Golpo romantic golpo আসবো ফিরে আবারো

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৮২


#আসবো_ফিরে_আবারো

#পর্ব_৮২

#সুরভী_আক্তার

শাফাহ্ ভ্যাট ভ্যাট করে তাকিয়ে রইলো ওর কথায় । চোখে ফেললো ঘন পলক । ভাবলো, শুধালো মনকে….ডিম কেজিতে বিক্রি হয় না ? তাহলে ? এইরে, ভুলে গেছে ! গোলমেলে হয়ে গেছে সব । সে আমতা আমতা করলো…..

” ডিম কেজিতে বিক্রি হয় না তো কিভাবে হয় ? 

” পন্ডিত হয়েছো, তো জানো না ? 

” জানি তো । যেভাবেও হোক না কেনো, ডিমি কেজিতেও বিক্রি হয় ‌। আমি যখন বলেছি ডিম কেজিতে বিক্রি হয়, তখন সেটাই হয় । 

ওর চোয়াল ছাড়লো ইয়াশ । ধীরে মাথা ঝাঁকালো । 

হাতের কব্জি চেপে ধরে হিড়হিড়িয়ে টেনে নিয়ে গেলো ঘরের দিকে । হাত চেপে ধরেই ক্লজেট থেকে দুটো ব্যাগ বের করলো । আবার টেনে আনলো বিছানার কাছে । ব্যাগ দুটো উপুড় করলো বিছানায় । একটা শাড়ি, হিজাব সমেত মেয়েলি কিছু সাজগোজের জিনিসপত্র উপচে পড়লো । চোখ গোল গোল করে চাইলো শাফাহ্ । চোয়াল ঝুলিয়ে বললো রগরগে গলায়….

” হায়রে রাক্ষস,,, এই শাড়ি আর মেকআপ কার জন্য কিনেছেন ? 

” আমার বউয়ের জন্য ! 

” বউ মানে,,, বউ কোত্থেকে আসলো ? 

ইয়াশের রাগান্বিত দৃষ্টি দেখে পরক্ষনে মনে পড়লো, সেই তো ওর বউ । জিভে কামড় বসালো মেয়েটা । গলা নামিয়ে বললো….

” আমার জন্য এনেছেন ? 

” হু । শাড়িটা পড়ে রেডি হয়ে নাও ফাস্ট। বেরোবো এক ঘন্টার মধ্যেই । 

” কোথায় যাবো ? 

” তোমাকে হালি দরে বিক্রি করে দেবো আজ । তাই বাজারে যাবো । 

মুখ কালো করলো শাফাহ্ । 

” বলুন না কোথায় যাবো ? 

” লেট নাইট পার্টি আছে । হসপিটালের ওপেনিংয়ে পনেরো বছর পূর্তি উপলক্ষে পার্টি থ্রু করা হয়েছে । বারোটার পর, আই মিন ছয় এপ্রিল আমাদের হসপিটালের পনেরো বছর…..

বলতে বলতে মুখ গোল রেখেই থমকালো ইয়াশ । চোখে মুখে পরিবর্তন আসলো তড়িতে । তাৎক্ষণিক আওড়ালো আবার…

” ছ…ছয় এপ্রিল ! 

তারিখ টা সম্পুর্ন মনে উঠতেই মস্তিষ্ক জানান দিলো কিছু একটা ‌। একহাত কোমরে ঠেসে অন্য হাতে কপাল চেপে ধরলো…..

” ওও নোহ্….

ড্যাম ইট । ভুলে গেলাম কি করে আমি ? উফফফ গড ! ‌

শাফাহ্ ও বোধহয় আন্দাজ করলো কিছু একটা । ঠোঁট ভিজিয়ে বললো দ্বিধায় থেমে থেমে…..

” মেঘার ভাইয়া,,, আজ পাঁচ এপ্রিল ‌। কাল ছয় তারিখ, মেঘার জন্মদিন । হ্যাঁ তো, ছয় এপ্রিল মেঘার বার্থডে ‌। হায় আল্লাহ, মনেই ছিলো না । মেঘা তো সুইজারল্যান্ডে, তার মানে ওখানে ছয় তারিখ পড়ে গেছে । ওর তো জন্মদিন আজ । উইশ করতে হবে না ? ইশশ্, ভুলেই গেছিলাম ।  ওর নাম্বার নেই আমার কাছে । আপনার কাছে আছে ? ফোন করুন না একবার ! 

ইয়াশ নিরুদ্বেগ । শাফাহ্ আলতো করে ঝাঁকালো ওকে….

” কি হলো ,, শুনছেন ? আজ আপনার বোনের জন্মদিন ! কেমন ভাইয়া আপনি ? মেঘাকে উইশ করবেন না ? মেঘা রেগে যাবে আপনার উপর ! একেই গত এক মাসের বেশি সময় ধরে কথা বলেন নি ওর সাথে । আপনি এতো নিষ্ঠুর কেনো ? 

ইয়াশ সরে আসে । পকেট থেকে ফোন বের করে । স্ক্রিনে না তাকিয়ে বোকার মতো শাফাহ্ কে শুধোয় আধো স্বরে….

” কটা বাজে ? 

” আটটা ! 

” সুইজারল্যান্ডে তো অনেক রাত হয়ে গেছে,তাই না ? মেঘা ঘুমিয়ে পড়েছে নিশ্চয়ই । এতো রাতে ফোন করে ডিস্টার্ব করবো ?

” তাহলে ওখানের সময় অনুযায়ী সকাল সকাল ফোন করে নেবেন । আমিও কতদিন কথা বলি না ওর সাথে । মেঘাটাও ফোন করে না । 

” ও আমার উপর রেগে আছে । আমি আসলেই নিষ্ঠুর,তাই না ? 

তপ্ত যুবকের কেমন কাতর স্বর । 

এই এক মেঘার বেলাতেই সে বড্ড দূর্বল । কিন্তু কি হলো দূর্বল হয়ে ? কতদিন কাটলো, বোনটার সাথে কথা বললো না একটাবার । 

যুবকের আহত মুখাবয়ব দেখে শাফাহ্ খানিক মিষ্টি সুরে জানতে চায়….

” মেঘাকে খুব ভালোবাসেন, তাই না ? 

” ভীষণ । কারন আমার বোন ছাড়া আমার আর কেউ নেই ! 

মেঝের পানে চেয়ে বেখেয়ালে উত্তর করে বসলো যুবক । তবে উত্তরে খুব একটা প্রশন্য হলো না রমনী । হাসি হাসি মুখখানা চুপসে এলো তার । সত্যিই কি মেঘা ছাড়া ইয়াশের আর কেউ নেই ? শাফাহ্ ? সে কেউ নয় ইয়াশের জীবনে ? মেয়েটা উত্তরের টাল গিলে কাষ্ট হাসে । দৃষ্টি সরিয়ে বিছানার উপর পড়ে থাকা শাড়িটা হাতে তুলে নিতেই কানে বাজে পরক্ষণে….

” ভুল বললাম,, আমার বোন ছাড়াও এখন তুমি আছো আমার জীবনে । 

চকিতে চাইলো রমনী । কেমন ঠান্ডা শিহরণ বয়ে গেলো ভেতরে….

” আমি আছি ? 

” আছো ! 

” শুধু কি এই ঘরে ? 

” ভেতর ঘরেও ! 

” সেখানে তো অন্য কেউ ছিলো ! আমার জায়গা হলো ? 

ইয়াশ মুচকি হাসলো । ফোনটাকে হাতের মুঠোয় চেপে ধরে ঘর থেকে বেরোতে বেরোতে কথা ঘোরালো…..

” সময় নেই । শাড়িটা পড়ে রেডি হয়ে নাও । আমি পাশের রুমে আছি । 

বেরিয়ে যায় সে । রমনী তাকিয়ে রয় চাতকের ন্যায় । চোখের কোণে ভিড় জমে এক‌ চিমকি অশ্রু কণা । 

তা গাল ছাপিয়ে ঝরে পড়ার সে মুছে নেয় আঁখি কার্নিশ । দুহাতে শাড়িটা বুকের সাথে চেপে ধরে উপর পানে মুখ তুলে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে । 

পেরোয় অনেকক্ষণ । 

হালকা গোলাপি রঙের পাতলা রেশমের শাড়ি । হালকা ছিপছিপে হলেও শরীর বোঝা যাবে না । শাফাহ্ শাড়ি পড়তে পারে না । একলা একলা শাড়ি পড়েছে সেই ওদের বিয়ের দিন । সেদিন বাড়তি কাপড় ছিলো না বিধায় ইয়াশের মায়ের সেই শাড়ি টাকেই গায়ে জড়িয়ে ছিলো বহু কসরতে । সেটা ছিলো জামদানি । চেষ্টা করে পড়তে গিয়ে অসুবিধা হয় নি । তবে আজকের এই শাড়িটা সিল্কের । শাফাহ্ কোনো রকমে গায়ে জড়ালেও ধরে রাখতে পারছে না । কুঁচি গুলো এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে বারবার । আঁচলে পিন গাঁথার আগেই খসে পড়ছে । একপাশে সামলাতে গেলে অন্যপাশ এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে । 

শেষে বিরক্ত হলো মেয়েটা । কুঁচির গোছ ছাড়তেই অবিন্যস্ত হয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়লো । ওষ্ঠ উল্টে একহাতে আঁচল ধরে রাখলো সে । 

এমতসময় দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকে ইয়াশ । ফিটফাট হয়ে পুরো তৈরি হয়ে এসেছে । চোখ তুলেই ডাকে……

” টুকটুকি, রেডি হয়েছো ? 

ছ্যাত করে ওঠে রমনী । দ্রুত আঁচল তুলে কাঁধ জড়িয়ে নেয় । থতমত খেয়ে পিছু ফিরে দাঁড়ায় । মেঝেতে লুটানো কুঁচি গুলো টেনে তুলে ঝেড়ে ওঠে….

” রাক্ষুস কোথাকার, আ… আপনি এখানে এসেছেন কেনো ? ঘরে ঢোকার আগে পারমিশন নিতে হয় জানেন না ? 

পেছন থেকে সাঁড়া পাওয়া গেলো না । নীরবে ভেংচি কাটলো শাফাহ্ । ইয়াশ ততক্ষণে আয়েশ করে এগিয়ে ওর পাশ কাটিয়ে সামনে দাঁড়িয়েছে । চক্ষু উপর নিচ করে এলোমেলো মেয়েটাকে চোখ সরু আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করতে ব্যস্ত সে । যেনো নির্ঘাত নির্লজ্জ পুরুষ । 

শাফাহ্ ইয়াশ কে নিজের সামনে দেখে আঁতকে উঠলো । তার অসংলগ্ন দৃষ্টিতে কাহিল হলো রমনী । ফের পিছু ফিরলো ঝট করে । 

” নির্লজ্জ লোক, ওভাবে কি দেখছেন ? 

” শাড়িটা দেখছি ! 

ইয়াশের ধূর্ত উত্তর । মুখ বাঁকায় শাফাহ্ ।

কুঁচি ছেড়ে আঁচলে সেফটিপিন মেরে আটকে দেয় । ক্ষুব্ধ হয়ে বলে…..

” এটা কোনো শাড়ি হলো ? খুলে যাচ্ছে শুধু । আটকাচ্ছে না একটুও । 

” তো আটকাতে কে বলেছে ? যাক খুলে । 

যুবকের ঠোঁট চাপা কথায় শাফাহ্ দাঁত কিড়মিড়িয়ে বিড়বিড় করে । তপ্ত ধমক দেয়….

” বেহায়া কোথাকার ! চোখ সরিয়ে ওদিকে গিয়ে বসুন । আমার দিকে তাকালে ভালো হবে না বলে রাখলাম । 

” খারাপ কিছু হলেও মন্দ হয় না । 

কিড়মিড় করে চাইলো রমনী । ইয়াশ ঠোঁট কামড়ে হাসে । হেলেদুলে দৃষ্টি সরিয়ে বিছানার একপাশে বসে । হাতে তুলে নেয় ফোন । 

শাফাহ্ মনযোগ সরিয়ে শাড়ি ঠিক করতে লেগে পড়লো । কোনো রকমে উপর থেকে কুঁচি গুলো গুঁজে আটকাতে পারলেও গোছাতে পারলো না ঠিকভাবে । চেষ্টা করলো , হলো না । নিচের দিকে অগোছালো হয়ে যাচ্ছে বারংবার । আয়নাও নেই, যে দেখবে ঠিকমতো হলো কি না । 

এমন নাকাল পরিস্থিতির চাপে ভীষণ কান্না পেলো তার । ইচ্ছে করলো হাত পা ছড়িয়ে কাঁদতে । তাই করলো । ধপ করে ডিভানে বসে কাঁদো কাঁদো হয়ে হাত ছড়িয়ে বললো চিৎকার করে….

” আআআআআআআ । আমি কোত্থাও যেতে পারবো । শাড়িও পড়বো না । আপনি যান কোথায় যাবেন । চলে যান আমার চোখের সামনে থেকে । 

চোখ তুললো ইয়াশ….

” কি হলো ? 

” কিছু না, আমি কোথাও যাবো না । থাকবো না আপনার এই রাক্ষুসে বাড়িতে । কিচ্ছু নেই এ বাড়িতে । আয়নাও নেই একটা । দেখবো কি করে আমাকে কেমন লাগছে । বা*লের শাড়ি পড়তেও পারি না । খুলে যাচ্ছে বারবার । আর উনি বসে বসে নাটক দেখছেন । 

” আরে কি হয়েছে বলবে তো ? 

” একলা একলা শাড়ি পড়তে পারছি না ! কুঁচি গুলো এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে বারবার । 

” তো ? 

” আবার জিজ্ঞেস করছেন ? একটু হেল্প তো করুন । 

” কিভাবে ? 

শাফাহ্ উঠে দাঁড়ায় । হাত ইশারা করে চিবিয়ে বলে…..

” নিচের দিকে কুঁচি গুলো ধরে গুছিয়ে দিন একটু । 

” হু, আমি ? 

” তো কে ? 

বাম ভ্রু উপরে তুললো ইয়াশ । এলোমেলো মেয়েটাকে পূনরায় আপাদমস্তক দেখলো । বললো ভাবেলাশহীন…

” আমি কুঁচি ধরতে গেলে আজ আর গোছানো হবে না । আমি হাত লাগালেই এলোমেলো হয়ে যাবে আরো বেশি । নাউ ইউর উইশ, আসবো গোছাতে ? আজ না হয় গোছানোর বাহানায় একটু এলোমেলোই করলাম ! এলোমেলো তুমি টাকে দেখতে খারাপ লাগবে না কিন্তু !

চোখ কপালে ওঠে রমনীর । ফোঁস করে ওঠে….

” রাক্ষুস কোথাকার, মশকরা করবেন না । আমি কিন্তু সত্যি সত্যিই যাবো না বলে দিলাম । 

নেমে আসলো ইয়াশ । কদম বাড়াতে বাড়াতে মুখভঙ্গি বদলে কূটিল করলো । 

” রাগ করে না হানি । আমি মশকরা করছি না । আ’ম সিরিয়াস । বাই দ্যা ওয়ে, এসো, শাড়ি পড়িয়ে দিই । 

হাঁটু মুড়ে বসে রমনীর অগোছালো কুঁচি গুলো গুছিয়ে দেয়  তপ্ত যুবক । আঁচলটাও ভালো মতো গুছিয়ে কাঁধে আটকে দেয় । অতঃপর মুখোমুখি দাঁড় করায় তাকে । শুধোয় মেয়েটাকে…..

” হয়েছে এবার ? 

” হু । থ্যাংক ইউ । ভাল্লাগছে আমায় ? 

” উঁহু ‌! 

ইয়াশের আহ্লাদ করা উত্তরে মেয়েটা শুকনো হাসলো । চোখ নামিয়ে বললো সাবলীল ভাবে…..

” আমি জানি ! 

” কি জানো ? 

” আপনার চোখে আমাকে কখনো ভালো লাগবে না । কারন একজনকে ভালো লাগার পর আর দ্বিতীয় কাউকে মনে ধরে না । আপনার চোখ, মন অন্যের দ্বারে পড়ে আছে এখনো । 

ব্যস, কপাল‌ গুটিয়ে ফেললো যুবক । 

শাফাহ্ তাকে আর কিছু বলার সুযোগ দিলো না । ফোন ক্যামেরা বের করে নিজেকে দেখলো সেথায় । সেখানে দেখে দেখেই মাথায় ইয়াশের আনা হিজাব টা পেঁচিয়ে নিলো । মেকআপ করলো না সে । কেবলই চিকন করে কাজল আঁকলো আঁখি দ্বয়ে । হালকা গোলাপি রঞ্জন ঘসলো অধরে । এই তার সাজ । 

সবশেষে একস্থির সটান দাঁড়িয়ে থাকা যুবকের কাছে আসলো আবার । হেসে বললো…..

” চলুন, আমি রেডি । এগারোটা বেজে যাচ্ছে প্রায়, যেতে হবে তো ? 

সে পাশ কাটাতে চায় ইয়াশকে । তাৎক্ষণিক হাত টেনে ধরে যুবক । সামনাসামনি দাঁড় করিয়ে চিবুক উঁচিয়ে ধরে চোখ নামিয়ে চায় । চোখে চোখ রোপন করে মুচকি হাসে । নাকের ডগায় আলতো টোকা মেরে বলে হীম শীতল কন্ঠে….

” বোকা হরিণী । বুঝেও বোঝো না কিছু । অভিমানে গাল ফোলাও । টকেটিভ লেডি,, খুব সুন্দর লাগছে তোমায় । একদম আমার বউ বউ লাগছে । পুরো টুকটুকি পরী লাগছে । চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে আমার । একজনকে ভালো লাগার পরেও তোমাকে ভালো লেগে গেলো কিভাবে, বলোতো ? 

শাফাহ্ তার প্রশংসায় খুশি হতে পারলো না । হাসলো জোর পূর্বক । বললো সহজ ভাবে….

” খুশি করার চেষ্টা করছেন আমায় ? আমি জানি, একজনকে ভালো লাগার পর আর কক্ষনো দ্বিতীয় কাউকে ভালো লাগতেই পারে না । 

” ইউ মিন,,, আমাকে ভালো লাগে না তোমার ? 

নিমিষেই ক্ষুব্ধ হলো যুবকের নরম কন্ঠ । দৃষ্টি হলো রোষকষায়িত । 

” তা কখন বললাম ? 

” বোঝালে তো তাই । অন্য কাউকে ভালো লেগেছিলো তোমার । 

” লেগেছিলো  ! 

” এখন ? 

” লাগে না ! 

” কাকে ভালো লাগে তাহলে ? মনে কে আছে ? 

” কেউ না ! 

” শাট আপ স্টুপিড,,, আমাকে ভালো লাগে না ? আমি মনে নেই তোমার ? ভালো না লাগলে ভালো লাগাও জলদি । মনে না থাকলে জলদি মনে ঢোকাও আমাকে । 

” লাভ কি ? আপনার মনে তো নেই আমি ! 

” কে বলেছে নেই ? 

শাফাহ্ নীরবে চেয়ে রয় । সন্দিহান হয়ে শুধোয় এক বাক্যে….

” আছি ? 

” আছো কি নেই সেটা তোমাকে জানতে হবে না । তোমার মনের দখলদারী চাই আমার । বুঝলে ? এক আনাও ছাড় দেবো না । পুরো মন জুড়ে শুধু আমার রাজত্ব চলবে ‌। কোন আপদ কে বসিয়েছো ঘোরের বশে, ঝেড়ে ফেলো তাকে । আমার স্থান কেবল আমারই থাকবে । আধিপত্য চাই আমার । 

,,,, 

পার্টি হচ্ছে লস অ্যাঞ্জেলেসের বিলাসবহুল এক পাঁচ তারকা হোটেলের ব্যাংকুয়েট হলে । সপ্তম তলা, অর্থাৎ রুফটপে । 

