#জাহানারা
#জান্নাত_মুন
পর্ব :৮৬
ক’পি করা নিষিদ্ধ
সতর্কবার্তা:
এই গল্পে অ’কথ্য ভাষা এবং স”হিং’সতার উপাদান রয়েছে। ১৮ বছরের কম বয়সী বা সং’বে’দনশীল পাঠকদের জন্য উপযুক্ত নয়। পাঠক নিজ দায়িত্বে পড়বেন।
ধরত্রীর বুকে এখন গভীর রাত। সম্পূর্ণ কক্ষ এখন নৈঃশব্দ্যে ছেয়ে আছে। শুধু পলির বুকের অনিয়ন্ত্রিত হৃদস্পন্দনের ধুকপুক আওয়াজ রুমের চার দেয়ালে আঘাত পেয়ে তা যেন প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। বাইরে থেকে ভেসে আসছে রাতের নিশাচরদের চাপা গুঞ্জন। রমণীর সর্বাঙ্গ মৃদু কম্পিত হচ্ছে। এই বিষয়টি অনুভব করতে পেরে ইমরানের ঠোঁটের কোণে কুটিল রহস্যময় হাসির রেশ উদ্ভাসিত হয়েছে। ইমরান পলির কোমর জড়িয়ে ধরে রাখা হাতে আরও বল প্রয়োগ করে রমণীকে নিজের সাথে বেষ্টন করতে মরিয়া হয়ে উঠল। এদিকে রমণীর কপাল বেয়ে ঘাম ছুটছে। তনুবুক একনাগাড়ে উঠানামা করে যাচ্ছে। ভয়ার্ত চেহারায় আতংকের ছাপ স্পষ্ট। রমণীর কানের কাছে ফের ইমরান হিসহিসিয়ে বলে উঠলো,
–“ক্ষমতা কার না পছন্দ, বউজান!”
পলি ধীরলয়ে দৃষ্টি ঘুরাতেই চোখের সামনে ভেসে উঠল ইমরানের এক অচেনা রূপ। সহসা রমণীর হৃদস্পন্দন থমকে গেল। নিঃশব্দে অদ্ভুত হাসল ইমরান। পলির নিকট সেই হাসি বড় অদ্ভুত ঠেকল। তাছাড়া ইমরানের অস্বাভাবিক দৃষ্টি পলির মধ্যে অযাচিত এক ভীতি সৃষ্টি করে তুলছে। রমণী ভয়ার্ত কাঁপা গলায় শুধালো,
–“ততুমি এমন করছ কেন? ক..কি করেছি আমি?”
ইমরান ফের রহস্যজনকভাবে নিঃশব্দে হাসল। অতঃপর পলির গলা থেকে ধারালো ছু’রি ধীরে ধীরে সরিয়ে, সেই ছু’রি দিয়ে আলতো করে রমণীর গাল ছুঁইয়ে দিত লাগল। ভীত রমণীর দেহের ভেতর ভয়ার্ত একটি শীতল স্রোত বয়ে গেল। ইমরান ভরাট অথচ চাপা গলায় হিসহিসিয়ে বলে উঠলো,
–“একদম না, তুমি কিছুই কর নি। করেছি তো আমি। ঘর শত্রু বিভীষণ জেনেও এতদিন ধরে পরম যত্নে লালন-পালন করেছি।”
ইমরান একটু থামল। হঠাৎ করে রমণীর কানে রুক্ষ অধর ছুঁইয়ে দিল। মৃদু কেঁপে উঠলো পলির সর্বাঙ্গ। দাঁতে দাঁত পিষে রেখে অদ্ভুত হাসল ইমরান। যেন তার এই হাসিতে অনেক ক্ষোভ মিশে আছে। ইমরান মূহুর্তেই পলির ঘাড়ে মুখ গুঁজে জোরে শ্বাস টানল। চাপা হাস্কি স্বরে বলে উঠলো,
–“কি ভেবেছিলে, আমার সাথে খেলবে আর আমি কিছুই বুঝতে পারব না?”
পলির ভয়ার্ত দৃষ্টি এলোমেলো। এবার মৃদু আওয়াজ তুলে হাসল ইমরান। রমণীর গালে ঠোঁট ছুঁইয়ে বলে উঠলো,
–“খুব লাকি তুমি বউজান! নাহলে তোমার মতো তুচ্ছ মেয়েকে আমি আমার মনের রাণী বানাতাম না। কিন্তু কি করব বল? তোমাকে প্রথম দেখাতেই আমার বেহায়া নি’কৃষ্ট প্রাণহীন হৃদয় আচানক স্থবির হয়ে যায়। তোমাকে এক রাতের জন্য উপভোগ করার জন্য গিয়ে বিয়ে করে এই বিশাল টাকার সম্রাজ্য চৌধুরী বাড়িতে নিয়ে আসলাম।”
ইমরানের কথা শুনে পলির মধ্যে আলাদা উদ্বেগ লক্ষ্য করা গেল না। কারণ এই কথা রমণী বহু আগে থেকেই জানে। সেইদিন ইমরান চৌধুরী দোকানের বাকি টাকা ফিরত দেওয়ার উদ্দেশ্যে পলির বাড়ি যায় নি। বরং ইমরান চৌধুরী যখন জানতে পারে পলাশের মতো একজন সাধারণ দোকানদার তার দলের কর্মীদের সাথে বাকি টাকা নিয়ে ঝামেলা করছে, তখন সে ভীষণ চটে যায়। খোঁজ নিয়ে জানতে পারে পলাশের ঘরে একটি সুন্দরী বোন আছে। অতঃপর পলাশের উপর ক্ষোভ মিটাতে মাঝরাতে তার বাড়িতে টাকা নিয়ে যায়। উদ্দেশ্য ছিল পলাশের একমাত্র বোনের স’র্বনাশ করা। কিন্তু সেদিন রাতে পলির ইজ্জত হরণ করতে গিয়ে ইমরান চৌধুরী নামক নি’কৃষ্ট পুরুষের মনে প্রেমের দোলা লাগে। উহু! তখন সেটা প্রেম নাকি মোহ ছিল তা বলা দুষ্কর। তবে এটা সত্যি, ইমরান চৌধুরী শুধুমাত্র একজন নারীর প্রতিই দুর্বল। সে আর কেউ নয়, ইমরান চৌধুরীর একমাত্র স্ত্রী অনামিকা পলি।
কিন্তু এর মধ্যে একটা ভারী মজার বিষয় ছিল! ইমরান চৌধুরীর মতো বিচক্ষণ, তীক্ষ্ণ বুদ্ধি সম্পন্ন খেলোয়াড়ও সেদিন ধরতেই পারে নি সে যাকে শিকার করতে গিয়েছিল, সেই শিকারই নিজে অপেক্ষারত ছিল শিকারীর আশায়। কারণ বাবা হারা এতিম দুই সন্তান বাবার মৃত্যুর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠে। ধীরে ধীরে ছক কষে ভালো মানুষের মুখোশের আড়ালের নি’কৃষ্ট অমানুষ ইমরান চৌধুরীকে নিঃশেষ করে দেওয়ার। সেই দিনের পরিকল্পনায় তারা সফল হয়। ইমরান চৌধুরী ঘুনাক্ষরেও ধরতেই পারে নি এক কিশোরীর দুর্দান্ত অভিনয়।
ইমরান পলির শান্ত চেহারা দেখে ফিক করে হেসে দিল। সহসা রমণীর ভাবনার সুতো ছিঁড়ে গেল৷ সংবিৎ ফিরতেই ইমরানের অস্বাভাবিক মুখাবয়ব দেখে ঘাবড়ে গেল। ইমরান এবার দু’হাতে প্রেয়সীর কোমর জড়িয়ে ধরল। আহ্লাদি গলায় বলল,
–“তুমি দুর্দান্ত খেলোয়াড় বউপাখি। একদম ইমরান চৌধুরীর বউ হওয়ার জন্য যোগ্য। সত্যি বলছি, সেদিন রাতে তোমার নিখুঁত অভিনয় আমি একটুও ধরতে পারি নি। কিন্তু কি বলতো? তোমার স্বামী তোমার থেকে শতগুণ অভিজ্ঞ এবং ভয়ংকর দানব। তোমরা দুই ভাই বোন মিলে কতবার গর্দভের মতো মারতে চাইলে আমাকে! কিন্তু তোমাদের হয়তো জানাই নেই, ইমরান চৌধুরীর হাত বহুত লম্বা।”
ইমরান কথায় বিরতি টেনে ঠোঁট কামড়ে কুটিল হাসল। অতঃপর রমণীর গালে আলতো দাঁত বসিয়ে দিল আচমকা। চরম ঘৃণা আর ব্যথায় চোখ খিঁচে নিল পলি। ইমরান কৌতুক গলায় বলল,
–“আমার কাছে তুমি একদম আহাম্মক পাখি৷ তার একটা মজার প্রমাণ কি জান?”
পলি জবাব দিল না। ইমরান চোখ বন্ধ করে রাখা রমণীর চেহারা পর্যবেক্ষণ করে সহাস্যে বলে উঠলো,“তোমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে আদর করতে করতেই শুট করে শামিনকে উপরে টপকে দিয়েছিলাম। আর তুমি টেরই পেলে না!”
আকষ্মিক দৃষ্টি মেলে তাকাল পলি। রমণীর নিশ্বাস যেন ভেতরেই আটকে গেছে। চেহারায় দ্বিগুণ উদ্বেগ। ইমরান প্রেয়সীর ভয়ার্ত চেহারা দেখে ক্রুর হাসল। পলির কাঁধে থুতনি ঠেকিয়ে নিঃশব্দে পৈশাচিক হাসতে হাসতে বলে উঠলো,
–“আরে আমার বাঘিনী এখনই ঘাবড়ে গেল হবে? আরও তো অনেক কিছু তোমার জানায় হয়নি। ঐ যে মাউনা ফ্যাক্টরিতে যেদিন আগুন লাগল, সেইরাতেও তো তোমার ভাই আমাকে ধাওয়া করেছিল। তারপর আমি খেলা ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য সেদিন আর বাড়ি ফিরলাম না। আর তোমার ভাই যাতে আমি ভেবে মারতে পারে তাই ইফান ভাইকে ভংচং বুঝিয়ে আমার গাড়িতে পাঠিয়ে দিলাম। ভাবলাম এক ডিলে দুই পাখি মরবে। ইফান ভাই টপকালে সব প্রোপার্টির উপর একমাত্র দখলদারি করব আমি। হাহ্! তা আর হলো কই? আমার গণ্ডমূর্খ সম্বন্ধী কোনো কাজই ঠিক করে করতে পারে না।”
হতাশার নিশ্বাস ত্যাগ করল ইমরান। পলি ঘৃণায় মুখ অন্ধকার করে ফেলেছে। সেভাবেই নিচু গলায় বলল,
–“ছিঃ! আপনি আমার ভাবনার চেয়েও নি’কৃষ্ট অমানুষ। নিজের ভাইকে প্রোপার্টির লোভে মা’রতে চেয়েছিলেন!”
ইমরানের হাস্যোজ্জ্বল চেহারা চুপসে গেল এক লহমায়। এক টান মেরে পলিকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল। অতঃপর নাখুশ চেহারা করে বলতে লাগল,
–“মা’রতে চেয়েছিলাম না। এখনো মারতে চাই। শুধু প্রোপার্টির জন্য নয়, ইফান চৌধুরীর সকল কিছু ছিনিয়ে নিতে চাই। ঘৃণা করি ওকে আমি।”
রমণী তাচ্ছিল্য করে হেসে বলল,“লজ্জা করে না এসব বলতে। মায়ের পেটের ভাইকে কেউ ঘৃণা করে। আর সেই লোকই কিনা আপনাকে বিপদ থেকে রক্ষা করে। আগলে রাখে।”
পলির কথার পিছে সারা ঘরে নৈঃশব্দ্য নেমে এসেছে। ইমরান প্রেয়সীর চেহারার দিকে সরল মুখ করে খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইল। অতঃপর আচমকা ফিক করে হেসে দিল। তাচ্ছিল্য করে বলল,
–“কে বলেছে ও আমার মায়ের পেটের ভাই?”
পলির চেহারায় বিস্ময় খেলে গেল। এতে ইমরানের ঠোঁটের কোণে শ্লেষ হাসি আরও প্রশস্ত হলো। সে পলিকে বলতে লাগল আসল ঘটনা।
নুলক চৌধুরী ইমরানকে বলেছে সে নাকি নাবিলা চৌধুরীর নিজ সন্তান নয়। ইকবাল চৌধুরী একজন অচেনা সহজসরল মেয়েকে ভালোবেসেছিলেন। যার ফলস্বরূপ ইমরানের জন্ম। কিন্তু এটা নাবিলা চৌধুরী মেনে নিতে পারেন নি। যার কারণে ইমরানের জন্মদাত্রীর ঠায় এই চৌধুরী বাড়িতে হয়নি। মেয়েটা অনেক দুঃখী ছিল। তারপর ইমরানের জন্মের সময় তার জন্মদাত্রী মা’রা যায়। ইকবাল চৌধুরী দুধের শিশু ইমরানকে তখন নাবিলার বুকে এনে দেয়। তখন নাবিলা চৌধুরী ছিল সন্তান হারা। ছোট্ট ইফানকে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দুঃখীনি হয়েছে। তাই সবসময় বেখেয়ালি থাকত। জগৎ সংসারের প্রতি তীব্র অনিহা। তাই ইমরানকে অবহেলা করে মানুষ করেছে। ধীরে ধীরে ইমরান বড় হয় আর তার ভেতর হিংসার বীজ বুনতে থাকে। সেই ঈর্ষা থেকে ইমরান হয়ে উঠে অন্ধকার কালো দুনিয়ার রাজার সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী। যা স্বয়ং মাফিয়া বসও জানে না।
পলি কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে পড়ল ইমরানের কথা শুনে। সে কখনো নাবিলা চৌধুরীর আচরণে কখনো এমন কিছু আচ করতে পারে নি। তার জানা মতে, নাবিলা চৌধুরী পৃথিবীতে সবচেয়ে ভালোবাসেন তার নিজ তিন সন্তানকে। আজ কিনা শুনতে হচ্ছে নাবিলা চৌধুরীর ইমরানের মা নয়! ইমরান প্রেয়সীর বোকা চেহারা দেখে হাসল। বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে ছুঁয়ে দিল রমণীর কোমল ওষ্ঠ। পুনরায় বলতে শুরু করল।
মাফিয়া আন্ডারওয়ার্ল্ড জগতে ইফান চৌধুরী অনেক ক্ষমতাধারী একজন ব্যক্তি। প্রকৃত পক্ষে বলতে গিলে সেই ক্ষমতা আকাশচুম্বী। ইফান চৌধুরীকে সাধারণ কিংবা এর চেয়ে আরও গভীর ভাবে পর্যবেক্ষণ করলেও কেউ সঠিক ঠাহর করতে পারবে না তার সম্পর্কে৷ মিস্টার ভি নামের মাফিয়া অধিপতির সম্পর্কে যতটুকু মানুষ জানে তার চেয়েও বহুগুণ অজানা রহস্য রয়েছে। সাধারণ মানুষ কি? আন্ডারওয়ার্ল্ডের বাঘা বাঘা মাফিয়াদের কাছেই মি. ভি পুরোটাই ধোঁয়াশা। লোকটা যেমন দেখায়, তেমন মোটেও না। বরঞ্চ তার চেয়েও গূঢ় মরীচিকা। আর এমন ক্ষমতার অধিপতি কে-ই বা হতে না চায়? ইমরানও চায় সেই জায়গায় বসতে। সে ইফানের থেকে সব কেড়ে নিতে চায়। তাই ব্ল্যাক ভেনম মাফিয়া গ্রুপের প্রতি সে অবসেসড। এটা শুধু একটা গ্রুপ নয়! প্রবল ক্ষমতার আধার। একবার ভেনম বসের জায়গায় সে বসতে পারলে পুরো রাজত্ব আর ক্ষমতা তার হবে।
ইমরান মাফিয়া বসের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে আড়ালে ছক কষছে। ইফানের যত শত্রু আছে তারা সকলেই ইমরানের মিত্র। এমনকি পঙ্কজ কাইসার ছিল তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সঙ্গী। কিন্তু মাঝপথে বাঁধ হয়ে দাঁড়ায় জায়ান শেখ নীরব। একজন দক্ষ সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। ইমরানের চোখের বিষ হয় জায়ান। কিন্তু যখন জানতে পারে জায়ান বাংলাদেশের একজন ডিরেক্টর জেনারেল পদে বসেছে, তখনই জায়ানকে মা’রার জন্য মরিয়া হয়ে উঠে। বাংলাদেশে ইমরানের মানব পা’চারের বিরাট অংশ রয়েছে। সাথে আরও জঘন্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। যেগুলো ধীরে প্রকাশ্যে চলে আসছিল ডিরেক্টর জেনারেল জায়ান শেখের নেতৃত্বে। সেই সূত্র ধরেই একদিন জানতে পারে জাহানারা শেখ সম্পর্কে। যে কিনা তার চির শত্রুর অবসেশন এবং পথের কাঁটার কাজিন। বাস, খেলা জমে গেল! টার্গেট করে তুলে নিয়ে যাওয়া হলো কিশোরী জাহানারা শেখকে। কিন্তু তাদের প্ল্যান কাজ করার আগেই ভেস্তে গেল। মাফিয়া বস ঠিকই নিজের জানকে অক্ষত অবস্থায় বাঁচিয়ে নিল।
কিন্তু ইমরান যখন বুঝল প্রথমে পথের কাটা সরানো উচিত, তখন প্ল্যান পাল্টে দিল। তার একমাত্র টার্গেট হলো কবিতা শেখ। জায়ান শেখের একমাত্র আদরের ছোট বোন। সে নিজেকে ইফান চৌধুরী পরিচয় দিয়ে ম্যানিপুলেট করে সহজসরল মেয়েটাকে। বোকা রমণী অন্ধের মতো ভালোবাসে ছেলেটাকে। কিন্তু এসবের মধ্যে হঠাৎ একদিন তাদের সকল অপকাজের প্রমাণ চলে যায় জায়ানের হাতে। ইমরান আতংকে ছিল। সে খুব ভালো করে জানে বাংলাদেশের কোনো আইন তার কিচ্ছুটি করতে পারবে না। কিন্তু মাফিয়া বস! ভেবেই ইমরান পাগল প্রায় অবস্থা। কারণ মাফিয়া বস বিশ্বাসঘাতকদের এত সহজ মৃত্যু দেয় না। নিশ্চয়ই ইফান, ভাই বলে ইমরানকে দয়া করতো না। কারণ এই যে আগেই বলা হলো, মি. ভি বড্ড রহস্যময়। দয়া-মায়া তার ধাঁচে নেই। সে দুর্ধর্ষ, চরম নি’কৃষ্ট। পরিবার-পরিজনদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা জগতে বাস করে। তাই তার ধারণা অনুযায়ী, তাকে ভাই বলে থোড়াই কেয়ার করত। বরঞ্চ ইমরানকে নৃ’শংস মৃ’ত্যু দিত।
তাই যে করে হোক জায়ানকে পৃথিবী থেকে সরানো ফরজ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ইমরান সুযোগ খুঁজতে থাকে। ঠিক পেয়েও যায়। সেই দিনটি এখন শেখ বাড়ির মানুষদের জীবনে একটি বিভৎস দিন। পুরো শেখ বাড়ি তখন বিয়ের আমেজে মেতে ছিল। ইমরান সেদিন জায়ানের গায়ে হলুদের দিন গিয়েছিল জায়ানকে খু”ন করার জন্য। কারণ সারা বাড়ি সেদিন মানুষে ভর্তি ছিল। সুযোগটি সে কাজে লাগাতে চেয়েছিল। কিন্তু পারে নি। অপরদিকে ইফান বিয়ের দিন এসে জায়ানের সাথে ঝামেলা করেছিল। ঠিক সেই মূহুর্তের অপেক্ষায় ছিল ইমরান। বাস! মোক্ষম সুযোগ পেয়েও গেল। ইফান যখন জায়ানকে ভয় দেখানোর জন্য বন্দুক তাক করে ঠিক সেই মূহুর্তে ইফানের পিছনের বিল্ডিং থেকে জায়ানকে শুট করে দেয়। বেচারা জায়ান জানলোও না তার খু’নী তার বন্ধু নয়। অন্যদিকে ইফান কিছু বুঝে উঠার আগেই ইফানকেও গু’লি করে। ইমরান ভেবেছিল তার দুই শত্রুকে খতম করে দিয়েছে। কিন্তু ব্যর্থ হলো। ইনান আর মাহিন ঠিক সময় এসে গু’লিবিদ্ধ ইফানকে নিয়ে দ্রুত চিকিৎসা দেয়।
________
ইমরান ক্লান্তির নিশ্বাস ত্যাগ করল। এদিকে চরম বিস্ময় আর ছলছল নয়নে নিজ পাষণ্ড স্বামীর দিকে তাকিয়ে রইল পলি। একটা লোক এত নি’কৃষ্ট! চরম ক্ষোভ, ঘৃণা আর দুঃখে রমণী যেন বাকহারা হয়ে পড়েছে। তবুও খুব কসরত করে আওড়ালো,
–“জা’নোয়ার! এত খা’রাপ তুই! এত কিছু করলি তবুও তর শান্তি হয়নি? সরল কবিতা আপুকে কেন মা’রলি?”
ইমরান চেহারা মলিন করল। সে পলির থুতনি উঁচিয়ে অকপটে বলল,“ঝামেলা করছিল। সবাইকে সব বলে দিবে এসব পাগলামি করছিল। জোর করে তাই ওকে তুলে নিয়ে গিয়েছিলাম। মেয়েটা খালি পালাতে চায়। ধ্যাত বাদ দাও। এসব শুনলে তোমার কষ্ট লাগবে।”
তাচ্ছিল্য করে হাসল পলি। মেয়েটাকে দেখে মনে হচ্ছে স্রেফ একটা প্রাণহীন দেহ দাঁড়িয়ে আছে। যার কাতর অবিশ্রান্ত দৃষ্টি ইমরানের পানে। ইমরানের এটা সহ্য হলো না। সে বুকে জড়িয়ে ধরল রমণীকে। আদুরে গলায় বলল,
–“আমি তোমাকে রাণী বানিয়ে রাখব। এই যে এখন তুমি সারাদিন বাড়ির কাজ কর, জাহানারার কথায় ওঠ-বস! সত্যি বলতে আমার মস্তিষ্ক এসব দেখে বিগড়ে যায়। কেন করবে তুমি? তুমি পায়ের উপর পা তুলে সকলকে আদেশ করবে। খুব শীগ্রই সেই ব্যবস্থা করব। কিন্তু…
ইমরান কুটিল হাসল। পলির মাথায় চুমু খেয়ে হিসহিসিয়ে বলল,“এবার বাচ্চাদের মতো খেলা বন্ধ কর। নিজের স্বামীর কাঁধে হাত রাখ। দেখবে পৃথিবীর সব সুখ তোমার। যদি তা না কর তাহলে..
পলি ক্লান্ত কণ্ঠে শুধালো,“তাহলে কি?”
ইমরান ক্রুর হেসে বলল,“ভয় নেই বউপাখি। তোমায় আমি মা’রব না। যার গায়ে আজ পর্যন্ত একটা ফুলের টোকা পর্যন্ত দেইনি, তাকে মা’রার কথা কল্পনাও করতে পারি না। আমি যে তোমায় বড্ড ভালোবাসি।”
তাচ্ছিল্য করে হাসল পলি। ইমরান থেমে বলল,“ব্যাগ গোছগাছ করে নাও। আজই দেশ ছাড়ব আমরা।”
ইমরান পলিকে ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। পলিকে ভীষণ দুর্বল ঠেকছে। ইমরান দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,“আমার কথা শুন বউপাখি। আমার সাথে একদম ছলনা করবে না। এটা আমি মোটেও বরদাস্ত করব না।”
পলি টালমাটাল পায়ে ইমরানের দিকে এগিয়ে গেল। একদম ইমরানের সন্নিকটে এসে পলির পা থামল। ক্লান্ত গলায় আওড়াল,“উহু, আজকের পর থেকে আর কোনোদিন তোমার সাথে ছলনা করব না।”
স্ত্রী’র মলিন মুখের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট প্রসারিত করল ইমরান। বলল,“গুড। এত তাড়াতাড়ি বুঝতে পেরেছ এটাই অনেক।”
অতঃপর মাথা নিচু করে চোখ বন্ধ করল। সারাদিন দৌড়ঝাপ আর অভুক্ত থাকায় ইমরাম বেশ ক্লান্ত। কোমরে দু’হাত ধরে এক বুক নিশ্বাস ছাড়ল। ফের দৃষ্টি উপরে তুলবে ঠিক তখন, একদম আচমকা ইমরানের পেটে ছু’রিকাঘাত করা হলো। অকস্মাৎ আক্রমণে ইমরান সহসা তা রোধ করতে পারল না। পরক্ষণেই হাত দিয়ে ঝাপটা মেরে অ’স্ত্রধারী হাত সরিয়ে, সে অতর্কিত দৃষ্টি ঘোরাল সামনের ঘা’তক রমণীর পানে। ইমরান লক্ষ্য করল রমণীর চেহারায় কিছুক্ষণ আগের সেই ক্লান্তি এখন আর নেই, বরং পাতলা গোলাপি আভাযুক্ত অধরে লেগে আছে কুটিল হাসি। মূহুর্তেই ইমরানের চেহারার রঙ বদলে গেল। হিংস্র দানবের মতো র’ক্তাভা দৃষ্টি পলিতে নিবন্ধ। ইমরান দাঁতে দাঁত পিষে হিসহিসিয়ে আওড়ালো,
–“ছলনাময়ী! বেইমান!’
ইমরানের জখম হওয়া স্থান থেকে তাজা লাল র’ক্তের স্রোত বয়ে যাচ্ছে। ইমরান প্রথমে যন্ত্রণা অনুভব করতে পারি নি। কিন্তু এই মূহুর্তে যন্ত্রণা তার সারা দেহে ছড়িয়ে পড়তে চাইছে। ইমরান হঠাৎ ক্রুর হাসল। কারণ পলির অদক্ষ হাতের আ’ঘাত এতটাও জোরালো ছিল না। শুধু পেটের চামড়া ভেদ করে একটু গভীর ক্ষ’তের সৃষ্টি করেছে। পর্যাপ্ত চিকিৎসা পেলে সেরে যাবে। কিন্তু এত র’ক্তক্ষরণ হতে দেওয়া যাবে না। ইমরান পেট বাধার জন্য কিছুর খুঁজ করল। ইমরানের দৃষ্টি বুঝে পলির চোয়াল শক্ত হয়ে আসল। সে ফের আ’ঘাত করতে যাবে তক্ষুনি ইমরান থাবা মে’রে হাতটি ধরে ফেলল। এবার ইমরানের মধ্যে যেন কোনো মায়া কাজ করছে না। রাগের বসে সপাটে থা’প্পড় বসাল তার অবাধ্য রমণীর নরম তুলতুলে গালে। পলি সেই আ’ঘাতে তাল সামলাতে না পেরে ছিটকে দূরে সরে আসল। ঠিক তক্ষুনি দরজা টাস করে খুলে গেল। যেন কেউ নিজের সকল শক্তি দিয়ে লাথি বসিয়েছে।
ঠিক তাই হলো। মীরা সজোরে লাথি মেরে দরজা খুলতেই আমি ঘরে ঢুকে পড়লাম। পলি ছিটকে এসে আমার বুকে মুখ থুবড়ে পড়ল। এই নিস্তব্ধ মধ্যেরাতে নিজের ব্যক্তিগত কক্ষে আমার আর মীরার আগমন দেখে চমকে উঠল ইমরান। কিন্তু মিরা তো দেশের বাইরে ছিল। তাহলে হঠাৎ কোথা থেকে চৌধুরী বাড়িতে আসল? মনে প্রশ্ন জাগলেও আর ভাবতে পার না ইমরান। সে কিছু বুঝার আগেই পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা আমি এবং মীরা দূরত্ব তৈরি করি। উন্মোচিত হলো তৃতীয় অবয়বের। জুইকে এখানে দেখে পুরোপুরি স্তম্ভিত হয়ে গেল ইমরান। পরিস্থিতি ঠাহর করতে পারল না। মীরা ভয়ার্ত এবং আতর্কিত চেহারা করে ভাইয়ের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে আওড়ালো,
–“দ্য ভাই, এত ব্লা”ড!”
মীরার প্রতিটি কদমের জোর অনুযায়ী তার হাই হিল টাইলস মেঝেতে ঠকঠক আওয়াজ তুলছে। নিস্তব্ধ মধ্যেরাতে তা বেশ জোরেই সারা রুমে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। ইমরান জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিল। এক পলক আমার বুকে পড়ে থাকা পলিকে দেখে ঢোক গিলল। ইতোমধ্যে মীরা ইমরানের একদম কাছে গিয়ে দাঁড়াল। চিন্তিত আর উদ্বীগ্ন হয়ে বলতে লাগল,
–“ওহ্ গড! তোমার পেটে আ’ঘাত লাগলো কি করে?”
ইমরান নিভু কণ্ঠে বলল,“বোন আমার, আমাকে এখনই হসপিটালে নিয়ে যা। পড়ে সব বলছি।”
মীরা ভাইয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে আতর্কিত গলায় শুধালো,“হসপিটালে যাবে?”
ইমরান মাথা নাড়াল। হ্যা উচ্চারণ করতে যাবে ঠিক সেই মূহুর্তে সে অনুভব করে, আবারও একটি ধারালো ছু’রি তার দেহের চামড়া ভেদ করেছে। তবে কারো দক্ষ হাতের আ’ঘাত হওয়ায় জ’খম খুব গভীর হলো। ইমরান আতর্কিত দৃষ্টি মীরার দিকে ঘুরাতেই মীরার চেহারায় এতক্ষণ ধরে থাকা ভাইয়ের জন্য সকল দুশ্চিন্তা সরে সহসা ক্রুর হাসি ফুটে উঠল। সেই সাথে মোটা করে ডার্ক আইলাইনার টানা শান্ত চোখ জোড়া বড্ড রহস্যময় ঠেকল। ইমরানের সচল মস্তিষ্ক সতর্কবার্তা দিল তক্ষুনি। মীরা ইমরানে কানের কাছে মুখ এনে হিসহিসিয়ে জানান দিল,
–“এটা আমার জে স্যারকে আ’ঘাত করার জন্য ছিল।”
ইমরানের ত্রাসিত দৃষ্টি আরও ভয়ার্ত হয়ে উঠল। ঠিক তখনই ঘা’তক মীরার থেকে আরেকটি আ’ঘাত আসল। নড়ে উঠল ইমরানের সর্বাঙ্গ। মীরা ফের ইমরানের কানের কাছে হিসহিসিয়ে জানান দিল,
–“এটা ছিল আমার জে স্যারকে পৃথিবী থেকে কেঁড়ে নেওয়ার জন্য।”
ইমরান বোধহয় এখন বুঝতে পারছে এখনকার তৈরি হওয়া সব পরিস্থিতি পরিকল্পিত, সবটাই সাজানো। সে আকুতি করে অস্ফুটে বোন আওড়াতে চাইল। তবে ‘বো’ উচ্চারণ অব্ধিই থমকে গেল। কারণ মীরা ধাক্কা মে’রে আমার দিকে ঠেলে দিয়েছে। ইমরান আমার দিকে হেলে পড়তে নিলেই আমি এক হাতে ওর প্রশস্ত কাঁধে ঢাল দিয়ে অপর হাতে তৎক্ষনাৎ ছু’রিকাঘাত করলাম। ইমরানের মুখ থেকে অনর্গল র’ক্তবমি হতে লাগল। আমি ক্রোধিত নয়নে ইমরানের দিকে তাকিয়ে হিসহিসিয়ে বললাম,
–“আফসোস! তোর মতো জা’নোয়ারকে হাজারবার নিজ হাতে মা’রলেও মনের জ্বা’লা মিটবে না।”
বলতে বলতে আরেকটা আ’ঘাত করলাম। ককিয়ে উঠলো ইমরান। আমি কুটিল হেসে বললাম,“উপলব্ধি করতে পারছিস আমার জান, আমার জায়ান ভাই আর কবিতা আপুর কেমন কষ্ট হয়েছিল?”
ইমরান কাতর চোখে তাকিয়ে সহানুভূতি পেতে চাইল। কিন্তু আজ যে আমি বড্ড পাষাণ হয়ে গেছি। তাই তো নি’র্দয়ভাবে ধাক্কা মে’রে দূরে সরিয়ে দিলাম ইমরানকে। তার আহত ক্ষ’তবিক্ষত দেহ ছিটকে গিয়ে ওয়ারড্রবের উপর পড়ল। দুর্বল হাতে ধরে নিজের অস্তিত্বকে দাঁড়া করিয়ে রাখতে মরিয়া হয়ে উঠল। যেই এক হাত ফসকে ঘুরে দাঁড়াল, অমনি তার বুকে আ’ঘাত আনল জুই। ফের ককিয়ে উঠলো ইমরান। জুই উন্মাদের ন্যায় ছু’রিকাঘাত করতে লাগল ইমরানের যৌ’নাঙ্গে। কঠোর দৃষ্টি কিশোরীর। রাগে তার সর্বাঙ্গ কাঁপছে।
এই বাড়িতে আসার পর জুই সচরাচর রুম থেকে বের হয়নি। এক প্রকার ঘর বন্দী হয়ে ছিল। আমিই মাঝেমধ্যে জোর করে রুম থেকে বের করে আনতাম। একদিন জুই সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় ইমরানের সাথে সাক্ষাৎ। ইমরান তখন উপরে উঠছিল। সেদিন জুই ইমরানের দেহের গন্ধে কিছু আন্দাজ করে। ভয়ে চুপ হয়ে যায়। আমি তো ওর বড় বোন। আমি ওকে ছোট থেকে কোলেপিঠে করে মানুষ করেছি। আমি জানি ও কখন সত্যি বলে, কখন মিথ্যা বলে। আর কখন কথা লুকায়। আমি ওকে চাপ দিয়ে পেটের কথা বের করি। অতঃপর সন্দেহ থেকে পলির মাধ্যমে ইমরানের চুল, ব্রাশ নিয়ে ডিএনএ টেস্ট করিয়ে সবটা জানতে পারি। আর এই কদিন ধরেই আমি তর্কেতর্কে ছিলাম। ইমরানের দেখা নেই ঠিক মতো। এই যে আজ মাঝ রাতে আসল। আর পলি নিচে খাবার আনতে গেল। উহু, পলি খাবার আনতে যায় নি। বরং আমার সাথে পরামর্শ করতে গিয়েছিল। আমিই ওর হাতে ছু’রি দিয়ে উপরে পাঠিয়েছিলাম।
জুই ঝোঁকের বশে নিজের ক্রোধ ঢালল ইমরানের উপর। কিন্তু যখন নিজের কর্মকাণ্ড অনুভব করল তখনই ভয়ে ছুটে এসে আমার বুকে আশ্রয় নিল। ইমরানের সম্পূর্ণ দেহ লাল তরল র’ক্তে রঞ্জিত। সেই সাথে আমাদের চারজনের দেহও ওর কলুষিত র’ক্তে রঞ্জিত হলো। ইমরানের নিস্তেজ হয়ে আসা দেহ মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে আছে। পলি ধীর পায়ে হেঁটে এগিয়ে গেল। মেয়েটা বড্ড এলোমেলো হয়ে গেছে। খোঁপা খুলে সেই কখন পিঠে পড়া চুলগুলো এলোমেলো হয়ে আছে। শাড়ির আঁচল র’ক্তাক্ত মেঝেতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। কোনো হুঁশ নেই রমণীর। সে গিয়ে বসল ইমরানের নিস্তেজ দেহের পাশে। নিভুনিভু চোখে ইমরান তাকল প্রেয়সীর পানে। অধরযুগল খানিকটা ফাঁক করে অস্ফুটে আওড়াল,
–“আমার বউজান..
রমণী যেন কলের পুতুল হয়ে গেছে। অনুভূতিহীনভাবে একনাগাড়ে ক্ষ’তবিক্ষত স্বামীর দিকে তাকিয়ে কৈফিয়ত চাইল,“আপনাকে ক্ষমা করার কোনো কারণ ছিল না।”
হাতের ইশারায় আমার বুকে লেপ্টে থাকা কিশোরী বাচ্চা মেয়েটাকে দেখিয়ে বলল,“ওর সামনে আমি কি করে মুখ দেখাব। ছিঃ!”
ইমরান কাতর চোখে শুধু দেখল রমণীকে। নে’শা বড় ভ’য়ংকর জিনিস। সে যেই নে’শায় হোক না কেন! নারীর প্রতি নে’শাও ইমরানের কম ছিল না বটে। বোধহয় চাচার স্বাভাব পেয়েছিল। ইমরান বুঝতে পারছে তার দুনিয়ায় সময় শেষ। খুব কসরত করে র’ক্তাক্ত হাত জোড়া উঁচিয়ে শেষবারের মতো প্রেয়সীকে বুকে জড়াতে চাইল। কিন্তু আজ যে তার প্রেয়সী নি’ষ্ঠুর হয়েছে। তাই তো শুধু তাকিয়ে দেখল স্বামী নামক লোকটাকে। উপেক্ষা করল ইমরানের বাড়িয়ে দেওয়া হাত। বেশিক্ষণ হাত দু’টো স্থির রাখতে পারল না ইমরান। ধপ করে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল। ইমরানের ঠোঁটে রহস্যময় হাসি। পলি একই অনুভূতিহীন চোখে তাকিয়ে রইল। বুঝার চেষ্টা করল কিসের হাসি এটা? উপহাসের, নাকি মৃত্যু যন্ত্রণার, নাকি অপূর্ণতার? বুঝে উঠতে পারল না রমণী।
ইমরানের আয়ু ফুরিয়ে এলো বুঝি। নিজের সহধর্মিণীকে অস্ফুটে কিছু বলতে চাইল। পলিও শুনতে চাইল সে কথা। সে একটু ঝুঁকে পড়ল। ইমরান একদম নিভে আসা গলায় শেষ বারের মতো আর্জি জানিয়ে কাতর গলায় বলে উঠলো,
–“বল বউজান, আমার হয়েই থাকবে?”
–“আমি তো আপনার কোনোদিন ছিলামই না!”
ঠিক সেই লগ্নেই থমকে গেল আরও একটি পাপিষ্ঠের প্রাণ। নিভে গেল জীবনের প্রদীপ। ক্লান্তহীন চোখে নিস্তেজ প্রাণহীন দেহটির দিকে তাকিয়ে রইল রমণী। কি দেখছে সে? কি জানি! গভীর থেকে গভীর রাত। রাতের নিশাচরদের চাপা গুঞ্জন আরও গাঢ় হয়েছে। আর এই ঘরটিও গভীর নিস্তব্ধতায় ডুবে। চারপাশে ভারী নৈঃশব্দ্য। পলি ঠায় বসে আছে ইমরানের বি’ধ্বস্ত নিস্তেজ দেহের পাশে। হঠাৎ করেই দরজার কাছ থেকে মেয়েলি চিৎকার ভেসে আসে,
“আ..আমার দাদাভাই। আ..র..র’ক্ত….
অতর্কিত দৃষ্টি ঘুরাতেই দেখি ইতি রুমের ভেতরের এই নৃ’শংসতা দেখে চেতনা হারিয়ে মেঝেতে ঢেলে পড়েছে।
*
*
*
চৌধুরী বাড়ি কেমন যেন শুনশান হয়ে পড়েছে। আমার কাছে মৃত্যুপুরী মনে হচ্ছে। ইমরানের মৃত্যুর আজ সপ্তাহখানিক হয়ে গেল। তার মৃত্যুর পরদিনই মাহিন দেশে আসে। অতঃপর জুইকে নিয়ে ফ্রান্স ব্যাক করে। আমি শুধু বোকার মতো ওদের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। কি জানি হঠাৎ হয়ে গেল মেয়েটার। সেচ্ছায় রাজি হয়ে গেল মাহিনের সাথে যাওয়ার জন্য। যদিও মাহিন একান্তে জুইকে কিছু বুঝিয়েছে বোধহয়।
জুইকে নিয়ে যাওয়ার আগে মাহিন আমাকে বলে গিয়েছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে জুইকে নিয়ে আবার দেশে ফিরবে। এখন এমন অসুস্থ পরিস্থিতিতে জুই থাকলে মানসিকভাবে আরও অসুস্থ হয়ে পরবে। আর মানা করিনি আমি। যাক, চলে যাক। সকলে এক এক করে আমার থেকে দূরে চলে যাক। এসব বলে মনকে সান্ত্বনা দিলাম৷ তবে মন শান্ত আর হলো কই? কোথাও খুব শূন্যতা অনুভব করছি সর্বদা।
বাড়িতে মাত্র আমরা ছয়জন; আমি, পলি, মীরা, অসুস্থ ইতি, নোহা এবং আমার শ্বাশুড়ি। এই যে ভাই মরলো। তার লা’শ লুকিয়ে আমরা কবর দিয়েছি। সবকিছু এমন ভাবে ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে যেন কিছুই ঘটেনি! সব জেনেও ইফান বিডি মুখী হয়নি। একবারও ফোন করে কারো সাথে যোগাযোগ করে নি। অথচ সব খবর তার কাছে ঠিকই যাচ্ছে। সেদিন রাতে মীরা প্রাইভেট জ্যাটে ইমার্জেন্সি কানাডা থেকে বিডি ফিরেছে। কারণ ইফান জানত এমন কিছু হতে পারে। ইমরান কানাডার মিনিস্টারের সাথে হাত মিলিয়ে ইফানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছিল। ইফান তা জানতে পেরেই মিনিষ্টারকে খতম করেছে, সাথে তার সহযোগী ছেলের গল্পও খতম করেছে। সে চাইনি ভাইয়ের মুখোমুখি হতে। যদি হতো, তবে নিশ্চয়ই ইমরানকে দুনিয়াতেই জাহান্নাম দেখিয়ে ছাড়ত।
কিন্তু ইফান পারেনি। সকলের অগোচরে আমি ছাড়া তার আরও একটি বড় দুর্বলতা আছে। সে আর কেউ নয়। তার জন্মদাত্রী। নাবিলা চৌধুরীর কাছে সে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিল। মায়ের অনুরোধ নিজের দুটো ভাই-বোনকে যেন দূর থেকে হলেও আগলে রাখে। ইফান ফেলতে পারেনি সেই অনুরোধ। তাই তো ইমরানের অনেক ছোট-বড় অপরাধ অনেকবার ক্ষমা করে দিয়েছে। কিন্তু একবার যদি বুঝতে পারত ইমরানের আসল রূপ, তাহলে বোধহয় ক্ষমা শব্দটা তার জন্য হারাম হয়ে যেত।
–“কি এত ভাবছ?”
মেয়েলী কণ্ঠ কানে আসতেই দৃষ্টি ঘুরালাম। পাশে এসে দাঁড়িয়েছে মীরা। আমি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সংক্ষিপ্ত প্রত্যুত্তর করলাম,“কিছু না।”
বেলা এখন দুপুর গড়িয়েছে। আজকাল আমি সংসারের দিকে নজর দিয়েছি। এই যে এখন মা বাদে সকলকে খাইয়ে রান্নাঘর গোছাচ্ছি। কিন্তু মন থাকে বড়ই উদাস। পলিটার মলিন চেহারা দেখলেই বুকের ভেতর ব্যথা অনুভব হয়। এইটুকু বয়স, আর আজ সাদামাটা কাপড় পড়ে চোখের সামনে ঘুরে। তার নামের সাথে লেগেছে বিধবা তকমা। মেয়াটা অনেক শান্ত হয়ে গেছে। সারাদিন খুঁজে খুঁজে কাজ বের করে। অতঃপর সেটা নিয়ে ব্যস্ত থাকে। আর শাশুড়ী মা! তিনি এখন অফিসে যান না। বিজনেসের সকল দায়িত্ব এখন বাড়ির বড় মেয়ে মীরা চৌধুরী সামলে যাচ্ছে। আর তাকে পিছন থেকে সাপোর্ট দিচ্ছে দুই ভাই।
সেদিন রাতে ইতির চিৎকার শুনে তিনি ছুটে আসেন উপরে। আর রুমের বিভৎস দৃশ্য দেখে জ্ঞান হারান। তারপর এই কদিনে নাবিলা চৌধুরীর থেকেই জানতে পারলাম এতদিনের লুকায়িত আসল সত্যি কথাগুলো। ইমরান চৌধুরী আর কেউ না, আমার একমাত্র ফুফি জেসমিন শেখের একমাত্র ছেলে। যাকে জন্ম দেওয়ার পর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। নাবিলা চৌধুরী সেদিন হাসপাতালে যায় জেসমিনের সাথে বোঝাপড়া করতে। কিন্তু গিয়ে দেখেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক দৃশ্য। তিনি পৌঁছাতে বড্ড দেরি করে ফেলেছিলেন। ততক্ষণে ঘা’তক ভুল বি’ষাক্ত ইনজেকশন পুশ করে দেয় জেসমিনের দেহে। জেসমিনের প্রাণ যায় যায় এমতাবস্থায় নাবিলার উপস্থিতি। জীবনের অন্তিম পর্যায়ে এসে আপন একজনকে দেখে ইশশ কি যে বড্ড খুশি হয়েছিলেন তিনি! খুশিতে চোখের পানি ছলছল করেছিল। নাবিলা চৌধুরীর হাতে ধরে মাপ চান তিনি। নাবিলা চৌধুরীর সকল ক্ষোভ তার আগেই গলে পড়ে বান্ধবীর এহেন হাল দেখে। জেসমিন নিজের অনিচ্ছাকৃত কাজের জন্য তখন অনুতপ্ত। শেষ অনুরোধ করেন যেন ছেলেটাকে নিজের সন্তানের মতো মানুষ করে। নাবিলা যেন সব কিছু ভুলে নিজের সন্তান মনে করে এই নবজাত শিশুটিকে। তারপর পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন জেসমিন শেখ। নাবিলা বাচ্চাটিকে বুকে টেনে নেয়৷ নিজ সন্তানের শূন্যতা পূরণ করে তাকে দিয়ে। কখনো পরের ছেলে ভাবে নি। তবে হৃদয়ে গভীর ক্ষত পুষে যাচ্ছিলেন।
সেই ছেলেটা এখন কি করে এত পর হয়ে গেল কল্পনা করতে পারেন না নাবিলা চৌধুরী। সে কি কখনো অবহেলা করেছে ইমরানের প্রতি? কই নাবিলা চৌধুরী মনে করতে পারেন না! হ্যা তবে আর পাঁচজন সাধারণ মহিলার মতো এতো হাস্যোজ্জ্বল ছিলেন না। যার কারণে বোধহয় ছেলে ভেবে নিয়েছে মা অবহেলা করেছে তার প্রতি। নাবিলা চৌধুরীর মন বড্ড বেশি আহত আজ। প্রথমে নিজ সন্তানের সাথে দূরত্ব, তারপর পাপিষ্ঠ স্বামী বেঁচে আছেন এই আশা ত্যাগ করেছেন বুকে পাথর চাপা দিয়ে। আর আজ আরেকটা সন্তান হারা হলো। আসলেই কি তিনি বড্ড খারাপ মানুষ? না তিনি আসলে খারাপ মানুষ না। তিনি ভাংচুর হৃদয়ের মানুষ। দিক শূন্য, সর্বহারা একজন নারী।
আজ খুব অনুভব করি পৃথিবীতে আমি একাই দুঃখী ছিলাম না। খোঁজ নিলে আরও আহত ক্ষ’তবিক্ষ’ত মনের সন্ধান মিলবে।
–“ভাবি, তুমি ঠিক আছ?”
ফের মীরার গলা শুনে সংবিৎ ফিরল। উদাস ভঙ্গিতে বললাম,“আমি ঠিক আছি। কিছু লাগবে তোমার?”
মীরা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,“ভাইয়ের সাথে তোমার ক…
আমি আরেকদিকে গিয়ে প্লেটে নাবিলা চৌধুরীর জন্য খাবার বাড়তে বাড়তে বললাম,“অন্য কোনো কথা বলার থাকলে বল।”
–“জারা কি হয়েছে আবার? ভাইয়ের সাথে কথা বলছ না কেন? তুমি জান সে এখনই দেশে আসবে না। এমনিতেই ঝামেলা চলছে, এখন দেশে আসলেই আরও ঝামেলা হবে। এরমধ্যে তুমিও কেমন করছ! ভাই বলল তোমার ফোন নাকি বন্ধ?”
–“মীরা ভালো লাগছে না এসব নিয়ে কথা বলতে।”
মীরা ফুস করে তপ্তশ্বাস ছাড়ল। আমি শান্ত গলায় শুধালাম,“কিছু লাগলে বল, করে দিচ্ছি।”
–“নো থ্যাংক্স। আমিই কফি বানিয়ে নিতে পারব। তুমি খেলে তোমার জন্যও…
–“ভালো লাগছে না গো। তুমি থাক, আমি গিয়ে মাকে খাবার দিয়ে আসি।”
–“ওকে যাও।”
আমি হাতে খাবারের প্লেট নিয়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে গেলাম। মীরা আমার যাওয়ার পানে হতাশার দৃষ্টিতে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।
________
মীরা নিজের জন্য এক কাপ ধোঁয়া ওঠা কফি বানিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিজ রুমের উদ্দেশ্য হাঁটা ধরল। ড্রয়িং রুম থেকে মীরার ছায়া আড়াল হতেই দেয়ালের আড়াল থেকে মাথা বের করল ইতি। পরপরই পিছন থেকে মাথা বের করে ড্রয়িং রুমে উঁকি দিল নোহা। আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি, তার মাথা ছোট্ট একটা স্কার্ফ দিয়ে ঢাকা। ইতি চারপাশে নজর বুলিয়ে চাপা স্বরে বলল,
–“নোহা আপু কেউ নেই। এই সুযোগ।”
নোহা হিসহিসিয়ে বলল,“ঠিকই বলেছ লিটিল গার্ল।”
থেমে নোহা হিসহিসিয়ে ইতিকে শুধালো, “কিন্তু আমরা কোথায় যাচ্ছি লিটিল গার্ল?”
ইতি পরনের মেরুন কালার গাউন জামার উপর গলায় ঝুলানো ওড়নাটা দিয়ে মাথায় পেচিয়ে নিল। চারিদিকে সতর্কতার দৃষ্টি বুলিয়ে নোহাকে ফিসফিস করে বলল,“বলবো, তবে এখানে বলা যাবে না। স্টার জলসার সিরিয়ালগুলোতে দেখনি, দেয়ালেরও কান আছে?”
নোহা বিচক্ষণ মানুষের মতো মাথা নাড়িয়ে বলল,“ঠিক বলেছ লিটিল গার্ল।”
অতঃপর তারা সতর্ক দৃষ্টি বুলিয়ে দেয়ালে আড়াল থেকে বেরিয়ে আসল। কি বিস্ময়কর বিষয়! নোহার মাথা স্কার্ফ দিয়ে ঢাকা, অথচ গায়ে পরনে ডিজাইন করা নেভি ব্লু রঙা টপ শার্ট এবং নিচে জিন্সের শর্ট প্যান্ট। টকটকে ফর্সা পা জোড়া তার সম্পূর্ণ উন্মুক্ত। কি অদ্ভুত মেয়েরে বাবা!
এরইমধ্যে ইতি আর নোহা সকলের অগোচরে চুপিচুপি বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।
চলবে,,,,,,,,
কত বড় পর্ব দিয়েছি! এটা ভাগ করে তিনটা দেওয়া যেত
যাইহোক তাড়াহুড়ো করে লিখেছি ভুল ত্রুটি থাকলে ধরিয়ে দিয়েন, পরে এডিট কটে দিব। আর যারা পড়ছেন সকলে রিয়েক্ট কমেন্ট করে দিয়েন কিন্তু। দ্রুত রেসপন্স আসলে লিখার প্রতিও আগ্রহ পাই। তখন দ্রুত নতুন পর্ব দিয়ে দিই। তাই সকলে বেশি বেশি রেসপন্স করবে ওক্কে।
Share On:
TAGS: জান্নাত মুন, জাহানারা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
জাহানারা পর্ব ৪৯+৫০
-
জাহানারা পর্ব ১৭+১৮
-
জাহানারা পর্ব ২৩+২৪
-
জাহানারা পর্ব ৬৭+৬৮
-
জাহানারা পর্ব ৩৭+৩৮
-
জাহানারা পর্ব ৭৪
-
জাহানারা পর্ব ৩
-
জাহানারা পর্ব ৪
-
জাহানারা পর্ব ১৫+১৬
-
জাহানারা পর্ব ৫৯+৬০