Golpo romantic golpo জাহানারা

জাহানারা পর্ব ৮৫


#জান্নাত_মুন

পর্ব :৮৫

🚫ক’পি করা নিষিদ্ধ

🔞 সতর্কবার্তা:

এই গল্পে অ’কথ্য ভাষা এবং স”হিং’সতার উপাদান রয়েছে। ১৮ বছরের কম বয়সী বা সং’বে’দনশীল পাঠকদের জন্য উপযুক্ত নয়। পাঠক নিজ দায়িত্বে পড়বেন।

আমি বিছানার মাথায় ঠেস দিয়ে বসে ঝিমচ্ছি। আমার একটা হাত পাশেই শুয়ে থাকা জুইয়ের মাথায়। এই বাড়িতে আসার পর থেকে আমার সাথেই দিনরাত্রি যাপন করছে। সারারাত ঝটপট করে অস্থির হয়ে থাকে। জগন্নিদ্রা যেন জুইয়ের নেত্রপল্লব হতে পালিয়েছে। বোনের এই বিষাদের অমাবস্যায় আচ্ছাদনকৃত চেহারা দেখে সেই সাথে আমার ঘুমও নয়ন হতে ছুটে। কোনো এক অজানা ভয় কিশোরী সপ্তদশীকে ঘুমের মধ্যেও তাড়া করে বেড়ায়। আমি তার এই মিইয়ে যাওয়া চেহারায় স্পষ্ট আতংক, ভয় এবং অজস্র কষ্টের তীব্র ছাপ দেখতে পাই। তাই আমার সারারাত একমাত্র আদুরে বোনের সাথেই নিদ্রাহীন কেটে যায়। চোখের সামনে অবেলায় খেলা করতে থাকে ফেলে আসা সোনালী স্মৃতিরা। যারা এখন সময়ের অগ্রসরে জীবন থেকে ছুটি নিয়েছে।

রাতে ঘুম হয় না বলে প্রতিদিন দিনের বেলায় জুইকে নিয়ে বিছানায় শরীর ঠেকাই। সারারাত অনিদ্রাই থাকায় ক্লান্ত দেহ এবং অবসন্ন মন ঘুমের অতলে তলিয়ে যায়। আমার সান্নিধ্য এবং আশ্বাস পেয়ে জুইয়ের নেত্রপল্লবেও এসে হানা দেয় রাজ্যের ঘুম। সেই ঘুমন্ত চেহারায় ক্ষণে ক্ষণে প্রতিচ্ছবিত হয় আকাশের গূঢ় কালো মেঘ। যেন এটা ঘুম নয় মরিচীকার অতলে ধীরলয়ে ডুবে যাওয়া। তখন আদুরে ঘুমন্ত মুখখানা অসহায়ত্বের ন্যায় নিঃশব্দে আকুতি করে উঠে, এই যন্ত্রণার চোরাবালিতে আমি ডুবে যাচ্ছি, বাঁচাও আমায়। জুইয়ের মাথায় বিচরণ করা আমার হাতখানা নিঃশব্দে অভয় দেয়, আমি আছি তোমার পাশে। কিছু হতে দেব না তোমার। আর এই ভরসাটুকুই যেন কিশোরীকে আশ্বাস দেয়।

আমি আদুরে বোনটার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিলাম। সহসা যেন তার সরল পবিত্র মুখাবয়বের কালো অশরীরী ছায়া সরে হাস্যোজ্জ্বল হয়ে উঠল। ক্ষণিকের তোরে ফের মলিন চেহারা ঢাকা পড়ল বিষাদের আচ্ছাদনে। বুক ছিঁড়ে বেরিয়ে আসল দীর্ঘশ্বাস। সোজা হয়ে বসতে যাব তখনই চোখ আটকে গেল ইতির ঘুমন্ত চেহারার পানে। জুইকে পাওয়ার পর থেকেই সারাদিন এই ঘরে এসে বসে থাকে। জুই ঘুমালে সেও পাশে শুয়ে পাড়ি দেয় ঘুমের রাজ্যে। ইতির পুতুল বরণের মুখচ্ছবি দেখলে মনে হয় পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সুখী মানুষকে দেখতে পারছি। ঘুমের মধ্যেও তার চেহারায় সুখের আভা স্পষ্ট। বোধহয় ঘুমপুরীতে ডুবে রঙবেরঙের স্বপ্ন বুনছে। তার অজান্তেই ঠোঁটে লেগে থাকে মিষ্টি হাসির রেশ। যেন প্রত্যুষ্যের মিহি সোনালি আলো খেলা করছে। আমি হাত বাড়িয়ে ইতির মাথায় একবার আদুরে স্নেহের পরশ বুলিয়ে দিলাম। এতে যেন তার চেহারার ঔজ্জ্বল্য আরও বেড়ে গেল। মাঝেমধ্যে সাধ জাগে ইতি আর নোহার মতো নির্বোধ হতে। জগৎ সংসার নিয়ে তাদের নেই কোনো চিন্তা চেতনা, আর না আছে দুঃখ-কষ্ট। তারা মেতে থাকে তাদের এক বোকার জগতে।

জুই যেন আমার ঘরে নুর হয়ে হানা দিয়েছে। একজোড়া রাতপাখি যখন অন্ধকার প্রেমী হয় তখন চারপাশ আধারে নিমজ্জিত হয়। আমার আর ইফানের এই ঘরটাও এক সময় মহাকর্ষের ব্ল্যাকহোলের মতোই দিনরাত আধারের কালো ছায়ায় ঢাকা থাকত। আর এখন রুমের প্রতিটি দরজা জানালা খোলা থাকায় ফিরকি দিয়ে সূর্যের সোনালি রশ্মি হুড়মুড়িয়ে ঘরের অন্দরে প্রবেশ করে। মেঝের সাদা মার্বল পাথরের টাইলস, ঘরের বিলাসবহুল প্রতিটি নান্দনিক আসবাপত্র সেই রোদ্দুরের আলোয় নিজেদের সবটুকু সৌন্দর্য বিলিয়ে অত্যন্ত দীপ্তমূর্তি ধারণ করে। যেন সোনালি আলো একটি স্বচ্ছ কাচ ছুঁইয়ে বিচ্ছুরিত হয় আরেকটি আসবাপত্রের উপর। আর সৃষ্টি করছে আলোকরশ্মির এক জাঁকজমকপূর্ণ খেলা।

আনমনে ভাবতে গিয়ে একদম হুট করেই ইচ্ছে জাগল এই স্বর্নালোয় গা ভাসানোর। বিষাদে ঢাকা মনের হঠাৎ এহেন সাধ সহসা অগ্রাহ্য করতে পারলাম না। এক পলক ঘুমন্ত জুইয়ের চেহারা দেখে বিছানা ছাড়লাম। ক্লান্ত দেহের ভার পায়ে ছেড়ে হেলেদুলে এসে দাঁড়ালাম বেলকনিতে। এক লহমায় আমার চোখ দুটোতে বিস্ময় খেলে গেল। আজকের আকাশ আর এই চিরহরিৎ প্রকৃতি বিগত কিছুদিনের চেয়ে একদম ভিন্ন। উহু! বিগত কিছু দিন নয়, বরং বহুদিন পর আজ প্রকৃতি নিজের রূপের লুকায়িত সৌন্দর্যের এক অনিন্দ্য বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে। নীলাকাশে শুভ্র ঘন মেঘেদের লুকোচুরি খেলা চলছে। সেই মেঘালয়ের বুক ছিঁড়ে পৃথিবীতে আঁচড়ে পড়ছে অবাধ্য স্বর্ণালো। চৌধুরীদের বিশাল বাগান ভর্তি বাহারি গাছের চূড়ায় এসে ঠিকরে পড়ছে আলোকরশ্মির একেকটি গুচ্ছ।

আমার বেলকনিও আজ অন্য রুপ ধারণ করছে। বিকালের এই অসময়ে সূর্যের সোনালী আলোর এমন চাকচিক্য সত্যি চোখ ধাঁধানো। আজকের এই আলোয় কোনো রুক্ষতা নেই। আছে একরাশ কোলমতা। দক্ষিণ দিক থেকে ধেয়ে আসছে ফুরফুরে শীতল হাওয়া। গা ছুঁয়ে দিতেই অদ্ভুত প্রশান্তি লাগছে। চিরহরিৎ প্রকৃতির এই রপ দেখে আমি ভীষণ আপ্লূত হয়ে পড়লাম। রেলিঙ ধরে আবেশে চোখ বন্ধ করে নিলাম। তবে হঠাৎ প্রকৃতি এমন রূপ নিল কেন? নাকি কোনো ছলনায় মেতেছে? মনের কোণে প্রশ্ন জাগল। তবে এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার সময় করে উঠতে পারলাম না। বাগানের বাহারি রঙবেরঙে ফল ফুলের মিষ্টি সুঘ্রাণে মাতোয়ারা চারপাশ। তবে সকল সুঘ্রাণ ছাপিয়ে খুব কাছ থেকে নাকে এসে আঁচড়ে পড়ছে অতি মিষ্টি এবং স্নিগ্ধ একটা সুবাস। সেই সুঘ্রাণ কিসের তা বুঝতে আমার এক মূহুর্ত সময় ব্যয় হলো না। আমি ধীরলয়ে চোখ মেলে তাকালাম। ঘাড় পাশে ঘুরাতেই নজরে আসল বেলকনির এক কিনারে টবে লাগানো টাইগার লিলি ফুল গাছটির দিকে। এই ফুল সারাবছর ফুটে না। তবে এখন এই ফুল ফোটার সিজন চলছে। আমি এগিয়ে গিয়ে ফুলের টবটির ধারে বসলাম। হাত দিয়ে একটি ফুল ছুঁইয়ে মুখ এগিয়ে নিয়ে সবটুকু মিষ্টি এবং স্নিগ্ধ খুশবু নিজের ভেতরে নিয়ে নিলাম। সহসা অদ্ভুত এক অনুভূতি হলো। মনে হলো আমার ব্যক্তিগত পুরুষটি আমার খুব কাছে অবস্থান করছে। আচমকা আশেপাশে দৃষ্টি ঘুরালাম। কেউ নেই, স্রেফ মতিভ্রম।

এই চৌধুরী বাড়িতে শুধুমাত্র আমার রুমের এই বেলকনিটি আমার একমাত্র প্রিয় স্থান। আর এই প্রিয় স্থানেই ভীষণ প্রিয়জনের স্মৃতিগুলো স্মরণ করি। আমি সঠিক জানি না! তবে আমার কেন মনে হয় ইফান জেয়লাস ফিল করে এই বিষয় নিয়ে। আমার সব কাজে বাঁধা দিলেও কখনো এখানে আসায় বাঁধ হয়ে দাঁড়ায় না। আর না আমার ভ্রমে বুড়ো আঙুল ঢোকায়। তবে আমার ভাবনায় তিনি ছাড়া অন্যকেউ আসলে ইফান যে তার কি অবস্থা করত ভাবলেই দেহে কাটা দিয়ে উঠে। তপ্তশ্বাস ছেড়ে ফের মন দিলাম ফুলের দিকে৷ কি চমৎকার উজ্জ্বল কমলা রঙের ফুল ধরে আছে থোকায় থোকায়। এই ফুল ইফানের বড্ড বেশি প্রিয়। এতটাই প্রিয় যে তার বাহুতে আমার অর্ধ মুখাবয়ব ট্যাটু সংলগ্ন কালো ধূসর কালিতে এই ফুলের ট্যটু এঁকেছে। ঠিক তার পরেই গোটা গোটা ফরাসি অক্ষরে কিছু লেখা। কেন জানি আমার মনে হয় সে ঈর্ষা থেকেই এই ফুল গাছের টবটি এখানে এনে রেখেছে। যেন সে না থাকলেও তার উপস্থিতি এই ফুল গাছ জানান দেয়। এমনকি বাড়িতে সে থাকলে এই গাছের যত্নও নিজ হাতে করে। আজ এতদিন ধরে লোকটা নেই। বাড়ির মালিই সব দেখে। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে তারা ইফানের মতো যত্ন নিচ্ছে না! মনে মনে ঠিক করে নিলাম এবার থেকে ইফানের অবর্তমানে আমিই এই টবের যত্ন নিব। ভাবতে গিয়ে হঠাৎ থমকালাম। কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে দ্রুত পায়ে ঘরের দিকে অগ্রসর হলাম।

ড্রেসিং টেবিলের বিশালকার মিররের সামনে দাঁড়িয়ে আছি আমি। মিররের স্বচ্ছ কাচে আমার প্রতিচ্ছবি ভাসছে। আমি সেদিকে তাকিয়ে ঠোঁটে ডার্ক রেড লিপস্টিক লাগালাম। অতঃপর যত্ন করে কপালের মধ্যেখানে একটা ছোট্ট কালো টিপ পরে নিলাম। কানে এক জোড়া ঝুমকো পরে আলগোছে কোমর ছাড়ানো দীর্ঘ কেশরাশিগুলো কাঁধের একপাশে সামনে এনে রাখলাম। অতঃপর মিররে নিজের অবয়ব দেখে নিলাম। অজান্তেই অধরে ধরা দিল এক টুকরো লাজুক হাসি।

শেষবার নিজেকে আপাদমস্তক দেখে পরখ করে নিলাম। অতঃপর বেড সাইড টেবিল থেকে মুঠোফোন হাতে বের হয়ে আসলাম বেলকনিতে। টব গাছটি থেকে একটি টাইগার লিলি ফুল ছিড়ে কানে গুঁজে নিলাম। তারপর বেশ কয়েকটি ছবি ক্লিক করে নিলাম। গ্যালারিতে সবচেয়ে ভালো পিকটি খুঁজতে গিয়ে নজর কাড়ল রেলিঙে হাতের কনুই ভর করে বাম গালে হাত রাখা পিকটিতে। ছবিটি ক্লিক করার সময় সূর্যের তীর্যক স্বর্ণালো চোখমুখে আঁচড়ে পড়ায় আচমকা চোখ বন্ধ করে ফেলেছিলাম। যার কারণে ছবিতে আমার ঘন কালো পাপড়িযুক্ত নেত্রপল্লব দুটো বন্ধ। অধরে মুচকি হাসি লেগে থাকায় বাম গালে সুক্ষ্ম খাঁজের সৃষ্টি হয়েছে। সূর্যের ঝলকানিতে আমার চেহারায় দ্যুতি ছড়াচ্ছে। কানে গুঁজে রাখা কমলা রঙের ফুলটিও আরও গূঢ় হয়ে ঝলমল করছে। ছবিটি সবগুলো থেকে বেশি ভালো লাগল তাই এটাকেই সিলেক্ট করলাম। অতঃপর হোয়াটসঅ্যাপে মি. মাফিয়া নামে সেইভ করে রাখা ইনবক্সে ঢুকে হাই মেসেজ লিখে সেন্ড করলাম। কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলাম উত্তরের আশায়। কিন্তু কোনো উত্তর আসল না। সহসা আমার চেহারা মলিন হয়ে গেলো।

ইফানের নির্দিষ্ট কোনো ফোন নাম্বার নেই। বলতে গেলে প্রতিনিয়ত ফোন নাম্বার চেইঞ্জ করে। তবে এই নাম্বারটি ইফানের একদম ব্যক্তিগত। হাতেগোনা কজন ছাড়া কেউ জানে না। কিন্তু ইফান বড্ড বেশি হার্টলেস! যতবারই দেশের বাইরে যায় ততবারই আমার সাথে যোগাযোগ করে না। অথচ আমার সকল খোঁজই তার কাছে থাকে৷ তবে কেন আমার সাথে যোগাযোগ করে না? ও কি জানে না আমি তাকে নিয়ে কত চিন্তায় থাকি? প্রতিবার স্বেচ্ছায়তার খোঁজ নিব না বলেও শেষ মূহুর্তে হার মানি। এই যেমন আজকেও নিজেই তাকে মেসেজ দিলাম।

মনের প্রশ্নগুলো মনেই অভিমান হয়ে জমা হলো। মনটা খুব ভার হয়ে গেল। এদিকে দূরে কোথাও গানের আসর জমেছে। এত তীব্র ডিজে বিটের শব্দে চোখমুখে বিরক্তির ছাপ ভেসে উঠল। আমি আবার নজর বোলালাম ফোনে। এখনো মেসেজ সিন করেনি। আমি সিলেক্ট করা পিকটি পাঠিয়ে দিলাম। ছবিটি সেন্ড হতে হতে দম বন্ধ হয়ে এলো। বুকের ভেতর ধকধক করে আওয়াজ হচ্ছে। মনে হচ্ছে হৃদযন্ত্রটি বেরিয়ে আসার উপক্রম। নিজের অস্থিরতা মোচন করতে চোখ খিঁচে নিলাম তৎক্ষনাৎ। একটু সময় নিয়ে নিজেকে ধাতস্থ করে চোখ মেলে তাকালাম। সহসা বুক ছিঁড়ে দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে আসল। ইফান এখনো মেসেজ সিন করেনি। হাহ্!

_______________

অটোয়া, কানাডা।।

মধ্যরাত হওয়ায় সারা শহর নিস্তব্ধতায় ছেয়ে আছে। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বিলাসবহুল বাসভবন ঘিরে এখনো টহল দিচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। হঠাৎ করেই সকল আলো নিভে চারপাশ অন্ধকারের চাদরে ঢাকা পড়ল। অসময় লোডশেডিং এর কারণ ঠাহর করতে পারছে কেউ। তবে বিপদের পূর্বাভাস পেয়ে সকলে সচকিত হয়ে পড়েছে। দ্রুতদমে প্রস্তুতি নিচ্ছে বৈদ্যুতিক সংযোগ ঠিক করার জন্য। কিন্তু কেউই আন্দাজ করতে পারল না লোডশেডিং হওয়ার সাথে সাথেই তাদের সকলের অগোচরে দুটো বিশালাকৃতির অশুভ ছায়া অন্দরমহলে ইতোমধ্যে প্রবেশ করেছে। পাঁচ-সাত মিনিটের মাথায় সেই অশুভ ছায়া দুটো অতি সুক্ষ্ম কৌশলে সেখান থেকে বের হয়ে এসেছে। অতঃপর আর এক মূহুর্ত সময় ব্যয় না করে দ্রুত কদমে সেখান থেকে প্রস্থান করল তারা।

আকাশে চাঁদের দেখা নেই। কালো মেঘ গুড়গুড় করছে সেথায়। আজ ভারী বৃষ্টি কিংবা তুষারপাত হলেও হতে পারে। অদূরে দাঁড়িয়ে আছে তিনটি বাইক এবং একটি জিপ গাড়ি। সেখানে আড়ালে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সশস্ত্র ভেনম গার্ডস। নিজ বাইকের সামনে দাঁড়িয়ে মীরা। তার পাশেই ইনান। দু’জনেই কালো দিয়ে আপাদমস্তক ঢেকে রেখেছে। মীরার বাইকের সিটে একটি ল্যাপটপ। এতক্ষণ দু’জন সেদিকেই দৃষ্টিপাত করছিল। মূলত মীরা আশেপাশে সিসিটিভি সহ সকল নেটওয়ার্ক এবং বৈদ্যুতিক সংযোগ নিজেদের আয়ত্তে নিয়ে নিয়েছে। অপর পক্ষ থেকে সিগন্যাল আসতেই ল্যাপটপ বন্ধ করে দুজন চোখাচোখি করল। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই দেখল অন্ধকার ভেদ করে দ্রুত এগিয়ে আসছে বিশালাকৃতির দুটো কালো ছায়া। তাদের বুঝতে বাকি রইল না এরা কারা?

ইফান এবং মাহিন কাছে আসতেই মীরা উদগ্রীব হয়ে শুধালো, “অল রাইট?”

–“ইয়াহ্।”

মাহিন শব্দটি আওড়ে একে-অপরের সাথে ফিস্ট বাম্প করল। ইফানও মীরার সাথে ফিস্ট বাম্প করল। কালো পোষাকে আবৃত সারা দেহে শুধু তার ধূসর বাদামী নেত্রপল্লব দু’টোই দৃশ্যমান। সেই চোখ দু’টোতে খেলা করছে শ্লেষাত্মক হাসি। সে হিসহিসিয়ে বলে উঠলো,

–“মেকিং অ্যান এনেমি অব মি. ভি মিন্স টার্নিং ইয়োর লাইফ ইনটু হেল। ফা”কিং মিনিস্টার।”

শেষ শব্দটি চিবিয়ে অস্ফুটে আওড়াল। আচমকা অদূরের পুরো ইউনিট জুড়ে রেড সিগন্যাল বেজে উঠল। সহসা শুরু হয়ে গেল হাঙ্গামা। চতুর্দিক টর্চ লাইটের আলোয় ঝলমল করে উঠেছে। ভেনম গার্ডসদের সাথে ইতোমধ্যে গো’লাবর্ষণ শুরু হয়ে গেছে। বুলেটের তীব্র শব্দ আর বারুদের ঝাঁজালো গন্ধে মূহুর্তেই চারপাশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে। সকলে সেদিকে দৃষ্টিপাত করতেই লক্ষ্য করল অন্ধকার ভেদ করে আলো এদিকে আসছে। সাথে তীব্র গতিতে একের পর এক বুলেট ধেয়ে আসছে। আচমকা একটা বুলেট মীরার দিকে আসতেই ইফান থাবা মেরে মীরাকে সরিয়ে দিল। অপর হাতে কোমরে গুঁজে রাখা রিভলবার বের করে অন্ধকারে শুট করে দিল৷ সহসা ভেসে আসল গগণ কাঁপানো আ’র্তনাদ। এদিকে ছুটে আসা বুলেট ইফানের হাতের উল্টো পিঠ ঘেঁষে চলে গেছে। ইফান ভ্রুক্ষেপ না করে ইনানের উদ্দেশ্য বলে উঠল,

–“ইনান, টেক অল দ্য গার্ডস অ্যান্ড মুভ টু দ্য আদার সাইড।”

বসের আদেশ পেতেই ইনান গার্ডসদের ইশারা করল। মূহুর্তেই সকলে গো’লাবর্ষণ থামিয়ে হুড়মুড়িয়ে জিপে চড়ে বসল। চোখের পলকে ইনান জিপ নিয়ে অন্ধকারে হারিয়ে গেল। ইফান তার দুপাশে মাহিন মীরাকে ইশারা করতেই সকলে মাথায় হেলমেট পরে বাইকে উঠে বসল। ইফান হ্যান্ডেলবারে হাত রাখতে যাবে তক্ষুনি লক্ষ্য করল হাতে র”ক্তক্ষরণ হচ্ছে। আঁধারের মধ্যেও ইফানের চোখ দুটো তীব্র ক্রোধে র’ক্তাভ হয়ে জ্বলে উঠল। ধারালো চোয়াল ইস্পাতের ন্যায় শক্ত হয়ে গেল সহসা। ইফান ঘাড় কাথ করে পিছনে তাকাতেই দেখল গো’লাবর্ষণ করতে করতে বাহিনীরা ছুটে আসছে৷ ইফান সেদিকে দৃষ্টিপাত করেই অ’শ্রাব্য ভাষায় বিড়বিড়ালো,

–“মাদারফা”কার!”

অতঃপর ঝড়ের বেগে সামনের দিকে ছুটে গেল তিনটি বাইক। পিছনে রক্ষাবাহিনিও কয়েকটা গাড়ি নিয়ে ওদের পিছু ছুটল। ঐ এরিয়া থেকে অনেকটা দূরে আসার পরও তাদের পিছু ছাড়ছে না বাহিনীরা। একের পর এক বুলেট ইফানদের দিকে ধেয়ে আসছে। ইফানরা কখনো ঘাড় কাঁধ করে, তো কখনো দুপাশে হেলে বুলেট গুলোকে লক্ষ্যচ্ছুৎ করছে। এক পর্যায়ে ইফানের ইশারা অনুযায়ী তার দু’পাশের মাহিন মীরা দু’দিকে রাস্তা ধরল। ইফান সোজা চলতে লাগল। আর কিছুক্ষণ পরই রক্ষাবাহিনিদের চোখের আড়াল হয়ে গেল।

______

আকাশে তীব্র গর্জন হচ্ছে। সেই সাথে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। ইতোমধ্যে তুষারপাত শুরু হয়েছে। চারদিকে তুমুল বাতাস বইয়ে। ভালোই ঠাহর করা যাচ্ছে আজ ঝড় হবে। যেদিকে চোখ পড়ে সবটাই অন্ধকারে নিমজ্জিত আর জনমানবশূন্য। ইফান মেইন রোড ছেড়ে শহরের অনেকটা ভেতরে চলে এসেছে। তবে এরূপ তুষারপাতের কারণে আর এগুনো সম্ভব নয়। এসবের মধ্যে হঠাৎই ভারী বর্ষণ নামল। সেই সাথে তীব্র বজ্রপাত। ইফান সচকিত দৃষ্টিতে আশেপাশে চোখ ঘুরাতেই লক্ষ্য করল একটি রেড টেলিফোন বুথ। আর সময় অপচয় না করে বুথের ভেতরে প্রবেশ করলো। তারপর কুচকুচে কালো লং কোটের হুডটা মাথা থেকে সরিয়ে নিল সে। আলগোছে চুলগুলো পেছনে ঠেলে দিয়ে মাথা ঝাঁকাতেই কেঁপে উঠল তার প্রশস্ত কাঁধ। মুহূর্তেই জমে থাকা শুভ্র তুষারকণাগুলো পোশাক হতে ঝরে পড়ল নিচে। আকাশের বিদ্যুৎ ঝলকানিতে মনে হলো মাটিতে অজস্র শ্বেতশুভ্র ফুল ফুটে আছে।

ইফান মুখ থেকে মাস্ক খুলে বুথে হেলান দিয়ে বসল এক পা ভাজ করে এবং এক পা সোজা করে। চোখ বন্ধ করে বুক ফুলিয়ে শ্বাস নিল। বিদ্যুৎ চমকানোর সাথে সাথেই দৃশ্যমান হলো তার গম্ভীর অথচ শক্ত মুখাবয়ব। তার ধারালো চোয়াল যেন নীরবে স্বাক্ষী দেয় তার দাপটে ব্যক্তিত্বের। কপালে উষ্কখুষ্ক হয়ে পড়ে আছে কিছু চুলগুচ্ছ। ইফান র’ক্তাক্ত হাতখানা চোখের সামনে ধরতেই দাঁতে দাঁত পিষল। অতঃপর ভাজ করা পায়ের হাঁটুর উপর অবেলায় ঝুলিয়ে রাখল। সেখান থেকে টপটপ করে বিন্দু বিন্দু র’ক্ত নিচে পড়ছে। এসবে বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই ইফানের। তার দৃষ্টি বাইরে। পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে আজ সারা রাতই চলবে প্রকৃতির তান্ডব। ইফান প্যান্টের পকেট থেকে একটা সিগারেটের শলাকা বের করে ব্রাউন দু ঠোঁটের ভাজে গুঁজে তৎক্ষনাৎ দিয়াশলাই দিয়ে আগুন ধরিয়ে দিল। কয়েকটি সুখটান দিয়ে উপরে ধোঁয়া কুন্ডলী ছাড়ল। উরুতে ভেজা হাত মুছে পোষাকের ভেতর থেকে অ্যাপল ব্র্যান্ডের ক্ষুদ্র মুঠোফোন বের করে আনল। উদ্দেশ্য মাহিনকে ইনফর্ম করা। যাতে ঝড়বৃষ্টি থামার আগেই এই স্থান ত্যাগ করতে পারে।

ইফান বিরক্তি নিয়ে ফোন চালু করল। মূহুর্তেই বুলবুলির মেসেজের নোটিফিকেশন সবার প্রথম শো করল। নিমেষেই ইফানের চেহারার কাঠিন্যে কর্পূরের মতো উবে গেল। চোখ দু’টোতে জড়ো হলো একরাশ শীতলতা। ইফান এক মূহুর্ত থ হয়ে বসে রইল ফোনের দিকে তাকিয়ে। অতঃপর প্রথম মেসেজের রিপ্লাই করল,

–“হ্যালো।”

এইটুকু শব্দ টাইপিং করতে বেশ কিছুটা সময় লাগল তার। কেননা সে বাংলা লেখা এবং রিডিং পড়ায় খুব একটা পারদর্শী না। রিডিং পড়তে বেশ অনেকটা কসরত করতে হয় তাকে। আর টাইপিং করতে তার চেয়েও দ্বিগুণ পরিশ্রম হয়।

আমি বেলকনিতে প্রায় ঘন্টাখানিক ধরে অবস্থান করছি। ভালো লাগছে না কিছু। মুন চেয়ারে বসে ঝিমচ্ছি। হঠাৎই মেসেঞ্জারে নোটিফিকেশন আসার শব্দ কর্ণপাত হতেই ধরফরিয়ে উঠে বসলাম। ফোন টেবিলের উপর থেকে তুলে হাতে নিতেই ইফানের মেসেজ নজরে পড়ল। মূহুর্তেই চেহারার মলিনতা উবে গিয়ে খুশিতে চকচক করতে লাগল। ফোন হাতে নিয়ে ছুটে রেঙিল ঘেঁষে দাঁড়ালাম। কিবোর্ডে হাত চলেও যেন চলছে না। বুঝতে পারছি না কি লিখব! হাত দুটো হঠাৎ মৃদু কম্পিত হতে লাগল। গলাও শুকিয়ে এলো। চোখ দুটো বন্ধ করে নিজেকে ধাতস্থ করলাম। অতঃপর সব অভিমান ঢেলে সময় নিয়ে টাইপিং করলাম,

–“বালিকার হৃদয়ে মেঘ জমেছে, মি. মাফিয়া কি বুঝে না?”

মেসেজ সেন্ড হতেই সিন দেখাল। ফোনের অপর প্রান্তে ইফান তখন ঘোর লাগা তৃষিত নয়নে আমার পাঠানো ছবিটি দেখতে মগ্ন। এক হাতে ধরে রাখা ফোনের বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে ছবি জুড়ে স্পর্শ করতে লাগল। ফের মেসেজ আসায় আঙুলটি থামল। রিপ্লাই দেওয়ার জন্য টাইপিং করতে লাগল। আমি বিষয়টা খেয়াল করলাম। কিছুটা সময় নিয়ে ইফানের থেকে রিপ্লাই আসল,

–“তাহলে কি বালিকা চায় এই মাফিয়াটা তার মন আকাশে বাদল হয়ে নামুক?”

ইফানের মেসেজটা দেখামাত্রই বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডটা দ্রুত স্পন্দিত হতে লাগল। আমি আর কিছুই লিখে উঠতে পারলাম না। শুধু অসাড় হয়ে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইলাম। ইফান আমার থেকে কোনো প্রকার উত্তর না পেয়ে ফের ফোনে ঝলঝল করা ভাসমান ছবিটিতে তাকিয়ে রইল। হয়তো ছবিটার ওপর ও এমনভাবে দৃষ্টি বোলাচ্ছে, যেন প্রতিটি পিক্সেল পর্যন্ত খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। কিছুক্ষণ পরও যখন আমার রিপ্লাই পেল না তখন ইফান নিজেই লিখল,

–“ঠিক আছ তুমি?”

আবারও মেসেজটা সিন করার পরও আমার তরফ থেকে ইফানের কাছে কোনো জবাব পৌঁছাল না। এবার ইফানের চেহারা আরও নমনীয় হয়ে আসলো। তার চোখে-মুখে স্পষ্ট কিছুটা উদ্বীগ্নতা আর দুশ্চিন্তার ছাপ। সে পুনরায় সময় নিয়ে টাইপিং করে মেসেজ পাঠাল,

–“মাই সুইটহার্ট নাইটিংগেল, হোয়াট হ্যাপেন্ড?”

আমার চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে আসছে। উত্তর না করে ইফানের মেসেজের দিকে ছলছল নয়নে তাকিয়ে রইলাম শুধু। এদিকে এতক্ষণ যাবত সুদূর থেকে ভেসে আসা উগ্র সুর হঠাৎ বদলে আবেগঘন কোমল সুরে পরিণত হলো,

“মন আকাশে বৃষ্টি আসে রৌদ্র মেঘের জুটি,

আজ নতুন আলোয় আধার কালোর খুনসুটি।

হুম… ঝড়ের বেসে, এলো কেশে

কাজল সে চোখ দুটি।

দিলো কঠিন কথার বিষন্নতার ছুটি।…”

এক মূহুর্তে গানের কলি গুলো অভিমানী মনকে গভীরভাবে ছুঁইয়ে দিল৷ বুকের কোথাও একটা তীব্র হাহাকারের আবির্ভাব হলো। মন চাইছে ছুটে চলে যেতে তার নিকট। একটু জড়িয়ে ধরে তার বুকের উষ্ণতা অনুভব করতে। বুক ভরে সেই দেহের স্নিগ্ধ কোলনের ঘ্রাণ নিতে। আমি ফের মুখ ভার করে মনের সকল অভিমান আর আকুলতা ঢেলে বাংলিশে লিখে পাঠালাম,

–“জান তুমি কোথায়?”

–“উমম! তোমার অস্তিত্বের কোনো এক কিনারায়। মনের দরজা খুলে চোখের পর্দা তুলো, দেখ আমি ঠাঁই দাঁড়িয়ে।”

এবার খুব দ্রুত প্রত্যুত্তর আসল ইফানের থেকে। ওর এই রিপ্লাই দেখে তৎক্ষনাৎ হৃদস্পন্দন থমকে গেল। নিজের কাছেই এলোমেলো হয়ে পড়লাম। ঢোক গিলে ঝাপসা নয়নে ফের টাইপিং করলাম,

–“তোমায় খুব মিস করছি। চলে আস আমার কাছে।”

–“ওকে সুইটহার্ট।”

আমি একটু চুপ হয়ে গেলাম। অতঃপর চুমুর ইমোজি পাঠালাম,

–“😙

–“😇💘

তৎক্ষনাৎ ইফানের এমন রিপ্লাই পেয়ে খুশিতে নেচে উঠল এই বেভুলা মন। সহসা ছলছল চোখদুটোতে মেঘ কেটে গেল। আমার অজান্তেই দু’গালে এসে হানা দিল জাফরানি রঙ।

___________

গলা ছেড়ে চেঁচাতে চেঁচাতে ভরা বাজারে ছুটে চলেছে নোহা। তবে বেচারি বেশি দূর যেতে পারে নি। পিছন ফিরে জিতু ভাইয়াকে দেখতে দেখতে ছুটতে থাকায় বেখেয়ালি হোটচ খেয়ে জমিনে মুখ থুবড়ে পড়েছে। জিতু ভাইয়া কড়া চোখে এতক্ষণ নোহার দিকেই তাকিয়ে ছিল। মেয়েটা পড়ে যাওয়ায় দাঁতে দাঁত পিষল। এদিকে বাজারের মানুষ নোহাকে উঠে দাঁড়াতে বলছে। কিন্তু কারো কোনো কথায় কানে নিচ্ছে না সে। বাচ্চাদের মতো গাল ফুলিয়ে কালো গাড়িটির দিকে তাকিয়ে রইল। জিতু ভাইয়া তাকে না তুললে কিছুতেই উঠবে না। নোহার এহেন ছেলে মানুষী দেখে জিতু ভাইয়ার রাগ সপ্তমে চড়ে যাচ্ছে। কিন্তু এখন উপায় কি? নোহাকে দেখে তো যা মনে হচ্ছে এই মেয়ে নিজে থেকে উঠবেই না। ক্রমান্বয়ে ভীড় আর কোলাহল বাড়তে লাগল নোহাকে ঘিরে। বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে বাধ্য হয় জিতু ভাইয়া মুখে মাস্ক পড়ে নেমে গেল।

নোহার সামনে জিতু ভাইয়া এসে সটান হয়ে দাঁড়াল। নোহা অভিমানী চেহারা করে ফেলেছে। সামনে পুরুষটিকে দেখেও না দেখার ভান ধরছে৷ জিতু ভাইয়া নোহার এহেন কান্ড দেখে মনে মনে নিজেকেই অশ্রা’ব্য গালি দিল। কোন দুঃখে যে এই মেয়ের সাথে তার পরিচয় হতে হলো! উপরওয়ালার এই গাধার ঘটে বুদ্ধির ছিটাফোঁটা দাও! আশেপাশের পাবলিক নোহাকে উঠতে বলছে। কজন মহিলা ধরে দাঁড় করাতে চাইলে নাখোশ করে দিচ্ছে। জিতু ভাইয়া চোখ বুঁজে নিজের ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ করে নোহার বাহু ধরে হেঁচকা টানে দাঁড়া করাল। হিসহিসিয়ে শুধাল,

–“তোমার ঘটে কিছু আছে নাকি সবটাই ফাঁকা, গোবর ভরা?”

–“গোবর!”

আচমকা সব অভিমান ভুলে জিতু ভাইয়া বলার পরপরই আওড়াল নোহা। এত জোরেই বলল যে আশেপাশের মানুষ হা করে তাকিয়ে আছে। তাতে নোহার কোনো খেয়াল নেই৷ জিতু ভাইয়া ফের দাঁতে দাঁত পিষল। নোহা খুশিতে গদগদ করতে করতে বলল,

–“গোবর! কোথায় গোবর? জিতু বেবি আমার মাথায় তো গোবর নেই। একটু গোবর তাহলে দাও না।”

আসেপাশে হাসির রোল পড়ে গেল৷ জিতু ভাইয়ার মেজাজ খিঁচে যাচ্ছে। এখানে এক মূহুর্ত থাকলে নোহা নির্ঘাত তার সুস্থ মস্তিষ্ককে বিগড়ে দিবে। চরম ভুল হয়ে গেছে এই গাধাটিকে তুলতে এসে! তক্ষুনি মনে পড়ল সে তো এখানে একটা কাজে এসেছে!

–“ও মাই গড!”

অস্ফুটে আওড়ালেন তিনি৷ সচকিত দৃষ্টিতে চারপাশে চোখ ঘুরালেন। এত মানুষের ভীড়ে কোনো সন্দেহজনক কাউকে দেখতে পেল না। দৃষ্টি সরিয়ে নিবে তখনই লক্ষ্য করল একজন ছেলে তার দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে। জিতু ভাইয়া ছেলেটার থেকে দৃষ্টি সরাল না। বরং সুক্ষ্ম নজরে দেখতে লাগল। ছেলেটার কপাল বেয়ে ঘাম ছুটছে। আচমকা মাঝ বাজারে উল্টো দিকে দৌড়াতে আরম্ভ করল। সহসা জিতু ভাইয়ার মস্তিষ্ক সজাগ হয়ে গেল। তৎক্ষনাৎ মুখের মাস্ক একটানে খুলে ফেলে পিছু ছুটতে লাগল। সকলে হতবাক আর কৌতুহলী নয়নে সেই দিকে তাকিয়ে রইল।

ভীড়ের মধ্যে লোকটা বেশিক্ষণ ছুটে পালাতে পারল না। তার আগেই জিতু ভাইয়া পিছন থেকে থাবা মেরে লোকটার ঘাড় ধরে ফেলেছে। লোকটা জিতু ভাইয়ার উপর হাত তুলতে নিলে জিতু ভাইয়া লোকটার হাত মচকে দিল। হঠাৎই ভীড় থেকে একসাথে আরও কিছু লোক বেরিয়ে এসে জিতু ভাইয়ার উপর আক্রমণ করে বসল। জিতু ভাইয়া তৎক্ষনাৎ তাদের সাথে প্রতিরোধ করতে লাগল। চতুর্দিকে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়েছে। আতংকে সাধারণ জনতা এদিক-সেদিক ছুটে পালাচ্ছে। এমতাবস্থায় হঠাৎ জিতু ভাইয়ার সামনে নোহা ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠল,

–“খবরদার জিতু বেইবির দিকে এক পা কেউ এগোলে গু’লি করে দিব, হুহ।”

এক মূহুর্তের জন্য সকলে থমকে দাঁড়াল। নোহার হাতে রিভলবার দেখে ছেলেগুলো ঘাবড়ে গেল খানিকটা। নোহা গাল ফুলিয়ে বলে উঠল,

–“সবাই হাত তুলে আত্মসমনপণ কর।”

নোহার কথা শুনে সকলে হা করে তার দিকে তাকিয়ে রইল। জিতু ভাইয়ার ভ্রূকুটি করে ফেলল। আশেপাশে থমথমে পরিস্থিতি দেখে নোহা জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজালো৷ অতঃপর ফের আত্মবিশ্বাসের সাথে বলে উঠলো,

–“সকলে আত্মসমলপণ কর।”

ফের চারপাশে নৈঃশব্দ্য। ছেলেগুলো একে অপরের দিকে চোখাচোখি করে হেহে করে হাসিতে ফেটে পড়ল। জিতু ভাইয়া দাঁতে দাঁত পিষে দু’হাত মুষ্টিবদ্ধ করে নিল। খ্যাপাটে দৃষ্টি সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নোহার দিকে। নোহা কিছুক্ষণ চারপাশের উশৃংখল পরিস্থিতি ঠাহর করে গাল ফুলাল। কিছুতেই সঠিক শব্দটা তার মনে পড়ছে না। কিন্তু নোহা দমে যাওয়ার পাত্রী নয়। সে বুক ফুলিয়ে শ্বাস নিয়ে ধমকে উঠল,

–“দুষ্টু লোক, এখনই গু’লি করে দিব।”

সামনে অট্টহাসিতে ফেটে পড়া ছেলেগুলো সহসা ভয়ে চুপসে গেল। ঠিক তক্ষুনি একটা বাচ্চা ছেলে নোহার হাঁটু সমান ফ্রকটি মৃদু টেনে কড়া চোখে অথচ কাঁদু কাঁদু চেহারায় বলে উঠলো,

–“আমার গুই দেও কইতাছি। দেও আমার গুই।”

নোহা ঢোক গিলে আড় চোখে বাচ্চাটির দিকে তাকাল। অতঃপর তেসরা দৃষ্টি সামনের ছেলেগুলোর দিকে তাকাতেই দেখল তারা রা’গে ফুঁসছে। নোহা দাঁত কেলিয়ে বোকা হাসল। তক্ষুনি একজন মহিলার কর্কশ কণ্ঠ কানে ভেসে আসল,

–“ঐ সেরি লজ্জা করে না, এমন দামড়ি হয়েও একটা বাচ্চার হাত থেকে খেলনা চুরি করতে? ছ্যা ছ্যা ছ্যা।”

নোহা মহিলাটির দিকে তাকিয়ে শুকনো ঢোক গিলল। মহিলাটি ফের খ্যাক খ্যক করে উঠে বলল,

–“সবাই দেখ দেখ, দামড়ি হয়েও আবু-দুবাইনদের জামা পিন্দে ঘুড়ছে! ছি ছি!”

অতঃপর আচমকা নোহার হাতের খেলনা বন্দুক ছিনিয়ে নিয়ে বাচ্চার হাতে দিয়ে দিল। তক্ষুনি বাচ্চাটির চেহারা খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। মহিলাটি তাকে কোলে নিয়ে চোখ মুছিয়ে দিতে দিতে বলল,

–“না আমার বাবা কাঁদে না আর।”

অতঃপর নোহাকে মুখ মুচড়ে দিয়ে গটগট করে হেঁটে চলে গেল। বেচারি নোহার চেহারা চুপসে গেল। ঘাড় ঘুরিয়ে করে পিছনে তাকাতেই ক্রোধিত জিতু ভাইয়াকে দেখতে পেলে। চোয়াল এতটাই দৃঢ় দেখাচ্ছে যেন পারলে এখনই নোহাকে চিবিয়ে খাবে। নোহা ভয়ে জড়সড় হয়ে ঢোক গিলল। হঠাৎ জিতু ভাইয়াকে ঝড়ের বেগে এগিয়ে আসতে দেখে চোখ খিঁচে নিল। এদিকে নোহার দিকে আঘাত করতে আসা ছেলেটাকে লাথি মেরে মাটিতে ফেলে দিয়েছে জিতু ভাইয়া। ছেলেগুলো খালি হাতে না পেরে একে একে অস্ত্র বের করল৷ জিতু ভাইয়া লড়ে যাচ্ছে তাদের সাথে। হঠাৎই রোদেলা আকাশ ঘন কালো মেঘে ছেয়ে গেছে। আকাশে ঘন ঘন মেঘ গর্জন করছে। মানুষ কিছু বুঝার ফুরসত পেল না, মূহুর্তেই মুশলধারে বৃষ্টি নামল। তৎক্ষনাৎ সকলে ছুটাছুটি করতে লাগল। বৃষ্টিস্নাত অবস্থায় জিতু ভাইয়ার সাথে লোকগুলো মারামারি করে যাচ্ছে। জিতু ভাইয়ার শক্তপোক্ত হাতের বেমালুম মা’রধরে সবগুলো কপোকাত হয়ে পড়ল। অপরদিকে বাকি সিআইডি অফিসাররা এদিকে ছুটে আসছে। তারাও বেশ কিছু অপরাধীকে ধরতে সক্ষম হয়েছে।

জিতু ভাইয়া কবিরকে বলল পড়ে থাকা ছেলেগুলো এরেস্ট করতে। অতঃপর তিনি পিছনে ফিরতেই লক্ষ্য করল নোহাকে৷ যে এতক্ষণ ধরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রয়েছে। পিঠে পড়া সিল্কি রেশমের মতো চুলগুলো সহ পড়নের হাঁটু সমান মসৃণ কাপড়ের ফ্রকটি ভিজে দেহের সাথে লেপ্টে গেছে। নোহা ছুটে আসতে নিলেই স্লিপ খেয়ে পড়তে যাবে তক্ষুনি জিতু ভাইয়া হাত ধরে নিল। নোহার চেহারায় হাসির ঝলকানি দেখা গেল। জিতু ভাইয়া ভ্রুকুটি করে কিছু একটা ভেবে আচমকা হাত ছাড়তেই নোহা গগণ কাঁপিয়ে চিৎকার করে উঠল। কিন্তু পড়ে যাওয়ার আগেই সে হাতে টান অনুভব করল। পিটপিট করে চোখ মেলে তাকাতেই দেখল জিতু ভাইয়া ফের তার হাত ধরে ফেলেছে।

তিনি এক টান মেরে নোহাকে সোজা করে দাঁড় করিয়ে দিল। অতঃপর জহরি চোখে তাকিয়ে রইল। নোহা আবারো চোখ পিটপিট করল। ঢোক গিলে বলল,

–“জিতু বেবি..”

–“মতলব কি তোমার?”

নোহাকে কিছু বলতে না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিল জিতু ভাইয়া। নোহা গাল ফুলিয়ে কিছু বলতে যাবে তার আগেই জিতু ভাইয়া নিজ পরনের ব্লেজার খুলে নোহার চোখের সামনে ধরল। তারা দু’জনই এখনো মাঝ বাজারে দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজে যাচ্ছে অনবরত। এদিকে আশেপাশে কয়েকদল অসৎ লোক নোহাকে বাঁকা দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছে।

নোহা খুশিতে গদগদ করতে করতে ব্লেজারটি পরে নিল। কিছু বলতে যাবে তার আগেই জিতু ভাইয়া বিনা বাক্যে প্রস্থান করল। নোহা পিছন থেকে অনেক ডাকল, কিন্তু সেই ডাক জিতু ভাইয়া কানেও তুলল না। নোহা পিছু নিতে গিয়েও পারল না। কারণ মাটি ইতোমধ্যে কর্দমাক্ত হয়ে গেছে। অসাবধানতায় পা ফেললেই পিছলে খেয়ে পড়বে নিশ্চিত।

_____________

গতকাল ঠিকই আন্দাজ করেছিলাম, হঠাৎ প্রকৃতি এমনি এমনি নিজের ঐশ্বর্যের ঝলক দেখাচ্ছে না। নিশ্চয়ই কারণ আছে। ঠিক তাই হলো, সারারাত থেমে থেমে প্রচুর বৃষ্টি হয়েছে। এমনকি আজ সারাদিনেরও একই অবস্থা গিয়েছে। কখনো মুশলধারে বৃষ্টি নামছে, তো কখনো ঝিরিঝিরি।

পৃথিবী পুনরায় অন্ধকারের চাদরে ঢাকা পড়েছে। মেঘলা আকাশ হওয়ায় কোথাও এক ফালি চাঁদের দেখা নেই। মাগরিবের নামাজ পড়ে মুঠোফোন হাতে বেলকনিতে এসে দাঁড়ালাম। আবহাওয়া আজ অনেক শীতল। বাগান থেকে ঝিঁঝি পোকার ডাক সহ ব্যাঙের ঘ্যাঙর ঘ্যাঙর ডাক ভেসে আসছে। আমি গভীর ভাবনায় মগ্ন। গতকাল রাত থেকেই ঘুম হারাম হয়েছে। সিআইডিরা ঐ ছেলেগুলোর সাহায্যে গতকাল রাতে মানব পাচার চক্রের একাংশকে কব্জা করেছে। একটি আবাসিক হোটেল থেকে প্রায় চল্লিশটিরও অধিক মেয়েদের উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে তারা। সকলের অবস্থা খুবই বি’ধস্ত। প্রচুর শারীরিক নির্যা”তনের শিকার হয়েছে। এখন সকলেই সিআইডির তত্ত্বাবধানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। কারোরই কিছু বলার মতো মানসিক অবস্থা নেই।

আজ সারাদিন পার হয়ে গেল এই বিষয়ে এখনো কোনো খবর পেলাম না। আমি অস্থির হয়ে পায়চারী করতে লাগলাম। তক্ষুনি মুঠোফোন বেজে উঠল। রিসিভ করতেই জিজ্ঞেস করলাম,

–“কেউ কিছু বলেছে?”

–“হ্যা। মেয়েগুলোকে পার্লারের কাজ শেখাবে বলে টোপ দিয়ে এনেছে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে। আমরা না গেলে সেই রাতেই সকলকে দেশের বাইরে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তারপর নিশ্চয়ই বিক্রি করে দিত।”

ফোনের ওপাশ থেকে কথাগুলো অরনা বলল। আমি তপ্তশ্বাস ছেড়ে ফের শুধালাম, “এই চক্রের পিছনের নেটওয়ার্কের কোনো তথ্য পেয়েছে?”

অরনা বলতে লাগল, আমি নিঃশব্দে শুধু সব শুনে গেলাম। কিছুক্ষণ কথা হলো আমাদের মধ্যে। এরপর থেকেই আমার চেহারা থমথমে হয়ে গেল। ঘরে এসে দেখলাম জুই চোখ বুজে শুয়ে আছে। পাশেই ইতি ফোনে ফানি রিলস দেখছে, আর তা জুইকে বলে শুনাচ্ছে। যেন সবসময় মনমরা হয়ে থাকা মেয়েটাকে একটু হাসাতে পারে। যদিও জুইয়ের থেকে কখনো কোনো প্রতিক্রিয়া আসছে না। আড়ালে তপ্তশ্বাস ছেড়ে আমি রুম থেকে বেরিয়ে গেলাম। নিচে অনেক কাজ পরে আছে। একা হাতে পলি আর কত সামলাবে? জুই আসার একদিন পরই নুলক চৌধুরী ছেলের খোঁজে লন্ডন চলে গেছে। এতে নাবিলা চৌধুরী যেন আরও একা হয়ে পড়েছেন। সারাদিন অফিসে কাজ করে সন্ধার পর বাড়ি ফিরেন। ওনার চেহারা দেখা কিছুই বুঝা যায় না কি চলছে তার মনে। ইদানীং কেমন যেন রোবটের মতো চলাফেরা আর কথাবার্তা বলেন!

___________

ঘড়ির কাটা টিকটিক আওয়াজ তুলে আড়ায় টায় এসে পৌঁছাল। চৌধুরী বাড়ি এখন অন্ধকারে নিমজ্জিত। সকলেই নিজ রুমে গভীর ঘুমে মগ্ন। দরজায় কটমট আওয়াজ পেতেই ঘুমের মধ্যে চমকে উঠল পলি। দ্রুত ধরফরিয়ে ওঠে বসতেই ঘরের দরজা খোলে কেউ ঢুকে পড়ল। কাঁপা কাঁপা গলায় পলি শুধাল,

–“ক..কে?”

–“আমি।”

মূহুর্তেই সারা রুম আলোকিত হয়ে উঠল। এই মাঝরাতে ইমরানকে দেখে পলি কিছুক্ষণ একনাগাড়ে সেদিকে তাকিয়ে রইল। ইমরান হাত ঘড়ি খুলতে খুলতে জিজ্ঞেস করল,

–“ঘুমিয়ে পড়েছিলে?”

–“হুম।”

–“সরি পাখি তোমার কাঁচা ঘুম নষ্ট করার জন্য।”

পলি কিছু বলল না। ইমরান নিজেই বলল,“ঘরে খাবার থাকলে দাও তো। সারাদিন চিন্তায় কিছু খাওয়া হয়নি।”

ভ্রু কুঞ্চিত করে পলি জিজ্ঞেস করল,“কেন, কি হয়েছে?”

দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল ইমরান। কোমরে দু’হাত ধরে ক্লান্ত কণ্ঠে বলল,“বাবা, কাকার কোনো খোঁজ নেই। আমি এখন কি থেকে কি করব মাথায় আসছে না! রাজনৈতিক মাঠে আমাদের দলের আর জায়গা নেই। এখন বিজনেসের অবস্থাও খারাপ।”

–“আচ্ছা চিন্তা করবেন না, সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি খাবার গরম করে আনছি।”

পলি রুম থেকে বেরিয়ে গেল। মিনিট দশেক পর আবার ফিরে এলো। পুরো কক্ষে চোখ বুলিয়ে দেখল কেউ নেই। রাতের নিশাচরদের চাপা গুঞ্জন ছাপিয়ে বেলকনি থেকে ফিসফিস করে কারো কথা বলার আওয়াজ ভেসে আসছে। পলি নিঃশব্দে ধীরপায়ে এগিয়ে গেল। বেলকনির পর্দার আড়ালে দাঁড়াতেই কানে আসল ইমরানের কণ্ঠ,

–“আরে ব্রো তোমরা সবাই আমাকে ফাঁসিয়ে দিয়েছ! আসলেই তোমরা সবকটা ইডিয়ট! পঙ্কি ভাই সহ চাচ্চুও টপকে গেছে। বাবার কোনো খোঁজ নেই। আমার সাজানো সব খেলা শেষ হয়ে যাচ্ছে। মেয়েগুলো তোমার কাছে সাপ্লাই করার আগেই সিআইডি কু’ত্তাগুলোর হাতে ধরা পড়েছে।”

ফোনের ওপাশ থেকে উক্ত ব্যক্তি কিছু বলল। ইমরান চুপ থেকে শুনে আবার চাপা গলায় বলতে লাগল,“যত দ্রুত সম্ভব দেশ ছাড়ছি আমি, ব্যাস। আশেপাশে এখন সবাই আমার শত্রু। এক জাহানারা মা’গী এই বাড়িতে আসার পর থেকে আমার সব প্ল্যান ভেস্তে দিয়েছে। রাতের ঘুম করেছে হারাম। একটা রাত আমি নিশ্চিন্ত ঘুমাতে পারি নি। যমের মতো বাড়িতে দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টা ঘুরঘুর করে। আনফরচুনেটলি যদি একবার জানতে পারে কবিতার মৃ’ত্যুর পিছনে আমার হাত…বড় ঝামেলা হয়ে যাবে। তাছাড়া..

বলতে গিয়ে হঠাৎ চুপ হয়ে গেল ইমরান। এতক্ষণে আড়ালে লুকিয়ে থাকা পলির কপাল বেয়ে ঘাম ছুটছে। হাত-পা থরথর করে কাঁপছে। সে আর এক মূহুর্ত সময় ব্যয় না করে দ্রুত রুম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য অগ্রসর হলো দরজার দিকে। তবে দরজা খোলার জন্য উদ্যত হতেই আচমকা তার হাত থমকে গেল। শক্তপোক্ত একটি হাত তার কোমর জড়িয়ে ধরেছে। ভয়ে তৎক্ষনাৎ পলির অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠল। গলায় শীতল কিছুর স্পষ্ট অনুভব করতেই ধীরে ধীরে সেদিকে দৃষ্টি নামাল। সহসা রমণীর পিলে চমকে উঠল গলায় ধারালো ছু’রি দেখতে পেয়ে। মূহুর্তেই নিঃশ্বাস ভেতরেই আঁটকে গেল। ঠিক তখনই সকল নৈঃশব্দ্য ভেদ করে তার কানের কাছে ভেসে আসল অতিপরিচিত পুরুষালি হাস্কি কণ্ঠস্বর,

–“বউজান।”

চলবে,,,,,

অনেক বড় পর্ব তাই ভুল ত্রুটি থাকতে পারে, বুঝে পড়ে নিয়েন। তবে নেক্সট পর্বে অনেক বড় ধামাকা আছে কিন্তু। আর আজকেও কারেন্ট নেই। বোনের থেকে হটস্পট নিয়ে পোস্ট করেছি🙂

যারা পড়েছন সকলে রিয়েক্ট আর কমেন্ট করে দিয়েন কিন্তু। তাহলে দ্রুত নতুন পর্ব নিয়ে আসব। হ্যাপি রিডিং।🥳🫶

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply