ক্যাপ্টেনভিহানআরভিদ
লেখনীতে_সাদিয়া
পর্ব_৩
রাহার গান শুনে সবাই হকচকিয়ে গেলেও মুখে তাদের মিটিমিটি একটা হাসি দেখা গেলো। রাহা তবুও থামলো না সে নিজের মতো গান গাইতেই লাগলো।
আচমকা আড়চোখে ভিহান ভাই এর দিকে তাকাতেই তার গলা থেমে যায়। সাবান মাখা সুদীর্ঘ বলিষ্ঠ শরীর টা শিউড়ে তুলার মতো। ভিহান ভাই কে কাইল্লা না বরং ধলা বিলাই বলা যায়। পুরুষ মানুষ এতো সৌন্দর্যের অধিকারী হতে হবে কেন? নিহান ভিহান ভাই কে একটু রাগাতে গানটা ধরেছে সে। কিন্তু ওই রক্তচক্ষু দেখে এবার গান দূরের কথা গলা শুকিয়ে এলো তার।
ভিহান আগুন লাল চোখ নিয়ে কটমট করে তাকিয়ে রয়েছে রাহার দিকে। বাকি সবাই লুকিয়ে চুকিয়ে হাসছে। যদি ভিহান ভাই দেখে তাহলে তাদেরও রক্ষে নেই।
ভিহান কে এমন ক্ষিপ্ত ভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে ইতিউতি করে রাহা। গান থামিয়ে দিয়ে ঢোক গিলে হাসার চেষ্টা করল। আমতাআমতা সুরে জানালো,
“আসলে গানটা নতুন বে বের হয়েছে তো। বাজারে চলছে খুব।”
“কি গান গাইছিলি তুই?”
ভিহান ভাই এর চিবানো সুর শুনেই রাহার হালুয়া টাইট হয়ে যায়। মনে মনে বলে, “ভাগ রাহা ভাগ। বাঁচতে চাইলে বাঘের সামনে থেকে পালা।”
“ও ওই ভিহান ভাই। আমার আসলে ইয়ে পেয়েছে। আ আমি আসছি। গান নিয়ে আপনার সাথে আমি পরে কথা বলবো।”
রাহা কে আর পায় কে। সে দৌড়ে পালালো। রাফি চেঁচিয়ে বলল, “কি হলো আপু? তুমি কি পালিয়ে যাচ্ছো? তুমি না সবসময় বলো তুমি খুব সাহসী।”
বাগানে ফুলের গাছের আড়ালে গিয়ে চোখ রাঙ্গালো রাহা। হুমকি সুরে বলল, “আবার তোকে একা পাই শুধু রাফির বাচ্চা। ছেচনী ছাড়া ভর্তা বানাবো তোকে।”
সবাই কে মুখে হাত দিয়ে হাসতে দেখে ভিহান রাগান্বিত ভাবে ওদের দিকে তাকায়। মুহূর্তে সবাই চুপসে যায়। আস্তেধীরে বাগানের ওই জায়গাটাও ফাঁকা হয়ে আসে। ভিহান ফোঁসফোঁস করতে করতে ভাবে,
“তুই পাখি বড্ড লাফাচ্ছিস। খুব বার বেড়েছিস। তোর সাথে সাক্ষাৎ বড্ড জরুরি হয়ে গিয়েছে।”
থামে ভিহান। অবচেতন মনে আবার বিড়বিড় করে,
“পাখি উড়তে শিখেছে, অথচ শিকারি এখনো মাঠেও নামেনি।”
–
সন্ধ্যায় খান বাড়ি তে নাস্তার আসর জমেছে। প্রতিদিনকার মতো একজনের শূন্যস্থান টা আজ ভরাট হয়ে গিয়েছে বলে ষোলকলা হয়তো পূর্ণ হয়েছে। আফসানা, জাহানারা, নীলা মিলে গরম গরম পেঁয়াজু আর সিঙ্গারা ভেজেছে। সাথে চা বিস্কুট তো আছেই।
ছেলের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন আফসানা বেগম,
“তুই কি চা নিবি বাবা না কফি?”
সবসময়কার মতো গম্ভীর গলায় জবাব দিলো ভিহান, “একটা ব্ল্যাক কফি।”
সিঁড়ি দিয়ে তখন রাহা নামছিল। ভিহানের কথা শুনে তেঁতে উঠে মনে মনে বলে, “আপনি যেমন তিতা গিলেনও শুধু তিতা জিনিসই। আস্তো তিত করলা একটা।”
পরক্ষণে গরমগরম সিঙ্গার দেখে রাহা হুমড়ি খেয়ে পড়ল। এক ছুটে গিয়ে একটা সিঙ্গারা তুলে নিলো হাতে। সব ভুলে গরম সিঙ্গারা তেই বসালো এক কামড়। মাত্র তেলে ভেজে আনা গরম সিঙ্গারা আর মুখে সইলো না। আবারও সে দ্রুত মুখে ঢুকানো সিঙ্গারা হাতে নিয়ে এসে হু হা করতে লাগল। তার এমন কান্ড দেখে সামি রাফি হাসতে লাগল। আরমান খান বললেন মেয়েকে,
“আম্মা আস্তেধীরে খাও। গরম তো।”
রাফি বলে উঠল, “রাহা আপু খচ্চর চাচ্চু। একেবারে অস্বাস্থ্যকর।”
রাহা তেঁতে বলল, “চুপ কর বেয়াদপ। কানের নিচে একটা দিবো।”
“আহ, খাওয়ার সময় এত কথা বলতে নেই। আর রাহা মা সিঙ্গারা তো আছেই। পালিয়ে তো যাচ্ছে না। তুমি আস্তে খাও মা। প্রয়োজনে আরো বানিয়ে দেওয়া হবে তোমাকে।”
রাহা এবার মুখটা কালোই করে নিলো। মিনমিন সুরে বলল, “থাকলেই বা কি? সবাই এখনি সাবার করে দিবে? একটার বেশি পরে ভাগেই পাবো না।”
রাহার কান্ড তীক্ষ্ণ নজরে সবটা দেখে ভিহান বিরক্ত মুখে বলল, “স্টুপিড একটা।”
ভিহানের কথা শুনে উপস্থিত সবাই বুঝলো এটা সে কার উদ্দেশ্যে বলেছে। কিন্তু কেউ কিছু বলল না কথা আর বাড়ালো না। রাহারও পাত্তা না দিয়ে মুখ মুচড়ে ফু দিয়ে সিঙ্গারা খেতে লাগল।
ভিহান ফোন টিপছে আর চোখ তুলে মাঝেমাঝে দেখে খাওয়ার মাঝে ডুবে থাকা রাহা কে। ফোলোফোলো গাল দুটি দিয়ে সে যখন ফু দিচ্ছে তখন অদ্ভুত অস্বস্তি হচ্ছে ভিহানের মাঝে। নিজেকে বড্ড কষ্টে দাঁতে দাঁত চেঁপে সামলে রাখছে সে। মেয়েটা আসলেই একটা বিরক্তিকর। সবসময় এমন কিছু না কিছু করবেই যেটা ভিহান দেখতে চায় না। মেয়েটা বরং সেটা করেই তার অশান্তি বাড়িয়ে দেয়।
জিদান পেঁয়াজু হাতে নিয়ে বলল, “মা পেঁয়াজু তে কি পেঁয়াজ দিয়েছো নাকি অন্য সব কিছু দিয়েই কাম সেরে ফেলেছো?”
ততক্ষণে চা নিয়ে এসেছে জাহানারা আর আফসানা বেগম। চোখ পাকিয়ে বললেন তিনি, “একটা দিবো অসভ্য ছেলে। কাজ সারা কি হ্যাঁ? খেয়ে দেখ।”
জিদান পেঁয়াজু উল্টেপাল্টে বলল, “না মানে বাঙ্গালি মায়েরা পেঁয়াজুর মাঝে পেঁয়াজ কম দিয়ে বাকি সব কিছু দিয়ে কাজ সেরে ফেলে তো তাই বলছিলাম আরকি।”
রাহা খেতে খেতে বলল, “দোকানের ওই দুটো পেঁয়াজ দিয়ে বানানো পেঁয়াজুর থেকে বড়মার টা বেস্ট।”
“তুই বোনু এমন লোক যেখানে আদর পাবি সেখানেই বেশিবেশি তেল মারবি।”
“এসব কি কথা জিদান ভাই? হ্যাঁ? দেখেছো বড়বাবা তোমার পঁচা ছেলে কি বলে?”
রায়হান খান কিছু বলার আগে ভিহান চেঁচিয়ে উঠল,
“খাবার সময় এত কথা কিসের তোর রাহা? মুখটা কি একটু বন্ধ করে রাখতে পারিস না?”
রাহা কথার ফুসরতে আচমকা বলে ফেললো, “না।”
মুহূর্তে জায়গাটা কেমন নীরব হয়ে গেলো। সবাই একেঅপরের মুখের দিকে তাকালো। ভিহান মুখে মুখে তর্ক করা একদম পছন্দ করে না। এমন সহজ সরল উত্তরটা দিয়ে রাহা স্তব্ধ হয়ে গেলো। ধীরেধীরে ঘাড় ফিরিয়ে তাকালো ভিহানের দিকে। তীক্ষ্ণ লাল চোখ নিয়ে তার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। যেন এখনি তার উপর হামলে পড়বে। রাহা শুকনো ঢোক গিলল। হাসার চেষ্টা করে বলল,
“আ আসলে আমার পড়া আছে। এ এসাইনমেন্ট বাকি আ আছে। আমি যাচ্ছি।”
সিঙ্গারার প্লেটটার মাঝে আরো কয়েকটা পেঁয়াজু তুলে রাহা দৌড় দিলো। ভিহান কটমট চোখে তাকিয়ে তার দিকে। বেয়াদপ টা এখনি উস্ঠা খেয়ে পড়বে। মনে মনে এটা ভাবতে ভাবতেই রাহা হুচট খেয়ে পড়তে পড়তেও নিজেকে সামলে নিয়ে সিঁড়িতে উঠল।
সামি চেঁচিয়ে বলল,
“ও আপু? সিঙ্গারা গুলি নিয়ে নিলে কেন? দিয়ে যাও দুটো।”
“গু খা গিয়ে।”
রাহা এক ছুটে নিজের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলো। নিচ থেকে জাহানারা বেগম মেয়েকে বকতে লাগলেন। রাহার কান্ডে বাপ চাচারা হাসতে লাগলো। ভিহান কফির মগে গম্ভীর ভাবে চুমুক দিয়ে ভাবতে লাগল,
“কত দূর পালাবি তুই রাহা? পালিয়ে আর যাবিই বা কতদূর? তোকে ভিহান আরভিদ দেখে নিবে। খুব ভালো করে দেখে নিবে।”
রাতে খাবার টেবিলে সবাই এক সাথে বসেছে। কিন্তু রাহা আসেনি। সে নাকি পরে খাবে। রায়হান খান আরমান খান ডাকলেও আসলো না মেয়েটা। দুপুরে খাবার খেতে বসে যা হলো রাহা আর ভিহানের সাথে খেতে বসতে চাইবে না এটা স্বাভাবিক।
ভিহান ভরাট গলায় উচ্চস্বরে বলল, “সামি যা গিয়ে রাহা কে ডেকে আন। গিয়ে বলবি আমি ডেকেছি। এখনি যাতে নিচে আসে। আমাকে যদি উপরে যেতে হয় তবে ওর জন্যে কিন্তু সেটা ভালো হবে না।”
তার এক মিনিট পাড় হলো না রাহা কে নিচে আসতে দেখা গেলো। ভিহান বেশ ভালো করেই জানে এই মেয়েকে ভয় না দেখালে কথা শুনবে না। বজ্জাৎ হাড্ডি না একটা।
সবাই চুপচাপ করে খাবার খাচ্ছে। খাবার টেবিলে সবসময় যাও কথা হয় তা কেবল রাহা বলে আর রাহার জন্যেই অন্যদের কথা বলতে হয়। তবে পরিবেশটা আজ অন্যরকম। যেন রাহার জম বসে আছে আজ। তাই চুপচাপ ভদ্র মেয়ের মতো খাবার খাচ্ছে সে। ভিহান খাওয়ার ফাঁকেফাঁকে একবার দুইবার চোখ তুলে দেখছেও মেয়েটাকে।
নিজের পাতের গরুর গোশতের বেশ বড় একটা পিস ভিহান কামিলির পাতে তুলে দিলো। মেয়েটা হাস্যোজ্জ্বল মুখে কেবল তাকলো ভিহান ভাই এর দিকে। ভিহানও ইশারায় খেতে বললো। রায়হান খান ছেলের এহেন কাজে সন্তুষ্ট হোন। তিনি বেশ বুঝতে পারেন দুপুরে কামিলি চিংড়ি চেয়েছিল আর সেটা রাহা তুলে নিয়েছে বলে এখন ভিহান নিজেই কামিলির পাতে গোশত তুলে দিলো। উনার এই ছেলে চুপচাপ রাগী আর গম্ভীর হলেও সব দিকে নজর রাখার মতো বৃহৎ এক গুণের অধিকারী।
তাদের এই দৃশ্য দেখে রাহার শরীর জ্বলে উঠল। রাগে দাঁত কটমট করলো তার। শয়তান খবিশ একটা লোক। বাড়ির সবার সাথে ভালো শুধু তার বেলাতেই ধমক বকা আর রাগারাগি। মনেমনে হাজারটা বকাবকি করলো সে ভিহান ভাইকে। ক্ষিপ্ত ভঙ্গিতে এক নজরে তাকিয়ে রইল তার দিকে। তখন ভিহানেরও চোখ ওর উপর পড়তেই রাহা তাকে দেখিয়ে মুখ মুচড়ে খাবার ছেড়ে উঠে গেলো।
রাত প্রায় ১০ টার উপরে। রাহা নিচে নেমেছে ফ্রিজ থেকে কিছু নিবে বলে। যতক্ষণ সজাগ থাকে ততক্ষণ কিছু না কিছু তার খেতেই হবে। রান্নাঘর থেকে টুকটাক শব্দ শুনে রাহা এগিয়ে গেলো। আফসানা বেগম তখন কফি বানাচ্ছেন।
“এখন কি করো বড়মা?”
“তুই এখানে কেন? কিছু লাগবে?”
“না ওই দেখতে এলাম ফ্রিজে কিছু আছে নাকি।”
রাহার বোকা বোকা হাসি মুখ দেখে হাসেন আফসানা বেগম।
“তোর জন্যে কি ফ্রিজ খালি রাখা যাবে? দেখ ফিন্নি পায়েস সন্দেশ আর কমলা ডালিম আছে। বিকেল দিকে ভিহান আনলো।”
“সত্যি?”
“হ্যাঁ।”
রাহার ডালিম খুব পছন্দ। সারাক্ষণ কুটকুট করে খেতে তার ভীষণ ভালো লাগে। ডালিম কমলা পেয়ারা লিচু আম সফেদা তার খুব পছন্দের ফল। কয়েক বছর আগে ভিহান ভাই বাগানে আম লিচু পেয়ারা সফেদা গাছ লাগিয়েছে। এবছর আম ধরবে। গত বছরই লিচু গাছে ঝাঁকে ঝাঁকে মিষ্টি লিচু ধরেছিল। রাহা ভিডিও কলে উচ্ছ্বাসের সাথে ভিহান ভাই কে লিচু ভর্তি গাছ দেখিয়েছিল। অবশ্য ভিহান ভাই বেশিক্ষণ দেখেনি। বজ্জাৎ লোকটা একটু পরই কল কেটে দিয়েছিল।
“মা যা তো কফিটা ভিহানের ঘরে দিয়ে আয়।”
রাহা কপাল কুঁচকে তাকালো আফসানা বেগমের দিকে। আশ্চর্যান্বিত কন্ঠে বলল, “আমি?”
“হ্যাঁ যা তুই’ই দিয়ে আয় একটু। তোর বড়বাবা সেই কখন আমাকে ডেকেছে ঔষধের জন্যে। যা মা তাড়াতাড়ি দিয়ে যায়। ঠান্ডা হয়ে গেলে ছেলেটা আবার চেঁচাবে। ও গরমগরম কফি খেতে পছন্দ করে।”
আফসানা বেগম রাহার হাতে কফির মগ ধরিয়ে দিয়ে চলে গেলেন। যাওয়ার আগে ঘাড় ফিরিয়ে এক পলক দেখলেন চিন্তিত রাহা কে।
কফি হাতে রাহা ঠাই মেরে দাঁড়িয়ে আছে। কি করবে এখন? কফিটা কি দিয়ে আসবে নাকি এখানে ফেলেই চলে যাবে? পরে যদি কফি না পেয়ে চিৎকার চেঁচামেচি করে। যদি জানতে পারে সে কফি না দিয়ে নিজের ঘরে চলে গিয়েছে তাহলে আর রক্ষে রাখবে না জাঁদরেল টা।
সেই ভাবনাতেই রাহা কফির মগ নিয়ে গেল উপরে। দরজার সামনে গিয়ে হুট করে ঢুকে যেতে চাইল। পরক্ষণে থামলো সে। ভিহান ভাই ইউদ আউট পারমিশন ছাড়া তার ঘরে ঢুকা একদম পছন্দ করেন না। মনে পড়ল তার দুই বছর আগের ঘটনা। সেদিনও এভাবেই না বলে হুট করে ভিহান ভাই এর ঘরে ঢুকে পড়েছিল সে। ভিহান ভাই তখন প্যান্ট পড়ছিল। তাকে এভাবে নক না করে ঢুকতে দেখে খুব ঝেড়েছিল। এরপর তাকে পুরো এক ঘন্টা ওই রুমে কান ধরিয়ে দাঁড় করে রেখেছিল ভিহান ভাই। আর সে বসে বসে ল্যাপটপ ঘাটছিল। সেদিনের সেই শাস্তির কথা ভুলেনি সে। পায়ে সে কি ব্যথা হয়েছিল। এরপর থেকে রাহা আর কারো ঘরে ঢুকার আগে নক না করলেও ভিহান ভাই এর রুমে ঢুকার আগে অবশ্যই নক করে।
“ভিহান ভাই? আসবো?”
ভেতর থেকে লোকটার রাশভারী গলা শুনা যায়।
“আয়।”
রাহা ভেতরে ঢুকে। ভিহান তখন সোফায় ল্যাপটপ নিয়ে কাজ করছিল। রাহা কফির মগ নিয়ে পা টিপে টিপে ভেতরে এলো।
“আপনার কফি।”
রাহা তো রাহাই। ওকে দিয়ে কি আর কোনো কাজ সুষ্ঠু ভাবে হয় নাকি? ঘরে ঢুকে ঠিক সোফার সামনে টেবিলে গিয়ে যেই না কফির মগটা রাখতে যাবে ওমনি মগটা উল্টে কতটা কফি নিচে পড়ে গেলো। মগটা ট্রে থেকে নিচে পড়ার আগেই খপ করে ধরল রাহা। ভয়ার্ত নজরে তাকালো তীক্ষ্ণ দৃষ্টির অধিকারী লোকটার দিকে। মানুষটার এই নজর দেখলেই তার ভয় হয়। সব কিছু কেমন তালগোল পাকিয়ে গুলিয়ে যায়। ভয়ে ভয়ে রাহা ঢোক গিলল। বোকা বোকা একটা হাসি টানলো অধরে।
“আ আসলে বড়মা টা এত ভরে নিলো কফি। তা তাই..”
ভিহান তখনো সুচালো নজরে তাকিয়ে পর্যবেক্ষণ করছে ভয়ার্ত রাহা কে। রাহা দ্রুত পরিস্থিতি সামলাতে বলল,
“আ আমি এখনি মুছে দিচ্ছি।”
রাহা দৌড়ে গিয়ে মপটা নিয়ে এলো। সেটা দিয়ে দ্রুত করে মুছে ফ্লোরটা পরিষ্কার করতে লাগল।
ঠান্ডা ভার গলায় বলল ভিহান, “ওইখানটা ক্লিন কর। দাগ বসে যাবে।”
রাহা তো সবটাই পরিষ্কার করলো। ভিহান ভাই আর কিসের কথা বলছে? মপ হাতে নিয়ে সে ঘুরে ঘুরে বলল, “কোথায় ভিহান ভাই? কোথায় পরিষ্কার করবো?”
“মরার উপর খাঁড়ার ঘা” বলে একটা প্রবাদ আছে না ওটাই বোধহয় হলো রাহার সাথে। মপের সাথে বেঁধে টেবিলে থাকা ক্রিস্টাল ফুলদানি টা ফ্লোরে পড়ে টুকরো টুকরো হয়ে গেলো। তা দেখে রাহার মুখটা একেবারে চুপসে গেলো। অসহায় মুখ করে সে তাকলো ভিহান ভাই এর দিকে। ইশশ রে এটা তো ভিহান ভাই এর খুব পছন্দের টপ ছিল। কত করে বলেছিল “ভিহান ভাই টপ টা আমাকে দিয়ে দিন না। এটা আমি আমার টেবিলে সাজাবো।” কিন্তু ভিহান ভাই কোনোদিন তাকে টপটা দেয়নি। সবসময় ধমকে বলতো, “হাত লাগাবি না ওটায়।” আর সেই টপটাই নাকি সে ভেঙ্গে ফেললো। এখন কি হবে? টপ ভাঙ্গার অপরাধে ভিহান ভাই না জানি কি করে তার উপর। এর চেয়ে ভালো ছিল কফির মগটা নিয়ে এ ঘরে না আসাই। রাহার খুব কান্না পেলো। ভিহান ভাই যদি এবার তাকে মারে?
“আ আমি ইচ্ছা করে ক করিনি ভিহান ভাই। বি বিশ্বাস করুন।”
ভিহান রাগে গজগজ করতে করতে উঠে দাঁড়ালো। রাগান্বিত চোখে রাহার দিকে তাকিয়ে ক্ষিপ্ত কন্ঠে বলল,
“একটা কাজও কি তুই ঠিক করে করতে পারিস না ননসেন্স? সব কাজে তোর কিছু না কিছু না ঘটালে তোর হয় না?”
“আমি দেখিনি বিশ্বাস করুন। ভুল হয়ে গিয়েছে। মাফ করে দিন না ভিহান ভাই।”
রাহার আধোআধো মুখটা দেখে থমকে যায় ভিহান।
“আমি এখনি পরিষ্কার করে দিচ্ছি।”
রাহা এক পা বাড়াতেই ভিহান তড়িৎ বেগে এগিয়ে গিয়ে রাহার হাত টেনে আনে। ক্রুদ্ধ নয়নে তাকায় রাহার পায়ের দিকে। খালি পায়ে গাঁধা টা ওগুলি পরিষ্কার করতে যাচ্ছিল? ভিহান রাগী গলায় ধমকে বলে উঠে,
“কোনো কাজ তোকে দিয়ে ঠিক করে হয় না? কবে বড় হবি তুই রাহা? কবে সব কিছু বুঝতে শিখবি ইডিয়েট?”
রাহা অপরাধী ভঙ্গিতে মাথা নিচু করে নেয়। লঘু আওয়াজে জবাব দিয়ে বলে,
“আমি যথেষ্ট বড় হয়েছি ভিহান ভাই। আমি এবার ইন্টারে পড়ি।”
“কানের নিচে ঠাটিয়ে একটা দিলেই বুঝে যাবি তুই একটুও বড় হোসনি। এখনো বাচ্চামো স্বভাবটা ছাড়িসনি।”
“বললামই তো আমার ভুল হয়ে গিয়েছে। তবুও আপনি ধমকাচ্ছেন। আপনি সবসময় আমার সাথে এমন করেন।”
ভিহান দাঁতে দাঁত চাঁপল। অল্প সময় নিয়ে পিষে বলল, “তোর এই ছেলেমানুষি করা বিষয়টা আমাকে অশান্তি দেয়। বড্ড বিরক্ত বোধ করি আমি। শুনেছিস তুই রাহা? আই রিপিট এগেইন ফ্রাস্টেট ফিল করি স্টুপিড।”
রাহার এবার কান্না পেলো। মাথা নিচু করে দুই হাত সমানে কঁচলে যাচ্ছে। ভিহান সটান হয়ে দাঁড়িয়ে সবটা খেয়াল করছে। মেয়েটার কমলা আভাযুক্ত চিকন কোমল ঠোঁট গুলি তিরতির করে কাঁপছে। ভিহান দ্রুত ঘাড় বাঁকিয়ে নিলো। পরিস্থিতি আঁচ করে ধমকে উঠল আবারও,
“ওই কাঁদবি না। আমার সামনে এক ফোটা চোখের পানি বের হলে সারারাত বাগানে দাঁড় করিয়ে রাখবো কেউ আটকাতে পারবে না কিন্তু।”
রাহার এবার হাত পা ছড়িয়েছিটিয়ে কান্না করতে মন চাইল। কিন্তু ভয়ও হলো আবার। সত্যি যদি ভিহান ভাই সারারাত বাগানে দাঁড় করিয়ে রাখে? সেই চিন্তা করে রাহা অনবরত নাক টানলো যে চোখ দিয়ে কোনো ভাবে পানি না পরে। আস্তো রাক্ষস একটা। এক নাম্বারের জল্লাদ।
ভিহান আড়চোখে একপল রাহা কে দেখে নিজেই এগিয়ে গেলো টুকরো গুলো পরিষ্কার করতে। কাঁচের টুকরো গুলো ডাস্টবিনে ফেলে ফ্লোরটা মপ দিয়ে ভালো করে মুছে নিলো।
এরপর রাহার দিকে ফিরে মোটা গলায় বলল, “কোথাও যাবি না। এখানেই দাঁড়া।”
ভিহান ওয়াশরুম থেকে হাত ধুয়ে এসে চোখ তুলে তাকালো রাহার দিকে। মেয়েটা এখনো নাক টেনে কান্না আটকানোর বৃথা চেষ্টা করে যাচ্ছে। ওর নাক টানার দৃশ্যটা দেখে যে কারো হাসি আসতে বাধ্য। ভিহান গভীর নয়নে দেখল দৃশ্যটা। অদ্ভুত এক হাওয়া তার ঠোঁট ছোঁয়ে ঘেঁষে গেলো। সে সহজাত ভঙ্গিতে এগিয়ে গেলো নিজের কার্বাডের দিকে। সেখান থেকে একটা মলম নিয়ে আবারও এগিয়ে এলো রাহার দিকে। ভিহান ভাই কে আসতে দেখে চোখ উপরে তুলল রাহা। দুজনের চোখে চোখ পড়ল। ভিহান ভাই কে স্থির হয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখে অগত্যা রাহাই দৃষ্টি নিচু করে নিলো আবারও।
ভিহান কথা ছাড়াই রাহার বাহু ধরে ওকে বিছানায় বসিয়ে দিলো। আচমকা কাজে হকচকিয়ে গেলো মেয়েটা। ভড়কে তাকালো ভিহান ভাই এর দিকে। ভিহান রাহার আশ্চর্যান্বিত দৃষ্টি দেখে নীরবে নিঃশব্দে হাটু গেড়ে নিচে বসে পড়ল। রাহা হতভম্বের মতো সন্দিহানি প্রশ্নাত্মক নয়নে তাকিয়ে ভিহান ভাই এর মুখের দিকে। আশ্চর্য লোকটা নিচে বসেছে কেন? কি করতে চাইছে?
ভিহান কোনো রকম কথা না বলে চুপচাপ রাহার পা টা নিজের হাটুর উপর রাখল। আচমকা কাজে বিস্ময়ে হকচকিয়ে গেলো রাহা। ভিহান ভাই এর স্পর্শ লাগতেই পুরো শরীরটা দুলে উঠল বৈদ্যুতিক শকের মতো। তৎক্ষণাৎ সে নিজের পা টা দ্রুত ভিহান ভাই এর হাটুর উপর থেকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলো। কিন্তু ভিহান উল্টে তার পায়ের গোড়ালি চেঁপে ধরে বলে উঠল,
“উঁহু, একটুও নড়াবি না।”
গলাটা শুকিয়ে এলো রাহার। অনুভব করল ভেতরের কাঁপুনি। বড্ড অস্বস্তিতে ভেতরটা রাহার ছটফট করা শুরু করল।
ভিহান নিঃশব্দে রাহার পায়ের কানী আঙ্গুলে মলম টা আস্তেধীরে লাগিয়ে দেয়। হঠাৎ অদ্ভুত কারণে রাহার ভেতরটা উত্থলিত হওয়া শুরু করেছে। আজব বুকের ভেতরটা এত ধড়ফড় করছে কেন তার। কোনোরকম আবারও ঢোক গিলল রাহা।
মলম লাগিয়ে ভিহান মাথা তুলে তাকালো বিছানায় বসে থাকা রাহার দিকে। এখনো তার হাটুর উপর পড়ে থাকা পা ছুঁয়ে আছে ভিহান। আলতো নয়নে রাহার দিকে তাকিয়ে অদ্ভুত কোমল স্বরে বলল সে,
“কবে বড় হবি তুই রাহা? আর কবে অন্তত নিজেরটা বুঝতে শিখবি?”
ভিহান ভাই এর এমন নরম কন্ঠ শুনে শরীর শিউড়ে উঠল রাহার। গায়ে কাটা দিয়ে উঠল এমন লেগেছে। ভেতরের তীব্র অস্বস্তিতে সে কোনো রকম উঠে দাঁড়ালো। ভিহান ভাই এর থেকে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে হাঁসফাঁস করতে লাগল।
ভিহান তখনো এভাবে হাটু মুড়ে কিয়ৎক্ষণ বসে থেকে উঠে দাঁড়ালো। প্রবল অস্বস্তি আর কৌতূহলে প্রশ্ন করলে বসল রাহা,
“ভি ভিহান ভাই আপনার কি কিছু হ হয়েছে? শরীর জ্বর? নাকি আপনার ভূ ভূতে ধরেছে?”
শান্তশিষ্ট মেজাজটা হুট করে গরম হয়ে গেলো ভিহানের। বিরক্তিটা হজম করে কপাল কুঁচকে সে খেঁকিয়ে উঠল,
“কেন?”
“ন না আপনি যে এ এভাবে নরম সুরে আ আমার সাথে কথ কথা বলছেন তাই মনে হলো আপনায় ভূতে ধরেছে।”
“স্টুপিড কোথাকার। মাঝেমাঝে তোকে মনে হয় আস্তো গিলে ফেলি রাহা।”
বোকা রাহা ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকে। কি বলল এটা ভিহান ভাই?
“তারমানে আমি এমনি এমনি বলি না। আপনি আসলেই রাক্ষস ভিহান ভাই?”
ভিহানের মেজাজ এবার সত্যি তুঙ্গে উঠল। দাঁত কটমট করে বলল, “ওই না আসলে…”
রাহার কথা জড়িয়ে আসে। সে দ্রুত রুম ছেড়ে বের হতে চাইলে শক্ত গলায় বলে উঠে ভিহান,
“দাঁড়া কোথায় যাচ্ছিস?”
রাহা থমকে দাঁড়ায়। বোকা বোকা হেসে বলে,
“রাত অনেক হয়েছে ভিহান ভাই। ঘুমাতে যাই। কেমন গুড নাইট?”
রাহা কিছু বলা কিংবা পালানোর আগেই ভিহান ওর দিকে স্থির দৃষ্টি নিবদ্ধ করে পা বাড়ায়। শার্টের বোতামে হাত দিয়ে একটা একটা করে বোতাম খুলতে খুলতে এগিয়ে আসতে থাকে রাহার দিকে। হতভম্ব রাহা নির্বোধের মতো প্রশ্ন করে,
“ক কি করছেন ভিহান ভা ভাই?”
ভিহান শার্টের বোতাম খুলে এগিয়ে আসতে আসতে ক্ষীণ গলায় বলে,
“আমি কাইল্লা কি না তা তোকে দেখাতে হবে না রাহা? আমাকে দেখে যে গান গাইলি তোর সেই গানের মর্মার্থ বুঝাবি না আমায়?”
চলমান…..
কেমন হচ্ছে অবশ্যই জানাবেন….
Share On:
TAGS: ক্যাপ্টেন ভিহান আরভিদ, সাদিয়া
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ের ব্যাকুলতা পর্ব ১০
-
প্রণয়ের ব্যাকুলতা পর্ব ১১
-
প্রণয়ের ব্যাকুলতা পর্ব ৮
-
ক্যাপ্টেন ভিহান আরভিদ পর্ব ৭
-
ক্যাপ্টেন ভিহান আরভিদ পর্ব ১
-
প্রণয়ের ব্যাকুলতা পর্ব ২২
-
প্রণয়ের ব্যাকুলতা গল্পের লিংক
-
ক্যাপ্টেন ভিহান আরভিদ পর্ব ১৭
-
ক্যাপ্টেন ভিহান আরভিদ পর্ব ১৯
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১৪