Golpo romantic golpo আলতো ছোঁয়ায় সমুদ্রকথন

আলতো ছোঁয়ায় সমুদ্রকথন পর্ব ২১


#আলতো_ছোঁয়ায়_সমুদ্রকথন__(২১)

#নুসরাত_সুলতানা_সেঁজুতি

শিকদার বাড়ির বড়ো পার্কিং লট-এ দাঁড়িয়ে আছে পুষ্প। চোখেমুখে ভীষণ ভয়। ঘাবড়েও আছে খুব। একটু আগে ধূসর ফোন করেছিল। কেমন গম্ভীর গম্ভীর শব্দ ছুড়ে বলেছে,গেইটের সামনে এসে দাঁড়া।

এ নিয়েই পুষ্প ঘেমে অস্থির। ইকবালের সাথে বের হওয়ার তখন ওর এক ঘন্টাও পার হয়নি। কিন্তু এক ফোনকলে দুটোতেই ভয়ডরে আধমরা হয়ে তাড়াহুড়ো করে ফিরে এলো এলাকায়। এখন পুষ্পর গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। ধূসর ভাই কি কিছু দেখেছেন, বুঝেছেন কিছু? এ নিয়েই কি জেরা করতে চাইছে? হাতে ফোন নিয়ে জিভে ঠোঁট ভেজাতে ভেজাতে এমাথা-ওমাথা হাঁটছিল ও। ফোনটা দু সেকেন্ডে ফের ভাইব্রেট হলো। ইকবালের কল দেখে চ সূচক শব্দ করে কেটে দিলো পুষ্প। এই ছেলেটা আরেক টেনশান। ওর চেয়েও ভয় এর বেশি।

প্রেম করার আগে মনে ছিল না? পুষ্পর ভাবনার মাঝেই ভীষণ জোরালো শব্দ হলো। দারোয়ান লোহার গেইট টেনে খুলছেন। অমনি তটস্থ হয়ে দাঁড়াল পুষ্প। কাচ তোলা নীল গাড়িটা ওর সামনে এসে ভিড়তেই,ঢোক গিলল আলগোছে। ড্রাইভিং এর জানলার কাচটা নামল,বেরিয়ে এলো ধূসরের শ্যামলা মুখ।

পুষ্প অমনি ব্যস্ত ভাবে বলল,

“ ভা-ভাইয়া,ক-কী হয়েছে?”

“ ওকে ভেতরে নিয়ে যা।”

ধূসরের পাশে আরিফ বসেছিল। পুষ্প ভাবল,ওর কথা বলেছে। ওর দিকে চাইতেই সব দাঁত বের করে হাসল আরিফ। পুষ্প ভড়কে ভাবল- একে আবার নিয়ে যাব কেন?

ওর থতমত খাওয়া মুখটা দেখে, আরিফ নিজেই বলল

“ আমাকে না,আমাকে না। পিউ আপুকে নিতে হবে।”

“ পিউ!”

পেছনের গাড়ির কাচ তোলা ছিল,এসি চলছিল বলে। পুষ্পর জবাব হিসেবে দরজাটা ঠেলে আস্তেধীরে নেমে এলো পিউ। বোনের বিধ্বস্ত, ক্লান্ত চেহারাটা দেখে এক চোট হকচকায় পুষ্প। উদ্বেগ নিয়ে বলে,

“ কী হয়েছে ওর? কী হয়েছে পিউ?”

পিউ মাথা নোয়াল। পুষ্প দেখল ওর কোমরের শার্টটাকে। এই শার্ট পরে ধূসর ভাই সকালে বেরিয়েছিল না? মেয়ে মানুষ তো,আসল ঘটনা বুঝতে পুষ্পর বেশি সময় লাগেনি। তবে অবাক হয়েছে ওকে ধূসরের সাথে দেখে। এই সময় তো পিউয়ের কোচিং-এ থাকার কথা।

ধূসর তক্ষুনি বলল,

“ বড়ো মাকে বলিস,আমার ফিরতে দেরি হবে। আর তোর মেজো মাকে বলিস,না খেয়ে যেন বসে না থাকে।”

এরপর গাড়ির স্টিয়ারিং আস্তে আস্তে ঘুরিয়ে ইউটার্ণ নেয়ার প্রস্তুতি নিলো সে। গাড়ির সামনের অংশ বাঁক নিলো। চারটে চাকা সামনে-পেছনে কবার গিয়ে গেইটের দিকে ঘুরল,ঐ পুরোটা সময় নিজের নির্লিপ্ত চোখদুটো উইন্ডস্ক্রিন ভেদ করে,ওইপাশে দাঁড়ানো একটা স্নিগ্ধ মুখে ফেলে রাখল ধূসর। পিউ তখনও মাথা নোয়ানো। পেটের কাছে বেঁধে রাখা দুইহাতের আঙুল কচলাচ্ছিল সমানে। এখনো ওর লজ্জা কাটেনি। দু দুটো ছেলের সামনে এ কী বিড়ম্বনা! তাও আবার ধূসর ভাইয়ের কাছে! এখন কদিন তো ও মানুষটার দিকে চাইতেও পারবে না।

ওরা যেতেই পুষ্প হতাশ গলায় বলল,

“ তোকে কতবার বলেছি,ডেইট মনে রাখতে। হলো তো?”

পিউ ঠোঁট উল্টায়।

“ ধূসর ভাইকে কোথায় পেয়েছিস?”

“ রাস্তায়।”

“ ভালো হয়েছে,চল।”

পিউ এগোলো অন্দরের দিকে। অথচ যেতে যেতে হাজার কয়েকবার পিছু ফিরে দেখল সে। যদিও ধূসরের ছায়াও সেখানে ছিল না। গাড়িটাও কবেই উধাও হয়ে গেছে। তাও পিউ দেখল। দেখেই গেল। চেয়ে রইল ধুলোমাখা রাস্তায়। বুকের ঢিপঢিপেের সাথে অনুভব করল,আজ যেন আরো বেশি করে ধূসরের প্রেমে পড়ে গেল সে। আরো বেশি করে বাড়ল তার প্রখরতা।

যখন গোসলের জন্য ওয়াশরুমে ঢুকল পিউ,বেসিনের আয়নায় তাকাতেই চোখে ভাসল ধূসর ফিরে এসে ওর হাত ধরার দৃশ্য। কাঁপা হাতটা তুলে মুখের সামনে ধরল মেয়েটা। শিউরে উঠল ওই খসখসে শক্ত হাতের ছোঁয়া মনে করে। ধূসরের শার্টটা দেখল তারপর। এই শার্ট পিউ পারভীনকে ধুতে দেবে না। ও নিজের হাতে ধোবে,নিজে ইস্ত্রি করবে। শার্টটা পিউ বুকে চেপে ধরে। দুহাতে তুলে চক্কর কাটে। বাথটাবে পানির ট্যাপ ছেড়ে রাখা ছিল। পানি ভরে গেছে। পিউ ঝুঁপ করে শার্টটা সহ চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ল সেখানে। পানি উথলে উঠল চারদিকে। তলিয়ে গেল ফ্লোর। ওইটুকু গভীরতা পিউয়ের ছোট্ট শরীর গিলে নিলো সহসা। ভিজে গেল ও,ওর ধূসর ভাইয়ের শার্ট। কিন্তু পিউয়ের ভাবান্তর হওয়ার নাম নেই। শার্টটা তখনো বুকের ভেতর মিশিয়ে নেয়ার চেষ্টায় সে। ভিজে চুপচুপে হওয়া শরীর,অথচ বুকের খাঁজে লুকিয়ে রাখা প্রেমের তালে গুনগুন করে উঠল,

“ হায় মেরা দিল,

চুরাকে লে গায়া,

চুরানে ওয়ালায়ায়ায়া…

মেরা কাতিল!”

***

রওনক বাড়ি ফেরে সন্ধ্যার পর। তাও যদি পার্টি অফিসে বেশি চাপ না থাকে তাহলে। সেই ছেলে আজ দুপুর বারোটায় ঘরের বেল বাজাল। রোজিনা খাতুন অবাক হলেন। তার চেয়েও বেশি চমকে গেল মারিয়া। ও নিজেও এই মাত্র ঘরে ফিরেছে। খুব তাড়াহুড়ো করে গায়ের জামা পালটে বারান্দায় মেলে দিলো মারিয়া। ব্যাগটা ঢুকিয়ে রাখল ড্রয়ারে। রোজিনা খাতুন বললেন,

“ কী রে, চলে এলি, শরীর খারাপ নাকি?”

রওনক এদিক-ওদিক চেয়ে বলল,

“ মারিয়া কোথায়?

“ ঘরেই আছে।”

রওনক হনহন করে বোনের রুমে ঢুকল। মারিয়া বারান্দা থেকে ভেতরে এসে দাঁড়াতেও পারল না, বড্ড শক্ত প্রশ্ন ছুড়ল,

“ কোথায় গিয়েছিলি?”

মারিয়ার গলা শুকিয়ে গেল অমনি। মায়ের দিকে দেখল এক পল।

“ সানজুদের বা-বাড়ি।”

“ সানজুদের বাড়ি বাড্ডায়?”

মাথা নিচু করে ফেলল মেয়েটা। রোজিনা খাতুন বললেন,

“ কিছু হয়েছে?”

“ কী হয়েছে তুমি জানো না? ভান করছো আমার সামনে! তোমার মেয়ে গার্মেন্টসে চাকরি নিতে গিয়েছিল। কত বড়ো সাহস ওর!”

রওনকের এক চিৎকারে ঘরবাড়ি নিস্তব্ধ রইল কিছু সময়। রোজিনা অবাক হয়ে মেয়ের দিকে চাইলেন। মারিয়ার চোখ জলে ভরে গেছে।

মাথা নিচু। রওনক এগিয়ে এসে বোনের এক হাত চেপে ধরে বলল,

“ তোকে কি আমি খেতে-পরতে দিই না?

আজ অবধি তুই কিছু চেয়েছিস আর আমি দিইনি এমন হয়েছে?

তাহলে তুই গার্মেন্টসে চাকরি খুঁজতে কেন গেলি? কী,উত্তর দে! চুপ করে থাকবি না মারিয়া।”

“ নাকি আমি

তোকে দামি কাপড় দিতে পারি না,মাস শেষে ১০/২০ হাজার টাকা হাত খরচ দিতে পারি না। তোকে একটা বিলাসবহুল লাইফ দিতে পারিনি বলে আমাকে অপমান করতে গেছিলি মারিয়া!”

মেয়েটা যেন আঁতকে উঠল এবার। ভেজা গলায় বলল,

“ ভাইয়া!”

“ কী ভাইয়া? তোকে আমি বলেছিলাম মন দিয়ে পড়াশোনা করতে। বাকি সব আমি সামলাব, বলিনি! তাহলে তুই চাকরি খুঁজতে কেন গিয়েছিলি? আমাকে ছোটো করতে!”

মারিয়া কেঁদে কেঁদে বলল

“ আমি শুধু তোমাকে একটু সাহায্য করতে চাইছিলাম। চাইছিলাম, তোমাকে আবার পড়াব।”

রওনকের পাথুরে মুখটা বদলাল। রোজিনা বললেন,

“ তুই পড়া ছেড়ে দিয়ে সংসারের হাল ধরলি। আমি অসহায়,ব্যর্থ মা! পারিনি নিজে কিছু করতে। তাই মারিয়া যখন বলল,ও চাকরি-বাকরি করে তোকে আবার পড়ার সুযোগ করে দেবে,তখন আমিও না করতে পারিনি বাবা।”

রওনকের চোখ ছলছল করলেও,মুখটা শক্ত দেখায়। মারিয়া ভাইয়ের হাত ধরে নিজের দিকে ফেরাল। খুব আকুল হয়ে বলল,

“ সরি ভাইয়া! তুমি কষ্ট পেও না,প্লিজ! প্লিইজ…”

রওনক ফিরল বোনের পানে। ফোস করে শ্বাস ফেলে মাথায় হাত রাখল। মোলায়েম স্বরে বলল,

“ মারিয়া,তুই আমার কাছে কী তুই নিজেও জানিস না। আব্বা মৃত্যুর আগে বলেছিলেন,তিনি না থাকলেও আমি যেন তোর মাথার ওপর বাবার ছায়া হয়ে থাকি৷ আমি নিজের সবটা দিয়ে তোকে আর মাকে একটু ভালো রাখতে চাই। এইটুকু বয়সে তুই গার্মেন্টসে চাকরি নিয়ে গাধার খাটুনি খাটতে যাচ্ছিলি? আমি নিজের চোখে দেখে এসব কীভাবে মেনে নেব?

তুই পড়বি,অনেক দূর যাবি। আমার,বাবার,মায়ের কত স্বপ্ন তোকে নিয়ে। সেসব রেখে কী চাকরির ভূত মাথায় ঢুকিয়েছিস বলতো! ভাইয়া কি মরে গেছি?” মারিয়া ভাইয়ের বুকে এক ঝাঁপ দিয়ে জড়িয়ে ধরে। হুহু করে বলে,

“ এভাবে বলো না,ভাইয়া। আর করব না আমি।”

রওনক ভেজা চোখ নিয়ে বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,

“ গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট না হওয়া অবধি,এসব যেন মাথায় আনতে না দেখি। তারপর যা ইচ্ছে করিস। তখন ভালো একটা চাকরি করবি,আমার আর মায়ের মুখ উজ্জ্বল করবি। আর তারপর মায়ের পছন্দ মতো ছেলের সাথে তোর বিয়ে দেবো আমি।”

মারিয়া চমকে মুখ তুলে চাইল। হাসল রওনক। বলল – যা,একটু কিছু বানিয়ে নিয়ে আয়। খিদে পেয়েছে!”

নিজেই বোনের চোখদুটো মুছিয়ে দিলো সে। ঠেলেঠুলে তাগিদ দিলো রুম ছাড়ার। মারিয়া বেরিয়ে আসতে আসতেও বিভ্রান্ত হয়ে পড়ল। মায়ের পছন্দের ছেলে বলতে কাকে বোঝাল ভাইয়া? ঐ ধূসর ছেলেটাকে?

****

দিন এত দ্রুত এগোয়! হিসেব রাখা যায় না।

পুষ্পর এইচ এস সি পরীক্ষা শেষ হয়েছে কিছু দিন হলো। দুদিন পর ভার্সিটিতে উঠবে মেয়েটা। পুষ্পর ভারি শখ ছোট চাচার মতো লইয়ার হবে। তাই প্রাইভেটে পড়াবেন ঠিক করেছেন আমজাদ। পিউ এখন ইন্টার মিডিয়েট সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্রী। আর কদিন বাদেই ওরও সতেরো তম জন্মদিন। আপাতত বাড়িতে এ নিয়ে একটা আলোচনার জোয়ার বয়ে যাচ্ছে। গত জন্মদিনে তো পিউয়ের এস-এস-সি পরীক্ষা ছিল। কোনো আয়োজনই হয়নি। পিউ এই বাড়ির ছোট মেয়ে,সবার আদরের। তারওপর একটা দুর্দান্ত রেজাল্ট করায় সবার আরেক ধাপ মন জয় করে ফেলেছে সে। গতবারই মা-বাবা সবাই বলেছিলেন আগামী জন্মদিন ধুমধাম করে পালন করার কথা! পিউ তো তা ভোলেনি।

আমজাদ গত দুদিন বাড়ি ছিলেন না। কুমিল্লা গিয়েছিলেন ব্যবসায়িক কাজে। এই ব্যবসা শুনতে যত সহজ,কর্মে যেন ততখানি খাটুনির। বারবার এদিক-ওদিক ছুটতে হয়। গত মাসে আফতাব গিয়েছিলেন, তাই এবার ভাইকে একটু আরাম দিয়ে নিজেই গেলেন ভদ্রলোক। এই আজই ফিরলেন দুপুরের দিকে। এলেন,খেলেন বিশ্রাম নিয়ে সন্ধ্যে বেলা নামলেন লিভিংরুমে। শিকদার বাড়ি সন্ধ্যার চা সবাই একইসাথে খায়। চায়ের আসর নয়,যেন উৎসব এটা! রাদিফের বয়স বারো বছর। এই বয়সের বাচ্চাদের চা দেয়া হয় না। কিন্তু বাড়িময় এই উৎসবের পাল্লায় সে নিজেও কাপ ভরতি চা খেয়ে বসে।

বাড়িতে আফতাব,আর আমজাদ ছিলেন। বাকিরা যে যার কাজে। আজমল রাঙামাটি, আনিস কোর্টে,আর সাদিফ তার অফিসে। কেবল আমজাদের ভাষ্যমতে শুধু ঘোড়ার ঘাস কাটতে বেরিয়েছে ধূসর। আসরে

মিনা,রুবা,জবা সকলেই ছিলেন। সুমনা চাকরিতে জয়েন করেছেন ডিসেম্বরের দিকে। ফেরার সময় হয়েই এলো প্রায়।

আমজাদ কথা বলতে বলতে খেয়াল করলেন,পিউ বড্ড উশখুশ করছে। কিছু যেন বলতে চায়! ভদ্রলোক ইশারায় কাছে ডাকলেন। অমনি দুরন্ত পাখির মতো নিজের জায়গা ছেড়ে উঠে বাবার পাশে গিয়ে বসল পিউ। হাসল স্ফূর্ত চেহারায়। মেয়েটার হাসি আমজাদ আপ্লুত নজরে চেয়ে চেয়ে দেখেন। পুচকে বাচ্চাটা কত বড়ো হয়ে যাচ্ছে। কলেজে পড়ে,দুদিন পর ইউনিভার্সিটি যাবে। আমজাদ মন দিয়ে দেখেন পিউয়ের হাসিহাসি গোলাকার মুখ। চোখদুটো তার মায়ের মতো ভাসা ভাসা৷ চাউনিতেই যেন আস্ত গল্প বলে দেয়।

হাসেও একদম তার মা জোবাইদা বেগমের মতো করে। আমজাদের বাবা জাভেদ শিকদার শ্যামবর্ণের ছিলেন। খুব লম্বা-চওড়া পুরুষ। শুনেছিলেন,একবার সুন্দরবনে বন্ধুদের সাথে শিকারে বেরিয়েছিলেন তিনি।

সেখানে গিয়েই জোবাইদা বেগমকে দেখলেন প্রথম। রমণীর বয়স নাকি মাত্র ১৪ বছর সেসময়। কিন্তু রূপে এত মজে গেলেন জাভেদ,বিয়ের প্রস্তাব দিলেন রাতারাতি। জোবাইদা ছিলেনও

অতীব ফরসা,গুণী মেয়ে। সত্যিই তো গুণী! কী নিপুণ যত্ন নিয়ে সংসার সামলেছেন। পরিবারকে এক সুতোয় বেঁধে রাখার মন্ত্র শিখিয়েছেন ছেলেদের৷ পিউও কি মায়ের মতো এমন হবে! মেয়েটা যা চঞ্চল,বাচ্চামো করে সারাদিন।

পিউ তক্ষুনি জিজ্ঞেস করল,

“ কী দেখছো আব্বু?”

আমজাদ নড়ে উঠলেন।

“ না,কিছু না। তুমি কি আমায় কিছু বলতে চাইছো?”

পিউ ধরা পড়ার মতো মুখ করে মাথা নাড়ল। পুষ্প ওপাশ থেকে বলল,,

“ এক গাদা বায়না নিয়ে এসেছে আব্বু। আমাকে বলতেই আমি বলে দিয়েছি, এসব শুনে আব্বু জীবনেও রাজি হবে না। কিন্তু ওর নাকি বিশ্বাস তুমি তোমার মেয়েদের কথা রাখবেই রাখবে।”

আমজাদের মুখটা দেখার মতো হলো। আচ্ছা বিপাকে পড়লেন। এখন রাজি না হলে কেমন দেখায়? আফতাব বললেন,

“ পিউ মা, তুমি আমায় বলো তো,কী লাগবে?”

“ এটা বাবাকেই শুনতে হবে চাচ্চু। বাবা ছাড়া হবে না। তোমাকে বললেও তুমি বাবাকেই জিজ্ঞেস করবে।”

রহস্যজনক কথা। গুরুজনরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করলেন। রুবায়দা কৌতূহলে শুধান,

“ কী লাগবে রে, মা?”

পিউ একটু নড়েচড়ে বসে বাবার দিকে চাইল। বাকিরা সবাই ওর দিকে চেয়ে। মিনমিনিয়ে বলল,

“ আব্বু, সামনে তো আমার জন্মদিন। তুমি তো বলেছিলে, আমি যেভাবে চাইব এবার সেভাবেই আয়োজন করবে।”

“ হ্যাঁ , করব তো। কী চাইছ বলো? কোনো সেন্টারে করব? বার্বি গাউন পরবে?…”

“ না না। এসব তো আগেই করে ফেলেছি। এবার ভিন্ন কিছু চাই।”

“ কী?”

পিউ একবার পুষ্পকে দেখে বলল,

“ বলছিলাম যে, চলো না আব্বু, আমরা সবাই মিলে কোথাও বেড়াতে যাই।”

সকলে কিছু চমকাল। এরকম কথা পিউয়ের থেকে আশা করেনি। শুধু পুষ্প বসে রইল মুখ খিচে। প্ল্যানটা ওরই। আমজাদ অবাক হয়ে বললেন,

“ ট্যুর! এই সময়? “

“ হ্যাঁ এখনই তো প্রাইম টাইম। বছরের শুরু। সবে সবে শীত কমছে,হালকা গরম পড়ছে। কারো স্কুল-কলেজে ক্লাসের চাপ নেই। প্লিজ আব্বু! তাছাড়া শেষ আমরা সবাই মিলে কবে ট্যুরে গেছিলাম বলোতো?”

পুষ্প আগ বাড়িয়ে বলল,

“ সেই ধূসর ভাই দেশে থাকতে। এরপর ওনাকে ছাড়া আম্মু -বাবা কেউ কোথাও যেতে চায়নি। এখন তো ভাইয়া এসে গেছে। তাহলে যাওয়াই যায় না! না মানে আমি এমনি বললাম। তোমাদের ইচ্ছে।”

কথা শেষেই মিনা ওর মাথায় চাটি মারলেন। গমগম করে বললেন,

“ আর ইচ্ছা ইচ্ছা করতে হবে না আপনাকে। সব বুঝে গেছি আমি। এসব আপনার মাথা দিয়েই বেরিয়েছে তাই না?”

“ আমি,কই? পিউ তোকে আমি কিছু বলে দিয়েছিলাম?”

পিউ সজোরে দুইদিকে মাথা নেড়ে না বোঝাল।

“ থাক থাক,আপনাদের দুজনকেই আমার চেনা আছে।”

জবা বললেন,

“ আপা ছাড়ো না। বললেও খারাপ তো কিছু করেনি। ভালোই করেছে। ভাইজান,ইয়ে বলছিলাম যে, ব্যাপারটা করলে কিন্তু মন্দ হয় না। মাঝেমধ্যে এরকম ফ্যামিলি ট্যুরের দরকার আছে না? বাচ্চাদেরও মন ভালো থাকে। আর আপারাও তো সহজে কোথাও বের হয় না। তারাও ঘুরতে পারবে। কী বলেন মেজো ভাইজান?”

আফতাব চেয়ে রইলেন ভাইয়ের দিকে। তার কাছে আমজাদ যা বলবেন তাই শিরধার্য।

ভদ্রলোক একটু ভেবেচিন্তে বললেন,

“ হুম্মম,মন্দ তো হয় না। দেখো,আমি আর আফতাব ব্যবসা সামলাই। চাইলেই যে কোনো সময় কোথাও চলে যেতে পারি। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে বাকিদের। আনিসও ম্যানেজ করতে পারবে। তবে আজমল ছুটি পাবে কিনা! আবার সাদিফ, সুমনা দুজনেই বলতে গেলে নতুন নতুন জয়েন করল,ওরাও সময় মেলাতে পারবে কিনা! যেতে পারবে কিনা,সেটাও তো দেখতে হবে?”

“ আমাদের রেখে কোথায় যাওয়ার কথা হচ্ছে?”

আনিসের উৎফুল্ল আওয়াজ শোনা গেল। সবাই ফিরল দরজার দিকে। কোর্ট থেকে ফেরার পথে সুমনাকে সাথে নিয়ে আসেন তিনি। স্বামী-স্ত্রী দুজনকে দেখেই মিনা বললেন,

“ সুমা,ভালো সময় এসেছিস। দ্যাখ,বিচ্ছুরা কী প্ল্যান করছে দ্যাখ। বার্থডে প্রোগ্রামের নামে ফ্যামিলি ট্যুরের বায়না ঠুকে দিলো!”

সুমনা শুনেই লাফিয়ে উঠলেন,

“ ফ্যামিলি ট্যুর। কবে আপা? দারুণ হবে তো। আমি তো কোনোদিন শহরের বাইরেই যাইনি। আমি কিন্তু যাবই।”

আনিস বললেন,

“ কদিন এত্ত ছোটাছুটি করেছি। মাথা হ্যাং হয়ে গেছে। ট্যুর হলে কিন্তু সত্যিই দারুণ হয়,ভাইজান।”

“ বাহ,সবাই দেখছি রাজি। এবার তাহলে সাদিফে…”

পুষ্প কথা কেড়ে নিলো,

“ সাদিফ ভাইয়ের সাথে আমাদের কথা আগেই হয়ে গেছে। ভাইয়াই তো বলল,পিউকে জন্মদিনের কথা তুলে তারপর ট্যুর নিয়ে বলতে।”

আসল কথা ফাঁস হয়ে গেছে। ফের আরেক দফা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল বড়োরা। একে অন্যের মুখ দেখে,পরপর জোরে হেসে উঠল। পিউ নিশ্চিত হতে শুধাল,

“ তাহলে আমরা যাচ্ছি তো আব্বু?”

“ সবাই রাজি থাকলে আমিও রাজি। কিন্তু আজমল!”

আফতাব বললেন,

“ ওকে চেনেন না ভাইজান? ফ্যামিলি ট্যুর শুনলে বলবে, লাগলে আমি চাকরি ছেড়ে দিচ্ছি,তাও ট্যুর মিস হবে না।”

আরেক বার হাসির স্রোত বইল বাড়িতে। আনিস শুধান,

“ তাহলে কোথায় যাব? কী রে পুষ্প,কী ঠিক করলি?”

সে বলল,

“ কক্সবাজার যাই?”

মিনা বললেন,

“ না না,কেউ ঠিকঠাক সাঁতার জানিস না। স্রোতে ভেসে টেসে গেলে? আর মানুষ কতবার এক জায়গায় যায় হ্যাঁ? গেলাম না,দুবার?”

“ আম্মু, তখন কত্ত ছোট ছিলাম। আচ্ছা ঠিক আছে,তাহলে সিলেট?”

জবা বললেন,

“ ওখানেও তো গেলাম। তাছাড়া বৃষ্টি ছাড়া সিলেটে মজা নেই রে পুষ্প।”

“ সাজেক? বান্দরবান?”

“ নাহ,পাহাড়ে বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে যাওয়া যাবে না। দু মিনিট হাঁটতে পারিসনা কেউ,আবার পাহাড়ে যাবে।”

মায়ের কথায় পিউ-পুষ্প হাল ছেড়ে দিলো। বিড়বিড়িয়ে বলল – তাহলে তোমরাই ঠিক করো। আমি তো আর জায়গার নামই জানি না।

গুরুজনরা ভাবতে বসেন। মিনা বলেন,এমন কোথাও যেখানে কদিন মন ভরে থাকা যাবে। তাড়াহুড়ো বাঁধবে না। গ্রামীণ পরিবেশ!

কিন্তু এমন জায়গা কোথায়? সকলের ভাবাভাবি আর নিরাশার মাঝ দিয়ে সুমনা হুট করে বললেন,

“ আপা,ভাইজান,অভয় দিলে একটা কথা বলি?”

“ বলো! অনুমতি নিতে হয়?”

“ না মানে, সবাই মিলে আমাদের বাড়ি চলুন না!”

সকলে ঝট করে তার দিকে চাইলেন। আমজাদ শুরুতেই নাকচ করতে নিলে,সুমনা কথা কেড়ে নিয়ে বললেন,

“ কোনো সমস্যা হবে না। আব্বা,আম্মা দুজনেই বারবার বলেছেন,আপনাদের সবাইকে নিয়ে যেতে। বিয়েতে তো আপনারা কোনো কিচ্ছু করতে দিলেন না। আপারাও কেউ গেল না। বাচ্চাগুলোকেও নিতে পারলাম না। এই সুযোগটা আমি মিস করতে চাইছি না ভাইজান। বড়ো আপা যেমন চায় আমাদের গ্রাম ঠিক তার চেয়েও বেশি সুন্দর। তাছাড়া পিউ -পুষ্প রাদিফ ওরাও তো গ্রামের ঐ সৌন্দর্য, মনোরম পরিবেশ,বিশুদ্ধ বাতাস কখনো দেখেনি। প্লিজ ভাইজান এই সুযোগে চলুন না। আমরা একটা ছোটোখাটো পিকনিক করে ফেলি?”

এত অনুনয় কী ফেলা যায়? আমজাদ দোনামনা চেহারায় ভাইদের দিকে চাইলেন। সকলেই তার পানে চেয়ে দেখে বললেন,

“ সবাই শুধু আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। আচ্ছা,আচ্ছা যাব।”

মূহুর্তে হইহই করে উঠল বাচ্চারা। রাদিফ দুইহাত তুলে কবার লাফিয়ে চ্যাঁচাল,ইয়েএএএ ট্যুর হবে ইয়েএএএ! পিকনিক হবে ইয়েএএএ।”

ওর অবস্থা দেখে হাসলেন সবাই। সুমনা তাড়াহুড়ো পায়ে হাতে ফোন নিয়ে ছুটলেন ওয়াজিদ সাহেবকে খবর দেয়ার জন্যে। আফতাব বললেন,

“ ভাইজান,একটা বাস ভাড়া করি। গাড়িতে আলাদা আলাদা যেতে হয়। পিকনিক যখন হবে,আলাদা যাব কেন?”

আনিস বললেন,

“ আমার চেনাজানা লোক আছে। আমি কথা বলছি।”

পিউ-পুষ্প উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ল। ঘরে ছুটল দুবোন কোন কোন জামা নেবে তা ঠিক করতে।

ধূসর বিদেশ যাওয়ার আগের বছর শেষ ট্যুর হয়েছিল এ বাড়ির। আবার হতে যাচ্ছে। তাও সুমনাদের গ্রামের বাড়ি,বরিশাল। কী আনন্দের কথা ভাবুন তো!

***

ধূসর রাতে বাড়ি এলো যখন, তখন বাজে সাড়ে এগারোটা। তাও ফোন করে জরুরি ভাবে তলব করে ডেকেছেন আনিস। ছোটো চাচা ধূসরের কাছে বন্ধুর মতো। তাই সব ফেলে এলো তাড়াতাড়ি। তবে বাড়ি ঢুকেই একটু অবাক হলো ধূসর। এই সময় তো কেউ ঘুমায় না। তাহলে বসার ঘর ফাঁকা কেন? দোতলা থেকে হাসাহাসি আর অনেকগুলো কণ্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে। ধূসর কিছু না ভেবেই ওদিকে রওনা করল। আনিসের ঘর ভরা মানুষ। এক বাড়ির সবাই-ই যেন এখানে। সাদিফ,রাদিফ, পিউ কে নেই? যে যেভাবে যেখানে পেরেছে বসেছে সেথায়। ফ্লোর,সোফা,খাট কিছু বাকি নেই। আমজাদ একা বসেছিলেন রকিং চেয়ারে। মুখটায় হাসি ছিল। ধূসর চৌকাঠে এসে দাঁড়াতেই অমনি গুরুগম্ভীর হয়ে গেল সেটুকু। পরপর ভ্রু দিয়ে ইশারা করলেন মেজো ভাইকে। ইশারায় যেন বোঝালেন – ঐ, এসেছে তোমার নেতাজি।

আফতাব কাচুমাচু হাবভাব করে বসে থাকেন। তবে দু ভাইয়ের এসব কাণ্ড ধূসর কোনোদিন দেখে না। আজও এড়িয়ে গেল। সোজা ছোটো চাচাকেই ডাকল,

“ চাচ্চু!”

আনিস ফিরেই বললেন,

“ ধূসর এসে গেছিস? বোস বোস।”

“ বাড়িতে কি বিশেষ কিছু আছে?”

বলতে বলতে একবার সবাইকে দেখল ধূসর।

“ আছে মানে! চমৎকার কিছু আছে। আমরা ঘুরতে যাচ্ছি হাহহা।”

ধূসর প্রথমে ভাবল,চাচা-চাচি হানিমুনে যাচ্ছে।

বলল, “ ভালো। কোথায় যাচ্ছো?”

“ তোর ছোটো মায়ের বাড়িতে। বরিশাল!”

ও কপাল কুঁচকে বলল,

“ ওখানে?”

রুবায়দা বললেন,

“ হ্যাঁ, সুমনা এত জোর করল। না গিয়ে উপায় কী?”

সুমনা বললেন,

“ ধূসর,তোকেও কিন্তু যেতে হবে। আমি একদম না শুনব না।”

ধূসর ফোস করে শ্বাস ফেলে বলল,

“ আম এক্সট্রিমলি সরি ছোটো মা। আমার একদমই সময় হবে না।”

পিউ খুব আকুল হয়ে চেয়েছিল। ধূসর ভাই কী বলবেন, সে নিয়ে এক্সাইটেড ছিল মেয়েটা। অথচ ঐ মুখে না শুনেই খুশি বদলে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে গেল যেন। সবার মধ্যেই আর্তনাদ করে বলল

“ সে কী! কেন,কেন যাবেন না?”

প্রত্যেকে ঝট করে চাইল ওর দিকে। শুধু ধূসর চোখ বুজে ঠোঁট ফুলিয়ে শ্বাস ফেলল। পিউ মিইয়ে গেল লজ্জায়। মাথা নুইয়ে নিলো তড়িৎ।

আমজাদ চটে বললেন,

“ তা, আপনার কী এমন রাজকার্য আছে শুনি, যে সময় হবে না?”

“ এ সপ্তাহে পার্টি অফিসে ত্রা…”

আফতাব কথা কেড়ে নেন। ফুঁসে বলেন,

“ চুপ করো তো বেয়াদব ছেলে। পার্টি অফিস আর পার্টি অফিস। সারাদিন এক নাম। মন চায় এই অফিসটাকে বেটে খাইয়ে দিই। যত্তসব!”

আনিস ভাইয়ের হাতের ওপর হাত রেখে শান্ত হতে বোঝালেন। ওকে শুধালেন,

“ একদমই যেতে পারবি না?”

ধূসর দুদিকে মাথা নাড়ল।

সাথে প্রশ্ন করল, আর কিছু বলবে?”

“ একবার চেষ্টা করে দেখিস না বাবা। গেলে ভালো লাগতো!”

বড়ো মায়ের কথায় ও একটা দ্বায়সারা জবাব দিলো,” ওকে।”

বেরিয়ে গেল এরপর। তিন তলায় নিজের ঘরের পথ ধরল। শুনতে পেলো আমজাদ যা-তা বলে বকাঝকা করছেন। মাঝে ইকবালের নামও উঠল। ধূসর চ সূচক শব্দ করে। বড়ো আব্বু ওকে বাচ্চা ভাবে কেন? কেনই বা ও কিছু করলে ইকবালকে টানে!

ও সব নিতে পারে,বন্ধুকে নিয়ে কিছু নিতে পারে না। তাও ধূসর উত্তর দিতে ফেরত এলো না। বরং পায়ের গতি বাড়িয়ে সোজা হনহন করে ঘরের দিকে এগোলো। এদিকে ফোনের লাইনটা কেটেই ছুটে এলো পুষ্প। বাবার চিৎকারে ভড়কে গেছে সে। সেই সাথে একটু আগে দেখে যাওয়া মুখ গুলো শুকনো দেখতে পেয়ে ভারি চিন্তায় পড়ল মেয়েটা। গিয়ে পিউয়ের পাশে বসল। পিউয়ের চেহারায় অন্ধকার। এক ফোঁটা আলো যদি থাকে! পুষ্প ফিসফিস করে বলল,

“ কী হয়েছে রে,আব্বু এত রেগে গেল কেন?”

পিউ খুব বিষণ্ণ সুরে জানাল,

“ ধূসর ভাই যাবেন না। না করে দিলেন!”

“ উফ,এদের দুই বন্ধুর যে কী সমস্যা। একজন নিজে যাবে না,আরেকজন অন্যদের যেতে দেবে না।”

“ ভাইয়া আবার কী করল?”

“ তোমার ভাইয়া যখন থেকে জেনেছে আমি বেড়াতে যাব,ফোনের পর ফোন দিয়ে যাচ্ছে। গ্রামে নাকি ছেলেপেলে থাকে,বখাটে থাকে। ওরা নাকি আমাকে লাইন মারবে। এই সেই কত কী ধ্যাত! আমিতো বলেই দিয়েছি,আমি যাবই।”

পিউ পোড়া শ্বাস ফেলল। ইকবাল ভাই তাও আপুকে নিয়ে কত কী ভাবেন! কত কেয়ার করেন ওর ব্যাপারে। আর ধূসর ভাই,পিউ কোথায় কী করছে,বেঁচে আছে;এক্স না নেই কোনো আগ্রহই নেই তার। সেখানে বাকিসব তো বহুদূরের ব্যাপার।

**

ধূসর যখন ঘরে ঢুকবে,পকেটে মুঠোফোনটা বাজল তখনই। এক অদ্ভুত গানের রিংটোন শুনে ওখানেই থামল সে। আশ্চর্য হলো বৈকি!

এই টোন তো ওর ফোনে সেট করা ছিল না। কী এক ঘ্যারঘ্যারে শব্দে বেজে চলছে,

“ আসছে গোপাল,যাচ্ছে গোপাল!

যুগের পরে যুগ কেটে যায় মানুষ তাকে ভোলে না। চলে না রে, চলে না রে তাকে ছাড়া চলে না।”

ধূসর স্ক্রিনে দেখল ইকবালের নাম উঠে আছে। বুঝল সে। দুপুরে ফোন টিপে এসব করে রেখেছে। নিজের নম্বরে এই টোন সেট করে দিয়েছে,যাতে ওও কল দিলেই ধূসর বুঝে যায়। এরকম গাধা দুনিয়ায় মনে হয় না আর কেউ রপ্তানি করতে পারবে!

রিসিভ করতে করতে ঘরে এলো ও। ওপাশে শোনা গেল ইকবাল হাঁপাচ্ছে একটু। তবে ছটফটে স্বর শান্ত করার চেষ্টায় বলল,

“ কী খবর বন্ধু, পৌঁছেছিস না?”

ধূসর বেসিনের ট্যাপ খোলে এক হাতে। আরেক হাতে ফোন কানে গুঁজে রাখা। চোখেমুখে পানি দিতে দিতে উত্তর দিলো,

“ হুম।”

“ ডাকল কেন? কিছু হয়েছে নাকি?”

“ না। চাচ্চু বেড়াতে যাচ্ছেন, আমি যাব কিনা! এইটুকুই!”

“ যাবি না?”

ধূসর রুমে এলো। তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বলল,

“ ওনারা দুজন যাচ্ছেন, আমি গিয়ে কী করব?”

ইকবাল কিছুটা হাহুতাশ করে উঠল,

“ ওনারা দুজন! ফ্যয়ামিলি ট্যুর দিচ্ছে নাকি শুনলাম।”

ধূসরের কপাল বেঁকে বসল। হাতটা থামল অমনি।

“ ফ্যামিলি ট্যুর!”

“ হ্যাঁ, সবাই যাচ্ছে। সবাই। তুই জানিস না?”

“ তুই কী করে জানলি?”

ইকবালের উত্তর তৈরি ছিল না। কিন্তু তাও থতমত খেল না আজ। ফটাকসে বলে দিলো,

“ পিউপিউয়ের সাথে কথা হচ্ছিল। তখন বলল। আগামী বৃহস্পতিবারই তো নাকি। বাসও ভাড়া হচ্ছে। কী বলিস,কিছু জানিস না?”

ধূসর একটু চুপ থেকে বলল,

“ ওহ!”

“ ও মানে? এখনো যাবি না? তোর জায়গায় আমি হলে কখন চলে যেতাম ভাই।”

“ কেন?”

“ কী কেন? আবার জিজ্ঞেস করছিস! আরে গ্রাম-গঞ্জের কথা জানিস কিছু? সারা জায়গায় উটকো ছেলেপেলে ঘুরে বেড়ায়। মেয়েদের উত্যক্ত করে। তারওপর তোর দু দুটো বোন থাকবে সেখানে। নতুন জায়গা, বয়স কম। ঐ কাজী নজরুলও তো যাবে তাই না?

দ্যাখ,পুষ্প বড়ো হয়েছে ও ভালো মন্দ বোঝে। কিন্তু পিউ তো ছোটোই। কেউ যদি ফুসলে ফাসলে ওকে পটিয়ে নেয়? ইস,বাচ্চা মেয়ে তো বুঝবেও না কার মনে কী আছে। যা সরল সহজ! বাকিরা থাকবে নিজেদের মতো। আন্টি-আঙ্কেলরা কি আর অত পাহারা দিতে পারবেন? আর পাহারা দেবেনও বা কেন? বলবেন,ঘুরতে এসেছ যাও ঘোরো। এই ফাঁকে পিউ যদি কারো প্রেমে-টেমে পড়ে যায়? তুই তো ওকে পাত্তা দিস না। ওর মন যদি ঘুরে যায়, তাও কোনো বখাটে ছেলের ওপর! কী যে হবে আমি সেটাই ভাবছিলাম তো,তাই মনে হলো তোর যাওয়া উচিত।”

“ আমি গিয়ে কী করব?”

গম্ভীর কণ্ঠটা শুনে ইকবাল হতাশ সুরে বলল,

“ তুই ওর বড়ো ভাইয়ের মতো না? একটু দেখে দেখে রাখতি!”

ধূসর ধমকাল মৃদূ স্বরে,

“ ফোন রাখ ইকবাল।”

ইকবাল লাইন কেটে মুখে হাত ঘষলো। এই ধূসরটা এমন বাঁকা কেন? ও ব্যাটা গেলে তারও একটা পথ তৈরি হতো না!

ধূসর ফোন হাতে দু সেকেন্ড থম ধরে দাঁড়িয়ে থাকে। নিচের ঠোঁট দাঁতে পিষে ভাবে কী যেন! তারপর ফোনটা টেবিলে রেখেই তড়বড়িয়ে বেরিয়ে আসে রুম ছেড়ে। সোজা সিঁড়ি বেয়ে নেমে চাচার ঘরে যায়। সেখানে এখন আবহাওয়া থমথমে। কারো ঠোঁটে হাসি নেই। সব চেয়ে বেশি মেঘ জমেছে এক ষোড়শীর মুখে। আমজাদ,আফতাব রেগে রেগে কথা বলছিলেন,মিনা বোঝাচ্ছিলেন কত কী! ধূসর জানে এসব তাকে নিয়েই হচ্ছে। ও সোজাসুজি ডাকল,

“ ছোট চাচ্চু!”

সবাই ফিরে চাইল আরেকবার। আনিসের প্রশ্নবিদ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে ধূসর বলল

“ আমি যাব।”

এক ঘোষণায় রেশ বদলাল রাতারাতি। চেহারা টানটান করে নিলো সকলে। আর এই হুট করে পাওয়া খুশিটা পিউ চেপে রাখতে পারল না।

এক লাফে দাঁড়িয়ে বলল,

“ সত্যিইইইই!”

ওর ওঠার তোড়ে কনুইয়ে বাড়ি লেগে কর্ণার শেল্ফের শোপিসটা ঝুপ করে পড়ে গেল মাটিতে। প্রচণ্ড আওয়াজ হলো। মিনা রেগে বললেন,

“ সব সময় লাফালাফি!”

পিউ মিইয়ে,শরীর গুছিয়ে জায়গায় বসল আবার। আনিস ভীষণ খুশি হয়ে বললেন,

“ আমি জানতাম,ধূসর ফ্যামিলি ট্যুর শুনলে না করবে না!”

আফতাব বললেন,

“ এত মুড সুইং হয় কেন তোমার?”

“ আপনারই রক্ত। হবে না কেন?”

আফতাব মুখ ফিরিয়ে নিলেন রেগেমেগে। কথা বলাই ভুল হয়েছে।

সুমনা বললেন,

“ যাক বাবা,আমার যা খারাপ লাগছিল। সবাই যাব,সেখানে একজন না গেলেই সব মাটি।”

সকলের উচ্ছ্বাস,উল্লাস আবার ফেরত এলো এখানে। ধূসর মিনাকে বলল,

“ বড়ো মা,আমার জামাকাপড় বের করে দিচ্ছি। লাগেজটা গুছিয়ে দাও।”

“ হ্যাঁ, আসছি চল।”

রুবা আটকালেন। বললেন,

“ আপা,আমি যাই?”

হাসলেন তিনি

“ যা।”

ধূসর ঘরে যেতে নিলো। উল্টোঘুরে পা বাড়াতেই কানে এলো পিউ-পুষ্পর স্ফূর্ত গলার শব্দ।

একজন-আরেকজনকে বলছে,

“ আমরা সেম সেম দুটো জামা নেব হ্যাঁ? শাড়িও নেব। অনেক ছবি তুলব।”

পিউ মাথা নাড়ে,

“ হ্যাঁ, সব আমি ইনস্টায় তোকে মেনশান করে পোস্ট করব।”

সুমনা বললেন,

“ ওখানে কিন্তু নৌকাও চড়া যায়। চড়বি?”

দুবোন লাফায়।

“ হ্যাঁ হ্যাঁ চড়ব।”

রাদিফও হইহই করে চড়বে জানাল। পিউ বলল,

“ শাড়ি ম্যানেজ করতে হবে না, আপু?”

“ দুদিন সময় আছে তো। সেম সেম দেখে দুটো কিনে আনা যাবে।”

“ ঠিক আছে। আপু, শুভ ভাইয়াও তো যাবে। সেবার না বলেছিলেন,গ্রামে গেলে উনিই ঘুরিয়ে দেখাবেন সব। আমরা কিন্তু ওখানে খুব মজা করব।”

মাথা স্থির রেখে আড়চোখের মনিদুটো ঘুরিয়ে গল্পে ব্যস্ত পিউয়ের দিকে চেয়ে রইল ধূসর। তার ধারালো,ক্ষুরধার দৃষ্টি পিউ দেখেনি। ও জানে,মেজো মায়ের সাথে বেরিয়ে গেছে মানুষটা। এই ট্যুর নিয়ে মেয়েটা এক্সাইটেড ভীষণ! ঠোঁটে হাসি ধরছে না। ওর ঐ সব লাফালাফি,হাসাহাসি তীক্ষ্ণ-শান্ত চোখে চেয়ে চেয়ে দেখল,কথাগুলোও শুনল ধূসর। তারপর আর এক দণ্ডও না দাঁড়িয়ে বেরিয়ে এলো সে। যেতে যেতে ভাবল,

“ কিছু করে দ্যাখ,পা দুটো ভেঙে ঘরে বসিয়ে রাখব!”

চলবে…

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply