#কানুন_ভিলা
#ফারহানা_কবীর_মানাল
৩.
ড্রাইভারটা আজকাল তোহার কথা শুনছে না। কাজে ফাঁকি দিচ্ছে। দুপুরে কল দিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। ফোন বন্ধ। এখন ফোনে পাওয়া গেলেও আসতে দেরি করছে। সে মেজাজ ধরে রাখতে পারল না। জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিতে লাগল।
আকাশে মেঘ জমতে শুরু করেছে। থেমে থেমে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। তোহা সদর দরজার পাশে সরে দাঁড়াল। মিনিট বিশেক দাঁড়িয়ে থাকার পর ড্রাইভার এলো। লম্বা হাই তুলে পান খাওয়া লালচে দাঁত বের করে হাসল। মিনমিনে গলায় বলল, “শরীরটা ভালো যাচ্ছে না ম্যাডাম। শরীরে কোন বল পাই না।”
“কিছু করার নেই। আমাকে যেতে হবে।”
“এতো রাতে কোথায় যাবেন?”
“সে কৈফিয়ত তোমাকে দিতে হবে নাকি?”
“উঁহু! আপনি এতো রেগে যাচ্ছেন কেন? ঠিকানা না দিলে কোথায় নিয়ে যাব!”
“গাড়ি বের করো। গাড়িতে বসে বলছি।”
ড্রাইভার গাড়ি বের করল অনিচ্ছায়। তার চোখ-মুখে বিরক্তি ছাপ স্পষ্ট। তোহা গাড়িতে উঠে বসল। সে গাড়িতে বসেই সোহেলের গাড়ি ঢুকলো। সোহেলের সাথে একটা মেয়ে এসেছে। মেয়েটা মাথায় ঘোমটা দিয়ে বউ বউ ভাব নিয়ে এসেছে। তোহা গাড়ি থেকে নেমে পড়ল। তীক্ষ্ণ গলায় বলল, “এই মেয়েটা কে? সোহেল, আমার কথার জবাব দাও। এই মেয়েটা কে? তোমার সাথে কী করছে?”
সোহেল তোহার বাহু ধরে তাকে একপাশে নিয়ে গেল। নরম স্বরে বলল, “বুঝিয়ে বলার সুযোগ দাও।”
“কী বলতে চাও তুমি?”
“তোহা প্লিজ, সিনক্রিয়েট করো না। ঘরে চলো।”
সোহেল মেয়েটাকে গেস্ট রুম দেখিয়ে দিলো। রাতের খাবারের ব্যবস্থা করল। তোহা বলল, “কে এই মেয়ে? এর আগে তো কখনো দেখিনি।”
“আমার পরিচিত। ঝামেলায় পড়েছে। তাই কয়েকদিন আমাদের বাসায় থাকবে।”
“ওহ আচ্ছা! কয়েকদিন এখানে থাকবে। কেন থাকবে?”
“ঝামেলায় পড়েছে সেজন্য থাকবে। প্লিজ ঘরে চলো, আমি তোমাকে সব বুঝিয়ে বলব।”
“কী বোঝাবে তুমি? এটা কী কোন সরাইখানা? যে কেউ বিপদে পড়লেই এখানে এসে উঠবে?”
“আস্তে কথা বলো তোহা, শুনতে পাবে।”
“শুনতে পেলে কী হবে সোহেল? তোমার মানসম্মান নষ্ট হয়ে যাবে?”
“তুমি এভাবে কথা বলছ কেন?”
“কীভাবে কথা বলছি আমি? মাঝরাতে তুমি একা একটা মেয়েকে বাড়িতে এনে ওঠাবে, কিছুদিন থাকতে বলবে। আর আমি কোন প্রশ্ন করতে পারব না?”
সোহেল ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস গোপন করল। তোহা বলল, “মেয়েটাকে দেখে মনে হলো সে অন্তঃসত্ত্বা। সত্যি করে বলো সোহেল, এই মেয়ের সাথে তোমার কী সম্পর্ক?”
“খানিকক্ষণ আগেও তোমাকে কৈফিয়ত দেওয়ার প্রয়োজন মনে করছিলাম। তবে এখন আর সে প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি না।”
“এ কথার মানে কী?”
“কোন মানে নেই তোহা। ঘরে যাব আমি। আমার পথ ছাড়ো।”
“রাতের খাবার?”
“আমার খিদে নেই। তোমার খাওয়া না হলে খেয়ে নাও।”
সোহেল ঘরে চলে গেল। সে ঘরে যেতেই মাহিরা এলো। বিস্মিত মুখে বলল, “তোমরা কী ঝগড়া করছিলে?”
তোহা মাথা দুলিয়ে কী যেন বলল। অর্থ বোঝা গেল না।
সোহেল বিছানায় বসে মাথার চুল খামচে ধরে আছে। তার মেজাজ বিগড়ে গেছে। তোহা কীভাবে কিছু না জেনেশুনে এমন ব্যবহার করতে পারল? সে কী তোহার থেকে কিছু লুকাতে চেয়েছে? সোহেল বিরক্তির নিঃশ্বাস ফেলে কপাল কুঁচকে রইল।
খানিকক্ষণ পর তোহা ঘরে ঢুকল৷ সোহেলের পাশে বসতে বসতে বলল, “এমন ব্যবহারের জন্য দুঃখিত। দেরি করে ফিরেছ দেখে মেজাজ ঠিক ছিল না। আমি খুবই দুঃখিত।”
“সমস্যা নেই।”
“মেয়েটা কে? কেমন পরিচিত?”
সোহেল সরল চোখে তোহার দিকে তাকালো। তোহার চোখ-মুখে ভয়ের ছাপ স্পষ্ট। সোহেল বলল, “সত্যি বলতে মেয়েটা আমার পরিচিত কেউ না। আগে-পরে কখনো কথা হয়নি।”
“তাহলে?”
“আমার পছন্দের সেই চায়ের দোকানটা মনে আছে?”
“মনে থাকবে না কেন? মনে আছে।”
“মেয়েটা দোকানের সামনের বাড়িতে ভাড়া থাকত। যেতে আসতে মাঝেমধ্যে দেখেছি।”
“তারপর?”
“আজ হঠাৎ দেখি মেয়েটা রাস্তার ভেতর দাঁড়িয়ে কাঁদছে। বাড়িওয়ালা তাকে নানান কটুকথা শোনাচ্ছে। লোকজন তাদেরকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম– কী হয়েছে? বাড়িওয়ালা বলল– মেয়েটা ছ’মাস ধরে বাসা ভাড়া দিচ্ছে না। তাই তাকে আর ও বাসাতে থাকতে দেবে না।”
“ভাড়া মিটিয়ে দিতে?”
“ভাড়া মিটিয়ে দিয়েছি তোহা। তবে বাড়িওয়ালা উনাকে আর তার বাসায় থাকতে দেবে না। একা একটা মেয়ে, তার উপর অন্তঃসত্ত্বা। বাজে ছেলেপুলেদের উৎপাত কে সহ্য করবে!”
“এতদিন কীভাবে সহ্য করেছে?”
“এতদিন লোক জানত না। এখন জানাজানি হয়ে গেছে। তবে চিন্তা করো না। উনার স্বামীকে কল দিয়ে সবকিছু জানানো হয়েছে। সে সৌদি আরব থাকে। বাড়িতে ঝামেলা তাই বউকে আলাদা রেখেছিল। কাল পরশুর মধ্যে উনার বাড়ির লোক চলে আসবে।”
তোহা সোহেলের কথা বিশ্বাস করল। আলমারি খুলে সোহেলের কাপড় চোপড় বের করে দিয়ে বলল, “কাপড় বদলে খেতে এসো। আব্বু চিংড়ি পোলাও রান্না করেছেন।”
সোহেল কাপড় হাতে বাথরুমে ঢুকে গেল। কাপড় বদলে তারা দু’জনে একসাথে খেতে বসল।
তোহার ঘুম ভাঙলো বেলায়। অনেক রাত পর্যন্ত ঘুমতে পারেনি। দারোয়ানের কথা মাথায় ঘুরছে। লোকটা কী চাইছে? অনেক ভেবে সে একটা সিদ্ধান্ত পৌঁছেছে। টাকা চুরির দায়ে চাকরি যাওয়ার পর সে প্রতিশোধ নিতে চাইছে। সেজন্যই টাকাগুলো তার হাতে ধরিয়ে দিয়ে গিয়ে এসব গল্প ফাঁদছে। তোহা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। ঘড়িতে সকাল দশটা। সোহেল অফিসে চলে গেছে। তোহা হাত-মুখ ধুয়ে নিচে নামল। তবে খেতে বসল না। সোজা গেস্ট রুমে ঢুকে গেল।
রাতে আসা মেয়েটা বিছানায় বসে চুল আঁচড়াচ্ছিল। সে তোহাকে দেখে উঠে দাঁড়াল। নরম স্বরে বলল, “আপনি?”
তোহা বলল, “আপনি কে ওইটা আগে বলুন।”
তার গলার স্বর খটখটে। মেয়েটা বলল, “আমার নাম সুরভি। সুরভি খাতুন।”
“নাম দিয়ে কী যায় আসে? অন্য পরিচয় বলেন। এখানে কেন এসেছেন?”
সুরভি তাকে সব খুলে বলল। প্রতিটা কথা সোহেলের কথার সাথে মিলে যায়। তোহা বলল, “বিপদে পড়েছেন আর একজন ছেলের হাত ধরে তার বাড়িতে চলে এসেছেন চক্ষুলজ্জা বলে কিছু নেই?”
“লজ্জা দিয়ে কী জীবন বাঁচে? বাঁচে না।”
“এ কথার মানে কী?”
“আপা, আমি সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা। মাস পাঁচেক আগে শ্বশুর বাড়িতে ঝামেলা করে বাপের বাড়িতে গিয়ে উঠেছিলাম। কিছুদিন সেখানে থাকার পর তারাও নানান ফ্যাকড়া শুরু করল।”
“যেমন?”
“মা বলত– স্বামীর কাছ থেকে আমার খাওয়া পরার খরচ চাইতে। আমিও চাইতাম। সে-ও খরচ পাঠাত। সে টাকা পাঠাতো দেখে আমার বাপ ভাই কাজ করা বন্ধ করে দিলো। পায়ের উপর পা তুলে তার টাকায় খাবে। গোটা সংসার তার মাথার উপর চাপিয়ে দিলো। সে সবেসবে সৌদি আরব গিয়েছে লেভার ভিসায়। অল্প বেতন। ধারদেনা করে দালালের মাধ্যমে গেছে। মাস শেষে লোনের টাকা দিতে হয়। নিজের বাপ মাকে দিতে হয়। এমন পরিস্থিতিতে যেসব সমস্যা হয় আর কী। বোঝেনই তো। তবে আমার স্বামী ভাল। সে দুই দিকই ম্যানেজ দিয়ে চলতে লাগল। আমাকে দুশ্চিন্তা করতে নিষেধ করত।”
“ভাড়ায় বাসায় উঠলেন কীভাবে?”
“হঠাৎ একদিন আমার স্বামী আমারে জিগাইলো বাচ্চা কেমন আছে, আমার শরীর সুস্থ কি-না, ওষুধের টাকা লাগবে কি-না। তার কাছ থেকেই জানলাম মা আব্বা আমার চিকিৎসার কথা বলে তার থেকে দুই লাখ টাকা এনেছে। তাকে বলেছে আমার বাচ্চা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আমার গায়ে রক্ত কম। ডাক্তার বলেছে মা বাচ্চা দু’জনকে বাঁচাতে হলে লাখ দুয়েক টাকার মতো লাগবে। সে তার সাথে কাজ করে একজনের কাছ থেকে টাকা ধার করে মাকে পাঠিয়েছে। এমন মিথ্যে কথা শুনে আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। মার কাছে টাকা চাইতে সে বলল– তোর বাপ জমি কিনেছে, পরে শোধ দিয়ে দেবে। এরপর কী আর সেই বাপের বাড়িতে থাকা যায়? ভাড়া বাসায় এসে উঠলাম।”
সুরভির কথার মাঝে তোহার ফোন বেজে উঠল। দারোয়ান কল দিয়েছে। সে কল রিসিভ করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
“হাতেনাতে ধরতে পেরেছিস মা?”
“দেখুন, আমাকে কল দিয়ে এসব অবান্তর কথা বলা বন্ধ করুন। বেশি বাড়াবাড়ি করলে আমি সোহেলকে সব কথা বলে দেব।”
“এখনও কেন দিচ্ছিস না মা?”
তোহা চমকে উঠল। তক্ষুনি তার মাথায় কোন জবাব এলো না। দারোয়ান বলল, “তুই সোহেলকে সব বলছিস না কারণ তুই আমাকে পুরোপুরি অবিশ্বাস করতে পারছিস না।”
“আপনার মতো লোককে বিশ্বাস করার কিছু নেই।”
“মেমোরি কার্ডে কী আছে দেখেছিস?”
“না দেখিনি। যে আমার আর আমার স্বামীর অমন ছবি তুলতে পারে তার দেওয়া মেমোরি কার্ডে কী আছে দেখার রুচি হয়নি।”
“খারাপ কিছু ছিল না। যাইহোক, দেখতে হবে না। একটা কথা জিজ্ঞেস করি।”
“কী কথা?”
“সোহেল তোকে সব কথা সত্যি বলে?”
“হ্যাঁ, বলে। অন্তত আমি তা-ই বিশ্বাস করি।”
“তাহলে বেশ। তুই সোহেলকে জিজ্ঞেস করল তোর ননদের নামের ওই কাকুন ভিলার রহস্য কী, আসল নাম কী?”
“ও বাড়ি শ্বশুর আব্বু কিনেছেন। সোহেল কী জানবে?”
“আহা! সোহেলকে জিজ্ঞেস কর। প্রয়োজনে তোর শ্বশুরকে জিজ্ঞেস কর। আমি নিশ্চিত কেউই তোকে সত্যি বলবে না। ওরা তোকে ওদের পরিবার মনে করে না।”
“কীসের ভিত্তিতে এসব কথা বলছেন?”
“সত্যি শোন মা। ওই কাকুন ভিলার আসল নাম কানুন ভিলা। আমার কথা বিশ্বাস করতে হবে না। সোহেলকে জিজ্ঞেস কর, তোর শ্বশুরকে জিজ্ঞেস কর। তারপর ওই বাড়ির সদর দরজায় লাগানো নামফলক ভেঙে দেখ। কাকুন ভিলার নিচে পাথরে খোদাই করা কানুন ভিলা লেখা পাবি। স্পষ্ট পাবি।”
কল কে’টে গেল। তোহা এলোমেলো পায়ে হেঁটে ডাইনিং টেবিলে এসে বসল। তার গলা শুকিয়ে গেছে। পানি কই? পানি খেতে হবে।
চলবে
Share On:
TAGS: কানুন ভিলা, ফারহানা কবীর মানাল
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
তোমার হাসিতে পর্ব ১৭
-
কানুন ভিলা পর্ব ২
-
তোমার হাসিতে পর্ব ১৩
-
তোমার হাসিতে পর্ব ২
-
তখনও সন্ধ্যা নামেনি পর্ব ২
-
তোমার হাসিতে পর্ব ৭
-
তোমার হাসিতে পর্ব ২২
-
তোমার হাসিতে পর্ব ২০
-
তখনও সন্ধ্যা নামেনি পর্ব ৩
-
তোমার হাসিতে সূচনা পর্ব