#আসবো_ফিরে_আবারো
#পর্ব_৯৫
#সুরভী_আক্তার
উদ্বিগ্ন রমনীর থেমে থেমে বলা কথা গুলো কর্নকুহরে প্রবেশ করা মাত্রই ছলকে ওঠে দুই যুবক । বলিষ্ঠ দেহদ্বয় ঝাঁকুনি দিয়ে ওঠে তাদের । দৃষ্টি হয় অবিশ্বাসে প্রখর । দুজনায় একে অপরের দিকে চাওয়া চাওয়ি করে নেয় ভয়ার্ত চোখে । মেঘা ফুঁপিয়েই চলেছে । রৌদ্রের অন্তরাত্মা শুকিয়ে আসে । ঢোক গিলে মেঘাকে টেনে ফেরায় নিজের দিকে । অস্পষ্টে শুধোয়…..
” ইভারা,,, কি বলছো এসব ? অ…অসভ্যতা ? কে ছিলো সে ? মে*রে ফেলেছো তুমি ওকে ? কি করেছিলো ও তোমার সাথে ? বলো মেরি জান…..
মেঘা অশ্রু সজল আঁখি তুলে চায় । দরদর করে ঘেমে নেয়ে একাকার রমনীর ফর্সাটে মুখ মন্ডল । রৌদ্রের এই বিচলিত মুখাবয়ব দেখে হু হু করে ওঠে ভেতরটা । আর পারে না । তটস্থ রমনী নিজেকে লুকোতে ডুকরে উঠে ঝাঁপিয়ে পড়ে যুবকের প্রকান্ড বক্ষের মাঝে । নড়েচড়ে ওঠে রৌদ্র । অবান্তর ধারনায় বুক কাঁপে । মেঘার পিঠে হাত রাখে সে….
” সুইটহার্ট,, ভয় পেয়ো না । বলো ! কি হয়েছিলো সেদিন ?
মিনিট কয়েক সময় নিয়ে নিজেকে ধাতস্থ করে রমনী । সরে আসে । চোখ বুজে শ্বাস টানে । মনে করে সেদিনের ঘটনা….
★ রৌদ্রের অফিস থেকে কাঁদতে কাঁদতে এক ছুটে বেরিয়েছিলো মেঘা । মস্তিষ্ক এলোমেলো ছিলো তখন । দিকভ্রান্ত পথিক হয়ে পড়েছিলো রমনী । অবিশ্বাসের দেয়াল ঠেসে ধরেছিলো তাকে । সেই অভাবনীয় দৃশ্য টুকু দেখার পর মাটি ছিলো না পায়ের তলায় ।
তবুও সে রৌদ্রকে কিচ্ছুটি বুঝতে দিতে চায়নি । শত যাতনা বুকে নিয়ে ফিরে আসতে চেয়েছিলো অ্যাপার্টমেন্টে । গাড়ি করে আসে নি রমনী । ইন্ডাস্ট্রিয়াল কোয়ার্টারের গতিশীল, শান্ত, মনোরম, ও অপরুপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে দীর্ঘ পথ হাঁটা যায় সেখানে । রমনীও হেঁটেই এসেছিলো অফিসে ।
এসেছিলো বুক ভরা উচ্ছ্বাস নিয়ে । তবে ফেরার পথে সেই উচ্ছ্বাস আর রইলো না ।
বরং কমে এসে দ্বিগুণ পীড়ায় পরিনত হলো ।
হাহাকার করা বুক নিয়ে ছুটতে গিয়ে রাস্তার মাঝে দমে গেছিলো রমনী । হট্টগোল হীন সরণীর একধারে শরীর ভেঙ্গে পড়ে গেছিলো বল হারিয়ে । সেই সময়টাতে চিৎকার করে কেঁদেছে মেঘা । অনেকে দেখেছে সেই হাহাকার । কেউ হাত বাড়ায়নি রমনীর পানে ।
নিজের উদরে হাত চেপে বহুক্ষণ রাস্তার ধারে পড়ে ছিলো মেয়েটা । অতঃপর নিজেকে ধাতস্থ করে বাড়ির পথে এগোতে গিয়ে আচানক সম্মুখীন হয় এক নতুন সংকটের । মেইন রোড পেরিয়ে সরু রাস্তার বাঁকে আসতে না আসতেই ভেঙ্গে পড়া রমনীকে ঘিরে ধরে বেশ কয়েক বখাটে ।
এসব সরু অলিগলি ফাঁকাই থাকে সর্বদা ।
তার উপর সন্ধ্যার আঁধার ছেয়ে যাচ্ছিলো চারপাশে । নিরাপদ, বাসযোগ্য এই শহর উন্নত ও অপরাধ মুক্ত । তবে সেটা হয়তো সবসময়ের জন্য নয় ।
এই অবেলায় একলা এক রমনীকে পেয়ে চার পাঁচেক যুবক তাকে ঘিরে ধরতে দ্বিধা করেনি ।
ক্রন্দনরত রমনী তখন ভয়ে জুবুথুবু । কেউ নেই আশেপাশে । মেইন রোড দিয়ে সোজা ফেরা যেতো অ্যাপার্টমেন্টে । কিন্তু নির্বাচনের রেলির জন্য রোডে ভিড় ছিলো অনেকটা । তাই মেঘা পথ পরিবর্তন করে এদিকে এসেছে । শর্টকাট নিয়ে এই সরু রাস্তা পার হতে পারলেই সামনে অ্যাপার্টমেন্ট । এর মধ্যেই এই বিপত্তির সম্মুখীন হতে হবে, তা কভুও কল্পনায় ছিলো না ।
চোখ মুখ মুছে মেঘা যথাসম্ভব শক্ত করে নিজেকে । তাদের ভাষায় তাদের বোঝায় না দমে….
” ক..কারা আপনারা ? পথ রোধ করে দাঁড়ালেন কেনো আমার ?
ছেলে গুলো গা দুলিয়ে হাসে । চিবুক চুলকে বাজে অঙ্গভঙ্গি করে….
