Golpo romantic golpo আসবো ফিরে আবারো

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৭৬


#আসবো_ফিরে_আবারো

#পর্ব_৭৬

#সুরভী_আক্তার

” আমার সাথে এসো মাহির । 

অগত্যা বাকিদের বিদায় করে আদেশ মোতাবেক রৌদ্রের পিছু নেয় মাহির । বিলাস বহুল এক ডুপ্লেক্স অ্যাপার্টমেন্ট । ঝকঝকে তকতকে কাঁচে আবৃত চারদিক থেকে । ভেতরে গেলে বোঝার জো নেই দিন কি রাত । এই রাতেও ঝিকঝিক করছে চার দিক থেকেই । 

গভীর ঘুমিয়েছে মেঘা । রৌদ্র ওকে ডাকলো না । নিজের জন্য বরাদ্দকৃত মাস্টার বেড রুমে নিয়ে গিয়ে আলগোছে শুইয়ে দিলো তুলতুলে বিছানায় । গায়ে পাতলা কম্ফোর্টার টেনে দিলো । ঝুঁকে ঠোঁট নামিয়ে উষ্ণ পরশ আঁকলো ঘুমন্ত রমনীর মসৃন ললাটের মধ্যমায় । 

গা ম্যাজ ম্যাজ করছে । বাড়তি কিছু না করেই রুমের ক্লজেট থেকে টাওয়েল বের করে ওয়াশ রুমে ঢুকলো । সে বরাবর লম্বা সময় ধরে শাওয়ার নেয় । আজও তাই । দীর্ঘক্ষণ পর বেরিয়ে কোনো রকমে টিশার্ট আর ট্রাউজার জড়ায় গায়ে । ঘর হতে বেরোনোর আগে আরো একবার ফিরে চায় বেডের পানে । মেয়েটা ভীষণ ক্লান্ত । মুখখানা শুকিয়ে গেছে । খায়ও নি তেমন কিছু । এখন ঘুমোচ্ছে । এই ভারী ঘুম থেকে ডাকা উচিত হবে না । 

রৌদ্র ফিরে এসে শব্দ করে আরো একটা চুম্বন আঁকে নিদ্রিতার কপালে । অতঃপর মুচকি হেসে পা বাড়ায় বাইরের দিকে । 

কি একটা ভেবে ফিরে চায় আবারো । নজর তীক্ষ্ণ তার । সে ব্যাকুল হয়ে তেড়ে আসলো । নিজেকে সংবরণ করতে ব্যর্থ হলো বেপরোয়া যুবক । 

এবারে শক্ত একটা চুম্বন বসালো রমনীর অধরের কোণে । অতঃপর নাকের ডগায়, আবারো আঁখি লতায় । 

শেষে মৃদু হাসলো । মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে এবারে নিজেকে ধাতস্থ করে বেরোলো রুম থেকে । নিচে লিভিং রুমে পায়ে পা তুলে বসে ফোন ঘাটছে মাহির । অপেক্ষায় আছে রৌদ্রের । 

রৌদ্র নিচে নেমে সোজা কিচেনের দিকে এগোয় । গলা বাড়িয়ে বলে…..

” কফি নেবে মাহির ? 

” নো বস । 

” বসো , আমি দু মিনিটে আসছি । 

কথা মোতাবেক সে ফিরে আসলো মিনিট তিনের মাথায় । দুহাতে দুটো কফির মগ । একটাতে চুমুক বসাতে বসাতে অন্যটা বাড়িয়ে দিলো মাহিরের দিকে…..

” উমমম, টেক ইট । 

মাহির দ্বিধা করে না । 

রৌদ্র বসে তার পাশে । শুধোয়…..

” কি অবস্থা এদিকের ? 

” সবটাই তো আপনার জানা আছে, বস । 

” হু , বাট মিনি ? 

” আপসেট ভীষণ । লোভ ধরিয়ে ধরিয়ে বাচ্চাটার মনে অনেক কিছু স্থাপন করে ফেলেছেন আপনারা । ও কিন্তু এক সময় কষ্ট পাবে । বাচ্চা তো , এখন বোঝে না । জানে না বাইরের দুনিয়া সম্পর্কে । যখন জানবে, বুঝবে, তখন ভেঙ্গে যাবে ওর নিষ্পাপ হৃদয়টা । 

রৌদ্র দীর্ঘ হাঁফ ছাড়ল । অনেক দেরি হয়ে গেছে । মিনিকে অনেক আশকারা দিয়ে ফেলেছে সে । মায়ার বাঁধনে জড়িয়ে গেছে । এ বাঁধন ছেড়া মুশকিল । 

” আই নো মাহির । অনেক বড় প্রবলেম ফেস করতে হবে এই নিয়ে । 

বাই দ্যা ওয়ে, তোমার উপর আরো একটা দায়িত্ব থাকবে এখন থেকে । 

” কি দায়িত্ব,বস ? 

” ইভারা কে দেখে রাখার । নজর রাখার । বাড়িতে সিসি ক্যামেরা আছে, এর বাইরেও ওর উপর খেয়াল রাখতে হবে । যতক্ষণ আমি থাকবো না ততক্ষণ । 

” কিন্তু কেনো ? 

রৌদ্র বুক ফুলিয়ে শ্বাস ফেললো । হেলান দিলো সোফায় । তর্জনী দিয়ে কপালের ধারে স্লাইড করে বললো দীর্ঘশ্বাসে….

” আই থিংক, ও ভয় পাচ্ছে । আন্দাজ করেছে কিছু একটা । অবান্তর সন্দেহ করছে আমায় নিয়ে । সেই সন্দেহের বশেই এসেছে আমার সাথে । 

” ম্যামের সন্দেহ অবান্তর নয় স্যার । স্বাভাবিক সন্দেহ করা । আপনি ম্যাম কেও কিছু বলছেন না । যদি পরবর্তীতে কোনো ঝামেলা বেঁধে যায় ? বোঝার চেষ্টা কেনো করছেন না আপনি ? এ বেলায় এতোটা কেয়ারলেস হচ্ছেন কি করে ? 

” আমি ইভারা কে অনেক আগেই সব বলতে চেয়েছিলাম মাহির । ভেবেছিলাম আমাদের মাঝে সব ঠিকঠাক হয়ে গেলে আর কিচ্ছু লুকাবো না ওর কাছে । সব খোলসা করে বলে দেবো । এমনিতেও আগে থেকে ও আমাকে ভুল বুঝতো । ভেবেছিলাম সব মিটিয়ে দেবো একেবারে । রিসা কে চেনে ও , বুঝিয়ে বললে ঠিক বুঝবে । 

কিন্তু আমাদের মাঝে যখন সব ঠিকঠাক হয়ে আসছিলো তখন বুঝলাম, ইভারা জ্বেলাস । সামান্য একটা তিন বছরের বাচ্চার উপরের হিংসে করে ও । তখনো আমাদের মাঝে সব মিটে যায় নি । 

আমি যদি ওকে বোঝানোর চেষ্টা করতাম, তাহলে ও তিলকে তাল করে আবারো ভুল বুঝতো আমায় । কেনো কেউ পাপা ডাকবে আমায় , আমি কেনো অন্যের সন্তান কে নিজের পরিচয় দেবো, এই নিয়ে হাজার প্রশ্ন তুলতো । স্বচোক্ষে না দেখলে আরো অবিশ্বাস করতো । ওকে মুখে বলে বোঝানোর মতো ভাষা পেতাম না । 

এসব ভাবতে গিয়ে ডিসিশন পাল্টালাম, ভাবলাম ওকে সোজা রিসার মুখোমুখি করবো ‌। তারপর সব বুঝিয়ে বলবো । 

কিন্তু না , মাঝে বাগড়া দিলো ইয়াশ । ইয়াশের কথায় ইভারার মনে অনেকটা ভুল ধারণা জন্মেছে । জানি না,, ও আমাকে নিয়ে এখন কি ভাবে । সব জানানোর পর কিভাবে ফেস করবো আমি ওকে ? যদি খুব বেশি ভুল ভেবে নেয় ? ও জেদি বড্ড । আমার ভয় হয় মাহির । ওকে হারানোর ভয় । আই কান্ট লিভ উইদাউট হার । 

রৌদ্রের কন্ঠ শেষের দিকে নিভে এসেছে । আহত হয়েছে মুখাবয়ব । মাহির তাকিয়ে থেকে মৃদু হাসলো । বললো আশ্বাস দিয়ে….

” তাহলে আর সময় নষ্ট করবেন না, বস । এখন যখন ম্যাম কে নিয়ে এসেই গেছেন, তখন তাকে সামনাসামনি সব বলে দেওয়া উচিত । আ’ম ড্যাম শিওর,, তিনি ভুল বুঝবেন না আপনাকে । 

” বলবো । তবে ছয় তারিখের পর । 

মাহির কপাল কুঁচকে ফেললো । 

” ছয় তারিখের পর কেনো ? 

” আমি চাই না ছয় তারিখের আগে অবধি ও বিষন্ন থাকুক । এর মধ্যে কোনো ঝামেলা হোক, আমি চাই না । এই কদিন ওকে সামলে রাখবো । খুশি রাখার চেষ্টা করবো । পরে বাকিসব । 

” কি আছে ছয় তারিখে ? 

রৌদ্র মুচকি হাসলো । দীপ্তি ফুটলো দৃষ্টিতে । আওড়ালো সে…..

” আছে অনেক কিছু । 

,,,,,,,

শিকদার বাড়ি সেজে উঠেছে বিয়ের আমেজে । 

রং বেরঙের ফেইরি লাইটে ঝিকঝিক করছে পুরো বাড়ি । বিশাল বড় করে আয়োজন করা হয়েছে বিয়ের । মেহমানে ভরপুর । সব মিলে চারদিক মুখোর উৎসবে । 

বর আসলো সন্ধ্যা নামতেই । সেই বিকেল থেকে সাজগোজ করে বসে আছে সারা । পড়েছে লাল টুকটুকে জামদানি শাড়ি । ভারী গহনায় ছিমছাম তনু আবৃত । মেয়েটা গহনার ভারে টলে পড়েছে এক প্রকার । 

মুখে হালকা মেকআপ । মাথায় ঘোমটা স্বরূপ ওরনা পাতলা পড়তের । সারা অমায়িক সুন্দর । আজ যেনো তার সৌন্দর্য বেড়েছে হাজার গুণ । বিয়ের সাজে পুরো টুকটুকে বউ লাগছে । 

তবে হাসি নেই তার ঠোঁটে । যেনো বিলিন হয়েছে উচ্ছ্বাস । মনমরা হয়ে এতক্ষণ ধরে ঘরে বসেছিলো সে । তবে বর আসার আভাস পেয়ে শুরু হয়ে গেছে দূরু দূরু অস্থিরতা । ব্যাকুল হচ্ছে হৃদয় । অপ্রস্তুত অনুভূতিতে হাঁসফাঁস করছে সে । সাথে কেউ নেই । বর আসতেই ওকে একলা ফেলে সবাই নেমেছে নিচে । 

আধা ঘন্টার মতো একলা বসে রইলো মেয়েটা । ফোনটাও সাথে নেই । ইভার কাছে ছিলো , কোথায় রেখেছে কে জানে । বসে থেকে আঁকুপাঁকু করছে সে । এর মাঝেই ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে নিচের পরিস্থিতি দেখার চেষ্টা করেছে একবার । ভিড়ভাট্টা ব্যাতীত নজরে আর তেমন কিছু পড়ে নি । আশাহত হয়ে আবার বিছানায় গিয়ে বসেছে । 

আরো কয়েক মিনিটের মধ্যে উতলা হয়ে ঘরে ঢুকলো সিরাত । হাতে তার ফোন । ভিডিও কলে যুক্ত মেঘা । 

সিরাত ছটফট করে আসে…..

” সারা,, তোকে একলা রেখে গেছে সবাই ? ইশশ্, আমি তো ভাবলাম কেউ একজন আছে বোধহয় তোর সাথে । এখন দেখি কেউ নেই । 

ঝটপট করে পাশে বসে একটু থেমে আবার বললো ব্যাতিব্যস্ত হয়ে…..

” জানিস, তোর বরকে দেখে আসলাম । হায় আল্লাহ, কি সুন্দর । পুরো রাজপুত্র । তোর মতো মিষ্টি একটা মেয়ের জন্য একদম পারফেক্ট সে । খুব মানাবে তোদের দুজনকে । 

সারা মলিন মুখে হাসি ফুটায় । চোখ নামিয়ে লজ্জার ভান ধরে । সিরাত থামলো না….

” বর পক্ষের সবাই এসে গেছেন । বিয়ে পড়ানো হবে কিছুক্ষণের মধ্যেই । তোকে নিতে এই আসলো বলে । 

পরে বিজি হয়ে যাবি ,, সময় পাবি না ওসব ঝঞ্ঝাটে । এখন ফ্রি আছিস, মেঘার সাথে কথা বলে নে একটু । ঐ মেয়েটা বারবার কল করে পাগল করে দিচ্ছে আমায় ‌। 

হাতের ফোনটা সারার দিকে বাড়িয়ে দিলো সিরাত । ফোনের স্ক্রিনে মেঘার হাস্যোজ্জ্বল মুখশ্রী জ্বলজ্বল করছে । সারা এক পলকেই ঝট করে দৃষ্টি সরালো । মুখ ফিরিয়ে অভিমানে বললো চড়া গলায়….

” আমি কারোর সাথে কথা বলবো না আপু । তুমিই বলো । 

তীব্র অভিমান রমনীর কন্ঠে । বেজায় ভার তার গলা । যেনো কান্না চেপে রেখেছে । চোখ ভিজে এসেছে । মেঘা বললো ফোনের ওপাশ থেকে…..

” আ’ম সরি সারা । ভীষণ সরি । প্লিজ রাগ করিস না । কাছে নেই তো কি হয়েছে ? এইতো আছি তোর সাথে । দূর থেকে হলেও আছি । প্লিজ অভিমান করে মুখ ফিরিয়ে নিস না । দেখি বউ সাজে কেমন লাগছে তোকে । তাকা আমার দিকে …..

সারা আরো বেশি করে মুখ ফিরিয়ে নেয় । 

টুপ করে পানি ঝড়ে গাল ছাপিয়ে । ছোট বেলা থেকে ওর বন্ধু কম । মেয়েটা চুপচাপ,, কম কথা বলে । তবে মিশুক । 

মেঘাই ওর একমাত্র বেস্ট ফ্রেন্ড ছিলো । আর কেউ ছিলো না । সাধারণ বন্ধু হিসেবেও না । সেই ছোট্ট কাল থেকেই মেঘার সঙ্গে চলে এসেছে । কলেজ লাইফও কেটেছে একসাথে । তবে ভার্সিটিতে এসে বিচ্ছিন্ন হয়েছে দুজন । সারা পাবলিকে, আর মেঘা প্রাইভেটে । 

সেই থেকে একটু দূরত্ব বেড়েছে দুজনার । সারা ব্যাতীত মেঘার জীবনে আরো অনেক বন্ধু থাকলেও , মেঘা ব্যতীত সারার জীবনে কেউ ছিলো না । 

আর আজ , সারার জীবনের এই উৎকৃষ্ট দিনটাতেই কিনা মেঘা নেই ওর সাথে । কথা ছিলো থাকবে । 

মেয়েটা ফাঁকি দিলো ওকে । না বলে কয়ে চলে গেলো । 

সারার রাগ বা অভিমান করা স্বাভাবিক । 

সে কেঁদেও ফেলে । এতক্ষণ ধাতস্থ করেছে নিজেকে । বড্ড একা সে । এই মুহূর্তটাতে মেঘা কে প্রয়োজন ছিলো তার । 

মেঘা আহ্লাদী সুরে ডাকে…..

” সারাআআ,,, প্লিজ । আ’ম সরি । তাকা আমার দিকে । কথা বলবি না । বিয়ে হওয়ার আগেই ভুলে গেলি আমায় । 

সারা তাকালো এবারে । চোখ মুছে হেসে বললো…..

” আমি কাউকে ভুলি না মেঘা, উল্টে সবাই আমাকেই ভুলে যায় । একেবারে মনেই রাখে না কেউ কেউ । আমি তাদের হিসেবের খাতার বাইরে । এমনকি তোর ও ! 

” না সারা,, আই লাভ ইউ ইয়ার । তুই আমার বেস্ট ফ্রেন্ড । তোকে ভুলবো কি করে ? এভাবে হুট করে চলে আসার জন্য ক্ষমা করে দে প্লিজ । আমি থাকতে চেয়েছিলাম তোর সাথে । কিন্তু পারলাম না । বাধ্য হয়েছি আসতে । প্লিজ সারা, আমাকে ভুল বুঝিস না । 

সারা তাকালো ফোনের দিকে । ফোন খানা হাতে নিয়ে মুখোমুখি ধরলো । ভেজা চোখ সমেত স্বভাব সুলভ মুচকি হাসলো । 

” ইটস্ ওকে । কি করছিস ? রৌদ্র ভাইয়া কোথায় ? আর আমাকে কেমন লাগছে বল ? 

” পুরো পরী । একদম আমার কুইন । কারোর নজর না লাগুক । আফসোস হচ্ছে, বউ সাজে তোকে সামনাসামনি দেখতে পারলাম না । তোর হাসবেন্ড কেও দেখলাম ফোনে । তুই আগে না দেখে মিস করে ফেলেছিস ! খুব সুন্দর উনি । লুক লাইক জেন্টালম্যান । তোর সাথে খুব খুব সুন্দর মানাবে । বলেছিলাম না তুই সুখি হবি । দেখবি, খুব সুখি হবি । আই উইশ, তিনি তোকে খুব বেশি ভালোবাসুক । 

সারা লাজুক হাসে । বেশি কথা বলতে পারে না । তার আগেই ডাক পড়ে দরজার ওপারে । 

বেশ কতগুলো কন্ঠ ভেসে আসছে । সারা কে বাইরে নিয়ে যাওয়া হবে এখন । গার্ডেনে বিয়ের সব আয়োজন চলছে । সারা আর কথা বাড়াতে পারলো না । 

কয়েক জন মেয়ে এসে বাইরে নিয়ে গেলো ওকে । সিরাত ও ব্যস্ত হয়ে পড়লো । 

ফোন কাটলো মেঘা । সে এখনো বসে আছে বিছানায় ।দুপুর হয়ে গেছে সেখানে । সকালে ঘুম থেকে উঠে ব্রেকফাস্ট সেরে আবার ঘুমিয়েছিল একবিংশী । উঠলো এই কেবল । এলোমেলো তার অবস্থা । ফোলা ফোলা চোখ মুখ । রৌদ্রকে দেখলো না ঘুম থেকে ওঠার পর । অবশ্য সেই লোক বলেছিলো, বারোটার পর অফিসে বেরোবেন তিনি । হয়তো সেখানেই বেরিয়ে গেছেন । যাওয়ার আগে মেঘা কে ডাকা বা বলার প্রয়োজন বোধ করেন নি । 

আবারো দীর্ঘ শ্বাস ফেললো মেঘা । কেমন আনচান লাগছে তার । রৌদ্রের সাথে কিছুতেই স্বাভাবিক হতে পারছে না । ওদিকে ওকে প্রিন্সেট ট্রিট করছে রৌদ্র । সকালে ব্রেকফাস্টের টেবিলে হুলস্থুল বাঁধিয়ে দিয়েছিলো । এ বাড়িতে ছয়জন মেইড আছেন । মেঘা সকালে দেখেছে তাদেরকে । কথা হয় নি সেভাবে । তারাও বেশ অবাক লোচনে চেয়ে ছিলো মেঘার পানে । 

সেসব মনে পড়তেই তড়িঘড়ি করে ঘর থেকে বেরোলো মেঘা । অ্যাপার্টমেন্টের কিছুই তার চেনা নয়, তবে কিছুটা পরিচিত । ভিডিও কলে রৌদ্র ঠিক যেমনটা দেখিয়েছিলো, ঠিক তেমনটাই । 

মেঘা সিঁড়ি ধরে নিচে নামে । তাকায় এপাশ ওপাশ । মেঘা কে দেখেই একজন মেইড দড়দড় করে এগিয়ে আসলেন । খাঁটি বাংলা ভাষায় শুধোলেন…..

” উঠে পড়েছেন ম্যাম ? কিছু লাগবে আপনার ? আপনি নিচে নামতে গেলেন কেনো ? আমাদের ডাকলেই পারতেন । 

আকস্মিক তড়তড়ে গলায় চমকে উঠলো মেঘা । হকচকিয়ে পিছিয়ে গেলো । তাকালো সেই মধ্য বয়স্কা মহিলার পানে । বেশ বিনয়ী তিনি । 

আবার বললেন….

” বলুন ম্যাম, কি লাগবে ? 

ততক্ষণে বাকি পাঁচ জন এসে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়েছেন 

মেঘা তাজ্জব বনে যায় । সবাইকে এক ঝলক করে দেখে বলে অবিশ্বাস্য কন্ঠে….

” আপনি বাংলা জানেন ? 

” ইয়েস ম্যাম । আমরা সবাই বাংলা জানি । আপনার কোনো অসুবিধা হচ্ছে,, কি লাগবে বলুন ? 

” কিছু লাগবে না ? রৌদ্র কোথায় ? 

মেঘার মুখে সোজাসুজি রৌদ্রের নাম শুনে একে অপরের দিকে তাকালেন সবাই । একজন মুখ খুললেন দোনামোনা করে…..

” স্যার তো অফিসে বেরিয়ে গেছেন । আপনি ঘুমোচ্ছিলেন, তাই ডিস্টার্ব করে নি । তবে বলে গেছে, যেনো আপনার কোনো কিছুতে অসুবিধা না হয় । 

” অফিস কোথায় আপনাদের স্যারের ? 

” এইতো, হাঁটার পথে পাঁচ মিনিট । খুব কাছেই । 

” কি করেন আপনাদের স্যার ? 

মহিলা বোধহয় মজা পেলেন এহেন প্রশ্নে । বললেন অবাক হয়ে…..

” সে কি ম্যাম, আপনি জানেন না ? 

” জানতেই তো চাইছি, বলুন শুনি ! 

মেঘার কন্ঠ শক্ত । মুখো ভঙ্গিমায় আধিপত্য । দুহাত আড়াআড়ি ভাবে গোটানো বুকে । 

ভদ্রমহিলা চুপসে গিয়ে বললেন…..

” জুরিখের পাশাপাশি সুইজারল্যান্ডের সবচেয়ে বড় বিজনেস ইন্ডাস্ট্রি,, লোমাত ইন্ডাস্ট্রির সিইও আপনার হাসবেন্ড । জুরিখ সহ সুইজারল্যান্ডের আরো দুই শহরে লোমাত ইন্ডাস্ট্রির শাখা রয়েছে । সব রৌদ্র স্যারের দখলে । তিনিই সামলান । সুইজারল্যান্ডের অন অফ দা মোস্ট রিনোয়েড বিজনেস ম্যান রুডভিক কাবির রৌদ্র । এখানে সবাই এক নামে চেনে তাকে । এক্সপোর্টের জন্য আদার্স কান্ট্রিতেও অনেক নাম ডাক আছে লোমাত ইন্ডাস্ট্রির । কেনো ম্যাম, আপনি জানেন না ? আপনার হাসবেন্ড এতো বড় মাপের একজন বিজনেস ম্যান । সবকিছু তার নখদর্পণে । তবে তিনি রাগী অনেক । আপনার যা যা প্রয়োজন পড়বে, প্লিজ আমাদের বলবেন ম্যাম । আমরা সব খেয়াল রাখবো । তবুও স্যারের কাছে আমাদের ত্রুটি তুলে ধরবেন না । উনি রেগে যাবেন নয়তো । আপনি এখন রুমে যান, যা যা লাগবে , আমরা সব নিয়ে আসবো । 

মেঘা যেনো ক্ষণকালের ব্যবধানে থমকে গেলো । আকাশ থেকে পড়ার মত অবস্থা তার । চোখ জোড়া বিষ্ময়ে গোলাকৃতি ধারন করেছে । গোটানো হাত জোড়া ছলকে নেমে এলো । মুখ ফাঁক করে অস্ফুটে বুলি আওড়ালো….

” রৌদ্র কে ? ক…কি করে বললেন ? 

” স্যারের তো অনেক কাজ । আমরা অতো কিছু বুঝি না । শুধু জানি এটুকুই । 

মেঘা থতমত খেয়ে যায় । গলায় জড়িয়ে যায় কথারা । সে চোখ নামিয়ে ঘন পলক ঝাপটায় । কি সব শুনছে এসব ? রৌদ্র তো জব করে এখানে , তাহলে এসব কি ? 

রমনী নির্বাক হয়ে যায় । ঠোঁট ভিজিয়ে সময় নিয়ে শুধোয়….

” আপনাদের স্যার, এখানেই থাকেন ? 

” ইয়েস ম্যাম ,,, অফিসে থাকেন বেশিরভাগ সময় । রাত টুকু এখানেই থাকেন । 

” আর‌ কে থাকে ? 

” মাহির স্যার মাঝে মাঝে থাকেন স্যারের সাথে ! 

” স্যার কোথায় কোথায় যায় ? 

” সেটা তো বলতে পারবো না ম্যাম । আমরা কেবলই এই পেন্ট হাউসের কেয়ার টেকার । আর স্যারের ও । স্যার এখানে থাকলে তার দেখভাল করি কেবলই । আমরা দুজন ছিলাম । আপনি আসার পর স্যার বাকি চারজন হায়ার করেছেন । 

” ওওওও ! 

মেঘা হিসেব মেলাতে পারছে না । গুলিয়ে যাচ্ছে সব । বাকি ছয়জন একে অপরের দিকে তাকাচ্ছেন বারবার । কেমন সূচালো দৃষ্টিতে একবিংশীকে আগাগোড়া পরখ করছেন । নতুন চার জনের মধ্যে একজন আগ্রহ দমিয়ে রাখতে না পেরে প্রশ্ন করে বসলেন……

” ম্যাম,,, আপনি বোধহয় স্যারের বিষয়ে জানেন না তেমন কিছু ! নতুন বিয়ে হয়েছে ? 

মেঘা চকিতে চায় । নিজেকে সামলে উত্তর করার আগেই,, এতক্ষণ ধরে কথা বলে আসা ভদ্রমহিলা উত্তর করলেন…..

” না ,,, স্যার আর ম্যামের বিয়ে অনেক আগেই হয়েছে । ছয় বছর হতে চললো প্রায় । তোমাকে ওসব কেউ ভাবতে বলেনি । সাহস তো কম নয় , ম্যামকে প্রশ্ন করছো তুমি ? যাও নিজের কাজে । 

তার দাপুটে স্বর । চুপসে গিয়ে মাথা নত করে সরে আসলেন বাকিরা । 

মেঘা মুচকি হাসে । সিঁড়ির পথে পা বাড়াতে বাড়াতে রৌদ্রের কথা মনে পড়ে তার । ক্ষণিকেই যেনো সব অভিমান গলে জল হয় । 

,,,,, 

বিয়ে পড়ানো হবে । সেই কখন থেকে সারা কে কবুল বলতে বলা হচ্ছে । মেয়েটা সেই যে বসেছে পাথরের মতো , নড়ছেও না । আর না ঠোঁট নাড়িয়ে বলছে তিন অক্ষর । 

ওকে স্টেজে উঠিয়ে বসানো হয়েছে অনেকক্ষণ হলো । পাশেই বোধহয় ওর হবু স্বামী । তবে দুজনের মাঝখানে দূরত্ব আছে কিছুটা । মাঝামাঝি তাজা ফুলের ভারী গালিচা । এপাশ থেকে ওপাশ দেখা মুশকিল । 

সারার মাথায় আরো একটা পাতলা পরতের ওরনা টেনে দেওয়া হয়েছে । ঢেকে দেওয়া হয়েছে গলা অবধি । 

ওরনার আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে রমনীর দগ্ধ ব্যাথায় জর্জরিত মুখখানা । 

চোখ থেকে বারি ধারা নেমেছে অব্যাহতি হীন । গাল ভিজে জবজবে । ঘেঁটে গেছে চোখের টানা কাজল । 

বারবার তাকে কবুল বলতে বলা হচ্ছে । মেয়েটা শাড়ি খামচে শক্ত হয়ে বসে আছে । জবানে ফুটছে না কথা । শ্বাস আসছে রুদ্ধ হয়ে । 

চারদিকে শোরগোল । রেহানা শিকদার ইতোমধ্যে কাঁদতে কাঁদতে হয়রান । তিনি আশেপাশে নেই কোথাও । সারার কাছে থাকা উচিত কেউ একজন । সিরাত আছে পাশে । তবুও কাজ হচ্ছে না । রুবিনা কাবির পরিস্থিতি বুঝে এগোলেন । মিহি কন্ঠে বললেন সারার কাঁধে হাত রেখে….

” কি হয়েছে মা । মৌলভী সাহেব কি বলছে শুনছিস না ? কি বলতে বলছে বল , সবাই অপেক্ষা করছে তো । বেশি সময় নষ্ট করতে নেই, বাজে বলবে লোকে । বল জলদি….

সারা আর পারে না । আকস্মিকই ফুঁপিয়ে ওঠে শব্দ করে । হুঁ হুঁ করে কাঁপে তার অন্তরাত্মা । 

কি জন্য, তা কেউ আন্দাজও করতে পারলো না । 

রুবিনা কাবির জড়িয়ে নিলেন ওকে । পিঠে হাত বুলিয়ে শান্তনা দিলেন । 

সারা চোখ নিভিয়ে নেয় । অবাধ্য কিছু স্মৃতি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে উপস্থিত মুহুর্তে । চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করে তার । সে শক্ত করে জাপটে ধরে রুবিনা কাবির কে । মনে মনে আওড়ায়…..

” আপনি আমার হলেও পারতেন ইয়াশ ভাইয়া । কিন্তু হলেন না । এ কেমন যন্ত্রণা, যেখানে আপনি অন্য কারোর । আর আজ হতে আমিও । অথচ স্বপ্ন দেখেছিলাম আমরা একে অপরের হবো । খুব অনর্থ হয়ে যেতো কি আপনি আমার হলে ? আমি অন্তত আজ কাঁদতাম না আপনাকে পেয়ে গেলে । আপনি আমাকে বুঝলেন না ইয়াশ ভাইয়া । বুঝলেন না । 

মেয়েটা ছাড়লো । কান্না গিললো । সে শক্ত যথেষ্ট । 

আর বিলম্ব করলো না । গাল মুছে কাঙ্ক্ষিত তিন শব্দ গড়গড়িয়ে উচ্চারণ করে ফেললো চোখ বন্ধ করে । 

অগত্যা চারদিকে সবার কন্ঠে সমস্বরে ধ্বনিত হলো….

“ আলহামদুলিল্লাহ । 

ব্যস হয়ে গেলো বিয়ে । সারা আবদ্ধ হলো বিবাহ বন্ধনে । জুড়ে গেলো কারোর সাথে । অতীত হলো সব স্মৃতি । কোনো কিছুই আর সত্য হবে না । অযথা কষ্ট পেয়ে লাভ নেই । সারা জেদ ধরেছিলো,, সে সব স্মৃতি ভুলতে বিয়ের পথ বেছে নেবে । আর সেটাই করলো । হলো তার বিয়ে । তবে কার সাথে, তা এখনো অবধি জানে না সে । দেখেনি তাকে । কবুল বলার পর‌পরই পাথরের ন্যায় জমে গেছে মেয়েটা । শান্ত স্থির হয়ে বসে আছে । 

হইহই শুরু হয়েছে আশপাশে । দুজনের মাঝখানে অসংখ্য ফুল দিয়ে তৈরি দেয়াল । 

ওপাড় থেকে লোকটা বোধহয় এপাড়ে আসবেন এবার । বলাবলি হচ্ছে তাই । সারা এক হাত দিয়ে অন্য হাত খামচে ধরে । ঘোমটা নামানো তখনো । দৃষ্টি নিচু । সেভাবেই লক্ষ্য করলো , ফুলের দেয়াল পেরিয়ে এপাড়ে এসেছেন লোকটা । দেখা যাচ্ছে তার পা । পেছন থেকে একটা মেয়েলি কন্ঠ..

” ভাইয়া, অনেক হয়েছে । আর কত ধৈর্য ধরবে ? এবার ভাবীর ঘোমটা সরাও । দেখো তার চাঁদ মুখখানা । আমরাও দেখি তোমার রিয়াকশন ।

হো হো করে হাসির রোল পড়ে সবার মাঝে । সারা মিইয়ে যায় এমন কথায় । আরো সিটিয়ে বসে চোখ খিচে নেয় । অনুভব করে, তার পাশে খুব কাছ ঘেঁষে কেউ বসলো । গলা ঝাড়লো শব্দ করে । আভাস দিলো পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে । পুরো বিয়ে বাড়ির সবার নজর এখন তাদের দিকে । মেইন ফোকাসে ওরা । 

লোকটা ধীরে হাত বাড়িয়ে দেয় । কেমন শিউরে ওঠে রমনী । দম বন্ধ করে চোখ খিচে নেয় । 

লোকটা ঘোমটা সরিয়ে নিজের দুহাতের আজলে রমনীর মুখশ্রী আগলে ধরেছে । তাহার এমন স্পর্শে আরো বেশি জমে যায় মেয়েটা । শিরশির করে ওঠে পায়ের তলা । কানে আসে লোকটার স্বর…..

” মাশাআল্লাহ ! 

মিনিটের মাথায় কপালে কারো ঠোঁটের উষ্ণ পরশ অনুভব করে সারা । একটা নয়, পরপর চারটে চুম্বন স্থায়ী হলো তার মসৃন কপালে । সারা চমকে তাকায় তড়াক করে । মুহুর্তেই একজন সুদর্শন যুবকের নিখাদ ভালোবাসা পূর্ণ দৃষ্টির সাথে দৃষ্টি মিলে যায় তার ।

লোকটা তাৎক্ষণিক মুচকি হাসে,,, সবাইকে শুনিয়ে বলে হীম শীতল কন্ঠে….

” আমার এই শূন্য জীবনে আপনাকে স্বাগত জানাই ম্যাডাম । আজ হতে আপনাতে পূর্ণ হলাম আমি । থ্যাংকস ফর কামিং ইনটু মাই লাইফ । এগেইন ওয়েল কাম । 

শেষের তিন শব্দের বাক্য টুকু ফিসফিসিয়ে বললো । অতঃপর পঞ্চম চুমু আঁকলো রমনীর কপালে । আশপাশের সবাই ঠোঁট টিপে হাসে ছেলেটার এমন কান্ডে । কেউ কেউ গলা খাঁকারি দেয় । থোরিই না পাত্তা দেয় যুবক । সে নিগুড় লোচনে চেয়ে রয় বউ সাজে সজ্জিত রমনীর পানে । মেয়েটা তখনো তাজ্জব পুরো । আশপাশে ধ্যান নেই । দৃষ্টিতে ঘোর । অবিশ্বাস এক রাশ । কে এই লোক ? সে তো চেনে না, দেখেনি । তবে সুদর্শন বড্ড । চোখে লাগার মতো । হাসি টুকু ভীষণ আকর্ষণীয় । তার উপর, তার এমন অপ্রত্যাশিত কান্ডে হকচকিয়ে সব ভুলে বসেছে সারা । খুইয়েছে ধ্যান জ্ঞান । আহম্মকের মতো নিষ্পলক চেয়ে আছে এখনো । সে মনে করার চেষ্টা করলো লোকটার নাম । শুনেছিলো কবার । মনে পড়তেই বিড়বিড় করলো নিজের মাঝে…..

” #ওয়াদিন_জোহান ? 

তার বিড়বিড়ানো কানে পৌঁছায় জোহানের । খুব কাছেই ছিলো সে । নিদারুণ হেসে প্রত্যুত্তর করলো তৎক্ষণাৎ……

” বলুন সারা । 

মেয়েটার সম্বিত ফেরে এতক্ষণে । ভ্যাবাচ্যাকা খায় । দ্রুত চোখ নামায় । খামচে ধরে শাড়ির আঁচল । আশপাশের কোলাহল কানে বাজে । ভেঙ্গাচ্ছে সকলে । টিটকারী মারছে । অত্যাধিক লাজে রাঙা হয়ে ওঠে নাজুক রমনী । চিবুক মেশায় গলায় । কেমন নির্লজ্জের মতো চেয়ে ছিলো, ভাবতেই গরম হয়ে আসলো কান দুটো । একটু আগেও যে হৃদয়ে হাহাকার ছিলো , এখন নিমিষেই যেনো তা উবে গেলো । হীম হয়ে আসলো বক্ষস্থল । 

অভাবনীয় প্রশান্তি পেলো রমনী । অদ্ভুত লাগলো তার । 

ফটোগ্রাফার ছবি তোলার জন্য মুখিয়ে আছেন । বর কনের পাশাপাশি ছবি তোলা হবে । তিনি চেঁচিয়ে বললেন ক্যামেরা ফোকাসে নিয়ে….

” ম্যাম,,, মাথা তুলুন একটু । ছবি তুলবো । স্মাইল প্লিজ….

সারা ধীরে মাথা তুললো । চোরা চোখে তাকালো পাশে । ছবি ক্লিক করার আগেই বাঁধা দিলো জোহান । সারার দিকে মাথা নামিয়ে ঝুঁকে বললো…..

” দেখি সারা, আমার দিকে তাকান ।

মেয়েটা তাকায় অপ্রস্তুত হয়েও । ছেলেটার চোখ সরু । সে বীনা সংকোচে হাত বাড়িয়ে দিলো । বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে খুব আলগোছে রমনীর ভেজা চোখের কার্নিশের ঘেঁটে যাওয়া কাজল মুছিয়ে দিতে দিতে বললো চমৎকার কন্ঠে….

” ইশশ্, কি অবস্থা করেছেন নিজের ? এভাবে কেউ কাঁদে, পাগল ! কাজল ঘেঁটে গেছে তো চোখের । 

সারা চমকায় পদে পদে । মূর্ত হয়ে তাকিয়ে রয় । সে তাকে চেনেও না, আগে কথাও হয়নি, অথচ লোকটা কি সুন্দর করে মানিয়ে নিচ্ছে । নিজ হাতে গুছিয়ে নিচ্ছে মেয়েটাকে । মাথা তুলে আপ্লুত হয়ে চেয়ে রয় রমনী । জোহান তার এমন অবাক চাহনি দেখে মুচকি হেসে কন্ঠ খাদে নামিয়ে বলে…..

” আমাকে পড়ে দেখবেন, দেখার জন্য পুরো জীবনটা পড়ে আছে । এখন আপাতত ক্যামেরার দিকে তাকান । 

মেয়েটা থতমত খেলো । তড়িঘড়ি করে দৃষ্টি নামালো কুন্ঠায় । 

,,,,,,, 

রৌদ্র অ্যাপার্টমেন্টে ফেরে পাঁচ টার দিকে । 

প্রজেক্ট নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিটিং ছিলো উইন্টারথারে । রৌদ্রের অনুপস্থিতিতে এতদিন আটকে ছিলো সেই প্রজেক্টের কাজ । কাল ফিরতে না ফিরতেই আজ প্রজেক্টের ডিল ডান হয়ে গেছে । 

মিটিংয়ের আগে সর্বপ্রথম মিনির কাছে গেছিলো সে । দীর্ঘ এক মনমালিন্য ঘুচলো বাচ্চা টার সাথে । অতঃপর কাজ সেরে বাড়ি ফিরলো এখন । 

লিভিং রুমের সোফায় পায়ে পা তুলে বসে পপকর্ন খেতে খেতে টিভি দেখছে মেঘা । বোরিং ফিল করেনি এক মুহুর্তও ।  বাকিরা বেশ সঙ্গ দিয়েছে ওকে । কথায় কথায় সময় কেটে গেছে । ভাগ্যিস তারা বাংলা জানেন । তবে বাংলাদেশী নন । ইন্ডিয়ান তিনজন । বাকিরা স্থানীয় । পুরোটা সময় রৌদ্র কে নিয়ে কথা হয়েছে । 

যদিও তারা মেঘার তুলনায় বয়সে অনেক অনেক বড় । চেহারায় আধুনিকতা থাকলেও মধ্য বয়স্কা সকলেই । তবুও মেঘা বেশ কমফোর্ট ফিল করেছে তাদের সাথে । গল্পে গল্পে একসাথে বসে টিভি দেখছিলেন সবে মিলে । 

রৌদ্র আসলো তখন । আভাস না দিয়ে পাসওয়ার্ড টাইপ করে নিঃশব্দে দরজা খুলে বাড়িতে ঢোকে সে । পা টিপে টিপে এগোয় । রমনী পিঠ ফিরিয়ে বসা । 

বাকিরা রৌদ্রকে লক্ষ্য করা মাত্রই উঠে দাঁড়ালেন । দৃষ্টি নত করে একে একে প্রস্থান করলেন । 

মেঘা আপনমনে বসে, দৃষ্টি টিভির পর্দায় । হরর মুভি দেখছে । রমনীর দৃষ্টি জোড়া গোল, ভয়ার্ত । সিন চলছে ভয়ানক । ক্ষণে ক্ষণে ঢোক গিলছে একবিংশী । শিউরে দাঁড়িয়ে গেছে লোমকূপ । 

রৌদ্র পেছন থেকে ওর অবস্থা বুঝে ঠোঁট টিপে হাসলো । ঝুঁকে রমনীর কাঁধ ছাপিয়ে কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করলো…..

” সুইটহার্ট !!

মেঘা চমকায় বিভৎস । ধড়ফড়িয়ে লাফিয়ে ওঠে সোফার উপর । চেঁচিয়ে ওঠে বিকট আওয়াজে । দুকান চেপে ধরে চোখ খিচে বন্ধ করে । তাৎক্ষণিক ওর কোমর পেঁচিয়ে ধরে রৌদ্র । একটু নড়চড় হতেই পা পিছলে মেঝেতে পড়তো ধপ করে । 

রৌদ্র ওকে আগলে নিয়ে সামলালো…..

” হেয়য়য় সানি ,,, ইটস্ মি । কাম ডাউন…..

ঝট করে চোখ খুললো মেঘা । রৌদ্র কে দেখে হাঁসফাঁস করে উঠলো । কানের কাছে উষ্ণ ধোঁয়া পেতেই কলিজা শুকিয়ে গেছিলো এক মুহুর্তেই । 

সে কাঁপছে তিরতির করে । সেভাবেই দুহাতে জাপটে ধরলো বেপরোয়া যুবককে……

” ইউ রাইনো,,, আপনি খুব খারাপ । 

” ভয় পেয়েছো ? সরি জান । দেখি, শান্ত হও । আমিই তো । 

মেঘা ওষ্ঠ উল্টে ছাড়লো ওকে । দৃষ্টি পেছনে পড়তেই ভ্যাবাচ্যাকা খেলো । রৌদ্রের ঠিক পেছনে মাহির দাঁড়িয়ে । মেঘার সাথে চোখাচোখি হতেই ফিক করে হাসলো যুবক । তড়িঘড়ি করে পিছিয়ে আসলো মেঘা । জড়তায় দৃষ্টি নামিয়ে জিভে কামড় বসালো । 

মেঘার অবস্থা বুঝে পেছনে তাকায় রৌদ্র । মাহির প্রস্থান করে তৎক্ষণাৎ । রৌদ্র ঘুরে এসে সোফায় বসে । মেঘা কে টেনে পাশে বসায় । খুব কাছে টেনে রমনীর খোলা অবিন্যস্ত চুলে নাক ডুবিয়ে বলে হাস্কি টোনে…..

” সরি সুইটহার্ট, কাজ ছিলো । বোর ফিল করেছো ? ফোন করেছি কতবার ? দেখোনি ? ধরছিলে না কেনো ? 

” ফোন রুমে,, দেখিনি । 

” উমম,, 

” কোথায় গেছিলেন ? 

” পাশের শহরে । 

” বিজি ভীষণ ? 

” আজকের পর আর থাকবো না । 

মেঘা ঠোঁট ফাঁক করে বললো । 

” সরুন, কেউ দেখে ফেলবে ! 

” দেখুক । 

” আচ্ছা এখন আপনার ফোনটা দিন । সারার বিয়ে আজ , সে খেয়াল আছে ? মেয়েটা আপনার কথা জিজ্ঞেস করছিলো তখন । একবার ফোন করি ! 

রৌদ্র মাথা তুলে সরে আসলো । সময় দেখে কপাল গুটিয়ে বললো…..

” অনেক রাত হয়ে গেছে ওখানে । আই থিংক ওরা এখন বাসর ঘরে । 

মেঘা চোখ পাকায়…

” অসভ্য লোক,,, আপনার বোন হয় ও । 

” সো হোয়াট সভ্য মেয়ে ? ভুল কি বললাম ? এতো রাতে ওদের ডিস্টার্ব করা ঠিক হবে না । 

একবিংশী চোখ রাঙিয়ে ফোঁস করে শ্বাস ফেললো । 

হার মেনে কথা বাড়ালো না । আসলেই রাত হয়ে গেছে দেশে । 

,,,,,,,

বিছানার উপর হাঁটু জড়িয়ে বসে আছে সারা । 

বাজে রাত্রি প্রায় বারোটা । 

এ বাড়িতে এসেছে থেকেই একটা মেয়ে পকর পকর করে মাথা খাচ্ছে । সেই কখন ওকে ঘরে রেখে গেছে জোহানের মা #জহরা_বেগম । বিয়ের ভারী সাজগোজ,শাড়ি পাল্টে পাতলা একটা সুতির শাড়ি পড়ানো হয়েছে সারাকে । জহরা বেগম নিজে খুব যত্ন নিয়ে তার বউমাকে শাড়ি পড়িয়ে দিয়েছেন । ভদ্রমহিলা নরম স্বভাবের । বেশ শান্ত । সারার সাথে কথা বলেছেন অনেক । সারা তাকে বিয়ের আগেও চার বার দেখেছে । 

এখন ঘরে ওর সাথে যে মেয়েটা বকবক করছে , সেটা জোহানের মামাতো বোন । মেয়েটার বয়স হবে ষোলো-সতেরো । নাম রিয়া । 

বড্ড বাচাল । সেই থেকে কথা বলেই যাচ্ছে । 

এদিকে সারার মাথা ধরে গেছে পুরো । বসে থাকতেও পারছে না আর । ঘাড়, কোমর লেগে এসেছে পুরো । খিদেও পেয়েছে । মেয়েটা পেট চেপে ধরে জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে বিছানার উপর । 

দরজায় শব্দ হলো, সাথে পূরু কন্ঠে গলা ঝাড়ি দিলো কেউ । ছটফটিয়ে উঠলো রিয়া…..

” ভাইয়া,,, এসে গেছো ? 

” হ্যাঁ,, এসে গেছি । এবার তুই যা । বকবক করে মাথা খাচ্ছিস ওর ? এতো জোরে কথা বলে কেউ ? পুরো ঘর মাথায় তুলে ফেলেছিস । বের হ ঘর‌ থেকে । 

রিয়া কাঁচুমাচু করে ফেললো মুখখানা…..

” তোমার বউকে কম্পানি দিচ্ছি, তো হচ্ছে না ? উল্টে বকছো আমায় ? থাকো তুমি তোমার বউয়ের কাছে । আমি গেলাম । গুড নাইট ভাবি । 

সারা জোর পূর্বক হাসে । 

বেরিয়ে যায় রিয়া । জোহান আলতো হাতে দরজা লাগিয়ে এগিয়ে আসলো । বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে মৃদু হাসলো কুন্ঠিত রমনীর গুটানো তন্বী দেখে । মুখোমুখি হয়ে বসলো আলগোছে । দ্বিধায় মুখ নামিয়ে নিয়েছে মেয়েটা । 

তাকে সূক্ষ্ম, সূচালো দৃষ্টিতে পরখ করে ওষ্ঠপূটের হাসি প্রসারিত করে জোহান । ডেকে বলে অদ্ভুত ভাবে……

” সারা, আপনি কি লজ্জা পাচ্ছেন ? 

🛑 নতুন কেউ এসেছে । যারা ভেবেছিলেন সারার সাথে সায়ানের বিয়ে হবে, তাদের জন্য কেবলই সমবেদনা । কেননা, আপনাদের চিন্তা টার কোনো যৌক্তিকতা পেলাম না । মানে, ওরা দুইজন এক পাক্ষিক ভাবে ভালোবেসে এসেছে বলে ওদের দুজনের মিল হবে ? ডিপলি ভেবে দেখুন তো , এটা কেমন না ? ঘটনা প্রবাহের সাথে কোনো দিক থেকেই খাপ খায় না । তো সেই চিন্তা বাদ দিয়ে নতুন কাউকে স্বাগত জানান । 

চলবে………….

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply