Golpo romantic golpo আসবো ফিরে আবারো

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৯০(প্রথমাংশ+শেষাংশ)


#আসবো_ফিরে_আবারো

#পর্ব_৯০ [ প্রথমাংশ ]

#সুরভী_আক্তার

পিনপতন নীরবতার মাঝে রৌদ্রের এমন উঁচু আর্তনাদ যুক্ত কন্ঠটা কেঁপে কেঁপে প্রতিধ্বনিত হলো গোটা লবিতে । 

হতচকিত হয়ে গেলেন সকলে । 

রৌদ্র অস্থির হয়ে পড়ে । পানি ঝড়ে গাল ছাপিয়ে । সামনের রমনী টি এখনো আশ্চর্যে কিংকর্তব্য বিমূঢ় । পলকহীন চেয়ে রয়েছে । 

রৌদ্র দিশেহারা হয়ে গেলো । কেঁদে উঠলো, আবার পাগলের মতো হাসলো । আবার বললো মেয়েটাকে একটু কাছে টেনে…..

” ড্যাড,, দেখো,, আমার ইভারা এটা । আমার জানেমান….

তোফায়েল কাবির বোঝেন না । পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে । কাঁপছে রৌদ্র । নিশ্চয়ই আবার ভ্রান্তি ঘিরে ধরেছে তাকে । তিনি বোরকা পরিহিত মেয়েটাকে এক ঝলক দেখে শুষ্ক ঢোক গেলেন । আদ্রের দিকে ফিরে তাকান…..

” আদ্র,,, ভাইকে সামলাও । হাইপার হয়ে পড়ছে ও । 

রৌদ্রের কানে পৌঁছায় কথাটুকু । সে মাথা নাড়ে ! মেয়েটার দিকে ভরা চোখে চেয়ে তাকে আরো কাছে টেনে আনে । রোশ্ ছিলো কোলে । রমনী টি আলগোছে মেয়েকে সরিয়ে দিলো । লোকটার টানে কাছে গেলো বাঁধাহীন । হুইলচেয়ারে বসে থেকেই এক টানে মেয়েটিকে তুলে বুকের সাথে জড়ালো বেপরোয়া যুবক । ভীষণ শক্ত ভাবে জড়ালো । কম্পিত গলায় দুই বাক্য আওড়ালো বাচ্চাদের মতো করে…..

” সুইটহার্ট….এসেছো তুমি ? আমি জানতাম তুমি ফিরে আসবে আমার কাছে । তাইতো বেঁচে আছি এখনো । জানো,, আমি অপেক্ষায় ছিলাম তোমার । আমাকে ছেড়ে কোথায় ছিলে জান ? 

আদ্র এগিয়ে আসে । ঠোঁট ভিজিয়ে ভাইয়ের কাঁধে হাত রাখে,, সরানোর চেষ্টা করে মেয়েটার থেকে…..

” রুডি,,, কি করছিস ভাই ? ছাড় ওনাকে ! সবাই দেখছে, মিস আন্ডারস্ট্যান্ডিং ক্রিয়েট হবে একটা । ভুল ভাবছিস তুই । প্লিজ ভাই, ছেড়ে দে । আমরা রুমে যাবো চল….

মেয়েটাকে ছাড়লো না বেপরোয়া যুবক । উল্টে আদ্রকে ঠেলে দূরে সরিয়ে দিলো । ভাঙ্গা গলায় চেঁচিয়ে উঠলো….

” নাআআআ, এটা আমার ইভারা । দেখ তোরা ওকে । ও আমার জান । আমার জানকে চিনেছি আমি । ফিরে এসেছে ও আমার কাছে । মম,, আমার ইভারা ফিরে এসেছে মম । 

রুবিনা কাবির ধক্ করে ওঠেন । 

চেঁচামেচিতে গোটা গোটা মানুষের ভিড় জমলো এর মধ্যেই । অনাকাঙ্ক্ষিত একটা সিন ক্রিয়েট হলো আচমকা । রৌদ্র হতবুদ্ধ রমনী টিকে ছাড়ে । মুখোমুখি করে তাকে । মেয়েটার ভেজা ভেজা দূর্বোধ্য নয়নের পানে চেয়ে শব্দ করে হাসে । দিক দিশা খুইয়ে ফের মুখখানি আজলে নেয়  । ব্যাস্ত হয়ে নিকাবের উপরেই এলোমেলো চুম্বন ছুঁইয়ে দিতে থাকে মেয়েটার মুখ জুড়ে । 

এ বেলায় ভড়কে যান বাড়ির সবাই । বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে । আদ্র রৌদ্রের হুইলচেয়ার টেনে পিছিয়ে আনলো । মেয়েটা বসে রয় সেখানেই । দূরে আসতেই হাঁসফাঁস করে ওঠে রৌদ্র….

” আদ্র,,,, দূরে সরালি কেনো আমায় ? আমি আমার ইভারার কাছে যাবো । ছাড় আমায় । নিয়ে চল ওর কাছে…..

তার কথায় গুরুত্ব না দিয়ে শুভ্র গলা নামিয়ে বলে পড়ে থাকা মেয়েটার উদ্দেশ্যে…..

” উই আর স্যরি । আমাদের ভাই একটু অসুস্থ ,, ট্রমাটাইজড । অন্য কারোর সাথে গুলিয়ে ফেলেছে আপনাকে । ক্ষমা করবেন প্লিজ । রোশ্ আপনার মেয়ে ? আমরা ওকে বিচের কাছে পেয়েছিলাম । আমাদের সাথেই ছিলো কাল থেকে । আমরা ওর ফ্যামিলির খোঁজ ও করেছিলাম । চিন্তা করবেন না, ওর খেয়াল রেখেছি কাল থেকে । আপনি এখন ওকে নিয়ে যেতে পারেন । আমার ভাই আপনাকে দেখে অস্থির হয়ে পড়ছে । প্লিজ,,, আপনারা আসতে পারেন । 

মেয়েটার মাঝে পরিবর্তন নেই তবুও । সে শুনলো সব । তার স্থির দৃষ্টি সামনের হুইলচেয়ার টার পানে । দুটো প্রশ্ন মনে,,, প্রথম টা, কে বসে আছে এই চেয়ারে ? আর দ্বিতীয় টা , এই বেপরোয়া লোকটা এই হুইলচেয়ারে বসে আছে কেনো ?

মেয়েটার চোখ কুঁচকে আসে । নিকাবের আড়ালে ঘনঘন ঢোক গেলে সে । অনবরত পানি ঝড়ে চোখ থেকে । দমের অভাবে শুকিয়ে আসে বুক । 

এক পর্যায়ে বুকে পাথর চাপিয়ে দৃষ্টি নামিয়ে নেয় রমনী । পাশ ফিরে মেয়ের দিকে তাকায় । মেঝেতে বসে পিটপিট করে মায়ের দিকেই তাকিয়ে আছে রোশ । 

মা মেয়ের কাছে আরো দুজন আসলো এবারে । একজন যুবক তিনি । রোশের সমবয়সী আরেকটা ছেলে বাবুর হাত তার হাতের মুঠোয় । পা বাড়িয়ে এসে রমনী টির পাশে দাঁড়ায় ওরা দুজন । যুবকের সাথে থাকা ছোট্ট বাচ্চা ছেলেটা রাগি রাগি চোখে চেয়ে আছে রৌদ্রের দিকে । হয়তো ভাবছে, এই লোকটা কে ? আর তার মাম্মা কে জড়িয়ে ধরেছিলোই বা কেনো ? তার মাম্মা শুধু তার ! একেই বোনকে না পেয়ে ছোট্ট মেজাজ বিগড়ে ছিলো কাল থেকে । এনারা কি বোনকে চুরি করে এনেছিলো না-কি ? 

ছোট্ট মনে এমন শত প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে বাচ্চাটার । চিনছে না কাউকেই । 

সে রৌদ্রের থেকে রুষ্ট দৃষ্টি ফিরিয়ে মায়ের কাছে বসলো । বোনকে দেখে ঠোঁটে হাসি টেনে আধো আধো স্বরে বলল…..

” রোশ্,,, ইউ ওকে ? 

নিজের জমজ ভাইয়ের কথায় গদগদ হয়ে হাসে রোশ….

” ইয়াহ্, রোশশশ্ ওকে । মাম্মা,,, রোশশশ্ বায়ি দাবে….

মেয়ের কথায় রমনী টি ঠোঁট ভেঙে হাসার চেষ্টা করে । ফিরে তাকায় না কোনো দিকে । কথাও বলতে পারে না অনুচ্চারিত যাতনায় । বোধহয় গলায় কিছু আটকে গেছে । শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে । 

সে দুহাতে দুই ছেলে মেয়েকে বুকে আগলে নেয় । ফিকড়ে ওঠে সইতে না পেরে । 

মেয়েটার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা যুবকটি রুক্ষ দৃষ্টিতে এক পলক দেখে নেয় রৌদ্র কে । বলে অতঃপর….

” ঠিক আছো তুমি ? রোশ্, ঠিক আছো মামনি ? চলো,, বাড়ি যাবে এখন….

রমনী টি চোখ বুজে বুকের উচাটন রুখে নেয় । শ্বাস ফেলে দুহাতে ছেলে-মেয়ের হাত ধরে উঠে দাঁড়ায় । ধরা গলায় বলে বিড়বিড় করে……

” বাড়ি যাবো মা,,, চলো….

তার গলার স্বর আধো আধো কানে পড়তেই রৌদ্র কাঁপতে কাঁপতে চেঁচিয়ে ওঠে গগন কাঁপিয়ে…..

” নাআআআ ইভারা,,, কোথাও যাবে না তুমি ? আদ্র,, আমার ইভারা ওটা । 

তোরা দেখ ওকে । ও আমাকে ছেড়ে চলে যাবে আবার । ওকে কেনো চিনতে পারছিস না তোরা ? আমি বলছি তো, ও আমার জান । আপু, শুভ্র ব্রো, বাবাই, ড্যাড, ওকে আটকাও প্লিজ । 

বেপরোয়া যুবকের গলা চেরা আর্তনাদ গায়ে লাগলো না কারোর । উপস্থিত অপরিচিত সবাই তাকে উন্মাদ বোই আর কিছু ভাবলেন না । আদ্র ঢোক গেলে,,, ভাইয়ের সামনে বসে বলে….

” রুডি,,, ভাই প্যানিক অ্যাটাক এসে যাবে তোর । প্লিজ শান্ত হ । মেঘ নেই এখানে । উনি অন্যকেউ । দেখছিস তো, হাজবেন্ড আর বাচ্চা আছে ওনার । মেঘ হলে তোর কাছে আসতো । 

” না আদ্র,,ও আমার ইভারা । আমার কোনো হ্যালুসিনেশন হচ্ছে না বিশ্বাস কর । আমি পাগল নই । ওর কাছে নিয়ে চল আমায় ‌। 

ইভারা,,,জান আ’ম স্যরি । সব কিছুর জন্য স্যরি । প্লিজ আমার কাছে এসো । এরা কেউ বিশ্বাস করছে না আমায় । 

তুমি আমার ইভারা,, তাইতো ? 

ছেলেটা ছটফট করে উন্মাদ হয়ে উঠলো । 

বসে থাকতে পারলো না আর । পারলো না অপেক্ষা করতে । কেউ শুনছে না তার কথা, অপেক্ষা করলে ইভারা পালিয়ে যাবে,, এটা কেনো বুঝতে পারছে না কেউ ?

সে অচল । হাঁটে নি চার বছর । পায়ে বল নেই । রাগে আদ্র কে ঠেলে সামনে থেকে সরিয়ে দিলো । 

পা নামিয়ে মেঝেতে রাখলো । থরথর করে কাঁপছে সর্বাঙ্গ । ভর করে দাঁড়ানোর আগে আরেকবার ডাকলো থেমে থেমে…..

” সুইটহার্ট,,, আমার কাছে এসো প্লিজ । আমি মরে যাবো নয়তো….

বেপরোয়া যুবকের এমন কথাবার্তার অর্থ উপস্থিত কেউ বুঝতে পারছেন না । রমনীর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অপরিচিত ছেলেটাও না বুঝে বললো ঝামেলা এড়াতে…..

” দাঁড়িয়ে থাকবে ? মেয়েকে পেয়ে গেছো, বাড়ি যাবে না ? আই থিংক এখানে থাকাটা ঠিক হবে না । চলো….

রমনী টি চোখ ঘুরিয়ে উপস্থিত পরিচিত সবাইকে এক ঝলক করে দেখে নেয় । হয়তো খোঁজে কাউকে । তবে যাকে খোঁজে, সে নেই এতো সবের মাঝে । প্রশ্ন জাগে মনে । মনের প্রশ্ন মনেই চেপে রাখে । যেভাবে এতো বছর রেখেছে, ঠিক সেভাবে । লম্বা শ্বাস ফেলে,,, অতঃপর মেয়েকে তুলে নেয় কোলে । ছেলের হাত চেপে ধরে এক কদম এগোতেই আর থেমে থাকতে পারে না বেপরোয়া যুবক । পায়ে ভর করে উঠে দাঁড়ায় এবারে । তবে পারে না বল টিকিয়ে রাখতে । হাঁটু কাঁপছে এতো বছর পর নিজ পায়ে দাঁড়াতে গিয়ে । 

সে পারলো না শরীরের ভার পায়ে ফেলতে । সোজা হয়ে দাঁড়ানোর আগেই শক্তি হারিয়ে ধপ করে লুটিয়ে পড়লো শক্ত মার্বেলের মেঝেতে । কুকিয়ে উঠলো অসম্ভব ব্যাথায় ।  আঁতকে ওঠেন বাড়ির লোক । তারা সবাই ছুটে যাওয়ার আগেই কানে বাজে রিনরিনে স্বরের ভড়কানো ডাক ! নাম সম্বোধনে ডেকে উঠলো রমনী…..

” রৌদ্র…

ডাক ছুড়ে আর থামলো না বোরকা পরিহিত রমনী । রোশ্ কে কোল থেকে নামিয়ে ছুট্টে আসলো সে । ধড়ফড় করে মেঝেতে বসলো যুবকের মুখোমুখি হয়ে । 

আঁকড়ে ধরলো লোকটাকে । আওড়ালো কেঁপে কেঁপে…..

” রো…রৌদ্র,,, লেগেছে ? ঠিক আছেন আপনি ? 

যুবক চোখ তুলে চায় ‌। 

থমকায় পরিস্থিতি । হুট করেই যেনো মোড় ঘুরে গেলো । অবাক লোচনে সবাই চেয়ে রইলো মেয়েটির পানে । স্তব্ধ হলেন কাবির পরিবারের সবাই । 

আন্দাজ ঘুচে যেতেই আদ্র কপাল গুটিয়ে অস্ফুটে উচ্চারণ করে বিড়বিড় করে….

” মেঘ……

রৌদ্রের নিভু জবানে প্রত্যুত্তর ফোটে…..

” আমি ঠিক নেই জান,, তোমার বিরহে একটুও ঠিক নেই । 

সে আর দমলো না । কাঁপা কাঁপা দুহাতে শক্ত করে জাপটে ধরলো মেঘাকে । আশপাশ তোয়াক্কা না করে বাচ্চাদের মতো হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো সবার সামনেই । আশ্চর্য হন উপস্থিত সকলে । গোটা রিসোর্টের সব গেস্ট, টুরিস্ট, স্টাফ, বিস্মিত হয়ে যান আকস্মিক ছেলেটাকে এভাবে কাঁদতে দেখে । এতক্ষণ এই ছেলের পাগলামি দেখছিলেন উপভোগ্য দৃষ্টিতে,, তবে এ বেলায় যেনো সবার দৃষ্টিকোণে পরিবর্তন আসলো । 

বেপরোয়া যুবক মেয়েটাকে বুক থেকে সরিয়ে হেঁচকা একটানে নিকাব সরিয়ে দিলো মুখ থেকে । অমনি দৃশ্যমান হয়ে উঠলো ললিতার ভেজা ভেজা ফর্সাটে নির্ভেজাল মুখখানা । 

বহু বছর পর এই বহুল কাঙ্ক্ষিত মুখাবয়ব টুকু নজরে পড়তেই ভরে উঠলো যুবকের চোখ দুটি । কাঁপলো ভেতর ঘর । পাল্লা দিয়ে বাড়লো দেহের কম্পন । 

মেঘার চোখ বন্ধ । রৌদ্র ওর আদল আজলে নেয় । শক্ত করে ঠোঁট বসায় কপালে । 

বিচলিত হয়ে আবার জড়িয়ে ধরে বুকের মাঝে । বুক চিরে কেঁদে ওঠে কাঁধে মুখ গুজে……

” আমি জানতাম, তুমি আমার ইভারা । আমি ঘ্রাণ পেয়েছি তোমার শরীরের । মাই সুইটহার্ট, মাই সানি । দেখেছো সবাই, আমি বলেছিলাম না এটা আমার জান । আমার জানেমান, দেখো তোমরা । আমার প্রাণ ফিরে এসেছে আমার কাছে । 

মেঘা অনড় হয়ে বসে । প্রতিক্রিয়া নেই । হাত ঝুলে রয়েছে এখনো । সে লোকটাকে জড়ায় নি । কেবলই চোখ দুটো পানি ঝড়াচ্ছে অবাধ্য খেয়ালে । 

রৌদ্রের দেহের কম্পন স্পষ্ট অনুভব করছে সে । লোকটা অস্বাভাবিক ভাবে কাঁপছে । হাঁসফাঁস করে শ্বাস টানছে হা করে । 

বাকিরা চেয়ে রয়েছে অবিশ্বাসে । আদ্র গুটি গুটি কদম বাড়িয়ে এক হাঁটু মুড়ে মেঝেতে বসলো । ডাকলো ধরা গলায়……

” ম…মেঘ ! 

চোখ খোলে রমনী । ঠোঁট কামড়ে ফুঁপিয়ে ওঠে সব বাঁধা ঠেলে । বদন খানি ভিজে জবজবে । 

আদ্রের চোখে সন্দেহ এখনো । সে আঁখি লতা কুঁচকে শুধোয় বাক্য ভেঙে ভেঙে….

” তুই,, এখানে,,, ক…কি করে ? 

” তোমার ভাই কাঁপছে ভাইয়া,,,, তাকে দূরে সরাও । 

মেয়েটার জবানে কথা ফোটে । জড়তায় নিভে আসা ক্ষিণ কন্ঠ তার । কাঁধ ভিজে গেছে রমনীর । হিজাব, বোরকা চুঁইয়ে লোকটার চোখের নোনা জলের ভেজা ভেজা পরশ পড়ছে কাঁধের ত্বকে । 

দূরে সরানোর কথা শুনে আঁতকে উঠলো যুবক । 

আরো শক্ত করলো হাতের বাঁধন…..

” না, সরবো না আমি । আ’ম স্যরি ইভারা । খুব করে স্যরি । প্লিজ আমাকে ছেড়ে যেও না আর । আমি শুধু তোমাকেই ভালোবাসি । আমার জীবনে আর কেউ নেই । ওরা কেউ নয় আমার । শুধু তুমি আমার সব । প্লিজ জান,,, আমাকে বিশ্বাস করো । আমি ভালোবাসি তোমায়…..

ক্রমশ কাঁপুনি বাড়ছে যুবকের শরীরের । মাথা ছিঁড়ে যাচ্ছে । শিরা উপশিরা গুলি ফুলে ফেঁপে দৃশ্যমান । 

সে রমনীর কাঁধ থেকে মুখ তুলতেই আঁতকে উঠলো আদ্র । নাক বেয়ে গলগলিয়ে রক্ত বেরিয়েছে যুবকের । মেঘার কাঁধের একাংশ সহ, রৌদ্রের গোটা মুখ ভেজা লাল তরলে । চোখ প্রায় নিভে এসেছে ‌। আদ্র চেঁচিয়ে ওঠে,,, সঙ্কিত হয়ে একটানে ভাইকে নিজের দিকে ফেরায়…..

” রুডি,,, রক্ত ! 

তোকে বলেছি না শান্ত হতে, শুনিস না কেনো আমার কথা ? এইইই,,, স্থির হ । নিজের ক্ষতি কেনো করিস বারবার ? আমার দিকে তাকা । ওঠ,, রুমে চল । 

সে জোরালো শ্বাস নিতে নিতে হাঁসফাঁস করে বাণী আওড়ায় গলা ভেঙ্গে…..

” ছাড় আমায়,, কোত্থাও যাবো না আমি । 

আমি আমার ইভারার কাছে থাকবো । ও আমাকে ছেড়ে চলে যাবে আবার । এবার ও হারিয়ে গেলে, আমি মরে যাবো ওকে ছাড়া । আমাকে ওর কাছে থাকতে দে,, প্লিজ । ওর কাছে থাকলে আমার কিচ্ছু হবে না । 

আদ্র পিছু ফিরে শুভ্র কে ইশারায় বোঝালো কিছু । রৌদ্রের শরীর কাঁপতে কাঁপতে অবস হয়ে আসছে । নেতিয়ে পড়ছে ধীরে ধীরে । 

নাক হতে রক্ত বেরোনো বন্ধ হচ্ছে না । 

একলা ঔদ্ধত্য হওয়ার কিঞ্চিত জোর টুকুও নেই বেপরোয়া যুবকের দেহে । বিলম্ব হলে অনর্থ ঘটে যাবে । 

আদ্র আর শুভ্র তড়িঘড়ি করে ওকে তুলে হুইলচেয়ারে বসালো । রৌদ্রের ডান হাতের মুঠোয় তখনো মেঘার হিজাবের একাংশ খামচে ধরে রাখা । 

মেঘা স্তম্ভিত । মাথায় ঢুকছে না এসব কিছু । রক্তে ফোবিয়া আছে তার । তবুও আজ কোনো অস্থিরতা কাজ করলো না । আশ্চর্য হয়ে রৌদ্রের এমন অবস্থা দেখে যাচ্ছে সে । এ কি হয়েছে রৌদ্রের ? 

হুইলচেয়ার ঠেলে লিফটের দিকে এগোনোর আগে হিজাবে টান পেলো মেয়েটা । দুলে উঠলো তার শরীর । ছলকে পলক পড়লো চোখে । 

কানে বাজলো রৌদ্রের আধো আধো স্বর,,,, লোকটা নিভু নিভু চোখে চেয়ে আওড়ালো হাত ফসকানোর আগে…..

” আই লাভ ইউ সুইটহার্ট,,,, আমাকে ছেড়ে আর যেও না প্লিজ । ভীষণ কষ্ট হয় আমার….

আর কিছু বলতে পারলো না সে । কম্পমান হাতে খামচে ধরে রাখতে পারলো না মেয়েটাকে । আদ্র তার আগেই বাঁধন ছিড়ে তড়িঘড়ি করে হুইলচেয়ার ঠেলে লিফটের দিকে এগোলো । 

মেঘা এখনো বসে আছে চকচকে মেঝেতে । দৃষ্টি লিফটের পানে ‌। শোরগোল পড়লো আশেপাশে । রৌদ্র দৃষ্টিগোচর হতেই কথার রোল পড়লো সবার মাঝে । এই ক্ষণিকের দেখায় কেউ কিছু বোঝেন নি । যা দেখেছেন তাই, কতটুকু কি বুঝেছেন কে জানে । 

মেঘা হতভম্ব । মাথা ফেটে যাচ্ছে । 

পাশে কারোর উপস্থিতি টের পেতেই চকিতে মাথা তুললো । রুবিনা কাবির দাঁড়িয়ে,,, আঁখি কোটর ভরাট তার । 

তার সাথে চোখাচোখি হতেই গাল ঝাঁপিয়ে নিমিষেই পানি গড়িয়ে পড়লো রমনীর । ফিকড়ে উঠলো । ফিসফিস করলো…..

” মা ! 

ডান হাতে টান মেরে ওকে তুলে দাঁড় করালেন ভদ্রমহিলা । চোখ মুছে শক্ত করলেন নিজেকে । দৃষ্টি করলেন প্রখর । মেঘা ঢোক গেলে । কেঁপে কেঁপে শুধোয় নির্বোধের ন্যায়….

” মা ! মা,,, রৌদ্রের কি হয়েছে ? উনি এমন করছেন কেনো ? র… রক্ত , নাক থেকে কিসের রক্ত,,,ওসব ? হুইলচেয়ার, রৌদ্র হুইলচেয়ারে কেনো মা ? 

ভদ্রমহিলা কোনো উত্তর করলেন না । সবার তাকিয়ে থাকার মাঝেই টানতে টানতে মেয়েটাকে সিঁড়ির দিকে নিয়ে যেতে লাগলেন । মেঘা ভড়কে যায় । ঘাড় ঘুরিয়ে পিছু ফিরে নিজের বাচ্চাদের দেখে আওড়ায় গলা তুলে…..

” মা,,, আমার বাচ্চা ! 

🛑 দুঃখিত, একসাথে পুরোটা দিতে পারলাম না । পরবর্তী অংশ কালকে দেওয়ার চেষ্টায় থাকবো, ইনশাআল্লাহ । রেসপন্স করবেন ঝটপট । হ্যাপি রিডিং । 🛑

চলবে…….

সবার আগে গল্প পেতে অবশ্যই পেজটি ফলো দিয়ে রাখুন

#আসবো_ফিরে_আবারো

#পর্ব_৯০ [ শেষাংশ ]

#সুরভী_আক্তার

দোতলায় আদ্রের রুমে নিয়ে গিয়ে রৌদ্রকে স্থির করার যথেষ্ট চেষ্টা করা হচ্ছে । কিন্তু সেই বেপরোয়া ছেলেকে ধরে রাখা বড্ড দায় । নিস্তেজ শরীরটাতে খানিক জোর পেয়েছে কি পাই নি, অমনি ঔদ্ধত্য হয়েছে আবার । 

ওকে শক্তি খাটিয়ে বিছানায় চেপে ধরার কসরত করছে শুভ্র আর তোফায়েল কাবির । ভদ্রলোক ছেলেকে বোঝানোর চেষ্টাও করছেন । কিন্তু শুনছে না তাদের বেপরোয়া ছেলে । আদ্রর হাতে সিরিঞ্জ । প্যানিক অ্যাটাকের তীব্রতা খুব বেশি বেড়ে রৌদ্রকে ধরে রাখা দায় হয়ে পড়ে । তাৎক্ষণিক মেডিসিন দিলেও সেটা কার্যকর হতে হতে পেরিয়ে যায় অনেকটা সময় । সেই দিক বিবেচনা করে ডক্টরের প্রেসক্রাইব করা একটা ইনজেকশন টা দেওয়া হয়েছে রৌদ্র কে । সময়ে অসময়ে কাজে লাগে এটা । যা শরীরের তীব্র কম্পন রুখে ধীরে ধীরে শান্ত করে ঘুমে অচেতন করে দেয় বেপরোয়া যুবককে । এতো বছরে আদ্র রৌদ্রকে পুরোপুরি সামলানো শিখে নিয়েছে । 

বরাবর ভাইকে দমন করার জন্য নিজে ইনজেকশন পুশ করে সে । তবে আজ রৌদ্র ছটফট করছে ভীষণ । এমন চলতে থাকলে তার হৃদযন্ত্রের রক্তনালী ব্লকেজ হতে পারে । অর্থাৎ আবারো হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনা খুব বেশি তার । সামলানোর জন্য দ্রুত ইনজেক্ট করতে হবে । 

এই ইনজেকশনের তীব্র প্যানিক অ্যাটাক ও শরীরের কম্পন থামিয়ে রোগীকে ঘুম পাড়ানোর ক্ষমতা রয়েছে ঠিকি , তবে এটিরই ভুল ব্যবহারে মারাত্মক প্রাণঘাতী ঝুঁকি হতে পারে । খুব সাবধানে ইনজেক্ট করতে হয় বরাবর । যা আজ সম্ভব হচ্ছে না । 

কেউ সামলাতে পারছে না বেপরোয়া যুবককে । 

শেষমেষ মেঘাকে সাথে নিয়ে সিঁড়ি চড়ে দোতলায় আদ্রের বরাদ্দ ঘরটায় ঢুকলেন রুবিনা কাবির । বিছানার উপর ছেলের অমন ছটফটে অবস্থা একঝলক দেখে নিলেন । অতঃপর মেয়েটাকে টেনে নিয়েই গেলেন বেডের পাশে । কান্না গিলে ছেলের উদ্দেশ্যে বললেন ধরা গলায়……

” রৌদ্র,,, এই দেখ বাবা, মেঘা এসে গেছে । ও কোত্থাও যাবে না তোকে ছেড়ে । আমরা যেতে দেবো না । তোর জন্য আমরা ঠিক আটকে রাখবো ওকে । এবার তুই একটু শান্ত হ বাবা । নয়তো অসুস্থ হয়ে যাবি আবার । ইনজেকশন টা দিতে দে,,, দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে । আর কষ্ট হবে না । 

শুয়ে থেকে মেঘাকে দেখা মাত্রই হাসি খেলে গেলো বেপরোয়া যুবকের ওষ্ঠপূটে । নিমিষেই ছটফটানি কমে স্থির হয়ে গেলো সে । টইটুম্বুর চোখদুটি হালকা হলো পানি ঝড়ে । সে নিস্তেজ হতেই ওকে ছাড়লো শুভ্র । পিছিয়ে ডাকলো । 

হা করে শ্বাস টেনে হাত উঁচায় রৌদ্র । হতবুদ্ধ রমনীকে কাছে ডাকে ফিসফিস করে……

” ইভারা,,, কাছে এসো প্লিজ । 

আদ্র ভেজা চোখে চায় । হাতে টান মারে মেঘার । করুন চোখে চেয়ে বুলি আওড়ায়….

” মেঘ,,, ওর কাছে যাবি একটু ? আমি জাস্ট ইনজেকশন টা দেবো । প্লিজ মেঘ,,, আমার ভাইটা শেষ হয়ে যাবে নয়তো । প্লিজ…

মেঘার থেকে উত্তর না নিয়ে আদ্র নিজে ওকে টেনে রৌদ্রের শিয়রে বসিয়ে দিলো । 

হাসলো রৌদ্র । প্রশন্য হলো ভীষণ । ঝট করে ভার মাথাটা তুলে সেটাকে এলিয়ে দিলো রমনীর কোলে । পেঁচিয়ে নিলো তনুমধ্য । উদরের কাছে মুখ গুঁজে লম্বা শ্বাস টানলো চোখ বুজে । শব্দহীন হাসলো প্রশান্তিতে । বিড়বিড় করলো শান্ত হয়ে….

” আই লাভ ইউ সুইটহার্ট…..আই রিয়েলি লাভ ইউ ! 

যাতনায় ঠোঁট কামড়ে চোখ বুজে নেন বাড়ির সকলে । যে ছেলে একটু আগেও উন্মাদের ন্যায় আচরন করছিলো, থামানো যাচ্ছিলো না যাকে, সে এখন এই মেয়ের সংস্পর্শে এসে দমে গেলো নিমিষেই । এ কেমন অবাধ্যতা তার ? 

আদ্র দম ছাড়ে । খুব সাবধানে ইনজেকশন পুশ করে রৌদ্রের ডান হাতের শিরায় । 

মেঘ তব্দা বনে দেখে । ঝিমিয়ে আসে রৌদ্র । অসার হয়ে আলগা হয় তার হাতের বাঁধন । সে বুঝতে পারছে, সে এখন জ্ঞান খোয়াবে । ঘুমে তলিয়ে যাবে । ঘুমোলে যদি মেঘা পালিয়ে যায়, তাহলে কি হবে ? এই ভাবনা আসতেই জ্ঞান শূন্য হওয়ার আগে তড়াক করে দৃষ্টি মেললো যুবক । ধড়ফড় করে এপাশ ওপাশ তাকালো । বালিশের কাছে শিশিরের একটা ওরনা দেখতে পেলো । নিভু নিভু চোখে চেয়ে হাত বাড়িয়ে সেটাকে টেনে নিলো দখলে । 

আলগোছে ওরনার এক মাথা পেঁচালো নিজের হাতের সাথে । অপর মাথা মেঘার বাম হাতের কব্জিতে বাঁধলো । অতঃপর আধো আধো চোখ তুলে তাকালো মেঘার দিকে । ঝাপসা হয়ে বুজে আসছে ভেজা পাপড়ি । সে মৃদু হেসে বিড়বিড় করলো ঘোরের বশে…..

” কোত্থাও যেও না, কেমন ? খুলে দিও না এই বাঁধন । আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারি না । কষ্ট হয় আমার । ভীষণ কষ্ট হয়, সুইটহার্ট । 

সম্পুর্ন অচেতন হওয়ার আগে পরক্ষণে তোফায়েল কাবির কে উদ্দেশ্য করে বললো আধো ভাঙ্গা গলায়….

” ড্যাড,,, আমার ভীষণ ঘুম পাচ্ছে ড্যাড । আমি ঘুমিয়ে গেলে তোমরা ওকে দেখে রাখবে প্লিজ । কোত্থাও যেতে দেবে না আর । আটকে রাখবে । আমি ঘুম থেকে উঠে ওকে চাই । ওকে আর হারাতে দিও না ড্যাড । আমার জন্য আটকে রেখো । 

বিড়বিড় করতে করতে এক পর্যায়ে আর কন্ঠ উঠলো না । নিভে এসে ঘুমের অতলে হারালো যুবক । শান্ত হলো সে । নিস্তব্ধ হলো আশপাশ । 

মেঘা পাথরের ন্যায় বসে আছে অনুভূতি হীন । গোটা ঘরে সবার উপস্থিতি থাকলেও কারোর মুখে রা নেই । 

পিনপতন নীরবতা । যাতে ছেদ ঘটলো বাচ্চার ডাকে……

” মাম্মা…..! 

ছ্যাত করে ওঠে মেঘা । সচকিতে তাকায় । 

দরজার চৌকাঠ মাড়িয়ে ভেতরে পা রেখেছে #উৎস নামক যুবকটি । মেঘার বাচ্চা দুটো তার কাছেই । রোশ ডেকেই ওষ্ঠ উল্টে ছোট ছোট চোখে দেখছে নিজের মাকে । #ইবাদ ও তাকিয়ে আছে অবাক লোচনে । বাচ্চা দুটো এসবের কিছুই বুঝতে পারছে না । 

মেঘা শুষ্ক ঢোক গেলে । বাড়ির সবাই দরজার দিকে তাকিয়েছে একই সাথে । উৎসের সাথে এই বাচ্চা দুটোকে দেখে দৃষ্টি কুঁচকে আসলো সবার । সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, এরা কারা ? এই ছেলেটাই বা কে ? সেই সাথে আরো অনেক প্রশ্ন রয়েছে । 

আদ্র ভেজা ঢোক গেলে । মেঘার কোল থেকে রৌদ্রকে সরিয়ে বেডে শুইয়ে দেয় ভালোভাবে । মেঘার হাত থেকে ওরনার বাঁধন টাও খুলে দেয় । চোয়াল শক্ত যুবকের । সে শক্ত করেই মেঘার হাতের কব্জি চেপে ধরল । বললো ধারালো কন্ঠে….

” চল আমার সাথে…..

পাশেরটা রৌদ্রের ঘর । 

সে ঘরে ভিড় জমলো । মাঝামাঝি নতজানু হয়ে দাঁড়িয়ে রমনী । আদ্র ওর মুখোমুখি । আশেপাশে ওকে ঘিরে সবাই । রোশ, ইবাদ, উৎস, ওরাও আছে । 

এখনো সবকিছু ঘোলাটে সবার কাছে । আদ্র ভারিক্কি গলায় প্রশ্ন করে ভনীতা হীন…..

” এতো দিন কোথায় ছিলি তুই ?

মেঘা ঢোক গিললো । উত্তর করলো সাবলীল…..

” এখানেই । তবে আর থাকবো না । 

” থাকবি না মানে, কোথায় যাবি ? 

” যেখানে আবার আমাকে কেউ খুঁজে পাবে না, সেখানে ! 

” মেঘ ! 

চেঁচিয়ে ওঠে আদ্র । খানিক কেঁপে পেছাতে গিয়েও দমে যায় রমনী । তোফায়েল কাবির বলেন ঠান্ডা গলায়….

” আদ্র,,, শান্ত হয়ে কথা বলো । বাচ্চারা আছে এখানে ! 

মুখ গোল করে শ্বাস টেনে নিজেকে ধাতস্থ করে যুবক । বাচ্চাদের প্রসঙ্গ উঠতেই তড়াক করে দরজার পাশে তাকায় । চোয়াল খিচে শুধোয়…..

” ওরা কারা, মেঘ ? 

মেঘা মাথা তুললো । নিজের ছেলে মেয়ের দিকে তাকালো এক ঝলক । একটুও গলা জড়ালো না প্রত্যুত্তরে……

” আমার ছেলে মেয়ে ওরা ! 

আদ্র ছলকে যায় । পরের প্রশ্নে গলা কাঁপে…..

” আর এই ছেলেটা,,, সে কে ? 

” এক্সকিউজ মি,, আমি….

উৎস মুখ খুলে কিছু বলার আগেই ধমকে উঠলো আদ্র…..

” শাট আপ,,, আপনাকে কিছু জিজ্ঞেস করিনি আমি । চুপ করে থাকুন । মেঘ,, বল , কে ও ? 

” ও উৎস ! আমরা একসাথে কাজ করি । 

রুবিনা কাবির তেড়ে যান । কনুইয়ে হেঁচকা টানে রমনীকে ফেরান নিজের দিকে ! ভয়ে ভয়ে শুধোন…..

” এই বাচ্চা,,,, বাচ্চা গুলো কার ? 

” আমার ! ওরা আমার সন্তান ! আমি ওদের মা । 

” বাবা কে ওদের ? 

মেঘার চোখ বেয়ে নির্বিঘ্নে দুই ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ে । ব্যাথা পিছে ঠেলে উত্তর করে দ্বিধাহীন….

” ওদের কোনো বাবা নেই ! শুধু মা আছে,,আমি ওদের মা । আর কেউ নেই…..

ললাট কুঞ্চিত হয় সকলের । বুঝতে বাকি রয় না কিছু । ফুঁপিয়ে ওঠেন ভদ্রমহিলা । থেমে থেমে জিজ্ঞাসা করেন সন্দেহ কাটাতে……

” ওরা আমার রৌদ্রের বাচ্চা, মেঘা ? আমার ছেলের ? আমাদের নাতি নাতনি ওরা ? আমার রৌদ্রের জমজ বাচ্চা হয়েছে ? আমারা ছেলেটা দুই সন্তানের বাবা হয়েছে !

ফুঁপিয়ে হেসে উঠলেন তিনি । ছুটে গেলেন বাচ্চা দুটোর কাছে । একসাথে দুটোকে টেনে মিশিয়ে নিলেন বুকের সাথে । কেঁদে উঠলেন শব্দ করে । আহাজারি করলেন……

” এ‌ দুটো আমার নাতি নাতনি । আমার ছেলের অংশ । আমাদের রক্ত । নিজেদের রক্ত কে চিনতে নাকি কেউ ভুল করে না, দেখেছেন আমারাও ভুল করিনি । আমার রৌদ্র ঠিক চিনেছিলো নিজের মেয়েকে । ও কাল রোশকে দেখে ঠিক আন্দাজ করেছিলো, যে এটা ওর মেয়ে । রোশ্ যখন কাঁদছিল, আমরা কেউ সামলাতে পারছিলাম না ওকে । কিন্তু রৌদ্র, ওর কোলে যাওয়া মাত্রই চুপ করে গেছে বাচ্চাটা । রৌদ্র বলেছিলো কাল, যে মেঘার মতো এর নাকের ডগাতেও তিল আছে । ও বলেছিলো এই বাচ্চাটা মেঘার মতো । আমরা কেউ গুরুত্ব দেইনি ওর কথায় । এখন দেখেছেন তো,, আমার রৌদ্র ভুল নয় । এটা আমার রৌদ্রের মেয়ে । আমার ছেলের জমজ বাচ্চা হয়েছে । ছেলে, মেয়ে দুটো সন্তানের বাবা হয়েছে আমার পাগল ছেলেটা । অথচ ও এখনো জানতেই পারলো না এসব । ওর সন্তানের মুখে বাবা ডাক শুনলো না এখনো । 

কথা বলার মাঝে ডুকরে উঠলেন তিনি । মেঘা চোখ বুজে নেয় । তাচ্ছিল্য হেসে বলে…..

” ভুল বললে মা,,,, তোমার ছেলে তার সন্তানের মুখে অনেক আগেই বাবা ডাক শুনে ফেলেছে । এ দুটো তার সন্তান নয় । এরা শুধু আমার সন্তান । 

আদ্র মাড়ি খিচে ধমকে ওঠে…..

” আচ্ছা,, ওরা শুধু তোর সন্তান ! 

চোখ তুলে তাকালো মেঘা….

” হ্যাঁ । ওরা শুধু আমার সন্তান । আর কেউ নেই ওদের । রোশ্, ইবাদ, মাম্মার কাছে এসো । 

মায়ের ডাক পেতেই রুবিনা কাবিরের বুক থেকে এক ছুটে মায়ের কাছে গেলো বাচ্চা দুটো । মেঘা হাঁটু মুড়ে বসতেই দুটোতে ঝাঁপিয়ে পড়লো বুকে । 

মেঘা জড়িয়ে নেয় ওদের । কান্না গিলে বিড়বিড় করে…..

” ওরা শুধু আমার সন্তান । শুধু আমার । 

উৎস সবকিছু দেখেছে এতক্ষণ অবধি । কোনো কিছুই বুঝতে বাকি নেই ওর । এখানকার কাউকে চিনতেও বাকি নেই । সে মুচকি হাসলো । বুক ফুলিয়ে দীর্ঘ হাঁফ ছাড়ল….

” মেঘা,,, আমি ডরমেটরিতে যাচ্ছি । আই থিংক, আমার এখানে থাকাটা উচিত হবে না । তবে যেকোনো প্রয়োজনে আমাকে স্বরন করতে ভুলো না । আসছি আমি…..

” দাঁড়াও,,, একসাথে যাবো । 

বাচ্চাদের ধরে উঠে দাঁড়ালো রমনী । 

চোয়াল খিচে নিলো আদ্র । খুবলে টেনে ধরলো ওর কনুই । হিসহিসিয়ে উঠলো…..

” কোথায় যাবি তুই ? বাড়াবাড়ি করবি না একদম । অনেক হয়েছে তোর এই লুকোচুরি । আমার ভাইটাকে শেষ করে দিয়েছিস তুই ! তোর জন্য আজ ওর এই অবস্থা ! নাটক পেয়েছিস ? বছরের পর বছর কোথায় ছিলি তুই ? দেশে আসলি কি করে ? মনে পড়ে নি আমার ভাইয়ের কথা ? সন্তান জন্ম দিয়েছিস ওর ! কোন স্পর্ধায় দূরে ছিলি এতো বছর ! কেনো শেষ করে দিলি রৌদ্রকে….

রোশ আর ইবাদ কুঁকড়ে গেছে । ভয় পাচ্ছে বাচ্চা দুটো । এদের পরিবারের মাঝে না ঢুকে উৎস নিঃশব্দে ঘর ছাড়লো । রোশ আর ইবাদ’কে নিজের কাছে টেনে নিলো মেহের । শুভ্রর ইশারা পেতেই বাচ্চা দুটোকে নিয়ে ঘর ছাড়লো সেও । মেঘা গলে না আজ । কঠোরতা ধরে রেখেই ঝটকা মেরে ছাড়িয়ে নেয় নিজেকে…..

” আমি শেষ করেছি তোমার ভাইকে ? নাকি সে আমায় শেষ করেছে ? ভাইয়ের হয়ে সাফাই গাচ্ছো ভাইয়া ? কেনো থাকতাম আমি তোমার ভাইয়ের কাছে ? আমার তো কোনো প্রয়োজন ছিলো না । তার জীবনে তিনি জাস্ট অতিরিক্ত হিসেবে রেখেছিলেন আমায় । অতিরিক্ত টুকু না হলেও চলতো । সংসার ছিলো তার,, স্ত্রী সন্তান…..

মেয়েটার পুরো কথা শেষ হলো না । তার আগেই আদ্রের শক্ত হাতের একটা চড় ঠাস করে আছড়ে পড়লো বাম গালে । চমকে উঠলেন সকলে । 

আকস্মিক আঘাতের টাল সামলাতে না পেরে ডান দিকে ছিটকে পড়তে পড়তেও বেঁচে গেলো মেয়েটা । মেঝেতে হুমড়ি খেয়ে পড়ার আগেই ওকে ধরে ফেলল শুভ্র । 

মেঘা হতভম্ব হয় । টলমলে চোখে ছলকে তাকায় আদ্রের দিকে । প্রহারের টাল সামলে অবিশ্বাসে অস্ফুটে জবানে বুলি খসলো তার….

” ভাইয়া…..

” চুপ ! খবরদার ভাইয়া বলে ডাকবি না আমায় । স্বার্থপর কোথাকার । চুপচাপ আমার প্রশ্নের সোজাসাপ্টা উত্তর দিবি । আমার ভাইকে ছেড়ে কোথায় চলে গেছিলি, বল ? এতো বছর কোথায় ছিলি তুই ? সুইজারল্যান্ড থেকে এখানে আসলি কি করে ? হ্যাঁ,, বল ! রোশ্, ইবাদ, ওরা আমার ভাইয়ের সন্তান ? আমার ভাইয়ের বাচ্চাদের ওর থেকে এতো বছর দূরে রাখার স্পর্ধা পেলি কোথায় ? তুই জানিস, তুই চলে আসার পর কি কি হয়েছে ? কোথায় না খুঁজেছি আমরা তোকে ! আরে চার বছর পেরিয়ে গেছে,, এখনো সুইজারল্যান্ডের মাটিতে তোর খোঁজ চলমান । তোকে হারিয়ে উন্মাদ হয়ে গেছে আমার ভাই,,,পাগল হয়ে গেছে ওর তোর জন্য ! 

মেঘা ফিকড়ে ওঠে । 

” কেনো ? আমার জন্য কেনো পাগল হবেন উনি ? কে আমি ওনার ? ওনার তো স্ত্রী-সন্তান আছে,,, কোথায় তারা ? দেখছি না তো ! নাকি তোমরা এখনো তোমাদের বাড়ির বেপরোয়া ছেলের লুকানো সংসার সম্পর্কে জানতে পারোনি ! বলেনি তোমার ভাই তোমাকে ? 

রমনীর এহেন কথায় ক্রোধ ঠিকড়ে ওঠে আদ্রের মুখাবয়বে । ফের চড়াও হয় মস্তিষ্ক । রক্ত বর্ন ধারন করে আঁখি যুগল । গর্জে ওঠে সে । গলা চড়িয়ে তীব্র চিৎকার জুড়ে ফের হাত উদ্যত করে আঘাতের জন্য । 

তবে এ বেলায় শক্ত চড় গালে পড়ার আগেই ওকে পেছনে ঠেলে আড়াল করে সামনে দাঁড়ালো শুভ্র । 

গাল চেপে ফুঁপিয়ে উঠলো মেঘা । 

শুভ্র রাগি গলায় ধমকায় আদ্র কে…..

” ব্যস আদ্র,,, অনেক হয়েছে । শান্ত ভাবেও কথা বলা যায় । রাগারাগী করছিস কেনো এভাবে ? মেঘার দিকটাও বুঝতে হবে । 

” আর কি বুঝবো ভাইয়া ? ও বুঝেছে, বোঝার চেষ্টা করেছে আমার ভাইকে ? রুডিকে পুরোপুরি শেষ করে দিয়েছে ও ! চার বছর, কম সময় নয় । অনেক সময়, অনেক মাস, অনেক দিন । ভ্রান্ত চোখে কি দেখেছি কি দেখেনি, অমনি হারিয়ে গেলো ও ? জানার চেষ্টা করলো না সত্যটা ? 

শুভ্রর পেছন থেকে বলে ওঠে রমনী…..

” কি জানবো আমি ? কি জানার বাকি ছিলো ? 

নিজের চোখে দেখেছি আমি সব ! হাজার বার সন্দেহ করেছি তোমার ভাইকে, তবুও মুখ খুলিনি কখনো । শুধু নিজেকে মানাতাম, বোঝাতাম, যে আমার রৌদ্র আমাকে ভালোবাসে । তিনি আমাকে ঠকাতে পারেন না কিছুতেই । কিন্তু না,, আমি ভুল ছিলাম । ভুল ছিলো আমার ধারনা । ভুল ছিলো আমার বিশ্বাস । 

রাগ ধরে রাখতে না পেরে হিসহিসিয়ে ওঠে আদ্র । ঘাড় চেপে ধরে সরে দাঁড়ায় । এদিক ঝট করে পিছু ফেরে শুভ্র । ঠান্ডা হয়ে বলে……

” ভুল ছিলি তুই ? আসলেই ? রৌদ্রের অবস্থা দেখলি তো,,,  একটুও খারাপ লাগছে না ? প্রশ্ন জাগছে না মনে, কি হয়েছে ওর ? জানবি না সত্যটা ? 

মেঘা দুহাতে মুখ চেপে ফিকড়ে ওঠে । 

ধপ করে বসে যায় মেঝেতে । এবারে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে রমনী । সবার চোখে জল । তোফায়েল কাবির বুঝতে পারেন ওর পরিস্থিতিও । একটু এগিয়ে যান । হাঁফ ছেড়ে শান্ত কন্ঠে বলেন…..

” তুমি ভুল ছিলে না মেঘা । ভুল ছিলো তোমার দেখার দৃষ্টিভঙ্গি । সেদিন যদি নিজের চোখের দেখাটাকে বিশ্বাস না করতে, তাহলে আজ এতো গুলো বছর এভাবে কাটতো না । সেদিন তুমি রৌদ্রকে প্রশ্ন করতে পারতে, মুখোমুখি হয়ে কৈফিয়ত চাইতে পারতে ওর কাছে । কিন্তু তুমি তেমন কিছুই করোনি । উল্টো নিজেকে সরিয়ে নিয়েছো খুব সন্তর্পণে । আর আমার ছেলেটাকে জিন্দা লাশ বানিয়ে ছেড়েছো । জানো, তুমি চলে যাওয়ার পর রৌদ্রের কি হয়েছে ? কিভাবে বেঁচে ছিলো ও এতো গুলো বছর ? দেখলে তো ওর ছটফটানি ! 

মেঘা চোখ তুলে তাকায় । কথা বলতে পারে না । 

হেঁচকি উঠে গেছে,, কান্নারা জড়িয়ে যাচ্ছে গলায় । দলা পাকিয়ে শ্বাস আটকাচ্ছে কন্ঠনালিতে । একাধারে পানি ঝড়ছে চোখ হতে । বুক ফেটে যায়,,, সে কেবলই প্রশ্নাত্মক চোখে তাকিয়ে রয় ‌। 

শুভ্র মেঝেতে বসলো ওর পাশে । টেনে নিজের দিকে ঘোরালো মেঘাকে । ভেজা দৃষ্টি যুবকের ‌। মেঘা হতভম্ব হয় সবার চোখে পানি দেখে । রুদ্ধতায় শুধোতে পারে না কিছু । শুভ্র মুখ খুলে কিছু বলতে যাবে । তার আগেই মেহেরের হতচকিত কন্ঠ ভেসে আসলো দরজার কাছ থেকে….

” মা, বাবা,,, রৌদ্র ভাইয়া ঘুমোয় নি । উঠে পড়েছে আবার ! তাড়াতাড়ি এ ঘরে এসো…

🛑 যেহেতু অর্ধেক অংশ, তাই এই পর্বটা ছোট । তবুও আড়াই হাজার শব্দ । পরের পর্ব বড় করে দেবো । সব ঝামেলা মিটে যাবে এবার । ধৈর্য ধরুন । ধৈর্যের ফল মিষ্টি হয় । আর থ্যাংকিউউউউ পাখিরা সুন্দর মতো রেসপন্স করার জন্য । এভাবেই ঝটপট করে বেশি বেশি রেসপন্স করে দিন, ওকে ? 🛑

চলবে……..

সবার আগে গল্প পেতে অবশ্যই পেজটি ফলো দিয়ে রাখুন

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply