Golpo কাজরী

কাজরী পর্ব ৪৪+৪৫


#কাজরী-৪৪+৪৫

#সাবিকুন_নাহার_নিপা

আল্পনা বাসায় এসেছে আজ। প্যালেসে কাউকে জানিয়ে আসে নি কিছু। বাসা লক করা ছিলো। ঘরে ঢুকে ও নিজের ব্যক্তিগত ড্রয়ার থেকে বাবার চাবিগোছা বের করলো। সুবর্ননগর যাবার দিন বাবা চাবির গোছাটা ভুল করে ফেলে রেখে গিয়েছিলেন টেবিলের উপর। অন্য কারো নজরে আসার আগে আল্পনা সরিয়ে নিলো। বাবা না থাকার সময়ে চাবিটা ব্যবহার করে ও আলমারি খুলবে। কিন্তু তারপর যা ঘটে গেছে, চাবিগোছার কথা ভুলেই গিয়েছিল।

আল্পনা বাবার ঘরে গেল। তার ঘরে আধুনিক কেবিনেট থাকলেও পুরোনো আমলের একটা আলমারি আছে যেটার চাবি তিনি কখনো কাছ ছাড়া করেন না। আগে কখনো ওর কৌতূহল হয় নি, যখন থেকে কাজরীর জন্মরহস্য সামনে এলো তখন থেকে ওর কৌতূহল বেড়েছে। এই আলমারিতে থাকলেও থাকতে পারে গোপন কিছু। বিশেষ করে সেই সময়ের কিছু এভিডেন্ট, যখন ওর মা ডাকাতের কবলে পড়েছিল।

আলমারির তাকে বেশ কিছু ফাইল। দুটো ড্রয়ারে কাগজপত্র ছাড়া তেমন কিছু নেই। জমির দলিল সংক্রান্ত কাগজপত্র, এছাড়া আরও কিছু ডকুমেন্টস। একটা লাল ফাইলের মতো পেল, সেখানে মায়ের পুরোনো কিছু প্রেসক্রিপশপন, ডাক্তারের কিছু কাগজপত্র। আল্পনা হতাশ হয়। খুব আশা করে ছিলো গুরুত্বপূর্ণ কিছু খুঁজে পাওয়া যাবে।

আল্পনা কাগজপত্র গুলো দেখছে। মায়ের প্রেসক্রিপশন যে ফাইলে ছিলো সেগুলোর ছবি তুলে নিলো। ড্রয়ার বন্ধ করে আলমারি লক করার সময় হঠাৎ উপরের তাকে ধাক্কা দিলো। উপরের অংশ ফাঁকা হতেই দেখতে পেল আরেকটি গুপ্ত ড্রয়ার। আল্পনা সেটা খুলে ফেলল। পুরোনো ছবির অ্যালবাম, কিছু পুরোনো কাগজপত্র। সবগুলো বের করে আনলো। অ্যালবাম ভর্তি ওর মায়ের বিভিন্ন সময়ের ছবি। বিয়ের ছবি, ও’কে কোলে নেয়া ছবি। বাবার সঙ্গে হাস্যেজ্জ্বল কিছু ছবি। সব ছবিগুলো মায়ের সুস্থ থাকার সময়ে তোলা। আল্পনা অবাক হয়, কী রুপবতী ছিলেন তিনি! পুরোনো ছবি হলেও রঙিন ছিলো সেগুলো। বিয়ের ছবিতে লাজুক মুখে বসে আছেন। আল্পনার মন ভার হয়। সবকিছু গুছিয়ে রাখে ঠিক আগের মতো। চাবিগোছা নিয়ে বেরিয়ে আসে। বাবা কতো পুরোনো ছবিও যত্ন করে রেখেছেন। অথচ ওদের দুই বোনের ছোটবেলার কোনো ছবি তার কাছে নেই৷ আল্পনা নিজের আর কাজরীর যে ছবিগুলো পেয়েছে সেগুলো সাত, আট বছর বয়সের। তার আগের ছবি পায় নি। বাবা কাজরীকে আড়াল করতে চেয়েছিলেন বলেই এতো সচেতন ছিলেন। মেয়ে না হয়েও কতো যত্ন, ভালোবাসা পেয়েছে কাজরী। কতো সৌভাগ্য ওর। আর আল্পনা! বাবার সঙ্গে তেমন ভালো, খারাপ কিছু স্মৃতি মনে পড়ে না। মা যেমন আল্পনা আল্পনা করে কাছে ডাকতেন বাবা তেমন ই দূরে সরিয়ে রেখেছিলেন। আজ তো সবকিছু স্পষ্ট, বাবা ও’কে ভালোবাসেন নি। কিংবা বেসেছিলেন ও বুঝতে পারে নি। তবে কাজরীর জন্য যে আকুলতা আছে সেটা স্পষ্ট টের পাওয়া যায়। আল্পনা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, কাজরী শুধু শুধুই বলে ওর কেউ নেই। আখতারউজ্জামান বলে একজন লোক যার সঙ্গে ওর ব্লাড রিলেশন না থাকা স্বত্তেও তার অকৃত্রিম ভালোবাসা শুধু কাজরীর জন্যই ছিলো।

****

আখতারউজ্জামান আজ কথা বলতে পারছেন। এতোদিন চোখ খুলে সবাইকে দেখলেও কথা বলার মতো শক্তি পান নি। ভীষণ ক্লান্ত অনুভব করেছেন। আধো ঘুমে নিজের ছোটবেলার দিনগুলোতে ফিরে গিয়েছিলেন বার বার। চোখ বন্ধ করলেই শৈশব, কৈশোরের দিনগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠতো বারবার।

আখতারউজ্জামানের হাত ধরে বসে আছে কাজরী। নরম গলায় প্রশ্ন করলো,

“বাবা এখন কী আগের চেয়ে একটু ভালো লাগছে? “

আখতারউজ্জামান হাসার চেষ্টা করলেন। প্রচন্ড দূর্বল অনুভব করছেন। চোখ খুলে রাখতে পারছেন না, মেয়ে এতো মমতা মাখা হাতে ছুঁয়ে রেখেছে। ঘুমিয়ে গেলেই তো ছেড়ে চলে যাবে৷ ক্লান্ত গলায় বললেন,

“আমি ঠিক আছি। আল্পনা কোথায়? ও ঠিক আছে? “

“ঠিক আছে বাবা৷ কোনো সমস্যা নেই। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। “

আখতারউজ্জামান নিশ্চিন্তে চোখ বন্ধ করলেন। চোখ বন্ধ করতেই ফিরে যান শৈশবে। মায়ের হাতে ভাত খাওয়া, বাবার পড়াতে বসানো। ইউনিভার্সিটির দিনগুলো, কল্পনার সঙ্গে এক রিকশায় ঘুরে বেড়ানো। বিয়ের পর প্রথম কলকাতা শহরে যাওয়া। আস্তে আস্তে দৃশ্যগুলো ঝাপসা হয়ে আসে। আখতারউজ্জামান গভীর ঘুমে তলিয়ে যান। কাজরী হাত ধরে রাখে কিছুক্ষন। যখন টের পায় উনি ঘুমিয়ে গেছে তখন ও উঠে আসে।

আল্পনা কাজরীর সঙ্গে রেগে বাবাকে দেখতে আসে নি। কল করেছিল সেটাও ধরে নি। কাজরী এই মুহুর্তে অসংখ্য টেনশন মাথায় নিয়ে ঘুরছে। তার মধ্যে আল্পনার আচরণ রীতিমতো বিরক্তিকর লাগছে। আখতারউজ্জামান এর কেসটা যিনি ইনভেস্টিগেট করছেন তিনি জানিয়েছেন যে জাহিদ আর অন্য ছেলেটা বর্ডার ক্রস করে ইন্ডিয়া চলে গেছে। এই হামলা তরফদার সাহেব করালেও তার পিছনে বড় কোনো মাথা আছে। কাজরী নিশানকে সন্দেহ করে। নিশান অবশ্য অস্বীকার করেছে। তবুও ওর সন্দেহ ঘুরেফিরে নিশানের দিকেই যাচ্ছে৷ ইশানকে এই ব্যাপারে কিছু বলে নি, বলতেও চায় না। বাবা আরেকটু সুস্থ হয়ে উঠলে খোলাখুলি কথা বলবে। ততক্ষণ পর্যন্ত ধৈর্য্য ধরা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।

কাজরী এখন ধৈর্য্য ধরতে শিখে গেছে। একের পর এক ঘটনা ও’কে অনেক কিছু শিখিয়ে দিচ্ছে। এ পর্যন্ত যতকিছু ঘটেছে তার মধ্যে শকিং ছিলো নিশানের কর্মকান্ড। ঠান্ডা মাথার খু*নী নিশানকে ওর কখনো মনে হয় নি। মানুষ পড়তে পারার ক্ষমতা ওর নেই, তবুও নিশানের মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই যে ওর মাথা থেকে বেরিয়েছি এই ভয়ংকর প্ল্যান।

কাজরী প্যালেসে এসে জানতে পারলো আল্পনা নেই। কোথায় গেছে সেটাও বলে যায় নি। কাজরী বিরক্ত হয়। আল্পনার এই ওভার স্মার্ট সাজার ব্যাপার টা সত্যিই বিরক্তিকর। তার মধ্যে আবার ওর ফোন তুলছে না। ইশান প্যালেসে ছিলো আজ। কাজরীকে টেনশন করতে দেখে বলল,

“আল্পনাকে নিয়ে এতো ভয় কেন পাচ্ছ? ও যথেষ্ট স্মার্ট আছে। নিজেকে সামলে নিতে পারবে। “

কাজরী অস্থির ভাবে পায়চারি করছিল। আবারও নাম্বার ডায়াল করে বলল,

“তুমি রিলাক্স হতে পারলেও আমি পারছি না। আমার আশেপাশে যারা থাকে তারা সবসময় ক্ষতি করার কথাই ভাবে। “

ইশান হেসে ফেলল। কাজরীর কাছে এসে ফোনটা কেড়ে নিয়ে বলল,

“তোমার এই টেনশনের কারণে আমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। “

কাজরী জিজ্ঞাসু চোখে তাকালো,

“আমাদের সম্পর্কে এফেক্ট পড়ছে কাজরী। আমি একদম তোমাকে কাছে পাই না। “

কাজরীর কপালে সূক্ষ্ম ভাজ পড়লো। ইশান গভীর চোখে তাকিয়ে আছে। ওর কথা মিথ্যে নয়। আসলেই ওদের মধ্যে একটা দূরত্ব এসেছে। গত একমাস ধরে দুজন দুজনের সঙ্গে নিজেদের কোনো কথা শেয়ার করে নি। হাসপাতাল, বাড়ির ঝামেলাগুলো ছাড়া নিজেদের কোনো কথাই হয় নি। ইশান ওর কোমড় জড়িয়ে কাছে টেনে বলল,

“ডু ইউ লাভ মি?”

কাজরীর এক নিমিষেই শান্ত হয়ে গেল। আরেকটু ঘনিষ্ঠ হয়ে ইশানের গলা জড়িয়ে ধরলো। সমস্ত টেনশন, ভাবনা থমকে গেল। এখন শুধু ইশানকেই অনুভব করছে। ইশান ও’কে কোলে তুলে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিলো। কানের পাশের চুল সরিয়ে দিয়ে বলল,

“আজ আমি তোমার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। “

কাজরী বলল,

“ইশান শোনো…..”

“এখন অন্য কথা থাক না কাজরী। “

কাজরী থেমে যায়। ইশান ওর গালে গভীর চুমু খেয়ে বলে,

“আমার মনে হচ্ছে যে ডিস্টান্স টা আমাদের মধ্যে এসেছে সেটা আর বাড়তে দেয়া উচিত হবে না। কারণ আমাদের পথচলা শুরু হয়েছিল অবিশ্বাস থেকে। অনেকটা সময় সেই অবিশ্বাসের মধ্যে কাটিয়ে আমরা একজন আরেকজনকে ভরসা করতে শুরু করলাম। আমি তোমার সঙ্গ পছন্দ করি, তোমার কাছে থাকলে হ্যাপি থাকি। তুমিও হ্যাপি থাকো আমার সঙ্গে। প্লিজ আমাদের এই হ্যাপিনেস টা নষ্ট না হোক। আমরা সবকিছু পেছনে ফেলে একজন আরেকজনকে ভরসা করতে শুরু করি। আমাদের সুখ, দু:খ একসাথে হোক। “

কাজরী জবাব দিতে পারে না। ইশানের কথাগুলো সত্যি। কাজরী কখনো ইশানের সঙ্গে ইমোশনাল বন্ডিং তৈরি করতে চায় নি। কিভাবে যেন হয়ে গেল। ইমোশন কন্ট্রোল করতে চেয়েও পারে নি, বোধহয় ইশান স্ট্রং ছিলো, তাই ও দূর্বল হয়ে ধরা দিয়েছে।

ভালোবাসার অদ্ভুত দোলাচালে ভুগছিল কাজরী। ভবিষ্যতে কী অপেক্ষা করছে জানে না, এই সময়টা যদি থমকে যেত তবে ইশানই থাকতো ও’কে ঘিরে। আর কিছু না, কোনো রিভেঞ্জ না, কোনো লড়াই না। শুধু ও আর ইশান একজন আরেকজনের বাহুঢোরে আবদ্ধ থাকতো।

***

শিরিন চৌধুরী বসে আছে লিয়াকত সরকার এর সামনে। ওয়াজেদ চৌধুরী এই লোকটাকে খুব সমীহ করতো। একজন আরেকজনকে বিভিন্ন বিষয়ে সাহায্য করেছে। শেষ নির্বাচনে লিয়াকত সরকার যখন মন্ত্রীপদ লাভ করেছিল ওয়াজেদ চৌধুরী তাকে আশুলিয়ার চব্বিশ কাঠা প্লট গিফট করেছিল।

লিয়াকত সরকার ই শিরিনকে প্রথম সুবর্ননগরের এমপি ইলেকশনের আইডিয়া দিয়েছিলেন। মৃত স্বামীকে পুঁজি করে নির্বাচন জিততে শিরিনের তেমন অসুবিধা হবে না এমন কথায় শিরিনও যুক্তি খুঁজে পেয়েছিলেন।

লিয়াকত সরকার চায়ের কাপ রেখে বললেন,

“কী অবস্থা তোমার? তুমি তো একের পর এক ঝামেলায় পড়তেছ। “

শিরিন একটু মন খারাপ করা গলায় বলেন,

“সময়টা খারাপ যাচ্ছে ভাইজান। “

লিয়াকত সরকার গমগমে গলায় বললেন,

“মেয়েমানুষ এর বুদ্ধিশুদ্ধি কম থাকে। তোমাকে ব্যতিক্রম ভাবছিলাম। ওয়াজেদ যে বিচক্ষণ, ক্ষুরধার বুদ্ধির লোক ছিলো তার ছিটেফোঁটা তুমি শিখতে পারলা না? “

শিরিন অপ্রস্তুত গলায় বলেন,

“আসলে ঝামেলায় তো কারোর হাত থাকে না….

শিরিন কথা শেষ করতে পারলেন না। লিয়াকত সরকার ধমকের সুরে বললেন,

“ঢং এর প্যাচাল বাদ দাও। আখতারউজ্জামান তোমার আত্মীয় না, তোমার পরিবারের মানুষ না। তার উপর হা*মলা করাইছ কোন আন্দাজে?”

শিরিন আকাশ থেকে পড়লেন যেন। মিনমিন করে বললেন,

“আমি করাই নি ভাইজান….

“চুপ। আমার কাছে খবর আছে। তরফদার না যেন কী… সেই ব্যটার সাথে তোমার যোগাযোগ ছিলো৷ তোমার কী মনে হয় রাজনীতি এতো সোজা জিনিস তোমার জন্য? তার উপর বাজারে তোমার বড় ছেলের নামে উল্টাপাল্টা খবর রটে গেছে… ছি: ছি: “

শিরিন মুখ ভোতা করে ফেললেন। অপমানে কান দিয়ে গরম ধোঁয়া বেরোচ্ছে।

“কোন বাড়িতে ঝামেলা থাকে না, আমাকে বলো তো? আমার বাড়ির সব কী ফেরেশতা? কই বাইরের কেউ কিছু জানে?”

“আসলে শত্রুপক্ষ উল্টাপাল্টা কথা ছড়াচ্ছে ভাইজান। মিস্টার চৌধুরীর তো শত্রুর অভাব নাই। “

“ওয়াজেদের শত্রু থাকলেও সে সামলাইতে জানতো। তোমার মতো কম বুদ্ধির লোক না। এই বুদ্ধি নিয়ে রাজনীতির মাঠে নামলে পাব্লিকের লাত্থি খাবা তুমি। আখতারউজ্জামানকে সুবর্ননগরের মানুষজন সমীহ করে, শ্রদ্ধা করে। তুমি কী করছ? একদিন শোকসভায় ভাসন দিয়ে তারপর ঘরে এসে ঘুম দিছো। এইভাবে নেত্রী হওয়া যায়। নেত্রী হইতে হলে ঘুম হারাম করতে হয়, বুদ্ধি খরচ করতে হয়। “

শিরিন কিছু বলার মতো খুঁজে পাচ্ছেন না। লিয়াকত সরকার আরও কিছুক্ষন হম্বিতম্বি করে জানালেন শিরিনের এমপি ইলেকশন করার প্রয়োজন নেই। তিনি ইলেকশনে নামলে গো হারা হারবেন আর এই সুযোগ অপোনেন্ট জিতে যাবে। সুবর্ননগরের মানুষজন এখন উত্তেজিত হয়ে আছে। শিরিন সেখানে ভাত পাবেন না। ভারাক্রান্ত মন নিয়ে শিরিন ফিরে আসেন। তার সব পরিকল্পনা বানচাল হয়ে যাচ্ছে।

****

“আল্পনা তুমি বাবাকে দেখতে যাবে না? তিনি কাল কথা বলতে পেরেছেন একটু। তোমাকে খুঁজছিল। “

আল্পনা গার্ডেনে বসেছিল। সকালের রোদে বসে আছে অনেকক্ষন। কাজরীর দিকে তাকালো। লাল, কালো মিশেলের মসলিন সিল্কের শাড়ি পরেছে কাজরী। বাইরে যাবার সময় কাজরী শাড়ি পরে। বিয়ের পর এটুকু পরিবর্তনে দেখতে বেশ ভালো লাগে। শিরিনও বাইরে গেলে শাড়ি পরে যান। এটা বোধহয় প্যালেসের অলিখিত নিয়ম।

“আমি যাব না। মনে হয় না যাবার প্রয়োজন আছে। “

কাজরী দূরত্ব বজায় রেখে আল্পনার পাশে বসে বলল,

“কেন? কাল কোথায় গিয়েছিলে?”

আল্পনা হঠাৎ রক্তচক্ষু নিয়ে তাকায়। বলে,

“আমি এডাল্ট কাজরী, কোথায় যাই সেটা তোমাকে বলার প্রয়োজন আছে কী?”

“আছে। তুমি বিপদে পড়তে পারো। শোনো, ওইদিন আমি একটু বেশি মিসবিহাভ করে ফেলেছিলাম। সরি তার জন্য। এখন চলো বাবাকে দেখে আসি। তিনি খুব খুশি হবেন। “

“তিনি তোমাকে দেখে খুশি হবেন, আমাকে না। তিনি আমাকে তেমন পছন্দ করে না। আমার জন্য তার কনসার্নও নেই। তার একমাত্র প্রায়োরিটি তুমি। “

কাজরী মৃদু হেসে বলল,

“তার একমাত্র প্রায়োরিটি আমি এটা সত্যি নয়। তোমার জন্য কনসার্ন নেই এটাও ভুল। “

“আমি ভুল না কাজরী৷ আমি ঠিকই আছি। পর পর সবকিছু ভেবে দেখলাম যে আমি যা কিছু সাফার করেছি সেটা আমার কর্মফল নয়, তোমাদের কর্মফল। তুমি আর বাবা। আমার বিয়ের একটা নাটক হলো, তারপর যা কিছু ঘটেছে সবকিছুর জন্য বাবা দায়ী। “

“আজ এসব আলোচনা না করে অন্যসময় কোরো। আগে বাবা সুস্থ হয়ে ফিরুক, তারপর তাকে প্রশ্ন করবে কেন তিনি এসব করেছিলেন। “

আল্পনা মুখে বিরক্তির একটা শব্দ করে বলল,

“কাজরী তুমি তো দূর্বল লোক পছন্দ করো না, তোমার কথা অনুযায়ী দূর্বল বলেই আমি এতোকিছু ফেস করছি। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি এখন থেকে তোমাদের সামনে আর দূর্বল হবো না। “

“ভেরি গুড আল্পনা। আমি তোমাকে এমন শক্তই দেখতে চাই। “

আল্পনা হেসে ফেলল। বলল,

“আমার মায়ের মৃত্যুর দিনটার কথা মনে করো তো কাজরী। সেইদিন ঠিক কী ঘটেছিল! তিনি তোমার গলা টিপে ধরেছিলেন। আমি তাকে ছাড়াতে গিয়েছিলাম। তিনি ধাক্কা খেয়ে পা হড়কে নিচে পড়ে যান। একটা আর্তচিৎকার! মাগো বলে একটা চিৎকারের পর সব শেষ হয়ে যায়….!

আল্পনার গলা ধরে আসে। কাজরীর চোখে বিষাদ নেমে আসে। সেই ঘটনার পর বাবা দ্রুত ও’কে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।

আল্পনা আবারও বলে,

“সেদিনও তো আমি দূর্বল ই ছিলাম। চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতেই পারতাম। “

কাজরী আল্পনার হাত ধরতে গেলে ও সরিয়ে নেয়। আল্পনা উঠে চলে যেতে গেলে বলে,

“আমি ভুলে যাই নি আল্পনা। আমি মনে রেখেছি। সেজন্যই চাই কোনো বিপদ তোমাকে ছুঁয়ে না যাক। “

আল্পনা ভেজা চোখে তাকায়। বলে,

“তুমি ভীষণ স্বার্থপর। নিজের স্বার্থ ছাড়া আর কাউকে নিয়ে তুমি ভাবো না। তুমি তো ভালো আছ কাজরী.. তুমি দু:স্বপ্নও দেখো না। এতো বড় প্যালেসের বউ তুমি। সোশ্যাল স্ট্যাটাসও কতো হাই। আর আমি! আমি দূর্বল, আমি অপরাধবোধে ভুগতে ভুগতে প্রায় শেষ হয়ে গেছি। “

কাজরী অপলক তাকিয়ে থাকে৷ কাজলপরা চোখে অশ্রুজল থমকে আছে।

চলবে..

Share On:

TAGS:



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply