লামিয়ারহমানমেঘলা
জেন্টাল মনস্টার পর্ব ৫৭
[ 🚫কপি করা সম্পূর্ণ কঠোর ভাবে নিষেধ ]
ডিনার টেবিলে বসেই সায়েরের চোখ একবার চারপাশে ঘুরে এল। প্রশস্ত টেবিল, সাজানো খাবার, নরম আলো,সবই যথাস্থানে, শুধু আদ্রিসের চেয়ারটি ফাঁকা। সেই শূন্য আসন যেন পুরো পরিবেশেই এক অদ্ভুত অসম্পূর্ণতা এনে দিয়েছে।
সে ভ্রু কুঁচকে মিরার দিকে তাকাল।
“আদ্রিস কোথায়, মিরা?”
মিরা সংক্ষিপ্ত স্বরে উত্তর দিল,
“রুমে।”
সায়ের আবার প্রশ্ন করল,
“আদ্রিতার সঙ্গে?”
“নাহ”
“তাহলে?”
মিরা এবার কিছুটা অনিচ্ছার সুরে বলল,
“আদ্রিতা আন্টির সঙ্গে বাইরে গেছে। বলেছে ফিরতে দেরি হবে।”
সায়ের ধীরেসুস্থে খাবার তুলতে তুলতে আবার মিরার দিকে তাকাল।
“আদ্রিসকে ডিনারে ডাকোনি?”
কথাটা শুনে মিরা বিরক্ত ভঙ্গিতে চেয়ারে বসে পড়ল। মুখে স্পষ্ট অনাগ্রহের ছাপ।
“আমার কথা শুনলে তো! ওকে এখন কিছু বলিয়েন না। আপনি খেয়ে রুমে যান।”
মিরার কণ্ঠের বিরক্তি এতটাই স্পষ্ট ছিল যে, সায়ের আর কোনো প্রশ্ন বাড়াল না। নীরবে খাবার শেষ করল সে। তারপর চুপচাপ উঠে নিজের কক্ষে চলে গেল।
এদিকে প্রেমা তখন নিজের জগতে সম্পূর্ণ মগ্ন। হাতে ফোন, ঠোঁটে মৃদু হাসি, কণ্ঠে ফিসফিসে ব্যস্ততা। ওপাশে রেভেন। তাদের ভালোবাসার শুরুটাও যেন এই তারের ওপারের কণ্ঠস্বরেই,কথা বলতে বলতে, রাতকে দিন আর দিনকে রাত বানাতে বানাতে।
কী এমন কথা তারা বলে, তা কেউ জানে না। তবে এতটুকু বোঝা যায়,যাদের হৃদয় একে অপরকে খুঁজে পায়, তাদের কাছে কথার কখনো শেষ হয় না
রাত ঠিক দশটা। তুষারছোঁয়া শীতল বাতাসে কাঁপছে মস্কো শহর। দূরের আলোগুলো কুয়াশার আবরণে ঝাপসা, যেন নিদ্রাহীন নগরীর চোখে জমে থাকা ক্লান্তি।
আদ্রিসের কক্ষের বারান্দার দরজাটি অর্ধখোলা। বাইরে থেকে ছুটে আসা হিমেল ঝটকা অনায়াসে ভেতরে ঢুকে পড়ছে, সঙ্গে করে আনছে একরাশ নির্জনতা। সেই বাতাসে ঘরের প্রতিটি কোণ ঠান্ডা হয়ে উঠেছে, দেয়াল পর্যন্ত যেন শীতের নিঃশ্বাসে জমে গেছে।
ঘরের মাঝখানে চেয়ারে বসে আছে আদ্রিস। উর্ধ্বাঙ্গ অনাবৃত, প্রশস্ত বক্ষের ওপর ছায়া-আলোর খেলা। পরনে কেবল ঢিলেঢালা কালো প্যান্ট,অন্ধকারের মতোই নির্বাক, গম্ভীর। তার আঙুলের ফাঁকে ধরা সিগারেটটি বারবার জ্বলে উঠছে, আবার নিভু নিভু হয়ে আসছে। প্রতিটি টানে আগুনের ক্ষুদ্র লেলিহান শিখা যেন তার মুখাবয়বকে ক্ষণিকের জন্য প্রকাশ করে, তারপর আবার গিলে নিচ্ছে ছায়া।
পাশের ছাইদানিতে ইতোমধ্যেই জমে আছে অসংখ্য পোড়া সিগারেটের ধ্বংসাবশেষ,যেন নীরব সময়ের স্তূপ। এ প্যাকেটের শেষ সিগারেটটিও এখন জ্বলছে, ধোঁয়া পাক খেয়ে উপরে উঠছে, তারপর মিলিয়ে যাচ্ছে শূন্যে।
কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর ছিল আদ্রিসের চোখদুটি। সেখানে ছিল এক অদ্ভুত শূন্যতা,গভীর, নিঃশেষ, দুর্বোধ্য। যেন সেই দৃষ্টির অন্তরালে ঝড় বইছে, অথচ বাইরে তার কোনো শব্দ নেই। এই মুহূর্তে তার ভেতরে কী চলছে, তা সে ছাড়া পৃথিবীর আর কেউ অনুমান করতে পারবে না। আদ্রিসকে বোঝা কঠিন নয়, অসম্ভব। সে কী চায়, কী হারিয়েছে, কী খুঁজছে,সেসব প্রশ্নের উত্তর কেবল তার নিজের কাছেই বন্দী।
চারপাশের নিস্তব্ধতা আর তার চোখের সেই শূন্যতা মিলেমিশে ঘরটিকে আরও ভারী করে তুলেছে। মনে হচ্ছিল, বাতাস পর্যন্ত থমকে গেছে,শুধু সময় নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে, আদ্রিস নামের এক দুর্বোধ্য মানুষের সামনে।
মেনশনের সামনে এসে থামতেই গার্ড বিশাল লোহার গেটটি খুলে দিল। গেটের কড়া শব্দ রাতের নিস্তব্ধতাকে খানিকটা চিরে গেল, তারপর আবার সব আগের মতো স্তব্ধ হয়ে রইল। মিসেস মিহু নিজেই স্টিয়ারিংয়ে ছিলেন। ধীর ভঙ্গিতে গাড়িটিকে ভেতরে এনে পার্কিং লটে থামালেন।
পাশের সিটে আদ্রিতা ঘুমিয়ে পড়েছিল। ক্লান্ত শরীরটা জানালার কাঁচে হেলান দিয়ে ছিল, যেন দিনের সমস্ত উচ্ছ্বাস শেষে ছোট্ট এক নিশ্চিন্ত আশ্রয় পেয়েছে সেখানে।
মিসেস মিহু সিটবেল্ট খুলে নরম কণ্ঠে ডাকলেন,
“আদ্রিতা আম্মাজান, উঠেন, চলে এসেছি আমরা।”
আদ্রিতা ধীরে ধীরে নড়ে উঠল। কিছুটা সময় নিয়ে চোখ মেলে চারপাশে তাকাল। বাড়ি ফিরে এসেছে বুঝতে পেরে ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।
“আমি আজকে অনেক মজা করেছি, মা।”
মিসেস মিহুও হাসলেন। কিন্তু সেই হাসির আড়ালেই বুকের কোথাও যেন হালকা ব্যথা খচ করে উঠল। যদি এই মেয়েটার শৈশবের দিনগুলোও তিনি পাশে থেকে পেতেন,তবে কত স্মৃতি জমত, কত গল্প তৈরি হতো তাদের দু’জনকে ঘিরে। হারিয়ে যাওয়া সময়ের জন্য মানুষ কখনো কখনো সবচেয়ে বেশি আফসোস করে।
দু’জন গাড়ি থেকে নেমে মেনশনের ভেতরে প্রবেশ করল।
ভেতরে ঢুকতেই আদ্রিতার মনে হলো, আজ বাড়িটা যেন অন্যরকম। সবকিছুই অস্বাভাবিক নিস্তব্ধ। সেই নীরবতা ভারী, দমবন্ধ করা। যেন দেয়ালের গায়েও অস্থিরতা লেগে আছে। কোথা থেকে যেন এক অজানা অশান্তি এসে চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে।
কোনো কথা না বলে আদ্রিতা নিজের কক্ষের দিকে হাঁটল। মিসেস মিহু তাকে থামালেন না। তিনিও ক্লান্ত পায়ে নিজের কক্ষে চলে গেলেন।
আদ্রিতা এসে দাঁড়াল আদ্রিসের ঘরের সামনে। দরজায় নরম করে টোকা দিল।
ভেতর থেকে কোনো শব্দ এলো না।
সে খানিকক্ষণ অপেক্ষা করল, তারপর একটু জোরে বলল,
“আপনি ভেতরে আছেন? দরজা খুলুন… বাইরে ঠান্ডা।”
তবু কোনো সাড়া নেই।
আদ্রিতা আবার ডাকল, এবার কণ্ঠে সামান্য অস্থিরতা মিশে গেল,
“কই আপনি? দরজা খুলুন,বাইরে ঠান্ডা।”
ঠিক তখনই,
হঠাৎ করেই দরজাটি খুলে গেল।
আদ্রিতা বিস্মিত চোখে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। দরজাটি যেন নিজের ইচ্ছেতেই খুলে গেছে। তারপর ধীরে পা বাড়িয়ে ভেতরে প্রবেশ করল সে।
ঘরের ভেতর এখনও জমে আছে শীতল বাতাস, সিগারেটের ধোঁয়া আর অদ্ভুত এক ভারী নীরবতা। মাঝখানে চেয়ারে বসে আছে আদ্রিস। উর্ধ্বাঙ্গ অনাবৃত, প্রশস্ত বুকে ছায়ার রেখা। মনে হলো দরজাটি হয়তো রিমোটেই খুলেছে সে।
আদ্রিতা এগিয়ে গেল। গিয়ে তার সামনে দাঁড়াল।
আদ্রিস আঙুলে ধরা সিগারেটের শেষ টুকরোটা নিঃশব্দে ছাইদানিতে ফেলে দিল। তারপর কোনো কথা না বলে তাকিয়ে রইল সামনে।
আদ্রিতা ধীরে ধীরে তার সামনে মেঝেতে বসে পড়ল। মুখ তুলে নরম কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“কি হয়েছে আপনার?”
আদ্রিস ঠান্ডা, গম্ভীর স্বরে বলল,
“কেন, কিছু হবার অপেক্ষায় ছিলি নাকি?”
কথাটা শুনে আদ্রিতা স্পষ্টই চমকে উঠল।
“কেন এমন বলছেন?”
আদ্রিস সামান্য ঝুঁকে এলো তার দিকে। চোখদুটো আরও গাঢ় হয়ে উঠল।
“ডিড ইউ এনজয়, আদ্রিতা?”
আদ্রিতা সরল স্বরে বলল,
“হ্যাঁ, মা আমাকে আজ অনেক জায়গায় নিয়ে গিয়েছিল।”
আদ্রিস উত্তর দিল না। শুধু তাকিয়ে রইল তার দিকে। সেই দৃষ্টি এত গভীর, এত তীক্ষ্ণ ছিল যে আদ্রিতা অস্বস্তিতে মাথা নিচু করে ফেলল।
আদ্রিসের কণ্ঠ এবার আরও ভারী হয়ে উঠল।
“মাথা নামাচ্ছিস কেন, সানা সুবহান আলভি? আমার সামনে দাঁড়ালে চোখে চোখ রেখে কথা বলার সাহস রাখতে হয়।”
আদ্রিতা ধীরে মাথা নাড়ল।
“আমি সানা সুবহান আলভি নই।”
এক মুহূর্তের জন্য নীরবতা নেমে এলো। তারপর আদ্রিস হেসে উঠল,শীতল, সংক্ষিপ্ত, প্রাণহীন এক হাসি।
“তোর না বলায় সত্য বদলে যায় না। নাম পাল্টালে অতীত মুছে যায় না। তোর হয়তো আর আমাকে সহ্য হচ্ছে না, ঠিক আছে। তাই হোক।”
সে ধীরে উঠে দাঁড়াল। কণ্ঠে বরফের মতো কঠিন সুর।
“নিজের মতো সময় কাটাস। যখন ভুলেই গেছিস, তখন ভুলেই থাক। আমার দরকার নেই কারও দয়ার।”
কথা শেষ করে আদ্রিস পাশের চেয়ার থেকে নিজের শার্ট তুলে নিল। অন্য হাতে গাড়ির চাবি তুলে নিল শক্ত ভঙ্গিতে।
আদ্রিতা সঙ্গে সঙ্গে বুঝে গেল,সে এখনই বেরিয়ে যাবে।
আতঙ্কে তাড়াহুড়ো করে উঠে দাঁড়াল সে। দ্রুত পায়ে এগিয়ে গিয়ে পেছন থেকে আদ্রিসকে জড়িয়ে ধরল।
এক মুহূর্তে থেমে গেল আদ্রিসের পদক্ষেপ।
আদ্রিতা তার পিঠে মুখ লুকিয়ে কাঁপা কণ্ঠে বলল,
“এমন করছেন কেন? আমি কী করেছি?”
আদ্রিস, আদ্রিতার হাত ছাড়িয়ে দেয় নিজের কোমড় থেকে।
“তুই কিছু করিস নি। আমি করেছি তোকে আঁটকে ফেলেছি চারিদিক দিয়ে। তুই আমাকে সহ্য করতে পারছিস না। আমারত বিষয়টা বুঝতে হবে।”
কথাটা বলে আদ্রিস বেরিয়ে গেলো। ফিরে চাইলোনা একবারও। আদ্রিতা তাকিয়ে রইলো অবাক হয়ে। কি বলবে বা কি করবে সে বুঝতে পারলো না।
আদ্রিতাকে একা ফেলে আদ্রিস বেরিয়ে গেলো।
কিছুক্ষন পর গাড়ির হর্ণের শব্দ শোনা গেলে আদ্রিতা দৌড়ে বেলকনিতে যায়। আদ্রিসের গাড়িটা বেরিয়ে গেলো মেনশন থেকে।
আদ্রিতা তাকিয়ে রইলো কিছু করতে পারলো না।
কোথাও না কোথাও আদ্রিতা ভেবেছিলো আদ্রিস হয়ত ফিরে আসবে। কিন্তু তাকে ভুল প্রমাণিত করিয়ে দিয়ে বাকিটা রাত কেটে গেলো আদ্রিস ফিরে এলোনা।
চলবে?
Share On:
TAGS: জেন্টাল মনস্টার, লামিয়া রহমান মেঘলা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
জেন্টাল মনস্টার পর্ব ৪২
-
জেন্টাল মন্সটার পর্ব ১৯
-
কিস অফ বিট্রেয়াল পর্ব ২
-
জেন্টাল মনস্টার পর্ব ৫৯
-
জেন্টাল মনস্টার পর্ব ৪৫ [ ঈদ স্পেশাল ]
-
জেন্টাল মন্সটার পর্ব ১৫
-
জেন্টাল মনস্টার পর্ব ২৯
-
জেন্টাল মনস্টার পর্ব ২৫
-
জেন্টাল মন্সটার পর্ব ১৭
-
জেন্টাল মনস্টার পর্ব ২৭