Golpo romantic golpo আসবো ফিরে আবারো

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৮৫


#আসবো_ফিরে_আবারো

#পর্ব_৮৫

#সুরভী_আক্তার

রৌদ্রের ডাকে প্রকম্পিত হয় তোফায়েল কাবিরের সারা দেহ ‌। দুলে ওঠে তার হৃদযন্ত্র । 

আদ্র আর শুভ্র চকিতে তাকায় । প্রথম পলক ভাইয়ের দিকে । তো পরের পলক বাপের দিকে । 

রৌদ্র তোফায়েল কাবির কে বাবা ডাকে না ‌। কত বছর ধরে ডাকে না, তার ইয়ত্তা নেই । 

বাপের প্রতি তার হাজার অভিমান । সে কখনো অভিযোগ করেনি । উল্টো নিজেকে আলাদা করে সরিয়ে নিয়েছে । 

বছরের পর বছর ধরে কথা হয়নি বাবা ছেলের মাঝে । তোফায়েল কাবির কে বরাবর উপেক্ষা করেছে রৌদ্র । গ্রাহ্য করেনি কখনো । 

তবে আজ, আজ সে ডাকলো নিজের বাবাকে । চোখে চোখ রেখে ইশারা করলো নিজের কাছে আসার জন্য । 

ভদ্রলোক একদন্ড বিলম্ব করেন না । ধাপ কয়েক ছুটে যান । হুমড়ি খেয়ে লুটিয়ে বসেন মেঝেতে । ছেলের হাত আঁকড়ে ধরেন মুঠোতে । রুদ্ধতা গিলে বোকার মতো বলার চেষ্টা করেন….

” রৌদ্র,,, কি হয়েছে বাবা ? এমন করছো কেনো ? কষ্ট হচ্ছে তোমার ? 

রৌদ্র হা করে শ্বাস টানে । মারাত্মক শ্বাস কষ্ট হচ্ছে তার । বুক জাম হয়ে এসেছে । দুই চোখের কার্নিশ বেয়ে অনবরত ঝড়ছে উষ্ণ নোনা জল । ফের কম্পন উঠেছে শরীরে । ক্ষণে ক্ষণে প্রচন্ড হচ্ছে তা । ঘাড় কুঁকড়ে আসছে যুবকের । সর্বাঙ্গের সাথে সাথে ছেলের হাতের কম্পন অনুভব করা মাত্রই উঠতেই ছলকে ওঠেন তোফায়েল কাবির । ঠকঠক করে কাঁপছে তার ছেলের হাত । তিনি শক্ত করে আকড়ে ধরলেন । উদগ্রীব হয়ে উঠলেন….

” বাবা,,, শান্ত হও । আমরা আছি তো এখানে ! বাবা আছে তোমার সাথে । কিচ্ছু হবে না । তুমি একটু স্থির হও বাবা । 

” আমার ইভারার সাথে কেউ নেই, ড্যাড ! ও বিপদে পড়বে ! ক্ষতি হয়ে যাবে ওর । ওকে খুঁজে আনো তোমরা ! 

” আনবো তো । তুমি সুস্থ হও । নিজের অবস্থা টাও তো দেখতে হবে , বাবা । মেঘার কিচ্ছু হবে না । ওকে ঠিক খুঁজে বের করবো আমরা । এখনো তো খোঁজ চলছে । দেখবে, ঠিক পাওয়া যাবে । খুব তাড়াতাড়ি ওকে খুঁজে আনবো আমরা । তোমার কাছে নিয়ে আসবো । কোনো ক্ষতি হবে না ওর । 

রৌদ্র হা করে করে বুক ফুলিয়ে জোড়ালো শ্বাস টানে ।

গলায় দলা পাকিয়ে আটকায় সেই নিঃশ্বাস । কথা বলতে ভীষণ কষ্ট হয় তার । সে বুঝতে পারছে তার দুনিয়া তলিয়ে যাচ্ছে কোনো এক অতলে । অন্ধকার হয়ে আসছে চারপাশ । 

ভারী হয়ে বুজে আসছে ভেজা চোখের পাপড়ি যুগল । বুকের উপর যেনো পাথর চাপিয়ে দিয়েছে কেউ । 

রক্ত বর্ন ধারন করা অবস শরীর খানা ঝড়ের গতিতে কাঁপছে থরথরিয়ে । 

উপস্থিত ডক্টর আঁতকে উঠলেন । রৌদ্রের অমন আশঙ্কাজনক টালমান অবস্থা দেখে ইংরেজি বাক্যে দ্রুত বললেন সঙ্কিত গলায়…..

” প্লিজ,,, আপনারা বাইরে যান । ওনাকে হাইপার করবেন না । বড় অ্যাটাক সামলে সদ্য জ্ঞান ফিরেছে । বেশি উত্তেজিত হলে দ্বিতীয় বার অ্যাটাক আসার সম্ভাবনা আছে । ক্রিটিক্যাল অবস্থা ওনার, প্লিজ বোঝার চেষ্টা করুন । ওনাকে শান্ত রাখতে হবে । ব্লাড প্রেসার বেড়ে যাচ্ছে ক্রমাগত । হৃৎপিণ্ডের রক্ত নালিতে জমে আসছে লহু । সেকেন্ড টাইম অ্যাটাক আসলে লাইফ রিস্ক হতে পারে ।  রাইট নাউ ইনজেক্ট করা মাস্ট । বাইরে যান আপনারা… 

রৌদ্র যন্ত্রণা সইতে না পেরে হাত মুঠিয়ে নিলো । তোফায়েল কাবির ছেলের হাত দুটো আলগোছে ছাড়িয়ে দিতে দিতে চোখের পানি ধরে রেখে জবানে বুলি ফুটাতে চাইলেন….

” বাবা, আমরা বাইরে…..

” নো ড্যাড, আমাকে ছেড়ে যেও না প্লিজ । প্লিজ ড্যাড, হোল্ড মি । আমি মরে যাচ্ছি, ভীষণ কষ্ট হচ্ছে আমার । এই দেখো শ্বাস আটকে আসছে গলায় । ও আমাকে রেখে চলে যেতে পারে না । তোমরা প্লিজ ওকে আমার কাছে এনে দাও । আর কিচ্ছু চাই না আমার । শুধু ওকে চাই । আমি বাঁচতে চাই ওকে নিয়ে । প্লিজ ড্যাড,, শুধু ওকে ফিরিয়ে এনে দাও আমার কাছে  ।

আদ্র, আমার ইভারা কে এনে দে প্লিজ । মাহির কে ডাক । ও সব জানে…..

রৌদ্রের কন্ঠ চলে না । সে কম্পিত হাতে খুবলে ধরে বাবার হাত । যেনো কেউ ওকে ফেলে পালাতে না পারে । সে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে । চারদিক শূন্য হয়ে আসছে তার কাছে । সঙ্গ প্রয়োজন । আঁকড়ে ধরার হাত প্রয়োজন । 

ছেলেকে এভাবে কাতরাতে দেখে বুক ফেটে যায় তোফায়েল কাবিরের । শক্ত খোলস ছাড়িয়ে রৌদ্রকে জাপটে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠেন তিনি ।

পিছে দাঁড়িয়ে আদ্র সামলায় তাকে । রৌদ্রের চেহারা, ঠোঁট, হাত, পা নীলচে হয়ে আসছে । ফুরিয়ে যাচ্ছে বল । 

ডক্টর দ্রুত অক্সিজেন মাস্ক লাগালেন তার মুখে । ছেলেটা তবুও কাতরায় ‌। ছটফট করে । 

তোফায়েল কাবির কে ছাড়িয়ে আনা হয় ওর থেকে । সহসা যুবক ভেজা ঝাপসা চোখে ঘাড় কাত করে বাবার দিকে তাকায় । অক্সিজেন মাস্কের ওপাশ থেকেই ফিসফিসিয়ে ঠোঁট নাড়িয়ে আওড়ায়…..

” ড্যাড,, আ’ম স্যরি । আর অবাধ্য হবো না । ছেড়ে দেবো সব বেপরোয়া গিরি । আজ থেকে তোমাদের সব কথা শুনবো আমি । তোমাদের বাধ্য ছেলে হয়ে থাকবো । তোমাদের ছেলে বেপরোয়া, অবাধ্য থাকবে না আর । তোমার পায়ে পড়ে থাকবে তোমার ছেলে । এর বিনিময়ে জাস্ট ঐ মেয়েটাকে চাই আমি । ওকে এনে দাও আমার কাছে । আই লাভ হার, ড্যাড । আই রিয়েলি লাভ হার । আই কান্ট লিভ উইদাউট হার । ওকে ছাড়া সত্যি সত্যিই মরে যাবে তোমার ছেলে । 

অবস্থা বেগতিক দেখে ডক্টর ঝাড়ি মেরে উঠলেন এবার…..

” আই সে স্টেপ আউটসাইড দ্য ক্যাবিন । প্লিজ ডোন্ট অ্যাজিটেট হিম । হিজ কন্ডিশন ইজ ক্রিটিক্যাল ! হি মাইট হ্যাভ আ হার্ট ফেইলর । গো রাইট নাউ…..

” আব্বু,, বাইরে চলো ! 

তোফায়েল কাবিরের কাঁধ জড়িয়ে বাইরে নিয়ে আসা হয় । 

কেবিনের বাইরে পা রাখতেই ছটফট করে ওঠেন ভদ্রলোক । মাথা চক্কর দেয় তার । ছেলের অমন দশা সহ্য হয় না । তিনি আদ্রের দুই বাহু আঁকড়ে ধরেন……

” আদ্র,,,, রৌদ্রের কষ্ট হচ্ছে ! তুমি কিছু একটা করো আদ্র ‌। নয়তো শেষ হয়ে যাবে তোমার ভাই ‌। মেঘাকে খুঁজে বের করো,, যে করেই হোক । আমার ছেলেটাকে বাঁচাও আদ্র । ও মেঘাকে ছাড়া বাঁচবে না,, ফুরিয়ে যাবে । আমি পারছি না ওর এমন অবস্থা দেখতে । কিছু করো তোমরা,,, ঐ মেয়েকে খুঁজে বের করো । যেখান থেকে পারো । ওকে আমার ছেলের কাছে এনে দাও । তোমার মাকে কি জবাব দেবো আমি ? বাবা হয়ে আমি আমার ছেলের এই অবস্থা দেখতে পারবো না আর । আমার ছেলে এমন নয় । ও আমাকে বাবা বলে ডেকেছে । অনেক আশা নিয়ে ডেকেছে আমায় ‌। ও আমাকে ডাকে না । তাকায় না আমার দিকে । কথা বলে না আমার সাথে । আজ বলেছে,, কিছু চেয়েছে আমার ছেলে আমার থেকে । মেঘাকে খুঁজে বের করতে হবে,,, যেভাবেই হোক না কেনো ! ওকে প্রয়োজন আমার ছেলের কাছে ‌। আমার ছেলেকে বাঁচাতে হবে…..

” আব্বু,,, আব্বু প্লিজ কাম ডাউন । তুমি অন্তত শান্ত হও । ভেঙে পড়ো না এভাবে । সব ঠিক হয়ে যাবে । কিছু হবে না রুডির । মেঘাকেও পাওয়া যাবে অক্ষত ‌। 

কেবিনের ভেতরে বেপরোয়া যুবক অশান্ত । মোচড়াচ্ছে ভেতর ঘর ‌। কাতরাচ্ছে সে । একে একে অবস হয়ে আসছে সর্বাঙ্গ । 

যুবকের দৃষ্টি আপনাআপনি নিভে আসার আগে তার চোখের কিনারে ভেসে ওঠে কিছু মিঠে মুহুর্ত । 

তার রৌদ্রময়ীর সাথে কাটানো কিছু চমৎকার দৃশ্য ধরা দেয় আঁখি কার্নিশে । তাদের প্রথম সাক্ষাত চোখে ভাসলো সবার আগে । মেঘার সেই ভিতু ভিতু বাচ্চা মুখাবয়ব । তিরতির করে কাঁপা অনুচ্চ তন্বী । 

রৌদ্র কতবার আড়ালে পিছু করেছে তার, সেসব ও মনে পড়লো । 

মেঘা সেবার রৌদ্রের ঘুমের সুযোগ নিয়ে তার ক্ষতবিক্ষত হাতে শতাধিক চুম্বন এঁকেছিলো । রৌদ্রের চোখের আর্দ্র কিনারে এই মুহূর্ত টুকু স্পষ্ট ফুটে উঠলো । অনুভবে জাগলো উৎসুক রমনীর করা প্রথম আলিঙ্গনের সেই সুখকর পরশ । সে পরশে কাঁটা দিয়েছিলো যুবকের শরীরে । খেই হারিয়েছিলো সে ।

ক্ষণে ক্ষণে তার নিভে আসা ক্লান্ত চোখের ধারে ফুটে উঠলো তাদের প্রথম এবং দ্বিতীয় বিয়ের নিদারুণ লহমা । তাদের সম্পর্কের মিঠে পূর্নতার সেই অমৃত লগন ধরা দিলো তার চোখে । নাকে ঠেকলো দ্বাবিংশীর দীঘল চুলের মাদকিয় ঘ্রাণ । যার মাদকতায় উন্মাদ সে । 

সেই ঘ্রাণে মাতোয়ারা হয়ে আস্তে আস্তে নিভে এলো যুবকের ঝাপসা দৃষ্টি জোড়া । ওষ্ঠপূটে ফুটলো এক পশলা স্মিথ রেখা । জেগে ওঠা হাসির হিল্লোল ধীরে ধীরে চওড়া হয়ে মিলিয়ে গেলো অধরের কোণে ।  

পেরোয় বেশ কয়েক ঘন্টা । 

দ্বিতীয় বার অ্যাটাক এসেছে রৌদ্রের । এবারে অবস্থা আশঙ্কাজনক । আগামী আটচল্লিশ ঘন্টার আগে ডক্টর কিচ্ছু বলতে পারছেন না । এই আটচল্লিশ ঘন্টার মধ্যে জ্ঞান না ফিরলে রৌদ্র কে আর পাওয়া যাবে না অনির্দিষ্টকালের জন্য ‌‌। এবারে তার জীবন সংকটে ।

এই সংশয়েই হসপিটালের করিডোরে নেমে আসে নিদারুণ নিস্তব্ধতা । এ যাত্রায় জন প্রত্যেক ডক্টর মাথা নত করে নিয়েছেন । তাদের ক্যারিয়ারে এমন কেস হ্যান্ডেল করতে হয় নি এ অবধি । এই প্রথম প্রত্যক্ষ ভাবে অবলোকন করলেন তারা, যেখানে কিনা নিজের স্ত্রীকে হারিয়ে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে কেউ । তাও কিনা জুরিখে একনামে সাড়া জাগানো স্বয়ং রুডভিক কাবির রৌদ্র । তাকে কে না চেনে এখানে ? 

কেবলই তার বাড়ির লোক তাকে চিনতে পারলো না । 

বাড়িতে রুবিনা কাবিরের অবস্থা ভালো না ‌। রৌদ্রের দ্বিতীয় হার্ট অ্যাটাকের কথা তাকে জানানো হয় নি । কেবিনের বাইরে হাঁটুতে কনুই ঠেসে মাথা চেপে ধরে বসে আছেন তোফায়েল কাবির । পাশেই শুভ্র । 

ছেলেকে ওভাবে দেখার আর শক্তি অবশিষ্ট নেই তার মাঝে । 

এখনো তোলপাড় চলছে মেঘাকে খোঁজার জন্য । 

রৌদ্রের খবর পেয়ে মাহির আসে হসপিটালে । সাথে রিসা আর মিনি । মাহির আরো একবার এসেছিলো । এবারে রিসা কে সাথে নিয়ে আসলো । কেবিনে ঢোকে ওরা । 

বেডের উপর যুবকের নিথর দেহ খানা পড়ে আছে ‌। 

কদিনের মাথায় রৌদ্রকে ওভাবে দেখে সশব্দে চিৎকার করে ওঠে মিনি…..

” পাপা….

কেবলই আদ্র ছিলো কেবিনে । সে চকিতে মাথা তুলে চাইলো । তীক্ষ্ণ করলো দৃষ্টি । এই ক’দিনে এলোমেলো ভাবে অনেক তথ্যের সম্মুখীন হয়েছে ওরা । এর মধ্যে মিনির বিষয়েও শুনেছে টুকটাক । আর গন্ডগোল টা এই থেকেই শুরু । তাও নিশ্চিত ভাবে বুঝেছে । জেনেছে রৌদ্রের সম্পর্কে । বেপরোয়া হয়ে মেঘাকে বিয়ে করার আসল হেতু সম্পর্কে এখন অবগত সবাই । ইয়াশ আর রৌদ্রের মধ্যকার পূর্ব পরিচয় পরিষ্কার সবার মাঝে । পরিষ্কার রৌদ্রের পরিচয় । 

এদিকে ডাক ছুড়ে মাহিরের কোলে থেকেই হাত পা ছুড়লো মিনি ! 

” আমি পাপার কাছে যাবো । হোয়াট হ্যাপেন্ড টু মাই পাপা ? মাহির আঙ্কেল, আমাকে আমার পাপার কাছে নিয়ে চলো । মাই পাপা ইজ সিক, মাম্মা ? পাপা….

মাহির এগিয়ে যায় । আদ্র বেডের পাশে বসে ছিলো । দাঁড়ালো সে । মিনিকে বেডের একপাশে নামিয়ে দিলো মাহির । বাচ্চাটা বুঝতে পারলো, তার পাপা ঠিক নেই । অক্সিজেন মাস্ক তার পাপার মুখে । অসার শরীরে কতসব তার পেঁচানো । লাগানো যন্ত্রপাতি । সে এসব বোঝে না , তবুও বুঝতে পারে কিছুটা । আঁতকে ওঠে বাচ্চা হৃদয় । 

পাঁচ বছরের জীবনে এই প্রথম ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে নিষ্পাপ শিশুটা…..

” মাম্মা,,, পাপা চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে কেনো মাম্মা ? আমার পাপার কি হয়েছে ? পাপা,, ও পাপা, চোখ খোলো । মিনি ইজ হেয়ার ! মিনি আর জ্বালাবে না তোমায় । মিনি ইজ গুড গার্ল । আর আইসক্রিম খাবে না, ফোনে গেমস ও খেলবে না । ওঠো পাপা । মিনি কাঁদছে । কষ্ট হচ্ছে মিনির ‌। পাপা……

ছোট্ট ছোট্ট হাতে রৌদ্রের বাহু আলতো করে ঝাঁকায় মিনি । রিসা হকচকিয়ে তাকায় মেয়ের দিকে । অসুস্থতার দরুন ছোট থেকে মিনি কাঁদতে পারে না । শব্দ করে কাঁদেনি কখনো । চোখ বেয়ে পানি ঝড়েনি । আর আজ, আজ কাঁদছে সে । ওষ্ঠ উল্টে ফোপাচ্ছে । পানি ধারা নেমে গাল ভিজে একাকার । 

রিসা ভেজা চোখ মুছে নিলো । রিকভারি হচ্ছে তার মেয়ের । সে আর নরম হবে না । ওদের জন্যই সবকিছু হয়েছে । 

সবকিছুর দায়ভার ওদের দুজনার । ওরা সুবিধাবাদী । রৌদ্রের এই অবস্থার জন্য ওরাই দায়ী । 

রিসা মিনির হাত ধরে ফেরায় ‌। ঢোক গিলে ধরা গলায় ধমক দেয় মেয়েকে…..

” শাট আপ মিনি । পাপা পাপা করবে না । ও তোমার পাপা নয় । রৌদ্র ইজ নট ইয়োর ফাদার । বুঝেছো ? 

আরো বেশি ফুঁপিয়ে উঠলো মিনি । হেঁচকি তুললো । ভয়ে জুবুথুবু হয়ে বিড়বিড় করলো ক্রন্দনরত অস্পষ্ট স্বরে…..

” আ’ম স্যরি মাম্মা, মিনি আর দুষ্টুমি করবে না ‌। পাপা ইজ অ্যাংরি উইথ মিনি ? মিনি স্যরি পাপা । প্লিজ ওঠো । 

” মিনি,,, আই সে স্টপ । মরে গেছে তোমার পাপা । রৌদ্র তোমার পাপা নয় । শুনে রাখো আজ,,, রৌদ্র ইজ ইউর আঙ্কেল । পাপা নয় । তোমার পাপা নেই । কোত্থাও নেই । 

রৌদ্রের এই অবস্থার জন্য আমরাই দায়ী । আর বলবে না তুমি ওকে পাপা । বুঝেছো ! 

মিনি বুঝতে পারে না । চায়না বুঝতে । এতো সহজে তার বোঝার কথাও নয় সব । 

আরো বেশি করে ডুকরে কেঁদে উঠলো সে । রৌদ্রের কাছে শোরগোল করা বারন । 

মাহির মিনিকে কোলে নেয় । বাচ্চাটাকে বুকে চেপে ধরে বলে রিসার উদ্দেশ্যে…..

” এখন এই বাচ্চাটার উপর গলা উচাচ্ছেন কেনো ? সবটা শুরু থেকে আপনাদের বোঝা উচিত ছিলো ম্যাম । আশাকারা দেওয়া উচিত হয়নি । 

আমি হাজার বার বলেছি , বসের সাথে পাল্লা দেবেন না । দু’পক্ষ সামলাতে পারবেন না একসময় । দেখলেন তো, আমার কথাটাই ফলে গেলো । এখন এই অবেলায় এই বাচ্চাটা কে বোঝাবেন কি করে ? তাও আপনি একা ! কি মনে হয়, এতো সহজে বুঝবে ও ? ভুলে যাবেন না আরিসার কন্ডিশন ! এখনো পুরোপুরি সুস্থ নয় আপনার মেয়ে । একসাথে বাচ্চাটাকে দু’টো ধাক্কা দিয়ে নাজেহাল করতে চাইছেন ? দেখুন , কাঁদছে ও ! এভাবে কাঁদতে দেখেছেন আগে কখনো ? 

ম্যাম,,, আ’ম স্যরি এভাবে কথা বলার জন্য । বাট, দুটো ঝামেলা বাড়াবেন না প্লিজ । এ্যাটলিস্ট আরিসা কে ঠিক থাকতে দিন । 

মিনির দিকে দৃষ্টি ফেরালো মাহির । এ বেলায় গলা নামিয়ে আদুরে করলো নিজেকে । বাচ্চাটার ভেজা চোখ মুখ মুছিয়ে দিতে দিতে বললো নরম গলায়…..

” আরিসা,,, ডোন্ট ক্রাই মাম্মা ! পাপার কিচ্ছু হয় নি । জাস্ট একটু সিক । ঠিক হয়ে যাবে খুব তাড়াতাড়ি । আরিসা গুড গার্ল না ? গুড গার্ল’রা কাঁদে না । ওকে ? 

ফুঁপিয়ে ওঠে মিনি । মাহিরের গলা জড়িয়ে কাঁধে মাথা রেখে বলে থেমে থেমে…..

” হি ইজ মাই পাপা, নট মাই আঙ্কেল, রাইট ? মিনির পাপা আছে ! মিনির পাপা ঠিক হয়ে যাবে । মিনি আর জ্বালাবে না পাপাকে । 

এ বেলায় রিসা ধপ করে মেঝেতে বসে পড়ে । মুখ চেপে কেঁদে ওঠে ফিকড়ে…..

” আমি এখন কি করবো , মাহির ? কি করার আছে ? সব দোষ আমার । আমার জন্যই আজ এসব হয়েছে ! রৌদ্রের জীবনের এই পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য আমি দায়ী । আমাকে সাহায্য করতে গিয়ে রৌদ্রের আজ এই অবস্থা ।

মেঘা ভুল বুঝলো রৌদ্র কে । সব আমাদের জন্য ! 

রৌদ্র মেঘাকে খুব ভালোবাসে ! তাই ভয় পেয়েছিলো ও,, আর এখন কি হলো ? সেই ভয়টাই কাল হয়ে দাঁড়ালো । বিপত্তি বাধালাম আমরা ওর জীবনে । আর কয়েক মিনিট,, আর কয়েক মিনিটের মধ্যে সব বলে দিতাম মেঘাকে । কিন্তু মেঘা আমাদের আর সময় দিলো না । ঐ মেয়েটা কোথায় হারালো ? কেনো বুঝলো না রৌদ্র কে ? 

আদ্র অবলার ন্যায় চেয়ে দেখে । 

রিসা তাকায় আদ্রের দিকে ।

” আমাদের ক্ষমা করে দেবেন প্লিজ । রৌদ্রের থেকে আমরা সুবিধা নিয়েছি সবসময় । ওর মতো একটা বন্ধু পাওয়া আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া । আর রৌদ্রের জীবনে সবচেয়ে বড় ভুল আমাদেরকে বেছে নেওয়া । আমাদের জন্যই আজ এসব হয়েছে । আমার মেয়েকে বাঁচাতে গিয়ে আজ নিজের জীবন থেকে গুরুত্বপূর্ণ মানুষটাকে হারিয়ে ফেললো রৌদ্র । নিজের ভালোবাসাকে হারালো ‌। 

,,,

আটচল্লিশ ঘন্টার জায়গায় টানা আটান্ন ঘন্টা লাইফ সাপোর্টে রাখা হয় রৌদ্র কে । সাধ্যমতো হাজার প্রচেষ্টা চলে তার জ্ঞান ফিরিয়ে আনার তাগিদে । 

তবে সব বিফল । সময় কাটলেও রৌদ্রের জ্ঞান ফিরলো না আর । সে আছে, তবে নেই । মনিটরে হার্টবিট মাপা হচ্ছে এখনো । সেথায় তৈরি হওয়া যান্ত্রিক বিপ বিপ শব্দটা জানান দিচ্ছে, বেপরোয়া যুবকের হৃদযন্ত্র স্পন্দিত হচ্ছে এখনো । অর্থাৎ সে আছে । অসীম ঘুমের দেশে তলিয়ে আছে । ইহজাগতিক কোনো কিছুর প্রভাবে নেই সে ।

ডক্টর খানিক আগে জড়ানো গলায় সোজাসুজি জানিয়ে দিলেন….

” উই আর স্যরি, বাট হি হ্যাজ স্লিপড ইনটু অ্যা কোমা । 

ব্যস,, এই বাক্য টুকুই যথেষ্ট ছিলো সবাইকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য । 

ডক্টর রাও নত করেছেন শির । তারা খামতি রাখেননি কোথাও । সাধ্যমতো চেষ্টা চালিয়েছেন । 

পরপর দুবার হার্ট অ্যাটাক এসেছিলো যুবকের । তার আগে লাগাতার চার বার প্যানিক অ্যাটাক ছিলো । মস্তিষ্কের উপর দিয়ে ধকল বয়ে গেছে বড্ড । তীব্র ছিলো শ্বাস কষ্ট । হৃদযন্ত্র তছনছ । যন্ত্রণার জাঁতাকলে পিষ্ট হয়েছে মস্তিষ্ক । খুইয়েছে তার সচলতা । কতক্ষনই বা টেকা যায় প্রাণান্তকর যন্ত্রণায় ? 

ক্রিটিক্যাল কন্ডিশন হতে রিকভারি মেলেনি আর । ডক্টরদের আশঙ্কাই ফলে গেছে । দ্বিতীয় অ্যাটাকের পর যুবক তলিয়েছে অসীম ঘুমের দেশে । 

রৌদ্রের ফুসফুস সচল কিছুটা । শ্বাস টানার ক্ষমতা হারায়নি ‌। খানিক আগে ওর মুখ থেকে অক্সিজেন মাস্ক খুলে নেওয়া হলো । 

ভরা গোটা হসপিটাল । কেবিনের এখানে ওখানে নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছেন একেকজন । রৌদ্র যে বেডে শুয়ে আছে, সেই বেডের পায়ের দিকটায় মেঝেতে হাত পা ছড়িয়ে বসে আছেন তোফায়েল কাবির ‌। স্তব্ধ তিনি । বুকে কোথাও একটা চিনচিনে যন্ত্রণা হচ্ছে । তার কাছে এখনো ঘোর লাগছে সব । তার ছেলের কিচ্ছু হতে পারে না । তিনি মানতে পারছেন না এসব । রুবিনা কাবির কিচ্ছুটি জানেন না । তিনি জানাবেন কি করে ? কোন মুখে ? 

শুভ্র দাঁড়িয়ে আছে দেয়াল ঘেঁষে । মুখে রা নেই । অবসন্নতা স্পষ্ট । গত কয়েক মাস থেকে কেবল একের পর এক ধাক্কা বয়ে যাচ্ছে কাবির পরিবারের উপর দিয়ে ‌। এবারের ধাক্কা টা অসহনীয় । 

আদ্র ও বাকরুদ্ধ, নিশ্চুপ । শিয়রে বসে ভাইয়ের মুখের পানে ফ্যাল ফ্যাল তাকিয়ে আছে ভেজা চোখে । 

হসপিটালের পাশাপাশি গোটা কেবিন ভরাট ‌হচ্ছে ক্ষণে ক্ষণে । করিডোরে উপচে পড়া ভিড় । ইন্ডাস্ট্রির প্রত্যেকটা স্টাফ উপস্থিত হসপিটালে । কেউ কেউ কেবিনের ভেতরে এসে রৌদ্রকে এক ঝলক করে দেখে বেরিয়ে যাচ্ছেন ভিড় না জমিয়ে । সবাই দেখতে এসেছেন তাদের বসকে । 

মাহির রৌদ্রের মাথার দিকটায় একটা চেয়ার টেনে বসে আছে । ক্লান্ত সে । আর পারছে না । নিতে পারছে না এই ধকল । 

সে রৌদ্রের একহাত টেনে মুঠোয় পুরলো । কপাল ঠেকালো সেই হাতের পিঠে । চোখ বুজে লম্বা শ্বাস টানলো । বুলি ফুটালো জবান চিরে….

” বস,, আ’ম স্যরি বস । আমি আসলেই একটা নিষ্কর্মা ! কিচ্ছু পারিনা আমি । পারলাম না ম্যাম কে খুঁজে আনতে ? খুঁজে পেলাম না আমি তাকে ‌। আমি অপদার্থ বস ! আপনার এই অবস্থার জন্য আমিও দায়ী । আমাকে ক্ষমা করবেন প্লিজ । মাহির ইজ ইউজলেস । 

সে থামলো । আবার ডাকলো মাথা তুলে….

” আপনি ফিরবেন না বস ? আপনাকে ছাড়া চলবে না কোনো কিছু ? প্লিজ বস ফিরে আসুন । আমরা একসাথে ম্যামকে খুঁজবো এবার ? দেখবেন, আপনি সাথে থাকলে ঠিক খুঁজে পাওয়া যাবে ম্যাম কে । ম্যাম আর আপনাকে ভুল বুঝবে না । আমি বোঝাবো তাকে ‌। ফিরে আসুন বস । আপনি জানেন,, আরিসার জ্বর উঠেছে । ও এখনো জানে না । ও জানলে খুব কষ্ট পাবে । সইতে পারবে না । প্লিজ গেট ওয়েল সুন অ্যান্ড কাম ব্যাক !

বলতে গিয়ে টুপটাপ পানি ঝড়ে যুবকের চোখ হতে ‌। সে থামতেই নিস্তব্ধ হয় গোটা কেবিন । ক্ষণকাল চললো এই নিশ্চলতা । এখন আর বাইরের কেউ নেই ভেতরে ।

শব্দহীন কেবিনে দুজনের আগমন ঘটলো হঠাৎ । 

করিডোরের সব ভিড়ভাট্টা ছাপিয়ে ভেতরে পা রাখলো দুই জনা । হন্তদন্ত এক যুবক । তার বাহু আঁকড়ে আরেক চঞ্চলা রমনী । উদ্বিগ্ন দুজনায় । কেবিনের বাইরে এতো সব অপরিচিত মুখের মাঝে ভয়ে জুবুথুবু হয়ে গেছে রমনী । তবে ভেতরে পা রাখতেই সুপরিচিত কিছু মুখাবয়বের দেখা মিললো দুজনের চোখেই । অমনি ছলকে উঠলো চঞ্চলা তনয়া । 

দূরে তার ভাইয়া দাঁড়িয়ে । সে ছ্যাঁত করে ওঠে । মুহুর্ত বিলম্ব করে না । তপ্ত যুবকের বাহু ছেড়ে গলা তুলে ডাকে কেঁপে কেঁপে…..

” ভাইয়া !!! 

কেবিনের দীর্ঘক্ষনের নীরবতায় ছেদ পড়লো । রিনরিনে চিকন স্বরে একসাথে ছলকে চাইলেন সকলে । নিজের উদ্দেশ্যে ডাক পড়েছে, বোঝা মাত্রই ধক্ করে ওঠে শুভ্র । নজরে পড়ে, তার আদুরে বোন ছুটে আসছে । 

দৃষ্টি গাঢ় হওয়ার আগেই এক ছুটে এসে জড়িয়ে ধরলো তাকে । দুলে উঠলো শুভ্রর শরীর । 

শাফাহ্ আহ্লাদে গদগদ হয়ে ওঠে । ভাইয়াকে শক্ত করে জড়িয়ে নিয়ে কান্না ভেজা গলায় বলে ওঠে…..

” ভাইয়া,,, কেমন আছো তুমি ? ভালো আছো ? 

আমি এসেছি ভাইয়া ! কতদিন পর দেখলাম তোমায় । 

শুভ্র হকচকিয়ে যায় । তাৎক্ষণিক বুঝে পায় না কিছু । এটা তার বোন, কেবলই এটুকু বোধগম্য হয় । সামনে দৃষ্টি পড়তেই দেখতে পায় ইয়াশ কে । স্তম্ভের ন্যায় দাঁড়িয়ে আছে সেই ছেলে । 

নিমিষেই নরম চোয়াল শক্ত হলো শুভ্রর । দৃষ্টি হলো কিছুটা ক্ষুব্ধ । বোনকে ধরলো না সে । ততক্ষণে শাফাহ্ আহ্লাদে আটখানা । খুশিতে পানি গড়িয়েছে চোখ হতে । 

আদ্র আর তোফায়েল কাবির ধীরে তাকালেন । তোফায়েল কাবিরের মাঝে খুব একটা প্রতিক্রিয়া না আসলেও আদ্র তাৎক্ষণিক উঠে দাঁড়ায় । 

শুভ্র ঠেলে সরিয়েছে শাফাহ্ কে । 

আদ্র এগিয়ে গেলো । বহুক্ষণ বাদ জবানে বুলি ফুটলো তার । সন্দেহ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে বললো শাফাহ্’র মুখখানা আজলে ধরে….

” টুকটুকি,,, তুই ? তুই এখানে ? কি করে ? 

শাফাহ্’র খুশি বিলীন হয় এক মুহুর্তেই । দপ করে নিভে আসে আহ্লাদী হাসি । চোখাচোখি হয় আদ্রের সাথে । সেকেন্ড কয়েকের জন্য মিলে যায় দৃষ্টি । 

মেয়েটা তড়াক করে পিছিয়ে যায় । চোখ নামায় । হাত মুঠিয়ে নিজেকে ধাতস্থ করে উৎসুক হাসে এক গাল । 

দৃষ্টি ফেলে বেডের পানে । রৌদ্র কে দেখে তেড়ে যায়…..

” রৌদ্র ভাইয়া,, কি হয়েছে ভাইয়ার ? ভাইয়া শুয়ে আছে কেনো এভাবে ? ভাইয়া ? রৌদ্র ভাইয়া ? কি হয়েছে তোমার ? ভাইয়া দেখো আমি এসেছি । 

ওঠো । ভাইয়া,,, 

লাগাতার ডেকে যায় মেয়েটা । 

গত পরশু শাহিনা কাবিরের মুখে টুকটাক কিছু শুনেছে ওরা । মেঘার নিখোঁজের খবর পেয়েছে । অমনি দীর্ঘ ফ্লাইটের পর ছুটে এসেছে আজ । তবে সবটা জানা নেই ওদের । বাড়ি থেকে তেমন কোনো ইনফর্মেশন পায়নি । 

এদিকে শত চেষ্টার পর ও মেঘার সাথে কিছুতেই কন্টাক্ট করতে পারেনি ইয়াশ । অতঃপর শাহিনা কাবিরের মুখে যা শুনেছে, তাও মাথায় ঢোকেনি কিছু । যা বুঝেছে, তাও এলোমেলো । তবুও ছুটে এসেছে । এয়ার পোর্ট থেকে ডিরেক্ট হসপিটালে । 

রৌদ্র পড়ে আছে নিথর হয়ে । 

ইয়াশ আশেপাশে তাকায় । ঢোক গেলে । চাতকের ন্যায় খোঁজে বোনকে । মেঘা নেই কোথাও । 

সে ভেতর ভেতর চমকে যায় । 

শাফাহ্ও রৌদ্রের এমন নিস্পন্দ অবস্থা বুঝতে পারে না । শুভ্রর কাছে গিয়ে বাহু ঝাঁকিয়ে শুধোয়…..

” ভাইয়া,, রৌদ্র ভাইয়ার কি হয়েছে ? আম্মু বললো, ভাইয়ার হার্ট অ্যাটাক এসেছে । সত্যিই ভাইয়া ? কেনো ? কি হয়েছে বলো না ? মেঘা কোথায় ? জানো, আমরা অনেক বার ফোন করেছি ওদের । ওরা কেউ ফোন ধরেনি । কি হয়েছে এখানে ? ভাইয়া ওভাবে পড়ে আছে কেনো ! 

শুভ্র উত্তর করলো না । বরং মুখ ফিরিয়ে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিলো সুপ্ত ‌তিক্ততায় । 

শাফাহ্ তোফায়েল কাবিরের কাছে আসে । বসে খুশি হয়ে বলে…..

” বাবাই,,, কেমন আছো তুমি ? রৌদ্র ভাইয়ার কি হয়েছে বাবাই ? ভাইয়া কিছু বলছে না কেনো আমায় ? মেঘা কোথায় ? 

আজব ! উত্তর করে না কেউ । 

ইয়াশের ধৈর্য কুলোয় না । দম ফুরিয়ে আসে । তেড়ে যায় সে । মাহির কে টেনে তোলে । ঠোঁট ভিজিয়ে কাঁপা গলায় শুধোয়…..

” ইউ মাহির ? আ…. আমার বোন কোথায় ? মেঘা, কোথায় ও ? কি হচ্ছে এখানে ? রুডি ? ওর কি হয়েছে ? পড়ে আছে কেনো এভাবে ? টেল মি হোয়াট হ্যাপেন্ড ? 

মাহির চোখ মোছে ‌। দোটানা হীন সাবলীল উত্তর করে…..

” বস হ্যাজ গন ইনটু আ কোমা । 

চমকে যায় ইয়াশ ! পিছিয়ে যায় এক কদম । মাথায় বাজ পড়ে অবিশ্বাস্য কথায় । 

” হোয়াট ? 

” ইয়াহ্ ! 

” হোয়াট আর ইউ সেয়িং, মাহির ? রুডি কোমায় মানে ? কি হয়েছে ? 

” কতটা আঘাতের চাপে মানুষ কোমায় যেতে পারে, ডক্টর হিসেবে আপনার জানা আছে আশা করি । 

” হেয়ালি করে কথা ঘোরাবে না,, এসব কি করে হলো ? ডক্টর কি বলেছে ? 

” সম্ভবনা দেয়নি তারা । দুবার অ্যাটাকের পর কোমায় চলে গেছেন তিনি । রিকভারি করতে হয়তো এক দিন, সপ্তাহ, মাস, বছর, কিংবা বছরের পর বছরও লেগে যেতে পারে । 

ইয়াশ হতভম্ব হয় । মাথা কাজ করে না তার । কেঁপে কেঁপে শুধোয় বাকিটা আন্দাজে নিয়ে…..

” আর,,, আ…আমার বোন কোথায় ? 

” ইয়োর সিস্টার ইজ মিসিং । 

চার শব্দের একটি বাক্য । যেনো কামানের গোলার ন্যায় আছড়ে পড়লো তপ্ত যুবকের কানে । টাল হারিয়ে আরো এক কদম পেছালো সে ।

দৃষ্টিতে পড়লো এলোমেলো পলক । মাথা বিগড়ে গেলো । সে কিছু জানে না । আধো আধো জানলেও বোঝা কঠিন । 

অস্ফুটে আওড়ালো যুবক….

” মিসিং মানে ? 

” আজ সাতদিন হয়,, আপনার বোন চলে গেছে । 

” চলে গেছে মানে ? কোথায় চলে গেছে ? 

” বলে গেলে বস কোমায় থাকতো না ! 

” এ….এইই মাহির, কি  বলছো এসব ? ক্লিয়ারলি বলো,,, কি হয়েছে ? আমার বোন কোথায় ? রু…রুডির এমন অবস্থা হলো কি করে ? 

” আপনার বোনের বিরহে ! 

আপনার বোন ভালো না । আপনি তো সব জানতেন । আরিসা আর রিসা ম্যাম, দুজনের ব্যাপারেই জানেন । বলেন নি কেনো বোনকে ? জানান নি কেনো ? বোঝাননি কেনো ? আপনিও অবুঝ ? একই ভুল সবাই করলেন আপনারা ! 

একটু থেমে বললো…..

” আপনার বোনকে সবটা জানানোর আগে তিনি আরিসা আর রিসা ম্যামকে বসের সাথে দেখে ফেলেছেন । আর যা হওয়ার, তাই হয়েছে । অবশ্য, তাকে দোষ দেওয়া যায় না । ইয়েস, আমি তাকে ব্লেম করবো না । তিনি যা দেখেছেন , তাই বুঝেছেন । তবে একটাই ভুল তার,, তিনি আর বোঝানোর সুযোগ দেননি কাউকে । বসের পক্ষ থেকে শোনেননি কিছু । চলে গেছেন উনি । কোথায় গেছেন জানি না । তবে এটা ভালো করেই বুঝতে পারছি, তিনি নিজেকে লুকিয়ে নিয়েছেন । হারিয়ে যাননি । হারিয়ে গেলে ঠিক খুঁজে পেতাম । 

ইয়াশের মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ে ‌। টগবগ করে ওঠে মস্তিষ্ক । বাকরুদ্ধ হয় সেকেন্ড কয়েক । 

শাফাহ্ উঠে যায়…..

” রৌদ্র ভাইয়া কোমায় ! আর মেঘা হারিয়ে গেছে মানে ? 

” যা শুনলেন তাই । ইভারা ম্যাম নিখোঁজ । বসকে ভুল বুঝেছেন তিনি । 

আপনারা কল্পনাও করতে পারবেন না,,, রুডভিক কাবির রৌদ্র ইভারা তাসনিম মেঘাকে ঠিক কে কতটা ভালোবাসে । আমি সাক্ষী তার অনুভুতির, তার বেপরোয়া ভালোবাসার । পাঁচটা বছর দেখেছি আমি তাকে কাতরাতে । ইভারা ম্যাম কে ছাড়া কষ্ট পেয়ে থাকতে দেখেছি । সময় গুনতে দেখেছি । নিজেকে বদলাতে দেখেছি ‌। তার মুখে হাজার প্রশংসা শুনেছি একটা মেয়েকে ঘিরে । ভালোবাসার স্বীকারোক্তি শুনেছি । কিন্ত এ – কি হলো শেষে ? 

ইয়াশের কানে কথা গুলো পৌঁছালো কি না কে জানে । তার তপ্ত শরীর টলে ওঠে । 

ঢোক গেলে বার কয়েক । কানে বাজে,, এক সপ্তাহ ধরে তার বোন নেই ‌ । এক সপ্তাহ আগে তো তার বোনের জন্মদিন ছিলো । ঘটে যাওয়া এই ঘটনার জন্যই তবে ইয়াশ মেঘার সাথে যোগাযোগ করতে পারেনি ? এক সপ্তাহ ধরে চলে আসছে এসব ? 

কোথায় তার বোন ? সাত দিন ধরে কোথায় আছে সে ? এই অচেনা অজানা শহর, ভিন্ন দেশে কোথায় হারিয়েছে তার আদরের বোন ? 

তপ্ত যুবক মাথা নাড়ায় ভাবতে গিয়ে । এসব বিশ্বাস করতে নারাজ মন । অবিশ্বাসে অন্তিম বার শুধালো অস্পষ্ট স্বরে….

” মাহির,, স্পিক দ্য ট্রুথ প্লিজ !! আ…আমার বোন কোথায় ? 

” সত্যিই বলছি,, খোঁজ পাইনি । 

হেলে পড়লো যুবক ‌। বেডে এক হাত ঠেসে কাঁপা হাঁটুতে ভর করে নিজেকে ধরে রাখলো কোনো রকমে । 

চোখ নামালো । তীব্র বিপদজনক আশঙ্কায় ভনভন করলো মাথা । মস্তিষ্কের প্রত্যেক নিউরনে আতঙ্ক খেলে গেলো তার । আড়চোখে ফিরে চাইলো নিস্তেজ রৌদ্রের মুখে । কাতর হলো দৃষ্টি । 

বেশ কয়েক মুহূর্ত নিষ্পলক নয়নে রৌদ্রের পানে তাকিয়ে রইলো সে । এ কি হচ্ছে ওদের সাথে ? 

আর ভাবলো না ইয়াশ । 

সোজা হয়ে দাঁড়ায় সে । ঘাম জমেছে চোখে মুখে । ভীত যুবক দুহাতে ডলে মুখ মুছে নিলো । স্তম্ভিত শাফাহ্ কে পাশ কাটিয়ে হনহনিয়ে পা চালালো বাইরের দিকে । 

ওকে ওভাবে চলে যেতে ধক্ করে ওঠে শাফাহ্ । সবার উপস্থিতি উপেক্ষা করে দ্রুত পায়ে পা মেলায়……

” মেঘার ভাইয়া,,, কোথায় যাচ্ছেন আপনি ? 

ডাক পেয়েও থামে না যুবক । করিডোরে পা চালায় ত্রম্ভ পায়ে । ছোট একটা ল্যাগেজ এনেছিলো সাথে । দরজার পাশে রেখে কেবিনে ঢুকেছিলো তখন । সে ল্যাগেজ টা টেনে ধরলো । পা চালালো আরো জোরে । 

শাফাহ্ তেড়ে যায় । পেছন থেকে হাত টেনে ধরে……

” এইই মেঘার ভাইয়া, কোথায় যাচ্ছেন হ্যাঁ ? আমিও যাবো আপনার সাথে ! 

তাকালো তপ্ত যুবক । সিক্ত চাহনি তার । শাফাহ্ কে গাঢ় দৃষ্টিতে পরখ করলো সেভাবেই । কিছু বললো না । ল্যাগেজের চেইন খুলে একটা পাসপোর্ট বের করে গুঁজে দিলো রমনীর হাতে । 

ফের বাড়ালো কদম । হাতে পাসপোর্ট দেখে আঁতকে ওঠে শাফাহ্ । ছুট্টে গিয়ে আবারো টেনে ধরে যুবককে । ছলছল চোখে চেয়ে বলে থেমে থেমে….

” এটা আমাকে দিচ্ছেন কেনো ? আমি কি করবো এটা দিয়ে ? 

” বাড়ি ফিরে যাও ! 

রুদ্ধ গলায় হীম শীতল ছোট্ট বাক্য । কেঁপে ওঠে চঞ্চলা । বৃহৎ হয় দৃষ্টি । সেথায় পড়ে এলোমেলো পলক । 

” বা…বাড়ি ফিরে যাবো মানে ? কা…কার বাড়ি ? 

” তোমার বাড়ি । ফিরে যাও । 

” কি বলছেন এসব ? 

” যা বলছি তাই ! ফিরে যাও টুকটুকি । 

ছলকে ওঠে শাফাহ্ । ওষ্ঠ কামড়ে ফুঁপিয়ে ওঠে । খুবলে ধরে যুবকের উদরের দুপাশ । মাথা তুলে ভেজা দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলিয়ে আওড়ায়…..

” মজা করবেন না প্লিজ । আপনি কোথায় যাবেন এখন ? 

প্লিজ আমাকে ফেলে যাবেন না এভাবে । শুনুন আমার কথা, বোঝার চেষ্টা করুন ‌। আমি আপনার সাথে যাবো । বাড়ি যাবো না আমি । মেঘাকে খুঁজতে যাবেন আপনি ? আমিও যাবো । যেখানে যাবেন সেখানে যাবো । 

ইয়াশ ঢোক গেলে । ল্যাগেজের হাতল ছেড়ে দুহাতে আগলে নেয় রমনীর ভেজা ভেজা মুখশ্রী । চারিদিক অগ্রাহ্য করে চোখ মুছিয়ে দিয়ে ঠোঁট নামিয়ে চুমু খায় ললিতার মসৃন কপালে । ভেজা ভেজা দুই গালে এবং নাকের ডগায় । শেষের টা অধরে স্থায়ী হয় । অতঃপর নরম গলায় বলে কপালে কপাল ঠেকিয়ে…..

” উঁহু,,, যাবে না তুমি আমার সাথে । পাসপোর্ট দিয়ে গেলাম । নিজের ভাই আর বাপের সাথে দেশে ফিরে যাও । পিছু ডেকো না, প্লিজ । বুকে হানছে তোমার ডাক । 

শাফাহ্ কেঁদে ওঠে অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু আশংকা করে । জাপটে ধরে যুবককে । 

” প্লিজ,,, আমাকে ছেড়ে যাবেন না । আমরা স্বামী-স্ত্রী তো ? আমাকে ছাড়বেন না প্লিজ । মেঘার ভাইয়া,,, আমি ও বাড়িতে যাবো না । ওখানে দম বন্ধ হয়ে আসে আমার ‌। এমনটা করবেন না দয়া করে । 

” ছাড়ো টুকটুকি,, আমাকে যেতে হবে ! অনেক কাজ আছে ‌। 

” না,, ছাড়বো না আমি । আমাকে রেখে কোত্থাও যেতে পারেন না আপনি ! এখন সখ মিটে গেছে ? তাই, ফেলে রেখে যাবেন আমায় ? 

” টুকটুকি ! 

চেঁচালো যুবক । শাফাহ্ ডুকরে ওঠে । বুকে মুখ গুজে শক্ত করে হাতের বাঁধন । 

” প্লিজ মেঘার ভাইয়া,,, আমি আপনার সাথে যাবো ! 

” না,, এখন বাড়ি যাবে তুমি । 

ধরে আসা কন্ঠ যুবকের । ভেতর মুচড়ে যায় ‌। স্পষ্ট আভাস পাওয়া যায় কন্ঠে । 

এদিকে শাফাহ্ জেদ ছাড়ে না…..

” না,, যাবো না আমি । 

” আমি তোমাকে নিতে আসবো তো !  

ধক্ করে চকিতে দৃষ্টি তুললো রমনী । 

” হ্যাঁ ? 

মাথা নাড়ায় যুবক…..

” হু । নিতে আসবো খুব তাড়াতাড়ি । ওকে, জান ?

” কি বললেন ? 

” এখন চলে যাও । 

” সত্যিই নিতে আসবেন তো ? নাকি ছেড়ে দেবেন আমায় ? 

” ছাড়বো না । প্রশ্নই ওঠে না ছাড়ার । ছাড়লে বাঁচবো কি করে আমি ? 

দু একদিনের মধ্যে সবাই বিডিতে ব্যাক করবে । লক্ষি মেয়ে হয়ে চলে যাবে সবার সাথে । আমি আসছি…..

শাফাহ্ কুঁকড়ে যায় । মাথা নাড়ায় তবুও…..

ফিসফিসিয়ে আওড়ায়…..

” প্লিজ….

” উঁহু,,, জেদ করো না প্লিজ । কষ্ট হচ্ছে আমার । দূর্বল হয়ে যাচ্ছি । আমি আসবো তোমার কাছে, কথা দিচ্ছি । আমার বোনকে খুঁজতে হবে আগে । তারপর আমি খুব তাড়াতাড়ি ফিরে আসবো….

কথা বাড়ালো না আর । শাফাহ্ কে আলগা করলো যুবক । সরিয়ে দিলো । ঝুঁকে আরেকবার চুমু খেলো ঠোঁটে । তাকালো না দ্বিতীয় বার । নিজেকে শক্ত করে দৃষ্টি ফিরিয়ে বড় বড় কদমে পা বাড়ালো । 

পেছনে ফেলে গেলো মর্মাহত জর্জরিত এক রমনীকে । যে তনয়া ভেজা চোখে চেয়ে দেখলো তপ্ত যুবককে । হনহনিয়ে যাচ্ছে যুবক । রমনী পেছন থেকে গলা তোলে…..

” আমি অপেক্ষা করবো আপনার জন্য…..

🛑 আমি বারবার বলছি, গল্পের নাম মাথায় রাখুন । নামের যৌক্তিকতা রাখতে দিন । যা হওয়ার তাই হচ্ছে । নামের সাথে মিলিয়ে হলেও এটা হওয়ার ছিলো । অতো বেশি ভাববেন না প্লিজ । গল্পের এন্ডিং কি হবে তা আমি অনেক আগেই বলে দিয়েছি । খুব সুন্দর একটা এন্ডিং অপেক্ষা করছে আপনাদের জন্য । এই অস্বাভাবিকতা টা শেষ হবে খুব শীঘ্রই । অতো বেশি হাইপার হবেন না । কুল থাকুন । রৌদ্রের প্রাপ্য ছিলো এটুকু । এই ঝামেলা এখানেই শেষ । পরবর্তী পর্ব থেকে নতুন কিছু হবে । 

আপনারা খালি রেসপন্স করুন 👻 । ঝটপট ওকে ? 🛑

চলবে……..

সবার আগে গল্প পেতে অবশ্যই পেজটি ফলো দিয়ে রাখুন –

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply