাচ্ছে অস্বাভাবিক কোণে। লোকটা ছটফট করছে,হাতের অসহ্য যন্ত্রনায় নিসপিস করছে। ছাড়া পেতে মরিয়া হয়ে মুচড়ে যাচ্ছে। তবে একজন প্রফেশনাল ডিফেন্সর ব্যক্তির সঙ্গে সাধারণ মানুষের পক্ষে কি সম্ভব শক্তিতে পারা? উপরন্তু লোকসম্মুখের ভয়ে চিৎকারটাও করতে পারছে না চেয়েও।
কয়েক সেকেন্ড! না, হয়তো মিনিটের কাটাও পেরেলো ঐভাবে।শেষ পর্যন্ত যখন ব্যথার সীমা ছাড়িয়ে গেল, তখন হঠাৎ করেই ছেড়ে দিল তাজধীর। লোকটা হাত ছাড়াতেই প্রায় দৌড়ে সরে গেল দূরে। তারপরই গলা ফাটিয়ে চিৎকারে কাঁপিয়ে তুললো সমগ্র রাস্তা,
“আহহহহহ!”
চারপাশে কয়েকজন লোক জড়ো হলো অতিদ্রুত। কেউ বুঝতে পারছে না ঠিক কি হয়েছে।লোকটা মাটিতে বসে অপর হাতদিয়ে আঘাতপাওয়া হাতের আঙ্গুল গুলো শক্ত করে চেপে ধরে চিৎকার করেই যাচ্ছে। ওদিকে প্রিয়ন্তী চমকে উঠে পেছন ফিরল দ্রুত।অমনি চোখে পড়ল ওর পিছনে টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা তাজধীর কে। ও অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল তৎক্ষণাৎ,
“কি হয়েছে ওখানে?আর আপনি এখানে কখন এলেন? লোকটা চিৎকার করছে কেন এভাবে?”
“কিছু না।আপনার কেনাকাটা হয়ে থাকলে চলুন। গাড়ি নিয়ে এসেছি।”
প্রিয়ন্তী একবার তাজধীর কে পাশ কাটিয়ে তাকালো সেদিকটায়। চোখে পড়ল একটা মধ্যেবয়সী লোক মাটিতে গড়াগড়ি খাওয়ার মতো করে হাত চেপে ধাপড়াচ্ছে। তবে তাজধীর ততক্ষণে সেখান থেকে চলে যাওয়ায় আর দাঁড়ালো না সেখানে প্রিয়ন্তী।তাজধীরের পিছু পিছুই ছুটলো ও। মনে মনে বিড়বিড় করে আওড়াল,
“এর আবার কি হলো? একটু আগেই তো একজন কে সাহায্য করল, অথচ লোকটার চিৎকারেও কোনো প্রতিক্রিয়া নেই! আজব!”
:
:
:
পুরো রাস্তায় একটি বাক্যও ব্যায় করেনি তাজধীর। আর নাতো প্রিয়ন্তী আগ বাড়িয়ে কিচ্ছুটি বলেছে। বাড়ির সামনে গাড়িটা এসে থামতেই প্রথমে নেমে গেল তাজধীর। প্রিয়ন্তী খানিকটা দ্বিধা নিয়েই নামল তার পেছন পেছন। লোকটার হাবভাব বোঝার চেষ্টা করছে মেয়েটা। এই ব্যক্তির হুটহাট কি হয় কে জানে। তখন গাড়িতে উঠেই লোকেশন কানেক্ট করে কাউকে একটা মেসেজ পাঠিয়েছিল তাজধীর। তারপর আর কোনো নড়চড় দেখেনি। নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে গাড়ি ড্রাইভ করে গেছে শুধু। প্রিয়ন্তী আসার পথে পিছনেই বসেছে। তাতেও কিছুটি বলেনি লোকটা।
গাড়িতে থাকা শপিং ব্যাগগুলোর দিকে তাকিয়ে এক হতাশ শ্বাস ছাড়ল প্রিয়ন্তী। এইসব নিয়ে এখনো ভেতরে ঢুকতে হবে আবার!নিচু হয়ে ব্যাগগুলো হাতে নিতে যাবেই কি অমনি এগিয়ে এসে তাকে থামিয়ে দিলো তাজধীর। বলল ছোট্ট করে,
“থাক! এগুলো নিতে হবেনা।তারপর আবার আপনার ভাবি বলবে তার ননদ কে দিয়ে কাজ করিয়েছে তার ভাই। আর তাছাড়া আমার মাছ ফিরিয়ে দেওয়ার জন্যও তো শক্তি লাগবে। শক্তি জমা রাখুন। আমার ব্লু হাফমুন ফিরিয়ে দেয়ার কাজে লাগবে!”
আবারও একই প্রসঙ্গ! এই ব্যাটার মাথায় নির্ঘাত সমস্যা আছে। নাহলে এতটা স্বাভাবিক থেকেও কিভাবে কাউকে এভাবে এতটা পিঞ্চ করতে পারে। আশ্চর্য! প্রিয়ন্তীর মুখ কালো হয়ে উঠল। বিরক্তিতে ঠোঁট কামড়ে কিছু না বলেই ঘুরে ভেতরে চলে গেল ও মনে মনে নিজেকেই ধমকাতে লাগল,
“জীবনে একটা মাছ চুরি করলাম, সেটাও এমন লোকের’ই করতে হলো? এখন দিনরাত চব্বিশ ঘন্টা শুনতে থাক সেই অপবাদ। হতচ্ছাড়ি একটা!”
পেছন থেকে তাজধীর তখন দারোয়ানকে ডেকে শান্ত গলায় বলল,
“এইগুলো ভেতরে নিয়ে যান।”
বলেই ড্রাইভিং সিটের পাশ থেকে হাতে একটা ব্যাগ নিয়ে ভিতরে ঢুকল সে। প্রিয়ন্তী ততক্ষনে চলে গিয়েছে উপরে। ড্রয়িংরুমে বসে ছিল মিতালী। তাজধীর সোজা বোনের সামনে গিয়ে ব্যাগটা এগিয়ে দিতে দিতে জানাল,
“এগুলো তোদের জন্য।”
অপেক্ষা করল না মিতালীর প্রশ্নের।সোজা উপরের দিকে উঠে গেল সে।মিতালী খানিকটা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল ভাইয়ের চলে যাওয়ার পানে। এরপর যখন প্রচন্ড কৌতূহলে শপিং ব্যাগটা খুলল তখন অবাকের চরম সীমায় পৌছাল মেয়েটা।ভেতর থেকে একে একে বেরিয়ে এল ফুলের গহনা—হলুদের জন্য বিশেষভাবে বানানো। ব্লু গোলাপ আর ছোট ছোট সাদা ফুলের মিশেলে কানের দুল, হাতের বালা আর মাথার টিকলিও আছে। সবকিছুই দু’সেট। একটা তার জন্য আরেকটা,প্রিয়ন্তীর।মিতালীর চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।মেয়েটা আহাম্মকের মতো কিছুক্ষণ নিঃশব্দে বসে রইল, গহনাগুলোর দিকে তাকিয়ে। বিষয়টাতে এতটুকু তো ক্লিয়ার, এগুলো প্রিয়ন্তী কিনেনি। তবে তার ভাই নিজ থেকেই কিনেছে? ছোটবেলা শুধু বিশেষ কোনো দিনেই ভাইকে নিয়ে শপিং যাওয়ার ভাগ্য হতো মিতালীর। এই যেমন বার্থডে, বা ঈদের সময়। তবে তখন শুধু ড্রেস ছাড়া আর অন্যকিছু কিনার জন্য সময় হতোনা তার। একটা ড্রেস কিনতেই কতশত বার তাড়া দিতো তার কোনো ইয়াত্তা নেই। অথচ আজ! পরপর মিতালীর মনে পড়ল ফোনের মেসেজের ঘটনাটা। তখন তার ভাইতো তাকে মেসেজ দিয়ে বলেছিলো এমনটা বলতে। একে একে দুই মিলিয়ে ঠোঁটের কোণে চাপা হাসি ফুটে উঠল মিতালীর। সে যেমনটা ভাবছে তেমনটা হলে কিন্তু মন্দ হবেনা। বরঞ্চ ব্যাপারটা একটু বেশিই ভালো হবে আরকি।
****
চট্টগ্রামের নৌ ঘাঁটি বন্ধর। সময় আনুমানিক সন্ধ্যা ৬টা। সূর্যটা ঢলে পড়েছে পশ্চিমায়। লালচে আভা ছড়িয়ে পড়েছে বিশাল জলরাশির বুকচিরে। দূরে সারি সারি যুদ্ধজাহাজ নোঙর করে দাঁড়িয়ে, নিঃশব্দ প্রহরীর মতো নিটল তারা। চারপাশে কঠোর শৃঙ্খলা, নিয়ম, দায়িত্বের ভারে ভারী হয়ে আছে গোটা পরিবেশ।
ঘাঁটির ভেতরে নিজ কোয়ার্টারগুলোর একটায় অবস্থান করছে সেহরোজ। দিনভর কাজের চাপ শেষ করে সন্ধ্যার দিকে সে ঢুকল নিজের কোয়ার্টারে।ইউনিফর্ম খুলে রেখে সোজা ওয়াশরুমে গেল প্রথমেই। টাইলসে পানির শব্দ ধ্বনিত হয়ে আস্তে করে মুছে যেতে লাগল গোটা দিনের ক্লান্তি। ওদিকে বিছানার ওপর পড়ে থাকা ফোনটা নিঃশব্দে কেঁপেই চলেছে কতক্ষন যাবৎ। চার বন্ধুর মাঝে তাজধীরের পড়ে শাওয়ারে সময় লাগায় সেহরোজ। যেখানে অর্ণব, ফাহিমের গোসলে সময় লাগে সর্বোচ্চ ১৫ মিনিট, সেখানে এরা দুজন এক ঘন্টা পেরিয়ে গেলেও বেরোয় না। মাঝে মাঝে অর্ণব আর ফাহিম এই নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনাও বসায়। ওরা দুইজন এত সময় লাগিয়ে ওয়াশরুমে করেটা কি সেটার তল্লাশিও চালায়। প্রথম প্রথম ওদের অদ্ভুত লাগলেও সময়ের ব্যবধানে সয়ে গেছে। এখন আর কিছু বলেনা তেমন।
ফোনটা তখনো বেজেই চলেছে। সেদিনের ঘটনায় মায়ের সঙ্গে কথা কাটাকাটি হওয়ায় অফ ডিউটিতে ফোনটা সাইলেন্ট’ই রাখে সে।
নির্দিষ্ট সময় পর ওয়াশরুমের দরজা খুলে বের হয়ে এলো। সদ্য শাওয়ার নেয়ায় চুল থেকে পানি টপটপ করে ঝরছে। গড়িয়ে পড়ছে চওড়া কাঁধে বেয়ে। একজন নেভি অফিসারের পরিপূর্ণ ছাপ তার প্রতিটি ভঙ্গিমায় ফুটে উঠে স্পষ্টতই। প্রশস্ত কাঁধ, টানটান বুক, শিরা, ফুটে থাকা বাহু—কঠোর প্রশিক্ষণ আর শৃঙ্খলার নিখুঁত প্রতিফলন যেন। টাওয়াল দিয়ে চুল মুছতে মুছতেই হঠাৎ চোখ পড়ল ফোনটার দিকে। এখনও কাঁপছে সেটা। কপাল কুঁচকে এগিয়ে গেল সে।হেঁটে গিয়ে ফোনটা হাতে তুলে নিতেই নজরে এলো—
একটা অচেনা নম্বরে। এক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল স্ক্রিনের দিকে। তারপর কিছু একটা ভেবে কলটা রিসিভ করল। গলায় স্বভাবসুলভ গাম্ভীর্য নামিয়ে এনে বলল,
“ইয়েস , লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সেহরোজ স্পিকিং!”
ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে আসা কাঠকাঠ গম্ভীর, ইংরেজি স্বরের বাক্যদয়ে প্রচন্ডরকমে ভড়কে যায় চঞ্চলা সপ্তদর্শী কন্যা মেহরিণ। ভয়ে বারকয়েক ঘন ঘন চোখের পলক ঝাপ্টে পাশে থাকা বান্ধবীর উদ্দেশ্য ভয়াতুর কাঁপা কাঁপা কন্ঠে আওড়ায় মেহরিণ,
“এই শালা নেভির বাচ্চা তো ইংলিশ ঝাড়তাসে রে, রুমি!”
রুমি তখন দিব্যি নিশ্চিন্তে বসে পেয়ারায় কামড় বসাচ্ছে। এইতো কিছুক্ষণ আগেই দু’জনে মিলে পাশের বাড়ির গাছ থেকে চুরি করে এনেছে। ওড়নায় মুছে নিয়ে বড়সড় এক কামড় দিয়ে মুচমুচে শব্দ তুলে বলল রুমি,
“শহুরা পোলাপান এমনই হয় রে! আর ওই ব্যাটা তো আবার মস্ত বড় অফিসার। দুই-চারটা ইংলিশ না ঝাড়লে কি তার মানায়?”
চিবাতে চিবাতেই আবার বলল,
“কি কইসে? তুই বুঝোস নাই?”
মেহরিণ চোখ কুঁচকে ফোনের দিকে তাকাল। বুঝেছে, অবশ্যই বুঝেছে। এতটুকু ইংরেজি বুঝতে না পাড়ার মতো মূর্খ তো সে নয়। কিন্তু সমস্যা ভাষা না,সমস্যা মানুষটা। লোকটার সম্পর্কে যা যা শুনেছে, তাতেই গা শিউরে ওঠে সপ্তদর্শী কন্যার। মায়ের মুখে শোনা—ভীষণ রাগী, কড়া স্বভাবের এই লোক। সবসময় নাকি রাগটা নাকের ডগায় বসে থাকে। আর সেই মানুষটার সঙ্গেই নাকি তার বিয়ের কথা চলছে!ভাবতেই তো গা গুলিয়ে ওঠে মেহরিণের। মূলত এই বিয়েটা হওয়ার কথা ছিল তার বড় বোন, মাহিরার সঙ্গে। কিন্তু বিয়ের কথা পাকাপাকি হওয়ার পরের দিনই—বড় বোন পাশের গ্রামের মিন্টু মিয়ার ছেলের হাত ধরে পালিয়ে গেল! বাড়ির মান-সম্মান বাঁচাতে তার বাবা মা তড়িঘড়ি করে গল্প বানালো আগেই নাকি বিয়ের দিন-তারিখ ঠিক ছিল তাদের। তারপর ছোট্ট, ঘরোয়া আয়োজনে বোনকে বিদায় দেওয়া হলো পরেরদিন।আর সেই ঘটনার পরই নিজের জীবনের বলি হিসাবে শুনতে পেল মায়ের কড়া গলার ঘোষণা,বান্ধবীর সেই ছেলের সঙ্গেই নাকি ওকে বিয়ে দিবে!
মেহরিণের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠে ভাবতেই। সে এই গ্রাম ছেড়ে কোথাও যেতে চায় না। তারচেয়েও বড় কথা—এই বয়সে বিয়ে? তাও এমন এক লোককে?
না, কিছুতেই না! যদিও পড়ালেখা তার কাছে বিষের মতো লাগে- মনে মনে ভাবত, বিয়ে হয়ে গেলে এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাবে। কিন্তু যখন শুনল ছেলেটা ডিফেন্সের বড় অফিসার, ভীষণ শিক্ষিত।তখনই তার সেই স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যায় মেহরিণের। ওসব লোকগুলো তো হয় উচ্চশিক্ষিত। বাইচান্স বিয়েটা হয়ে গেলে দেখা যাবে দিনরাত চব্বিশ ঘন্টা ওকে পড়ার উপরেই রাখবে। বাসর ঘরে উপহার হিসানে এক বস্তা বইনা হাতে ধরিয়ে দেয় আবার। শুষ্ক গলায় ঢুক গিলে দুইবার গলা খাঁকারি দিল মেহরিণ। বুক ভরে শ্বাস নিল এরপর। তারপর কণ্ঠটা যতটা সম্ভব শক্ত করে বলল,
“আপনি কি সুমি আন্টির ছেলে বলছেন?”
কথাটা বলার সময় নিজেরই মনে হলো—গলার দৃঢ়তা যতটা দেখাতে চেয়েছিল, তার অর্ধেকও ঠিকমতো ফুটিয়ে তুলতে পারছেনা মেয়েটা। ফোনের ওপাশে কে আছে—তা সে খুব ভালো করেই জানে। আর ঠিক সেই কারণেই— বুকের ভেতরটা কেমন যেন অদ্ভুতভাবে কাঁপছে মেহরিণের।
ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে এলো একেবারে চিকন, নরম একটা মেয়েলি কণ্ঠ। সেহরোজ কান থেকে ফোনটা একটু সরিয়ে এনে ভ্রু কুঁচকে স্ক্রিনের দিকে তাকাল আরেকবার। অচেনা নম্বর। তবুও সরাসরি তার মায়ের কথা জিজ্ঞেস করাতে খানিকটা থমকালই বটে।কণ্ঠটা এবার একটু শক্ত করেই বলল,
“ইয়েস। আপনার পরিচয়?”
সরাসরি পরিচয়ের প্রশ্নে বেচারি মেহরিণ থতমত খেলো।কি বলবে?কিভাবে বলবে?নিজের পরিচয় তো দেওয়া যাবে না ভুলেও। যদি সামহাউ ব্যাপারটা গিয়ে মায়ের কানে ওঠে, তাহলে আজকেই তার পা ভাঙবে তার মা নিশ্চিত! মাথায় কিছুই কাজ না করায় একেবারে গড়গড় করে বলে উঠল,
“আমি কে সেটা আপনার জানা লাগবে না। আপনি নিশ্চয়ই জানেন—আপনার আম্মা আর আমার আম্মা আমাদের বিয়ের কথা পাকাপাকি করে ফেলছে। কিন্তু দেখেন, এই বিয়েতে আমার একদমই মত নাই।”
একটু দম নিল মেয়েটা। তারপর আবার গলার স্বর টানটান রেখে বলল,
“এর যথেষ্ট কারণ আছে। এমন না যে আমি বিয়ে করতে চাই না বা আমার বয়স হয়নি। আমি আসলে—আপনাকে বিয়ে করতে চাই না।”
“ওকে।”
ওপাশ থেকে নির্লিপ্ত “ওকে” শুনে মেহরিণ ভরকালো আরেকদফা। ডাগর ডাগর চোখ দুটো কুঁচকে উঠল বিস্ময়ে। ভেতরে ভেতরে কেমন একটা আগুন দপ করে জ্বলে উঠল ওর মনে। ওকে? সে না করল আর লোকটা সরাসরি মুখের উপর ওকে বলে দিলো? এত বড় অপমান? মুহূর্তেই আত্মসম্মানে ধাক্কা লাগল প্রচন্ড। রাগে ঠোঁট ফুলিয়ে ফোনটা আরও শক্ত করে কানে চেপে ধরে এক নিঃশ্বাসে শুরু করল বলা,
“আরে ভাই, এত তাড়াহুড়ো কইরেন না! আগে আমার কথাটা ঠিকঠাক শুনেন! দেখেন, আমি আপনাকে বিয়া করতে পারুম না। এইটা ফাইনাল কথা! কারণ এক, আপনার বয়স! আপনারে আমি দেখি নাই ঠিকই, কিন্তু যতটুকু শুনছি—আপনি আমার ছোট চাচার বয়সী!”
একটু থেমে আবার জোরে বলল,
“মানে, আমি একদম ফ্রেশ, টাটকা, তরতাজা, নাদুস নুদুস, সহজ সরল, বোকা সোকা একটা মাইয়া—আর আপনি একেবারে একজন রেডিমেড অফিসার!”
রুমি পেয়ারায় কামড় দিতে দিতে হাসি চাপতে গিয়ে কাশতে লাগল।মেহরিণ থামল না। চলন্ত ট্রেনের গতিতে মেয়েটার মুখ ছুটেই গেল,
“এইডা কেমনে মিলে বলেন? আপনার লগে দাঁড়াইলে মানুষ ভাববো—বাপ-মাইয়া না হইলেও কমপক্ষে চাচা-ভাতিজি!সবথেকে বড় কথা,আপনার ভয়ে আমার আপাও তার বয়ফ্রেন্ড নিয়া ভাগসে। দুর্ভাগ্য আমার বয়ফ্রেন্ড নাই। থাকলে আমিও আর এত কষ্ট করে আপনার নাম্বার জোগাড় করে ফোন দিতাম না।
আর আপনার ওই অফিসারগিরি—সেটা আপনি আপনার অফিসেই রাখেন। তাই কইতেছি, আপনি আর আমি একেবারে দুই দুনিয়ার মানুষ! আপনার লাইফ একরকম, আমার লাইফ আরেকরকম। এই দুইটা জোড়া লাগলে একটাই হইবো, ডিজাস্টার!প্রয়জনে আমাদের ক্লাসের রিহানরে বিয়ে করবো, তারপরও আপনার মতো বুড়ো ব্যাটাকে বিয়ে করবোনা। মানুষ বলবো, সুগার ডেডি…
টুট টুট করে কেটে গেল ফোনটা।চোয়াল শক্ত করে ফোনটা কেটেই তৎক্ষণাৎ সেটা ছিটকে ফেললো বিছানায়। দাঁত চেপে বিড়বিড় করে উঠল সেহরোজ,
“ইডিয়েট!”
****
রাত ৮টা পেরিয়ে। একটা বড়োসড়ো কমিনিউ সেন্টারে হলুদের আয়োজন করেছে পাভেলের বন্ধু, শিহাব। একমাত্র বোনের বিয়ে,জাঁকজমকভাবেই জমকালো আয়োজন করেছে তারা। পাভেল এসেছে সন্ধ্যার দিকে। এসেই থেকেই তাঁরা দিচ্ছে স্ত্রী, বোনকে। প্রিয়ন্তী সময় নিয়ে শাড়িটা জড়ালো গায়ে। গায়ে হলুদের শাড়িটা গায়ে জড়িয়ে কেবলই শাড়ির কুচিগুলো ধরেছিলো প্রিয়ন্তী। অমনি খাটের উপর থাকা ফোনটা টুং করে বেজে উঠল।শ্রেয়া বলেছিলো ওর সঙ্গে কিছু জরুরি কথা ছিল, সেই তাগিদে প্রিয়ন্তী ভাবল হয়তো শ্রেয়ার’ই মেসেজ এসেছে। সেই ভেবে একহাতে শাড়ির কুচিগুলো ধরে দু কদম এগিয়ে গিয়ে ফোনের স্ক্রিনে চোখ বুলাতেই একটা লেখা জ্বলজ্বল করে উঠল,
“Soon… we’ll finally meet. Be ready, my blueberry
মেসেজটায় চোখ বুলাতেই আঙুলগুলো শিথিল হয়ে এলো প্রিয়ন্তীর।চোখের পাতা কাঁপল। বুকের ভেতর ধকধক শব্দটা যেন হঠাৎ বেড়ে গেল কয়েকগুণ। ঠোঁট শুকিয়ে এলো। কুচিগুলো হাত থেকে প্রায় ছেড়ে পড়ার উপক্রম হলো। মুখের রঙ বদলে গেল মুহূর্তেই। এই নাম্বারটা,নতুন। পুরোপুরি অচেনা। কিন্তু মেসেজে থাকা বাক্যটা যে অতিপুরোনো। শব্দ দুটো ঘুরেফিরে কানে বাজছে ওর। বুঝতে ব্যাগ পোহালো না দুইজন ব্যক্তিযে একই। শরীরের ভেতর দিয়ে ঠাণ্ডা একটা স্রোত বয়ে গেল কেমন। শীগ্রই দেখা হতে যাচ্ছ বলতে কি বুঝালো সেই আগন্তুক? তারমানে ওকে কি আগে থেকেই চিনে সে?এতদিন বিষয়টায় গাঁ ছাড়া ভাব নিয়ে থাকলেও আপাতত মাথা ভনভন করে উঠল ওর। কে সে? কোথা থেকে দেখছে ও-কে ?কেন বারবার এমন করে ওর জীবনে ঢুকে পড়ছে সে?
প্রিয়ন্তী ভাবল সেই নাম্বারে কল লাগবে। তখনি শব্দ করে দরজা খুলে পরিপাটি হয়ে সেজে ভিতরে এলো মিতালী। ভাবীর আগমনে ফোনটা সরিয়ে রাখতে রাখতে বলল,
“মাশাআল্লাহ ভাবি, তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে আজকে। ভাইয়া দেখেছে?”
“নাহ। নিচে যায়নি এখনো। তোমায়ও কিন্ত মারাত্মক সুন্দর লাগছে প্রিয়। আজকে আমার ননদকে দেখে কত পুরুষের চোখে ঘুম যে হারাবে। ইশ!”
মিতালী মুখের নিখাদ প্রশংসায় মিইয়ে এলো প্রিয়ন্তী। মিতালী হাতে থাকা প্যাকেটটা প্রিয়ন্তীর দিকে বাড়িয়ে দিলো,
“এটা নাও!”
“কি এটা?”
“খুলেই দেখো!”
প্রিয়ন্তী অবাক হয়ে প্যাকেটটা নিল। খুলতেই ভেতর থেকে বের হলো গায়ের হলুদের জন্য ফুলের গয়না। তাও আবার শাড়ির সঙ্গে ম্যাচিং করে একই রঙের। তবে সবথেকে আশ্চর্য হলো অফ হোয়াইট আর ব্লু’র কম্বিনেশনে তৈরী ফুলার গহনা গুলো দেখে। প্রিয়ন্তী আশ্চর্য হয়ে বলল,
“এইগুলো তুমি কখন আনলে ভাবি?”
মিতালী ভ্রু নাচিয়ে হেসে বলল,
“আমি আনিনি তো।”
“কে এনেছে ভাইয়া?”
“হ্যা তবে তোমার ভাই নয়। আমার ভাই এনেছে!”
থমকালো প্রিয়ন্তী। লোকটা ফুল এনেছে?কখন আনলো? ওতো দেখেনি তখন কিছু কিনতে।
“আসো পড়িয়ে দেই। তোমায় খুব মানাবে এতে। তোমার ভাই ও তাড়া দিচ্ছে। জলদি করো!”
মিতালীর ডাকে নড়েচড়ে উঠে প্রিয়ন্তী। মিতালী
বলতে বলতে নিজেই এগিয়ে এসে ফুলগুলো ওর হাতে তুলে দিল।
নিচে বসে আছে পাভেল। একটা বাসন্তী রঙের পাঞ্জাবী জড়িয়েছে গায়ে। অফিস থেকে ফিরেছে সন্ধ্যায়। এতক্ষন বসে তাজধীরের সঙ্গে টুকটাক আলাপচারিতা করছিলো ড্রয়ইংয়ে । কথার ফাঁকে ফাঁকে তাড়া দিয়ে ডাকছে স্ত্রীকে,
“এত দেরি কেন হচ্ছে? হয়েছে তোমাদের?”
স্বভাবসুলভ সন্ধ্যায় এক কাপ গ্রীন টি লাগে তাজধীরের। কাজের মেয়েটা সবেই বানিয়ে দিয়ে রেখে গেছে গরম ধোঁয়া উঠা কাঁপটা। সেটাই উঠিয়ে সবেই হাতে নিয়েছে সে। ওমনেই সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসা এক রমণীতে চোখ আটকালো তার। সেখানে তাকাতেই থামলো হৃদস্পন্দন।কয়েকটা হার্টবিট ও মিস করে বসল। বেখেয়ালিতে গরম কাপে চুমুক বসাতেই গদগদ করে এক চুমুক গরম তরল মুখে ঢুকে গেল। ধোয়া উঠা গরমে ঝাঝে সঙ্গে সঙ্গে খুক খুক করে কেশে উঠল সে। নাকে মুখেও বোধহয় উঠে গেছে কিছুটা। রান্নাঘর থেকে দৌড়ে এলেন মোহনা। উৎকণ্ঠায় ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে যাচ্ছেন তিনি।
“ইশ! একটু দেখে শুনে খাবিতো বাবা।”
চলবে…..
৫k রিয়েক্স আর ৫০০+ কমেন্ট না হলে পরবর্তী পর্ব দিবোনা। আপনারা শর্ত না দিলে রেসপন্স করেন না। আপনাদের জন্য এই নিয়মই ঠিক আছে। ধন্যবাদ।
ডেসটেনি নিয়ে দুটো ইবুক লিখা আছে। তাজধীর আড় তার ব্লু হাফমুণের রোমান্স দেখতে চাইলে ইবুক দুটো কালেক্ট করতে পারেন বইটই এপস থেকে। ইবুকটা সম্পূর্ণ রোমান্টিক জনরার। প্রাপ্তবয়স্ক এলার্ট ও দিয়ে দিলাম
Share On:
TAGS: ডেসটেনি, সুহাসিনি মিমি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ডেসটেনি পর্ব ১৯
-
ডেসটেনি পর্ব ১০
-
ডেসটেনি গল্পের লিংক
-
ডেসটেনি পর্ব ১৭
-
ডেসটেনি পর্ব ৬
-
ডেসটেনি পর্ব ৩
-
ডেসটেনি পর্ব ১১
-
ডেসটেনি পর্ব ১৮
-
ডেসটেনি পর্ব ১
-
ডেসটেনি পর্ব ৮