” হেয়য় মামনি । কোথায় যাচ্ছো ? চলো আমাদের সাথে ! তোমাকে অন্য জগৎ থেকে ঘুরিয়ে আনি একটু ।
ভড়কে যায় মেঘা । শিউরে ওঠে লোমকূপ । একেই শিহরিত সে । তার উপর জনশূন্য আশপাশ দেখে আতঙ্কে ধড়ফড় করে ওঠে নির্মল কায়া ।
সে পেছাতে চায়, পারে না । চারদিক থেকেই ঘিরে ধরা হয়েছে ওকে । ছেলে গুলো কদমে কদমে কাছে আসছে আরো । মেঘা কুল কিনারা না পেয়ে চেঁচায় সে সময় । লাভ হয় না তবুও । মেইন রোডে বিরাট রেলি নেমেছে । বড্ড আওয়াজ হচ্ছে । সেই আওয়াজের ভিড়ে রমনীর চেঁচানো ক্ষিণ গলা মিলিয়ে যায় ।
একটা ছেলে খপ করে হাত চেপে ধরে ওর ।
অজানা আশঙ্কায় এতেই আত্মারাম খাঁচাছাড়া হয় রমনীর । শঙ্কারা বুকের ধড়ফড়ে বিশালতা ছাড়ায় ।
বাগড়া দেওয়ার আগেই ওকে টেনে হিড়হিড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয় গলি পেরিয়ে অন্য এক ছোট গলিতে ।
চমকে ওঠে মেঘা । জ্ঞান শূন্য হয়ে ঝাড়া মেরে ছাড়িয়ে নেয় নিজের হাত ।
দিক দিশা খুইয়ে ছুট লাগায় কোনো এক দিকে ।
ছেলে গুলোর থেকে নিস্তার মেলে না তবুও । কয়েক ধাপ এগোনো মাত্রই আবারো বন্দি হয় সে ।
ছেলে গুলোর মধ্যে দু’জন শক্ত করে রমনীর দুই হাত চেপে ধরে । ঠেসে ফেলে রংচটা কোনো এক দালান কোঠার পাথুরে দেয়ালের সাথে ।
অন্য আরেকজন রাগের মাথায় তেড়ে এসে সপাটে এক থাপ্পর বসায় তখনকার সেই দ্বাবিংশী রমনীর বাম গালে । তীব্র যন্ত্রণা আর ভয়ের দাপটে চিৎকার করে কেঁদে ওঠে মেঘা । সংশয়ে আঁকুপাঁকু করে হৃৎপিণ্ড ।
ছেলে গুলো বড্ড পাষান । কেউ গললো না । মেঘার নরম দু চোয়াল খুবলে ধরলো একজন । হিসহিসিয়ে কাছে যেতেই মুখ ফিরিয়ে নেয় রমনী ।
গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে । আজব এই শহরে কেউ শোনে না তার ডাক ।
সেই জনশূন্য গলিতেই রমনীর গলা থেকে একটানে খুলে নেওয়া হয় শরীর ঢেকে রাখা উত্তরীয় । সেটাকে ছুড়ে ফেলা হয় পাথুরে রাস্তায় ।
চেঁচাতে গিয়ে গলা চিরে যায়,, তবুও কেউ সাহায্য করতে আসে না ।
এক পর্যায়ে মেঘার হাত ছাড়া হলো । ওকে ছুড়ে মারা হলো রাস্তায় । ছেলে গুলোর মধ্যে বাকিরা গলির মাথায় পাহারা হয়ে দাঁড়ায় । বাকি একজন বিবস্ত্র হতে হতে অগ্রসর হয় দ্বাবিংশীর পানে ।
মেয়েটা বাঁচার তাগিদে ছেচড়ে পেছায় । রক্ষে হয় না । সেই
ছেলেটা ক্ষ্যাপাটে ষাঁড়ের ন্যায় হামলে পড়ে ললিতাঙ্গের উপর । খড়খড়ে কালো হাতে চেপে ধরে উদর । স্পর্শ গাঢ় করার আগেই ব্যর্থ হয় সে ।
তাকে ব্যর্থ করে সর্বশক্তি দিয়ে নিজেকে রক্ষা করতে সক্ষম হয় মেঘা । ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে মাথার নিকট হাত পৌঁছাতেই হাতে লাগে চুলের ধারালো স্টাইলেটোর সেই হেয়ার স্টিক । যেটা গতরাতে রৌদ্র উপহার দিয়েছিলো ওকে । শুধু একটা নয়, উপহারে অনেক গুলো ছিলো । তার মধ্যে একটা খোঁপায় গুঁজে বেরিয়েছিলো মেঘা ।
সেটাই হলো তার মোক্ষম অস্ত্র ।
দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে আচমকাই সেটাকে মুঠোতে চেপে ধরে আছাড় মেরে এক কোপ বসালো সেই বখাটে ছেলেটার বুক বরাবর ।
তাৎক্ষণিক দমে গিয়ে ঝাঁকুনি দিয়ে উঠলো ছেলেটার শরীর । মেঘা ভড়কে যায় । চোখ তুলে তাকায় ।
ছেলেটা এক মুহুর্তের জন্য নেতিয়ে গেলেও শক্তি জোগায় আবার । ততক্ষণে বুকের পাঁজর ফুটো হয়ে চুলের কাঁটাটা ঢুকে গেছে কলজে বরাবর ।
ছেলেটাকে ফের উদ্যত হতে দেখে মেঘা একটানে স্টিক টা বের করলো । এক ধাক্কায় ওকে সরালো নিজের থেকে । অদ্ভুত শক্তিতে উন্মাদের ন্যায় হামলে পড়লো ।
সম্মানে বাঁচতে বিভ্রান্ত পাগলের ন্যায় ছেলেটাকে রাস্তায় ফেলে লাগাতার আঘাত হানলো তার বুকে । যুবকের বুক চিরে গলগলিয়ে ছিটকে বেরিয়ে এলো র*ক্ত । গুঙ্গিয়ে উঠলো সে । উল্টে ফেললো চোখ মুখ ।
প্রাণ হারানোর আগে নাক মুখ দিয়েও গলগলিয়ে র*ক্ত বেরোলো । তবুও দমলো না দ্বাবিংশী । কালো হাতের স্পর্শ এঁকে দেওয়া সেই ছেলেটার উপর সব ক্ষুব্ধতা নিংড়ে ঝাড়লো । লাগাতার ধারালো স্টিকের অর্ধশতাধিক আঘাতে শেষ অবধি ঐ ছেলেটার বুক ঝাঁঝরা করলো মেঘা ।
ছেলেটা নিস্তেজ হতেই সরে আসলো ।
ততক্ষণে পেছনের ছেলে গুলো এই দৃশ্য দেখে আতঙ্কে ধড়ফড় করে উঠেছে । এই অনুচ্চ রমনীর রণমূর্ত তেজের সম্মুখে আর অগ্রসর হলো না তারা । নিজেদের বন্ধুর অমন র*ক্তাক্ত নিথর দেহ দেখে চোখ কপালে তুলে পেছাতে পেছাতে এক ছুট লাগালো বাইরের দিকে ।
মেঘা নিস্তেজ হয়ে এসেছে ।
মূর্ত বনেছে নিজের কান্ডে । র*ক্তে ফোবিয়া আছে । এতো এতো র*ক্তের স্রোত দেখে গা শিউরে উঠলো তার । গা হাত পা মেখে গেছে লাল তরলে । এ কি করলো সে ?
চমকে পেট চেপে গলগলিয়ে বমি করলো তৎক্ষণাৎ । খিচে নিলো চোখ মুখ । ভীষণ যন্ত্রণায় মুচড়ে উঠলো সর্বাঙ্গ । সে থরথরিয়ে কাঁপতে লাগলো ।
,,,,, মেঘা থেমে থেমে রৌদ্র আর ইয়াশকে খুলে বলে সব । দুই যুবক স্তব্ধ । হাত পা শিউরে উঠেছে । চক্ষুদ্বয় কোটর ছাড়ানোর দশা ।
রমনী থামলো একটু । দুহাতে মুখ ঢেকে কেঁদে উঠলো সেই বিভীষিকাময় ঘটনা চোখে ভাসতেই ।
রৌদ্র ওকে আলগোছে টেনে নিজের দিকে ঘোরায় । চিবুক উঁচিয়ে ধরে । মেয়েটা কাঁপছে তিরতিরিয়ে । রৌদ্র বিলম্ব করলো না । ওকে মিশিয়ে নিলো বুকের সাথে । রক্ষে পেলো রমনী,, পেলো এক প্রশান্ত ঠাঁই ।
বুকে মাথা গুঁজে আহাজারি করলো ভয়ে…..
” আমি ওকে মা*রতে চাইনি,, রৌদ্র । ও আমার পেটে হাত রেখেছিলো, আ…আমার সন্তান ছিলো ওখানে । আমি আর কিছু ভাবতে পারিনি । নিয়ে নিয়েছি প্রাণ….
চোখ বুজে নেয় বেপরোয়া যুবক । কার্নিশ ছাপিয়ে টুপ করে পানি ঝড়ে রমনীর কাঁধে । কি কি সহ্য করেছে মেঘা ? ভাবতে গিয়ে কেঁপে উঠলো বুক । রাগ ও উঠলো । চোয়াল খিচে মুঠিয়ে নিলো হাত । দৃঢ় করলো হাতের বাঁধন । কাঁধে মুখ গুজে গলা তুলে আওড়ালো….
” দ্যাটস মাই ব্রেভ গার্ল ! একদম ঠিক করেছো তুমি !
হকচকিয়ে আলগা হয়ে মাথা তোলে রমনী ।
মুখোমুখি হয় রৌদ্র । মেঘার প্রশ্ন সূচক চাহনি দেখে ভেজা চোয়ালে হাত তুলে কপালে কপাল ঠেকায় । দাঁত খিচে বলে চোখ বুজে….
” ইয়েস সুইটহার্ট । ভুল কিছু করোনি তুমি । ওকে মারা প্রয়োজন ছিলো । তুমি না মারলেও আমি মেরে দিতাম । আরো নৃশংসভাবে মারতাম । তোমাকে ছোঁয়ার পর ঐ বাস্টার্ডের বেঁচে থাকার কোনো অধিকার ছিলো না, সুইটহার্ট । সমাজ থেকে একটা নোংরা কীট ধ্বংস করেছো তুমি । নিজের সাথে সাথে আমার সন্তানদের রক্ষা করেছো । আই অ্যাম প্রাউড অফ ইউ,, জান ।
বলতে গিয়ে আরো কয়েক ফোঁটা পানি ঝড়লো দু চোখ হতে । নিভে এলো কন্ঠস্বর ।
মেঘা তাজ্জব বনে চেয়ে রয় । স্বাভাবিক হয়ে দূরত্ব বাড়িয়ে ইয়াশের দিকে ফেরে । তাৎক্ষণিক হাতের উল্টো পিঠে চোখ মুছে নেয় তপ্ত যুবক । বোনের হাত ধরে বলে….
” তারপর কি হয়েছে বনু ? তুই ওখান থেকে বেরিয়ে আসলি কি করে ? বেরিয়ে যখন আসলি, তখন রৌদ্রের কাছে ফিরলি না কেনো ? কোথায় ছিলি, পাখি ?
মেঘা শ্বাস টানে বুক ভরে…..
মাত্রাতিরিক্ত রক্তের মাঝে সেখানেই অবস্থা নাজেহাল হয়ে পড়েছিলো রমনীর ।
উঠে দাঁড়িয়ে টালমাটাল পা বাড়াতেই আকস্মিক দুজনের সম্মুখিন হয় সে । একজন বয়স্ক লোক, তার সাথে একটি কম বয়সী মেয়ে । বাবা মেয়ে ওরা ।
বাকি গুন্ডা গুলোকে ছুটে পালাতে দেখেছেন তারা । কৌতুহল বশত এদিকে পা বাড়াতেই এমন লোমহর্ষক দৃশ্য দেখে আঁতকে উঠলেন উভয়েই । মেয়েটা চিৎকার করে ভয়ে বাবার পিছে লুকালো । মেঘার শরীর তাজা র*ক্তে মাখামাখি । পেছনেই পড়ে আছে সেই নিথর প্রাণহীন দেহ ।
নিজের সামনে ঝাপসা চোখে জলজ্যান্ত দুজনকে দেখে প্রাণ ফিরে পায় রমনী । থেমে থেমে বলার চেষ্টা করে । বোঝানোর চেষ্টা করে তাদের ভাষায়….
” আ…আমি ওকে মারতে চাইনি । হি অ্যাটেম্পটেড টু সেক্সুয়ালি অ্যাসোল্ট মি । আমাকে বাঁচান প্লিজ,, আমি রৌদ্রের কাছে যাবো….
ব্যস এটুকুই । তারপর সেখানেই জ্ঞান হারিয়ে ধপ করে পড়ে যায় মেঘা । যখন জ্ঞান ফেরে, তখন নিজেকে আবিষ্কার করে এক অজ্ঞাত স্থানে । ছোট্ট এক সাধারণ বাড়িতে । তখন মধ্যরাত ।
মানসিক বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলো রমনী । সেই ভদ্রলোক আর তার মেয়ে মিলে ওকে এখানে এনেছে সবকিছু থেকে বাঁচিয়ে ।
মেঘা টালমাটাল । বিভ্রমে সবখানে রক্ত দেখতে পায় সে । আধো পাগল হয়ে পড়ে জ্ঞান ফেরার পর থেকে ।
যখন জানতে পারে পুলিশ কেস হয়ে গেছে,, তখন ভেঙ্গে পড়ে আরো বেশি ।
জুরিখ থেকে তখন বাইশ কিলোমিটার দূরে তার অবস্থান । ফিরে আসার পথ নেই । জুরিখ তোলপাড় খু*নের ঘটনায় । পুলিশ কেস হাতে তুলেছেন । ঘটনা পর্যবেক্ষণ করে গোটা শহর জুড়ে চিরুনি তল্লাশি চালিয়ে খু*নিকে খোঁজা হচ্ছে ।
কিন্তু মেঘাকে রাখা হয়েছে লুকিয়ে । সেই ভদ্রলোক সব কিছু বুঝতে পেরে নিজের মেয়ের অবস্থানে বসিয়ে মেঘাকে বাঁচিয়ে নিয়েছিলেন এসব থেকে ।
এসবের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে এক পর্যায়ে ট্রমাক্রান্ত হয়ে পড়ে দ্বাবিংশী । মাথা থেকে বেরিয়ে যায় বাড়তি সব । নিজের পরিচয় ও কখনো প্রকাশ করেনি সে ।
সেই অবস্থা থেকে ঠিক হতে হতে মাস পেরোয় । নিজেকে লুকিয়ে ঘরবন্দি কাটে মাসের পর মাস । সেই মাস গুলোতে সে এক বাক্যেও কারোর সাথে কথা বলেনি ।
যখন নিজের দিকে তাকালো, দেখলো নিজের বাড়ন্ত পেট, তখন সম্বিত ফিরেছে তার । তবুও পথ ফেরেনি । পুলিশের কেস ক্লোজ হয়নি ।
সব বাঁধা ছিড়ে শেষমেশ সেই ভদ্রলোকই ট্রাভেল পারমিটে মেঘাকে দেশে ফেরার ব্যবস্থা করে দেন ।
মেঘা ততদিনে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে । মা হওয়ার পর ভয় কাটিয়ে বাচ্চাদের সাথে শুরু করেছে নতুন জীবন ।
রৌদ্রের কাছে ফেরার মুখ ছিলো না তার । সাহস ছিলো না যুবকের সামনে দাঁড়ানোর ।
তবে আজ সেই বাঁধ ভেঙেছে ।
যে ভয়ে বছরের পর বছর নিজেকে লুকিয়ে রেখেছিলো । সেই ভয়ের ঘটনা মন খুলে সব বললো রমনী । ফোপাচ্ছে এখনো ।
রৌদ্র আর ইয়াশ একে অপরের দিকে চাওয়া চাওয়ি করে । ঢোক গেলে দু’জনেই । ইয়াশ হাত বাড়িয়ে বোনের দু চোখ মুছিয়ে দেয় । শান্ত গলায় বলে….
” কিচ্ছু হয় নি বনু । রিল্যাক্স । সব অতীত । অনেক আগের ঘটনা । এখন বদলে গেছে সব । আর কিছুই হবে না । তুই এখন সম্পুর্ন নিরাপদ । ওসব ঝেড়ে ফেল মাথা থেকে ।
” না ভাইয়া,,,ঐ খু*নের কেস ক্লোজ হয়নি এখনো ।
আমি সেফ নই । ওরা জানতে পারলেই আমাকে ধরে নিয়ে যাবে । আমি কোত্থাও যাবো না ভাইয়া,,,
রৌদ্র কিচ্ছু বলে না ।
ঝট করে উঠে গিয়ে বেড সাইড টেবিলের উপর থেকে নিজের ফোন হাতে নিয়ে আবার আগের অবস্থানে এসে বসে । সে ফোন ব্যাবহার করে না বহুদিন । কললিস্ট ব্লার হয়ে পড়ে আছে । বহুদিন ধরে কোনো কল আসে না, যায় ও না ।
তবে আজ গেলো । লিস্ট ঘেঁটে সেভ করা একটা নাম্বারে কল লাগালো রৌদ্র । সেকেন্ড কয়েক বাদ রিসিভ হতেই ভরাট কন্ঠে উচ্চারণ করলো…..
” মাহির !
ফোনের ওপাড়ে অবিশ্বাসে ভড়কে যায় যুবক । হাঁসফাঁস করে উত্তর করে…..
” ব…বস !
” হু !
” বস , আপনি আমায় ফোন করেছেন আজ ? আপনি কথা বলছেন ? আ’ম রিয়েলি স্যরি বস,, গত সপ্তাহ থেকে বাংলাদেশে আসতে পারিনি আমি । আপনার বার্থডে ও মিস করে গেছি । আ’ম স্যরি ! কি হয়েছে বস ? আপনি ঠিক আছেন তো ?
” আমার একটা কাজ করে দাও, মাহির !
ছয় এপ্রিল দুই হাজার পঁচিশ,,, জুরিখের ইন্ডাস্ট্রিয়াল কোয়ার্টারে একটা খু*নটা হয়েছিলো । যে করেই সেই খুনের কেস ক্লোজ করে দাও । আগামী চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে এই কেস ক্লোজ চাই আমি । চব্বিশ ঘন্টা মানে চব্বিশ ঘন্টা ।
মাহির বোঝে না কিছু । উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে….
” কিন্তু কি হয়েছে, বস ?
” পরে বলবো । শুধু শুনে রাখো,, আমি আমার ইভারা কে খুঁজে পেয়েছি ।
আর কিছু বললো না সে । মাহিরের উদ্বিগ্নতা হাজার গুণ বাড়িয়ে তুলে মুখের উপর ফোন কাটলো ।
ফিরলো স্ত্রীর পানে । মেঘা টলমলে চোখে চেয়ে রয়েছে ! রৌদ্র ওর দুগাল আজলে নেয় ! থেমে থেমে বলে…..
” ডোন্ট ওয়ারি সুইটহার্ট,,, কিচ্ছু হবে না তোমার । কেউ আর কেড়ে নিতে আসবে না ।
” হ্যাঁ লিটিল বার্ড,, কিচ্ছু হবে না । আমরা আছি তো ! আর ভয় পাবি না এসব নিয়ে ।
,,,
সব জেনে বুঝে বোনকে সামলে ঘরে আসে ইয়াশ ।
একটা বেজেছে ততক্ষণে ।
ড্রিম লাইটের আলোয় বিছানার উপর চিত হয়ে শুয়ে থাকা রমনীকে দেখলো তপ্ত যুবক । বুক চিরে দীর্ঘ এক শ্বাস ফেললো ।
হাসি টানলো ঠোঁটে ।
দরজা লাগিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিলো এবার । বেঘোরে ঘুমোচ্ছে শাফাহ্ । ইয়াশ ঘর থেকে বেরোনোর আগে ওর ভারী উদরের দুপাশে কুশন রেখে গেছিলো । সেগুলো আবার ভালো ভাবে পরখ করে নিলো যুবক ।
শুয়ে থেকে ক্ষান্ত হলো না । উঠে বসে রমনীর দুই পায়ের নিচে আরো দুটো নরম কুশন রাখলো ।
এসব তার রোজকার দায়িত্ব । এই বেখেয়ালে মেয়ের চিন্তায় হয়রান সে, কোনো রাত ঘুমোতে পারে না শান্তি করে ।
কিন্তু দেখো, এই মেয়ে তো ঠিক আরামছে ঘুমোচ্ছে ।
ইয়াশ তার পাশে শোয় । দীর্ঘ পলকে পরখ করে মেয়েটাকে । স্বাস্থ্য বাড়ার দরুন শাফাহ্’কে আরো বেশিই ভালো লাগে । ভীষণ গুলুমুলু আদুরে বউ পেয়েছে সে ।
দেখলেই চোখ জুড়িয়ে আসে ।
মুচকি হাসে ইয়াশ । ঠোঁট তুলে চুমু খায় ঘুমন্ত রমনীর মসৃন ললাটের মধ্যমায় । গালে হাত রেখে বিড়বিড় করে আফসোস নিয়ে…..
” টকেটিভ লেডি,,, স্বামীটা যে কাছে নেই । সে খেয়াল আছে তোমার ? নিজের খেয়াল হারিয়ে আমার খেয়ালে নিজেকে ডুবিয়ে রাখো সবসময় । স্টুপিড কোথাকার ।
নড়েচড়ে ওঠে শাফাহ্ । আরাম হচ্ছে না শুয়ে থেকে । পেটটা বড্ড ভার লাগছে আজ । ওকে খচখচ করতে দেখে ইয়াশ তড়িঘড়ি করে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় । ঘুমে বিঘ্ন ঘটার আগেই শান্ত হয় রমনী । ফের তলায় ঘুমের রাজ্যে ।
এদিকে রৌদ্রের বুকে মাথা নামিয়ে মেঘা কাঁদছে সেই তখন থেকেই । রৌদ্র বলছে না কিছু । কাঁদতে দিচ্ছে আজ । রাত বাড়ছে তড়তড় করে । মেঘাও আর মুখ খোলেনি । রৌদ্র কিছু বলবে, এই আশায় থাকতে থাকতে আর ধৈর্য রাখতে পারলো না । ফুঁপিয়ে ডাকলো ক্ষিণ গলায়…..
” রৌদ্র ?
” ইয়েস সুইটহার্ট !
মেয়েটার কন্ঠে রুদ্ধতা । দোনামোনা করে সে…..
” ওও..ঐ দিন,, ঐ ছেলেটা আমার সাথে খারাপ কিছু করতে পারেনি । আমি ঠিক আছি একদম । কোনো ক্ষতি হয়নি আমার । আপনি আমায় ভুল বুঝবেন না প্লিজ ।
ধক্ করে ওঠে রৌদ্র ।
” কি বলছো,, ইভারা ? ভুল বুঝবো কেনো আমি তোমায় ? আই নো,, তুমি শুধু আমার । ভুল বোঝার কোনো প্রশ্নই ওঠে না । আমার বিশ্বাস নিয়ে ভুল ধারণা করো না প্লিজ । আই লাভ ইউ, জান ! এন্ড আই ট্রাস্ট ইউ । যাই হোক না কেনো, তুমি শুধু আমার ।
” আমার সাথে সত্যিই খারাপ কিছু হয়নি ।
” আই নো,,, সানি । আই লাভ ইউ….
” যদি সেদিন আমার সাথে খারাপ কিছু ঘটে যেতো ? তাহলেও ভালোবাসতেন ?
” বাসতাম । ভীষণ ভালোবাসতম । মাথায় তুলে রাখতাম । তোমাকে পাওয়া আমার ভীষণ বড় পাওয়া, জান । যাই হোক না কেনো,, আমি তোমাকে ভালোবাসি, আর বাসতাম ও । আর এমনিতেও,, কিচ্ছু ঘটতো না তোমার সাথে । এসব ভাবনা ভুলে যাও । খারাপ স্মৃতি মনে রাখতে নেই ।
চোখ খিচে নেয় রমনী । রৌদ্র এই কদিনে লক্ষ্য করেছে । মেঘা খোঁপায় কাঁটা গোঁজে না আর । এই তবে কারন । এতো কিছু ঘটে গেছে ওর সাথে । ইশশ্,,, সেদিন যদি খারাপ কিছু ঘটে যেতো ? ওরা যদি মেঘাকে মেরে…..
না, আর ভাবতে পারে না যুবক । শিউরে উঠে হাতের বাঁধন শক্ত করে । নীরবে অশ্রু গড়ায় কার্নিশ ঘেঁষে ।
সে রমনীর সিঁথিতে নাক ডুবিয়ে আওড়ায় ঠোঁট কাঁপিয়ে…..
” আই লাভ ইউ সুইটহার্ট ! ঘুমাও এখন ! অনেক রাত হয়েছে !
,,,,
দেড় ঘন্টা ধরে ঘুমোনোর চেষ্টা করেও কিছুতেই ঘুম ধরা দিচ্ছে না ইয়াশের চোখে । বারংবার মেঘার করা বর্ননা গুলো কানে বেজে আশঙ্কা জাগাচ্ছে মনে ।
তার উপর শাফাহ্ খচখচ করে নড়াচড়া করছে সেই থেকে । ওর উপর তদারকি করতেও ঘুম উড়ে যাচ্ছে আরো বেশি । মেয়েটা আর দিন গুলোতে এতো নড়াচড়া করে না ! আজ কি খুব অসুবিধা হচ্ছে ? সেই চিন্তায় বুঁদ তপ্ত যুবক । আধশোয়া হয়ে অনেকক্ষণ ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো সে । এ বেলায় চুপ থাকতে পারলো না আর । মেয়েটার নড়চড় বাড়তেই ডেকে উঠলো নরম সুরে……
” টুকটুকি ?
আধো ঘুমের ঘোরে ছিলো রমনী । সব টের পাচ্ছে । শান্তি হচ্ছে না তার ও । সে উত্তর করলো ঘুম ঘুম কন্ঠে…..
” হু !
” কি হয়েছে ? কষ্ট হচ্ছে কি ? এতো বেশি নড়াচড়া করছো কেনো আজ ?
মেয়েটা টেনেটুনে চোখ খোলে । নিজের অসুবিধা ঠাহর করতে না পেরে পলক ঝাপটে বলে ক্ষিণ গলায়…..
” খিদে পেয়েছে !
আধশোয়া থেকে তড়িঘড়ি করে উঠে বসে যুবক । বিচলিত হয়…..
” সেটা আগে বলবে তো, জান ! খিদে চেপে ঘুমোচ্ছো তুমি ? একটু উঠে বসো,, আমি কিছু একটা বানিয়ে আনছি ।
” কোথায় যাবেন ? এটা আপনার বাড়ি নয় ?
” সো হোয়াট ? খিদে পেয়েছে তো !
” খুব বেশি পায়নি । এই মাঝরাতে আর কষ্ট করতে হবে না আপনাকে । ঘুমোন !
” তোমার কষ্ট দেখলে এমনিতেও ঘুমোতে পারবো না আমি । পাঁচ মিনিটের মধ্যে গরম গরম কিছু একটা বানিয়ে আনছি । খেয়ে তারপর ঘুমোবে ! ওকে ?
যুবককে থামায় কে ? শাফাহ্কে তুলে ব্যাক বোর্ডে হেলান দিয়ে বসালো সে । কপালে চুমু এঁকে বেরিয়ে আসলো ঘর থেকে । তার পিঠ পিছে মুচকি হাসে রমনী । এই লোকটা এমনই । শাফাহ্ প্রেগন্যান্ট হওয়ার পর থেকেই দেখে আসছে এই লোকের পাগলামি ।
এখন এই মাঝ রাতে ছুটলো রান্না করতে । শশুর বাড়িতে এসে এখন কিনা রান্না করবেন ইনি ? কিচেনে কোথায় কি আছে কে জানে ?
ইয়াশ ঠিকই সব খুঁজে নিয়েছে ।
চটপট এক বাটি স্যুপ বানিয়ে নেবে এখন । সেই অনুযায়ী প্রস্তুতি নিয়ে শুরু করলো সব ।
লিভিং রুমের লাইট অফ ছিলো, সেই অন করেছে । এর মধ্যেই বেখেয়ালে হাত ফসকে একটা গ্লাস হাত থেকে ফেলে ভেঙেছে । ঝংকার তুলে আওয়াজ ছড়িয়েছে এই মাঝরাতের নিস্তব্ধতায় ।
ভুল শুধরে তড়িঘড়ি করে কাঁচের টুকরো গুলো পরিষ্কার করে যুবক । ততক্ষণে কানে পড়ে আধো আধো মেয়েলি কন্ঠ…..
” এ কি, ভাইয়া ? আপনি এতো রাতে কিচেনে ? কিছু প্রয়োজন ?
তড়াক করে পিছু ফেরে ইয়াশ । ঘুমে ভার নিভু নিভু চোখ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মেহের । গ্লাস ভাঙার শব্দে ঘুম ছুটে গেছিলো । ঘর থেকে বেরিয়ে বসার ঘরে আলো দেখে তড়িঘড়ি করে এখানে এসেছে । তবে এ সময় ইয়াশকে কিচেনে কল্পনা করে নি কভুও ।
থতমত খেয়ে তাকিয়েই রয়েছে যুবক ।
মেহেরের সাথে সাথে শুভ্রর ঘুম ও ভেঙেছে । সেও আসলো পিছু পিছু । পেছন থেকে না দেখেই বললো হাই তুলে…..
” কি হয়েছে মেহের ? এতো রাতে কি ভাঙলো ? কে কিচেনে…..?
বলতে বলতে ইয়াশের পানে দৃষ্টি পড়ে । অমনি থেমে যায় জবান । দৃষ্টি হয় তীক্ষ্ণ । মেহের দম টেনে শুধোয় আবার….
” ভাইয়া, কিছু কি প্রয়োজন ?
ইয়াশ দাঁড়ায় টান টান হয়ে । দু’জনকে দেখে গলা ঝেড়ে বলে স্বাভাবিক কন্ঠে…..
” আপনার ননদের খিদে নিবারণ করা প্রয়োজন । খিদে পেয়েছে ওর ।
শান্ত তার বাণী । তবে তা শুভ্রর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি শিথিল করার জন্য যথেষ্ট । ইয়াশ উত্তর করেই পিছু ফিরলো । রান্না হয়ে এসেছে । মেহের আপ্লুত নয়নে ঘাড় উঁচিয়ে শুভ্রর দিকে তাকায় এক ঝলক । শুষ্ক ঢোক গেলে ।
তড়িঘড়ি করে এগিয়ে বলে…..
” তাই বলে আপনি কেনো এসব করছেন ভাইয়া ? আমাদের কাউকে ডাকলেই পারতেন ! কি করছেন, দিন আমি করে দিই ।
” ইটস্ ওকে,,, করে নিয়েছি আমি । হয়ে গেছে । আসলে, হাত লেগে একটা গ্লাস ভেঙ্গে,,, স্যরি তার জন্য ।
বাটিতে স্যুপ ঢেলে নিলো ইয়াশ ।
শুভ্র পেছন থেকে নীরবে চেয়ে দেখে, শোনে এই তপ্ত যুবকের কথা গুলো । অতঃপর জোর পূর্বক মুখ নিরেট করে ডাকে…..
” মেহের,, চলে আয় । ঘুম নষ্ট করতে হবে না তোকে ।
বলেই গটগট করে চলে গেলো সে । ইয়াশ পিছু ফিরে আর দেখলো না ওকে । নীরবে শ্বাস ফেলে দুদিকে মাথা নাড়ালো । বেরিয়ে আসলো কিচেন থেকে ।
মেহের মৃদু হাসে ওকে দেখে ।
ঘরে ঢুকেই শাফাহ্’র পাশাপাশি বিছানায় কাঁধ মিলিয়ে বসলো যুবক ।
মেয়েটার মুখ মন্ডলে ব্যাথিত ছাপ । ভীষণ অস্বস্তি লাগছে আজ সন্ধ্যা থেকেই ।
ইয়াশ কে বুঝতে দিচ্ছে না কিছু । এই লোক বাড়ি মাথায় তুলবেন নয়তো ।
এখন পাশাপাশি বসেই গরম স্যুপে ফু দিয়ে শাফাহ্’র ঠোঁটের সামনে ধরলো সে……
” খেয়ে নাও ।
মেয়েটা বিতৃষ্ণ মুখে কোন রকমে একটু খায় । অতঃপর মুখ ফিরিয়ে বলে…
” আর খাবো না ।
” খাওনি তো এখনো । পুরোটা খেতে হবে । খিদে পেটে ঘুমোতে নেই । আমার বেবির ও খিদে পেয়েছে নিশ্চয়ই !
কাঁদো কাঁদো হয়ে তাকায় রমনী…..
” আপনার বেবি বড্ড জ্বালাচ্ছে আজ আমায় । নড়াচড়া করছে ভীষণ ! জানেন,, কিক মারছে বারবার ।
বড় বড় চোখ করে চায় ইয়াশ । দ্রুত হাতের বাটি পাশে রাখে । চেপে বসে চঞ্চলার উদরে হাত রাখে…..
” সেটা আগে বলোনি কেনো ? খুব অসুবিধা হচ্ছে ? কেমন লাগছে বলো ? বেবি জ্বালাচ্ছে খুব ? ডক্টর ডাকবো ।
” উফফফ,, পাগল লোক । আপনি তো নিজেই একজন ডক্টর । এতো হাইপার হচ্ছেন কেনো ? এজন্যই কিছু বলতে চাই না আপনাকে । এই ফিটাল মুভমেন্ট নরমাল । বোঝেন না ?
মুখ কুঁচকে বিরক্তি ঝাড়লো রমনী ।
ইয়াশ থতমত খেয়ে হাঁফ ছাড়ে । আসলেই নরমাল এটা । তবে শাফাহ্’র ব্যাথিত মুখাবয়ব দেখে অসহায় বোধ করলো সে । না জানি কেমন যন্ত্রণা সহ্য করছে এই মেয়ে ।
এটুকুনি পেটে কোথায় আছে তার সন্তান ? ভাবতে ভাবতে মলিন মুখে ওর উদরের দিকে ঝুঁকে আসে যুবক । হাত বুলিয়ে আলগোছে কান পেতে বলে কাতর স্বরে…..
” মাম্মা কে কষ্ট দিতে নেই বেবি,, পাপার কষ্ট হতে এতে । চুপচাপ ঘুমিয়ে পড়ো । মাম্মা কে আরাম দাও একটু । ওকে, সোনা ?
বলেই টুপ করে চুমু খেলো বাড়ন্ত উদরে । এতেই ফিক করে হেসে ওঠে শাফাহ্ । এই লোক আসলেই পাগল । সে হাত উঠিয়ে তার চুলের ভাঁজে রাখে । ডাকে আমুদে গলায়….
” আচ্ছা মেঘার ভাইয়া,, একটা কথা বলি ?
” অনেক গুলো কথা বলো মেঘার ননদ,, আমি আছি শোনার জন্য !
আরো বেশি গদগদ হয় রমনী….
” আমাদের বেবি হলে কি নাম রাখবেন ?
” উমমম,, আমি নাম ডিসাইট করেছি । আমাদের মেয়ের নাম হবে #ইয়ানাহ্ ।
” মেয়ে হবে ? আপনি জানলেন কি করে ? ডক্টর তো কিছু বলেনি ?
” আমি জানি । দেখে নিও,, একটা সুইট, কিউট মেয়ে হবে আমাদের !
” যদি না হয় ? ছেলে হলে কি করবেন ?
” কি আর করবো ? ছেলে হওয়ার পর ছেলের মাকে আদর করবো একটু । অনেক দিন আদর করি না ! কষ্ট হয় জান ! কবে হবে এই বেবি….
হতভম্ব হয়ে যায় রমনী ।
ইয়াশ ঠোঁট কামড়ে ভ্রু নাচায় । ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে তড়িঘড়ি করে দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয় চঞ্চলা । পরক্ষণে মুখ খিচে যুবকের শক্ত বাহুতে আঘাত বসায় ।
” নির্লজ্জ কোথাকার । ঘুমোন এখন !
,,,,,,
ফজরের আজান পড়েছে বেশ কিছুক্ষণ হলো ।
বারান্দার পর্দার ফাঁক গলিয়ে ভোরের পাপমুক্ত মোলায়েম, স্নিগ্ধ আলো এসে পড়েছে ঘরের মেঝেতে ।
পাখির কিচিরমিচিরের সুরেলা আওয়াজে মুখোরিত আশপাশ । রৌদ্রের বুকে লেপ্টে নিদ্রায় মশগুল মেঘা । রাতে কেঁদেছে অনেকক্ষণ । মাথা ধরে এসেছিলো । যন্ত্রণা সয়ে গভীর ঘুমে তলিয়েছে এখন । রৌদ্রও অনেক রাত অবধি জেগে ছিলো ।
এই ভোর ভোর গভীর ঘুমে বিঘ্ন ঘটলো তার । মনে হলো বাহুতে কেউ খামচি কাঁটছে । তবে ঘুমের ঘোরে তোয়াক্কা করলো না খুব একটা ।
পরক্ষণে চুলে টান অনুভব করতেই নড়েচড়ে উঠলো যুবক । বিব্রত হয়ে ঘুমের ঘোরে মুখে চ সূচক শব্দ আওড়ালো ।
ভারী পাপড়ি মেলে পিটপিট করে তাকালো উপরে । সিলিংয়ে নজর বুলিয়ে পরক্ষণে ডান দিকে মাথা ফেরালো । ইবাদ মুখ পাকিয়ে বসে আছে ওর মাথার নিকট । ভোরের আবছা আলো আঁধারির মাঝে ছেলের অমন ক্ষুব্ধ মুখাবয়ব দেখে আকস্মিক ভড়কে যায় রৌদ্র । দৃষ্টি ছলকে বৃহৎ হয়ে । কেঁপে উঠে ঘুম ঘুম কন্ঠে ঠোঁট ভাঙ্গে….
” বাবা,, তুমি ?
” ব্যাদ ম্যান,,, আমাল মাম্মাকে চালো….
আওয়াজ উঁচু ছিলো । রৌদ্র তড়িঘড়ি করে মেঘার মাথাটা বুক থেকে নামিয়ে বালিশে রাখলো । রমনীর শরীরে কম্ফোর্টার জড়িয়ে দিয়ে পুরোপুরি ফিরলো ছেলের দিকে । আড়মোড়া ভেঙে চোখ কচলে তাকালো । আস্তে বললো…..
” বাবা,, ধীরে কথা বলো । মাম্মা ঘুমিয়েছে তো । জেগে যাবে নয়তো । এখন তো খুব সকাল । এতো সকালে ঘুম থেকে উঠেছো কেনো তুমি ? চলো,, আবার ঘুমিয়ে পড়ো । আমি ঘুম পাড়িয়ে দিচ্ছি । শুয়ে পড়ো তুমি…..
” নাআআআ….
” আর ঘুমোবে না ?
বাচ্চা সুলভে মাথা ঝাঁকায় ইবাদ । রৌদ্র হাই তোলে । ঘুম হয়নি তার । সে বললো কাতর স্বরে…..
” তাহলে কি করবে, বাবা ?
” তুমি কে ?
আকস্মিক এহেন প্রশ্নে ওষ্ঠপূটে হাসি মেলে যুবকের । ছেলেকে টেনে কোলে বসায় । গাল চেপে আদুরে গলায় বলে….
” আমি তোমার পাপ্পা, সোনা !
নিষ্পাপ আঁখিতে পিটপিট করে চেয়ে দেখে ইবাদ । পরক্ষণে রুক্ষতা টেনে নেয় বদনে । সহ্য করতে না পেরে পেট চেপে বাজখাঁই গলায় বলে…..
” ব্যাদ ম্যান, আমি ছুছু কলবো !
ফের উঁচু স্বর । মেঘা নড়ে উঠলো একটু । ওর ঘুমে ব্যাঘাত ঘটার আগেই তড়িঘড়ি করে ছেলেকে সামলে নেয় রৌদ্র….
” সুসু করবে ? ওকে সোনা,,, ওয়াশ রুমে চলো ?
” নাআআআ !
” কি ?
” ওয়াছ লুমে দাবো না !
আঁখি লতা কুঁচকে ফেলে যুবক । জানতে চায়…..
” তো , সুসু করবে না ?
” হুমম ! ওয়াছ লুম একানে এনে দাও ।
নির্বোধ ছেলের এহেন সোজাসাপ্টা কথায় আশ্চর্য বনে যায় রৌদ্র । হতবাক হয়ে তাকিয়ে পরক্ষণে ফিক করে হেসে ওঠে । ঠোঁট কামড়ে বলে…..
” বাপ আমার,,, ওয়াশ রুম এখানে আনবো কি করে ? ওয়াশ রুম তো হাঁটতে পারে না । তোমাকে যেতে হবে ওর কাছে ।
” নাআআ,, আমিও হাততে পালি না । তুমি ওয়াছ লুম একানে এনে দাও । ছুছু পিয়েচে !
রৌদ্র আবারো ফিক করে হাসে । ইবাদকে চেপে কোলে নিয়েই বিছানা থেকে নেমে দাঁড়ায় । এই ছেলের গলা উঁচু হচ্ছে ক্ষণে ক্ষণে । যেকোনো মুহূর্তে মেঘার ঘুম ভেঙ্গে যাবে । তার আগে ওকে কোলে নিয়েই তড়িঘড়ি করে ওয়াশ রুমে ঢুকলো সে । দরজা লাগিয়ে ছেলের প্যান্টে হাত দিতে দিতে বললো……
” নাও,,, তোমার পাপ্পা তো হাঁটতে পারে । পাপ্পা নিয়ে এসেছে তোমায় । এবার গুড বয়ের মতো সুসু করে নাও ।
ইবাদ ঘন পলক ঝাপটায় । গলা নামিয়ে মিনমিন করে….
” তুমি চোক বন্দ কলো !
শব্দ করে হাসলো রৌদ্র ।
” কেনো ?
” ব্যাদ ম্যান,, চোক বন্দ কলো ।
অগত্যা ছেলের আদেশ মোতাবেক তাই করে যুবক ।
,,,,,
বাজে সকাল আটটা ।
ব্রেকফাস্টে বসেছেন বাড়ির সবাই ।
কেবল শাফাহ্ ব্যাতীত । সে বসে আছে সোফায় । ভালো লাগছে না কিছু । চোখ মুখে অস্বস্তির ছাপ স্পষ্ট এখনো । খেতে ইচ্ছে করছে না । সবাই বসলেও ও বসলো না খেতে
। শাহিনা কাবির কতবার ডাকলেন । তবুও নড়লো না মেয়েটা । খিদে পায় নি । খাবে না এখন ।
রোশ ইবাদ, ওদের দুটোকে খাইয়ে মেঝেতে খেলতে বসিয়েছে মেঘা । সেও খায়নি এখনো ।
ইয়াশ ও ওঠে নি ঘুম থেকে । মেঘা শাফাহ্ কে শুধালো এবার…..
” টুকটুকি,, ভাইয়া কোথায় ? ওঠে নি এখনো ?
” উঁহু । উনি তো ঘুমোচ্ছেন ।
” এতো বেলা অবধি ঘুমোচ্ছে ? ডাকিস নি ?
” অনেক রাত অবধি জেগে ছিলো,, তাই সকালে আর ডাকিনি । ঘুমিয়ে নিক একটু ।
শাহিনা কাবির প্লেটে খাবার বেড়ে আনলেন মেয়ের জন্য ।
মেহেরের মুখে শুনেছে রাতের ঘটনা । তাই আর সে প্রসঙ্গ ঘাটলেন না । সোফার পাশে প্লেট রেখে শুধোলেন মেয়েকে……
” তুই এখন এতো সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠিস শাফাহ্ ? একলা বাড়িতে কষ্ট হয়ে যায়, তাই না ?
শাফাহ্ মুচকি হাসে…..
” আমার আবার কষ্ট কিসের আম্মু ? আমাকে তো কিছুই করতে হয় না । মেঘার ভাইয়া ঘর থেকেই বেরোতে দেন না আমায় । উনি বলেছিলেন না,, উনি আমাকে রান্না করে খাওয়াবেন ? জানো, উনি তাই করেন । গত চার বছরে চার দিন ও কিচেনে পা রাখিনি আমি । আমি চাওয়ার আগে সব পেয়ে যাই । মেঘার ভাইয়া খুব ভালো আম্মু !
মেঘা মিষ্টি করে হাসলো ।
শাহিনা কাবিরের সাথে টেবিলে বসে থাকা বাকিরাও ।
ইয়াশ চোখ ডলতে ডলতে ঘর থেকে বেরোচ্ছে । শাহিনা কাবির ওকে দেখা মাত্রই হকচকিত হয়ে ডাকলেন…..
” ইয়াশ,, উঠে পড়েছো বাবা ? অপেক্ষা করছিলাম তোমার জন্য । খেতে এসো,,,
ইয়াশের চোখ ফোলা ফোলা । টেবিলের সবাইকে এক ঝলক করে দেখে নিলো সে ! বোনকে দেখে প্রশ্ন করলো নরম গলায়…..
” খেয়েছিস ?
মেঘা মাথা নাড়ে…..
” খাইনি এখনো । তুমি খেতে বসো । আমি আর টুকটুকি একসাথে খেয়ে নিচ্ছি !
তড়াক করে শাফাহ্’র দিকে ফিরলো তপ্ত যুবক……
” ও খায়নি এখনো ? এইইইই,, আটটা পেরিয়েছে । তুমি এখনো খাওনি কেনো ?
আগামী পর্বে একটা শেষ ধামাকা পাবেন । আজকেই আগাম আভাস দিতে চেয়েছিলাম । বাট হলো না
। পরের পর্বে থাকবে কিছু একটা । গেস করুন । আর ছটফট রেসপন্স করুন সেটার জন্য । 
চলবে………..
সবার আগে গল্প পেতে অবশ্যই পেজটি ফলো দিয়ে রাখুন
Share On:
TAGS: আসবো ফিরে আবারো, সুরভী আক্তার
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৫৭
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৬৩
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৮৮
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৪৭(প্রথমাংশ+শেষাংশ)
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ২৪
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৮২
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৬৫
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৫৩
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৬১
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৮৯+বোনাস