#ডিজায়ার_আনলিশড
সাবিলা সাবি
বোনাস পর্ব
মেক্সিকো সিটির বাতাস আজ এক অপার্থিব উন্মাদনায় ভারী হয়ে আছে। ৬ মে, ২০২৬—তারিখটি মেক্সিকোর ইতিহাসে চিরস্থায়ী হয়ে গেল। ন্যাশনাল প্যালেসে নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ক্লদিয়া শিনবাউমের আমন্ত্রণে বিটিএস-এর সাত সদস্যের উপস্থিতির খবরটি যখন রাষ্ট্রীয়ভাবে ঘোষণা করা হলো, তখন ঘড়িতে সময় মাত্র দুপুর। কিন্তু সেই ঘোষণার মাত্র পাঁচ ঘণ্টার ব্যবধানে মেক্সিকো সিটির প্রাণকেন্দ্র ‘জোকালো’ স্কয়ারে তিল ধারণের জায়গা রইল না। প্রায় ৫০ হাজার মানুষের এক বিশাল জনসমুদ্র আছড়ে পড়ল প্যালেসের চারধারে।
——
ভিলার ড্রয়িংরুমে বসে তান্বী তার ফোনের স্ক্রিনে বুঁদ হয়ে ছিল। জোকালো স্কয়ারের সেই লাইভ ফুটেজে দেখা যাচ্ছে, আরএম (RM) প্রেসিডেন্ট ক্লদিয়া শিনবাউমের পাশে দাঁড়িয়ে সাবলীল স্প্যানিশ ভাষায় ভক্তদের ধন্যবাদ জানাচ্ছেন। তান্বীর চোখেমুখে এক অপার্থিব জ্যোতি, ঠোঁটের কোণে উপচে পড়া মুগ্ধতা। সে আর নিজেকে সামলাতে পারল না। জাভিয়ান তখন পাশের সোফায় বসে ল্যাপটপের স্ক্রিনে স্ট্রোম হাউসের কিছু এনক্রিপ্টেড ডাটা নিয়ে কাজ করছিল। তার কপালে চিন্তার ভাঁজ, আঙুলগুলো কিবোর্ডে দ্রুত চলছে। তান্বী দৌড়ে গিয়ে জাভিয়ানের হাতটা জাপ্টে ধরল। “জাভিয়ান! জাভিয়ান, শোনো! মেক্সিকো সিটিতে আজ ইতিহাস তৈরি হচ্ছে। বিটিএসের সাতজনই একসাথে ন্যাশনাল প্যালেসের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছে। চলো না একবার! জাস্ট একবার দূর থেকে দেখে আসব!”
জাভিয়ান ল্যাপটপ থেকে চোখ না সরিয়েই চোয়াল শক্ত করল। তার কণ্ঠস্বরে এক ধরণের হিমশীতল গাম্ভীর্য। সে খুব নিচু স্বরে বলল, “বাইরের পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয় তান্বী। পাঁচ ঘণ্টায় ৫০ হাজার মানুষ জোকালো স্কয়ারে জমা হয়েছে। তোমার এই অবস্থায় আমি তোমাকে ওই নরকের মধ্যে নিয়ে যেতে পারব না।” তান্বী নাছোড়বান্দার মতো জাভিয়ানের গায়ের সাথে লেপটে রইল। তার চোখে আবদার আর আকুতি। সে খুব নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলল, “জাভিয়ান, আমি জানি তুমি মেক্সিকোর সবচেয়ে ক্ষমতাধর মানুষদের একজন। তুমি চাইলে আমাকে ভিড় এড়িয়ে একদম ওদের সামনে নিয়ে যেতে পারো। ওরা প্রেসিডেন্টের সাথে আছে, তুমি চাইলে কি অসম্ভব? প্লিজ জাভিয়ান, আমার খুব ইচ্ছে ওদের সামনাসামনি দেখার।”
তান্বীর প্রতিটি কথা জাভিয়ানের কানে বিষের মতো বিঁধল। হ্যাঁ, সে ক্ষমতাধর। সে চাইলে তান্বীকে প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত গেস্ট হিসেবে ওই ব্যালকনির একদম কাছে নিয়ে দাঁড় করাতে পারে। কিন্তু জাভিয়ান তা করবে না। সে তান্বীকে ওই সাতজন পুরুষের সামনে নিয়ে গিয়ে তান্বীর সেই মুগ্ধ চোখের চাহনি সবার সামনে বিলিয়ে দিতে চায় না। তান্বীর প্রতিটি পলক, প্রতিটি হাসি কেবল তার একার সম্পত্তি। তান্বী তখন জাভিয়ানকে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করলো সে বললো ” রাহিয়ান নেই আমার মনটা খুব খারাপ প্লিজ চলোনা”…
‘রাহিয়ান’—এই একটি নাম জাভিয়ানের সব যুক্তি আর কাঠিন্যকে মুহূর্তের মধ্যে ধুলোয় মিশিয়ে দিলো। জাভিয়ান এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে ল্যাপটপ বন্ধ করল। কিন্তু তার বুকের ভেতরে এক বিষাক্ত দহন শুরু হয়েছে। সে জানে, তান্বী ওই সাতজন আইডলকে কতটা পছন্দ করে। আর ঠিক এখানেই জাভিয়ানের সমস্যা। সে তান্বীর ওই মুগ্ধ চোখগুলো অন্য কারো দিকে তাকিয়ে থাকুক—তা সহ্য করতে পারে না। জাভিয়ান তান্বীর চিবুক ধরে নিজের দিকে ফেরাল। তার চোখে তখন এক আদিম অধিকারবোধ। “এক শর্তে নিয়ে যাব। তুমি গাড়ির জানালার কাঁচ নামাবে না। জোকালো স্কয়ারের অন্তত দুই ব্লক দূর থেকে দেখবে। এর বাইরে এক কদমও নয়।”
অবশেষে তাদের গাড়ি যখন জোকালো স্কয়ারের কাছাকাছি পৌঁছাল, তখন চারদিকে কেবল ‘পার্পল’ আলোর জোয়ার। পুরো মেক্সিকো যেন আজ বিটিএস এর রঙে সেজেছে। জাভিয়ান তান্বীকে নিয়ে ভিড়ের অনেকটা দূরে এক অন্ধকার গলির মোড়ে গাড়ি থামাল। ওপরের দিকে তাকালে দেখা যাচ্ছিল সেই ঐতিহাসিক ন্যাশনাল প্যালেসের ব্যালকনি।
তান্বী জানালার কাঁচে মুখ ঠেকিয়ে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। সাতটি ছায়া তখন ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে ভক্তদের উদ্দেশ্যে হাত নাড়ছে। তান্বীর চোখে তখন বিমুগ্ধ এক জ্যোতি, তার ঠোঁটে এক চিলতে অকৃত্রিম হাসি। জাভিয়ান ড্রাইভ সিটে বসে স্টিয়ারিং হুইলটা এত জোরে চেপে ধরল যে তার হাতের শিরাগুলো ফুলে উঠল। সে আড়চোখে কেবল তান্বীকে দেখছিল। সে চাইলে তান্বীকে ওই ব্যালকনির নিচে নিয়ে যেতে পারতো, কিন্তু তার প্রচণ্ড ঈর্ষা তাকে তা করতে দিল না। তান্বীর ওই হাসি, ওই দীপ্তি—সবই তো কেবল জাভিয়ানের জন্য হওয়ার কথা ছিল! তান্বী কেন অন্য কারো জন্য এত আনন্দিত হবে?
হঠাৎ জাভিয়ান কোনো কথা না বলে গাড়ির স্টার্ট দিল এবং সজোরে রিভার্স নিল। টায়ারের কর্কশ শব্দে তান্বী চমকে উঠল। “আরে! ওরা তো এখনো ভেতরে যায়নি জাভিয়ান! আর কিছুক্ষণ থাকো না!”
জাভিয়ান কোনো উত্তর দিল না। তার মুখ এখন পাথরের মতো গম্ভীর, চোয়াল শক্ত। বাসায় ফেরার পুরোটা পথ সে একটা শব্দও উচ্চারণ করল না। গ্যারেজে গাড়ি থামিয়ে সে ঝটকা দিয়ে নেমে তান্বীর পাশের দরজাটা খুলে দিল। তান্বীকে প্রায় পাজাকোলা করে লিফটে নিয়ে এল সে। বেডরুমে ঢোকার পর জাভিয়ান তান্বীকে দেওয়ালের সাথে চেপে ধরল। তার চোখে তখন সেই ভয়ংকর আভা। সে তান্বীর খুব কাছে ঝুঁকে এসে দাঁতে দাঁত চেপে বলল—”হয়েছে তো? ওই ৫০ হাজার মানুষের ভিড়ে তোমার ওই মুগ্ধতাটুকু নিশ্চয়ই ওরা টের পেয়েছে? জিন্নীয়া, আমি চাই না তোমার ওই চোখের এক ফোঁটা মুগ্ধতাও অন্য কেউ ভাগ করে নিক। আমার পৃথিবী তোমার ওই এক জোড়া চোখে শুরু আর শেষ হয়। ওখানে আমি ছাড়া অন্য কারো ছায়াও আমি বরদাস্ত করি না। তুমি জানতে আমি তোমাকে ওদের সামনে নিতে পারতাম, কিন্তু আমি নেইনি। কারণ তোমাকে কারো সামনে প্রদর্শনী করার ইচ্ছে আমার নেই।”
তান্বী জাভিয়ানের বুকের ধুকপুকুনি অনুভব করতে পারছিল। সে বুঝতে পারল, এই বিশাল জনসমুদ্রের মাঝেও জাভিয়ান কেবল একাই ছিল—তার সেই বিকারগ্রস্ত জেলাসি নিয়ে। জাভিয়ান গটগট করে বারান্দার দিকে চলে গেল। বাইরে মেক্সিকোর আকাশে তখন বিজয়োল্লাসে বাজি ফুটছে, আর ভেতরে জাভিয়ানের মনে তান্বীকে সম্পূর্ণ নিজের কুক্ষিগত করে রাখার এক ভয়াবহ তৃষ্ণা জ্বলছে। মেক্সিকোর ওই ঐতিহাসিক রাত আজ সাক্ষী রইল—এক বিশ্বখ্যাত দলের জনপ্রিয়তার কাছে জাভিয়ান এমিলিও চৌধুরীর ব্যক্তিগত অধিকারবোধ হার মানেনি।
পরমুহূর্তেই বেডরুমে জাভিয়ান সজোরে ঠাস করে শব্দ করে দরজাটা বন্ধ করে দিল। কক্ষের নিস্তব্ধতা এক ভয়াবহ ঝড়ের সংকেত দিচ্ছিল। তান্বী তখনও বিছানার কোণে জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে, তার চোখে ভীতি আর বিস্ময়। সে বুঝতে পারছে, আজ জাভিয়ান তার স্বাভাবিক সত্তায় নেই; তার ভেতরে এখন নিষ্ঠুর সত্তাটি জেগে উঠেছে। জাভিয়ান কোনো কথা না বলে ড্রয়ার থেকে একটি শৌখিন মোমবাতি বের করল। লাইটারের আগুনের শিখায় মোমবাতিটি জ্বালিয়ে সে ধীরে ধীরে তান্বীর দিকে এগিয়ে এল। তার শান্ত চাহনি আর দৃঢ় পদক্ষেপে এক ধরণের পৈশাচিক সৌন্দর্য ছিল।
তান্বী ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলল, “জাভিয়ান… আপনি কি রাগ করেছেন? আমি তো শুধু একটু দেখতে চেয়েছিলাম…”
জাভিয়ান কোনো উত্তর দিল না। সে তান্বীর খুব কাছে গিয়ে দাঁড়াল। মোমবাতির শিখাটি তান্বীর চোখের মণিতে প্রতিফলিত হচ্ছে। জাভিয়ান তান্বীর চিবুকটা শক্ত করে ধরে তাকে নিজের দিকে টেনে নিল। তার কণ্ঠস্বর ছিল ভয়ার্ত রকমের নিচু—”আমি তোমাকে বলেছিলাম না তান্বী, তোমার ওই মুগ্ধতাটুকু কেবল আমার? কিন্তু তুমি আজ জোকালো স্কোয়ারে আমার সেই আদেশ অমান্য করেছ। তোমার চোখের ওই উজ্জ্বলতা আজ অন্য কারো জন্য ছিল। আমি সেটা মেনে নিতে পারছি না তান্বী।” বলেই জাভিয়ান মোমবাতিটি তিল তিল করে তান্বীর উন্মুক্ত কাঁধের ওপর ধরল। তান্বী কিছু বুঝে ওঠার আগেই এক ফোঁটা তপ্ত মোম তার ত্বকের ওপর আছড়ে পড়ল।
“উহ্! জাভিয়ান!” তান্বী যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠল। সেই উত্তাপ তার শিরায় শিরায় এক ধরণের অদ্ভুত শিহরণ আর দহন তৈরি করল। জাভিয়ান থামল না। সে আরও কয়েক ফোঁটা মোম তান্বীর গায়ের ওপর ফেলল। প্রতিটি ফোঁটা যেন জাভিয়ানের অধিকারবোধের একেকটি মোহর হয়ে উঠলো। তান্বী যন্ত্রণায় চোখ বুজে জাভিয়ানের শার্ট খামচে ধরল। জাভিয়ান তান্বীর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “এই জ্বালাটুকু মনে রেখো তান্বী। প্রতিবার যখন তুমি অন্য কারো কথা ভাববে বা অন্য কারো দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকাবে, তখন এই দহন তোমাকে মনে করিয়ে দেবে যে তুমি কার। তোমার শরীরের প্রতিটি ইঞ্চি, তোমার প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস সবই জাভিয়ান এমিলিও চৌধুরীর।”
তান্বী যন্ত্রণায় ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল, কিন্তু সে জাভিয়ানকে ঠেলে সরিয়ে দেওয়ার শক্তি পেল না। জাভিয়ানের এই ভয়াবহ ভালোবাসা আর শাসন তাকে এক অদ্ভুত গোলকধাঁধায় ফেলে দিয়েছে। জাভিয়ান তান্বীর অশ্রুসিক্ত গাল মুছে দিয়ে তাকে নিবিড়ভাবে কাছে টেনে নিল। সেই মোমের উত্তাপ আর জাভিয়ানের শরীরের কঠোরতা মিলেমিশে এক বিষাক্ত মায়াজাল তৈরি করল। বাইরে মেক্সিকোর উৎসবের আলো তখনো নিভেনি, কিন্তু এই ঘরের ভেতর জাভিয়ান তার ভালোবাসার এক অন্ধকার ইতিহাস লিখে ফেলল—যেখানে প্রেমের চেয়ে দহনই ছিল বেশি প্রকট।
ভোরবেলা পর্ব আসবে…. এটা একটু বোনাস পর্ব ছিলো যেহেতু ওরা মেক্সিকোতে এসেছিলো তাই এতটুকু লিখলাম তান্বীর জায়গায় আসলে আমি ছিলাম জেকেরে দেখার জন্য
Share On:
TAGS: ডিজায়ার আনলিশড, সাবিলা সাবি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ৩৪
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ১৯
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ৩০
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ৩৬
-
আযদাহা সব পর্বের লিংক
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ৪৫
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ২
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ৪(প্রথমাংশ+শেষাংশ)
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ১৮
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ৪৩