আমার_আলাদিন
জাবিন_ফোরকান
পর্বসংখ্যা৬
ঘুম থেকে উঠেই মায়ের জন্য চেঁচিয়ে কেঁদে যাচ্ছে ইযান। সবেমাত্র বাথরুমে ঢুকেছিল ইরাম, ফ্রেশ হতে। বাচ্চার কান্নার আওয়াজে হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে এলো। বিছানার একদম মাঝখানে কাঁথায় মোড়ানো ইযানের নাজুক শরীরটা ছটফট করছে। ছোট্ট হাত দুখানা ছুঁড়ে ছুঁড়ে মাকে কাছে পাওয়ার দাবি পেশ করে যাচ্ছে। ইরাম দ্রুত বিছানায় গেলো। ছেলেকে কোলে তুলে বুকে চেপে দোলাতে লাগল,
“এইযে, আম্মু এইখানে আছি বাবা। দেখি দেখি দেখি, কাঁদেনা আমার প্রিন্স। তুমি স্ট্রং বয়, তাইনা? আম্মুর স্ট্রং ব্রেইভ বয়!”
ইযানের মুখে অসংখ্য ছোট ছোট আদুরে চুমু দিতেই ছেলে শান্ত হয়ে এলো। ইরামের গালে গাল ঠেকিয়ে বুঝি জননীর শরীরের উষ্ণতায় নিজেকে ভোলালো। মুচকি হেসে ইরাম ছেলেকে শুরুতে কিছুটা দুধ খাইয়ে নিল। মাত্রই ঘুম থেকে উঠেছে যেহেতু, আবার এক্ষুণি ঘুমাবেনা। খানিকটা সতেজ বাতাসে থাকলে ভালো লাগবে। এই ভাবনাচিন্তা থেকে ইরাম পরনের সালোয়ার কামিজের ওড়নাটা ঠিকঠাক করে নিয়ে ছেলেকে সুন্দর করে নতুন একটি কাঁথায় পেঁচিয়ে গেস্ট রুমের বাইরে বেরোলো।
সামিয়া হাসপাতাল থেকে ফেরার সাথে সাথে আবার বাইরে চলে গিয়েছেন। কিচেন ভর্তি কেজির পর কেজি মিষ্টির প্যাকেটে। তার চেহারায় অকৃত্রিম খুশির ঝিলিক ছিল সবসময়। ছেলের বিয়ে নিয়ে উৎসাহের কোনো কমতি নেই। সিদ্ধান্ত হয়েছে বাড়িতেই ছোটখাট একটা অনুষ্ঠান করে আকদ হবে সাইবান আর ইরামের। একা হাতে সব আয়োজনে ছোটাছুটি করছেন সামিয়া। সাইবানও সকাল থেকে বাড়িতে ছিলনা। এখন ফিরেছে কিনা ইরামের জানা নেই।
ছেলেকে কোলে নিয়ে লিভিং রুমের দিকে যেতে যেতে একবার সকালের ঘটনাগুলো মনে করল ইরাম। সাইবানের বলা কথাগুলো এখনো কানে বাজছে তার। ছেলেটা এমনভাবে কথা বলল কেন? ইরাম কোনো হিংসা থেকে সাইবানকে পরনারীর সম্পর্কে বলেনি। যে ট্রমার মধ্য দিয়ে অরণ্য তাকে নিয়ে গিয়েছে, সেই ট্রমা দ্বিতীয়বার মোকাবেলা করার মতন শক্তি তার নেই। সাইবান আজকালকার ছেলে, উপরন্তু ইরাম এখনো ছেলেটাকে ঠিক বুঝে উঠতে পারছেনা। ছোটবেলার সাইবানের সঙ্গে আজকের সাইবানের ফারাক যোজন যোজন। ভরসা নামক গুণটি বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে তার মন থেকে। কিন্তু সাইবান তার একটা বাস্তবসম্মত অনুরোধের ভিত্তিতে এমন প্রতিক্রিয়া কেন করল? সে কি ইরামের সাথে মজা নিতে চাইছে? হতে পারে। ছেলেটাকে বুঝতে আরও অনেক কাঠ খড় পোঁড়াতে হবে তাকে।
লিভিং রুমের কাছাকাছি পৌঁছাতেই ইরাম টের পেল ভেতরে মানুষের উপস্থিতি আছে।
‘আজ কি রাত মাযা হুসন কা আঁখোসে লিজিয়ে~’
মিউজিকের আওয়াজে গমগম করছে লিভিং রুম। ইরাম ইযানকে কোলে নিয়ে ঢুকতে গিয়ে করিডোর থেকে খেয়াল করল সোফায় বসে বেশ আয়েশ করে টিভিতে গানের ভিডিও দেখছে সাইবান। বাইরে থেকে ফিরেছে পোশাকে বোঝা যাচ্ছে। একটা সাদা শার্ট আর কালো জিন্স পরনে। শার্টের বোতামগুলো খোলা, তাতে উন্মুক্ত বুক দেখা যাচ্ছে। লিভিং রুমের হলদেটে আলোয় রোমহীন চন্দন ফর্সা ত্বক চিকচিক করছে। ইরামের কোলে ইযান কুইকুই করে উঠল। পর্দার দিকে তাকানোর সুযোগ তার হলো না।
“এইযে বাবাটা, আম্মু তোমাকে ঘোরাতে নিয়ে যাচ্ছি।”
ইযানের কানে বিড়বিড় করতে করতে সে লিভিং রুমে পা রাখতেই সোফা থেকে দৃশ্যটা খেয়াল করল সাইবান। এক হাতে রিমোট ধরে পা ঝোলাচ্ছিল সে। তৎক্ষণাৎ রিমোটটা তাক করল টিভির দিকে। বিদ্যুতের গতিতে ঘটনাটা ঘটল। ইরাম দেখতেও পেলনা কি হয়েছে। শুধু শুনতে পেল। গানটা বদলে গিয়েছে। এখন টিভিতে ভাসছে কিছু কার্টুন, আর বাজছে,
“বেবি শার্ক ডুডুডুডু ডুডু, বেবি শার্ক ডুডুডুডু ডুডু~”
ভ্রু উঁচু করে ফেলল ইরাম। সাইবানের চেহারায় একটা ভীষণ বিরক্তি দেখা যাচ্ছে, আপনমনে কি যেন বিড়বিড় করে যাচ্ছে ঠোঁট নাড়িয়ে। মন্তব্য করবেনা করবেনা করেও বলে বসল,
“কি ব্যাপার? গানটা বদলালে কেন?”
“চাইল্ড ফিল্টার মেরেছি। শান্তি আছে নাকি এই বাড়িতে আর? এই বাড়ির শান্তির মা পটল তুলেছে, আর কিছুদিন পর বেগুনও তুলে ফেলবে।”
ইযানের অবশ্য গানের দিকে কোনো মনোযোগ নেই। সে জননীর বুকে চুপটি করে লেপ্টে আঙুল চুষছে।
“ভাইজান সুন্দর সুন্দর মাইয়ামানুষের নাচন কোদন দেখতে পারতেসে না তো, এইজন্য চেইত্তা গেসে!”
কথাটি ভেসে এলো সম্পূর্ণ অনাকাঙ্ক্ষিত একজন মানুষের তরফ থেকে। সুগন্ধা। হাতে কফির মগ নিয়ে হেলেদুলে কিচেন থেকে বেরিয়ে আসছে। তার চেহারায় ডোন্ট কেয়ার ভাব। ঠাস করে কফির মগটা সে সাইবানের সামনে টি টেবিলের উপর রেখে দিলো। এতক্ষণ রাগ দেখা না গেলেও এবার সত্যি সত্যি তেঁতে উঠল সাইবান,
“ইউ জরিনার আম্মা সকিনা! কত্ত বড় সাহস তোর! মুখে গু পড়বে তোর, মুরগীর জামাই মোরগের পাতলা পাতলা গু!”
সুগন্ধা বিপরীতে নিজের লম্বা চুলে একটা ঝটকা দিয়ে আবার উল্টো ঘুরে গেল। যেন সাইবান একপ্রকার তার মালিক নয়, বরং নগণ্য কোনো অস্তিত্ব। এই বাড়ির সবারই মাথায় সমস্যা, ইরাম ভাবল মনে মনে। তবে তাদের ঝগড়াঝাঁটি স্থায়ী হওয়ার সুযোগ পেলনা। খোলা সদর দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলেন সামিয়া, হাতে একগাদা ব্যাগপত্র। তার অনুসরণে করিম, ওই লোকটারও হাতে, মাথায়, কাঁধে ব্যাগ ঝুলছে। শপিং করে এসেছে স্পষ্ট। দ্রুত প্রতিক্রিয়া করল ইরাম। হুট করে সাইবানের দিকে ইযানকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
“ধরো তো একটু।”
ছিটকে দূরে সরে গেল সাইবান।
“ইশ, ছিঃ!”
ইযান ছোট্ট মুখটা ঘুরিয়ে জিভ বের করে সাইবানের দিকে ডাগর ডাগর চোখে চেয়ে রইল। ওই বড় বড় টলটলে জীবন্ত দীঘির ন্যায় দৃষ্টি দেখে একটি শক্ত ঢোক গিললো সাইবান,
“ইয়া আল্লাহ! ইয়া আল্লাহ তুমি রহম করো, ওহ মাবুদ! শক্তি দাও, ধৈর্য্য দাও, টাকা দাও!”
কাঁপা কাঁপা দুহাত বাড়িয়ে ইযানের কাঁথায় মোড়ানো ছোট্ট শরীরটা কোনমতে সাইবান ধরেছে কি ধরেনি ইরাম ছুটে চলে গেল সামিয়ার কাছে। আঁড়চোখে সেদিকে চেয়ে সাইবান দৃষ্টি ফেরালো দুহাত টানটান করে শরীরের থেকে একহাত দূরে ধরে রাখা ইযানের দিকে। শক্ত একটি ঢোক গিললো সে, নিঃশ্বাস প্রশ্বাস ভারী হয়ে উঠেছে তার, যেকোন মুহুর্তে প্যানিক আট্যাক করতে পারে। ইযানের কাদার মতন নরম শরীরটা বুঝি তার বিশাল দুই হাতের আঙুলের ফাঁক গলে পরে যাবে! মাথা কাত করে বাচ্চাটার চোখে চোখ রাখল সাইবান। অদ্ভুতভাবে ইযান একটুও কাঁদলনা, বরং সাইবানকে নকল করে নিজের ছোট্ট মাথাটাও কাত করল, আঙুল চুষতে চুষতে তাকিয়ে রইল গোল গোল চোখে।
“আপনি আঙুল খাচ্ছেন কেন? নিয়মিত নিজের মায়ের মাথাটা খাবেন।”
সাইবানের কন্ঠে ইযান দুই পা নেড়ে সামান্য ঝটকা দিয়ে উঠল, ফোকলা দাঁতের মাড়ি দেখিয়ে হাসল নাকি বিদ্রুপ করল বোঝা দায়। আরেকটু হলে সাইবান তাকে ফেলেই দিচ্ছিল, কিন্তু সয়ংক্রিয়ভাবে তার হাতদুটো ইযানকে কাছে টেনে বুকের উপর রাখল। শার্টের বোতাম খোলা থাকায় তার তপ্ত ত্বকের সরাসরি স্পর্শে ইযান গুটিশুটি দিয়ে একদম বুকের সঙ্গে লেপ্টে গেল। ভ্রু উঁচু হলো সাইবানের, মহা বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে রইল নিজের বুকে ঠেকিয়ে রাখা নগণ্যপ্রায় অস্তিত্বটিকে। তার হাতের তালু ইযানের সমস্ত পিঠের সমান, বিষয়টা একইসঙ্গে বিস্ময়কর এবং উপভোগ্য। এত ছোট মানুষ হয়? এ তো জ্যান্ত একটা পুতুল।
মুচকি হাসি ফুটল সাইবানের ঠোঁটে। অজান্তেই দুই পা নাড়িয়ে ইযান সমেত শরীর দোলাতে দোলাতে সে টিভির কাছে গিয়ে দাঁড়াল। তখনো বাচ্চাদের গানটা বেজে চলেছে। অথচ ইযানের ওই গানের প্রতি বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। সে সাইবানের বুকের মাঝে কিলবিল করে যাচ্ছে, নতুন পরিবেশ, নতুন মানুষ চিনছে তার মস্তিষ্ক।
“বাচ্চা ফিল্টার তোর পছন্দ না? তাহলে কি পছন্দ? বেলিড্যান্স দেখবি?”
“আই?”
মৃদু একটা শব্দ করে কৌতূহলী চেহারায় ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল ইযান। সাইবান অন্য হাতে ধরা রিমোটটা দিয়ে গানটা বদলে আগের গানে ফিরে গেল। সমস্ত লিভিং রুমে বেজে উঠল,
‘থোরি ফুরসাত ভি মেরি জাঁ কাভি বাহোকো দিজিয়ে, আজ কি রাত মাযা হুসনকা আঁখোসে লিজিয়ে~’
অদ্ভুত হলেও সত্য গানের বিটের সঙ্গে সঙ্গে ইযান চোখ ঘুরিয়ে টিভির পর্দার দিকে তাকাল। চোখেমুখে একটা নিদারুণ আকর্ষণ ফুটল তার। ছোট্ট শরীরটা মিউজিকের তালে তালে নড়ে উঠল, মাথাটা ঝুলিয়ে ঝুলিয়ে ইযান ছোট্ট হাত দুখানা নাড়তে লাগল,
“আই…আআ..!”
বিরাট এক তীর্যক হাসিতে ছেয়ে গেল সাইবানের সমস্ত মুখমন্ডল।
“তু তো মেরেসেভি বাড়া কামিনা নিকলা ইয়ার! জিও মামা, আয় নাচি, ইয়ে ইয়ে!”
“উই উই!”
এক হাতে ইযানকে ধরে রেখে আরেক হাত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে লাফাতে লাগল সাইবান। তার ভয়ডর সব ভেঙে গিয়েছে। সামিয়া আর ইরাম দুজনই তখন সবেমাত্র কথা বলতে বলতে রুমের মাঝখানে এসে পৌঁছেছে। সামনের বিপদজনক দৃশ্য দেখে আঁতকে উঠল ইরাম। সামিয়ার হাত থেকে যে শপিং ব্যাগগুলো সে সাহায্য করার উদ্দেশ্যে নিজের হাতে নিয়ে নিয়েছিল, সেগুলো ঝরঝর করে পরে গেল মেঝেতে। উদ্দাম লাফিয়ে চলেছে সাইবান, সিটি বাজাতে বাজাতে। তার বুকে লেপ্টে থাকা ইযান একটা হাত আঁকড়ে ধরে দণ্ডহীন মাড়ি দেখিয়ে হাসতে হাসতে অতি উৎসাহ নিয়ে টিভির পর্দায় তাকিয়ে আছে।
“আলাদিন!”
ইরাম শঙ্কায় ছুটে যেতে নিল, কিন্তু পিছন থেকে সামিয়া তার একটা হাত আঁকড়ে ধরে ফেললেন।
“আটকাস না, বন্ডিং হতে দে।”
দ্বিধায় থেমে গেল ইরাম। বিচলিত দৃষ্টিতে সামিয়ার দিকে ফিরে তাকাল। মুচকি হেসে তিনি আশ্বাস দিলেন,
“চিন্তা করিস না, আমার সাইবান অতটাও কেয়ারলেস না।”
যেন সামিয়ার উক্তিকে কটূক্তি করতেই তৎক্ষণাৎ সাইবানের ভয়ংকর রকমের আর্তনাদ ভেসে এলো,
“আহহহহহ! হেগে দিয়েছে! ফারাক্কা বাঁধ খুলে হেগে ভাসিয়ে দিয়েছে পোটলাটা! ইয়াক!”
ঝট করে মাথা ঘুরিয়ে ইরাম এবং সামিয়া দুজনই দেখলেন ইযানকে জড়ানো কাঁথাটা ভিজে আছে। সাইবানের খোলা বুকের উপর জ্বলজ্বল করছে বাদামী বর্ণের তরল মানবশিশু বর্জ্য! টলে উঠল সাইবান, ইরাম আর থামতে পারলনা। দৌঁড়ে গিয়ে কাঁথা সমেত ইযানকে নিজের কোলে তুলে নিল। কিন্তু ততক্ষণে কাজ যা হওয়ার হয়ে গিয়েছে। সাইবান টিভি ক্যাবিনেট আঁকড়ে ধরল নিজের পতন ঠেকাতে। চেহারাটা বিকৃত হয়ে গেল তার ঘৃণায়,
“ওয়াক! ওয়াক…!”
“সরি সরি, একটু আগেই দুধ খাইয়েছি তো!”
হাতের কাছে কিছু না পেয়ে নিজের গলার ওড়নাটা দিয়েই সাইবানের বুক মুছতে লাগল ইরাম। কাপড়টা টেনে নিয়ে নিজের শরীর ঘষতে ঘষতে লাল টকটকে বানিয়ে সাইবান খেঁকিয়ে উঠল,
“পোটলার ঘরের পোটলা! ফরজ, নফল, ওয়াজিব, সব গোসল দিতে হবে আমাকে! দেখিস তুই আর যদি তোকে কোলে…ওয়াক! ওয়াক!”
সবকিছু ফেলে মুখ চেপে ধরে ছুটতে ছুটতে সাইবান দুই তলায় উঠে গেল। সেখানের করিডোরে বেসিন আছে। দূর থেকেও তার বমি করার শব্দ ভেসে আসতে লাগল স্পষ্ট।
ঝড় একটু শান্ত হতেই সামিয়ার অট্টহাসির শব্দ ভেসে এলো,
“আমার নাতি একদম বাপের উপরে গিয়েছে। জানিস? সাইবানের বাবা যখন ওকে প্রথম কোলে তুললো, হিশু করে লোকটার জামাকাপড় ভাসিয়ে দিয়েছিল। লোকটার মুখে ঢুকে গিয়েছিল, হায় খোদা! এরপর দশদিন সাইবানকে কোলে নেয়নি আর! হাহাহা!”
ইরাম এতসবকিছুর মাঝে হাসবে নাকি আফসোস করবে বুঝতে পারলনা। কিন্তু বুকের ভেতর ভর করা উষ্ণতাটা তাকে বুঝিয়ে দিল, বহুদিন বাদে সে একটুখানি সুখ সুখ অনুভূতি টের পাচ্ছে।
──────────────────────────
পরদিন সকালে ইরামের ঘুম ভাঙল মৃদু গোলযোগের কারণে। বিছানায় সটান উঠে বসল সে। ঘড়ির দিকে তাকাল। সকাল সাড়ে নয়টা বাজে। ইযান গতকাল রাতে অনেকবার জেগে উঠেছে, তার যত্ন নিতে নিতে ভোরের দিকে ঘুমানোর সুযোগ পেয়েছে ইরাম। যার কারণে এতটা দেরী হয়ে গিয়েছে। বাইরে থেকে উত্তেজিত কন্ঠস্বর ভেসে আসছে। অচেনা। ইরাম বসে থাকতে পারলনা। ঘুমন্ত ছেলের দুপাশে দুটি কোলবালিশ দিয়ে সুরক্ষিত করে নেমে পড়ল। মুখ ধুয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শাড়ির কুঁচকে যাওয়া আঁচল ঠিকঠাক করে সে বাইরে বেরোলো। দুহাতে চুলে আঙুল চালিয়ে খোঁপা বাঁধতে বাঁধতে যখন সে হলঘরে এসে পৌঁছাল তখন দৃশ্যটি চোখে পড়ল।
জর্জেটের শাড়ি পরনে এক সুদর্শনা রমণী দন্ডায়মান। স্ট্রেট সিল্কি চুলগুলো পিঠ ভাসিয়ে নেমে গিয়েছে কোমরের নিচ অবধি। চেহারায় একইসাথে মায়া এবং কঠোরতা। হাতে রেশমি চুড়ি। খানিকটা নতুন বউ নতুন বউ ধরণের প্রভাব আছে ভেতরে। সামিয়ার সঙ্গে বাকবিতন্ডায় লিপ্ত হয়েছে সে।
“মম, তুমি সাইকে এভাবে জোর করতে পারো না। তুমি জানো না ও কোন লেভেলের সাইকো? তুমি একবার ফেইক মুক্তা কিনে স্ক্যামড হয়ে গিয়েছিলে বলে ওইদিনই সোজা কক্সবাজারে গিয়ে মুক্তা ব্যবসায়ীদের সাথে সাগরে গিয়ে নিজে থেকে ঝিনুক আহরণ দেখে বেছে বেছে আসল মুক্তা নিয়েই ফিরেছিল! মনে নেই তোমার? টানা সাতটা দিন ওর কোনো হদিসই পাইনি আমরা! আর তুমি এই ছেলের সামনে উচ্চারণ করো বিয়ের কথা? ও তো সেটা করবেই!”
“চিৎকার করিস না সারিকা, এটা ভদ্রলোকের বাড়ি আর একটা ছোট বাচ্চা আছে ঘরে।”
“বাচ্চা মাই ফু…!”
“সারিকা, প্লীজ। শান্ত হও।”
সারিকাকে থামাতে এতক্ষণ একপাশে দাঁড়ান দীর্ঘদেহী পুরুষটি এগিয়ে এলো। ধূসর বর্ণের স্যুট পরনে। চোখেমুখে ভাবগাম্ভীর্য এবং নমনীয়তা। উজ্জ্বল দৃষ্টি। সারিকার কাঁধে হাত রাখল সে। এই পুরুষটিকে না চিনলেও রমণীকে চিনতে বেগ পোহাতে হলনা ইরামের।
সাইবানের একমাত্র বড় বোন। সারিকা বিনতে আহমদ। ইরামের যতদূর মনে পরে একে অপরের সাথে দুই কি তিন বছরের ব্যবধান তাদের। যতদূর শুনেছে গত বছর সারিকার বিয়ে হয়ে গিয়েছে। তাহলে পুরুষটি হয়ত তার স্বামী। ইরাম খানিকটা ইতস্তত করল। কিন্তু ততক্ষণে সামিয়া তাকে দেখে ফেলেছে। তাই পালিয়ে না গিয়ে ইরাম ভেতরে ঢুকল। মোলায়েম গলায় বলল,
“কেমন আছো, সারিকা? বহুদিন বাদে তোমায় দেখলাম।”
সারিকা সটান ঘুরে দাঁড়াল। ইরামকে দেখেই তার চোখমুখ বিতৃষ্ণায় ছেয়ে গেল। কাঁধ থেকে পুরুষটির হাত ঝটকা দিয়ে সরিয়ে সে হনহন করে হেঁটে এসে ইরামের মুখোমুখি দাঁড়াল।
“ফালতু প্যাচাল বাদ দাও, ইরাম আপু। তোমার লজ্জা করেনা নিজের হাঁটুর বয়সী একটা ছেলের ঘাড়ে চেপে বসতে? হোয়্যার ইয ইওর সেল্ফ রেসপেক্ট?”
ইরাম বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। সারিকা মেয়েটা খারাপ না। ছোটবেলায় যতটুকু দেখা, সাক্ষাৎ আর কথাবার্তা হয়েছে, কখনোই তাকে এইভাবে অপমান করে কথা বলেনি। অথচ আজ বলছে। ইরাম সারিকাকে দোষ দিতে পারলনা। সমাজের মানুষ মাত্রই তার এবং সাইবানের বিয়েটাকে কটু দৃষ্টিতে দেখবে সেটা সে জানে।
“সারিকা! বিহেইভ ইওরসেল্ফ! মানুষের সঙ্গে এমন ব্যবহার করা শিখিয়েছি আমি তোদের? যা, ঘরে যা। তোর মাথা গরম আছে। আমরা এই বিষয়ে পরে কথা বলব।”
তপ্ত দৃষ্টিতে একবার সামিয়াকে দেখে গটগট করে হেঁটে সারিকা অন্দরমহলে আড়াল হয়ে গেল। পিনপতন নীরবতা ভর করল সমস্ত ঘরে। সামিয়া একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোফায় বসলেন, এক হাতে কপাল ঠেকিয়ে রইলেন। ইরাম ভীষণ অস্বস্তিবোধ করল। বুঝতে পারলনা সে চলে যাবে কিনা। তবে সিদ্ধান্ত নেয়ার আগেই সুদীর্ঘ পুরুষটি এগোলো তার দিকে। থেমে বলল,
“দুঃখিত, মিস। আপনি কিছু মনে করবেন না। আসলে সাইবানের বিয়ের কথা জানার পর থেকেই সারিকা একটু রেগে আছে। ভাইকে নিয়ে একটু বেশিই চিন্তিত। ওর হয়ত আপনাকে আঘাত করার উদ্দেশ্য ছিলনা। ওর পক্ষ থেকে আমি আপনার কাছে ক্ষমা চাইছি।”
“না। আমি কিছু মনে করিনি। ওর মনের অবস্থা আমি বুঝতে পারছি।”
মুখ তুলে পুরুষটির স্নিগ্ধ মুখের দিকে তাকাল ইরাম।
“আপনি…”
“আমার জামাই।”
সামিয়া বাৎলে দিলেন। পুরুষটি এবার নিজের ডান হাত এগিয়ে দিয়ে স্মিত হাসি নিয়ে জানাল,
“মিসির। মিসির ইকবাল, ইউ ক্যান কল মি জাস্ট ভাইয়া।”
ইরাম না চাইতেও খানিকটা হেসে ফেলল।
“মিসির? লাইক, হুমায়ুন আহমেদের মিসির আলী?”
“হাহাহা, সবাই বলে। আমার মা ভীষণ হুমায়ুন ভক্ত, মিসিরকে তার এতই মনে ধরেছে যে ছেলের নামটাই রেখে দিয়েছেন চরিত্রের নামে।”
ইরাম মিসিরের হাতটা ধরল, করমর্দন করে বলল,
“ইরাম কিবরিয়া, ইউ ক্যান কল মি জাস্ট ইরাম, মিসির ভাইয়া।”
মাথা দুলিয়ে সম্মতি জানিয়ে নিজের হাতটা সরিয়ে নিলো মিসির। সামিয়ার দিকে ফিরল,
“মম, আমি তাহলে আসছি। ফার্মে একটা প্রজেক্টের কাজ আছে, সারিকাকে পৌঁছে দিতেই এসেছিলাম।”
“সে কি? তুমি আজ থাকবেনা?”
“কালই তো বিয়ে। কাল সকাল সকাল চলে আসব।”
“তা হলে তো হবেনা বাবা। এতসব কাজ করবে কে? আমার বয়স হয়েছে, তোমাকেও তো সামলাতে হবে।”
মিসির খানিকটা ভেবে বলল,
“আচ্ছা মম, আমি আজ রাতে চলে আসব।”
“ঠিক আছে। তবে একেবারে শুকনো মুখে আমি বের হতে দেব না, সরি। নাস্তা করে যাও।”
“না না। আমরা খেয়েই বেরিয়েছি। তাছাড়া আমার দেরী হয়ে যাচ্ছে। তবে আপনি চাইলে এক কাপ চা দিতে পারেন।”
“সুগন্ধাকে একটু বাজারের দিকে পাঠিয়েছি করিমের সাথে। তুমি বসো, আমি এক্ষুণি করে দিচ্ছি।”
এবার ইরাম এগিয়ে এলো,
“না খালামণি। তুমি বসো ওনার সাথে। এমনিতেও কয়েকদিন ধরে খুব কষ্ট করছো। আজ একটু ছুটি পেয়েছ। আমি চা করে আনছি তোমাদের দুজনের জন্যই।”
“পারবি? আচ্ছা যা, লক্ষ্মী মেয়ে আমার। এর মধ্যেই বাড়ির বউয়ের দায়িত্ব বুঝে নিচ্ছে।”
মৃদু হেসে ইরাম কিচেনের দিকে চলে গেল। সুগন্ধা যখন তাকে নাস্তা দিত, তখন হাতে হাতে টুকটাক সাহায্য করে সে জেনে গিয়েছে কোথায় কি আছে। তাই চা পাতি, চিনি, দুধ ইত্যাদি খুঁজে পেতে সমস্যা হলোনা। চুলায় কেতলি বসিয়ে তাতে দুধ দিয়ে প্রথমে ভালো করে ফুটিয়ে নিলো সে। খানিকটা চিনি দিয়ে তাতে চা পাতা ছেড়ে দিতেই ধীরে ধীরে ধবধবে সাদা তরল দারুণ বাদামী রং ধারণ করল। দুটো কাপ ট্রেতে রেখে সঙ্গে কিছু কুকিজ প্লেটে সাজিয়ে নিলো। ইরামের ঘরের কাজকর্ম করতে বেশ ভালোই লাগে। চা প্রায় হয়ে আসলে সে আঁচটা খানিক কমিয়ে ভালোমত ফুটে চা মজাদার হতে দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ঠিক তখনি নিজের পিছনে অদ্ভুত একটা উষ্ণতার উপস্থিতি টের পেল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই শক্ত পুরুষালী বুকের সঙ্গে ধাক্কা লাগল তার পিঠের, সঙ্গে সঙ্গে দুইটি শক্তিশালী বাহু ঠিক তার দুইপাশে সামনের কাউন্টারের উপর এসে বসল। চিনতে একটুও বেগ পোহাতে হলনা ইরামকে। ঠিক পিছনে দাঁড়িয়ে আছে আলাদিন।
“আলাদিন? কি সমস্যা? এমন অভদ্র আচরণ করছ কেন?”
খানিকটা ঝাঁঝ নিয়েই শুধাল ইরাম। ছেলেটা এভাবে হঠাৎ হঠাৎ তাকে ভড়কে দেয় কেন? এমন অপ্রস্তুত অবস্থায় ফেলার কোনো মানে হয়? ঘাড়ের উপর সাইবানের তপ্ত নিঃশ্বাস ছুঁয়ে যেতেই ইরাম খানিক ঝটকা দিল,
“প্লীজ! আমার এসব একদম পছন্দ না। আমি মজার মুডে নেই, দূরে যাও আলাদিন!”
অথচ একচুল নড়লনা সাইবান। বরং আরও কাছে সরে এলো, ইরামকে রীতিমত কাউন্টারের সঙ্গে লেপ্টে যেতে হলো। মুখ নিচে নামিয়ে ইরামের কানে ফিসফিস করে উঠল সাইবান,
“বলেছিলাম না পরপুরুষ আপনার জন্য নিষিদ্ধ?”
“কি উল্টাপাল্টা কথা বলছ? কিসের পরপুরুষ?”
“চা বানাচ্ছেন কার জন্য?”
থমকে গেল ইরাম। চুলায় টগবগ করে ফুটতে থাকা চায়ের দিকে প্রসারিত দৃষ্টিতে চেয়ে রইল। সাইবান তার কাঁধে থুতনি ঠেকিয়ে কন্ঠ খাদে নামিয়ে বলল,
“চা বানানো হয়, আবার হ্যান্ডশেকও করা হয়! নাইস!”
—চলবে—
[ কালকে আমার বিরতি। কালকে দিব না গল্প, আজকে বড় করে দিসি, হুহ্! আর সবাই বিয়ের গিফট কিনতে বেরিয়ে পড়েন, গিফট ছাড়া কোনো দাওয়াত নাই। আলাদিনের বিয়েতে ঢুকতে হলে, ক্যাশ হাতে দিতেই হবে। 🥱 ]
Share On:
TAGS: আমার আলাদিন, জাবিন ফোরকান
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
আমার আলাদিন পর্ব ১৩
-
আমার আলাদিন পর্ব ১৪
-
আমার আলাদিন পর্ব ৩
-
আমার আলাদিন পর্ব ১৫
-
আমার আলাদিন পর্ব ২০
-
আমার আলাদিন পর্ব ১
-
আমার আলাদিন পর্ব ৮
-
আমার আলাদিন পর্ব ৪
-
আমার আলাদিন পর্ব ১০
-
আমার আলাদিন পর্ব ১২