জাবিন_ফোরকান
পর্বসংখ্যা১৯
“আপু, আমার প্রচুর ক্ষুধা পেয়েছে, খেতে দিন প্লীজ।”
চুলার আগুনের তাপে রীতিমত সেদ্ধ হয়ে যাওয়া ইরাম মুখ ঘুরিয়ে পিছনে তাকিয়ে বেশ অবাক হলো। রান্নাঘরের দরজার সামনে দাঁড়ানো কিশোর সাইবান। স্কুলড্রেস পরনে। খয়েরী টাই টেনে ঢিলে করে রেখেছে, ধূসর শার্টের উপরের কয়েকটা বোতাম খোলা। স্কুলব্যাগটা আলগোছে ঝুলছে হাতে। ওড়না দিয়ে কপাল মুছে ইরাম বলে উঠল,
“ব্যাপার কি? খালামণি বাড়ি নেই?”
ডানে বামে মাথা নাড়ল সাইবান।
“সেমিনার তিনদিনের। খুলনায় গিয়েছে।”
ইরাম মুখ ফিরিয়ে আবার চুলার দিকে তাকাল। তার বুকটা চেপে এলো। কোচিংয়ের বেতন আগাম নিয়ে আজ সকালে চাল কিনেছে। আরেক চুলায় আলু সেদ্ধ হচ্ছে। গতকালের কিছুটা ডাল রয়ে গিয়েছে। এই দিয়ে ভাইদের খাইয়ে দেবে ভেবেছিল। একটি শুকনো ঢোক গিলে সে সাইবানকে বলল,
“তুমি বরং বাড়িতে গিয়ে ভাত খাও, ভাই। আপু তোমাকে লেবুর শরবত করে দিচ্ছি।”
“না! কেন?”
সাইবানের অবুঝ প্রশ্নে ইরাম ওড়না গলায় চেপে আরেক দফায় ঘাম মুছল।
“না মানে, তোমার বাড়ির খাবার নষ্ট হবে।”
“উফ। বাড়িতে আজ রান্না হবেনা। সিস টাকা দিয়েছে, ও বাইরেই খাচ্ছে বন্ধুদের সাথে রেস্টুরেন্টে।”
“তাহলে তুমিও রেস্টুরেন্টে যাও।”
তবে ইরামকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে সাইবান হঠাৎ তার পাশে এসে দাঁড়াল। চুলার দিকে মুখ বাড়াতেই তার চোখজোড়া চকচক করে উঠল যেন সোনার খনি দেখেছে।
“আলুর ভর্তা? ওয়াও! আমার ফেইভরিট! আলুর ভর্তা, ডাল আর একটা শুকনো মরিচ। উমমমম! কতদিন খাই না!”
ভাতের মাড় গালতে গালতে জমে গেল ইরাম। সে জানে, সাইবানের আলুর ভর্তা মোটেও পছন্দ না। হরেক পদের তরকারির মাঝে সে কখনোই ভর্তার দিকে চোখ তুলেও তাকাবেনা। ডালও খুব একটা খেতে দেখেনি কখনো। সে না চাইতেও ছেলেটার দিকে কিছুক্ষণ অপলক চেয়ে রইল। কত যেন বয়স হবে এখন ছেলেটার? বারো? তেরো? এর মধ্যে এত বোঝদার কবে হয়ে উঠল?
ইরামকে নিষ্পলক চেয়ে থাকতে দেখে সাইবান মাথা কাত করে ডাকল,
“আপু?”
চোখ পিটপিট করল ইরাম। ভেজা ভেজা কিছু ঠেকল চোখের কোণে। দ্রুত তা দূর করে ইরাম এবার ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটিয়ে বলল,
“ঠিক আছে। তুমি হাতমুখ ধুয়ে নাও। আমি খাবার দিচ্ছি।”
সাইবান হঠাৎ করে ইরামের কাছে এগিয়ে গেল। উচ্চতায় ছেলেটা তার কাঁধসমান। কোনো কথা না বলে নিজের প্যান্টের পকেটে হাত ভরে সাইবান একটা টিস্যুর প্যাকেট বের করল। সেখান থেকে টিস্যু বের করে হাত তুলল সে,
“দেখি দেখি।”
ইরামের কপাল ছুঁয়ে সে ধীরে ধীরে ঘামটুকু মুছে নিল। অতঃপর গলার দিকটায় চাপল, অতি যত্ন নিয়ে। বকবক করে বলল,
“এত গরম পড়ছে। নিজের যত্ন কেন নেন না, আপু? আপনি অসুস্থ হয়ে পড়লে ভাইয়াদেরকে কে দেখবে?”
বুকের ভেতর ঝড় উঠল বুঝি ইরামের। বাবা চলে যাওয়ার পর শেষ কবে কেউ তাকে এভাবে আদর করেছে, তার জন্য চিন্তা করেছে তা মনে করতে পারলনা সে। ঠিক। কেউ করেনি। আর কোনোদিন করবে কিনা সন্দেহ। ইরামের কি হলো বলতে পারবেনা। সাইবানের হাতটা সে চেপে ধরল। মুচকি হেসে সেই হাত মুঠো করে ঝুঁকে তার আঙুলের উপর আলতো করে নিজের ঠোঁট ছুঁয়ে জানাল,
“এই যে, তুমি যেন আমার যত্ন নিতে পারো তাই নিজের যত্ন নিচ্ছি না, বুঝেছ? এবার লক্ষ্মী ছেলের মত গিয়ে টেবিলে বসে পড় তো, আপু খাবার নিয়ে আসছে। আর দুই তলায় রাহাত ভাইয়া আছে তোমার, ওকেও ডেকে দিও খেতে।”
সাইবান জ্বলজ্বলে নিষ্পাপ চোখ মেলে কয়েক পলক চেয়ে রইল ইরামের দিকে। অতঃপর তার ঠোঁটে বিস্তৃত একটা হাসি ফুটল। পবিত্রতম, সুন্দরতম।
“এইযে যাচ্ছি। আপু আমাকে কিন্তু ডাল বেশি দেবেন!”
বলেই ব্যাগ ছুঁড়ে লিভিং রুমের সোফায় ফেলে সাইবান ধুপধাপ শব্দ করে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগল,
“রাহাত ভাই? ও রাহাত ভাই? খাবেনা? কইরে?”
─────────────────────────────
ঘুমের ঘোরে ইরাম স্বপ্ন দেখছিল নাকি স্মৃতির জগতে হারিয়ে গিয়েছিল অবচেতনভাবে, বলতে পারবেনা। চোখ দুটো অজান্তেই ভিজে উঠেছে তার। বদ্ধ পাঁপড়িতে চিকচিক করছে অশ্রুদানা। ঠিক এমন সময়েই ভাইব্রেশনের শব্দে ইরামের পাতলা ঘুম ভেঙে গেল। চোখ মেলে রীতিমত লাফিয়ে উঠল সে। ভারী নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে আশেপাশে তাকাল। ভোরের নরম আলো পর্দা গলে চুঁইয়ে পড়ছে ভেতরে। স্নিগ্ধ আবহাওয়া। বিছানায় ঠিক পাশেই ছুঁয়ে আছে ইরামের কলিজার ধন। ঘুমে আচ্ছন্ন ইযান। ছোট্ট শরীরটা মায়ের বুক ঘেঁষে পরে আছে। নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের সঙ্গে ওঠানামা করছে। কি মায়া! কি কোমল! ইরাম ছেলের দিকে চেয়েই রইল। একটি আঙুলে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখতে লাগল তার ঠোঁট, কপাল, গাল। ছেলে তার মতোই হয়েছে অনেকটা। সৌভাগ্য তার। ছেলের মায়ায় বিভোর ইরামের অস্থির অন্তরটা ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে এলো। ভাইব্রেশনের শব্দটা আবার হওয়ায় এবার মুখ ঘুরিয়ে নাইটস্ট্যান্ড থেকে নিজের ফোনটা হাতে তুলে নিল ইরাম। চোখ কচলে স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই তার চক্ষু চড়কগাছ হওয়ার দশা হলো।
হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ এসেছে। সাইবানের কাছ থেকে। নামটা ভেসে উঠতেই হঠাৎ করে ইরামের মাত্র অনুভব করা স্মৃতিটুকুর কথা মনে পড়ল। নিদারুণ নিষ্পাপ একটা চেহারা। তাতে খেলা করত জগতের সবটুকু মায়া, আবেগ, ভালোবাসা। চোখ দুটো ছিল যেন গভীর অনুভূতির আঁধার। সে যখন হাসত, তখন মনে হত তার সঙ্গে গোটা জগৎ হেসে উঠেছে। এমন মায়াবী একটা ছেলে কয়েক বছরের ব্যবধানে কি আমূল বদলে গিয়েছে! ছোট সাইবানকে ইরাম ভাইয়ের আসনে বসিয়েছিল। কোনোদিন নিজের আর দুটো আপন ভাইয়ের থেকে আলাদা চোখে দেখেনি। হাতে তুলে খাইয়ে দিয়েছে কতবার। কত শত রাত্রিতে হাতে হাত রেখে রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে চাঁদ তারার গল্প করা হয়েছে। ইরামের রূপকথার গল্পও ছেলেটা মনোযোগ দিয়ে শুনত। আত্মার সঙ্গে আত্মার বন্ধুত্ব যেন। কোনোদিন কাজিন, খালামণির ছেলে এই ধরনের বিষয় তাদের ভাইবোনদের মাঝে আসেইনি। তারপর একদিন, হঠাৎ ঝড়ে সবকিছুই বদলে গেল। এতটাই বদলে গেল যে আজকের সাইবানকে কিছুতেই সে পুরাতন সাইবানের সঙ্গে মিলিয়ে উঠতে পারছেনা। যেন দুজন সর্বদাই দুটি ভিন্ন মানুষ।
শেষমেষ সকল চিন্তা দূরে হটিয়ে ইরাম সাইবানের পাঠানো মেসেজটা দেখল। এটা কি? একটা ছবি। সাইবান হোটেল রুমের মেঝেতে বসে আছে। তার পরনে একটা গোলাপী রঙের স্ট্রবেরী আঁকা প্যান্ট, আর হ্যালো কিটি ডিজাইনের জুতো। চোখ পিটপিট করল ইরাম। এটা সত্যিই সাইবান? মুখটা তো তার স্বামীরই! কি আশ্চর্য্য!
— Gd mr9.
ইরাম টেক্সট মেসেজটার দিকে পাক্কা দুই মিনিট যাবৎ তাকিয়ে থেকেও এর অর্থ উদঘাটন করতে পারলনা। পারার দরকার নেই। সে তাকিয়ে আছে পাঠানো ছবিটার দিকে। ড্যাবড্যাব করে চেয়েই রইল সে পাক্কা পাঁচ মিনিট যাবৎ। সাইবান কি পাগল হয়ে গেল?
সে দ্রুত মোবাইলে টাইপিং করল,
— ইয দ্যাট হ্যালো কিটি?
— Ow! Period bestie!
ইরামের চোখ কপালে উঠে গেল। বেস্টি? পিরিয়ড? কিসের পিরিয়ড? ওহ সৃষ্টিকর্তা! ইরামকে ধৈর্য্য দাও! ধৈর্য্যের ভান্ডার ঢেলে দাও!
— তুমি কি বলছ না বলছ আমি কিচ্ছু বুঝতে পারছিনা আলাদিন! এসবের মানে কি? তোমার প্যান্টে স্ট্রবেরী কেন?
— Ik Ik. It’s fr.
— আই কে কারা? কোথা থেকে এলো এরা? সকাল ছয়টা সাত বাজে! তোমার ব্রেইন সুস্থ আছে?
— Ahhh….Six seveeeennnn!!!!!
সিক্স সেভেন আবার কি? ইরাম ঘুম জড়ানো চোখে আঙুল ঠেসে ধরল। আপনমনে বিড়বিড় করল,
“হেহ আল্লাহ, উঠিয়ে নাও। আমাকে না, ওই জল্লাদ ছেলেটার ব্রেইন থেকে শয়তানি উঠিয়ে নাও মাবুদ, আমিন।”
তারপরই সে রেগেমেগে টাইপিং করল,
— এক্ষুণি তুমি আমার চোখের সামনে থেকে বিদায় না হলে আমি কিন্তু তোমাকে ব্লক করে দেব।
— করুন। আমি এক্সপার্ট ওপেনার। ব্লকও খুলতে পারি, সঙ্গে আপনার অন্তরের দরজাও।
ইরাম এবার একটু বিজয়ীর হাসি হাসল। অবশেষে স্বাভাবিক ভাষায় ফিরেছে ছেলে।
— যাক। আমি ভেবেছিলাম তুমি গেঞ্জি ভাষা ছাড়া আর কোনো ভাষাই জানো না।
— গেঞ্জি বলবেন না তো! অপমান লাগে।
— সকাল সকাল স্ট্রবেরি মুখে না দিয়ে প্যান্টে সাজিয়ে কি প্রমাণ করতে চাইছিলে?
— এটাই যে বাকিদের জন্য আমি ঝুঁকি হলেও আপনার জন্য আস্ত একটা পুকি। (Pookie)
ইরাম আরেক দফায় থামল। পুঁকি আবার কি? পুরোপুরি জানা না থাকলেও তার কেন যেন একটুখানি লজ্জা লাগল সে নিজেও বলতে পারবেনা। একটি ঢোক গিলে দ্রুত বিষয় পরিবর্তন করল সে,
— তা সাত সকালে কি করছ? তুমি তো আবার ব্রেকফাস্ট প্লাস লাঞ্চ ব্রাঞ্চের আগে ঘুম থেকে ওঠোনা। উঠেছ যখন, নাস্তা করে নাও। ফিরছ কখন?
— মিসিং ইওর ড্যাডি অলরেডি?
— ফালতু কথা বলবে না। কিসের ড্যাডি? তুমি কি আমার আব্বু লাগো?
— ফিরে আসি। পোটলাকে বোঝাব কীভাবে ওর আব্বু লাগি আর আপনার ড্যাডি! টিল দ্যান, কিপ মিসিং মি।
সাইবান অদ্ভুতুড়ে একটা ইমোজি পাঠাল। ঠোঁট কামড়ে ধরে রেখেছে এমন। ইরাম টানা বিশ সেকেন্ড চেয়ে থেকে শেষমেষ ফোনটা ফেলে মুখে হাত ঘষতে লাগল।
“হে আল্লাহ। বিয়েটা যখন আলাদিনের সাথে দিয়েছ, তখন আলাদিনের চেরাগটাও দিতে। চেরাগ ঘষে দৈত্যকে বের করে বলতাম, এই বান্দার মাথায় কি চলছে সেটা আমাকে বুঝিয়ে দিতে।”
পরক্ষণেই আপনমনে খানিক হাসল ইরাম, কেন তা নিজেও বলতে পারবেনা।
─────────────────────────────
সকাল ভারী হয়েছে। ইরাম পুরোদস্তুর প্রস্তুত বাইরে যাওয়ার জন্য। আজ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে তার। আগামী মাসের ১ তারিখ থেকে তার কম্পিউটার কোর্সের ক্লাস শুরু হয়ে যাবে। তার আগে কিছু প্রস্তুতি নেয়া প্রয়োজন। সামিয়ার ল্যাপটপটা ঠিকঠাক চলে। ফ্রিল্যান্সিং আর অন্যান্য ভারী কাজের জন্য যথাযথ আপডেটেড না সেটি। তাই নিজের বিয়েতে পাওয়া দেনমোহরের টাকা দিয়ে ভালো দেখে একটা ল্যাপটপ কিনবে ইরাম। প্রথমে ব্যাংকে যেতে হবে টাকা তুলতে। তারপর ল্যাপটপের শো রুমে।
ইযানকে একটা ঢোলা সুতির ফতুয়া আর প্যান্ট পরিয়ে নিয়ে মাথায় ছোট্ট একটা ক্যাপ দিল ইরাম। দেখতে বেশ লাগছে। ঝুঁকে ছেলের মুখে অসংখ্য চুমু আঁকতে আঁকতে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলো সে,
“আমার বাবাটা কত্ত হ্যান্ডসাম! কুচুপু সোনা! উম্মাহ, উম্মাহ!”
“আই…আ!”
জননীর আদর খেতে খেতে দন্তহীন মাড়ি দেখিয়ে খিলখিল করে হাসল ইযান। হাসপাতালের জন্য বের হচ্ছিলেন সামিয়া। সিঁড়ির গোড়ায় দৃশ্যটি দেখে তিনি অপলক নয়নে চেয়ে রইলেন। মুচকি হাসলেন।
“বেরোচ্ছ?”
ইরাম প্রশ্ন শুনে মৃদু হাসল,
“জি, খালামণি।”
“আমার ছেলেকে বিয়ে করেছ একমাস হয়ে গেল। এখনো খালামণি?”
সামিয়া ভ্রুকুটি করলেন। ইরাম তাতে থমকে পড়ল। তার গালজোড়া লালচে হয়ে উঠল।
“ওই মানে…ইয়ে…”
“স্বামীর মাকে কি বলে?”
“শ্বাশুড়ি।”
“রাইট। কিন্তু তুমি তো আমার বউ না, তুমি আমার মেয়ে। মনে থাকবে?”
ইরামের বুকের ভেতরটা উষ্ণতায় পরিপূর্ণ হলো। মাথা দুলিয়ে হেসে সে বলল,
“জি, মনে থাকবে আম্মু।”
সামিয়া বাইরের দিকে হাঁটা দিচ্ছিলেন, তবে ইরামের ডাকটা শুনে বরফে পরিণত হলেন। সটান ঘুরে তাকালেন রমণীর দিকে। চশমার আড়ালে তার চোখজোড়া বুঝি ছলছল করে উঠল। ঠোঁটজোড়া ফাঁক হয়ে রইল বিস্ময়ে। প্রায় ফিসফিস করে তিনি উচ্চারণ করলেন,
“কি বলে ডাকলে আমায়? আরেকবার ডাকো তো?”
ইরাম ইযানকে বুকে চেপে দোলাতে দোলাতে আবারও ডাকল,
“আম্মু।”
চোখজোড়া বুঁজে ফেললেন সামিয়া। যেন এই ডাকটা তাকে ধন্য করে ফেলেছে। চশমা খুলে টিস্যুতে দ্রুত চোখ মুছে নিতে নিতে তিনি জড়ানো গলায় বললেন,
“একদম ঠিক। আম্মু। সরি, আসলে সাইবান, সারিকা দুজনই আমায় মম ডেকে অভ্যস্থ। একেবারে বাঙালি মায়ের ডাকের স্বাদ পাইনা বহুকাল। তুমি ডাকায় একটু ইমোশনাল হয়ে পড়েছি।”
“ব্যাপার না আম্মু, এখন থেকে আমি আপনাকে সবসময় এভাবেই ডাকব।”
“থ্যাংক ইউ মাই চাইল্ড!”
ক্রন্দনমাখা এক হাসি উপহার দিলেন সামিয়া। এমন সুন্দর মুহূর্তে হলঘরে প্রবেশ করল সারিকা। একটা আকাশী রঙের জর্জেটের শাড়ি পরনে। বাহুতে ঝুলছে অ্যাপ্রোন। অন্য হাতে লেদারের দামী লেডিসব্যাগ। চেম্বারের জন্য যাচ্ছে। ধবধবে সাদা হিলজোড়ায় ঠকঠক শব্দ করে এগোচ্ছে সে। সামিয়া মেয়েকে দেখে বলে উঠলেন,
“সারিকা?”
সারিকা থামল। মুখ ফিরিয়ে তাকাল জননীর দিকে।
“বলো।”
“চেম্বারে যাচ্ছিস?”
“হ্যাঁ।”
“ইরামের সাথে যাও। ও ব্যাংক থেকে টাকা তুলবে। তোর চেম্বারের পাশেই তো অ্যাপলের শো রুম। নিয়ে যাস।”
ভ্রু কুঁচকে ফেলল সারিকা।
“এক্সকিউজ মি, মম। আমি অকর্মা না, কারো চাকরও না। যার কাজ তাকে করতে বলো। তাছাড়া ওনার বেস্ট ফ্রেন্ড সুগন্ধা কোথায়?”
“সুগন্ধা কলেজে গিয়েছে। ইনকোর্স চলছে মেয়েটার। আমি হাসপাতালে যাচ্ছি। করিম বাজারে। ব্যাংকের কাজ, টাকা পয়সার ব্যাপার। একটা বাচ্চা কোলে। তুই যা, সেফটি দরকার আছে।”
সারিকা নাকমুখ কুঁচকে এমনভাবে ইরামকে দেখল যেন দুনিয়ার সবথেকে বড় কোনো অকর্মণ্য মানুষকে দেখছে। তবে শেষমেশ সে মানা করলনা। ব্যাগ নাড়িয়ে তুড়ি বাজিয়ে ইরামকে বলল,
“তাড়াতাড়ি আসুন মহারাণী, আমার চেম্বার বসে থাকবেনা আপনার জন্য।”
বলেই সে গটমট করে হাঁটা দিল। ইরাম কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে শেষমেষ একটা নিঃশ্বাস ফেলে পিছু নিলো সারিকার।
কাজগুলো হতে এক ঘণ্টার মত লাগল। ব্যাংক থেকে টাকা তুলে গাড়িতে করে সারিকার চেম্বারের কাছে পৌঁছাল ইরাম। চেম্বার আর শো রুম রাস্তার এপাড় ওপাড়। শো রুমে ঢুকতেই তাদের বসার জন্য চেয়ার দেয়া হলো। স্টাফরা বেশ মিষ্টি ভাষায় ইরামের সকল প্রয়োজন অনুযায়ী ল্যাপটপ মডেল দেখাতে লাগল। আরও এক ঘণ্টার যাচাই বাছাই শেষে ইরাম স্থির হলো ম্যাকবুক এয়ার এম থ্রি মডেলে। এক লাখ পঁচিশ হাজারের মূল্য শোধ করে জিনিসটা কিনতে যদিও তার ভীষণ অস্বস্তি কাজ করেছে, তবুও ভবিষ্যতের জন্য একটা শক্ত ভিত্তি দরকার। কাজের খরচাই করছে সে। নিজেকে বোঝাল তা। কাগজপত্র, বিল সবকিছু প্রস্তুত হয়ে গেলে ধীরপায়ে উভয় রমণী শো রুম থেকে বেরিয়ে এলো।
বাইরে এখন দুপুর প্রায়। ব্যস্ততা বেড়েছে জনজীবনের। সূর্য মাথার উপর কিরণ দিচ্ছে। রাস্তার সামনেই একপাশে ডাব বিক্রি হচ্ছে। দা দিয়ে ডাব কেটে বিক্রি করছে কিশোর বয়সী এক ছেলে। অন্যপাশে আবার ফল নিয়ে বসে হাঁকডাক করছে ফেরিওয়ালা। সারিকার চেম্বারটা চোখে পড়ছে অদূরে। খোলাই। ভেতরে খুব সম্ভবত এখন তার কোনো অ্যাসিস্টেন্ট আছে। সারিকা ইরামের দিকে ঘুরল।
“আপনি গাড়িতে করে চলে যান।”
এটুকুই। কোনো বিদায় নেই। সোজা রাস্তার ওপাশের দিকে হাঁটা দিল সারিকা। প্রাইভেট গাড়ি ডাবের ভ্যানগাড়ির সামনেই পার্ক করা। ইরাম এক হাতে ল্যাপটপের ব্যাগ আর অন্য হাতে ছেলেকে ধরে এগোল। ইযান তার বুকে চুপটি করে লেপ্টে আছে। ঘুমে ঢুলুঢুলু করছে, তবে ঘুমায়নি। শো রুমের মেয়ে স্টাফগুলো এতক্ষণ যাবৎ তাকে বিনোদনে রেখেছিল। এখন ক্লান্ত হয়ে গিয়েছে খেলতে খেলতে। ইরাম ছেলের কপালে চুমু এঁকে চুপচাপ এগোল গাড়ির দিকে। ঠিক এমন সময়েই দৃশ্যটা চোখে পড়ল তার। লাল কালো হোন্ডা বাইক। দুটো ছেলে। একজনের মাথায় হেলমেট, আরেকজনের মুখে মাংকিটুপি জড়ানো। ইরামের জন্য ঘটনাটা স্লো মোশনে ঘটল বুঝি। মায়ের মন সবথেকে সতর্ক। সেই সতর্কতা ইঙ্গিতে তার মস্তিষ্ক বুঝি সারা শরীরে দামামা পিটিয়ে দিলো।
লাল কালো বাইক। ঠিক একদিন আগে, তাকে অনুসরণ করেছিল কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র অবধি। সুগন্ধার কলেজেও একই বাইক। আর আজও, সারিকার চেম্বারের সামনে সেই বাইক। দুজন ছেলে। এই গরমে মুখে মাংকিটুপি। অস্বাভাবিক। ভীষণ রকমের অস্বাভাবিক। বাইকটা তীব্র গতিতে এগিয়ে আসছে। ইরাম সিদ্ধান্ত নিতে বড়জোর পাঁচ সেকেন্ডের মত সময় পেল। তার হাত থেকে ল্যাপটপের ব্যাগটা ধপাস করে নিচে পড়ে গেল। দুহাতের মাঝে ইযানকে বুকের ভেতর জাপটে ধরে উল্টো ঘুরে গেল সে। বাইকটা একদম তার কাছে। চালকের পিছনে বসা মাংকিটুপি পড়া ছেলেটা নিজের হাতে ধরা একটা বোতল থেকে ক্ষীপ্র গতিতে কিছু স্বচ্ছ তরল ছুঁড়ে দিল ইরামের গায়ে। ছিটকে উঠল সবটা। অমোঘ পরিণতির জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে ফেলল ইরাম। সবটুকু তার শরীরে লাগুক, কিন্তু ছেলে যেন বুকের কুঠুরিতে একদম সুরক্ষিত থাকুক। তবে স্রষ্টার ইচ্ছা ভিন্ন কিছুই। ঘটনার মাঝে আগমন ঘটল তৃতীয় ব্যক্তির। নারী মাত্রই বুঝি বিপদের আঁচ সবার আগে টের পায়। সারিকাও তেমনি। সে বেশি দূরে ছিলনা। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার পা দুটো তাকে টেনে নিল ইরামের কাছে। হাতের সামনে কিছু না পেয়ে নিজের লেদারের ব্যাগটাই ছুঁড়ে দিল। বাইক থেকে ছুঁড়ে দেয়া তরলের বেশিরভাগ গিয়ে লাগল সারিকার ব্যাগে। বাকিটা ছিটকে গেল চারপাশে। কোথায় কোথায় গিয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় পড়ল দেখাও গেলনা। শুধু হতভম্ব চোখে উপস্থিত পথচারীরা দেখল কীভাবে লেদারের ব্যাগটা গরম তেলে ছেড়ে দেয়া মাছের মত জ্বলে উঠল।
অ্যা*সিড!
সারিকা বুঝল সবার আগে। তবে এই দশ সেকেন্ডের মাঝে যা হওয়ার হয়ে গিয়েছে। আশেপাশের মানুষের চিৎকার চেঁচামেচিতে ভরে গিয়েছে চারপাশ। অ*স্ত্র লক্ষ্য ভ্রষ্ট হয়েছে দেখে বাইকার স্পিড বাড়িয়ে দিল। সেকেন্ডের মাঝে চলে যাবে লোকচক্ষুর আড়ালে। অসহায় নারী হয়ত তাদের কিছুই করতে পারবেনা, তবে একজন ধ্বংসিনী মা ঠিকই পারবে, এই সত্যিটা তাদের জানা ছিলনা।
ইরামের মাঝে কি তীব্র বিদ্যুৎ খেলে গেল সে নিজেও বলতে পারবেনা। সটান ঘুরে দাঁড়িয়ে এক হাতে পাশে থাকা ডাবের ভ্যানগাড়ির উপর রাখা দা টা তুলে নিল সে।
“ইবলিশের অওলাদ!”
ঐশ্বরিক শক্তি ভর করল বুঝি ইরামের মাঝে। বুমেরাংয়ের মত দা টা ছুঁড়ে দিল সে। ভারী ধাতব বস্তুটি বনবন করে ঘুরতে ঘুরতে গিয়ে বাইকের পিছনে বসে থাকা মাংকিটুপি পরা ছেলেটার পিঠ বরাবর গেঁথে গেলো! ছিটকে উঠল রক্ত, সঙ্গে চিৎকার।
“আহহহহ!”
অথচ বাইকচালক নিজের আহত বন্ধুটির জন্য থামল না। ওই অবস্থায়ই দ্রুতি বাড়িয়ে রীতিমত কয়েক পলকের ব্যবধানে রাস্তা কেটে ওপাশে হারিয়ে গেল তীব্র গতিতে। বহু দূর থেকেও পিছনে বসা ছেলেটার পিঠে ভয়ানকভাবে গেঁথে থাকা ধারালো দা স্পষ্ট দেখা গেল যতক্ষণ না আততায়ীরা সম্পূর্ণ চোখের আড়াল হয়ে গেল।
সম্পূর্ণ ঘটনাটা ঘটল মাত্র পনেরো সেকেন্ডের ভেতর। অতঃপর এক অশরীরী পিনপতন নীরবতা। বাকরুদ্ধ প্রত্যেকে। যেন সকলের মস্তিষ্ক বুঝে উঠতে হিমশিম খাচ্ছে সেকেন্ডের ব্যবধানে কি হয়ে গেল। ইরামের চোখে যেন আগুন ঝরছে, ফুঁসছে সে হিংস্র বাঘিনীর মত। অথচ তার দুঃসাহসে ভরা বুকের ভেতরটা ভেঙে খানখান হয়ে গেল জগতের সবথেকে ভয়ংকর কান্নার আওয়াজে।
“উয়াআআআআ!!”
ইরামের বুকে লেপ্টে থাকা ইযান তীব্র চিৎকারে বুঝি গোটা ধরিত্রী কাঁপিয়ে দিল। ভেতর থেকে আত্মা বেরিয়ে গেল মানুষ বোধ হয় তেমনটাই অনুভব করে যেমনটা ইরাম এই মুহূর্তে করল। ঝট করে মুখ নামিয়ে তাকাল সে। ইযানের বাম কব্জি লালচে বর্ণে ছেয়ে গিয়েছে ধীরে ধীর ত্বক পোড়ার মত শক্ত হয়ে যাচ্ছে। ছটফট করে কাঁদছে নাজুক শিশুটি।
“আমার আব্বু!”
ইযানের চাইতে দ্বিগুণ শক্তিতে চিৎকার দিয়ে কেঁদে ফেলল ইরাম।
—চলবে—
Share On:
TAGS: আমার আলাদিন, জাবিন ফোরকান
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
আমার আলাদিন পর্ব ১২
-
আমার আলাদিন পর্ব ১৩
-
আমার আলাদিন পর্ব ১৪
-
আমার আলাদিন পর্ব ১৬
-
আমার আলাদিন পর্ব ৪
-
আমার আলাদিন পর্ব ৯
-
আমার আলাদিন পর্ব ১
-
আমার আলাদিন পর্ব ৭
-
আমার আলাদিন পর্ব ১১
-
আমার আলাদিন পর্ব ২