Golpo আমার আলাদিন কষ্টের গল্প

আমার আলাদিন পর্ব ৯


আমার_আলাদিন

জাবিন_ফোরকান

পর্বসংখ্যা৯

“ইরাম আপু, প্লীজ একবার আমার কথাটা শুনুন।”

“এখান থেকে যাও আলাদিন। তোমার কথা আমি পরে শুনব।”

“না। আপনাকে এক্ষুণি শুনতে হবে। এই মুহূর্তেই। আমার খুব দরকার আপু!”

“পরে আসতে বলেছি।”

“না। আমি এখনি বলব। পরে…”

“যাও আলাদিন! আমার চোখের সামনে থেকে দূর হও!”

ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসল সাইবান। সমস্ত শরীর ঘেমে একাকার হয়ে গিয়েছে তার। এসি চললেও কোনো কাজেই দিচ্ছেনা। বুকটায় ভারী চাপ জেঁকে বসেছে। পায়ের সঙ্গে কম্বল পেঁচিয়ে আছে তার। খানিক উদ্ভ্রান্তের মতন এদিক সেদিক তাকাল সে। তারপর একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দুহাতে নিজের মাথা চেপে ধরল। ঘড়ির কাঁটা এগারোটা পেরিয়ে গিয়েছে বুঝতে পেরে সে একদম নীরবে বিছানা থেকে নেমে এলো। কিছুক্ষণ আগের দুঃস্বপ্নটা মন থেকে ঝেড়ে ফেলার নীরব চেষ্টায় লিপ্ত হলো।

সে বাথরুমে থাকতেই সামিয়া দুইবার ডেকে গেলেন। এরপর সুগন্ধাও এলো তাকে মনে করিয়ে দিতে যেন সে জলদি নাস্তা খেয়ে তৈরী হয়ে নেয়। বহুদিন বাদে আজ বেশ লম্বা একটা সময় নিয়ে গোসল সারল সাইবান। হালকা গরম পানি পূর্ণ বাথটাবে প্রায় ঘণ্টাখানেক বসে রইল। অতঃপর শরীর মুছে পরিপাটি হয়ে বেরোল। সুগন্ধা নাস্তা দিয়ে গিয়েছে নাইটস্ট্যান্ডের উপর। একটা পরোটা অর্ধেক ছিঁড়ে মাংসের ঝোল মাখিয়ে গোটা মুখে দিয়ে সে ক্লোজেট থেকে পোশাক বের করে নিল।

একটা কালো শার্ট, কালো ফরমাল প্যান্ট, উপরে কালো হাতাবিহীন ভেস্ট। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একে একে সবগুলো গায়ে জড়াতে জড়াতে নিজের ভাবনার দুনিয়ায় ক্ষণিকের জন্য হারিয়ে গেল সাইবান। টেরও পেলনা কখন আফনান, অনুরাগ আর নীরব তার রুমের ভেতরে চলে এসেছে। নীরবের হাতে একটা বিশাল বড় ফ্লাওয়ার বুকে। এতটাই ভারী যে বেচারা একা ধরে রাখতে পারছে না, আফনানের সাহায্য লাগছে। দুজনের পরনেই ডিজাইনার পাঞ্জাবী, একমাত্র অনুরাগ ফরমাল স্যুট পড়েছে। তিনজনই সাইবানকে তৈরি হতে দেখে খানিক অবাক হলো।

“তোর বিয়েতে তুই কালো পোশাক পড়েছিস কেন?”

প্রশ্নটা করল আফনান। সাইবান আয়নার প্রতিফলনের কারণে পিছনে দাঁড়ানো বন্ধুদের দেখল। তারপর মুচকি হেসে টাই বাঁধতে বাঁধতে উত্তর করল,

“শোক দিবসে মানুষ কালোই পড়ে।”

খিলখিল করে হেসে উঠল সবাই শুধু অনুরাগ বাদে। বান্দা হেঁটে গিয়ে সাইবানের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে অগোছালো বাঁধতে থাকা টাইটা খুলে আবার নতুন করে বেঁধে দিতে দিতে বলল,

“এতই শোক যখন তখন নাচতে নাচতে বিয়ের পিঁড়িতে বসছিস কেন?”

“ওমা। আমার শোক কে বলল? শোক তো আমার বউয়ের, আমি শুধু তার পক্ষ থেকে শোকটা পালন করছি।”

চোখ টিপ দিয়ে উত্তর করল সাইবান। এবার না হেসে পারলনা অনুরাগ, ছেলেটা একটা আলাদাই চীজ। নীরব মুখ টিপে বলল,

“দেখিস ভাই। বউয়ের শোক মেটানোর ঠেলায় বুলডোজার চালাস না, বিছানার কাঠের উপর মায়াদয়া করিস।”

“ব্যাপার না, আমার বেড স্টিলের।”

বিশাল আকারের আধুনিক চকচকে কালো বর্ণের প্রলেপ দেয়া ধাতব ডিজাইনের বিছানার দিকে ইঙ্গিত করল সাইবান। বন্ধুদের নিয়ে না পারতে মুখে হাত ঘষল অনুরাগ।

“হায় ভগবান! তোদের নিয়ে আমি আর পারিনা!”

আফনান আর নীরব ফ্লাওয়ার বুকেটা নিয়ে এগোল। সাইবানের হাতে তুলে দিল। বেচারা ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে দেখল। তাজা গোলাপ। অনেকগুলো, গুণে ওঠা দায়। তবে গোলাপ একা নয়। প্রত্যেক গোলাপের সঙ্গে জোড়ায় জোড়ায় লাগানো কিছু চকচকে সিলভার আর গোল্ডেন ফয়েলের প্যাকেট। চোখ পিটপিট করল সাইবান, নীরব বলে উঠল,

“হ্যাপি ওয়েডিং ব্রো! উইদ সিক্সটি নাইন রোজেয অ্যান্ড সিক্সটি নাইন চকলেট ফেভার।”

“হ্যাঁ ব্রো। আজ রাতে ৭০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে গাড়ি চালানো নিষেধ। সেফটির জন্য সবসময় হেলমেট ব্যবহার করবি। অ্যাক্সিডেন্ট হলে অকালে, কাঁদতে হবে আড়ালে।”

আফনান বলতেই আর সহ্য করতে পারলনা সাইবান। মুখটা টকটকে হয়ে গেল তার। ফ্লাওয়ার বুকেটা তুলেই সপাত সপাত বন্ধুদের মাথায় মারতে লাগল। মারের মাঝখানে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলল,

“আউযুবিল্লাহ…. হিমিনাশ… শাইতোয়ানির রাজীম!”

ফুল আর প্যাকেট সবগুলো বুকে থেকে খুলে খুলে পড়তে লাগল মেঝেতে। আফনান আর নীরব অট্টহাসি হাসতে হাসতে বিছানায় গড়াগড়ি খেল, তবুও মার ছাড়লনা সাইবান। ঠিক অমন মুহূর্তেই রুমের ভেতর এসে পড়ল সারিকা,

“কোথায় সাই? তোর হলো? ওদিকে যে মেহমান….!”

মেঝেতে তখন ফুল, পাপড়ি আর চকচকে ফয়েলগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। একমাত্র অনুরাগ দরজার কাছে। বেচারা উপায়ান্তর না পেয়ে সটান বুক চিতিয়ে মেঝেতে শুয়ে পড়ল। শরীরের নিচে আড়াল করে ফেলল সব। পা দিয়ে লাথি মেরে বাকিগুলো ড্রেসিং টেবিলের নিচে ঢুকিয়ে দিল। কনুইয়ে ভর দিয়ে হাতে মাথা রেখে এমন ভঙ্গিতে সারিকার দিকে তাকাল যেন স্যুট পরে ফ্লোরে শুয়ে থাকার চেয়ে সাধারণ ব্যাপার দুনিয়ায় আর একটাও হয়না। জোরপূর্বক হাসার চেষ্টা করল সে,

“হেহেহে…এইতো সাইবান রেডি প্রায়, আপনি যান আমরা নিয়ে আসছি ওকে।”

সারিকা ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে রইল দৃশ্যপটে? রেডি? তার ভাই বিছানার উপর উঠে বালিশ দিয়ে নিজের অপর দুই বন্ধুকে মারছে, যেন ডব্লিউ ডব্লিউ ই বক্সিং চ্যাম্পিয়নশিপ হচ্ছে বিছানার উপর আর সে জনসিনা। অপরদিকে অনুরাগ মেঝেতে শরীর বিছিয়ে এমনভাবে শুয়ে আছে যেন সে মাটির মানুষ আর মাটিতে থাকতেই পছন্দ করে। এমন একটা বিষয়কে একজন মেয়ের কেমন চোখে দেখা উচিত?

“আচ্ছা।”

বিব্রতবোধ করল সারিকা, কেন সে নিজেও জানেনা। উল্টো ঘুরে গেল,

“সাই, তাড়াতাড়ি আয়!”

এটুকু বলেই সে রুমের বাইরে চলে গেল। রমণী গায়েব হয়ে যাওয়ার পরেই শুধু বুকের ভেতর আটকে রাখা নিঃশ্বাসটুকু ছাড়তে পারল অনুরাগ। মেঝে থেকে উঠে সে এক রামধমক দিল সবাইকে,

“যদি চাস তন্ত্র মন্ত্র জপে তোদের বাণ না মারি এক্ষন থাম, পাঠার দল কোথাকার!”

⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠─⁠──⁠──

লিভিং রুমটা চমৎকারভাবে সাজানো হয়েছে। তাজা ফুলের সঙ্গে চকচকে কাপড়ের পর্দার খেলা। নিয়ন বাতি জ্বলছে। সকাল হওয়া সত্ত্বেও ভীষণ সুন্দর দেখাচ্ছে তা চারিপাশে। মেঝের মাঝখানে বিশাল কার্পেট বিছিয়ে সকলের বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ইতোমধ্যে কাজী সাহেব এবং উকিল উপস্থিত। বাড়ির জামাই মিসির দায়িত্ব নিয়ে সকল মেহমানদের খাতিরদারি করছে। নীল বর্ণের ডিজাইনার পাঞ্জাবী এবং কোট পরনে তার। সামিয়া অফহোয়াইট বর্ণের শাড়ি পড়েছেন। ছেলের বিয়ে উপলক্ষ্যে হালকা সেজেছেন, গয়নাগাটিও পড়েছেন। তদারকি করছেন তিনি সবকিছুর যেন গাফিলতি না হয়। এমন সময়েই সিঁড়ি বেয়ে হাসাহাসি করতে করতে নেমে এলো সাইবানদের দল। সাইবান সকলের পিছনে। সামিয়া সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়িয়ে মুগ্ধ নয়নে ছেলেকে দেখলেন। যদিও কালো পোশাকটা বিয়ের মতন অনুষ্ঠানের জন্য ঠিক গ্রহণযোগ্য নয়, তবুও সাইবানকে অতুলনীয় লাগছে। ছেলেটা তার ফরমাল পরে খুব কম, তার কাজ এবং চালচলনে এমন স্যুট ভেস্টের দরকার পড়েনা। আজ পুরোদস্তুর প্রাপ্তবয়ষ্ক পুরুষের মতন লাগছে সাইবানকে। সে নিচে নেমে আসতেই সামিয়া দুহাত তুলে ছেলের মুখ ছুঁয়ে দিলেন।

“মাশাআল্লাহ।”

মায়ের মুখপানে চেয়ে মুচকি হাসল সাইবান, নুয়ে এলো সামান্য। সামিয়ার চোখ ছলছল করে উঠল, চোখ বুঁজে তাই ছেলের কপালে স্নেহের চুমু খায় দিলেন তিনি।

“আল্লাহ যেন তোকে খুব সুখে রাখে। আমার ভাগের হায়াত, সুখ, সৌভাগ্য সব তোর হোক। সব তোর।”

সাইবান পকেট থেকে রুমাল বের করে সামিয়ার চোখ মুছে দিল। তারপর পাল্টা মায়ের কপালের পাশে ঠোঁট ছুঁয়ে ফিসফিস করল,

“তোমার দোয়াই যথেষ্ট।”

“আর আমার?”

ঠিক তখনি পাশে উপস্থিত হলো সারিকা। বিরাট হাসি নিয়ে ভাইয়ের দিকে চেয়ে আছে সে। সাইবান মাথা ঘুরিয়ে তাকাল, বাঁকা হেসে বলল,

“তুই? তুই উচ্ছন্নে যা!”

“দেখেছ, দেখেছ মম! আজ বিয়ের দিনটায়ও আমাকে ছাড় দিলনা। তোর মুখে পোকা পড়বে বেয়াদব ছেলে!”

খিলখিল করে বোনকে কাছে টেনে হালকা জড়িয়ে ধরল সাইবান,

“তোকে একদম দুই চোখে সহ্য করতে পারিনা, সিস।”

“হ্যাঁ জানি তো। বিয়ে হলে আরও ভুলে যাবি।”

“যাব না যদি অতি সত্বর আমাকে মামা বানাতে পারিস।”

সারিকার মুখটা লালচে হয়ে গেল। ঠাস করে ভাইয়ের বুকে থাপ্পড় দিল। ঠিক অমন সময়েই সদর দরজা দিয়ে দুজন মানুষকে ঢুকতে দেখে সারিকাসহ সকলেই থমকে গেল। রাহাত আর ইহান, দুজনই নিঃশব্দে পাশাপাশি হেঁটে আসছে। ভ্রু কুঁচকে ফেলল সারিকা,

“এরা এখানে কি করছে?”

“আমি ডেকেছি।”

উত্তর করলেন সামিয়া। দৃঢ় দৃষ্টিতে সন্তানদের দিকে চেয়ে বললেন,

“হাজার হোক, ওদের বোনের বিয়ে। ওদেরও হক আছে।”

সাইবান কি ভাবছে বোঝা না গেলেও সারিকাকে ভীষণ অসন্তুষ্ট মনে হলো। তবে মায়ের উপরে কোনো কথা সে বললনা।

কিছুক্ষণ বাদে সবাই কার্পেটের উপর বসল। কাজী সাহেবের মুখোমুখি বসেছে সাইবান। তার পাশের জায়গাটা ফাঁকা রাখা হয়েছে। তার অন্যপাশে অনুরাগ এবং মিসির বসেছে। অনুরাগের কোলে ইযান। সুতির পোশাক পরানো হয়েছে ইযানকে, একদম বাধ্য ছেলেটি হয়ে সে অনুরাগের কোলে বসে বসে একটা খেলনা গাড়ি নিয়ে খেলছে। সাইবান আড়চোখে কেন যেন বেশ কয়েকবার ইযানকে ঘুরেফিরে দেখল। অচেনা মানুষদের ভিড়ে বাচ্চাটা ঠিকঠাক আছে কিনা সেটা নিয়ে তার মনে একটা খচখচে ভাব কেন তৈরি হয়েছে সে বুঝতে পারছেনা।

“মেয়েকে নিয়ে আসুন। আমরা শুরু করে দিই, দেরী কিসের?”

কাজী সাহেব বলতেই সামিয়া মাথা দুলিয়ে উঠে গেলেন। অন্দরমহলে আড়াল হয়ে গেলেন। সাইবান ঠাঁয় নিজের জায়গায় বসে ইযানকে দেখতে লাগল। বাচ্চাটা এখন খেলনার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে মিসিরের কোটের বোতাম ধরে টানাটানি করছে। আনমনে মুচকি হাসল সে। সেই হাসিটুকু হঠাৎ করে জমে গেল দৃশ্যটি নজরে আসতেই।

অন্দরমহল থেকে ধীরপায়ে বেরিয়ে এলেন সামিয়া। তার পাশেই ইরাম। জলপাই বর্ণের একটা চকচকে শাড়ি জড়ানো অঙ্গে, তাতে উজ্জ্বল সিলভার জরির কাজ। শাড়ির পাড় সোনালী। লাইটের আলো পড়লেই মোহনীয় এক দ্যুতি ছড়াচ্ছে। শাড়ির আঁচলটাই মাথায় তুলে দেয়া। খুবই হালকা সাজ, সঙ্গে পাতলা কিছু সোনার গহনা। এটুকুই। অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি কিছুই নেই। বয়সের সঙ্গে মানানসই। তবুও সাইবান নিষ্পলক চেয়ে রইল। ইরামের দুই হাতের টকটকে খয়েরী মেহেদীর রঙের উপর থেকে নজর ফেরাতে পারলনা সে। এমন নয় যে সে জীবনে সুন্দরী মেয়ে দেখেনি। বরং ঠিক উল্টোটা। ডি জে পার্টিতে আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু থাকে সে। রমণীদের লাইন লেগে থাকে তার আশেপাশে। বড়লোকের আদরের দুলালীদের আগুনঝরা রূপ। তরুণীদের মন মাতানো সাজসজ্জা। কিন্তু এর আগে কারো প্রতি এমন অনুভূতি জন্মায়নি তার। ইরামকে দেখে তার ওই জ্বালাময়ী অনুভূতিটা হচ্ছেনা। ঝলসে যাওয়া রূপের প্রতি স্বাভাবিক পুরুষালী আকর্ষণ আসছেনা। যেটা তার বুকের মাঝে জন্মেছে সেটা শ্রদ্ধাবোধ। ইরাম কোনো মেয়ে নয়, সে একজন নারী, একজন মা। তার রূপের প্রতি অনুভূতিটাও অজান্তেই পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে অসীম আগ্রহে। নারীসুলভ আকর্ষণে নয়।

ইরাম হেঁটে এসে সকলকে সালাম দিয়ে আস্তে করে সাইবানের পাশে বসল। তার কাজলটানা চোখ শুরুতেই ইযানকে খুঁজে বের করল। ছেলে নিরাপদে আছে নিশ্চিত হওয়ার পরেই সে তার পাশে বসা পুরুষটার উপর মনোযোগ দিল। সাইবান সঙ্গে সঙ্গে নিজের দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল। অনুভব করল বিনা কারণেই তার হৃদস্পন্দন বেড়ে গিয়েছে। এতটা কাছে বসা ইরাম যে তার শরীরে মাখা সূক্ষ্ম পারফিউমের ঘ্রাণটুকু তাকে মাতোয়ারা করে তুলছে। সাইবান কালো পোশাক পরেছে এই নিয়ে বিশেষ কোনো মন্তব্য ইরাম করলনা। নীরবে মাথা ঘুরিয়ে একবার পিছনে তাকাল। ঢোকার সময়েই সে দেখেছে, তার দুই ভাই এসেছে। সকলের থেকে পিছনে কার্পেটের একদম শেষ কিনারে বসেছে তারা। রাহাত মুখ নিচু করে নিজের ফোন ঘাটছে। ইহান অবশ্য ইরাম তাকাতেই বিরাট হেসে হাত তুলে নাড়ল। তার গালে একটা ব্যান্ডেজ দেখা গেল। কালকেও তো সুস্থ ছিল! এক রাতে কি হয়ে গেল? মনে মনে ভাবলেও আপাতত জিজ্ঞেস করার সুযোগ নেই। পরে কথা বলবে ভেবে ইরাম মাথা দুলিয়ে সামনে ফিরে তাকাল।

অনতিবিলম্বে বিয়ের কাজ শুরু হলো। ইরামের বয়সের ব্যাপারটা আসতেই উকিল ভ্রু তুলে তাকালেও কাজী সাহেবের পক্ষ থেকে কোনো অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া এলোনা। তিনি অতি স্বাভাবিকভাবেই সবকিছু করছেন। সারিকার কয়েকজন বান্ধবী এসেছিল দাওয়াতে। তারা অবশ্য সেই মুহূর্তেই কানাঘুষা শুরু করে দিল।

“সারিকা। কি ভাবছিস তোরা? তোর ভাইয়ের জীবনটা সবেমাত্র শুরু, আর সেখানে তাকে এক বাচ্চার মায়ের সাথে জুড়ে দিয়েছিস?”

“৭ বছর? ভাই, ৩-৪ বছর হলে মানা যায়! কিন্তু এত? উনি তো অর্ধেক বুড়ি হয়ে গিয়েছে। সাইবানের সঙ্গে যাবে কিভাবে?”

সারিকা প্রতিক্রিয়া না করার চেষ্টা করল। কিন্তু কথাবার্তা ততক্ষণে ছড়িয়ে গিয়েছে। যদিও সামিয়া এই ভয়েই একদম কাছের মানুষ ছাড়া কাউকেই দাওয়াত করেননি, তবু এমন অনাকাঙ্খিত ব্যাপারটা তাকে একইসঙ্গে লজ্জিত এবং ক্রোধিত করল। তিনি রাখঢাক করলেন না, সোজাসুজি বলে বসলেন,

“তোমরা না আধুনিক মেয়ে? এমন সস্তা মেন্টালিটি নিয়ে কীভাবে চলো?”

মেয়ে দুটো চুপ করে গেল সঙ্গে সঙ্গে। তবে একজনের মা বলে উঠল,

“ভাবী। কথা বলার মতন কাজ করলে লোকে তো বলবেই। আমি সন্দেহ করেছিলাম, আপনার ছেলের বিয়ের এত ছোট অনুষ্ঠান করছেন ভেবে। তবে এই ব্যাপার বুঝতে পারিনি। যতই বলুন, একজন ছেলে আর একজন মেয়ে তো আর এক না। মেয়েরা খুব তাড়াতাড়ি ম্যাচিওর হয়ে যায়। সেখানে আপনার ছেলে এত বড় একজনের সঙ্গে কীভাবে সংসার করবে সেটা মা হয়ে আপনার ভাবা উচিত ছিল। ভাবেননি বলেই অবাক হচ্ছি। এমনও মা হয়?”

“যেখানে ধর্ম একটা সম্পর্ককে জায়েজ ঘোষণা করেছে সেখানে সমাজ হয়ে প্রশ্ন করার আপনি কে?”

হঠাৎ করে ভেসে এলো কাজী সাহেবের দৃপ্ত কন্ঠস্বর। মুহূর্তেই পিনপতন নীরবতা নেমে এলো চারপাশে। কাজী সাহেব কাগজপত্র রেখে মুখ তুলে তাকালেন। মুখভর্তি সাদা দাড়ি, জ্বলজ্বলে চোখে পড়া চশমার ভেতর থেকে তিনি তাকালেন সামনে।

“আপনাদের শখ করে আগ্রহ নিয়ে একজন মা নিজের ছেলের বিয়ের সাক্ষী হতে দাওয়াত করেছেন, আপনাদের অতিথি হিসাবে মার্জিত আচরণ করা উচিত। সমালোচনা না।”

এবারেও কেউ কোনো কথা বলতে পারলনা। কাজী সাহেব সরাসরি তাকালেন সাইবানের দিকে,

“আপনার স্ত্রী আপনার থেকে বয়সে বড় আর তার একটি নাবালক শিশু সন্তান রয়েছে, এই নিয়ে আপনার আপত্তি আছে?”

সাইবান তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল, অতঃপর জবাব দিল,

“না।”

মুচকি হাসলেন কাজী সাহেব,

“বেশ তবে। আমরা নিকাহ্ কাযর্ক্রম জারি রাখি।”

উকিল এবং কাজী সাহেব মিলে সবকিছু ঠিকঠাক করার পর অবশেষে এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ।

“মরহুম রইজুল কিবরিয়ার সুযোগ্যা কন্যা ইরাম কিবরিয়া, আপনি কি ১১ লাখ ১১ হাজার ১০১ টাকা দেনমোহর ধার্যে এ কে এম আহমদ উদ্দিনের সুযোগ্য পুত্র সাইবান আলাদিনকে নিজের স্বামী হিসাবে গ্রহণ করতে রাজী? রাজী থাকলে কবুল বলুন।”

একটি দীর্ঘ প্রশ্বাস টানল ইরাম। তার মনে হলো, কয়েক সেকেন্ডের ভেতর নিজের গোটা জীবন থেকে ঘুরে এলো সে। জন্ম, বাবার চোখের মণি হয়ে বেড়ে ওঠা, বাবার চলে যাওয়া, গোটা সংসারের দায়িত্ব কাঁধে ফেলা, দুই ভাইকে মায়ের মতন স্নেহ ভালোবাসা দিয়ে গড়ে তোলা, ত্রিশ পেরিয়ে বিয়ের বন্ধনে বসা, প্রাক্তনের সঙ্গে দেখা ভালোবাসার জীবনের স্বপ্ন খানখান হয়ে যাওয়া, ইযানের জন্মের ভেতর দিয়ে জীবনে পরিপূর্ণতা আসা এবং আজ। সব জল্পনা কল্পনার অবসান। অসম এক সম্পর্কে নিজেকে জড়ানো। আজকে বিয়ের দিন, তবুও সমাজের চুলচেরা বিশ্লেষণ থেকে সে ছাড় পায়নি। ভবিষ্যতেও পাবেনা। এই সমাজ তাকে মায়া দেখাবে না। ছলছলে চোখে সে তাকাল অদূরে অনুরাগের কোলে বসে থাকা ইযানের দিকে। যেন জননীর চোখের ভাষা বুঝতে পেরে ওই মুহূর্তেই ইযান শব্দ করে উঠল,

“আই!”

হেসে ফেলল ইরাম। দ্রুত চোখ মুছে নিয়ে ছেলের দিকে তাকিয়েই গভীর গলায় বলল,

“কবুল।”

—তোমার জন্য এই মায়ের সবকিছু কবুল।

সকলে একযোগে আলহামদুলিল্লাহ বলে সাধুবাদ জানাল। এরপরই কাজী সাহেব ফিরলেন সাইবানের দিকে।

“কে এম আহমদ উদ্দিনের সুযোগ্য পুত্র সাইবান আলাদিন, আপনি কি ১১ লাখ ১১ হাজার ১০১ টাকা দেনমোহর ধার্যে মরহুম রইজুল কিবরিয়ার সুযোগ্যা কন্যা ইরাম কিবরিয়াকে নিজের স্ত্রী হিসাবে গ্রহণ করতে রাজী? রাজী থাকলে কবুল বলুন।”

সাইবান একনজর তাকাল নিজের পরিবারের দিকে। সামিয়া ঝাপসা চোখে তাকিয়ে আছেন, ছেলের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ এই মুহূর্তটায় চোখের পানি ধরে রাখতে পারছেন না। অপরদিকে সারিকা একটি বৃদ্ধাঙ্গুল তুলে তাকে থাম্বস আপ দেখাল। দুলাভাই মিসির মাথা নেড়ে তাকে উৎসাহ দিল। বন্ধুরাও অধীর আগ্রহে হাসিমুখে তাকিয়ে আছে। চোখ বুঁজলো সাইবান। একটামাত্র শব্দ তার গোটা জীবনকে বদলে দেবে। এমনভাবে বদলাবে যে সে হয়ত আর কখনোই ফিরে আসতে পারবেনা। এই শুরু, এই শেষ। অবশেষে চোখ খুলল সে। অতিরিক্ত চিন্তায় কিংবা ভয়ে নাকি সাইবান বলতে পারবেনা, তার মুখ থেকে বের হলো,

“কবর।”

বাজ পড়লেও বুঝি মানুষ এত অবাক হয়না যতটাই সাইবানের কথা শুনে হলো। জিভ কামড়ে ধরল বেচারা, কি বলে ফেলেছে সে উত্তেজনার ঠেলায়? পাশে বসা ইরাম খানিকটা ব্যথিত দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। তবে কি সাইবান তাকে গ্রহণ করতে পারছেনা? সেটাই তো হওয়ার ছিল। সত্যিই তো। কীভাবে অন্য কিছু আশা করা যায়? মুখ নত করে কোলের দিকে চেয়ে থাকল ইরাম। বুকে বুঝি ভারী পাথর চেপে বসেছে তার। ঠিক এমন সময়েই একটি পুরুষালী শক্তিশালী হাত তার মেহেদী রাঙা হাতের উপর চেপে বসল। দৃষ্টি প্রসারিত হয়ে গেল ইরামের, তার কানে সুগভীর কণ্ঠের জবাবটি ভেসে এলো বাঁধভাঙা জোয়ারের মতন,

“কবর অবধি কবুল। কবুল, কবুল, কবুল।”

চারিদিকে আরেক দফায় উল্লাস ধ্বনি ছড়িয়ে পড়ল। অথচ ইরাম কিছুই টের পেলনা। একদৃষ্টে চেয়ে রইল সে নিজের হাতের উপর রাখা শিরা উপশিরাপূর্ণ লম্বাটে আঙুলযুক্ত হাতটার দিকে।

                                   —চলবে—

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply