পর্ব সংখ্যা;৪০
লেখনীতেনবনীতাচৌধুরি
–” তুমি তোমার স্ত্রীকে নিয়ে বাড়ি ছেড়েছো। কিন্তু আমার ছোটো মেয়ে কে নিয়ে যাওয়ার কোনো অধিকার তোমার নেই।”
মায়ের পেছন থেকে চাচ্চুর গম্ভীর কণ্ঠের উপরোক্ত কথা গুলো শুনে মা কে বুক থেকে সরিয়ে পাশে দাঁড় করালো তরঙ্গ। নিজের রাগ সংবরণ করে শীতল কন্ঠে সুধালো সে।
–” জেদ করো না চাচ্চু। তিন্নিকে আমাদের সাথে যেতে দাও। টেমা তরীকে ছাড়া ভালো থাকবে না চাচ্চু।”
–” মেয়ের বাবা আমি। তাই ওর ভালো খারাপ দেখার দায়িত্ব ও আমার।”
তরঙ্গ দু’আঙুলের সাহায্যে কপাল চেপে ধরলো। অন্য হাত কোমরে চেপে তরীর দিকে তাকালো সে। তরী নিশ্চুপ ভঙ্গিতে মেঝেতে দৃষ্টিবদ্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে। কাঁদছে কিনা তা বোঝা যাচ্ছে না মাথা নামিয়ে রাখার জন্য। পুনরায় স্বাভাবিক ভাবে দাঁড়িয়ে চাচ্চুর দিকে তাকালো ছেলেটা।
–” তার মানে তুমি তিন্নিকে আমাদের সাথে যেতে দিবে না তো?”
আয়েশি ভঙ্গিমায় সোফায় পিঠ এলিয়ে দিলেন ফারহান দেওয়ান। বুশরার দিকে তাকিয়ে আদেশের অনুরূপ সুধালেন তিনি।
–” আমার জন্য এক কাপ কড়া লিকারের দুধ চা করে আনো বুশরা।”
অতঃপর, তরঙ্গের দিকে তাকালেন তিনি। ছেলেটার পা থেকে মাথা অব্দি এক পলক তাকিয়ে; কিঞ্চিত হাসলেন ফারহান দেওয়ান। এই ছেলেকে ওইদিন ও কাঁধে নিয়ে ঘুরেছেন তিনি। আজ সেই তরঙ্গ ওনার সামনে দাঁড়িয়ে মুখে মুখে তর্ক করছে। প্রশ্নের জবাব চাইছে। সময় গুলো কি তাড়াতাড়ি চলে যায়। দীর্ঘ শ্বাস চাপলেন তিনি।
–” তোমাদের নিজেদের ই থাকার জায়গা নেই। খাবে কি তার ঠিক নেই। আমার ছোটো মেয়ে কে নিজেদের সাথে নিয়ে গিয়ে খাওয়াবে কি? ওর স্কুল আছে, টিউশন আছে।”
–” সেটা আমার বিষয়। তোমার মেয়েদের ভালো রাখলেই তো হবে চাচ্চু। অন্তত তোমার রাজ প্রাসাদের ন্যায় বড় বাড়ি থেকে আমার দুই রুমের বাসায় ওরা বেশি ভালো থাকবে।”
স্বামীর আদেশ পেয়ে ও জায়গাতেই দাঁড়িয়ে ছিলো বুশরা। সুযোগ বুঝে কথার বাণ ছুঁড়ে দিলেন তরঙ্গের নিকট।
–” সংসারে টানাটানি পড়লে ওসব লোক দেখানো ভালোবাসা জানলা দিয়ে ও পালানোর সুযোগ পাবে না। আগে নিজের সংসার সামলাও। পরে অন্যের মেয়ের দায়িত্ব নিতে এসো।”
বুশরার কথায় নিজেকে সামলাতে না পেরে। তরী ধীর পায়ে তরঙ্গের সন্নিকটে এসে দাঁড়ালো। ভয় ভুলে আঁকড়ে ধরলো তরঙ্গের হাত। অবাক চোখে তরীর নিজের হাতের ধরে রাখা জায়গা টা দেখে; পর পর তরীর মুখপানে তাকালো সে। নিজের পুরনো চুপচাপ খোলসে ছেড়ে তেজী কণ্ঠে আওড়ালো তরী;-
–” এখানে দাঁড়িয়ে অপমান হওয়ার মানে হয় না তরঙ্গ। আমাদের সংসারে আমরা খেতে পারবো নাকি পারবো না। ভালোবাসা থাকবে নাকি ঝামেলা হবে। তা আমাদের বিষয়। কাউকে তা নিয়ে ভাবতে হবে না। আপনি এখান থেকে চলুন তরঙ্গ।”
–” গায়ে প্রথম, প্রথম স্বামীর শরীরের হাওয়া লাগলে এমন কতো পিরিতের কথাই আসে।”
কথা শেষ করে টিটকারির ভঙ্গিতে ভেংচি কাটলেন বুশরা। ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি ঝুলিয়ে ধীর পায়ে রান্না ঘরের দিকে চলে গেলেন তিনি। তরঙ্গ আর এক মূহুর্ত দাঁড়ালো না। তরীর হাত ধরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলো সে। এতক্ষণ নিরব দশকের মতো সব অবলোকন করতে থাকা সাহানারা ফের ছেলেকে চলে যেতে দেখে ডুকরে কেঁদে উঠলেন। আঁচলে মুখ চেপে দুর্বল শরীর টেনে নিজের ঘরে চলে গেলেন তিনি।
” সময় ” শব্দটি কেবল তিন বাক্যের। অথচ এই তিন বাক্যের ছোট্ট শব্দটি বড়ই নিষ্ঠুর। সে কারো জন্য অপেক্ষা করে না। সে চলে নিজের গতিতে।
মানুষ তার সাথে তাল মিলিয়ে পৃথিবীতে বসবাস করে আসছে যুগের পর যুগ ধরে। যারা সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে তাল মেলাতে পারেনি। তারা হারিয়ে গেছে কালের গর্ভে। তরী – তরঙ্গ তাদের নতুন বাসায় উঠেছে যে দুই সপ্তাহ পেরিয়েছে। বাসা ভাড়া আর খাবার খরচ সামলানোর জন্য; সন্ধ্যার পর দুটো টিউশনি জোগাড় করেছে তরঙ্গ। পার্ট টাইম জব হিসেবে একটা শপিংমলে সেলস ম্যানের কাজ করছে। সেখানে ডিউটি দুপুরের পর থেকে সন্ধ্যার পর পর্যন্ত। ভার্সিটি থেকে ফিরেই শপিংমলে চলে যায় ছেলেটা। সেখানের ডিউটি শেষ করে টিউশনিতে যায়। সব সামলাতে গিয়ে মাঝে মধ্যে হিমসিম খেতে হচ্ছে তরঙ্গ কে। বড়লোকের আদরের একমাত্র ছেলে হঠাৎ ডুপ্লেক্স বাড়ি ছেড়ে রাস্তায় নামলে কষ্ট হবার ই কথা। তবে দিন শেষে নিজের সংসারে ফিরে হাসি মুখে অপেক্ষা করা তরীকে দেখলেই তার সব কষ্ট বিলীন হয়ে যায়। টুনাটুনির সংসারে সব মোটামুটি ঠিকঠাক চলছে।
ছুটির দিন বাদে সারা সপ্তাহ একাই বাসায় থাকে তরী। মাঝে মধ্যে, ছুটির দিনে ও সকালেই বেরিয়ে যায় ছেলেটা। যেদিন ভার্সিটির ক্লাস থাকে না। সেদিন সকাল থেকেই ডিউটিতে যায় তরঙ্গ। এই দুই সপ্তাহের কষ্টতেই তার গায়ের রঙ ময়লা হয়ে গেছে। দুধ ফর্সা রঙ কিছুটা চাপা হয়ে এখন উজ্জ্বল শ্যামলা লাগছে।
চাঁদের আলোয় বারান্দায় টুল পেতে বসে আছে তরী। গলার ওড়নাটা বিছানার উপর রাখা। চুল গুলো ছেড়ে বসে আছে সে। মিষ্টি বাতাস বইছে। তার সাথে আকাশে রয়েছে প্রকান্ড এক রুপোলি চাঁদ। কি অসম্ভব সুন্দর লাগছে আকাশটা। আকাশের বুকে তারা নেই। কেবল এক ফালি চাঁদের অস্তিত্ব রয়েছে। এখন রাত সাড়ে নয়টা বাজে। তরঙ্গ ফিরতে ফিরতে সাড়ে নয়টা, দশটা বাজে প্রতিদিন। সারাদিন বাসায় একা থাকতে তরীর মন্দ লাগে না। নিজের ছোট্ট সংসার গোছানো থেকে শুরু করে রান্না বান্না করা। সব একা হাতে সামলাতে হয় তরীকে। সব কাজ শেষ করতে করতে যোহরের আজান পড়ে। অতঃপর, গোসল করে এসে। নামাজ আদায় করে, খাবার খেয়ে ভাত ঘুম দেয় মেয়ে। সেই ঘুম ভাঙে আসরের সময়। ঘরে নতুন আরো কিছু জিনিস পত্র নিয়েছে।
বাসায় উঠার পর দিন ই ওরা দুজনে এক সাথে গিয়ে নিয়ে ছিলো। আকাশের পানে তাকিয়ে আনমনে কি যেন ভাবছিলো তরী। হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে ভাবনার তাল কেটে গেলো তার। চুলে অগোছালো হাত খোঁপা করে ছুটে এসে দরজার নিকট উপস্থিত হলো তরী। পাছে তরঙ্গ হলে তাকে যেন অপেক্ষা করতে না হয়। তার ধারণাই সঠিক হলো। কাগজের একটা প্যাকেট হাতে দরজায় দাঁড়িয়ে আছে তরঙ্গ। দরজার ছিটকিনি খুলে কোমল হাসলো তরী। বিনিময়ে তরঙ্গ ও হাসলো। জুতো খুলে ভেতরে প্রবেশ করে সুধালো সে।
–” কেমন আছেন তরী জান?”
এই একটা প্রশ্নে, বাচ্চাদের মতো আনন্দে আটখানা হয়ে গেলো তরী। মুখে যেন হাসি ধরছে না তার। এই একটা প্রশ্ন প্রতিদিন ঘরে প্রবেশ করার সময় তরঙ্গ করে। আর তরী ও নিয়ম করে একই উত্তর দেয়। তবুও প্রতিদিন এই প্রশ্নের উত্তর দেবার জন্য অধীর আগ্রহে রাত অব্দি অপেক্ষা করে সে।
–” ভালো, আপনি?”
দরজায় ছিটকিনি দিয়ে বেডরুমের দিকে এগোলো তরঙ্গ। তরী ও তার পিছু পিছু পথ ধরলো। কাগজের প্যাকেট টা নতুন কেনা কাঠের টেবিলটার উপরে রেখে শার্টের বোতামে হাত লাগালো তরঙ্গ।
–” সারাদিন ভালো ছিলাম না। এখন পাঁচ ফুট চার ইন্ঞি ভালো আছি।”
–” মানে?”
থতমত খেয়ে প্রশ্ন করলো তরী। প্রতি উত্তরে ফিচেল হাসলো তরঙ্গ। পর পর লাজুক মুখে কিচেনে চলে গেলো তরী। তোয়াল কাঁধে ঝুলিয়ে তরীর পেছন পেছন কিচেনের দরজায় এসে দাঁড়ালো তরঙ্গ। দেয়ালের সাথে ঢেঁশ দিয়ে কোমল স্বরে বললো সে;-
–” তোমার জন্য গরম, গরম চিকন জিলেপি এনেছি। পরে এসব করো। আগে হাত ধুয়ে জিলেপি খাও।”
তরীর হাত থেমে গেলো।
–” এতো রাতে গরম জিলেপি পেলেন কোথায়?”
–” স্পেশাল অর্ডার দিয়ে আমার তরী জানের জন্য বানিয়েছে। লোকটা উঠে গিয়েছিল। কতো কষ্টে আবার বসিয়ে তারপর বানিয়ে আনলাম। কাজ পরে করিস আগে খা গিয়ে।”
তরী জবাব দিলো না আর। ছেলেটা পাগল। শুধু পাগল না। তার প্রেমে পাগল। এমন পাগলদের কিছু বলে ও বিশেষ সুবিধা পাওয়া যায় না। এরা নিজেদের সিদ্ধান্তে অটল থাকে। তরঙ্গ ও তাই।
চলবে
( প্রিয় পাঠক মহল,
কেমন হয়েছে জানাবেন কিন্তু! জ্বর, গলা ব্যথা, কাঁশি সব মিলিয়ে করুণ দশা। শোয়া থেকে উঠতে পারছি না। তবুও গল্প দিলাম ছোটো করে। কেবল আপনাদেরই জন্য।) See less
Share On:
TAGS: জল তরঙ্গের প্রেম, নবনীতা চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ৩১
-
She is my Obsession পর্ব ১৪
-
She is my Obsession পর্ব ১৬
-
জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ১০
-
জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ৪
-
She is my Obsession পর্ব ২৪
-
জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ১৬
-
She is my Obsession পর্ব ২৯
-
She is my Obsession পর্ব ১
-
জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ২৫