Golpo romantic golpo আসবো ফিরে আবারো

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৯৪


#আসবো_ফিরে_আবারো

#পর্ব_৯৪

#সুরভী_আক্তার

সকাল সকাল ব্রেকফাস্ট করতে বসেছেন কাবির পরিবারের সদস্যরা । 

সবাই টেবিলে বসলেও মেঘা বাচ্চাদের নিয়ে সোফায় বসেছে । ওদের মুখে খাবার তুলে দিতে দিতে একে একে বাড়ির সবাইকে দেখাচ্ছে । শিখিয়ে দিচ্ছে ডাক । কাকে কি বলে ডাকতে হবে, নিশানা করে তাই বুঝিয়ে দিচ্ছে ওদের । কিন্তু কতটুকু কি বোঝাতে পারছে কে জানে ! সেই ফিরে আসার পর থেকে বারবার শিখিয়েও লাভ হচ্ছে না । দুই একজন ব্যাতীত তেমন কাউকেই ডাকে না বাচ্চারা । এমনকি নিজের বাপকেও না । 

ইবাদের ধ্যান তো এসবে নেই । গোটা সোফায় খেলনা ছড়ানো । খেতে খেতে খেলনা হাতে খেলায় মত্ত সে ‌। রোশ্ লক্ষি মেয়ের মতো মায়ের ইশারা দেখছে কেবলই । 

রৌদ্র খাচ্ছিলো সবার সাথে বসে । সেখানে আর পোষালো না ওর । প্লেট হাতে উঠে দাঁড়িয়ে অসার পদ যুগল কোন রকমে টেনে টুনে এসে ধপ করে সোফায় বসলো । 

বাকিরা খাওয়া ফেলে তাকানোর মাঝেই স্ত্রীর নিকট আবদার জুড়ে বসলো বেপরোয়া যুবক…..

” তুমি খাইয়ে দাও সুইটহার্ট । যেভাবে ধৈর্য নিয়ে ওদের খাওয়াচ্ছো, ঠিক সেভাবে । 

মেঘা পাশ ফিরে তাকায় । বাড়ির সবাই ওদের আলাদা ছেড়ে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়েছেন । মেঘা অপ্রস্তুত হলো না আজ । দ্বিমত ও করলো না । বাচ্চাদের খাওয়ানোর সাথে সাথে এ বেলায় রৌদ্রের প্লেট খানা হাতে নিয়ে পরোটা ছিঁড়ে মুখে তুলে দিলো । 

ইবাদের খাওয়া শেষ হয়ে এসেছিল প্রায় । আর খাবে না সে বলে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলো অন্যপাশে । 

কিন্তু এ যাত্রায় চোখ ঘুরিয়ে বাপ মায়ের এহেন কান্ড দেখে চোখ খিচে নিলো বাচ্চাটা । এক হাতের খেলনা ফেলে মায়ের কাছে চেপে বসলো । ভরা পেট নিয়ে হা করলো আবার….

” আমিও কাবো । 

” পরোটা খাবে ? সবজি ঝাল বাবা, খেতে পারবে না । আমি আরেকটু ওটস নিয়ে আসছি তোমার জন্য ! 

” না, আমি এতাই কাবো । 

ছেলের জেদ । মেঘা আর কি করবে ? বুঝলো ওর হিংসাত্মক মনভাব টুকু । দুদিকে মাথা নাড়িয়ে এক টুকরো পরোটা ছিঁড়ে ছেলের মুখে তুলে নিলো । পাশ ফিরে রৌদ্রের মুখে আরেক টুকরো দেওয়ার আগেই হাত টেনে ধরলো ইবাদ….

” আমি ছব গুলো কাবো । উনি কাবেন না….

মেঘা আর পারে না এর জ্বালায় । 

রৌদ্রের দিকে তাকিয়ে বেচারার আশ্চর্য মুখো ভঙ্গিমা দেখে ফিক করে হেসে দেয় । রৌদ্র কাতর স্বরে চেঁচায়….

” মম, তোমার নাতি আমাকে খেতে দিচ্ছে না । 

খাওয়ার মাঝে এদিকে তাকালেন সবাই । মৃদুমন্দ হাসলেন বাপ ছেলের কান্ডে । আদ্র একই ভাবে চেঁচিয়ে বলে…..

” তোর ছেলে, তোর মতোই হয়েছে । নো নিড টু ডিএনএ টেস্ট । দুটোতেই এক তোরা । নিজেরা নিজেদের সহ্য করতে পারিস না, আমাদের জড়াস কেনো তোদের মাঝে ?  

আহত হয় রৌদ্র । 

মেঘার হাত টেনে হাতের পরোটা টুকু মুখে তুলে নেয় । অতঃপর আহ্লাদ করে ভেংচি কাটে ছেলেকে । 

তবে ছেলে যেনো সহ্য করলো না এটুকু । ফোঁস করে উঠে দাঁড়ালো সোফায় । খেলনা গুলোর মধ্যে বন্দুক ছিলো একটা ।  রৌদ্র এখানে বসার পরেই সেটাকে অস্ত্র হিসেবে হাতে নিয়েছিলো ইবাদ । এখন বোধহয় সেই অস্ত্র কাজে লাগানোর সময় এসেছে । রৌদ্রের পরবর্তী পদক্ষেপ যথেষ্ট বুঝতে পারছে সে । এই লোক কালকের মতো ওর মাকে আবার চুমু খাবে না তো ? 

এই ভাবনা আসতেই খেলনা বন্দুক টা রৌদ্রের দিকে তাক করে এটম বোমের মতো ঝাঁঝিয়ে উঠলো…..

” আমাল মাম্মা কে আবাল তুমু কাবে তুমি ? তুমু কেলে পুলিচের কাচে দিয়ে দেবো, ব্যাদ ম্যান । ইটছ্ মাই মাম্মা….

ছেলের শাশানি পেয়ে হতবুদ্ধতায় ফাটা বেলুনের ন্যায় চুপসে যায় বেপরোয়া যুবকের বদন খানি । এদিকে ইবাদের কথা কানে পড়তেই আর নিজেকে সংবরণ করতে পারলো না আদ্র । হো হো করে হেসে উঠলো সে । 

বাকিরা শব্দ করে হাসতে না পারলেও ঠোঁট টিপে ধাতস্থ রাখলেন নিজেদের । 

আদ্রের হাসির ঝংকারে চোখ মুখ পাকিয়ে টেবিলের দিকে তাকায় রৌদ্র ! তপ্ত স্বরে ঝেড়ে ওঠে….

” হাসছিস কেনো ওভাবে ? 

” হাসার কথা বললে হাসবো না ? 

ফোঁস করে ওঠে রৌদ্র । মোক্ষম খোঁটা কাজে লাগায়….

” মম, তোমার বড় ছেলে তো আমার থেকে তেইশ সেকেন্ডের বড় তাই না ? ছ্যাহহহহ্,, লজ্জা থাকা উচিত । 

ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায় আদ্র…..

” এখানে বড় ছোট আর লজ্জার প্রসঙ্গ আসলো কোথা থেকে ? 

” যেখান থেকে তোর লজ্জা নেই সেখান থেকে । হুহহহ্, তেইশ সেকেন্ডের ছোট হয়েও তোর আগে বিয়ে করেছি আমি । বাপ ও হয়েছি আগে । তাও আবার একটা সন্তানের না, একসাথে দুটো সন্তানের বাপ হয়েছি । হ্যাডাম দেখেছিস ? আর তুই ? ছ্যাহহহহ্,, লেজি বয় ! লজ্জা থাকা উচিত । কদিন পর আমার সন্তানের সন্তান বড় দাদু বলে ডাকবে তোকে….

” তো আমার কি বিয়ে হয়নি ? বাচ্চা হয়নি ? 

” হয়েছে তো চুনোপুঁটি ! আমি তোর থেকে ছোট হতে পারি, কিন্তু আমার বাচ্চারা তোর বাচ্চার থেকে ছোট নয় । তাই তোর লজ্জা থাকা উচিত । এই লজ্জা নিয়ে মুখ দেখাস কি করে ? তাও আবার দাঁতের পাটি বের হাসছিস ? ছ্যাহহহহ্…..

আহম্মকের মতো ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রয় আদ্র । 

তোফায়েল কাবির গলা খাঁকারি দেন । এই ছেলে যেকোনো মুহূর্তে মুখ ফসকিয়ে ব্লাস্ট ঘটিয়ে দিতে পারে । বিশ্বাস নেই ওকে । 

আর কেউ কিছু বলার আগেই কলিং বেল বাজলো দরজায় । শুভ্র খাওয়া শেষ করে বেসিন থেকে হাত ধুয়ে সিঁড়ির দিকে এগোচ্ছিলো । 

ডোর বেলের শব্দ শুনে সিঁড়ি উঠলো না আর । পথ ফিরিয়ে সদরের দিকে এগিয়ে আলগোছে দরজা খুললো । দুটো কপাট আলগা হতেই চৌকাঠের ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা লম্বাটে যুবক কে দেখে মুখাবয়বে খানিক চমকিত ভাব ফুটলো শুভ্রর । বিষ্ময়ে দৃষ্টি ছলকালো তৎক্ষণাৎ । সোজাসুজি চোখাচোখি হলো ইয়াশের সাথে । 

তপ্ত সেই যুবকের পাশেই দাঁড়িয়ে তার আদরের ছোট বোন শাফাহ্ । পরক্ষনেই গোলগাল দেহি শাফাহ্’র সাথে দৃষ্টি মিলতেই ছ্যাত করে উঠলো শুভ্রর অন্তঃস্থল । 

টানা এক বছর পর নিজের ভাইয়াকে সামনাসামনি দেখে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারে না চঞ্চলা রমনী । ইয়াশের বাহু ছেড়ে গদগদ হয়ে চেঁচিয়ে ওঠে…

” ভাইয়া….

বলেই থামলো না । সাবধানে তেড়ে এসে হুমড়ি খেয়ে জড়িয়ে ধরলো শুভ্রকে । শুভ্র নির্বিকার । চাহনিতে পলক পড়ে কেবল । টাল হারিয়ে এক কদম পেছায় সে । 

শাফাহ্ হাতের বাঁধন দৃঢ় করে হাঁসফাঁস করে ওঠে…..

” কেমন আছো ভাইয়া ? কতদিন দেখিনি তোমায় ! 

সচকিতে দরজার দিকে ফিরে তাকান সকলে । ইয়াশ আর শাফাহ্ কে দেখে হতভম্ব হন প্রত্যেকে । 

ওদের আসার খবর আদ্র ব্যাতীত আর কারোর জানা নেই । আদ্র মুচকি হাসলো । শাহিনা কাবির মেয়েকে দেখে আত্মহারা হয়ে উঠলেন । খাওয়া ফেলে ছুট্টে গেলেন দরজা বরাবর । 

শুভ্র অটল । হাত তুলে বোনকে জড়ালো না । বুকের উত্তাল ঝড় সামলালো কসরত করে । ততক্ষণে শাফাহ্’র চোখ ভিজেছে । 

ভাইয়াকে ছেড়ে ভেজা ভেজা চোখ উপরে তুললো সে ‌। দৃষ্টি বিনিময় হলো শুভ্রর শুকনো নয়নের সনে । যুবকের মাঝে খুশির কোনো উদ্বেগ না দেখে চাপা যাতনায় ফিকড়ে উঠেও পরক্ষণে হাসির রিনরিনে শব্দের আড়ালে তা লুকিয়ে ফেললো রমনী । 

শাহিনা কাবির মেয়েকে ছুঁয়ে দেখে অবিশ্বাসে অস্ফুটে বিচলিত হয়ে বলেন….

” শাফাহ্,, মা তোরা হঠাৎ এখানে ? আগে তো বলিস নি আসার কথা ! 

” সারপ্রাইজ আম্মু ! কেমন লাগলো ? চমকে গেছো তাই না ? 

আসলেই চমকে গেছে সবাই । 

ওরা সারপ্রাইজ দিতে এসেছে, আবার নিতেও । সবার চোখ যখন শাফাহ্’র দিকে, তখন কেবলই মেঘার চোখ তার একমাত্র আপন বড় ভাইয়ের দিকে । রমনীর দৃষ্টি টলমলে হয়ে এসেছে আরো আগে । ইয়াশ ও নিষ্পলক তাকিয়ে আছে বোনের দিকে । আজ যেনো বড্ড অবিশ্বাস লাগছে তার । দরজা মাড়িয়ে পা বাড়াতে পারছে না আর । পদযুগল আঠার ন্যায় চিপকে রয়েছে ওখানেই । 

তবুও সে কোনো রকমে টেনে টুনে কদম এগোলো । সোফার সামনে মেঘা দাঁড়িয়ে । 

এক পা দু’পা করে এগিয়ে এসে বোনের মুখোমুখি দাঁড়ালো সে । দৃষ্টি ঘোলাটে,, ঝাপসা দেখলো বোনের মুখ । সে চোখ কচলে পরিষ্কার করলো । 

হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দিলো মেঘার গাল । হেসে উঠলো,, প্রশ্ন সূচকে বাণী আওড়ালো বহুকষ্টে……

” ম…মেঘা,,, আমার বোন ? তুই মেঘা…..

আর দমলো না সে । একটানে বোনকে শক্ত করে জড়িয়ে নিলো বুকের সাথে । কঠোরতা ভুলে খোলস ছাড়িয়ে ফিকড়ে উঠলো । 

তার সাথে সাথে মেঘাও কেঁদে উঠলো ভাইয়ার আলিঙ্গনে । ইয়াশ দিশেহারা হয়ে পড়ে । বোনকে কোথায় লুকোবে, বুজতে পারে না । ব্যাকুল হয়ে পড়ে সে । মেঘাকে সরায় বুক থেকে । বোনের মুখ আজলে ধরে কপালে স্নেহের পরশ এঁকে দেয় । 

মেঘার চোখ মুখ ভিজে একাকার । ইয়াশ ওর ভেজা কপোল দুখানি তালুতে করে মুছিয়ে দেয় আলগোছে । ক্রন্দনের বেগে থেমে থেমে আওড়ায়…..

” লিটিল বার্ড,,, আমার বনু । তুই আছিস বোন ! বেঁচে আছিস তুই ? কোথায় ছিলি এতো দিন ? কেনো হারিয়ে গেছিলি পাখি ? 

তার গলা ধরে আসছে । আর কিছু বলতে পারছে না সে । ঠোঁট কামড়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে মেঘা । ভাইয়ার চোখে চোখ রাখার সামর্থ নেই তার । প্রশ্নের জবাব দেওয়ার সাহস নেই । শরীর কাপে, কান্নার দরুন লাল হয়ে ওঠে মুখশ্রী । কাঁদছে দুই ভাই বোনেই । এক দীর্ঘ বিরহের পর সাক্ষাৎ হয়েছে দুজনার । বাকিদের কথা ছাড়লে, একে অপর ব্যাতীত ওদের তো আর কেউ নেই । ওরাই একে অপরের । 

এদিকে ইবাদ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে হঠাৎ এহেন কান্ড দেখে । এ আবার নতুন কে জুটলো ? ওর মাম্মা কে জড়িয়ে ধরছে, আবার চুমুও খেলো কপালে । বাচ্চাটার গাল ফুলে আসে । খিটখিটে চোখে তাকিয়ে রৌদ্রের কাছ ঘেঁষে বসে সে । 

ইয়াশ চিবুক ধরে বোনের আদল উঁচিয়ে নেয় । ওর পুরো মুখ দেখে চোখ ভরে আসে যুবকের । কাঁপে হৃৎপিণ্ড । ফের শুধোয় দম টেনে…..

” কোথায় ছিলি তুই এতো দিন ? কত্তো খুঁজেছি ! পাই নি কেনো বল ? তুই ঠিক আছিস ! তোকে না পেয়ে কত কি ভেবে ফেলেছিলাম আমি,‌ জানিস ! ভেবেছিলাম আমার বোধহয় আর কেউ রইলো না । বনু,,, কোথায় চলে গেছিলি তুই সেদিন ? এতো গুলো দিন কোথায় ছিলি ? তোর যদি খারাপ কিছু হয়ে যেতো ? 

” যদি খারাপ কিছু হয়ে যেতো, তাহলে আমি আজ এখানে থাকতাম না ভাইয়া । খারাপ কিছু হওয়ার আগেই খারাপ টাকে মুছে ফেলেছি আমি । চিন্তা করো না, একদম ঠিক আছি । 

রমনীর রুদ্ধ জবানে বুলি ফোঁটে । সজল চোখ নিয়ে হাসার চেষ্টা করে সে । ফের শুধোয় ঢোক গিলে……

” তুমি কেমন আছো,, ভাইয়া ? 

ইয়াশ সে প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বিড়বিড় করে অসহায় কন্ঠে…..

” আমাকে ক্ষমা করে দে লিটিল বার্ড,,, আমি অনেক দিন কথা বলিনি তোর সাথে । আ’ম স্যরি,, আমি যদি তোকে না এড়িয়ে কথা বলতাম তখন, তাহলে এমন কিছুই হতো না । আ’ম রিয়েলি স্যরি বনু । ভুলের পেছনে আমিও আছি । যে ভুলটা করেছিলাম, সেটা করার পর তোর সাথে কথা বলার সাহস ছিলো না আমার । সাহস জুগিয়ে তোর বার্থডের দিন হাজার বার কল করেছি আমি,,, কিন্তু ততক্ষণে খুব দেরি হয়ে গেছিলো । বড্ড দেরি করে ফেলেছিলাম । প্লিজ আমাকে ক্ষমা করে দে বনু । আমিও কষ্ট দিয়েছি তোকে । 

এতো কেনো অভিমান তোর ? আমাদের কারোর কথা ভাবলি না একবারও ? কেনো চলে গেলি সেদিন ? আমাকে ফোন করলি না কেনো একবার ? কেনো যাচাই করলি না কোনো কিছু ? কেনো যোগাযোগ করলি না এতো দিন ? এতো বছর কি করে কাটিয়েছিস তুই ? দেশে ফেরা, এতো কিছু একলা কি করে করেছিস ? 

মেঘা চেয়ে রয় নিষ্ক্রিয় সিক্ত নয়নে ‌। তার সাহস নেই কোনো প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার । কেবলই নীরবে সব শুনে যায় সে । ইয়াস উদগ্রীবতা কমায় । এখানে সবাই রয়েছেন । এসেই এতোটা ব্যস্ত হয়ে পড়াটা ঠিক হবে না মোটেও । চোখ বুজে শ্বাস টেনে নিজেকে ধাতস্থ করলো তপ্ত যুবক । 

রুক্ষ অধর ভিজিয়ে একটু সরে আসলো । গাল মুছে তূষিত নয়নে বোনকে পরখ করলো আগাগোড়া । মেঘার পড়নে হালকা গোলাপি রঙের একটি শাড়ি । বেশ বড় আর ম্যাচিউর লাগছে তার ছোট্ট ছিপছিপে বোনটাকে । 

ঠান্ডা হয়ে আসলো যুবকের বক্ষস্থল । আজ মন খুলে গাল ঠেলে হাসলো সে । ছাড়লো দীর্ঘ দম । 

আশপাশে ধ্যান ফেরানোর আগে বোনের ভেজা চোখ মুছিয়ে দিয়ে দ্বিতীয় বার কপালে চুমু খাওয়ার জন্য অগ্রসর হলো কি হলো না,,, অমনি দুটো কন্ঠের বিকট চিৎকার ভেসে আসলো একি মুহুর্তে । 

ইবাদ চিৎকার করে বললো….

“ ওতা আমাল মাম্মাআআআ……

পাশাপাশি রৌদ্রের চিৎকার আরো জোরে…..

“ সল্ট হার্ট শালা,, ওটা আমার বউ ! 

দুজনের চিৎকারে হকচকিয়ে ঝট করে সোফার দিকে তাকায় ইয়াশ । ভ্যাবাচ্যাকা খেয়েছে বড্ড । রৌদ্রের মুখে বুলি শুনে চোখ কপালে উঠলো তার । একই ভাবে চোখ আসমানে উঠলো রৌদ্রের পাশের বাচ্চা টাকে দেখে । এক আদলের বাপ ছেলে ফোঁস ফোঁস করে রুষ্ট লোচনে চেয়ে আছে ওর দিকেই । থমকায় ইয়াশ । 

সে এ অবধি কিছু জানে না । আদ্র ওকে তেমন কিছু খোলসা করে বলে নি । ব্যস্ত না হয়ে কেবল আসল খবরটা জানিয়ে দেশে আসতে বলেছিলো । 

ইয়াশ এখনো অজ্ঞাত এসব কিছু নিয়ে । রৌদ্রের পাশের বাচ্চাটা কে ? প্রশ্ন ভাসতেই, আচমকা মন উত্তর সাজিয়ে নিলো । অমনি ধক্ করে নড়েচড়ে উঠলো যুবক । তড়াক করে চাইলো বোনের দিকে । 

প্রশ্ন সূচকে উপর নিচ মাথা দোলালো সে ! মেঘা‌ বুঝতে পারে চাহনির অর্থ । আলতো হেসে মাথা দুলিয়ে আস্থা দেয় । মিনমিন করে বলে মুখ ফুটে…

” ওটা আমার ছেলে ভাইয়া ! ইবাদ ! 

ছলকে ওঠে তপ্ত যুবকের ভেতর ঘর । দ্রুত হাঁটু মুড়ে বসে ইবাদ কে কোলে টেনে নেয় । ফের ভরে ওঠে দু চোখ । হাসি চওড়া হয় ঠোঁটে । বাচ্চাটার মুখ জুড়ে চুমু খেয়ে গালে হাত বোলায় । বাক হারিয়েছে যেনো । আনন্দের জোয়ারে কথা ফুটছে না জবানে । 

ওর খুশি আরো বর্ধিত হলো রোশের দিকে চোখ পড়তেই । সেও অপরিচিত । আগে দেখেনি, চিনলো না প্রথমে । বাচ্চাটা আপন মনে খেলছে । এসবে মনযোগ নেই । 

ইয়াশ বোনের সাথে রোশের আদলের মিল পেয়ে ফের বিষ্ময় নিয়ে তাকায় বোনের দিকে । 

” ও কে ? 

মেঘা স্মিথ হেসে বলে আবার….

” ওটা আমার মেয়ে । রোশ্ । দুটো সন্তান আমার, ভাইয়া । তোমার বোন মা হয়ে গেছে অনেক আগে । 

ইয়াশ একে একে ঝটকা খেয়ে কিংকর্তব্য বিমূঢ় হয়ে পড়লো । ইবাদ কে নামিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে রোশ্ কে কোলে নিলো । 

পেছনে শাফাহ্ । এতক্ষণ নীরবে দেখছিলো এসব । এ বেলায় উঁচু পেট নিয়ে ধীরে কদম বাড়িয়ে ডাকলো….

” মেঘা….

স্বর অনুসারে হতচকিত হয়ে এক ঝটকায় শাফাহ্’র দিকে ফিরলো রমনী । চোখ দুটি বৃহৎ হলো অমনি । ওর থেকে চার হাত দূরে শাফাহ্ দাঁড়িয়ে । 

এক মুহুর্তের জন্য মেয়েটাকে চিনতে বেগ পেলো রমনী । সেই রোগা পাতলা, ছিপছিপে শাফাহ্ বদলে গেছে । গোলগাল হয়েছে বেশ । 

মেঘা থমকালো ওর উদরের পানে দৃষ্টি পড়তেই । কি আশ্চর্য, শাফাহ্’র পেট ফুলে আছে কেনো ? 

মেঘা ধড়ফড় করে ওঠে । বাকি চার হাতের দুরত্ব ঘুচে তেড়ে যায় শাফাহ্’র কাছে । কতদিন পর দেখা । দুজনের বুকই হু হু করে মোচড় দিয়ে ওঠে । মেয়েটার গালে হাত বুলিয়ে বিচলিত হয়ে পড়ে মেঘা…..

” টুকটুকি,,,, কেমন আছিস তুই ? 

ছলছল চোখ নিয়ে মৃদু হাসে চঞ্চলা….

” আমি ভালো আছি মেঘা,, এখন তো আরো বেশি ভালো হয়ে গেলাম তোকে দেখার পর । আদ্র ভাইয়া যখন বললো, তোকে পাওয়া গেছে, জানিস আমি বিশ্বাসই করিনি । ভেতরটা কেঁপে উঠেছিলো । এতো বছর পর ফিরে এসেছিস তুই । এখন তোকে দেখে কি যে খুশি লাগছে ! এমন অবস্থা না হলে নাচতাম আমি এতক্ষণে । 

এতো নিষ্ঠুর কেনো রে তুই ? খুব মিস করেছি তোকে । কত কেঁদেছি জানিস ? কোথায় হারিয়ে গেছিলি আমাদের ছেড়ে ? 

মেঘা কানালো না সেসব কথায় । সে আগ্রহী হয়ে উঠলো চঞ্চলার বাড়ন্ত পেট নিয়ে । বাম হাত আলগোছে উদরের উপর রেখে টলমলে চোখে তাকিয়ে শুধালো কাঁপা গলায়…..

” তুই.. তুই প্রেগন্যান্ট টুকটুকি ? 

সবার উপস্থিতিতে রমনী লজ্জা পায় খানিক । চোখ ভেজা , লাজুক হাসে তবুও । নিজের ফুলে ওঠা পেটের দিকে তাকায় । অতঃপর হ্যাঁ বোধক মাথা ঝাঁকায় আলগোছে ! মেঘা হেসে উঠলো । মেয়েটাকে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করলো শক্ত করে । কিন্তু ধরলো না । উল্লাসে ছটফট করলো….

” তার মানে আমি ফুপি হবো ? ভাইয়া….. ভাইয়া তোমার বেবি ! আমি ফুপি হবো ভাইয়া ! 

মেঘা ইয়াশের কাছে এলোমেলো হয়ে ছুটে আসে । তপ্ত যুবকের কোলে রোশ্ । ইয়াশ মৃদুমন্দ ওষ্ঠ প্রসারিত করে । 

শাফাহ্ সবটা নজরে নিয়ে বললো কাছে এসে…..

” আর আমি ফুপি হয়ে গেছি অলরেডি । তাই না বেবি…?

রোশের নাকের ডগায় টোকা মারলো সে । ইয়াশের দিকে তাকিয়ে ইনোসেন্ট ফেস বানিয়ে হাত বাড়িয়ে বললো…..

” ওকে একবার কোলে নিই ? আমার কোলে দিন ! 

তাৎক্ষণিক মাথা ঝাঁকায় ইয়াশ । বলে নরম সুরে…..

” উঁহু,, নেওয়া যাবে না । নিজের দিকে তাকাও আগে । জার্নি করে এসেছো, রেস্ট প্রয়োজন । রুমে যাও, জান । খিদে পেয়েছে তো,, খাবে না ? আন্টি,, আপনার মেয়েকে একটু রুমে নিয়ে যান । 

গাল ফোলায় শাফাহ্ । 

গত চার বছরে দেশে আসা হয়েছে মাত্র দুবার । একবার রৌদ্র কোমা থেকে ফিরে আসার পর এসেছিল । আর তারপর আরো একবার এসেছিলো এক বছর আগে । এর মধ্যে আর আসা হয় নি । শাফাহ্’র গর্ভাবস্থার ভরা আট মাস চলে এখন । বেশ বড় হয়েছে পেট খানা । রমনী হাঁটতেও পারে না ঠিকমতো । 

মেঘার খবর না পাওয়া গেলে, রিস্ক নিয়ে কিছুতেই এতটা পথ জার্নি করিয়ে ওকে দেশে নিয়ে আসতো না ইয়াশ । খবর পেয়ে আর থেমে থাকতেও পারে নি । 

কতদিন পর বাড়িতে আসলো শাফাহ্ । সবার সাথে কথা বলাই তো হলো না এখনো ! 

সে মোটেও জার্নি করে ক্লান্ত নয় । হলেও বোঝালো না । 

তবুও ইয়াশ ওর আহ্লাদে সায় মেলালো না কিছুতেই । শাহিনা কাবিরের সাথে ঠেলে ঠুলে ঘরে পাঠালো ওকে । 

অতঃপর মনযোগ ফেরালো রোশ আর ইবাদের দিকে । বাচ্চাটা দু’টোকে নিয়ে বসে বললো আহ্লাদী হয়ে…..

” আমার লিটিল বার্ডের দুটো ছানা পোনা হয়েছে ! ওরা কি মামাকে চেনে আদৌও ? ইবাদ, রোশ্,, আমি কে জানো ? মামা,, মামা বলে ডাকো আমায় ! 

পরিপ্রেক্ষিতে ইবাদ এতক্ষণে জমানো রাগ ঝেড়ে ফোঁস করে ওঠে…..

” তুমি আমাল মাম্মাল কপালে তুমু কেলে কেনো ? 

” হ্যাঁ, বল তুই আমার বউয়ের কপালে চুমু খেলি কেনো ? 

বাচ্চার সাথে রৌদ্র ও যোগ দিলো চোখ মুখ পাকিয়ে । 

থতমত খায় ইয়াশ । মেঘা হা বনে তাকায় । 

উপস্থিত বাকিরা তাৎক্ষণিক কপাল চাপড়ান । দুদিকে ঘাড় ঝাঁকিয়ে প্রস্থান করেন একে একে । 

,,,, 

বিকেলের দিকে বাড়িতে আরো অতিথির আগমন । 

শিকদার বাড়ি থেকে রেহানা শিকদার আর তার স্বামী এসেছিলেন খুশির খবর পেয়ে । বিকেলের শেষ ভাগে সারা জোহান,, আর ওদের পুঁচকে ছেলে #সাহান ও এসেছে । ওদের বাচ্চা হয়েছে বছর দুয়েক পেরোলো । 

সংসার চলছে বেশ । মেঘা হারিয়ে যাওয়ার পর মাস দুয়েক একটা চাপা ট্রমায় ছিলো সারা । মেঘা ব্যাতীত এ জীবনে ওর কোনো বন্ধু ছিলো না । বন্ধুর থেকেও অনেক বেশি কিছু ছিল মেঘা । হঠাৎ এভাবে ওর হারিয়ে যাওয়া, তার উপর রৌদ্রের এই অবস্থা,,, দুটো ধাক্কায় মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলো রমনী । 

জোহান সেই সময়ে ফেস করেছে ওকে । সে কখনো মেঘাকে সামনাসামনি দেখেনি । আজই প্রথম দেখলো । 

ওরা বিকেলের শেষে আসলেও এখন সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত আটটা প্রায় । রেহানা শিকদার আর তার স্বামী ফিরে গেছেন খানিক আগে । 

সারা জোহান আছে এখনো । তবে ওরাও বেরোবে খানিকক্ষণের মধ্যেই । 

সাড়ে সাতটার দিকে খাওয়া দাওয়া শেষ করে ফেরার আগে মেঘার রুমে ঢুকেছে সারা । 

সব বাচ্চারা একসাথে মিলে খেলছে বিছানার উপর । মেঘা আর সারা বারান্দায় । 

দুই বান্ধবীর জমিয়ে রাখা হাজার আলাপনের মাঝে ঘর পেরিয়ে বারান্দায় ঢুকে গলা খাঁকারি দিলো জোহান । 

রমনীরা চকিতে ফিরতেই মুচকি হেসে বললো….

” আপনাদের আলাপ আজ আর শেষ হওয়ার নয় । সারা,, আপনি কি আজ থাকতে চাইছেন বান্ধবীর কাছে ? নাকি ফিরবেন আমার সাথে ? 

লোকটার ওষ্ঠ চাপা স্বর । 

রমনীরা আলতো হাসলো । বললো সারা…..

” থাকতে দিলে থাকতাম,, কিন্তু আপনি তো থাকতে দেবেন না । 

” মন চাইলে থাকতে দিতাম, কিন্তু মনটা তো চাইছে না । 

মেঘা মুচকি হাসে । মাথা ঝাঁকায় সারা । 

জোহান তাগাদা দেয় এবারে…..

” রাত হচ্ছে সারা । এবার চলুন । এর মধ্যে না হয় বান্ধবীকে নিজের কাছে ডেকে নেবেন একদিন । সে তো আপনার স্বামীর বাড়ি দেখেনি । 

সারা হাঁফ ছাড়ল । ফিরলো মেঘার দিকে । 

” আজ আসি মেঘা । দেরি হয়ে যাচ্ছে । নিজের আর বাচ্চাদের যত্ন নিবি । সাথে রৌদ্র ভাইয়ার ও । 

উঁচু পেট নিয়ে ড্রইং রুমের সোফায় বসে আছে শাফাহ্ । ফোলা ফোলা পা দুটো সামনের টি টেবিলের উপর তুলে রাখা । সবে রাতের খাবার খেলো । হালকা পাতলা খেলেই শ্বাস নিতে কষ্ট হয় ইদানিং । তার উপর খাবারের পর এক গাদা ঔষধ খেতে হয় । তিতি বিরক্তি এসে গেছে ঔষধের প্রতি । মেয়েটা বসে বসে আঁকুপাঁকু করছে । এর মাঝেই গাদা গাদা ঔষধ নিয়ে হাজির হলো ইয়াশ । 

এখন নাক চেপে এসব গিলতে হবে , এটা ভাবতেই গা গুলিয়ে উঠচলো চঞ্চলার । 

ঝামটা মেরে মুখ ফিরিয়ে নিলো সে । ইয়াশ পাশে বসে । বলে মোলায়েম কন্ঠে…..

” এদিকে ফেরো টকেটিভ লেডি,,, খেয়ে নাও ঝটপট । 

” আমার বমি পাচ্ছে, মেঘার ভাইয়া । ঔষধ খেলে বমি করে দেবো । 

” নাটক করবে না, মেঘার ননদ । ফেরো বলছি….

চুপসে গিয়ে ফিরে তাকালো রমনী । 

ইয়াশ নিজে ঔষধ গুলো খুলে খাইয়ে দেয় ওকে । হাত বাড়িয়ে রমনীর কপালের ধারে পড়ে থাকা খুচরো চুল গুলো কানের পিঠে ঠেলে দিয়ে বলে অতঃপর…..

” এবার রুমে গিয়ে লক্ষি মেয়ের মতো ঘুমিয়ে যাবে । ঘুম প্রয়োজন তোমার ! চলো…..

মেয়েটার হাত ধরে উঠে দাঁড়ালো সে । এদিকে রুমের দরজা থেকে এই দৃশ্যটুকু অদ্ভুত আকর্ষণীয় লোচনে চেয়ে দেখে সারা । জোহান ছেলেকে কোলে নিয়ে পাশেই দাঁড়িয়ে । সে চোখ সরু করে স্ত্রীকে পরখ করলো । ঠিক ঠাহর করতে পারলো না এহেন চাহনির অর্থ । 

ইয়াশের মনযোগ কোন দিকে নেই । শাফাহ্ কে সামলে নিচ তলাতেই পাশের এক রুমে ঢুকতে গেলে হঠাৎই মুখ ফসকে ডেকে ওঠে সারা…..

” ইয়াশ ভাইয়া,, 

থেমে সচকিতে চায় যুবক । চোখাচোখি হতেই সেই অবাঞ্চিত অনুভূতিতে ধক্ করে ওঠে রমনীর বক্ষস্থল । ঢোক গেলে তৎক্ষণাৎ । কেনো ডাকলো বুঝলো না । ইয়াশ নিজে থেকেই বলে……

” আরে সারা,, চলে যাচ্ছো ? 

” জ…জি ভাইয়া ! ভালো থাকবেন । আসি….

বলেই আর থামলো না । চোখ নামিয়ে জোহানের হাত চেপে ধরে গটগটিয়ে এগোলো সদরের দিকে । হকচকিয়ে যায় জোহান…..

” সারা,,, যাওয়ার আগে কাউকে বললেন না তো । আন্টিকে বলতে হবে না ? 

” উঁহু,, আমি আগেই বলেছি । আর বলতে হবে না । চলুন এখন । 

গাড়িতে পাশাপাশি বসেছে দু’জন । সারার কোলে সাহান । গাড়ি স্টার্ট হতেই খোলা জানালা ভেদে দমকা হাওয়া পেলো রমনী । 

চোখ বুজে লম্বা লম্বা শ্বাস টানলো বুক ভরে । জোহান এখনো হতভম্ব । ড্রাইভিংয়ের মাঝে বারবার আড়চোখে সারাকে পরখ করছে । তবে আগ বাড়িয়ে শুধোচ্ছে না কিছু । 

প্রায় মিনিট পাঁচেক পর ভেতরের অবাধ্য উচাটন সামলে শান্ত হলো রমনী । চোখ বুজলো । এমনটা তো হওয়ার কথা নয় । এতো বছর পর আজ ইয়াশ কে দেখলো সে,, অনেক কিছু বদলে গেছে এতো দিনে । তবুও কেনো লাগছে এমন ? 

চোখের কোণে উঁকি দেওয়া চিকচিকে জল কনা মুছে নিয়ে স্বামীর পানে তাকালো সে । বুক ফুলিয়ে হাসলো । ডাকলো মোলায়েম কন্ঠে…..

” জোহান ? 

” জি বউজান ? 

সারার হাসি প্রশান্ত হয় নিমিষেই । সিট বেল্ট খুলে জোহানের দিকে চেপে বসে । লোকটার বাহুতে মাথা ঠেকিয়ে বলে…..

” আই লাভ ইউ ! 

” আই লাভ ইউ ঠু, সারা ! 

” আপনি জানেন,,, আপনি একটু বেশিই ভালো । আমার কল্পনার থেকেও ! 

” আর আপনি একটু বেশি আদুরে,, আমার বাচ্চার থেকেও !

সারা মাথা তুলে চায় । ওদের বিয়ের চার বছরের অধিক সময় পেরিয়েছে । এই লোক এখনো এই আপনি সম্বোধন টা ছাড়েননি । সারা কতবার বলেছে এই নিয়ে । তবে বরাবর লোকটি এড়িয়ে গেছেন । গায়ে মাখেন নি ! 

তিরিক্ষি হয়ে আজও বললো রমনী….

” আপনি কি আমাকে তুমি করে বলবেন না কখনো ? 

” উঁহু,, আপনাকে আপনি করে বলতেই আমার মারাত্মক ভালো লাগে,, বউজান ! আর এই ওয়াদিন জোহান অলওয়েজ নিজের ভালো লাগায় প্রাধান্য দেয় । যেভাবে প্রাধান্য দিয়ে আপনি সূচক আপনি টাকে বউ করেছে, ঠিক সেভাবেই । 

লোকটার অকপট উত্তর । 

” আপনি একটা পাগল ! বউকে আপনি করে বললে লোকে কি ভাবে জানেন ? আপনি সম্বোধন শুনলে কেমন পর পর লাগে ! 

” আর আপনাকে আপনি বললে আমার কেমন আপন আপন লাগে । লোকের ভাবনায় আমি পরোয়া করি না । আপনি সম্বোধন টা সম্মানসূচকে ব্যবহার করা হয়, তা তো জানেনই । আমি আপনাকে সম্মান দিই,, সারা । শুধু মেয়েরাই কেনো তাদের স্বামীকে আপনি বলবে,, ছেলেরা কেনো নয় ? আপনিও তো আমাকে তুমি করে বলতে পারেন । তা করেন না কেনো ? 

ভ্রু নাচালো লোকটা । 

” ধ্যাত,, আপনার সাথে কথায় পারবো না । 

শব্দ করে হাসে জোহান । একহাতে স্টিয়ারিং সামলে অন্যহাতে স্ত্রীর কাঁধ জড়িয়ে নেয় । মাথা ঘুরিয়ে শব্দ হীন পরশ একে দেয় রমনীর সিঁথিতে….

,,,,,

রাত্রি এগারোটা । 

বাড়ির সবাই যখন যে যার ঘরে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে, ইয়াশ তখন নিজের বোনের ঘরে উপস্থিত । বাচ্চারা ঘুমিয়েছে । লক্ষি মেয়েটা মেহেরের কাছে । মেহের কে ভীষণ চেনে সে ‌। 

এদিকে রুখো ইবাদ তার মাকে ছাড়েনি । 

হাত পা ছড়িয়ে বিশাল বিছানায় একলা শুয়ে বেঘোরে ঘুমাচ্ছে সে । 

ইয়াশ একপাশে দাঁড়িয়ে বুকে হাত গুটিয়ে । মেঘা নতজানু হয়ে বসে আছে ডিভানের উপর । রৌদ্র তার পাশেই । 

ইয়াশ এতক্ষণ ধরে টুকটাক প্রশ্ন শুধিয়েছে বোনকে । জানা হয়েছে অনেক কিছু । আরো অনেক কিছুই অজানা, ঝাপসা । মেঘা কিছু একটা বলতে গিয়ে থেমেছে । খিল ধরেছে গলায় । আর পারছে না বলতে । ভয়ে কাঁপছে হাত পা । 

ইয়াশ দাঁড়িয়ে না থেকে বোনের মুখোমুখি হয়ে বসলো….

” মেঘা,,, আমার দিকে তাকা । সেদিন কি হয়েছিলো বনু ? কি করেছিলি তুই ? ভয় পাচ্ছিস কেনো এভাবে ? এখানে তো শুধু আমরা আছি, আর কেউ নেই । বল আমাদের । কি করেছিস তুই ? 

মেঘা চোখ তুলে চায় । ছলছলে দৃষ্টি তার । রুদ্ধতায় দাঁত বসেছে অধরের কোণে । রৌদ্র আর ইয়াশ দুইজনকেই এক ঝলক করে দেখলো সে । পরক্ষনে আর সংযত থাকলো না । ফিকড়ে কেঁদে উঠলো মুখ চেপে । 

ভড়কে যায় দুই যুবক । তড়িঘড়ি করে ওকে নিজের দিকে ফেরায় রৌদ্র । বিচলিত হয়ে বলে…..

” ইভারা,, কি হয়েছে সুইটহার্ট ? বলতে চাও না তুমি ? আচ্ছা,, বলতে হবে না । কেঁদো না,,, রিল্যাক্স জান…. 

কিচ্ছু জানতে চাইবো না আমরা । 

মেঘা থামলো না আজ । কান্না গিলে নিলো । ঢোক গিলে সোজা হয়ে বসে বললো অধর কাঁপিয়ে….

” স….সেদিন আমার দ্বারা মা*র্ডার হয়ে গেছে, ভাইয়া । আ…আমি মেরে ফেলেছি ঐ ছেলেটাকে । প…পুলিশ খুঁজছে আমায় ! জেনে গেলে আমাকে ধরে নিয়ে যাবে ওরা । আমি কোথাও যাবো না । কোত্থাও না । আমার ছেলে মেয়েদের ফেলে যাবো না আমি । 

আমি ইচ্ছে করে মারতে চাইনি ওকে । করতে চাইনি খু*ন । ভুল করে হয়ে গেছে আমার দ্বারা । ও অসভ্যতামি করতে চেয়েছিলো আমার সাথে । আমি আর পথ পাইনি । মেরে দিয়েছি….

🛑 বাকিটা আগামী পর্বে পরিষ্কার করা হবে । বেশি বেশি রেসপন্স করুন ঝটপট ‌। 🛑

চলবে……..

সবার আগে গল্প পেতে অবশ্যই পেজটি ফলো দিয়ে রাখুন

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply