#আলতোছোঁয়ায়_সমুদ্রকথন_(১৪.২)
#নুসরাত_সুলতানা_সেঁজুতি
ধূসর ফোন হাতে নিয়ে চারপাশ দেখছে। এত এত মানুষের মধ্যে অতটুকু পুচকিকে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। তাছাড়া ও নিশ্চিত ভাবে জানেও না এটা পিউয়েরই নম্বর কিনা! শুধু আন্দাজ করছে, এসব পাকামি ওর। চিরকুটের কথা ভুলে যায়নি এখনো। সেবার তো বেঁচে গেছিল। সেজন্যে এবার আগে প্রমাণ বুঝতে হবে,এরপর করবে যা করার! ধূসর এগিয়ে এলো,হন্যে চোখ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে খোঁজার মাঝে নজর পড়ল অদূরে। পুষ্পর হাতে ফোন দিয়ে পিউ লেহেঙ্গার দুপাশ তুলে ছুটছে কোথাও। ভিড় ঠেলে আসতে আসতে অদৃশ্য হয়ে গেল মেয়েটা। সেদিকে চেয়ে চ সূচক শব্দ করল ধূসর। পরপর পুষ্পর দিকে চাইল সে। অমনি সটান হয়ে দাঁড়াল পুষ্প। টেনেহিঁচড়ে হেসে বলল,
“ হ-হ্যাঁ, ভাইয়া কিছু লাগবে?”
ধূসর ওর হাতের দিকে দেখল এক পল। গম্ভীরমুখে জিজ্ঞেস করল,
“ কোথায় গেছে ও?”
“ ও? ওহ,পিউ! ওয়াশরুমে। ডেকে দেব?”
“ না। ওর ফোন কোনটা?”
হাতে থাকা দুটো ফোনের একটা দেখাল পুষ্প। প্রশ্ন করল,
“ কেন ভাইয়া?”
ধূসর ঠাড় চোখে চাইতেই মিনমিনিয়ে বলল,
“ না,এমনি। নাও, তুমি নাও।”
ধূসর পিউয়ের ফোন হাতে নিয়ে স্ক্রিন জ্বালাল। লক স্ক্রিনে পিউয়েরই ছবি। দোলনায় বসা,পরনে সাদা স্কার্ট সেট। মাথায় একটা সাদা হেয়ারব্যান্ড! কিন্তু হোমস্ক্রিনে যেতে চাইলে পাসওয়ার্ড চাইল সেখানে। ধূসর বলল,
“ পাসওয়ার্ড বল।”
পুষ্প বিভ্রান্ত। ধূসর ভাই হঠাৎ পিউয়ের ফোন নিয়ে কী করবে বুঝতে পারল না। দোনামনা করতে দেখে ধূসর কণ্ঠ শক্ত করল আরেকটু,
“ পাসওয়ার্ড কী?”
“ আমি,আমি তো জানি না।”
“ জানিস না! কেন? ছোটো বোন না তোর? কোথায় কী করে বেড়ায়,খেয়াল রাখিস না কেন?”
ধূসর ধমকাল প্রতি শব্দে। পুষ্প গুটিশুটি মেরে বলল,
“ আসলে ভাইয়া ও তো বড়ো হয়েছে। কলেজে পড়বে দুদিন পর। একটা প্রাইভেসি আছে না বলো! আর,তুমি তুমি কি ছেলেঘটিত কিছু বোঝালে? পিউয়ের ওপর আমার ভরসা আছে। ও এমন কিছু করবেই না। আর করলেও,ওয়ার্ল্ড বেস্ট ছেলেটাকে যে ও চ্যুজ করে আনবে তা আমি জানি!”
শেষ কথায় পুষ্প দাঁত মেলে হাসল। কথায় কী আত্মবিশ্বাস। কিন্তু থম ধরে গেল ধূসরের মুখ। পরপরই কর্কশ স্বরে বলল,
“ যা এখন।”
পুষ্প তাও উশখুশ করল। চোরা চোখে পিউয়ের ফোন দেখছিল বারবার। এটা সাথে নেবে না? ধূসর আরো জোরে ধমকে বলল,
“ কী? যা।”
ছলকে, চপল পা চালিয়ে ছুটে গেল মেয়েটা। শিকদার বাড়িতে মেয়েদের এভাবে শাসায় না কেউ। বাবা-চাচা সবাই ভীষণ গদগদ করেন। মায়েদের মধ্যে গাইগুই করেন শুধু মিনা বেগম! তাও পিউ-পুষ্প অত গায়ে মাখে না। কিন্তু ধূসরই প্রথম মানব, যে ওদের সাথে একটু হেসেও কথা বলেনি । দরকার ছাড়া মুখও খোলে না। দাঁড়ি,কমা সবেতে ধমকা-ধমকি তার। পুষ্প এপাশে এসে বুকে হাত দিয়ে জোরে জোরে শ্বাস নিলো। বুকটা কেমন ধড়ফড় করছে। বিড়বিড় করে বলল,
“ বাবাহ,ধূসর ভাই এত্ত রাগী!
দুঃখ আছে এর বউয়ের কপালে….”
এদিকে ধূসর পড়েছে বিপাকে। পিউয়ের লকড ফোনটা হাতে নিয়ে দাঁত দিয়ে নিম্নোষ্ঠ কামড়াতে কামড়াতে ভাবছিল, পাসওয়ার্ড কী হতে পারে? তারপর পিউয়ের বার্থ ডেইট লিখল সেথায়। ক-মাস আগেই তো গেল জন্মদিন ;কেক কাটল সবাই। তাই মাথায় ছিল ওর। কিন্তু না,ভুল হলো। ধূসর বার্থ ইয়ার লিখল। পিউ যেবার জন্মায় সেসময় ওর ক্লাস ফাইভের এক্সাম চলছিল। কিন্তু এবারেও ভুল এলো সেটা। শেষে ভাবতে ভাবতে কেন যেন মাথায় এলো ভিন্ন কোনো কিছু। নিউমেরিক না হয়ে অ্যালফাবেটসও তো হতে পারে। আর তাতেই ও তৎক্ষনাৎ টাইপ করল,
“dhusormahtab”
আর ওকে তাজ্জব করে দিয়ে লক খুলে গেল সহসা। ধূসর যতটা না নিশ্চিত ছিল,ততোধিক অনিশ্চিত ছিল বেশি। একটু বোকা বনে গেল কিছুক্ষণের জন্যে। তার চেয়েও বেশি হতবাক হলো, হোম স্ক্রিনে নিজের ছবি দেখে। সোফায় বসা,হাতে চায়ের কাপ। এই বসার ঘরেরই তো ছবিটা। কিন্তু কখন,কবে তুলেছে? ছবি তে চিবুকের এক পাশ। যেন ওকে না বলে তোলা! এর মানে পিউ ওকে না জানিয়ে ফাঁকফোকরে এসবও করে বেড়ায়? ধূসর দুই গাল ফুলিয়ে বিরক্ত শ্বাস ফেলল।
ম্যাসেজ খুঁজতে ইনবক্সে এলো। কিন্তু এখান থেকে কোনো ম্যাসেজ যায়নি। সব ফাঁকা। নিশ্চয়ই ডিলিট করে দিয়েছে?
ধূসর ডায়ালপ্যাডে এসে ওর নম্বর তুলতে গেল,কীবোর্ড ভেসে উঠল তাতে। আর ওই কীবোর্ডের থিমেও নিজের ছবি দেখে চোখদুটো কিছু চমকাল ধূসরের। আশ্চর্য হলো বৈকি! এখানেও ও?
ধূসর ধাত সামলে নম্বর তুলল নিজের। ডায়াল করতেই,স্ক্রিনে লেখা এলো- mine dairymilk.
তুরন্ত খুকখুক করে কেশে উঠল ও।
উত্তর পেয়ে গেল এখানেই। ম্যাসেজেও তো এই উদ্ভট শব্দ ছিল। এর মানে ওর এসব আজগুবি নাম রাখা হয়েছে!
কী ভেবে দিয়েছে এসব! উফ,এত্ত পাকা এই মেয়ে…
ধূসরকে ম্যাসেজ পাঠানো নম্বর পিউয়ের ছিল না। যে নম্বর দিয়ে ওর ফোনে কল এলো মাত্র,আর ম্যাসেজের নম্বর দুটো আলাদা। হয়ত অন্য কারো ফোন থেকে টেক্সট দিয়েছে,যাতে নিজে ধরা না পড়ে৷ কিন্তু ডেইরিমিল্ক শব্দ দুটো মিলিয়ে ধূসর বুঝে ফেলেছে, আসল চোর কে! পিউয়ের প্রতি শুরুতে যে রাগ ছিল,সেই হেতু ধরে ধূসরের আরো ক্ষুব্ধ হওয়ার কথা। রেগেমেগে খোঁজার কথা ওকে।
কিন্তু, ও কী ভেবে পিউয়ের ফোনের গ্যালারিতে ঢুকল। শেল্ফের মতো থোকা থোকা ফোল্ডারের মধ্যে, dairymilk লেখা ফোল্ডারটা দেখে ধূসর তব্দা খেয়ে যায়। ক্লিক করতেই,পঙ্গপালের মত বেরিয়ে আসে ওর হাজারখানেক ছবি!
ধূসরের মাথা এলোমেলো হয়ে গেল এবার। স্ক্রল করতে করতেও হাতটা কাঁপল ঈষৎ। এত ছবি! এত?
ফেসবুক,ইনস্টা যেখানে যা পেয়েছে সব সেইভ করেছে পিউ। এমনকি ফাঁকে ফাঁকে নিজেও তুলেছে কিছু। ধূসর জিভে ঠোঁট ভেজাতে ভেজাতে দেখছিল সব। ওপরে ফেসবুকের নোটিফিকেশন এলো সেসময়। হাতটা স্ক্রিনে চলতে থাকায় চাপ পড়ল সেখানে। ফেসবুকটা নিজে থেকেই খুলে গেল। ধূসর ঢুকল পিউয়ের প্রোফাইলে। আরেক দফা ধাক্কা ওর জন্যে অপেক্ষা করছিল হয়ত।
পিউয়ের টাইমলাইনে সব ওর ছবি,ওকে নিয়ে পোস্ট। সব অনলি মি করে রাখা। অ্যালবামের নাম দিয়েছে- এক সমুদ্র প্রেম!
ধূসরের প্রতিটা ছবির সাথে জুড়ে আছে একেকটি প্রেমময় ক্যাপশন।
কোথাও লেখা :
“ আপনি আমার ভালোবাসা নন শুধু… আপনি আমার ভাবনার শুরু, আমার অপেক্ষার শেষ। আমি যতবার চোখ বন্ধ করি, আপনাকেই দেখি; যতবার চোখ খুলি, আপনাকেই খুঁজি।”
পিউয়ের জন্মদিনে ধূসর বন্ধুদের পার্টিতে ছিল। সেখানকার ছবি পোস্ট করেছিল ফেসবুকে। সেই ছবি সেইভ করে আশেপাশের সবাইকে কেটে শুধু ওকে রেখে, পিউ অনলি মি করে পোস্ট করেছে। ক্যাপশন দিয়েছে,
“ আমার জন্মদিনে এলেন না কেন ধূসর ভাই? এলে কী খুব ক্ষতি হতো! আপনি তো জানেন না, আপনার অনুপস্থিতি আমার কাছে কী যে শাস্তির। আর উপস্থিতি যেন পুরো একটা জীবন।”
ধূসর ধাপ করে স্ক্রিন বন্ধ করে দিলো। ঢোক গিলে চাইল এদিক-সেদিক।
পাশ থেকে যাচ্ছিল রাদিফ। ওর স্যুটের পেছন থেকে টেনে ধরল ধূসর। রাদিফ ভড়কে তাকাতেই ওর হাতে ফোনটা ধরিয়ে দিয়ে বলল
“ পিউকে দিয়ে দিস!”
রাদিফ কিছু বলার আগেই ধূসর জুসবারের দিকে এগোয়। হাতে একটা ম্যাংগোজুসের গ্লাস তুলে, ৫-৬টা আইস কিউব দিয়ে হনহন করে হাঁটা ধরে কোথাও।
এদিকে পার্টি বেশ জমে উঠেছে। ভাইদের চাপে পড়ে আনিস হাতে মাইক্রোফোন নিয়েছেন। লজ্জায় চুর হলেও স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে গাইছেন,
“ আগুনের দিন শেষ হবে একদিন,
ঝর্ণার সাথে গান হবে একদিন,
এই পৃথিবী ছেড়ে চলো যাই,
স্বপ্নের সিঁড়ি বেয়ে সীমাহীন!”
পিউ ওয়াশরুম থেকে মাত্রই ফিরল। ওর মেক আপ ঠিক করতে একটু সময় লেগেছে। প্রথম বার এত সাজলো তো! আগে সাজতে ভালো লাগতো না। কিন্তু এখন একজনের জন্যে সারাক্ষণ সেজেগুজে থাকতে ইচ্ছে হয়। তা সে দেখুক,না দেখুক। পিউ চাচার গান শুনে হাসতে হাসতে মুখোমুখি তাকাল।
মেইন ফোকাস পয়েন্টের চারপাশে গেস্টদের জটলায় চোখ বোলাল বার কয়েক। ধূসর ভাই কোথায়? ম্যাসেজ গুলো দেখেছিল?
হুহ,এবার আর ওর ওকে এসে ধরতে পারবে না। ছোটো মায়ের ফোন থেকে পাঠিয়েছে। তার নম্বর ওনার কাছে নেই-ই! আর এমন ম্যাসেজ দিয়েছে,উনি এসে জিজ্ঞেসও করতে পারবে না কিছু। পিউ মনে মনে হাসল খুব। কাঁধ চাপড়াল গর্বে। হঠাৎ মনে পড়ল ওর ফোন পুষ্পর কাছে। উদগ্রীব হয়ে তাকাল আবার। নজর গেল পাশে থাকা রিনির দিকে। মেয়েটাও উতলা হয়ে কাউকে খুঁজছে। পিউ সতর্ক হয়ে ভাবল,
“ চারচোখী কাকে খুঁজছে? আবার আমারটাকে খুঁজছে না তো?”
অমনি মেরুদণ্ড সোজা করে ফেলল পিউ। নাক ফুলিয়েও হেসে বলল
“ রিনি আপু,কাউকে খুঁজছেন?”
রিনি ইতস্তত করে বলল,
“ না মানে ঐ, ফ্যামিলির সবাইকে দেখতে পাচ্ছি। শুধু তোমার ভাই ধূসরকে দেখছি না যে!”
পিউ কিড়মিড়িয়ে ভাবল,
“ ভাই হবে তোর চৌদ্দ গোষ্ঠির। আমার কেন হবে!”
কিন্তু মুখে বলল,
“ আপু আপনার বয়স কত? কোন ক্লাসে যেন পড়েন?”
“ এইত পুষ্পর সাথে। এইচ এসসি দেবো এবার।”
“ এমা,আপনি এত ছোটো? আর ধূসর ভাইয়ের বয়স জানেন? উনি আপনার কত সিনিয়র,আর আপনি কিনা নাম ধরে ডাকছেন আপু? ছি,ছি! আপনাদের পরিবার নিয়ে কত সুনাম শুনেছি। এইত, একটু আগেও আপনার আম্মু আমার আম্মুকে বলছিল,তার মেয়েরা নাকি ভীষণ ভদ্র! এটা তাহলে কেমন ভদ্রতা!”
রিনির মুখ ভোঁতা হয়ে গেল। অপ্রস্তুত হয়ে বলল,
“ না মানে, সরি আসলে মুখে চলে এসেছিল।”।
পিউ এপাশ ফিরে ভেংচি কাটে।
বিড়বিড়িয়ে বলে,
“ মেহমান দেখে কিছু বললাম না!”
ইকবাল গান শোনার ফাঁকেও পুষ্পকে চোখে চোখে রাখছে। পাছে কোনো উটকো ছেলে তার মাই লাভের কাছে ঘিঁষতে যায়! তক্ষুনি
খেয়াল করল ধূসর নিজের ঘরের দিকে যাচ্ছে। ইকবালের খটকা লাগল। এত আয়োজন, অনুষ্ঠান ফেলে হতচ্ছাড়াটা ওদিকে যায় কেন? শরীর-টরির খারাপ নাকি! ইকবাল পিছু নিতে গেল,অমনি যেন দৈত্যের মত পথে এসে দাঁড়ালেন আমজাদ। পিঠে দুইহাত বেঁধে কর্কশ গলায় বললেন,
“ ওদিকে কোথায় যাচ্ছো?”
ইকবালের সব হাওয়া ওখানেই ছেড়ে দিলো সহসা। মিইয়ে গেল ডরে। আমজাদের দাঁড়ি নেই,তবে আগেকার জমিদারদের মতো রাজকীয় গোফ আছে একটা। ইকবালের ওই গোফ দেখলেই ভারি ভয় লাগে। চুল সিঁথি করা,সব সময় রুক্ষ চেহারা। এ জন্যেই না হিটলার ডাকে ইকবাল। ও তুতলে বলল,
“ ও-ওপরে আঙ্ককেল।”
“ ওপরে কী কাজ তোমার?”
“ ধূসরের ঘরে …”
“ একদম না। তোমাকে আমি সাবধান করে দিচ্ছি,আমার ছেলের থেকে দূর…”
কথার মাঝেই সুমনার বাবা হাজির হলেন। পিঠে হাত রেখে বললেন,
“ বাবা আমজাদ! তুমি এখানে?”
আমজাদ ফুঁসতে থাকা মুখটা বদলে গেল অমনি। মূহুর্তে ঠোঁটে হাসি টানলেন। বললেন,
“ জি জি। কিছু দরকার?”
দুজন কথায় ব্যস্ত হতেই ইকবাল পালানোর পথ পেলো। সুড়ুৎ করে ছুটন্ত ঘোড়ার মতো উঠে গেল সিঁড়িতে। ধুপধাপ পা চালিয়ে বিড়বিড় করল,
“ ব্যাটা হিটলারের হিটলারি যায় না। মোটে দেখতে পারে না আমাকে। দুদিন যাক,ঠিক আমার বাচ্চা দিয়ে ব্যাটাকে নানা ডাকিয়ে ছাড়ব। দাঁড়ান হিটলার শ্বশুর, দাঁড়ান।”
ঘরের চৌকাঠ হতেই খুব জোর চামচ নাড়ার শব্দ পাওয়া গেল। ইকবাল পর্দা সরিয়ে উঁকি দিলো তড়িৎ। রুমের কফি স্টেশনের সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ম্যাংগোজুসের গ্লাসটায় জোরে জোরে চামচ নাড়ছে ধূসর। কিন্তু ওটা তো জুসের গ্লাস। তাহলে মেশাচ্ছে কী?
ইকবাল গলা ঝেরে ভেতরে এলো।
পায়ের শব্দেও ধূসর ফিরল না। অমন গাট গয়ে দাঁড়ানো দেখে নিজেই এগিয়ে পাশে এসে দাঁড়াল ছেলেটা। জিজ্ঞেস করল,
“ কী করছিস?”
আবার নিজেই বলল,
“ ওহ,চিনি মেশাচ্ছিস? কেন, মিষ্টি হয়নি?”
ধূসর কিছু বলল না। গ্লাস তুলে ঢক করে পুরোটা খেয়ে ফেলল। ইকবাল বুঝল না হতচ্ছাড়াটার হয়েছেটা কী? ভাবতে গিয়েই মাথায় বাজ পড়ল ওর। চোখ প্রকট করে ভাবল – কোনো ভাবে কি ওর আর পুষ্পর কথা ধূসর জানতে পেরে গিয়েছে? বন্ধুর এই বিশ্বাসঘাতকতার কষ্টে ধূসর কি বোবা হয়ে গেল? বন্ধুত্বটা আবার নষ্ট করবে না তো! ইকবালের ঘাম ছুটে যাওয়ার দশা। শ্বাস-প্রশ্বাস বেড়ে এলো। ঢোক গিলতে গিলতে ডাকল,
“ ধূ-ধূসর!”
জবাব এলো না, আরো ঘাবড়ে গেল ছেলেটা।
“ ও ধূসর শোন না!”
ধূসর কথা না বলে বাইরে তাকাল। ওর ঘর খোলা বারান্দার সাথে মেশানো। এই বাড়ির সব গুলো বারান্দার গ্রীলই কোমর সমান বসানো। এক্সট্রা দরজা নেই, বিশাল বিশাল থাই গ্লাস টানতে হয়। বারান্দায় যাওয়ার আগে হাতের বামে শেল্ফ পরে একটা । দেওয়াল কেটে বানানো। কোনো কাঠ দিয়ে তৈরি করা হয়নি। শেল্ফের ফাঁকে ফাঁকে নানান রকম পুরোনো শোপিস,আভিজাত্যপূর্ণ নকশার ফুলদানি আর রঙীন রঙীন মোমবাতি রাখা। ধূসর সোজা গিয়ে বারান্দার গ্রিলে হেলান দিয়ে ফিরল এদিকে। ততক্ষণে রুমাল বের করে ইকবাল গলা ঘাম মুছল। খুব কষ্টে আওয়াজ এনে বলল
“ আমি তোকে বলতাম বিশ্বাস কর। আমি চাইনি এরকম কিছু করতে! বিশ-বিশ্বাস কর ধূসর।” ”
ধূসর নিষ্পৃহ, চুপ। মেঝের দিকে ভ্রু কুঁচকে চেয়ে চেয়ে নিচের ঠোঁট দাঁতের দলায় পিষল। হুট করে ডাকল,
“ ইকবাল!”
ও এগিয়ে এলো ছটফটিয়ে,
“ হু? হ্যাঁ হ্যাঁ!”
“ Its not just fascination;
She is completely consumed by me!”
থামল এক পল। বলল,
“ More than her age! More than my thoughts!”
চটক কাটার মত চাইল ইকবাল।
“ শী? তুই কি পিউপিউয়ের কথা বলছিস?”
ধূসর আবারো চুপ করে গেল। ইকবালের প্রানে পানি এলো। বুক চিতিয়ে হাসল এইবার। বলল,
“ হঠাৎ কী করে বুঝলি?”
ধূসর শীতল চোখে চাইল।
আস্তে-ধীরে বলল সবটা। ইকবাল হাঁ করে শুনলোও। নিজেও অবাক হয়ে বলল,
“ ও তোকে অনেক পছন্দ করে আমি জানতাম। কিন্তু এতটা! অবশ্য সেদিন যখন বললাম, ধূসর যা শক্ত মানুষ ওকে পাওয়া এত সহজ হবে না পিউ। ধৈর্য ধরতে হবে। কী বলল জানিস,বলে
আমি রাজি। তাতে আমার গোটা জনম চলে গেলেও,আমি পারব।”
ধূসরের মাঝে বিভ্রান্তি। শুধাল,
“ কিন্তু এই বয়সে কাউকে এত প্রবল ভাবে চাওয়া সম্ভব?”
“ হয়ত! দ্যাখ আমরা তো ভাবি এই বয়সের ছেলেমেয়ে ভালোবাসার কী বোঝে? ওদের কাজ পড়াশোনা করা। ইমম্যাচিউর ওরা। কিন্তু কী জানিস,আমাদের মনে প্রথম যে আবেগের জন্ম হয়,প্রথম যখন আমরা হৃদয়ের গভীরে ভালোবাসার মতো কিছু টের পাই সেটা কিন্তু এই বয়সেই। এসময় বিবেক থাকে না রে বন্ধু। সেজন্যে এই বয়সে কাউকে ভালোবাসলে সারাজীবনেও ভোলা যায় না। দেখিস না,কত ব্যাটামানুষ জীবনের প্রথম প্রেমিকাকে ভেবে ভেবে বুড়ো বয়সেও ডায়েরি লিখে রাখে। নাতি-নাতিনিকে রসিয়ে রসিয়ে গল্প শোনায়। আসলে,
এই বয়সে জাত-পাত মাটি,
প্রেমই শুধু খাঁটি!”
বলতে বলতে ইকবাল সিগারেট ধরাল। ধূসর নিষ্প্রভ নয়ন মেলে তাকাল ওর হাতের দিকে। ইকবাল মূহুর্তে নিজের হাত পেছনে নিয়ে বলল,
“ উহু,ইউ কান্ট বিয়ার ইট ভাইয়া! কাশি হবে। অভ্যেস নেই তোর।”
ধূসর একপেশে হাসল। ওর দৃষ্টি দেখেই ইকবাল মনের কথা বুঝে যায়। বলল,
“ তাহলে এমন কিছু নিয়ে আয়,দ্যাট আই ক্যান বিয়ার।”
“পিউপিউকে আনব?”
ধূসর চোখ গরম করে চাইতেই মিটিমিটি হাসল ইকবাল। ঘুরে এসে চেয়ারে পায়ের ওপর পা তুলে বসতে বসতে বলল,
“ খুব সিরিয়াস একটা কথা বলি?”
“ কী?!
“ পিউপিউ তোর প্রতি যা অবসেসড। ও ছেলে হলে তুই এতদিনে রেইপড হয়ে যেতিস!”
ধূসরের স্থির চোয়াল বদলে গেল,শক্ত হলো অমনি। তেড়ে এসেই পেছন থেকে কনুইয়ের ভাঁজ দিয়ে ইকবালের গলা প্যাঁচিয়ে ধরল। অমনি জিভ এক হাত বের করে কাইকুই করে উঠল ইকবাল,
“ আয়ায়া মরে গেলান,মরে গেলাম। আর বলব না, আর বলব না।”
ধূসর ছেড়ে দিলো। ধমকে বলল,
“ যা, এক্ষুনি যা এখান থেকে৷”
ইকবাল ঠোঁট উলটে উঠে দাঁড়াল। ফোস করে শ্বাস ফেলতে ফেলতে
গেল চুপচাপ। দরজা থেকে বেরিয়েও হঠাৎ এসে উঁকি দিয়ে বলল,
“ পিউপিউকে আনব কী? বাট রাইট নাউ শী কান্ট বিয়ার ইউ, ধূসর। তোর যা শরীর”,
ধূসর অমনি পায়ের জুতোতে হাত দিলো।
ছুড়ে মারার আগেই ইকবাল হুড়মুড় করে ছুটল পালাতে।
ধূসর মেজাজ খারাপ করে কিছুক্ষণ দেখল সেথায়। পরপর ভ্রু কুঁচকে এলো। চোখের সামনে ভাসল, “mine dairymilk”
লেখাটা। এরপর মাথায় এলো ডেইরিমিল্ক নিয়ে সেসব টিভিসি গুলোর কথা। একেকটা মেয়ে কী উদ্ভট ভাবে চকলেটগুলো খায়!
ধূসর চ সূচক শব্দ করে চোখ বুজে সরু নাক ফোলাল। বিড়বিড়িয়ে বলল,
“ এর শোধ আমি তুলব পিউ,আরেকটু বড়ো হ শুধু!”
চলবে… See less
Share On:
TAGS: আলতো ছোঁয়ায় সমুদ্রকথন, নুসরাত সুলতানা সেঁজুতি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ১৬
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৪৬
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৮৩
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৫২
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৬
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৪২
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ২১
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৭৬
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৪০
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ১১