এগারোটা থেকে শুরু হয়েছে । 

শাফাহ্ আর ইয়াশ সেখানে পৌঁছায় প্রায় বারোটায় । জাঁকজমকপূর্ণ আমেজ বিরাজমান সেথায় । কেবলই হসপিটালের পনেরো বছর পূর্তি উপলক্ষে এই পার্টির আয়োজন নয় । আরো কি এক এনাউন্সমেন্ট করার আছে । হসপিটাল থেকেও টুকটাক ইয়াং ডক্টর সহ আরো অনেকেই উপস্থিত এখানে । বাকিরা আননোন । পুরো হোটেল বুক করা হয়েছে এই এক পার্টির জন্য । নিচেও অনেকে রয়েছেন । 

শাফাহ্ কে নিয়ে ডিরেক্ট রুফটপে ওঠে ইয়াশ । চারদিকে ঝিকঝিকি আলোর মেলা । দিকবিদিক ঝলকানিতে ঝলসে যায় চোখ । পপ মিউজিকের সাউন্ড ভাসছে বাতাসে । 

রমনী এসব কিছুতে পুরোপুরি নতুন । ইয়াশের হাত চেপে ধরে আছে সে । কদম এগোচ্ছে ভয়ে ভয়ে । 

উপরে ওঠা মাত্রই একটা মেয়ে তেড়ে আসলো ওদের দেখে । বার্তা হীন হুট করেই গায়ে পড়ে জড়িয়ে ধরলো ইয়াশ কে । বলতে লাগলো….

” হেয়য়য় ইয়াশ, এথো ধেরি করে আসলে কেনো টুমি ? ডু ইউ নো, হাউ লং আই হ্যাভ বিন ওয়েটিং ফর ইউ ?

সবাই এসে গেছে । আই ওয়াজ জাস্ট ওয়েটিং ফর ইউ । 

ইয়াশ ওর সংস্পর্শে জ্বলে ওঠে তেলে বেগুনে । হাত মুঠিয়ে নেয় । এতো সব লোকের ভিড়ে ধাতস্থ রাখে নিজেকে । ঠেলে দূরে সরিয়ে দেয় মেয়েটাকে । দাঁত চেপে বলে…..

” হাউ ডেয়ার ইউ এভলিন ! ডোন্ট ট্রাই টু কাম নিয়ার মি, স্টে ব্যাক অ্যান্ড টক !

” ওওও বেইব,, হোয়াই আর ইউ গেটিং সো অ্যাংগ্রি ? থোমার জন্যই বসে আছি আমি । লেটস গো, এভরিওয়ান ইজ ওয়েটিং ফর ইউ ।

শাফাহ্ আহম্মক বনে যায় ওদের দুজনের মাঝে । মেয়েটাকে দেখে সে । উঁচু লম্বা বিদেশি সাদা চামড়ার তরুণী । পড়নে ছোট পোশাক । কে এই তরুণী ? ইয়াশ কে জড়িয়ে ধরলো কেনো ? আর কি বলছে এসব ? হতবুদ্ধ হলো রমনী । ইয়াশ কে পেয়ে মেয়েটার উৎফুল্লতা দেখে ছলছল করে উঠলো চোখ দুটি । তাৎক্ষণিক ইয়াশের হাত ছাড়লো সে । এক ধাপ পিছিয়ে আড়ালে দাঁড়ালো দৃষ্টি নত করে । 

এভডিন বাঁধা পেয়েও জোর পূর্বক ইয়াশের বাহু টেনে সামনে এগোতে চায় । সহসা ঝটকা মেরে ওর হাত ছাড়িয়ে দেয় যুবক । ঘাড় ঘুরিয়ে শাফাহ্’র দিকে তাকায় । ওর দৃষ্টি অনুসরণ করে এভলিন ও তাকালো পেছনে । অমনি শাফাহ্ কে দেখে চিকচিক করে উঠলো…..

” ওও ইয়াশ, ইজ দিস ইউর সিস্টার ? 

ইয়াশ কে উত্তর করার ফুরসৎ না দিয়ে শাফাহ্ কে টেনে সামনে আনলো সে । হাস্যোজ্জ্বল মুখে শাফাহ্’র দুহাত টেনে খুশিতে গদগদ হয়ে বললো….

” হেয়য়, টুমি ইয়াশের সিস্টার ? অ্যাম আই রাইট ? ইয়াহ, আ’ম রাইট । আই নো ইউ । ইয়াশ বলেছে হামাকে , ভাংলাদেশে গেলে টোমাকে নিয়ে আসবে । ইউ আর সো প্রিটি । জাস্ট লাইক অ্যা ডল । ইউ নো হু আই এম ? 

এভলিন একটু জড়িয়ে এলো । হাসি ধরে লজ্জা লজ্জা ভাবে বললো চিবুক নামিয়ে…..

” আই অ্যাম এভলিন, ইয়াশ’রস গার্লফ্রেন্ড । 

তার কথা শেষ হওয়া মাত্রই যেনো আকাশ ভেঙ্গে পড়লো রমনীর মাথায় । দুলে উঠলো তার অনুচ্চ তনু । টলটলে পানি গড়িয়ে ভিজলো কপোল । স্তব্ধ, বাকরুদ্ধ হয়ে চেয়ে রইলো সে ‌। 

এদিকে তপ্ত ক্রোধে কেঁপে ওঠে ইয়াশ । মাড়ি খিচে চোখ রাঙিয়ে ধমকায় বজ্রকণ্ঠে…..

” এভলিন ! হোয়াট দ্যা হেল আর ইউ টকিং অ্যাবাউট ? আর ইউ ননসেন্স ? 

উচ্চস্বরে গানবাজনা হচ্ছে । তার বজ্রকন্ঠ বেশিদূর পৌঁছালো না । তবুও কেঁপে উঠলো এভলিন । মিইয়ে গিয়ে হাল না ছেড়ে আমতা আমতা করলো…..

” ইয়াশ, জাস্ট কিপ ইউ কুল বেইবি । হামিই তো সত্যি বলছি । ইউ উইল গেট ইট ইন আ বিট । 

হেয়য় সিস্টার, টুমি হামার সাথে চলো ! 

শাফাহ্ কে নিজের সাথে টেনে নিয়ে যেতে চায় সে । বাম হাত ধরে এগোতেই ডান হাত টেনে ধরে ইয়াশ । এভলিন তাকাতেই অগ্নি দৃষ্টিপাত করে । তার অগ্নি চক্ষুর বিপরীতে টিকতে পারে না মেয়েটা । শাফাহ্’র হাত ছাড়ে । হেসে বলে….

” ওকেইই….

টুমি ইয়াশের সাথে এসো । আই অ্যাম গোয়িং, অ্যান ইম্পর্টেন্ট থিং নিডস টু বি অ্যানাউন্সড । ইয়াশ, কাম কুইকলি ! ওকে বেইব ! 

এভলিন চলে যেতেই দম ফেলে ইয়াশ । 

অগোচরে ভেজা গাল মুছে নেয় শাফাহ্ । নাক টেনে ইয়াশের থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নেয় । 

আলতো চোখে চায় যুবক । বুঝতে পারে । বোঝানোর চেষ্টা করে নরম কন্ঠে….

” আরে টুকটুকি,,, ওর কথায় কিছু মনে করো না । সি ইজ ক্রেজি । মাথার স্ক্রু ঢিলে আছে । উল্টোপাল্টা বকে । তুমি চলো । সফট ড্রিংকস নেবে ? 

ফের মেয়েটার হাত ধরে ড্রিঙ্কস কাউন্টারের দিকে এগোয় সে । দুটো সফট ড্রিংকস নেয় । একটা বাড়িয়ে দেয় শাফাহ্’র দিকে । মেয়েটা সেই যে মাথা নত করেছে,আর তোলেনি । 

” টুকটুকি, জুস নাও । 

তবুও উদ্বেগ দেখা গেলো না । 

ইয়াশের মনযোগে বিঘ্ন ঘটলো অন্য কারোর উপস্থিতিতে

…..

” ইয়াশ,, হোয়েন ডিড ইউ কাম ? 

চকিতে চাইলো তপ্ত যুবক । বেশ কজন টাইকন গোছের ভদ্রলোক এগিয়ে এলেন । মাঝের জন #ম্যাথিউ_টেইলর । হসপিটালের ফাউন্ডার, পাশাপাশি এভলিনের বাবা । তিনি বেশ সভ্য লোক । ইয়াশ মুচকি হাসি টেনে উত্তর করে…..

” জাস্ট কাম ইন ! 

” ইউ আর ওয়ে টু লেট, ইয়াশ । ইউ নো,, টুডেজ পার্টি ইজ অর্গানাইজড অল ফর এভলিন এন্ড ইউ !

” স্যরি ? 

” ইয়াহ্ । বাই দ্যা ওয়ে, হু ইজ সি ? 

নতজানু শাফাহ্ কে ইঙ্গিত করে প্রশ্ন করলেন তিনি । 

ইয়াশ কিছু একটা আন্দাজ করতে পারে । কপাল গুটিয়ে ঢোক গেলে । রাগ ওঠে ভেতর ভেতর । সে সামলে নেয় । শ্বাস ফেলে শাফাহ্’র কাঁধ জড়িয়ে নেয় । বুক ফুলিয়ে বলে দোটানা হীন…..

” সি ইজ মাই ওয়াইফ ! শাফাহ্ কাবির । 

ইয়াশের কথা শুনে চমকে গেলেন ভদ্রলোক । পকেটে পুরে রাখা হাতখানা বেরিয়ে আসলো তার । অস্ফুটে শুধোলেন…..

” হোয়াট আর ইউ সেয়িং ? আর ইউ ম্যারিড ?

” ইয়াহ্ ! আই হ্যাভ বিন ম্যারিড ফর আ মান্থ অ্যান্ড টুয়েলভ ডেজ । 

” ইয়াশ, সিরিয়াসলি ? 

” অফকোর্স । 

হুড়ো জবাব যুবকের । ভদ্রলোক পিছিয়ে গেলেন । মেয়ের কথা রাখতে আজ এই পার্টির আয়োজন ‌করা । আর আজই এভলিনের সাথে ইয়াশের আগাম সম্পর্ক তৈরির ঘোষনা দেওয়াটাই ছিলো আসল উদ্দেশ্য । 

কিন্তু হঠাৎ ইয়াশের এমন কথায় থমকে গেলেন তিনি । ওদিকে ইতোমধ্যে গান থামিয়ে মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে সবার মাঝে দাঁড়িয়েছে এভলিন । 

” ড্যাড, কাম হিয়ার । অর ইয়াশ , প্লিজ কাম অ্যালং টু । আই কান্ট ওয়েট । ড্যাড ইজ গোয়িং টু অ্যানাউন্স সামথিং রাইট নাউ । ইয়াশ ডার্লিং, প্লিজ কাম হিয়ার । 

মেয়ের কথায় ভদ্রলোক শুষ্ক ঢোক গেলেন । 

ঠোঁট ভিজিয়ে তেড়ে যান । তিনি নিতান্তই ঠান্ডা স্বভাবের । মেয়ের ঔদ্ধত্যতা জানেন তিনি । ইয়াশ বিবাহিত, চাওয়া টা শুধু তার মেয়ের একার পক্ষ থেকে । এতে ইয়াশের কোনো আশকারা ছিলো না । 

এভলিন বেশি কিছু বলার আগেই তিনি মেয়ের হাত টেনে এতো সব লোকের ভিড় হতে প্রস্থান করতে লাগলেন । এভলিন আকস্মিক এমন কান্ডে হকচকিয়ে যায়…..

” ড্যাড, হোয়্যার আর ইউ টেকিং মি ? ইউ ওয়্যার সাপোজড টু অ্যানাউন্স মাই ম্যারেজ উইথ ইয়াশ টুডে । ড্যাড…..

মেয়েটার কথা উপস্থিত সবার কানেই পৌঁছালো । শাফাহ্ সিটিয়ে গিয়ে চোখ বন্ধ করে নেয় । এই অবেলায় যেনো বিদ্যুৎ স্পৃষ্টে চূর্ণ হয় তার কোমল হৃদয় । সে খামচে ধরে শাড়ির আঁচল । 

পার্টি সেখানেই শেষ হয়নি । চলেছে রাত তিনটে অবধি । পুরোটা সময় ড্রিঙ্কস কাউন্টারের সামনেই বসে ছিলো শাফাহ্ । বল ডান্স হলো সব কাপলদের নিয়ে । শাফাহ্ দেখে গেছে সেসব । পরিচিত হয়েছে ইয়াশের হসপিটালের আরো কয়েকজনের সাথে । 

ওরা অ্যাপার্টমেন্টের উদ্দেশ্যে রওনা দেয় আড়াইটার দিকে । পুরো পথে শাফাহ্ চুপটি করে বসে ছিলো । ইনফ্যাক্ট পার্টিতেও টু শব্দেও কথা বলে নি । 

মুখ ভার । ইয়াশ ড্রাইভিং এর ফাঁকে ফাঁকে আড়চোখে পরখ করছে ওকে । নিজেও বলছে না কিছু । 

শেষে বাড়ি পৌঁছে গাড়ি থামতেই শাফাহ্ হিসহিসিয়ে গাড়ি থেকে নামে । গা জ্বলছে অনলে । রাগ উঠছে ভীষণ । তার উপর হাই হিল পড়ার দরুন ব্যাথা ধরেছে পায়ে । গাড়ি থেকে পা নামাতেই বেকায়দায় হুবড়ি খেয়ে পড়তে নিলো । অস্ফুটে বেরিয়ে এলো গলা চিরে…..

” আহহহ্ । 

” টুকটুকি ! পড়ে যাবে তো । 

ইয়াশ উত্তেজিত হয়ে ঘুরে এসে ধরতে গেলে হাত উঁচিয়ে চড়া গলায় বাঁধা দেয় রমনী….

” খবরদার ছোঁবেন না আমায় । 

এতক্ষণে জবান ফুটেছে । তাও চড়া । 

বুলি আওড়িয়ে কোন রকমে পা বাড়ালো । হিল পড়ে হাঁটাও দায় । রাগে গিজগিজ করে পায়ের হিল খুলে ছুড়ে মারলো । গোড়ালিতে চিনচিনে ব্যথা ধরেছে । মেয়েটা তোয়াক্কা না করে শাড়ির কুঁচি একহাতে ধরে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে গটগটিয়ে হেঁটে গিয়ে থামলো দরজার সামনে । দুবার পাসওয়ার্ড টাইপ করলো, খুললো না । নিশ্চয়ই পাসওয়ার্ড চেঞ্জ করা হয়েছে । 

চোখ মুখ টাটিয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে চাইলো পেছনে । ততক্ষণে ইয়াশ এগিয়ে আসছে । বা হাতে রমনীর হিল জোড়া । সে এসে পাসওয়ার্ড টাইপ করতেই খুলে গেলো দরজা । শাফাহ্ গটগট করে এগোতে গেলে ছেড়ে রাখা লম্বা আঁচলের কোণে পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলি পেঁচালো তার । বাম দিকে কাত হয়ে পড়তে পড়তেও পড়লো না । তাৎক্ষণিক হাত টেনে ওকে সামলে নিলো তপ্ত যুবক । 

থেমে রইলো না এতেই । ডান হাতের সাহায্যে মেয়েটাকে তড়িতে কোলে তুলে নিলো ‌। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দ্রুত ওর গলি জড়িয়ে নিলো জড়বুদ্ধ রমনী । 

ওকে আগলে নিয়েই ভেতরে ঢোকে ইয়াশ । একেবারে থামে ঘরের ভেতর । কোল হতে নামাতেই ছিটকে পিছিয়ে যায় শাফাহ্ । অসম্ভব রাগে গজগজ করে । কিন্তু পন করেছে কথা বলবে না । 

একে একে সেফটিপিন সরিয়ে মাথার হিজাবটা টান মেরে খুললো । ইয়াশ হিল জোড়া হাত থেকে নামিয়ে বলে ওকে দেখে….

” আব্বে ইয়ার,, এমন করছো কেনো তখন থেকে ? পার্টিতেও টু শব্দ করো নি । কি হয়েছে ? 

ওপাশের প্রতিক্রিয়া নেই । ইয়াশ আগ বাড়িয়ে বলে,,,,

” টুকটুকি,,, রিয়াক্ট করছো কেনো এভাবে ? ওখানে যা হয়েছে তাতে আমার কোন হাত নেই । সি ইজ জাস্ট দ্য ডটার অফ আ হসপিটাল ওনার । এর চেয়ে আর বেশি কিছু নয় । 

” আচ্ছা ? কিচ্ছু নয় ? হসপিটালের ওনারের মেয়ে এমনি এমনি বলবে, যে সে আপনার গার্লফ্রেন্ড ? অতো সুন্দর একটা মেয়ে, সে আপনার পিছে এমনি এমনি পড়ে থাকবে । আপনি বিবাহিত, এটা কেনো জানবে না তারা ? একজন বিবাহিত পুরুষ কে তার স্ত্রীর সামনে অন্য একটা মেয়ে এসে গদগদ হয়ে জড়িয়ে ধরবে ? ডার্লিং, বেইবি, এসব বলবে ? এতো সহজ ? 

আর আজকের এই পার্টি, এই পার্টি তো আপনাদের বিয়ের এনাউন্স করার জন্যই থ্রু করা হয়েছে । ঐ মেয়েটা, ঐ মেয়েটার সাথে আপনার বিয়ের কথা হচ্ছিলো ওখানে । সবাই বলাবলি করছিলো । কি ভেবেছেন, আমি শুনিনি কিছু ? আমি বুঝি না ওদের ভাষা ? 

বিরতি হীন কথা গুলো বলতে গিয়ে মেয়েটার গলা কাঁপে । ললিতাঙ্গ অস্থির হয় । হাঁসফাঁস করে সে । চিকচিক করে ওঠে আঁখি যুগল । ইয়াশ এমন উদগ্রীব রমনীকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পরখ করে । ঠান্ডা জবানে বলে…..

” তেমন কিছু না, টুকটুকি । আমি কেবলই ওদের হসপিটালের একজন ডক্টর ‌। আমার পার্সোনাল লাইফ খুব একটা শেয়ার করি না আমি । আমাদের বিয়ের কথাটাও বলিনি তাই । ওখানে আমার ক্লোজ কেউ নেই । আমি আমার কাজে ফোকাস করি । আর কিছুতে না । 

সি ইজ আ স্পয়েল্ড গার্ল । আই কান্ট স্ট্যান্ড হার । আমি জানতাম আজকের পার্টিতে এমন কিছু একটা হতে পারে । তাই তোমাকে সাথে নিয়ে গেছি । প্লিজ ট্রাস্ট মি,,,আমি সত্যি বলছি । এভলিনের সাথে আমার কোনো রিলেশন নেই । 

” তাহলে ও আপনাকে জড়িয়ে ধরলো কেনো ? 

” আরে ও একটা গায়ে পড়া মেয়ে । আর এমনিতেও ওদের কালচারে এসবে কোনো হেজিটেশন নেই । যার তার গায়ে ঢলে পড়ে । 

” তারমানে সবসময় আপনাকে ওভাবে জড়িয়ে ধরে ? 

” একদম না । আজ প্রথম এতোটা কাছে আসতে পেরেছে । বিলিভ মি,, এর আগে আমাকে ছুঁতেও পারে নি কখনো । 

শাফাহ্ বিশ্বাস করলো না । গাল ভিজেছে অনেক আগে । এ বেলায় ফুঁপিয়ে উঠলো । হাত ছুড়ে পাশ ফিরে বললো থেমে থেমে…

” বিশ্বাস করি না আমি আপনাকে । ঐ মেয়েটার সাথে নিশ্চয়ই আপনার কোনো চক্কর চলছে । বউ থাকতে অন্য মেয়ের প্রয়োজন হয় আপনার ? আজ আমার সামনে ও আপনাকে জড়িয়ে ধরেছে, না জানি আড়ালে আরো কত কি করে । 

” টুকটুকি । কি বলছো এসব ? 

” চেঁচাবেন না আমার উপর ‌। একদম ঠিক বলছি আমি । আপনি আমাকে বাদ দিয়ে সবাইকে ভালোবাসেন । সবার গুরুত্ব আছে আপনার কাছে । কেবল আমিই গুরুত্বহীন । 

ইয়াশ নিজেকে ধাতস্থ করে । রাগ উঠলেও প্রকাশ করে না ‌। ঠান্ডা থেকে বলে….

” এটা কে বললো ? 

” জানি আমি । 

” আচ্ছা, ও আমাকে জড়িয়ে ধরেছে এতে প্রবলেম হচ্ছে তোমার । ওর স্পর্শ আমার শরীরে লেগেছে , এতে প্রবলেম ? ওকে, শাওয়ার নিয়ে আসছি এক্ষুনি । 

শাফাহ্ কে আর কিছু বলতে না দিয়ে একটা টাওয়েল তুলে গটগটিয়ে ওয়াশ রুমে ঢোকে ইয়াশ । সে চলে যেতেই ফুঁপিয়ে ওঠে শাফাহ্ । কেমন অস্বস্তি লাগে তার । বারবার চোখের সামনে ভাসে, ঐ মেয়েটা কিভাবে ইয়াশ কে জড়িয়ে ধরেছিলো । 

মিনিট দশেকের মাথায় ইয়াশ বেরিয়ে আসে ওয়াশ রুম হতে । পড়নে সাদা টাওয়েল পেঁচানো । গলায় আরেকটা ঝুলছে । সে মাথা মুছতে চোখ চালালো । ডিভানের একপাশে হাঁটু জড়িয়ে চুপচাপ বসে আছে রমনী । হেঁচকি তুলছে ক্ষণে ক্ষণে ।

ইয়াশ এগিয়ে যায় । মুখোমুখি মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে…..

” লেটস সি,,, শাওয়ার নিয়ে এসেছে ‌। আর কারো স্পর্শ লেগে নেই আমার শরীরে । তুমি ব্যাতীত আর কারোর স্পর্শ থাকবেও না কখনো । এবার তো নরমাল হও । 

শাফাহ্ আড়চোখে দেখলো । যুবকের পেটানো উদ্যম শরীরের পানে দৃষ্টি পড়তেই ছলকে উঠলো রমনী । ঝটপট দৃষ্টি সরিয়ে গুটিয়ে বসলো…..

” কি এসে যায় আমার নরমাল হওয়া না হওয়াতে ? কে আমি আপনার ? চলে যান রুম থেকে । ভোর হয়ে এসেছে, ঘুমাবো আমি । 

” অনেক কিছু এসে যায়, কারন বউ তুমি আমার । 

” আমি কারোর বউ নই । 

কথাটুকু বলেই চট করে উঠে পা বাড়ায় । তাৎক্ষণিক কব্জি টেনে ধরে ইয়াশ । অতঃপর রমনীকে কে ঘুরিয়ে নিজের দিকে ফেরায় । 

” উঁহু , আমার বউ তুমি । লুক অ্যাট ইয়োর হাজব্যান্ড ।

” পারবো না । হাত ছাড়ুন । 

” ছাড়বো না । অন্য কারোর স্পর্শ আমার শরীর থেকে ধুয়ে মুছিয়ে দিয়েছো । এবার তোমার স্পর্শ চাই আমার । হোল্ড মি । 

শাফহ্ চোখ তুলে তাকায় । লোকটার ঠান্ডা স্পর্শে অস্বস্তি হয় তার । খচখচ করে নিজেকে ছাড়াতে । এক কদম এগোয় তপ্ত যুবক । দূরত্ব ফুরিয়ে খুব কাছে দাঁড়ায় । চিবুক উঁচিয়ে ধরে রমনীর । লালিত মুখাবয়বে তাকিয়ে হাস্কি টোনে বলে…..

” চকলেট খেতে খেতে পুরো চকলেট তৈরি হয়েছো । তাকালেই টুপ করে পুরো তুমি টাকে খেয়ে ফেলতে ইচ্ছে করে । 

রমনী তিরতিরিয়ে কেঁপে ওঠে । জমে যায় সর্বাঙ্গ । মুখ নামিয়ে নেয় সে । ইয়াশের দৃষ্টি জোড়া অদ্ভুত । এলোমেলো বটে । মেয়েটার চোখের পাপড়ি ভেজা এখনো । লালচে কপোল দুখানি । ওষ্ঠ জোড়ায় গোলাপী রঞ্জন এখনো রয়ে গেছে । 

যুবকের দৃষ্টি প্রখর হয়ে আটকালো সেথায় । শিহরণ বইলো তার ভেজা শরীরেও । ডাকলো….

” টুকটুকি ? 

” হু ! 

” উই আর হাসবেন্ড এন্ড ওয়াইফ ? রাইট ? 

” হু । 

” হাসবেন্ড হিসেবে যদি কিছু চাই, দেবে ? 

ছ্যাঁত করে ওঠে শাফাহ্ । তড়াক করে দৃষ্টি তুলে চায় । চাহনি মিলে যায় দুজনার । যুবকের আকাঙ্ক্ষিত চাহনি দেখে ছলকে ওঠে মেয়েটা ‌। শুষ্ক ঢোক গিলে চোখ নামায় ‌। প্রত্যুত্তর বিহীন নিজের হাত ছাড়িয়ে সরে আসে । 

বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে আনচান করে । হাত কচলায় । বুকে শ্বাস নেয় বেগতিক । 

ইয়াশ দমে না । আবার ওকে নিজের দিকে ফেরায় । একহাতে কোমর পেঁচিয়ে নেয় আষ্টেপৃষ্ঠে । অন্য হাত গ্রীবা গলিয়ে কানের কাছে নিতেই শাফাহ্ নড়চড় বাড়ালো । অত্যাধিক অস্বস্তিতে কম্পন ধরলো অঙ্গে । ইয়াশের হাত খামচে ধরে চোখ খিচে ধীরে বললো বাঁধা দিয়ে…..

” মেঘার ভাইয়া,, আমি……

রমনী জবান হতে পুরো বাক্য খসলো না । তার আগেই অপ্রস্তুত অভাবনীয় হামলা পড়লো অধরের কোণে । জবান বন্ধ হলো সহসা । তপ্ত যুবক তার অনুচ্চ তনু টেনে লেপ্টে নিলো নিজের সাথে । 

মেয়েটা শরীরের ভার হারালো মুহুর্তেই । হাঁটু ছেড়ে টলে পড়লো যুবকের সুঠাম বুকে । চোখ নিভিয়ে নিলো বেসামাল অনুভুতিতে । 

মুহুর্ত কয়েক বাদ ছাড় পেতেই দম টানলো ধক্ করে । চোখ মেলে তাকিয়েই বলতে নিলো ব্যাকুল হয়ে…..

” মেঘার ভাইয়া…..

” শাট আপ, মেঘার ননদ । তুমি ছোট নও । যথেষ্ট বোঝো । 

আমরা স্বামী-স্ত্রী । বোঝো এর মানে ? 

” বুঝি । আর এটাও বুঝি, আপনি আমাকে ভালোবাসেন না । যেখানে ভালোবাসা নেই, সেখানে সম্পর্ক স্থাপনের কোনো মানে নেই । 

ইয়াশ ঝুঁকে আসলো । রমনীর ঘাড় চেপে ধরে উঁচু করলো তাকে । কপালে কপাল ঠেকালো । নাকে নাক ঘষে অধর ছুঁই ছুঁই করে আওড়ালো…..

” ভুল বোঝো স্টুপিড । 

” ভালোবাসেন তবে ? 

” উঁহু ! 

” তাহলে ছাড়ুন ! 

ইয়াশ থোরিই না ছাড়লো । মেয়েটার শরীরের ভার বয়ে শূন্যে ভাসালো তাকে । গ্রীবার নিকট নাক ডুবিয়ে বললো….

” টুকটুকি,, কাকে ভালোবাসো তুমি ? প্লিজ বলো ! কে সে ? 

” জানি না । 

” না বললে ছাড়বো না আজ । পাবে না রেহাই । 

গুমোট নীরবতা সেকেন্ড কয়েক । অতঃপর যুবকের নিয়ন্ত্রণ হীন বেসামাল কন্ঠ…..

” বলবে না ‌? আশকারা দিচ্ছো ? সো , আই নিড ইউ নাউ । ডোন্ট ওয়ারি,, আই উইশ বি জেন্টল । 

,,,,,,

সুইজারল্যান্ডে তখন দুপুর একটা । সবে লাঞ্চ হলো । আজ একটু তাড়াতাড়িই হয়েছে । 

রৌদ্র বেরোবে, তাই খাওয়া দাওয়ার পালা চুকিয়ে নেওয়া হলো । খাওয়ার পর রুমে গিয়ে রেডি হচ্ছে বেপরোয়া যুবক । মেঘা বসে বসে দেখছে তাকে । 

রৌদ্র রেডি হয়ে মেঘার সামনে আসলো । ঝুঁকে কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে বললো মিঠে কন্ঠে……

” আসছি সুইটহার্ট । সাবধানে থাকবে , ওকে ? 

” কখন আসবেন আপনি ? 

” উমমম, সন্ধ্যার আগেই চলে আসবো । 

” এতো দেরি ! 

” অফিসে ইম্পর্ট্যান্ট কাজ আছে, জান । লেট হবে একটু । আসলাম, ওকে ! 

রৌদ্র দরজার দিকে পা বাড়াতে গিয়ে ফিরে আসলো । মেঘা দাঁড়িয়ে গেছে । সে আচানক শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো রমনীকে । 

” লাভ ইউ ইভারা ! আজ তোমার সাথে কাউকে মিট করাবো । ফিরে আসি তারপর । 

মেঘা বেশ আগ্রহী হয়…..

” কাকে মিট করাবেন ! 

” সেটা দেখতেই পাবে । প্লিজ সানি, ভুল বুঝো না শুধু । আই জাস্ট লাভ ইউ । রৌদ্র শুধু তার রৌদ্রময়ীকেই ভালোবাসে । আর কাউকে না । এটা মনে রাখবে প্লিজ । আমি ভালোবাসি তোমায় । 

” আমি জানি তো । 

হঠাৎ ভুল বোঝাবুঝির কথা আসছে কোথা থেকে ? 

” তুমি তো আমাকে বোঝার চেয়েও ভুলটাকে বেশি বোঝো । অথচ আমার মাঝে ভুল নেই । খাদ নেই আমার ভালোবাসায় । আমাকে কখনো ভুল বুঝবে না প্লিজ । আজকের পর সব মিটে যাবে । আর কোনো গোপনতা থাকবে না । তোমাকে হারানোর ভয় থাকবে না । সন্ধ্যার পর ফিরে আসি আগে, ওকে । এর পর সব বলবো তোমায় । টেক কেয়ার জানেমান । আসছি…..

রৌদ্র মেঘাকে ছেড়ে পা বাড়ালো । মেঘা পিছু নিতে গেলেই টুং টাং আওয়াজে বেজে উঠলো তার মুঠো ফোন । চকিতে তাকালো সে । রৌদ্র বেরিয়ে গেছে ঘর থেকে । মেঘা পিছু নিলো না আর । বিছানার উপর থেকে ফোন হাতে নিতেই দেখলো , রুবিনা কাবির ভিডিও কল করেছেন । মুচকি হাসলো রমনী । কল রিসিভ করে কথা শুরু করলো । 

এদিকে নিচে নেমে বাইরের দিকে পা বাড়ায় বেপরোয়া যুবক । সদর মাড়াতেই আকস্মিক পা থমকায় তার । কেমন অস্বস্তি বোধ হয় হুট করেই । পা চলে না আর । সে ঝট করে ঘাড় ঘুরিয়ে উপরের দিকে তাকায় । মেঘা ব্যালকনিতে বেরোয়নি । ওদিকে গাড়ি অপেক্ষা করছে রৌদ্রের জন্য । অথচ যুবকের অন্তঃস্থলে আকস্মিক তান্ডব শুরু হয় । অস্থির লাগে তার । 

রৌদ্র চোখ নামিয়ে ঢোক গেলে । দুদিকে মাথা ঝাঁকিয়ে পা চালিয়ে গাড়িতে উঠে বসে । সিটে মাথা এলিয়ে চোখ বুজে নেয় । গাড়ি স্টার্ট হয় । গেটের বাইরে বের হতে না হতেই উদগ্রীবতা বাড়ে যুবকের । তীব্র উচাটন সৃষ্টি হয় ভেতর ঘরে । গাড়ির ঠান্ডা এসিতেও দড়দড় করে ঘাম ছোটে কপালের ধারে । বন্ধ চোখের সামনে ভেসে ওঠে দ্বাবিংশী রমনীর স্নিগ্ধ মুখাবয়ব । 

তড়াক করে চোখ মেলে সে । আদেশ ছোড়ে বজ্রকণ্ঠে…..

” হেয়য়য়, স্টপ দ্যা কার । 

গেইট পেরিয়ে কিছু দূর যাওয়া মাত্রই আদেশ মোতাবেক গাড়ি থামলো । রৌদ্র ছটফট করতে করতে নামলো গাড়ি থেকে । গলার টাই টেনে ঢিলে করতে করতে এলোমেলো কদমে ছুটলো বাড়ির দিকে । 

গেইট, অতঃপর সদর পেরিয়ে হাঁসফাঁস করে উঠতে লাগলো সিঁড়ি ডিঙিয়ে । যেনো দম ফুরিয়ে আসছে তার । বুকে শ্বাস নেই । ইনহেলার এর মতো এখন প্রয়োজন মেঘাকে । কোনো রকমে করিডোর ছাপিয়ে খোলা দরজা মাড়িয়ে ঘরের ভেতরে ঢুকেই উত্তেজিত হয়ে ডাকে বেপরোয়া যুবক……

” ইভারা । 

🛑 পরের পর্বে কি হবে 🙂? জানার জন্য, রেসপন্স করবেন বেশি বেশি ওক্কে ? 🛑

চলবে………..

– সবার আগে গল্প পেতে অবশ্যই পেজটি ফলো দিয়ে রাখুন –

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply