#আলতো_ছোঁয়ায়_সমুদ্রকথন___(২৭)
#নুসরাত_সুলতানা_সেঁজুতি
গ্রামের নাম চরনন্দী(ছদ্মনাম)।
আর শীতকালেই এই গ্রাম তার সৌন্দর্যের ডালা মেলে বসে। চারদিকে নতুন সবজি আর খেজুর রসের গন্ধ,সবুজ ধানক্ষেত,শান্ত নদী,ঝকঝকে রাস্তা,পায়ের নিচে শুকনো পাতার মড়মড়ে আওয়াজ! শিশির ভেজা ঘাস আর ধোঁয়াটে কুয়াশা ভরা চারিদিক! সব মিলিয়ে অস্থির মন, মূহুর্তে স্থির করার ক্ষমতা আছে এর।
শিকদার বাড়ির সেই ভাড়া করা বাস,চরনন্দীর
বাজারে এসে থেমেছিল শেষ দুপুরের দিকে।
তখনো বাজারে লোকজন গিজগিজ করছে । লাল বাসটা এক পাশে থামার পর আশপাশ থেকে কিছু উৎসুক হয়ে চাইলেন তারা। কানাঘুষা করলেন কেউ কেউ। সুমনার যে খুব ভালো ঘরে বিয়ে হয়েছে এ কথা এখনো মুখে মুখে তাদের। মহামারির মতো ছড়িয়ে গেছে প্রায় । তারওপর একটা গোটা বাস ভাড়া করে আসা, ব্যাপারস্যাপারই আলাদা না?
ওনাদের সাদর আপ্যায়নে নিয়ে যেতে বাড়ির চারজন পুরুষ এসেছেন। সুমনার বাবা হেমায়েত রহমান, যিনি এক কালে এই গ্রামের চেয়্যারম্যান ছিলেন। হেমায়েতের বড়ো ভাই হাকিমুল্লাহ সাহেব, তার ছেলে অহিদুল আর ওয়াজিদের ছেলে শুভ। শুভ এক থোকা লাল গোলাপ এনেছে সাথে।
গুরুজনেরা কুশলাদিতে ব্যস্ত হতেই, পিউদের দেখে স্ফূর্ত পায়ে এসে দাঁড়াল ছেলেটা।
“ পুষ্প,পিউ হোয়াটসঅ্যাপ হাঁ?”
পিউ প্রফুল্ল মুখে হাসলেও, একটু চুপসে গেল পুষ্প। আড়চোখ নাড়িয়ে দেখল চারিপাশ। ইকবাল নেই এখানে। দেখলে আবার কী থেকে কী করে ফেলবে! মেয়েটা টেনেটুনে ঠোঁটে হাসি এনে বলল,
“ হ্যালো শুভ।”
“ হ্যালো এন্ড ওয়েলকাম। এই নাও এটা তোমার।”
পুষ্পর মুখ আরো শুকিয়ে গেল,শুভ গোলাপ বাড়িয়ে দিতেই।
“ এটা কীসের জন্যে?”
“ আরে,আমাদের গ্রামে প্রথম এলে না? স্বাগত জানাচ্ছি। ধরো।”
পুষ্প ভয়ে ভয়ে ধরল ফুলটা। আবার দেখল ইকবাল আছে কিনা!
শুভ শুধু ওর জন্যেই ফুল এনেছে এমন নয়। রাদিফ,পিউ সবাইকে একটা করে ফুল দেয়ার পর চোখ পড়ল মারিয়ার দিকে। একে ও চেনে না। আপাদমস্তক মেয়েটাকে একবার খেয়াল করে শুধাল,
“ উনি কে, পিউ?”
“ উনি আমাদের গেস্ট ভাইয়া। মারিয়া আপু। আপু,উনি শুভ; ছোটো মায়ের ভাইয়ের ছেলে।”
মারিয়া হেসে বলল,
“ আসসালামু আলাইকুম।”
শুভ সালামের উত্তর না দিয়ে চেয়ে রইল দু সেকেন্ড। ফট করে বলল,
“ আপনার বয়স কত?”
বিভ্রান্তিতে হাসিটা দপ করে নিভে গেল মারিয়ার। বিব্রত হয়ে বলল,
“ জি?”
“ না মানে কে সিনিয়র,আমি না আপনি?”
পুষ্প বলল,
“ আমার থেকে অল্প একটু বড়ো। আপনার থেকে অল্প একটু ছোটো।”
শুভর দু গাল ছড়িয়ে গেল অমনি। চমৎকার করে হেসে বলল,
“ মারহাবা মারহাবা,তাহলে ইটস ওকে।”
মারিয়া কিছুই বুঝল না। ফের বিভ্রান্ত চোখে একবার ডানে পিউয়ের দিকে তাকাল,একবার বামে থাকা পুষ্পর দিকে। শুভ ঘুরেফিরে মারিয়াকে দেখল কবার। কাঁধে বেনুনি ঝোলানো,ঢিলেঢালা পোশাক, সুশ্রী বড্ড! চট করে ফুল এগিয়ে দিয়ে বলল,
“ ওহ, এটা আপনার।”
“ ধন্যবাদ! গোলাপটা দেখে মনে হচ্ছে একদম সদ্য তুলে আনা।”
“ জি। আমাদের উঠোনে গাছ আছে। সেখানকার।”
পিউ বলল,
“ এ বাবা কেন ছিঁড়লেন তাহলে? ফুল তো গাছেই ভালো লাগে।”
শুভ বলল,
“ তা ঠিক। কিন্তু তোমাদের হাতেও খারাপ লাগছে না।”
বলতে বলতে আবার ও মারিয়াকেই দেখল। বলল ভীষণ কোমল সুরে,
“ এখানে কোনো অসুবিধে হলে আমাকে জানাবেন। এটা আমার দাদু বাড়ি। দাদা দাদু আমি অন্ত:প্রাণ!”
“ জি আচ্ছা।”
ওর এত গদগদ ভাব দেখে পিউয়ের সন্দেহ হলো। কপাল কুঁচকে পুষ্পর দিকে দেখল সে। পুষ্প মিটিমিটি হেসে চোখদুটো নাঁচাল অমনি। বোঝাল – কোথাও কোনো গণ্ডগোল।
ওয়াজিদ সাহেব বললেন,
“ শুভ দাঁড়িয়ে কেন,নিয়ে এসো ওদের।”
“ জি জি আসুন। এসো পিউ,এসো পুষ্প।”
ও আগে হাঁটে। মারিয়া তারপর। পেছনে পিউ-পুষ্প নিজেদের মাঝে ফিসফিস করে চাপা কণ্ঠে হাহাহিহি করল।
শুভ হাঁটাপথেই আবার ফিরল পেছনে। জিজ্ঞেস করল,
“ তোমরা আজ কেউ অনলাইন হওনি? আমি দুজনকেই ম্যাসেজ করেছিলাম।”
পিউ বলল,
“ না ভাইয়া,নেটওয়ার্ক খুব স্লো এদিকে।”
“ হ্যাঁ তা একটু। এজন্যেই তো আব্বু বাড়িতে ওয়াইফাই দিয়েছে। কোনো অসুবিধেই হবে না।”
পুষ্প বলল,
“ বাহ তাহলে ভালোই হবে। ইন্টারনেট ছাড়া থাকা যায়!”
মারিয়া বলল,
“ গ্রামে যায়। এখানকার সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতেই দেখবে সময় কেটে যাচ্ছে।”
শুভ মুগ্ধ চিত্তে বলল,
“ আপনি তো খুব সুন্দর কথা বলেন।”
মারিয়া আবার বিব্রত হয়ে পড়ল৷
জড়োসড়ো কণ্ঠে জানাল – ধন্যবাদ!
কথা বলতে বলতে হাঁটছিল সকলে। এখান থেকে একটা কাচা রাস্তা ধরে বাড়ির দিকে যেতে হয়। সুমনাদের বাড়ির নাম “ শিউলিবাড়ি”। তবে রাস্তাটা বড্ড সরু। পাশাপাশি দুজনের বেশি ধরে না। একদম সামনে পুরুষেরা হাঁটছিলেন,মাঝে নারীরা। আর এরপর পিউদের দল। পুষ্প বারবার পিছু ফিরে দেখছিল। ইকবাল আর ধূসর কাউকেই দেখা যাচ্ছে না কেন? অচেনা জায়গা,তাহলে গিয়েছেটা কোথায়? রাস্তার এক পাশে খাল। বেশ বড়ো,চ্যাপ্টা আয়তনে। আরেক পাশে কখনো জমি,কখনো ক্ষেত আর কখনো দু -তিনটে টিনশেড ঘর।
পুষ্প হঠাৎ টের পেলো ইকবালের গলার শব্দ। বকবক করতে করতে আসছিল পেছনে। সাথে ধূসর-সাদিফ দুজনেই থাকবে নিশ্চয়ই?
ও আর ঘুরে দেখল না। যেমন ছিল হাঁটল সেভাবেই। এদিকে চারদিক দেখতে দেখতে অভিভূত হয়ে যাচ্ছে পিউ। খাল দেখে ভেবেই নিয়েছে নৌকা চড়ার কথা। ক্ষেতের মধ্যে থোকা থোকা সবজি আবার। কোনটা রেখে কোনটা দেখবে? শেষে পায়ের নিচে দূর্বাঘাস পড়ল। পিউ চট করে জুতো খুলে হাতে নেয়। ঘাসে পায়ের তালু গলিয়ে দিতেই আরামে চোখ বুজে ফেলে। ঠোঁটে মৃদূ হাসি নিয়ে খরগোশের মতো এক কদম এক কদম হাঁটছিল ও।
খালে জেলেদের নৌকা ছিল। মাছ ধরছিলেন অনেকে। একজন জাল ওপরে টানতেই পিউ সাগ্রহে চেয়ে রইল। দেখছিল, কী কী মাছ পেয়েছে। ঠিক সেই মূহুর্তে পাশ থেকে ফের পনিটেইল খিচে টেনে ধরল ধূসর। পিউ এবার নিশ্চিত এটা ধুসর ভাই-ই হবেন। তখনকার এক টানেই ওর চেনা হয়ে গেছে। ফিরল, করুণ চোখে বলল,
“ আবার কী করলাম?”
ধূসরের মুখটা স্বভাবসুলভ একইরকম। শুধু জলদগম্ভীর স্বরে বলল,
“ তুই কি তালকানা? দেখে হাঁটতে পারিস না?”
পিউ সামনে চাইল। আবার কি ইট পড়েছে এখানে? তবে এক দলা গোবর পড়ে থাকতে দেখেই, জিভ কাটল অমনি। নাক সিটকে সরে আসল দ্রুত। কাচুমাচু মুখে তাকাতেই পনিটেইল ওর দিকে ছুড়ে দিয়ে,লম্বা লম্বা পা ফেলে এগিয়ে গেল ধূসর। ঠোঁট টিপে সেদিকে চেয়ে,একা একা হেসে ফেলল পিউ।
ধূসর ভাই ওর ছোটো ছোটো ব্যাপার গুলোর এত খেয়াল রাখছেন,হাউ সুইট!
ইকবাল গিয়েই শুভর কাঁধে হাত রাখল। একটু চমকে চাইল ছেলেটা। ওকে দেখেই বলল,
“ আরে ইকবাল ভাই না। হোয়াট আ প্লেজেন্ট সারপ্রাইজ!”
ইকবাল হাসতেই যাচ্ছিল,হঠাৎ খেয়াল পড়ল শুভর হাতে। দুটো গোলাপ। ও চট করে পুষ্পর দিকে ফিরল। মাই লাভের হাতেও গোলাপ দেখল না? মানে কী,এই নচ্ছার ব্যাটা দিয়েছে তাহলে!
ইকবালের দারুণ মেজাজ খারাপ হলো। কাঁধ থেকে হাত সরিয়ে নিয়ে গমগম করে বলল,
“ ভালোই ছিলাম। কিন্তু কারো সহ্য হলো না।”
শুভ বুঝল না। বোকা বোকা চেহারায় চেয়ে রইল। ইকবাল বলল,
“ হাঁটো না ভাই। উস্টা খাবে তো।”
“ জি জি।”
তারপর ওৎ পেতে পা ফেলল ইকবাল। ধূসর ওর সামনে। পেছনে কেবল মারিয়া,পুষ্প আর পিউ। ও একটু পায়ের গতি কমাল। পুষ্প যখনই পাশাপাশি হলো,তুরন্ত ওর হাত থেকে গোলাপটা ছিনিয়ে নিয়ে, মাথা মুড়ে ফুলটাকে দূরে ছুড়ে ফেলল ইকবাল। হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে গেল মেয়েটা। চোখ ফুড়ে এলো প্রায়। ইকবাল ওসব দেখল না। পাঞ্জাবির হাতা ভাঁজ করতে করতে হনহন করে চলে গেল সে। কিন্তু হকচকিয়ে চেয়ে থাকা মারিয়ার সামনে, ভারি লজ্জায় নুইয়ে এলো পুষ্প। মাথাই তুলতে পারল না! পিউকেও চোর চোর ভাব করতে দেখে,মারিয়া ফিক করে হেসে উঠল হঠাৎ।
“ এর মানে আমি ঠিক ভেবেছিলাম,পুষ্প? ইকবাল ভাই!”
আর তো লুকানোর উপায় নেই। অগত্যা ঘাড় নাড়ল মেয়েটা। পরপর সতর্ক গলায় বলল,
“ কাউকে বলো না কিন্তু। তোমার ভাইয়াকেও না।”
“ আচ্ছা,আচ্ছা বলব না। দুজনকে
দারুণ মানাবে কিন্তু!”
পুষ্প লাজুক ঠোঁটে হাসল। বলল না কিছু। পিউ বলল,
“ তাই না? আমিও সব সময় এটাই বলি। আর ভাইয়া যে আপুকে কত ভালোবাসে জানো না।”
“ একটু একটু বুঝতে পেরেছি।
প্রেমিকার হাতে অন্য ছেলের দেয়া ফুল দেখে ফুলটাই ছিড়ে ফেলল? বাপ্রে এমন পসেসিভ প্রেমিক কোথায় পাওয়া যায়?”
পিউ পোড়া শ্বাস ফেলল এবার। নিজের হাতের পানে দেখল। ওকেও তো শুভ ফুল দিয়েছিল। ধূসর ভাই খেয়ালই করলেন না। উফ পিউ তুই-ই বড্ড তাড়াহুড়ো চাচ্ছিস। কদিন হলো মাত্র,এর মাঝেই কি ধূসর ভাই পটে যাবেন? আরো সময় লাগবে না!
হেমায়েত সাহেব টানা দু বছর চরনন্দীর চেয়্যারম্যান ছিলেন। মাছের বিস্তৃত ব্যবসা ছিল তার। সেবার বন্যায় একটা বড়ো লোকসানের মুখোমুখি হতেই,স্ট্রোক করে বসলেন। চিকিৎসায় প্রচুর টাকা ঢালতে হলো। তবে ব্যবসা আর দাঁড়ায়নি। আর না পুরোপুরি সুস্থ হয়েছেন ভদ্রলোক। তারপর থেকে ওয়াজিদই বাবা-মায়ের দেখাশোনা করতেন। মাঝে সুমনাও চাকরি বাকরি করল। দু ভাইবোনই পালন করত ওসব। তবে হেমায়েত সাহেবের একইরকম সম্মান এখনো আছে এই গ্রামে। যে কোনো কাজে লোকজন ছুটে ছুটে আসে। এই যে শিকদার বাড়ির লাগেজগুলো খুব খুশিমনে টেনেটুনে দিচ্ছেন তারা।
লাগেজ ছিল ১৫টারও বেশি। তার মধ্যে একটা ছিল বিশাল বড়ো। যাতে সুমনার বাড়ির প্রত্যেকের জন্যে আমজাদরা কেনাকাটা করেছেন। ফল নিয়েছেন ৬ ক্যারেট। কয়েকরকম মিষ্টি আর দই এনেছেন সাথে। প্রায় ৭/৮ মিনিট হাঁটার পর শিউলিবাড়ির দেখা পাওয়া গেল। ওপরে টিন দেয়া দোচালা বাড়ি। কাঠের পাটাতন আছে। দেওয়াল পাকা,ফ্লোরে মোজাইক। বিশাল উঠোনের চারপাশ ঘোরানো বেশ কয়েকটা বাড়ি আছে এখানে। ওয়াজিদ হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে বললেন,
“ এটা আমার দাদাবাড়ি। কেউ বেঁচে নেই,তবে ফুপিরা থাকেন এখানে।
ওটা চাচাদের আর এটা আমাদের। এটা কাছারিঘর,আব্বার শালিশ-আলোচনা বসতো এখানে। পেছনে দুটো পুকুর আছে। আব্বা মাছ পুষতেন। এখনো আছে টুকটাক।”
“ বাহ বাহ,দারুণ তো।”
হেমায়েত এই শরীরেরও বাড়ির আনাচেকানাচে কৃষি করেছেন। বেগুন থেকে শুরু করে টমেটো,কাচামরিচ সবই আছে অল্পস্বল্প। মাঁচায় লাউ ধরেছে। উঠোন লেপে রাখা,ভীষণ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। অদূরে আবার গোরুর গোয়াল আছে। পাশে হাঁস-মুরগির খামার। পিউয়ের চোখ গেল চালের ওপর নুইয়ে পড়া পেয়ারা গাছটায়। ডাসা ডাসা পেয়রা ঝুলে আছে। ও আনিসকে বলল,
“ চাচ্চু,পেয়ারা খাব!”
ভদ্রলোক হেসে ফেললেন।
“ আচ্ছা। আগে দুপুরের খাবার খেয়ে নাও।”
পিউ ঘাড় নাড়ল। সরব পায়ের শব্দ আর হেমায়েতের ডাকে অন্দর থেকে তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে এলেন জহুরা,দোলা আর বাকিরা।
জহুরা মাথায় কাপড় টেনে সালাম দিলেন সবাইকে। শিকদার গৃহীনিদের জড়িয়ে ধরলেন! এমনিতে তারা ভারি আন্তরিক মানুষ। জিজ্ঞেস করলেন,
“ আসতে কোনো অসুবিধা হয় নাই তো।”
মিনা বললেন,
“ না না। আপনাদের গ্রাম তো ভীষন সুন্দর কাকি।”
“ হ্যাঁ, ঘুরবা। শুভ আছে না? ওরে বইলা দিবো। আসো আসো ভিতরে আসো। বউমা, চেয়ার টেয়ার পাতো। মেহমান বসাইতে হইব তো।”
দোলার মুখ ভার। তাও কাজে হাত লাগালেন তিনি। মেহমানদের তো আর অসম্মান করা যাবে না।
বাড়ির চার দিকে টিন দিয়ে বেড়া পেটানো ছিল। তবুও আশেপাশের বাড়িঘর থেকে উঁকিঝুঁকি দিয়ে দেখছিলেন অনেকে।
সুমনাদের বসার ঘর চার কোণা করিডোরের মতো। এক সেট প্লাস্টিকের টেবিল চেয়ার,এক সেট কাঠের সোফা,আর এক কোণে খাট রাখা ছিল। হেমায়েত মেহমান বসানোর খাতিরে নকশায় আরেকটু অদল-বদল করেছেন। চেয়ার-টেয়ার জুটিয়েছেন অনেক।
যে যেখানে পারল বসল সেভাবে। আর সাথে সাথে সামনে এসে হাজির হলো একেক রকম নাস্তার ট্রে। রাদিফ হঠাৎ ছুটে এলো বাইরে থেকে। পিউয়ের কানে কানে বলল,
“ এখানে অনেক মাছ আছে।”
“ কীভাবে দেখলি?”
“ ঘুরে এলাম ওর সাথে।”
রিনির ছোটো ভাই রুবাইবকে দেখাল ও। সেভেনে পড়ে ছেলেটা। তবে গায়ে গতরে রাদিফের চেয়ে বড়ো। রাদিফই শিকদার বংশের এক মাত্র ছেলে, বয়স অপেক্ষা বুদ্ধি-ম্যাচিউরিটি আর উচ্চতা যার কম কম সব। পিউ বলল,
“ আচ্ছা, বিকেলে ঘুরব।”
শুভ খাবার সার্ভ করছিল। শরবতের গ্লাসটা এগিয়ে দেয়ার সময় বলল,
“ আমি নিয়ে যাব চিন্তা নেই। পুষ্পও যাবে তো?”
“ আ-আচ্ছা।”
বলতে বলতে ফের ইকবালকে একবার দেখল পুষ্প। ইকবাল বসেছিল অদূরে। তবে তপ্ত নজর এদিকেই ছিল ওর। পুষ্প তাকানো মাত্রই দাঁত বের করে হাসল ছেলেটা। বোঝাল,কোনো ব্যাপার না। কিন্তু পুষ্প জানে,এর মজা ওকে পরে দেখানো হবে। দীর্ঘশ্বাস ফেলতে ফেলতেও হঠাৎ তটস্থ হয়ে চাইল মেয়েটা। স্পষ্ট নজরে খেয়াল করল ধূসরকে।
ইকবালের অন্য পাশে ছিল মানুষটা। হাতে শরবতের গ্লাস। সেটাকে শক্ত করে চেপে রেখে কাউকে দেখছে সে। এত রুক্ষ-রুঢ চাউনি দেখে পুষ্প ঘাবড়ে যায়। ভয় পায়,ধূসর কিছু ধরে ফেলল কিনা! কিন্তু খেয়াল করল,ধূসর ওকে দেখছে না। তাহলে? সেই দৃষ্টি অনুসরণ করে ফিরতেই,ভ্রু দুটো টানটান করে ফেলল পুষ্প। পিউ মাথা নাড়িয়ে নাড়িয়ে শুভর সাথে গল্পে মজেছে। কোথায় কোথায় ঘুরবে,কোথায় যাবে একটা বিস্তর পরিকল্পনা ওদের। সাথে জুটেছে মারিয়াও। কিন্তু ধূসর ভাই দেখছে কাকে?
পিউকে,নাকি মারিয়াকে! না না পিউকে কেন দেখবেন,মারিয়াকেই বোধহয়। পুষ্প নিশ্চিত হতে আবার ধূসরের দিক তাকাল,হতাশ হলো এবার। ধূসর জায়গা ছেড়ে উঠেই চলে গেছে। একদম আনিসকে গিয়ে বলছে কিছু। আনিস সুমনাকে ডাকলেন। ভদ্রমহিলা বললেন,
“ হ্যাঁ হ্যাঁ এসো। তোমার রুম তৈরিই আছে।”
ধূসর যেতেই,ইকবালও আর বসল না। পিছু নিলো ওর। এমনিতেই ও খেয়াল করেছে আমজাদ শিকদার ঘুরেফিরে ওকে চোখ রাঙিয়ে দেখছেন। এই হিটলার ব্যাটা সামনে থাকলেই ওর গলার নলি সুদ্ধ শুকিয়ে খাক হয়ে যায়। ছেলেটা যেতেই আমজাদ রেগে রেগে ফিসফিস করলেন,
“ দেখলে,কেমন কাবুলিওয়ালার মতো ধূসরের পেছনে সেটে থাকে। মেয়ে হলে ফুসলে ফাসলে বিয়েই করে ফেলতো।”
আফতাব হেসে ফেললেন। রীতিমতো শরবত মাথায় উঠে বিষম লেগে গেল।
ঘরের দরজা সুমনা দুহাতে ঠেলে দিয়ে বললেন,
“ তুমি আর ইকবাল এই ঘরে থাকো ধূসর। এমনিতে কোনো অসুবিধে হবে না। আলো-বাতাসই সবই আসবে। তবে সমস্যা একটাই,এ্যাটাচ ওয়াশরুম নেই।”
ধূসর ভেতরে এসে ব্যাগ রাখল। চারপাশে এক পল চোখ বুলিয়ে বলল,
“ ব্যাপার না। এতেই হবে।”
“ আচ্ছা,তাহলে চেঞ্জ করে নাও। আমি হাতমুখ ধোয়ার পানি দিচ্ছি।”
সুমনা যেতেই ধূসর দরজা চাপাল। অমনি হাতপা চারদিকে ছড়িয়ে খাটের ওপর চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ল ইকবাল। বুক ভরে লম্বা শ্বাস ফেলল। ধূসরও এসে শুলো ওর পাশে। ইকবাল কী যেন ভাবছিল।
পরপরই কটমটিয়ে বলল,
“ কাজী নজরুল,
করিয়াছ ভুল
কী কারণে বৎস
দিতে গেলে ফুল?”
“ কীহ!”
ইকবালের হুশ এলো। জিভ কেটে বলল,
“ ছড়া, ছড়া। এমনিতে তোকে কিছু বলিনি।”
ধূসর কপাল কুঁচকে সিলিং এর দিকে চেয়ে থাকে। ও বলল,
“ একটা জিনিস খেয়াল করেছিস?”
“ কী?”
“ শুভ ছেলেটার চরিত্রে সমস্যা আছে।”
“ কী করেছে তোর?”
“ আমার করেনি। কতক্ষণ দেখি পুষ্পর সাথে হাহাহিহি, কতক্ষণ পিউয়ের সাথে। পিউ মেয়েটা ভোলাভালা,ওকে নিয়ে আমি চিন্তিত। কখন যে কী হয়ে যায়।”
ধূসর ভ্রু গুছিয়ে পাশ ফিরে চাইল,
“ কী হবে?”
ইকবাল গুরুতর হয়ে বলল,
“ তুই কি নাদান ধূসর? সবই তো বুঝিস। পিউ হলো সুইট সিক্সটিন। উড়ুউড়ু মন। আজ একে ভাল্লাগবে, কাল ওকে। এরকম হওয়া
স্বাভাবিক না?”
কথার মধ্যে মুঠোফোন ক্রিং ক্রিং করে উঠল। ইকবাল শোয়া থেকে বসতে বসতে বলল,
“ শালার আমাকে আবার কে ফোন করল!”
উঠে ওই কোণে গেল ও। কানে ফোন গুযে বলল,
“ হ্যাঁ মা পৌঁছেছি।”
“ বউমা বউমা করো না। বউমার ভাই টের পেলে আমার মাথায় বোমা মেরে দেবে।”
ইকবালের ফিসফিসে আওয়াজ ধূসর শুনছে কিনা বোঝা গেল না। তবে ওর কানের পাশে বাজল – আজ একে ভাল্লাগবে কাল ওকে ভাল্লাগবে।
চট করে ধূসর ফোন বের করল। ত্রস্ত হাতে কিছু একটা করে পকেটে ভরে রেখে দিলো আবার।
***
দুপুর বেলাও খাবারে এলাহি আয়োজন করা হলো। হাঁসের মাংস,কয়েক রকম মাছ,টাটকা সবজি। খাসীর মাথা সব রাখা হলো আপ্যায়নের জন্যে। তবে বিপত্তি একটাই। এ বাড়ি এত বড়ো টেবিল নেই। ছ-সেট টেবিল চেয়ারে তো আর এত লোক ধরবে না। তাছাড়া আপাতত উনুন একটাই জ্বলছে। হাকিমুল্লাহরাও কদিন এখানেই খাবেন।
হেমায়েত মেয়ের সাথে কিছু নিয়ে পরামর্শ করছিলেন। মিনা পাশ থেকে যাবার সময় কানে এলো,
আমজাদদের টেবিলে বসাই,আর ছোটোদের নাহয় খাটের ওপর দিই?”
মিনা থামলেন। বললেন,
“ কিছু মনে না করলেন বাবা-মেয়ের মাঝে একটা কথা বলি?”
দু বাবা মেয়ে একটু তৎপর হয়ে চাইলেন। হেমায়েত বললেন,
“ জি,মা বলো!”
“ খাওয়া নিয়ে সমস্যা হলে,মেঝেতে পাটি বিছিয়ে দিন না কাকা। সবাই মিলে বসতে পারব।”
ভদ্রলোক চট করে মেয়ের পানে তাকাতেই মুচকি হাসলেন সুমনা। হেমায়েতও হাসলেন এ যাত্রায়। স্বস্তিতে ঘাড় নেড়ে বললেন,
“ আচ্ছা,আচ্ছা তাই করি।”
জহুরা এই কথা রান্নাঘরে বসে শুনেছেন। এক চোট নিঃশব্দে হাসলেন তিনিও। দোলার দিকে চেয়ে শ্বাস ফেললেন পরপর। বাবা সরকারি চাকরিজীবী বলে অহংকারে মাটিতে পা রাখে না। মেয়েটাকে যে কীভাবে বোঝাবে,
সত্যিকারের যারা বড়ো মানুষ হয়,তাদের মনে হিংসে থাকে না।
দুটো পাটি মিশিয়ে ফ্লোরে পাতানো হলো। একে একে পা গুছিয়ে বসল সকলে।
পিউয়ের মনটা ভালো নেই। বেড়াতে এসে ও ধূসরের থেকে ভাগ হয়ে গিয়েছে। সুমনাদের বাড়িতে এত লোক একসাথে থাকার মতো ঘর নেই। তাই কিছু ভাগ করা হয়েছে হাকিমুল্লাহদের বাড়ি। সেখানে আজমল-জবা, পুষ্প-মারিয়া,রাদিফ-শুভ-সাদিফ,আর পিউ থাকবে রিনি-মিনিদের সাথে।
আর এটাই ওর ভালো লাগছে না। রিনিকে ওর পছন্দ নয়। তারওপর ধূসর থাকবে এক দিকে,ও আরেকদিকে। ধুর!
ওর পাশে আনিস বসেছিলেন। শুভ যখন খাবার বাড়তে এলো,বললেন,
“ তুমি বসবে কখন?”
“ এইত, একটু পরে ফুপা।”
“ আরে পরে বলতে কথা আছে? বসো তো।”
ছেলেটাকে টেনে নিজের পাশে বসিয়ে দিলেন তিনি। ঠিক ওনার আর পিউয়ের মাঝখানে।
এই সাঁড়িতে মুখোমুখি থাকা ইকবাল মূহুর্তে ধূসরের কানে কানে বলল,
“ ডিরেক্ট পাশে বসে পড়ল। যদি পারফিউমের ঘ্রাণে পিউ পটে যায়!”
“ গেলে তোর কী?”
“ আমার কিছু না। একজনের ভালো চাই তাই বললাম।”
“ খা চুপ করে।”
ইকবাল ঘাড় নেড়ে ভাতে হাত দিলো। ধূসর ব্যস্ততা থালায় দেখালেও,এক পল নির্লিপ্ত, ধারালো চোখদুটো তুলে চাইল মুখোমুখি। লেবুর স্লাইসটা মুঠোয় চটকে চটকে হাত ধুলো সাথে। যেন কারো ওপর অপার রাগ, পানিতে মিশিয়ে দিচ্ছে সে। হঠাৎ খেয়াল করল পিউ আস্তে আস্তে পুষ্পর দিকে সরে বসেছে। শুভ আর তার মাঝে তৈরি হয়েছে বিস্তর দুরুত্ব। অমনি ইকবালের দিকে পাশ ফিরে চাইল ধূসর। কুচকুচে মনিজোড়ায় কেমন অস্বচ্ছ গর্ব। ইকবাল বুঝে নেয়। মাথা নাড়ায় হেসে হেসে,
“ লয়াল,হুম্মম্ম…”
এদিকে বিপাকে পড়েছে মারিয়া। ও মাছের কাঁটা বাছতে পারে না। ভাইয়া, না হয় মা বেছে দেন। শিকদার বাড়িতে মাছ খুব কম আনা হয়! ওখানে মাংস আর চিংড়িটা চলে বেশি। এখন এখানকার খালবিলের মাছ দেখে খেতেও ইচ্ছে করছে। কিন্তু কাঁটার সমস্যার কী করবে? তাই থালায় দিতে এলে মানা করল মারিয়া।
“ না না, আমি খাব না।”
রুবায়দা বললেন,
“ আরে নাও না। এত টাটকা মাছ তো শহরে পাবে না মারিয়া।”
মেয়েটা খুব লজ্জা নিয়ে জানাল,
“ আন্টি, আমি আসলে কাঁটা বাছতে পারি না।”
“ আরেহ এই কথা। দাও, আমি বেছে দিই।”
জহুরা মাছের টুকরো পোলাওয়ের ওপর রাখতেই,রুবায়দা প্লেট টেনে নিলেন।
মারিয়া আপ্লুত হয়ে বলল,
“ আপনি একদম আমার মায়ের মতো। আম্মুও এমন করে।”
“ তুমিও তো আমার মেয়ের মতোই!”
মপিউ খেয়াল করল এসব। মূহুর্তে ওর থালা সুদ্ধ উঠে এসেই,
পাশে বসে বলল,
“ মেজো মা আমাকেও কাঁটা বেছে দাও।”
রুবায়দা হেসে ফেললেন,
“ দেখলে,এই হচ্ছে আমার আরেক মেয়ে। আদরের ভাগ কাউকে দিতে নারাজ।”
পিউ হাসে দাঁত দেখিয়ে। মারিয়া ওর গাল টেনে দিলো।
“ পিউ এত মিষ্টি, আন্টি।”
“ তুমিও মিষ্টি।”
“ তুমি বেশি। স্পেইশালি তোমার চোখ। তোমার কপাল ভালো আমি ছেলে নই।”
কথাটায় জোরে হেসে ফেলল পিউ। শব্দে
সবাই এক যোগে তাকাল ওর দিকে। সব চেয়ে বড়ো বড়ো করে চোখ পাঁকালেন মিনা। কেন এভাবে খিলখিল করে হাসবে? আসার সময় পানি পড়া দিয়ে বুঝিয়েছেন,গ্রামে ভদ্রের মতো থাকতে। এত মানুষের চাউনি দেখে লজ্জায় চুপসে মাথা নুইয়ে নিলো পিউ।
খাওয়া দাওয়ার পর সবাইকে যার যার ঘরে পাঠানো হলো। এত জার্নি করে এসেছে,বিশ্রাম দরকার। পিউ মুখ কালো রওনা করল সে পথে। ওর চুল শুকিয়ে গেছে। এখানে তো আর বারান্দা নেই। ভেজা তোয়ালে উঠোনে মেলতে হয়। পিউ তোয়ালে ছাড়িয়ে মাথা কাত করে চুল মুছতে মুছতে,লম্বা গোছা কাঁধ থেকে পিঠে ছুড়ে মারল। সোজা হয়ে তাকাতেই চোখ পড়ল উঠোনের রোদে। একটা লম্বাদেহী ছায়া ওর পিঠের সাথে দাঁড়িয়ে। চকিতে ঘুরে চাইল মেয়েটা। ধূসরকে এত কাছে দেখে বুকটা কেমন ছ্যাৎ করে ওঠে। হকচকায় একটু। মানুষটা চোখ বুজে,ভ্রু কুঁচকে রেখেছে। শ্যামলা মুখে পানির ফোঁটা দেখে পিউ জিভ কেটে বলল
“ স-সরি সরি আমি দেখিনি।”
ধূসর ঠান্ডা নয়ন মেলে চাইল চুপ করে চেয়ে থেকে ঢোক গিলল। পরপর মুখটা পাথরের মতো শক্ত করে বলল,
“ সর।”
পিউ ভড়কে গেল এই রূপ বদলে। উঠোনে এত জায়গা,তাও ওকেই সরে দাঁড়াতে হবে? এক পাশ হয়ে গেল তড়িৎ। ধূসর পাশ কাটিয়ে চলে গেল সদর গেইটের ওপাড়ে। সেদিক চেয়ে ঠোঁট উলটে পোড়া শ্বাস ফেলল মেয়েটা।
ও ঘরের জানলা হতে মিনি চ্যাঁচাল তখনই,
“ পিউ আপি, আসুন বিছানা রেডি।”
এ ঘরে বিছানা দুটো। রিনি,আর মিনির। সুমনার খালাতো বোনের সঙ্গে চাচাতো ভাইয়ের বিয়ে হয়েছিল। সে ঘরেই তিন সন্তান তাদের। খাটের একটা পিউকে বুঝিয়ে দিয়ে ওরা দুবোন এক খাটে শুলো। শ্বাস ফেলতে ফেলতে বালিশে মাথা রাখল মেয়েটা। তবে নরম গদির স্পর্শ পেতেই চোখ লেগে গেল ওর।
বাসে তো ঘুমায়নি। উঠেওছিল ভোরে। তবে আরামের ঘুম বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না! ঘন্টাখানেকের মাথায় ক্রিং ক্রিং শব্দে ছুটে গেল সেটুকু। পিউ টেনেটুনে চোখ মেলে দেখল,ঘরবাড়ি অন্ধকার। সন্ধ্যে নামছে। রিনি-মিনিও নেই। ও বালিশের নিচ হতে ফোন সামনে এনে স্ক্রিনে চাইল। তানহার কল।
“ হ্যালো?”
“ পিইইইইউ!”
ওপাশ থেকে এক চিৎকার করে উঠল মেয়েটা। পিউ হতভম্ব হয়ে বলল,
“ কী হয়েছে?”
“ তোকে আমি কতবার কল দিলাম পিউ আর তুই ঘুমাচ্ছিস! এদিকে কত কী ঘটে গেছে পিউ।
অনলাইনে আয়,তাড়াতাড়ি আয়।”
বেজায় বিরক্ত হলো মেয়েটা। চ সূচক শব্দ করে বসল উঠে। মুখে হাত ডলতে ডলতেই তানহাকে লাইনে রেখে, অনলাইনে ঢুকল। ঘুম ঘুম গলায় বলল,
“ কোথায় কী?”
“ আরে ইনস্টাগ্রাম দ্যাখ হাদি। ধূসর ভাইয়ের আইডিতে দ্যাখ।”
পিউ মূহুর্তে গম্ভীর হয়ে বলল,
“ তুই ধূসর ভাইকে স্টক করছিলি?”
“ আরে না, হঠাৎ সামনে আইডি পড়ল। তাই ভেতরে ঢুকে দেখতে গেছিলাম।”
“ কেন দেখবি তানহা?”
“ উফ বাবা,আর দেখব না। তুই আগে ইনস্টায় আয়। জলদি জলদি।”
পিউয়ের ভার মুখ গেল না। তাও শুনল ওর কথা। ধূসরের আইডি ওর সার্চ লিস্টে পিন করা থাকে। চোখে ঘুম তখনো কাটেনি। হাই তুলতে তুলতে স্ক্রল করছিল। তানহা উতলা হয়ে বলল – “দেখেছিস?”
পিউ বুঝল না মেয়েটা এত এক্সাইটেড কেন। এই আইডি দিনে অন্তত ৫০ বার স্টক করে ও। বাসেও করেছে। তবে গ্রামে ঢোকার পর থেকে ফোনই আর ধরেনি। তো কী এমন হয়ে গেল এর মধ্যে?
তানহা ফের বলল,
“ আরে এতক্ষণ লাগে? ঢুকলেই তো পাওয়া যায়।”
“ ঢুকেছি তো। লাস্ট পোস্ট সকালের। আর তো কিছু নেই।”
“ উফ হো পিউ, কানা মহিলা,
বায়োটা দ্যাখ। বায়ো বায়ো!”
পিউ বিড়বিড় করল,
“ বায়োতে কী আবা…”
লেখাতে নজর পড়া মাত্রই কথা থামল ওর। আটকে গেল চোখমুখ। বুকের ভেতর সহ ধুক করে উঠল। চমকে,থমকে ফের স্পষ্ট করে চাইল পিউ।
Shikder Dhusor Mahtab
আইডিটার বায়োতে ছোটো ছোটো করে দাপুটে শব্দে লেখা বায়ো –
“Owner of the barbie!”
তানহা অধৈর্য হয়ে বলল,
“ দেখেছিস?”
“ দ-দেখেছি।”
পিউয়ের কথা অস্পষ্ট শোনাল।
“ পিউ এটা ধূসর ভাই তোর জন্যে দিয়েছেন আম শিয়র।”
পিউয়ের কথায় অবিশ্বাস,
“ আমার জন্যে!”
“ অভিয়েস্লি। তোর বায়োর কথা তোর মনে নেই? তাছাড়া মিনা আন্টি না সেবার বললেন,তুই হওয়ার পর ভাইয়া তোকে বার্বিডল বলেছে। পিউ উনি তোকে নিয়েই দিয়েছে। আই থিংক হী হ্যাজ ফিলিংসস ফর ইউ।”
পিউয়ের হাত পা থরথর করে উঠল ঐ কথা ভেবে- হী হ্যাজ ফিলিংস ফর ইউ! কাঁপা গলায় বলল,
“ আ-আমি, আমি বিশ্বাস করতে পারছি না।”
“ তুই গিয়ে সরাসরি জিজ্ঞেস কর। এক সাথেই তো আছিস, যা এখনই যা।”
সত্যিই আজ বেপরোয়া হয়ে পড়ল মেয়েটা। পাতলা কাঁথা চট করে গা থেকে নামিয়ে জুতো ছাড়াই ছুটল। ফোন হাতেই রয়ে গেছে তখন।
উঠোন পেরিয়ে যখনই হেমায়েতদের ঘরের দরজা দিয়ে ঢুকতে গেল ,দুম করে কারো সাথে এক ধাক্কা লাগল ওর। সজোরে হাত থেকে ফোনটা ছিটকে পড়ে গেল মাটিতে। বসার ঘরে চায়ের আসর চলছিল। ধূসর সহ প্রত্যেকে ঐ জোরালো শব্দে চাইল ফিরে।
পিউ হকচকিয়ে নিজের ফোনের দিকে তাকায়। গ্লাস ফেটে চৌচির। সাদিফ বলল,
“ আরেহ, দেখে আসবি না? এভাবে কে ছোটে?”
পিউয়ের মেজাজ চটে গেছে। রেগেমেগে সাদিফের দিক তাকাতেই, হতবুদ্ধি হয়ে পড়ল একটু। ধাক্কা সাদিফের সাথে লাগেনি। লেগেছে ওর পাশের মানুষটাতে। পিউ তাকাতেই যে চমৎকার হেসে বলল,
“ সরি প্রহর্ষা,আমি দেখিনি।”
চলবে…
Share On:
TAGS: আলতো ছোঁয়ায় সমুদ্রকথন, নুসরাত সুলতানা সেঁজুতি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৩৩
-
আলতো ছোঁয়ায় সমুদ্রকথন পর্ব ১৭
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৬৮.১
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৮৪
-
আলতো ছোঁয়ায় সমুদ্রকথন পর্ব ৪(খ)
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৬৫
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৬০.২
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৪৪
-
আলতো ছোঁয়ায় সমুদ্রকথন পর্ব ১৪.২
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৫৯(প্রথমাংশ+শেষাংশ)