Golpo romantic golpo জল তরঙ্গের প্রেম

জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ২৭


#জল_তরঙ্গের_প্রেম

পর্ব সংখ্যা;২৭

#লেখনীতে_নবনীতা_চৌধুরি

(⛔ নোট পড়বেন সবাই)

ঘড়ির কাঁটা সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এগারোটার ঘর ছুঁয়েছে।

এতক্ষণ তরীর কোল জুড়ে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে ছিলো তরঙ্গ। অগত্যা তরীকে ও এতক্ষণ নড়াচড়া না করে এক ভাবে শান্ত হয়ে বসে থাকতে হয়ে ছিলো। গরমের মধ্যে ও সিল্কের শাড়ির মাঝে মাথা রেখে কি গভীর প্রশান্তিতেই না ঘুমোচ্ছিলো ছেলেটা! সেই দৃশ্য দেখে তরীর ও আর ইচ্ছে হয়নি তার ঘুম ভাঙানোর। বরং, আলতো হাতে বারবার আঙুল ছুঁইয়ে দিয়েছে তরঙ্গের চুলের ভাঁজে। তাতে আরো গাড়ো হয়ে ছিলো তার ঘুম।

এক সময় এভাবেই বসে থাকতে থাকতে তরীর ও চোখ লেগে এসে ছিলো। অচেতন ঘুমে মাথাটা হেলে পড়ে তরঙ্গের পিঠের উপর। দু’জনের সেই শান্ত ঘুম ভাঙলো হঠাৎ ফোনের তীক্ষ্ণ শব্দে। চমকে উঠে চোখ মেললো তরী। সন্তর্পণে পার্স হাতড়ে ফোনটা বের করে নিলো সে। যাতে তরঙ্গের ঘুম না ভাঙে। কিন্তু ফোনের শব্দে ততক্ষণে তরঙ্গ জেগে উঠেছে। মাথা উঠিয়ে স্ক্রিনে তাকালো সে। ফোনের স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে সাহনারা বেগমের নাম। সেটা দেখে তরীর হাত থেকে ফোনটা প্রায় কেড়েই নিলো তরঙ্গ। ঘুম জড়ানো চোখে; ধীরে উঠে বসে কল রিসিভ করলো সে।

–” হ্যালো আম্মু?”

ফোনের এপাশ থেকে ছেলের কণ্ঠ পেয়ে চমকে উঠলেন সাহনারা। বিস্ময়ে চোখ বড় হয়ে গেলো তার। তড়িঘড়ি করে কান থেকে ফোনটা সরিয়ে স্ক্রিনে ভেসে থাকা নাম্বারের দিকে তাকালেন তিনি। সঠিক নাম্বার দেখে পুনরায় ফোন কানে চাপলেন।

–” তরঙ্গ তুই? আমি তো তরীকে ফোন দিয়েছি।”

–” কেনো? ছেলের বউয়ের জন্য বুঝি মন খারাপ হচ্ছে? নাতি – নাতনি না আসতেই এতোটা ডেস্পারেট হলে চলবে আম্মু? আমাদের কোয়ালিটি টাইম স্পেড করতে না দিলে নাতি পুতি পাবে কোথ….?”

পুরো কথা শেষ করার আগেই, তরঙ্গের মুখ চেপে ধরলো তরী। বড় বড় চোখে তাকিয়ে ইশারায় চুপ করতে বললো তাকে। না পারতে নিচু স্বরে ফিসফিসিয়ে বললো তরী;–

–” চুপ করুন অসভ্য লোক। এসব কেমন কথা। ভুলে গেলেন? উনি আপনার মা হয়।”

তরঙ্গ থামলো না। বরং তরীর হাতটা আলতো করে মুখ থেকে নামিয়ে এনে নিজের মুঠোয় বন্দি করলো। পর পর মুচকি হেসে, ধীর ভঙ্গিতে মেয়েটির তালুতে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিলো সে। সেও তরীর মতোই ফিসফিসিয়ে সুধালো।

–” ভাগ্যিস আমি কিচ্ছু ভুলিনি। উনি যেমন আমার মা। তেমন আপনি ও আমার স্ত্রী। দু’জনেই আমার জন্য স্পেশাল। তাই একজন অপরজন কে ছোটো করবে। তা আমি সহ্য করতে পারবো না।”

এর মাঝে সাহানারা চেঁচিয়ে উঠলেন;-

–” মানে? কার নাতি পুতি?”

–” তোমার গো মা জননী তোমার। নানু – দাদু দুই এক সাথে হবে। ব্যাপারটা ইন্টারেস্টিং না!”

তেঁতে উঠলেন সাহনারা। মুখখানা বিরক্তিতে কুঁচকে গেলো তার। গজগজ করতে করতে ক্ষুব্ধ স্বরে জবাব দিলেন তিনি;-

–” চুপ কর বেয়াদপ ছেলে। কাকে কি বলছিস? ওই মেয়ে কোথায়? সকালে সং সেজে ঠেং ঠেং করতে করতে বেরিয়ে গেছে। এখনো ফেরার নাম নেই। বাড়ির কাজ করবে কে?”

সিরিয়াস ভঙ্গিতে ভ্রুকুটি করে নিলো তরঙ্গ। মায়ের কথা গুলো কানে যেতেই মুহূর্তে বিগড়ে গেলো তার মেজাজ। চোয়াল শক্ত করে, দাঁতে দাঁত চেপে গম্ভীর স্বরে বললো সে;-

–” সরি মা, আমি বাড়ির বউ বিয়ে করেছি। কাজের লোক না। তোমরা বরং তোমাদের সংসারের কাজ করো। আমার বউ তার সংসারের কাজ করবে। শাশুড়ির সংসার সে সামলাতে পারবে না!”

সহসা ছেলের এমন উত্তরে বুকে হাত চেপে বিছানায় বসে পড়লেন সাহানারা। ছেলেটা এভাবে তাকে বলতে পারলো? এই কথা শোনার জন্যই এই ছেলেকে ন’মাস তিনি পেটে ধরে ছিলেন তিনি? শেষে কিনা একটা বাইরের চাল চুলোহীন মেয়ের জন্য তাকে ছোটো করলো? সাহনারা বেগম আর কথা বলতে পারলেন না। ফোনটা ছুঁড়ে মেরে কানে আচঁলের অংশ গুঁজে মেঝেতে বসে পড়লেন। মেঝেতে বসে বিলাপ করে না কাঁদলে ঠিক কান্নার সাধ পান না তিনি। নিমিষেই হাত, পা ছড়িয়ে বিলাপ জুড়ে দিলেন তিনি। আচমকা ওনার এমন কান্নার শব্দ কানে পৌঁছাতেই ফারহান দেওয়ান ঘুম ছেড়ে লাফিয়ে বিছানায় বসে পড়লেন।

উদভ্রান্তের ন্যায় এদিক ওদিক তাকিয়ে কান্নার শব্দ কোথা থেকে আসছে তা খুঁজলেন। নিজের মেঝেতে বসে বাচ্চাদের মতো নিজের সহধর্মিণী কে কাঁদতে দেখে স্থির হলেন ফারহান দেওয়ান। ফের চুপ করে বিছানায় পিঠ এলিয়ে দিলেন তিনি। এখন কথা বলা মানেই নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারা। সবার দোষ এসে ওনার ঘাড়ে পড়বে। পুরোপুরি চোখ বোঝার আগেই সাহনারা দেখে ফেললেন ওনাকে। কান্না রেখে ঝটপট বিছানায় উঠে বসলেন তিনি।

–” আমার ছেলেকে ওই মেয়ে জাদু করেছে গো। সে এখন ডাইনির দল পাকিয়েছে।”

ক্লান্ত ভঙ্গিতে কেবল “হুমম” বলে শুয়ে পড়লেন ফারহান দেওয়ান। তাতেই দ্বিগুণ ফুঁসে উঠলেন সাহনারা।

–” হুম কি? আমি কিছু বলেছি তো তোমাকে।”

ফারহান দেওয়ান কিছু বলবেন। তার আগেই সাহনারা নিজের কথার জবাব নিজেই দিলেন। ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি টেনে ধীর স্বরে সুধালেন তিনি;-

–” ওহ, আপনি কিছু বলবেন কেনো? নিজের ছেলেকে আপনি কখনো দোষী ভাবতে পেরেছেন? পারলে পাঁচ বছর আগ থেকেই রশি শক্ত হাতে ধরতে। আর সে তো আপনার ভাইয়ের মেয়ে। আমি ই শুধু পরের মেয়ে।”

–” এসব কথা এখন কোথা থেকে আসছে সাহনারা? তুমি একটু বেশি বেশিই ভাবছো বলে তোমার মনে হচ্ছে না?”

–” হ্যাঁ। আমি কিছু বললেই তা বেশি। আর ওই মেয়ে আমার ছেলের কাছে গেলে দোষ হয় না। সকাল সকাল মেম সাহেব সেজে তিনি আমার ছেলের কাছে গিয়ে হাজির হয়েছেন।”

বিরক্তিতে তেতো হয়ে এলো ফারহান দেওয়ানের মুখ। স্ত্রীর এসব কদর্য ইঙ্গিতপূর্ণ কথা শুনতে তাঁর বিন্দুমাত্র ইচ্ছে করছে না। অথচ সাহনারা যেন থামার নামই নিচ্ছে না।

*******

ফোনটা রেখে বিছানা থেকে নেমে পড়লো তরঙ্গ। রশি থেকে গামছা আর ট্রাউজার তুলে কাঁধে নিয়ে দরজা খুলে বাইরে চলে গেলো সে।

তরঙ্গ বেরিয়ে যেতেই তরী ও উঠে দাঁড়ালো। চুপটি করে কুঁচকে যাওয়া শাড়িটা ঠিক করে নিলো সে। ঘরে তখন নিস্তব্ধতা। সেই নীরবতা চাপিয়ে পাখির কিচিরমিচির শব্দ শোনাতে মন দিলো তরী। মিনিট দশেক পর আবার ফিরে এলো তরঙ্গ। কাঁধে ভেজা গামছা, তার মাথার চুল থেকে টুপটাপ পানি ঝরছে। হেঁটে গিয়ে রশিতে গামছা টা নেড়ে দিয়ে ব্যাগ থেকে শার্ট বের করলো তরঙ্গ। অজান্তেই তরীর চোখ গিয়ে থামলো তরঙ্গের বুকের কাছে। প্রশস্ত বুক বেয়ে পানির ফোঁটা গুলো ধীরে ধীরে নিচে নেমে আসছে। সূর্যের তেজের মতো সুন্দর ভেজা শরীরে সেই ছোট ছোট জল বিন্দু গুলো চকচক করছে। ঢোক গিললো তরী।

–” অসভ্য ছেলেটা সারাদিন এমন উদোম উদোম ঘুরে নাকি? ছিঃ, কি লজ্জার ব্যাপার। সবাই তাকে এভাবে দেখে? মেয়েরাও?”

তরী ঘোরের বশেই জিজ্ঞেস করে বসলো।

–” হলে সারাদিন এমন উদোম উদোম ঘুরেন নাকি?”

শার্টের শেষ বোতামটা লাগাতে লাগাতে দেয়ালে টানানো আয়নায় নিজের মুখ দেখ ছিলো তরঙ্গ। হঠাৎ তরীর এমন প্রশ্নে তার হাত থেমে গেলো ক্ষণিকের জন্য। কয়েক সেকেন্ড নীরব রইলো সে। মনে মনে কিছু ভাবলো। তারপর ধীরে ধীরে তার ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে উঠলো। তরীর দিকে এগিয়ে এসে নরম স্বরে বললো সে;-

–” আপনাকে একবার জড়িয়ে ধরি তরী জান? জাস্ট ওয়ানা হাগ!”

তরী থমকে গেলো। কথাটা বলার সময় তরঙ্গের কণ্ঠ অদ্ভুত অসহায় আর কোমল শোনালো। মুখে জবাব না দিয়ে হাত বাড়িয়ে দিলো তরী। তরঙ্গ এগিয়ে এলো। নিজেদের দূরত্ব গুছিয়ে প্রশস্ত বক্ষবিভাজনে টেনে নিলো তরীকে। মুহূর্তেই দুজনের মাঝখানের সমস্ত দূরত্ব গুছিয়ে দুটো দেহ একে অপরকে আলিঙ্গনে লিপ্ত হলো। তরীর কপাল এসে ঠেকলো তরঙ্গের বুকের কাছে। সাদা শার্টটা থেকে পারফিমের স্ট্রং স্মেল আসছে। সেই সুবাসে মাখামাখি হয়ে উঠলো তরীর কায়া।

শক্ত বাহুর আবরণে মেয়েটাকে আগলে ধরে চোখ বন্ধ করলো তরঙ্গ। বহুদিনের ক্লান্তি শেষে; নিজের প্রিয় মানুষটাকে জাপটে ধরতে পেরে চোখ ছলছল করে উঠলো তরঙ্গের। তরী ও আর সরলো না। নিঃশব্দে আঁকড়ে ধরলো ছেলেটার শার্ট। বুকের ভেতর ধুকপুক করা হৃদস্পন্দন গুলো একে অপরের গায়ে মিশে যাচ্ছে সন্তর্পণে। নীরবতা কাটিয়ে স্নিগ্ধ স্বরে গেয়ে উঠলো তরঙ্গ।

–” আমার দেহের মাঝে,

মিশে যাও না তুমি।

এক দেহ নিয়ে, রবো তুমি আমি।”

গান শুনে মিটিমিটি হেসে ফেললো তরী। জবাবদিহির স্বরে তরঙ্গ উত্তর দিলো;-

–” আমি সারাদিন এমন উদোম হয়ে ঘুরি না। আপনাকে কাছে পেয়েই টি-শার্টটা বিসর্জন দিয়েছি। যদি একবার হলেও আপনার নজর পড়ে আমার উপর।”

মিনমিনিয়ে তরী বললো;-

–” কিন্তু আমি তো কালো। আপনার মতো সুন্দর কেউ আমার নজরে পড়ার জন্য এতো উদগ্রীব কেন?”

–” ভালোবাসা ম্যাম! ভালোবাসা কালো-সুন্দর, লম্বা-খাটো, পাপ-পুণ্য কিছুই দেখে না। ভালোবাসা শুধু ভালোবাসতে জানে।”

#চলবে

( প্রিয় পাঠক মহল,

ছোটো পর্ব দেওয়ার জন্য দুঃখিত। লেখিকারা ও মানুষ। সুখ-দুঃখ, উথান-পতন আমাদের জীবনে ও হয়। তাই, সমস্যা শেষ হলে বড় পর্ব পাবেন।)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply