Golpo romantic golpo আমি তোমার হতে চাই

আমি তোমার হতে চাই পর্ব ৫


#আমি_তোমার_হতে_চাই

#পর্ব_৫

#সুরভী_আক্তার

( অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষেধ ❌ ) 

চকিতে ছেলের দিকে তাকালেন ওয়াহিদা খান । বললেন চিন্তিত গলায়….

” দেখো না ওয়াহাজ, মেয়েটা এই মাঝরাতে অসুস্থ হয়ে পড়েছে খুব । দুবার বমি করেছে । জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে । ডাকছি কখন থেকে । সাঁড়া দিচ্ছে না আর । তুমি আরেকবার ডক্টর কে ডাকো না একটু । 

ওয়াহাজ খান ভূমির দিকে তাকান পূর্ণ দৃষ্টিতে । 

মেয়েটার শ্যামলা শরীর খানা লাল হয়ে এসেছে পুরো । দৃষ্টি সরু করলেন তিনি । 

মিহাজ ভূমির কাছে গিয়ে ঝাকালো ওকে । ফিকড়ে কাঁদো কাঁদো গলায় ডাকলো…..

” মিস,, শুনছো তুমি ? ওঠো প্লিজ । একবার চোখ খোলো । মিহাজ তো গুড বয় হয়ে গেছে,, আরো বেশি গুড বয় হয়ে যাবে । তোমার সব কথা শুনবে । তুমি ওঠো, দেখো আমার দিকে । 

শুনলো না রমনী । মিহাজ ছটফট করে বাবার দিকে ফিরে চায় ‌। দৃষ্টি তুলে ওয়াহাজের হাত টেনে ধরে…..

” বাবা,, মিস কে একবার ডাকো তুমি । ও শুনছে না আমার কথা । দেখো, মিসের খুব জ্বর এসেছে । গা গরম খুব । ছুঁয়ে দেখো একবার….

বলতে বলতে একটা অপ্রত্যাশিত কান্ড ঘটিয়ে বসলো বাচ্চাটা । ওয়াহাজ খানের বাম হাত খানা টেনে নিচু করে ভূমির বাম গালে রাখলো । মেয়েটার কপালে মোটা ব্যান্ডেজ করা । জ্বরের তীব্রতা বোঝানোর জন্য বাপের হাত টেনে ভূমির গালে রাখার বুদ্ধি পেলো সে ।

ছেলের আকস্মিক এমন কান্ডে হকচকিয়ে যান ওয়াহাজ খান । হতচেতন হয়ে সাথে সাথে বাঁধা দিতেও পারলেন না তিনি । হাত খানা সম্পুর্ন ভাবে স্পর্শিত হলো রমনীর উষ্ণ বাম কপোলে । 

ওয়াহিদা খান আর দিশা,, ওরাও চকিতে চায় । ওয়াহাজ খান মেয়েদের থেকে যথাসম্ভব দুরত্ব বজায় রাখেন । স্পর্শ তো দূর,,, চোখ তুলে তাকানোর ও অভিপ্রায় দেখান না কখনো । খুব প্রয়োজন ব্যাতীত কোনো নারীর সাথে দু বাক্যেও কথা বলেন না তিনি । সেক্ষেত্রে আজ মিহাজ একটা অপ্রত্যাশিত কিছু ঘটিয়ে বসলো । 

ওয়াহাজ ঝটকা মেরে হাত সরিয়ে নিতে গিয়ে থমকে যায় এক মুহুর্তে । ঠান্ডা হাতে রমনীর শরীরের প্রচন্ড তাপমাত্রা ঠাহর করা মাত্রই কেমন ছটফট করে উঠলেন তিনি । এক মুহুর্তের জন্য হাত সরিয়ে পরক্ষণে আবারো ডান গালে হাতের উল্টো পিঠ ছোয়ালেন আলতো করে । ভীষণ উত্তপ্ত মেয়েটার শরীর । উষ্ণতায় ধোঁয়া বেরোচ্ছে এমন । 

ভদ্রলোক শঙ্কিত হলেন কিছুটা । ঝট করে মায়ের দিকে ফিরে বললেন টলায়মান হয়ে….

” মা, তার তো জ্বর অনেক । গা পুড়ে যাচ্ছে পুরো । 

দিশা,, জ্বর মেপেছো তোমার  বান্ধবীর ? 

দিশা শুষ্ক ঢোক গেলে । ভয়ে জুবুথুবু হয়ে গেছে রমনী । সেই রাত্রি দুটো থেকে এই মেয়ের চিন্তায় হয়রান হয়ে যাচ্ছে ও ‌। না জানি কি হলো । মেয়েটা ভয় গিলে বললো ঠোঁট ভিজিয়ে….

” হ্যাঁ,, মামা । জ্বর ১০৫° উঠেছে । ভেজা পট্টি দিচ্ছি অনেকক্ষণ ধরে । রাতে মেডিসিন ও খেয়েছে । তবুও কমছে না । দুবার বমি করেছে এর মধ্যে । অবস্থা খারাপ দেখে নানুকে ডেকেছি । রেগে যেও না প্লিজ । তোমাকে ডাকতে চাইনি । ভাই….

” ডাকতে চাওনি মানে ? ডাকো নি কেনো আগে আমায় ? অন্যের মেয়েকে বাড়িতে এনে ফেলেছো , যদি কিছু হয়ে যায় ? কে নেবে এর দায়ভার ? তাকে ডাকো, দেখো হুঁশ ফেরে কি না ! আমি এক্ষুনি ডক্টর কে ডাকছি । 

চড়া জবানে কথা গুলো খসিয়ে ধুপধাপ পা ফেলে ঘর থেকে বেরোলেন ভদ্রলোক । ফোন ঘরে ফেলে এসেছেন । 

এদিকে দিশা লাগাতার ডাকছে ভূমিকে । ওয়াহিদা খান এর আগে দুবার পানি ছিটিয়েছেন মুখে, কাজ হয়নি । এবার তৃতীয় বার আজলে কয়েক ফোঁটা পানি নিয়ে রমনীর মুখে ছেটানো মাত্রই চোখ মুখ কুঁচকে ফেললো ভূমি । এতক্ষণে নড়ে উঠলো একটু । 

ওর খানিক নড়চড়েই দিশা প্রাণ ফিরে পায় । ছটফট করে গালে চাপড় মেরে ডাকে…..

” ভূমি, ভাই চোখ খোল প্লিজ । মামা ডক্টর ডাকছে, কিচ্ছু হবে না তোর । একবার চোখ মেলে তাকা । জ্বরের ঘোরে জ্ঞান হারিয়ে কতটা চিন্তায় ফেলেছিস আমাদের । জ্বর কত সে খেয়াল আছে ! এবার একটু স্বস্তি দে ভাই । 

মিহাজ ও যোগ দেয়…..

” মিস, ওঠো তুমি । চোখ খোলো । বাবা ডক্টর নিয়ে আসবে এক্ষুনি । কিছু হবে না তোমার ‌। একদম ঠিক হয়ে যাবে । 

বলার মাঝে হনহন করে ঘরে ঢুকলেন ওয়াহাজ খান । হাতে ফোন । মেয়েটার জ্ঞান ফিরেছে, এটা অবলোকন করে নিলেন একবার । অতঃপর বেডের পাশে ঠিক আগের অবস্থানে দাঁড়ালেন…..

” ডক্টর আসছেন এক্ষুনি । জ্ঞান ফিরেছে ভালো হয়েছে । আরেকবার চেকআপ প্রয়োজন । 

শ্বাস ফেললেন ওয়াহিদা খান । ভূমি তীব্র অস্বস্তিতে সবে আধো আধো চোখ খুলেছিলো । 

এবারে গা গুলিয়ে আসতেই আকস্মিক মুখ চেপে ধরলো মেয়েটা । শুয়ে থেকেই কাতরে উঠলো । উঠে বসলো তড়াক করে । চোখ মুখ উল্টে ফেললো মুহুর্তেই । গা গুলিয়ে উঠছে তার । ওর এমন তড়পানি দেখে দিশা শুধোয় ব্যস্ত হয়ে…..

” ভূমি,, কি হলো আবার ? 

মেয়েটার কানে পৌঁছালো কি না কে জানে ? 

শরীর দূর্বল । মাথা টলে পড়ছে । তবুও খানিক শক্তি জুগিয়ে ঝাড়া মেরে কম্বল ফেলে বিছানা থেকে নামতে উদ্যত হলো রমনী । মুখ চেপে রাখা তখনো । 

কোন রকমে উঠে দাঁড়াতেই চক্কর দিয়ে উঠলো মাথাটা । পূণরায় টাল হারিয়ে পড়তে গিয়ে ধপ করে বসে গেলো মেঝেতে । 

ওয়াহাজ খান দৃষ্টি তীক্ষ্ণ করেন । সম্মুখ বরাবর এক হাঁটু মুড়ে বসে ভারী গলায় ঝেড়ে ওঠেন…

” অ্যাইইই,, কি হয়েছে ? এমন করছো কেনো ? 

মেয়েটা মুখ খুলতে পারলো না । 

আর না পারলো নিজেকে ধরে রাখতে । বেসামাল হয়ে আধো ঘোরের বশে তৃতীয় বারের মতো গলগলিয়ে পেট উগড়ে বমি রুপে সব বের করে দিলো পেট হতে । 

মেয়েটার পেট উগড়ে বেরোনো সব বর্জ্য ছিটকে পড়লো ওয়াহাজ খানের শরীরে । 

ভদ্রলোক তাজ্জব, হতবুদ্ধ, আকস্মিক এহেন অভাবনীয় কান্ডে । তার পড়নের সাদা টি শার্ট সহ ট্রাউজার নোংরা হয়ে গেছে ইতোমধ্যে । তবুও প্রতিক্রিয়া নেই । হা বনে কিংকর্তব্য বিমূঢ় লোচনে দিকদিশে খোয়ানো রমনীর পানে চেয়ে আছেন তিনি । চিলতে পরিমাণ স্থানচ্যুত হননি মেয়েটা বমি করে দেওয়ার পরও । 

ভূমির পেটে কিছু নেই,, গত দুবার বমি করে সব বের করে দিয়েছে । এবারে কেবলই বমি রুপে খানিক তিক্ত পানি বেরোলো গলা চিরে । 

এদিকে বাকিরা আশ্চর্য, কিংকর্তব্য বিমূঢ় । তব্দা খেয়ে তাৎক্ষণিক মুখে হাত চেপে ধরলো দিশা । এই রে,, এই ভূমির আজ রক্ষে নেই । 

ভয়ে আতঙ্কে চোখ কোটর ফেটে বেরোনোর দশা । গলা শুকিয়ে আসছে । একই অবস্থা ওয়াহিদা খানের ও । তিনি বিস্মিত । তার ছেলে বড্ড খুঁতখুঁতে স্বভাবের । যাকে বলে ফাস্টিডিয়াস্ট । অপরিচ্ছন্নতা একেবারেই পছন্দ নয় । একেই বাড়িতে তার দেওয়া হাজারটা নিয়ম চলে । 

সবকিছু ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে ঝকঝকে রাখা হয় এই  পারফেকশনিস্ট লোকটার জন্য । 

আর সেই জায়গায় এই মেয়ে কি এক কান্ড ঘটিয়ে বসলো । ওয়াহাজ খান তখনো আশ্চর্য হয়েই রয়েছেন । বমি শেষ হতেই ক্লান্ত হয়ে নেতিয়ে আসলো ভূমি । বসা অবস্থায় শরিরটা কাত হয়ে ডান দিকে টলে পড়তে গেলে দ্রুত ওকে ধরে ফেললেন ওয়াহাজ খান । মেয়েটা ডান দিকে না টলে বাঁ দিকে হেলে পড়লো এবারে । ঠিক ওয়াহাজের বুক বরাবর কপাল ঠেকলো রমনীর । মুখ চেপে ধরলো আবার । হয়তো পেট পরিষ্কার হয়নি পুরোপুরি । 

ওয়াহিদা খান এই অনভিপ্রেত ঘটনা সামলে অস্ফুটে ডেকে ওঠেন ছেলেকে….

” ওয়াহাজ,,,,

তার ছেলে চাইলো । ভদ্রমহিলা বিছানা থেকে নেমে ছেলের থেকে ভূমিকে সরাতে উদ্যত হলেন । একটু সরিয়ে নিয়ে কিছু বলার আগেই ওয়াহাজের শান্ত বাণী কানে পড়লো…..

” ইটস্ ওকে, মা । তাকে বমি করতে দিন ‌। জ্বরের ঘোরে আছে সে । বমি করাটা বরং ভালো হয়েছে । 

” কিন্তু তোমার শরীরে লেগে যাচ্ছে তো ! 

” লাগুক । হয়ে গেছে । ইটস্ ওকে । এক কাজ করুন,, দিশা, তোমরা ওকে তুলে চেঞ্জ করিয়ে এসব ক্লিন করো । ডক্টর এসে যাবেন এক্ষুনি । আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি । 

আর থামলেন না ভদ্রলোক । ঠোঁট ভিজিয়ে মেয়েটার বাহু ঠেলে আলতো করে দূরে সরালেন ওকে । মেঝেতে বসানো অবস্থায় ভূমিকে খাটের সাথে হেলান দিয়ে রাখলেন । একপাশে ওয়াহিদা খান ধরে আছেন । 

ওয়াহাজ আর বিলম্ব করলো না,, উঠে দাঁড়িয়ে গটগট করে বেরিয়ে আসলো ঘর থেকে । দিশা বিস্ময়াভিভূত হয়ে বিড়বিড় করে…..

” নানু, তোমার ছেলে আজ এতো নরম হলো কি করে ? কিছু বললো না যে ? 

” কি বলবে ? ভূমির অবস্থা দেখেছো ? এই অচেতন মেয়েটাকে কি বলবে ও ? তুমি কথা না বাড়িয়ে ওকে তোলো, চেঞ্জ করাতে হবে । ভাগ্যিস মেয়েটাকে আটকে দিয়েছিলাম আজ । নয়তো, এই নাকাল অবস্থায় একা হোস্টেলে থাকলে কি অবস্থা হতো ভেবে দেখেছো একবারও ? 

ভদ্রমহিলার কন্ঠে আকুলতা । 

এদিকে সোজা নিজের ঘরে এসেছেন ওয়াহাজ খান । দ্রুত টাওয়েল নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকলেন তিনি । 

বিলম্ব না করে ঝটপট শাওয়ারের নিচে দাঁড়ালেন । 

টিশার্ট ও ট্রাউজারে এখনো উদগিরিত পদার্থ গুলি মেখে রয়েছে ।

ভিজে জবজবে হয়ে মিনিট দুয়েক বাদ নিজের দিকে তাকালেন ভদ্রলোক । দৃষ্টি কুঞ্চিত হলো, তবে মুখ নয় । শরীরে লেগে থাকা এই উচ্ছিষ্ট দেখে প্রচন্ড ঘৃনা হওয়ার কথা । তবে এ বেলায় ঘৃনা সূচক অনুভুতি কাজ করলো না একটুও । কিন্তু কেনো ? 

ভাবতে গিয়ে চোখে ভাসলো মেয়েটার গলগলিয়ে বমি করার দৃশ্য টুকু । সে সময়েও ঘৃনা লাগেনি ।

নিজের এমন বিহ্বলতা ঠাহর করে চরম বিব্রত হলেন ভদ্রলোক । মুখে চ সূচক শব্দ উচ্চারণ করলেন । মাড়ি খিচে আওড়ালেন নিজের উদ্দেশ্যে….

” হোয়াট দ্যা হেল,, হোয়াই অ্যাম আই নট ফিলিং ডিসগাসটেড ? কেনো ঘৃণা লাগছে না আমার ? 

নিজেকে শুধিয়ে লাভ হলো না । উত্তর পাওয়া গেলো না । 

★ 

সকাল সাড়ে আটটা পেরিয়েছে । শুক্রবার আজ । 

সবার ছুটি । দিশার ভার্সিটি নেই, মিহাজের ও স্কুল নেই । ওয়াহাজ খান ও আজ বাড়িতে থাকবেন সারাদিন । 

রোজ আটটার দিকে ব্রেকফাস্ট করা হলেও দেরি হয়ে গেছে আজ । অবশ্য ছুটির দিন টায় ঘুম থেকে উঠতে উঠতে প্রায়শই দেরি হয়ে যায় । 

তার উপর কাল রাতে ঘুমোনো হয় নি ঠিকমতো । 

ব্রেকফাস্টে বসতে বসতে নয়টা বেজেছে । ওয়াহিদা খান, ওয়াহাজ, আর মিহাজ বসলো সবে । 

দিশা নিচে নামে নি এখনো । এর মধ্যেই হেলে দুলে কানে হেডফোন লাগিয়ে গুনগুন করতে করতে নিচে নামছে নীলয় । সিঁড়ির মাঝ পথে খাবার টেবিলে ওয়াহাজ কে দেখে তড়িঘড়ি করে নিজেকে সামলিয়ে সোজা হলো যুবক । কান থেকে হেডফোন নামিয়ে গলায় রাখলো । টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে গলা ঝেড়ে গম্ভীরতা টানলো । 

নিচে নেমে বসলো চেয়ার টেনে । আগ বাড়িয়ে বললো সবার এটেনশন পেতে..

” দিশা কোথায় মা ? খেতে আসলো না যে ? ঘুম থেকে ওঠে নি এখনো ?

ওয়াহিদা খান তাকান । মুখ ফিরিয়ে নেন পরক্ষণে । 

ওয়াহাজ বাঁকা দৃষ্টিতে ভাইকে পরখ করে বলেন স্বাভাবিক ভাবে…..

” নিজের কথা বলো,,, ঘুম হয়েছে রাতে ? 

নীলয় ঠোঁট ভেজায়…..

” হ্যাঁ ভাইয়া, ঘুম হবে না কেনো ? তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম কাল, তাই আজ তাড়াতাড়ি উঠতে পেরেছি ? 

” আচ্ছা,, কটায় ঘুমিয়েছিলে ? 

” ঐ সাড়ে এগারোটা মতো ! 

” ওও , বাড়ি ফিরেছো কটায় ? 

নীলয় আবারো ঠোঁট ভিজিয়ে নেয় । ঠোঁটে হাসি ধরে রেখেই বলে…..

” এগারোটার দিকে ! 

ওয়াহাজ খান সোজাসুজি পূর্ণ দৃষ্টিতে ভাইয়ের দিকে তাকালেন এবারে । দৃষ্টি সূচালো, প্রখর তার । সহসা চোখাচোখি হতেই থতমত খেলো নীলয় । নামিয়ে নিলো দৃষ্টি । 

কাল সে বাড়িতে ছিলো না । ফিরেছে ভোরের দিকে । ওয়াহাজ খান জানেন সব । তবুও সোজাসুজি ধরলেন না । বললেন ঠান্ডা গলায়…..

” গুছিয়ে মিথ্যে বলতে পারো, অথচ গুছিয়ে জীবন সাজাতে পারো না । চলবে কি করে এভাবে ? 

নীলয় ঠোঁটে টানা মেকি হাসি আর ইনোসেন্ট মুখো ভঙ্গিমা স্বাভাবিক করে । প্লেটে স্যান্ডউইচ তুলে নিতে নিতে বলে এবার সিরিয়াস হয়ে…..

” চলছে তো ভাইয়া, যেভাবে চলছে সেভাবেই চলবে ! 

প্রত্যুত্তরে ওয়াহাজ খান কিছু বলার আগেই সিঁড়ি বেয়ে ধীরে ধীরে নেমে আসলো দিশা আর ভূমি । 

মেয়েটা খোঁড়াচ্ছে এখনো । ঢাল মুখখানা শুকিয়ে ছোট হয়ে এসেছে । চোখ দুটোও শুকনো । 

গুটি গুটি পায়ে এসে টেবিলের একপাশে দাঁড়ালো ওরা দুজন । এই সকালে ভূমিকে নিজেদের বাড়িতে দেখে অবাক হয় নীলয় ‌। আরো বেশি বিস্মিত আর দৃষ্টি কুঞ্চিত হয় রমনীর কপালে মোটা ব্যান্ডেজ দেখে । সে শুধোয় বিচলিত হয়ে…..

” আরে ভূমিকা,,, তুমি এই সকালে এখানে ? আর মাথায় কি হয়েছে তোমার ? ব্যান্ডেজ কেনো ? 

ভূমি তাকালো দীপ্তিহীন দৃষ্টি তুলে । 

ওয়াহিদা খান ব্যস্ত হয়ে পড়লেন…..

” এ কি দিশা,,, ওকে নিয়ে নিচে এসেছো কেনো ? একেই মেয়েটা হাঁটতে পারছে না,, এই শরীরে নিচে নামালে কেনো ওকে ? ব্রেকফাস্ট রুমে পাঠিয়ে দিচ্ছিলাম আমি । 

” ও তো নিজেই আসতে চাইছিলো নানু । আমি বারন করলাম, শুনলো না । 

” আচ্ছা,, খেতে বসো এখন । ভূমি,, আমার পাশে বসো তুমি । 

মিহাজ আর ওয়াহিদা খানের মাঝামাঝি একটা চেয়ার টেনে বসলো রমনী । চিবুক নত কুন্ঠায় । কেমন ইতস্তত লাগছে,, না জানি কত কি করে ফেলেছে কাল ‌। সবাইকে জ্বালিয়েছে নিশ্চয়ই । ইশশ্,, কি লজ্জা লাগছে । এনারা তো আপন কেউ নন । পরের বাড়িতে এসে মাঝরাতে তাদের জ্বালিয়ে এখন আর মোটেও স্বস্তি পাচ্ছেনা বিংশী রমনী । 

মেয়েটা নতজানু হয়ে বসতেই হাত বাড়িয়ে ছোট ছোট হাতে ওর প্লেটে দুটো স্যান্ডউইচ তুলে নিলো মিহাজ । 

” মিস, আর কিছু নেবে ? কি খাবে বলো ? 

এবার পাশে তাকিয়ে মুচকি হাসলো ভূমি । বাচ্চাটার মাথায় আদুরে হাত রেখে বললো আড়ষ্ট হয়ে….

” আর কিছু লাগবে না,, তুমি খাও । 

আড়চোখে ওদের এক ঝলক দেখে নিলেন ওয়াহাজ খান । এদিকে নীলয় বুঝতে পারছে না কিছু । সে এ বেলায় গলা বাড়িয়ে বললো উদ্বিগ্ন হয়ে….

” আরে কি হয়েছে, আমাকে কেউ বলবে কি ? ভূমিকার কি হয়েছে ? মাথায় ব্যান্ডেজ কেনো ? আর এতো সকালে ও আমাদের বাড়িতেই বা কেনো ? 

দিশা গলা নামিয়ে খুলে বললো সবটা । 

ওয়াহাজ খানের খাওয়া শেষ ‌। উঠে যাওয়ার আগে ভাগ্নির দিকে তাকিয়ে রাশভারী গলায় শুধোলেন তিনি….

” দিশা,, তার জ্বর কেমন এখন ? 

” কমেছে মামা ! জ্বর নেই তেমন । পায়ে আঘাত পেয়েছে, ওটার ব্যাথা আছে কেবল । 

” ব্রেকফাস্টের পর মেডিসিন খাইয়ে দিও । ব্যাথা সেরে যাবে । যদি প্রয়োজন হয়,, ডক্টর ডেকো আরেকবার ‌। 

উঠে পা বাড়ানোর আগে কুন্ঠিত রমনী মুখ খোলে চকিতে….

” মামা ! 

সহসা থমকে যান ভদ্রলোক । তবে তাকান না পিছু ফিরে । ভূমি মিনমিন করে ইতস্তত গলায়….

” কাল রাতের জন্য স্যরি মামা । কি থেকে কি করেছি নিজেও জানি না,, কিচ্ছুটি মনে পড়ছে না । দিশা বললো আজ, আ’ম রিয়েলি স্যরি ! জেনে বুঝে করিনি কিছু । 

মেয়েটার কন্ঠ ধীর । 

রাতের অপ্রত্যাশিত ঘটনা টুকু দিশা খুলে বলেছে । ভূমি সবটা শোনার পর হতবুদ্ধ হয়ে গেছে নিজের করা এমন কান্ডে । ধ্যান জ্ঞান ছিলো না সে সময়ে । 

সবাই নিশ্চয়ই বিরক্ত হয়েছে ওর উপর ! 

ওয়াহাজ খান পা বাড়িয়ে শান্ত কন্ঠে বললেন প্রত্যুত্তরে….

” ইটস্ ওকে ! 

,,,,

দুপুর গড়িয়েছে । 

সবে জুমার নামাজ আদায় করে বাড়ি ফিরলেন এমপি সাহেব । তার সাথে অরিধ এসেছে । 

কিছু কাজ আছে,, বাড়িতেই আলোচনা করবেন দু’জনে ‌। 

দুপুরের খাবারের বাহারি আয়োজন হয়েছে আজ । ভূমি, দিশা, মিহাজ আর ওয়াহিদা খান, সবে মিলে ড্রইং রুমে বসে গল্প করছিলেন । ভূমিকে নিয়ে টুকটাক প্রশ্ন করছিলেন ভদ্রমহিলা । 

এর মধ্যেই বাড়ি ফিরে সোজা সিঁড়ির পথে পা বাড়ালেন ওয়াহাজ খান । দিশা অরিধ কে তার সাথে দেখে নড়েচড়ে ওঠে । দ্রুত পিছু ডাকে…..

” মামা,, কফি লাগবে ? 

” না,, খাবার রেডি করতে বলো । লাঞ্চ করবো দশ মিনিটের মধ্যে । 

বলেই সিঁড়ি ডিঙিয়ে উঠতে লাগলেন তিনি । পাশাপাশি অরিধ । দিশা মুখ মলিন করে ফেলে । 

কাঙ্ক্ষিত লোকটা একবারও ফিরে চাইলো না ওর দিকে । কি রসকস হীন পাষন্ড লোক রে বাবা ! মনে মনে ভেংচি কাটে রমনী ! 

ওয়াহিদা খান ভূমিকে প্রশ্ন করতে করতে এক পর্যায়ে শুধোলেন…..

” তোমার বাবা তো রিটায়ার্ড করেছেন শুনেছি, কি করতেন তিনি ? 

” আব্বু আর্মি অফিসার ছিলেন ।

ভূমির সাবলীল নরম উত্তর । ওয়াহিদা খান আগ্রহী হয়ে জানতে চাইলেন….

” নাম কি তার, সেটা তো শোনা হলো না ! 

” আহাদ আলী । 

ছোট্ট উত্তর টুকু যেনো বাতাসের বেগে সোজা ছিটকে গিয়ে ওয়াহাজ খানের কানে আঘাত হানে । সহসা থমকে যায় তার অহমিকায় উদ্যত পদযুগল । 

ঝট করে ঘাড় ঘুরিয়ে পিছু ফেরেন তিনি । ধারালো অস্ত্রের ন্যায় খাদযুক্ত দৃষ্টি যুগল আছড়ে পড়ে ভূমির উপর । মেয়েটা সোফায় শরীর এলিয়ে অনেকটা আধশোয়া হয়ে আছে । মুখাবয়বে সতেজতা ফিরেছে খানিক । 

ওয়াহাজ খান সেসব দেখলেন না । বিলম্ব না করে উঁচু গলায় সহসা ধমকের সুরে জানতে চাইলেন উপর হতে….

” এইই, বাসা কোথায় তোমার ? 

চমকায় ভূমি । অগত্যা মাথা উঁচিয়ে সিঁড়ির দিকে তাকায় । সাথে বাকিরাও । মেয়েটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়েছে আকস্মিক চড়া গলায় । তার উপর লোকটা কেমন অগ্নি দৃষ্টিতে চেয়ে আছে । অপ্রস্তুত হয় ভূমি,,, ঠোঁট ভিজিয়ে উত্তর করার আগেই ফের ধমকে উঠলেন ভদ্রলোক,,,

” কি হলো বলো, বাসা কোথায় তোমার ? 

চমকে একবাক্যে বুলি আওড়ায় রমনী…..

” খিলগাঁও ! 

লোকটার অগ্নি দৃষ্টি খিচে আসে । চোয়াল হয় শক্ত । দন্ত পিষে জানতে চান পূনরায়….

” মায়ের নাম কি ? 

” আমার মা,,, মানে নিজের মা তো নেই । দেখিনি, ওনার নাম #হাফিজা । 

” যে মা এখনো বেঁচে আছে, তার নাম কি ? 

তার এমন অবান্তর প্রশ্নের হেতু বুঝলো না কেউ । ওয়াহিদা খান পাল্টা ছেলেকে প্রশ্ন করেন…..

” তুমি এসব জানতে চাইছো কেনো, ওয়াহাজ ? কি হয়েছে ? 

” তাকে বলতে দিন মা । এইই বলো, তোমার সৎ মায়ের নাম কি ? 

ভূমি কেমন জড়িয়ে আসে । ঢোক গিলে বলে…

” নিলুফা নাজমিন । 

ব্যস, আরো বেশি ক্ষুব্ধতা ঠিকড়ে উঠলো এমপি সাহেবের মুখাবয়বে । হাত মুঠিয়ে নিলেন তিনি । 

রাগের দরুন লালচে হয়ে উঠলো তার ফর্সাটে দেহ খানা । কিচ্ছু বললেন না আর । ক্রোধে রক্তিম দৃষ্টি ফিরিয়ে হনহনিয়ে করিডোর পেরিয়ে ঘরে ঢুকে গেলেন ভদ্রলোক । 

বাকিরা আশ্চর্য হয় । সাথে অরিধ ও । সেও বুঝলো না কিছু । কপাল কুঁচকে চোখ নামিয়ে এক ঝলকের জন্য তাকালো ভূমির দিকে । 

পরের ঝলকে অবাধ্য দৃষ্টি আপনাআপনি ছিটকে পড়লো পাশে বসে থাকা দিশার পানে । 

চঞ্চলা মেয়েটা তাকিয়ে ছিলো চাতকের ন্যায় । অমনি চোখে চোখ মিলে গেলো দুজনার । সহসা ছ্যাঁত করে উঠলো রমনীর কোমল হৃদয় । ঠোঁটে ফুটলো এক পশলা হাসির ঝিলিক । 

অরিধ দুই সেকেন্ডের ব্যাবধানে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিজেও গটগট করে উঠে যায় ওয়াহাজের ঘরে । 

#চলবে………..

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply