Golpo আমার আলাদিন কষ্টের গল্প

আমার আলাদিন পর্ব ২৩


#আমার_আলাদিন

#জাবিন_ফোরকান

#পর্বসংখ্যা২৩

আজ সকালে হাসপাতাল থেকে ডিসচার্জ করা হয়েছে ইযানকে। অবশেষে ইরামের বিস্তর চিন্তার একটু হলেও অবসান ঘটেছে। গাড়ি চলছে মৃদু গতিতে। পিছনের প্যাসেঞ্জার সিটে ইরাম, তার পাশে বসেছে সাইবান। ইযান মায়ের বুকে লেপ্টে আছে। ঘুমাচ্ছে না। ডাগর ডাগর চোখ মেলে চারপাশ দেখছে। মুন্সীবাড়ির রাস্তা কেটে সাইবানদের বাড়ির সামনে এসে থামল গাড়ি। ব্যাগপত্র নিয়ে প্রথমে বেরোল সাইবান। অতঃপর তাকে অনুসরণ করল ইরামও। ছেলেকে কাঁধে শুইয়ে গাড়ির দরজা আটকে পিছনে ঘুরতেই একটি দৃশ্য তার নজর কেড়ে নিল। রাস্তার অপর পাশে রাহাত দাঁড়িয়ে আছে। পুরোদস্তুর তৈরি। বোঝাই যাচ্ছে অফিসের জন্য বেরিয়েছে। তার পিছনে বিদায় জানাতে এসেছে মিথিলা। উভয়েই ইরামের দিকে তাকিয়ে আছে। রমণী এক পলক ভাই এবং ভাইয়ের স্ত্রীর দিকে তাকাল। পরক্ষণে উল্টো ঘুরে সাইবানের দিকে ইযানকে এগিয়ে দিল,

“ধরো তো।”

সাইবান নিঃশব্দে ইযানকে কোলে তুলে নিল। খানিকটা কৌতূহলী দৃষ্টিতে ইরামকে রাস্তার অপর পাশে এগিয়ে যেতে দেখলেও কোনো মন্তব্য করলনা। ইরাম রাহাতের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। ভাই দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলেও মিথিলা বলে উঠল,

“বাবু কেমন আছে এখন?”

ইরাম মৃদু হাসল।

“আমি এখানে এসে না দাঁড়ালে এই প্রশ্নটাও কি করতে মিথিলা?”

থতমত খেয়ে গেল মিথিলা, তবে পাল্টা কোনো উত্তর করলনা। রাহাত মুখ তুলে ইরামের দিকে চেয়ে বলে উঠল,

“কি বলতে চাইছ আপু?”

“কিছু বলতে চাইছি না। দেখতে এলাম এই বাড়িতে কেউ মরে টরে গেল নাকি আবার! এছাড়া কোনো যুক্তি খুঁজে পাচ্ছিনা। তিনদিন তিনরাত হাসপাতালে একটা মাসুম বাচ্চা ছটফট করে গেল, অথচ মামা মামী হয়েও এক সেকেন্ড তাকে দেখতে যাওয়ার মতন সুযোগও হলোনা কারো। কোনো বড় দুর্ঘটনা না ঘটলে তো এমনটা হওয়ার কথা না।”

রাহাত দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

“আপু। ইযানের সঙ্গে যা হয়েছে তার জন্য আমরাও দুঃখিত।”

ইরামের ঠোঁটের হাসিটা আরেকটু বিস্তৃত হলো। কোনো প্রফুল্লতা নয়, অদ্ভুত এক পরিতাপের বিষন্ন হাসি।

“একটা সময় ছিল রাহাত। যখন তোর জ্বর হলে সারারাত তোর মাথার কাছে বসে মাথায় জলপট্টি দিতাম। তুই বজ্রপাতে ভয় পেতি। ঝড় হলেই বালিশ নিয়ে আমার রুমে এসে বলতি, আপু আজকে আমি তোমার সাথে ঘুমাই? তোকে ভাই কম, নিজের সন্তানের মত দেখেছি আমি। অথচ তুই আমার সন্তানেরই মান রাখতে পারলিনা। এতই বড় মানুষ হয়ে গিয়েছিস আজকাল?”

রাহাতের মুখটা থমথমে হয়ে গেল। দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল সে খানিক অপরাধীর ভঙ্গিতে। মিথিলা খানিকটা কর্কশ গলায় বলে উঠল,

“আপু। আপনার তো আমাদের কোনো প্রয়োজন নেই এখন আর। বড় ঘরের বউ হয়েছেন। টাকা পয়সার তো কমতি নেই কোনো। ডাক্তার শ্বাশুড়ি, ব্যবসায়ী শ্বশুড়। স্বামী যেমনি হোক না কেন, আপনার আর কি লাগে?”

মিথিলার কথায় স্পষ্ট তাচ্ছিল্য প্রকাশ পেল। ইরাম ভ্রু কুঁচকে ফেলল।

“স্বামী যেমনি হোক মানে?”

“আপু…”

রাহাত কিছু বলতে যাচ্ছিল তবে ইরাম হাত তুলে ভাইকে থামিয়ে দিল। তার নরম কোমল দৃষ্টি বদলে তীক্ষ্ণতর হয়ে উঠল। মিথিলার দিকে ধারালো চোখে চেয়ে সে বলল,

“হেঁয়ালি করে কথা বলা পছন্দ করিনা আমি। সাহস থাকলে সরাসরি বলো।”

“বলার কি আছে, আপু? সবাই তো জানেই। শুধু বড়লোক হলেই হয়না, ট্যালেন্ট, পড়াশোনা, রুচি, সুশীলতা থাকতে হয়। কাহিনী একটু হলেও আমাদের কানে আসে। এলাকার বাইরে তো থাকি না। এমনি এমনি আপনার উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে কেউ? এমনিতেই দুধের শিশুটার উপর দিয়ে ঝড় গিয়েছে? কোনো বেয়াদবি করেনি আপনার…খালাতো ভাই?”

শেষ দুটো শব্দে আলাদাই একটা জোর দিল মিথিলা। রাহাত খপ করে স্ত্রীর হাত ধরে থামতে ইশারা করলেও সে বেপাত্তা হয়ে বলে গেল,

“এলাকার মাস্তান কিনা! কোথায় কোথায় কি কি করে বেড়ায় দেখুন গিয়ে।”

“ঠিকই বলেছ। কোথায় কোথায় কি কি যেন করে বেড়ায়! শুধু স্ট্যাটাসের বাহানায় কোনোদিন ঘাড় থেকে বোনের বোঝাটা নামাতে পারলনা। মানুষের বিপদ দেখে মুখ ফিরিয়ে হেঁটে যাওয়ার বদলে সেখানে ঝাঁপিয়ে পড়া থেকে নিজেকে রুখতে শিখলনা। এসবই তো করে বেড়ায় সারাদিন ও।”

তীর্যক হেসে বলল ইরাম। মিথিলা এবং রাহাত উভয়ে জমে গেল। ইরাম কয়েক পা এগোলো, দাঁড়াল একেবারে মিথিলার মুখোমুখি। মিথিলার চেয়ে সে ইঞ্চিকয়েক লম্বা। ঝুঁকে রমণীর বিভ্রান্ত মুখমন্ডলের পানে চেয়ে ইরাম বলল,

“ট্যালেন্ট, পড়াশোনা, রুচি, সুশীলতার নিদর্শন তো তোমার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে। দ্যা এভার পারফেক্ট জীবনসঙ্গী। কি মনে হয় মিথিলা? তোমার ছেলেরা তোমার স্বামীর মত হলে সইতে পারবে?”

জমে গেল মিথিলা। একটা টু শব্দও আর বের করতে পারলনা মুখ থেকে। ইরাম পর্যবেক্ষণ করল তার মুখটা। ক্রোধ প্রকাশ করল প্রকাশ্যে।

“যদি পারফেক্ট সুশীল জীবনসঙ্গী তোমার স্বামীর মত হয়, তাহলে আমার এলাকার মাস্তানই সই। আরেকটা কথা ঠিকই বলেছ তুমি, মানুষের মনকে বিষিয়ে তুলতে হলেও ট্যালেন্ট লাগে। সেক্ষেত্রে আমার আলাদিন পুরোই ট্যালেন্টলেস!”

পিছিয়ে দাঁড়াল ইরাম। শেষ একবার ভাই আর ভাইয়ের স্ত্রীর দিকে তাকাল। হতবাক হয়ে চেয়ে আছে দুজনই।

“বায় দ্যা ওয়ে। আমার প্রপার্টির কাগজ কতদূর রাহাত? দুই মাস তো প্রায় হয়েই এলো। চটজলদি কর, নাহলে মামলা মোকদ্দমা চালানোর হিম্মত আমার খুব ভালোভাবেই আছে, জানিস তো।”

মুচকি হেসে উল্টো ঘুরে রাস্তা পেরিয়ে অপর পাশে চলে এলো ইরাম। পিছনে ফিরে আর দেখলও না। সাইবান লোহার গেটের কাছে ইযানকে নিয়ে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল তার। সে আসতেই বাঁকা হেসে সাইবান বলে উঠল,

“আপনার হাসিটা পুরোই মম যে সিরিয়াল দেখত সেই সিরিয়ালের কূটনি বেটির মতন। ব্যাপার কি? আপনিও কবে থেকে অন্যের জীবনে ভিলেনগিরি শুরু করলেন?”

“তুমি গুরু। তোমার কাছ থেকেই তো শিখেছি।”

পাল্টা জবাব দিয়ে ইরাম লম্বা পা ফেলে বাড়ির দিকে এগোল। খিলখিল করে হেসে ছেলেকে কাঁধের উপর টেনে তুলে সাইবান সাগ্রহে অনুসরণ করল স্ত্রীকে।

⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠─⁠──⁠──

গভীর রাত।

সাইবান এখনো দুই চোখের পাতা এক করতে পারেনি। সোফায় শুয়ে বারংবার এদিক সেদিক করছে সে। সেই রাতের চিত্রটা সে ভুলতে পারছেনা। পুলিশকে বিষয়টা সম্পর্কে জানানো হয়েছে। প্রাথমিক ইনভেস্টিগেশনে ধরা পড়েছে দুটো লা*শের একটাও বখতিয়ারের না। ইরাম আর ইযানের উপর হওয়া হামলার বিরুদ্ধেও থানায় মামলা দায়ের করেছে সাইবান। সেই ভিত্তিতে খুঁজতে গেলে জানা যায় বখতিয়ার পলাতক। সে কোথায় আছে কেউই জানেনা। সম্পূর্ণ কেসটা কেমন যেন ঘোলাটে। ওই দুজন চ্যালাকে তবে কে খু*ন করেছে? সাইবান পৌঁছানোর অনেক আগেই ঘটেছে ঘটনা, তাই তো অমন দুর্গন্ধ ছড়াতে শুরু করেছিল। ব্যাপারটা ভীষণ ধোঁয়াশা। যার কূলকিনারা আপাতত সে করতে পারছেনা। তবে সাইবান এইটুকু ঠিকই বুঝতে পারছে, ভবিষ্যতে তাকে অনেক সাবধানে চলতে হবে।

ভাবনায় বিভোর সাইবান সোফায় পাশ ফিরে শোয়ার চেষ্টা করল। রুমের ভেতর অত্যন্ত মৃদু একটা টেবিলল্যাম্প জ্বলছে। পুরোপুরি অন্ধকার ভালোবাসলেও ইরাম হালকা আলোয় সাচ্ছন্দ্যবোধ করে। আজ সাইবান বিছানায় ঘুমায়নি। যদিও ইরাম তার সঙ্গে মোটামুটি স্বাভাবিক আচরণ করছে, তবে ভেতরে ভেতরে চাপা ক্ষোভ আছে স্পষ্ট। সেও আর সাইবানকে জোর করেনি। বিছানায় শুধু ইরাম আর ইযান ঘুমিয়েছে। অন্য সময় সাইবান চোখে আইমাস্ক আর কানে তুলো গুঁজে শুয়ে থাকে। কারণ প্রায় রাতেই অনেকবার কেঁদে ওঠে ইযান। সাইবানের ঘুম গভীর। তাই কানে তুলো গুঁজে ঘুমানোর পদ্ধতি আবিষ্কারের পর থেকে সে টের পায়নি কখন বাচ্চা উঠেছে, কখন কখন ইরাম নিদ্রাহীন সামলেছে সবকিছু একা একা। তবে আজ রাতে সে আইমাস্ক, তুলো কিছুই ব্যবহার করছেনা। চোখ বুঁজে ঘুমানোর ভং ধরে শুয়ে ছিল বিধায় টের পেয়েছে। ইতোমধ্যে তিনবার উঠে ছেলেকে খাইয়েছে ইরাম। ভীষণ ক্লান্ত শরীর তার। হাসপাতালের তিনরাত মেয়েটা টানা দুই ঘণ্টার জন্য হলেও চোখের পাতা এক করেছে কিনা সন্দেহ। মুখের ক্লান্তিভাব আর মলিনতা দেখলেই বোঝা যায়। অথচ, বিরক্তির একটা টু শব্দ অবধি করেনি ইরাম। যতবার ইযান কেঁদেছে, ততবারই হয় ছেলেকে কোলে নিয়ে বারান্দায় হেঁটেছে, কখনো বা নার্সারি গ্লাইডারে বসে দুলেছে, আবার কখনো গুণগুণ করে ঘুমপাড়ানি গান গেয়েছে। কি নিদারুণ ধৈর্য্য একজন মায়ের। সাইবান শুধু চোখে দেখছে আর কানে শুনছে তাতেই তার ভীষণ বিরক্তি ধরে যাচ্ছে। অথচ ইরাম দিনের পর দিন, রাতের পর রাত একই রুটিনে অভ্যস্থ। এখন তো তাও সাইবান চোখের সামনে দেখছে। তাহলে যে তিন মাস ইরাম একা একা থেকেছে, সেই দিনগুলো কীভাবে অতিবাহিত করেছে? নারী ও পুরুষের ক্ষমতায় কত পার্থক্য! একজন বাবা কিংবা একজন মায়ের দায়িত্ব কত ব্যাপক! এই বিষয়গুলো ইরাম জীবনে না আসলে সাইবান কখনো অনুধাবন করতে পারতনা।

কতক্ষণ ভাবনার জগতে ডুবে ছিল সাইবানের হিসাব নেই। দীর্ঘ নির্ঘুম রাত্রির পর অবশেষে চোখদুটো প্রায় বুঁজে আসছিল তার। ঠিক এমন সময়েই মৃদু ক্রন্দনের আওয়াজ। চোখের পাতা খুলে গেল সাইবানের। অজান্তেই মাথা তুলে তাকাল সে বিছানার দিকে। মাঝখান বরাবর ইরাম শুয়ে আছে। তার একপাশে ইযান আরেক দফায় জেগে উঠেছে। ছোট ছোট হাত পা ছুঁড়ছে। ব্যান্ডেজ করা হাতটা দুলছে চারদিকে। চোখমুখ কুঁচকে ফুঁপিয়ে বড়সড় চিৎকারের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ইরাম এখনো টের পায়নি। ঘুমিয়ে আছে। মুখটা দেখেই বোঝা যাচ্ছে ঠিক কতখানি ক্লান্ত এবং জর্জরিত সে। সাইবান কয়েক সেকেন্ড সিদ্ধান্তহীন হয়ে রইল। তারপর কিছু বুঝে ওঠার আগেই অন্তরের তাড়নায় সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। ঠিক যে মুহূর্তে ইযান চিৎকার করে কান্না শুরু করবে, সেই মুহূর্তেই সাইবান বিছানার কাছে গিয়ে সপাত করে ছেলেকে কোলে তুলে নিল। লম্বা পা ফেলে ইরামের কাছ থেকে দূরে চলে এলো।

“পোটলা। তোর সাইরেনে বিরতি নেই? আম্মু ঘুমালেই বাঁশি বাজাতে মনে চায়, না?”

সাইবানের আলতো কথায় কান্না থেকে বিরত রইল ইযান। ডাগর ডাগর চোখ মেলে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল পিতার দিকে। একবার শান্তিতে ঘুমানো ইরামকে দেখে শেষমেষ রুমের কোণার টেবিলের কাছে গিয়ে দাঁড়াল সাইবান। অতি সাবধানে ইযানকে সেখানে রাখল।

“দেখি দেখি দেখি, হাগুমুতু কয় কেজি করেছিস?”

ইযানের ডায়পার ভিজে উঠেছে। সাইবান কয়েক মুহূর্ত দ্বিধা করল। শেষমেষ একটা দীর্ঘ প্রশ্বাস টেনে শুকনো কাপড়ের বাস্কেট থেকে ক্লিপ তুলে নিয়ে নিজের নাকে লাগিয়ে নাক বন্ধ করে ফেলল। মুখ দিয়ে প্রশ্বাস টেনে অবশেষে ডায়পারে হাত দিল সে। ছটফট করছে ইযান। এদিকে সাইবান জানেনা ডায়পার কীভাবে বদলাতে হয়। থমকে গেল সে। মাথা কাত করে তাকাল পিছনে। ইরামকে ডেকে তুলবে? ধুর! তাহলে এত কাহিনীর প্রয়োজন কি ছিল? ডায়পারের প্যাকেট তুলে ইনস্ট্রাকশন পড়ল সে। তাও কিছু বুঝলনা। শেষমেষ নিজের ফোন হাতে তুলে নিল। ইউটিউবে গিয়ে সার্চ দিল,

—হাউ টু চেঞ্জ বেবি’স ডায়পার?

বেশ কয়েকটা ভিডিও এলো। বিজয়ীর হাসি হেসে সেটা পাশে রেখে সাইবান নাকি সুরে ইযানের সঙ্গে কথা বলতে লাগল,

“দেখেছিস? বাপ তোর কত্ত চালাক? মামু! সোনার কপাল নিয়ে জন্মেছিস তুই, বুঝেছিস? নাহলে আমার মত একটা বাপ পাওয়া তো বিলাসিতা।”

ভিডিও দেখে দেখে সাইবান ধীরে ধীরে অদক্ষ হাতে পুরাতন ডায়পার খুলে নতুন ডায়পার পরিয়ে দিল ইযানকে। সম্পূর্ণ সময়টা ছটফট করে গেল ইযান। বাইন মাছের মত খালি হাত গলে বেরিয়ে যায়। সাইবান শেষমেষ খপ করে তার দুটো হাত মাথার উপর তুলে চেপে ধরে রেখে শাসাল,

“পোটলা ছটফট করছিস কর, কিন্ত মামা তোর আম্মু যদি উঠেছে, একদম উল্টো লটকে রাখব। আমি তোর বাপ হতে পারি, তবে তার আগে তোর আম্মুর ডিয়ার হাসবেন্ড, বুঝেছিস?”

“আই!”

বিনিময়ে পা তুলে সটান সাইবানের থুতনিতে হামলা চালাল ইযান। খিলখিল করে হেসে ফেলল সাইবান। তারপর ইযানকে উল্টো শুইয়ে পিছনে আলতো দুটো চাপড় দিয়ে বলল,

“আর মারবি? আর মারবি বাপের মুখে লাথি?”

“উই!”

প্রায় মিনিট পনেরোর নীরব যুদ্ধ শেষে অবশেষে ইযানকে ডায়পার পড়াতে পারল সাইবান। নাক থেকে ক্লিপ খুলে নিজের হাত দুটোকে পরপর পাঁচবার স্যানিটাইজার দিয়ে পরিষ্কার করল সে। ড্রেসিং টেবিল থেকে হ্যান্ডক্রিম তুলে হাতে মাখল। শুধুমাত্র তারপরই চেঞ্জিং টেবিল থেকে ইযানকে কাঁধে তুলে নিল সে। ইরাম ফিডারে দুধ পাম্প করে রেখেছে। সেটা আর একটা তোয়ালে কাঁধে নিয়ে বিছানার কাছে এলো সে। পরম শান্তিতে ঘুমের জগতে বিচরণ করছে তার অর্ধাঙ্গিনী। এক হাতে ইযানকে ধরে রেখে অন্য হাতে কোলবালিশ টেনে ইরামের পাশে রাখল সাইবান। খানিকটা সময় প্রাণভরে দেখল ঘুমন্ত মুখটা। কি নিষ্পাপ! কি মায়াবী! বুকটা তার অজানা উষ্ণতায় ছেয়ে গেল। ঝুঁকে ইরামের কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে একটা আদুরে চুমু এঁকে দিল সাইবান। ফিসফিস করে বলল,

“স্লিপ টাইট অ্যান্ড ড্রিম অ্যাবাউট মি, মাই প্রেশিয়াস।”

ইযান ক্রমশ জোরালো শব্দ করতে শুরু করেছে। তাই সাইবান পিছিয়ে গেল। নিঃশব্দে রুমের দরজা খুলে আলতোভাবে চাপিয়ে দিয়ে ছেলেকে নিয়ে চলে গেল নিচের হলরুমে।

সমস্ত বাড়িজুড়ে রাত্রির নীরবতা। হালকা হলুদাভ আলোয় আবছায়াভাবে আলোকিত হলরুম। সাইবান সোফায় বসল ইযানকে নিয়ে। ততক্ষণে সত্যিই আবার কাঁদতে শুরু করেছে শিশুটি। সাইবান ছেলেকে বুকে চেপে দোলালো,

“এইযে বাবা এখানে। আম্মুর ঘুম দরকার, তাই এখন থেকে বাবা অন ডিউটি। দেখি দেখি দেখি, দুধ চাই কার?”

ইযানকে ধরে অন্য হাতে ফিডারটা মুখে দিতেই কান্না ভুলে চুকচুক করে খেতে লাগল সে। সাইবান অপলক নয়নে চেয়ে দেখল গোটা দৃশ্য। সামান্য দুধ খাওয়ানোর দৃশ্য এতটা মধুর হতে পারে তার জানা ছিলনা। তার বুক ঘেঁষে থাকা প্রাণীটা সম্পূর্ণ তার উপরেই নির্ভরশীল, বিষয়টা একইসাথে আতঙ্কের এবং তীব্র অনুভূতির। বুকের ভেতর যা অনুভূত হলো তা কোনোভাবেই ব্যাখ্যা করতে পারবেনা সাইবান। কিছুই বোঝে না সে, কিছুই জানেনা। তবে এটুকু জানে।

এই ছোট্ট নাজুক অস্তিত্বটিকে সে নিজের অন্তিম নিঃশ্বাস অবধি রক্ষা করে যাবে এমনভাবে, যেমনভাবে নেকড়ে পাহারা দেয় নিজের শাবকদের।

ইযানের দুধ খাওয়া শেষ হলো। তবে চোখে আর ঘুম এলোনা। উপরন্তু তরতাজা হয়ে সে হাত পা ছুঁড়ে কখনো সাইবানের মুখে, কখনো বুকে দপাদপ মেরে গেল। এদিকে ঘুমে জুড়ে আসছে সাইবানের চোখের পাতা। অথচ ছেলের আগে সে ঘুমাতে পারছেনা। সোফা ছেড়ে কিচেনে হাঁটল, সদর দরজা খুলে বারান্দায় অবধি গেল। উপায়ন্তর না পেয়ে শেষমেষ নিজের পালিত হ্যামস্টারদের খাঁচার কাছ থেকে ইযানকে ঘুরিয়ে আনতে গিয়ে চেঙ্গিস খানের দৌঁড়ানি খেল। কিম জং হিটলার আর বারাক ওসামাকে আঙুর ফল খাওয়ানো হয়ে গেল। সব হয়ে রাত ফুরিয়ে ভোরের আলো ফুটল। অথচ ইযানের ঘুম আর হলনা। শেষমেষ হলঘরের সোফার কাছে মেঝেতেই বসে পড়ল সে। মাথাটা রাখল সোফার নরম গদিতে। কাঁধে জড়িয়ে আছে ইযান। তখনো ছেলের পিঠে আলতোভাবে চাপড়ে যাচ্ছে সাইবান।

“এবার একটু ঘুমা বাপ। ও বাপ, প্লীজ ঘুমা! নাহলে স্কচটেপ এনে চোখে মেরে দেব একদম!”

“আই! উই উই…!”

“পোটলা। ঘুম না আসলে আমার মতন করে চোখ বুঁজে বল আর শোন। ঘুমা, ঘুমা, তামান্না ভাটিয়া, তামান্না ভাটিয়া, আজ কি রাত মাযা হুসনকা… তামান্না ভাটিয়া…তামান্না ভাটিয়া…”

একটা সময় ছেলের পিঠ চাপড়াতে চাপড়াতে নিজের ঘুমিয়ে পড়ল সাইবান। তার কাঁধে মাথা ঠেকিয়ে তখনো জেগে আছে ইযান। সাইবানের শরীর শিথিল হয়ে যেতেই ইযান নিজের ছোট্ট একটি হাত তুলে পিতার বুকে ঠেকিয়ে হাই তুলল,

“গুই।”

⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠─⁠──⁠──

রোদের আলো চোখে এসে লাগতেই আড়মোড়া ভেঙে জেগে উঠল ইরাম। তার সমস্ত শরীর এত ফুরফুরে শেষ কবে লেগেছে সে ভুলে গিয়েছে। বিছানায় যখন উঠে বসেছে, তখনো চোখ সম্পূর্ণ খোলেনি তার। আরামদায়ক উষ্ণতায় জড়ানো এক দুর্দান্ত সকাল। এত ভালো ঘুম ইযান জন্ম হওয়ার আগেও হয়েছে কিনা সন্দেহ আছে তার। বেশ দিলখোলা মেজাজে চোখ কচলে ইরাম যখন পাশে তাকাল তখন দেখল বিছানা একদম ফাঁকা। ইযান নেই। বুকের ভেতরটা তৎক্ষণাৎ মোচড় দিয়ে উঠল তার। সমস্ত আয়েশটুকু এক লহমায় উবে গেল। লাফিয়ে বিছানা থেকে নামতে গিয়ে পা ফসকে মেঝেতেই পরে গেল সে। তবে হাঁটুতে পাওয়া ব্যথা উপেক্ষা করে হন্যে হয়ে আশেপাশে তাকাল।

“ইযান! কুচুপু! কোথায় তুমি?”

সেদিনের ঘটনার পর থেকে ইরামের মাতৃহৃদয় আরও সতর্ক হয়ে গিয়েছে। দিগ্বিদিক, যুক্তিতর্ক কোনোকিছুর ধার না ধেরে সে ছুটে বেরিয়ে এলো রুমের বাইরে। উদ্দেশ্য, বাড়ির সবাইকে ডেকে তোলা। রুমের ভেতর ছেলেকে না পেয়ে আতঙ্কিত ইরাম যখন সিঁড়ি বেয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে নিচে নামতে লাগল, তখন সামনের দৃশ্যটি তাকে বাকরুদ্ধ করে দিল। পদক্ষেপ সিঁড়ির গোঁড়ায়ই থমকে গেল। বরফখন্ড হয়ে সামনে চেয়ে রইল সে। হৃদযন্ত্র হয়ে উঠল দুর্বার।

বাড়ির হলরুমে আজ ভিন্ন এক শান্তির আসর বসেছে। পরিবারের সকল সদস্য চারপাশে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে পাথরের মূর্তির মতন। সামিয়া, সারিকা, সুগন্ধা এমনকি আহমদ অবধি নিশ্চুপ, নিশ্চল। প্রত্যেকের চোখের দৃষ্টিই সামনের দৃশ্যে আবদ্ধ। তাদের দৃষ্টি অনুসরণ করে তাকাল ইরাম। চোখজোড়া মহাবিস্ময়ে প্রসারিত হয়ে উঠল তার।

হলঘরের সোফায় মাথা ঠেকিয়ে বসে বসে ঘুমাচ্ছে সাইবান। আর ঠিক তার বাহুর মাঝেই কাঁধে মাথা রেখে পরম শান্তিতে নিদ্রাচ্ছন্ন ইযান। পিতা এবং পুত্র উভয়ে আপন ঘুমের জগতে বিচরণ করছে। কোনো খেয়াল নেই আশেপাশে কি ঘটছে না ঘটছে। বাইরের স্নিগ্ধ সূর্যরশ্মি উভয়ের শরীরে প্রতিফলিত হয়ে এক ঐন্দ্রজালিক আবহ সৃষ্টি করেছে। পরম শান্তি, পরম নিরাপত্তার এক নিশ্ছিদ্র বেষ্টনী যেন। একে অপরের সহায়ক দুটি অস্তিত্ব। কেউই দৃষ্টি ফেরাতে পারছেনা নিজেদের। আবেগী দৃশ্যটি আজ বাড়ির প্রত্যেক মানুষকেই নিজেদের স্থানে থামিয়ে দিয়েছে, উষ্ণতায় ছেয়ে ফেলেছে তাদের অন্তরসমূহকে।

ইরাম ধীরপায়ে নিচে নেমে এলো। খানিকটা সম্মোহনী কন্ঠে আলতো আঁচে বলল,

“আমি ওদের ডেকে দিচ্ছি।”

তৎক্ষণাৎ প্রতিবাদ জানালেন সামিয়া,

“না। আমার ছেলে আর তার ছেলে ঘুমাচ্ছে। খবরদার কেউ বিরক্ত করবিনা।”

সকলে অবাক হয়ে গেল। সামিয়া প্রশস্ত হাসি নিয়ে দৃশ্য দেখছেন। হাতের মোবাইল ফোনে বেশ কয়েকটা ছবিও তুলে নিলেন তিনি। অতঃপর জানালেন,

“আজকে সবাই নাস্তা কিচেনে করব। ওকে?”

কেউই দ্বিমত করলনা। প্রতিদিনকার মত হলরুমের সাথে লাগোয়া ডাইনিং টেবিলের বদলে আজ সকালের নাস্তার আয়োজন করা হলো কিচেনের টেবিলে। বাড়ির সদস্যরা সকলে হলরুমকে নিঃশব্দ রাখল, শুধুমাত্র যেন বাড়ির ছেলেরা শান্তিতে নিজেদের নিদ্রাজগতে বিচরণ করতে পারে।

—চলবে—

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply