#অসম্ভব_রকম_ভালোবাসি_তোমায়
#লেখিকা_সুমি_চৌধুরী
#পর্ব ৬২
[•••অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষিদ্ধ•••]
রিদি পাহাড়ের বিস্তীর্ণ সেই মাঠের দিকে পা রাখল। ঠিক মাঝখানে পৌঁছাতেই তার প্রতিটি পদক্ষেপ যেন জমে গেল। সামনে শুভ্র দাঁড়িয়ে আছে কিন্তু তার পিঠটা রিদির দিকে। সে আপনমনে আকাশে ঘুড়ি ওড়াচ্ছে। শুভ্রর আজকের এই রূপ আগে কখনো দেখেনি রিদি। সাদা ধবধবে শার্ট ফিটিং কালো প্যান্ট আর পায়ে সাদা স্নিকার্স। মাথায় একটা স্টাইলিশ ব্যান্ডানা জড়ানো যার জন্য তাকে ঠিক ১৮-১৯ বছরের কোনো টগবগে তরুণ প্রেমিকের মতো লাগছে। রিদির মনের ভেতরটা কেমন যেন অদ্ভুত এক শিহরণে কেঁপে উঠল। ভাষা হারিয়ে সে নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
কয়েক সেকেন্ডের জড়তা কাটিয়ে রিদি ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল। নিচু গলায় ডাকল।
“শুভ্র ভাই?”
শুভ্র ঘুড়ির সুতোয় টান দিয়ে পেছনে ফিরে তাকাল। চোখেমুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। সে হালকা গলায় বলল।
“হুম বল?”
রিদি শুভ্রর ঠিক পাশে গিয়ে দাঁড়াল। তার চোখেমুখে তখনো ঘোর কাটেনি। শুভ্রর হাতের ঘুড়ির নাটাইটার দিকে তাকিয়ে সে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।
“আপনি ঘুড়ি ওড়ান? জানতাম না তো।”
শুভ্র এক ভ্রু নাচিয়ে বাঁকা হাসল। শান্ত স্বরে বলল।
“শুধু কি ঘুড়ি ওড়াতেই দেখলি? আর কিছু দেখিস নাই।”
রিদি চারপাশটা একবার চোখ বুলিয়ে নিল। কোথাও বিশেষ কিছু চোখে পড়ল না। সে কনফিউজড হয়ে বলল।
“মানে? আর কী দেখব।”
শুভ্রর মেজাজটা যেন এক নিমেষে খিঁচড়ে গেল। সে দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করে উঠল।
“শা’লি কানি।”
রিদি একটু বুক ফুলিয়ে বলল।
“আমি কী দেখি নাই? বরং আপনিই তো কিছুই দেখেন নাই।”
শুভ্র অবাক হয়ে ভুরু কুঁচকে তাকাল।
“আমি কী দেখব? কী দেখার কথা বলছিস।”
রিদি অবলীলায় বলল।
“যা দেখার কথা তা কি আপনি এতক্ষণে দেখেছেন।”
“কি দেখ….”
শুভ্র কথাটি শেষ করতে পারল না। তার দৃষ্টি মুহূর্তের মধ্যে রিদির ওপর পড়ল। গাঢ় সবুজ শাড়ি হাতের চুড়ির মৃদু শব্দ আর খোলা চুলের মায়াবী ঝরনা। রিদিকে দেখে মনে হচ্ছে আসমান থেকে নেমে আসা কোনো অপার্থিব পরী। শুভ্র তার হাতের ঘুড়ির নাটাইটা একপাশে ফেলে দিয়ে রিদির দিকে স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে রইল। সে জানত রিদিকে সবুজ রঙে সুন্দর মানায় কিন্তু আজকের এই রূপকল্প যে এতটা মোহময় হবে তা তার কল্পনারও বাইরে ছিল।
শুভ্রের তীব্র এবং গভীর চাহনিতে রিদি বেশ লজ্জা পেয়ে গেল। সে আড়ষ্টতা কাটাতে হালকা গলায় কেশে উঠল। শুভ্র তখনো মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল।
“জান একটু দেখ না।”
রিদি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বলল।
“আজব? কী দেখব আমি।”
শুভ্র মাথা চুলকে হাসল।
“আমার মাথা দেখবি।”
রিদি সাথে সাথে শুভ্রের মাথার দিকে তাকাল।
“হুম দেখলাম। এখন?”
শুভ্র এবার কিছুটা অস্থির হয়ে বলল।
“প্লিজ জান একটু ভালো করে দেখ। আশেপাশে ভালো করে খেয়াল কর।”
রিদি চারিদিকে তাকাল। চারপাশ জুড়ে পাহাড়ের সবুজ গাছপালা দূরে পাখির ডানা ঝাপটানোর শব্দ আর দিগন্তজোড়া খোলা আকাশ। সে হতাশ গলায় বলল।
“কই? এখানে তো শুধু প্রকৃতি ছাড়া আর কিছুই দেখছি না।”
শুভ্রর মুখটা অসহায় হয়ে এল যেন সে কোনো একটা বিশেষ মুহূর্তের অপেক্ষায় ছিল যা রিদি ধরতে পারছে না। সে বলল।
“আমার দিকে তাকা।”
রিদি শুভ্রের চোখের দিকে তাকাতেই সে ঘুড়ির দিকে চোখের ইশারা করল। রিদি সেই ইশারায় ঘুড়ির সুতোর দিকে তাকাতেই তার মুখটা বিস্ময়ে হা হয়ে গেল। বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল যেন হৃৎপিণ্ডের ছন্দ এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। ঘুড়ির গায়ে উজ্জ্বল রঙে স্পষ্ট বড় বড় অক্ষরে লেখা।
~ I Love You Ridhi ~
রিদি খুশিতে আটখানা হয়ে শুভ্রের দিকে তাকাতেই তার হাসিটা মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। তার পাশে শুভ্র নেই। রিদি দিগ্বিদিক তাকাতে লাগল। লোকটা গেল কোথায়? তার ভাবনার জাল ছিঁড়ে পাহাড়ের চূড়া থেকে ভেসে এল শুভ্রের গম্ভীর অথচ আবেগমাখা কণ্ঠস্বর।
“ওহ রিদি? এদিকে তাকা।”
রিদি চমকে মাথা তুলে উপরের দিকে তাকাতেই তার দুই চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। শুভ্র দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়ের একদম শেষ সীমানার খাঁজে যেখানে এক পা ফসকালেই গভীর খাদ। রিদি আতঙ্কিত হয়ে চিৎকার করে উঠল।
“আপনি ওখানে কেন? নেমে আসুন? পড়ে যাবেন তো।”
শুভ্র উপর থেকে অদ্ভুত শান্ত গলায় বলল।
“পড়ে মরে গেলে কোনো আফসোস নেই রিদি। প্রকৃতির বিশালতার মাঝে নিজের ভালোবাসাকে সমর্পণ করতে গিয়ে যদি জীবনটা ঝরেই যায় তবে আমি হব ইতিহাসের প্রথম ভালোবাসার শহীদ।”
রিদি ভ্রু কুঁচকে অস্থির হয়ে বলল।
“মানে? এসব কী পাগলামি করছেন? নেমে আসুন প্লিজ আমার খুব ভয় করছে।”
শুভ্র কোনো উত্তর দিল না। সে পাহাড়ের চূড়ায় দুহাত পাখির ডানার মতো প্রসারিত করে দিল। চোখ দুটো শক্ত করে বুজে বুক ভরে একরাশ হিমেল হাওয়া টেনে নিল সে। তারপর আকাশ-পাতাল কাঁপিয়ে এক অবিরাম সুরের মতো করে বলতে শুরু করল।
“হে বিশাল পাহাড়? হে নিস্তব্ধ ঝোপঝাড়? হে বহমান নদী আর দূর আকাশ তোমরা কি আজ আমার কথা শুনতে পাচ্ছো? মানুষ তো দামি উপহার আর চাকচিক্যের মোড়কে ভালোবাসা জাহির করে কিন্তু আমি আজ তোমাদের বিশালতার সাক্ষী রেখে আমার মনের কথা বলব। আজ আমি সাইফান শুভ্র চৌধুরী এই প্রকৃতির প্রতিটি ধূলিকণাকে সাক্ষী রেখে আমার ভালোবাসার ঘোষণা দিচ্ছি।”
শুভ্র এবার বুকের ভেতর থেকে জমানো সবটুকু আবেগ উগড়ে দিয়ে মাটির গভীরে যেন কাঁপন ধরিয়ে চিৎকার করে উঠল।
“আই লাভ ইউ রিদি? আই লাভ ইউ সো মাচ।”
পাহাড়ের প্রতিধ্বনি হয়ে তার সেই ডাক বারবার আছড়ে পড়তে লাগল উপত্যকায়। সে আবার চিৎকার করে উঠল।
“ভালোবাসি রিদি? অনেক অনেক বেশি ভালোবাসি? তুই ছাড়া আমার এই অস্তিত্ব একটা মরুভূমির মতো। কখনো আমাকে ছেড়ে যাস না রিদি। তোকে ছাড়া এই শুভ্রর পৃথিবীটা মুহূর্তেই ধুলোয় মিশে যাবে। তুই আমার অক্সিজেন আমার বেঁচে থাকার প্রতিটি কারণ? আমি তোকে ভালোবাসি কথাটা খুব ছোট। কিন্তু আমি তোকে ছাড়া বেঁচে থাকাটা বড় কঠিন এই সত্যটা এর চেয়েও অনেক বড়। তুই আমার রক্তে মিশে আছিস আমার প্রতিটি চিন্তায় তোর দখল। তুই হারিয়ে গেলে আমি নিজেকেও খুঁজে পাব না রিদি। তুই আমার হারানো পথ তুই আমার পাওয়ার শেষ গন্তব্য। তুই না থাকলে আমি হয়তো থাকব কিন্তু সেই থাকা আর বেঁচে থাকা দুটোর মাঝে তখন যোজন যোজন দূরত্ব থাকবে।”
শুভ্রর সেই আর্তনাদ আর ভালোবাসার তীব্রতা পাহাড়ের গায়ে যেন এক অদ্ভুত মায়াজাল তৈরি করল। রিদি খুশিতে মুখ চেপে ধরে কেঁদে দিল। তার কান্নার শব্দ যেন এই নিস্তব্ধ পাহাড়ের প্রতিটি পাথর আর ঝরনা শুনতে পাচ্ছে। কান্নার প্রতিটি ধ্বনিতে মিশে ছিল এক দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান আর গভীর ভালোলাগা। পাহাড়ের চূড়া থেকে রিদির এই কান্না শুনে শুভ্রর হৃদপিণ্ড যেন কেঁপে উঠল। সে আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ঝড়ের গতিতে নিচে নেমে এল। রিদির সামনে এসে দাঁড়াতেই শুভ্র দেখল মেয়েটা দুহাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। সে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে রিদির কাঁধ দুটো শক্ত করে ধরে ব্যাকুল গলায় জিজ্ঞেস করল।
“কী হয়েছে রিদি? কাঁদছিস কেন? আমি কি ভুল কিছু করে ফেলেছি? কোনোভাবে কি আঘাত পেয়েছিস।”
রিদি কোনো উত্তর দিল না। সে তার মুখ থেকে হাত সরিয়ে নিল। কিন্তু কান্না থামার বদলে তা যেন বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো বেরিয়ে এল। রিদি তার সরু হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ করে শুভ্রর প্রশস্ত বুকে দুমদাম কিল-ঘুষি বসাতে লাগল। যেন এই ঘুষিগুলো কেবল আঘাত নয় শুভ্রর ওপর জমা থাকা সব অভিমান আর দীর্ঘদিনের না বলা কথার বহিঃপ্রকাশ। শুভ্র কোনো বাধা দিল না। সে এক জায়গায় পাথরের মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে জানে রিদির এই রাগটা আসলে তার প্রতি চরম ভালোবাসার এক অন্যরকম প্রকাশ।
কয়েকটা ঘুষি মারার পর রিদির হাতগুলো নিস্তেজ হয়ে এল। সে হঠাৎ শুভ্রর শার্টের কলার আঁকড়ে ধরল এবং ঝাপটা মেরে তাকে জড়িয়ে ধরে শুভ্রর বুকের ভেতর মুখ লুকিয়ে ফেলল। তার কান্নার শব্দ এখন আগের চেয়েও বেশি তীব্র। শুভ্র দুই হাতে রিদির পিঠটা জড়িয়ে ধরল যেন রিদিকে সে তার শরীরের ভেতর বিলীন করে নিতে চাইছে। রিদির চোখের জলে শুভ্রর সাদা শার্টটা ভিজে যাচ্ছে কিন্তু তাতে শুভ্রর কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। সে শুধু ওর মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত স্বরে বলল।
“কাঁদ? তুই কাঁদ যতো মন চাই কাঁদ। আমি তো জানি এই জলগুলো কেবল কষ্টের নয় এগুলো তো আমার প্রতি তোর ভালোবাসারই অন্য নাম।”
রিদি কাঁদতে কাঁদতে শুভ্রর বুকে মুখ গুঁজে অস্ফুট স্বরে বলল।
“আপনি খুব খারাপ? খালি কষ্ট দেন আমায়। এমন কেউ করে? যদি ওখান থেকে পড়ে যেতেন? জানেন কত ভয় করছিল আমার? বুকের ভেতরটা কেমন যেন হয়ে গিয়েছিল।”
শুভ্র রিদির দুই কাঁধ ধরে একটু আলগা করে ওর চোখের দিকে তাকাল। তার চোখে তখন এক অমলিন আনন্দ। শুভ্র মৃদু হেসে বলল।
“আরে পাগলি? ভয় থেকেই তো জয়ের শুরু। আজকে আমার মনটা ভীষণ খুশি। কারণ এতদিনে আমি আমার বুকের ভেতর জমিয়ে রাখা সবচেয়ে প্রিয় কথাটা সবচেয়ে বড় আবেগটা তোকে বলে দিয়েছি। মনে হচ্ছে আমার বুক থেকে একটা পাহাড়সম ভারী পাথর নেমে গেছে যেটা আমি এতদিন খুব গোপনে চেপে রেখেছিলাম। আজ আমি সত্যিই খুব খুশি।”
কথাগুলো বলে শুভ্র খুব যত্নে রিদির চিবুক ধরে মুখটা সোজা করল। নিজের হাতের আঙুল দিয়ে রিদির চোখের জল মুছতে মুছতে সে বলল।
“সারা জীবন তো কেবল গম্ভীর হয়েই কাটিয়ে দিলাম। আজ না হয় একটু অন্যরকম হই? আজ আমি তোর প্রেমিক শুভ্র হয়ে গেলাম। আমি তোকে নিয়ে পুরো শহর ঘুরে বেড়াব। শুধু পাহাড় নয় এই শহরের প্রতিটি গলিকে আমি আজ জানিয়ে দেব আমি আমার প্রাণের ভালোবাসাকে খুঁজে পেয়েছি নিজের করে পেয়েছি।”
শুভ্র রিদির হাত ধরে পাহাড় থেকে নেমে এল। নিচে নামতেই দেখল শুভ্রা আর ঈশান অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে। রিদিকে দেখেই শুভ্রা মৃদু গলায় বলল।
“কি? সারপ্রাইজটা কেমন লাগলো।”
রিদি খানিকটা অভিমানি সুরে বলল।
“তোরা তখন গাড়িতে মিথ্যে কথাগুলো কেন বলেছিলি।”
শুভ্রা খিলখিল করে হেসে উঠল।
“আরে পাগলি ওটা তো মজা ছিল? তোকে একটু ঘাবড়ে দেওয়ার জন্যই তো ওই পরিকল্পনা।”
রিদি আর কথা বাড়াল না। তারা চারজন মিলে আবার গাড়িতে উঠল। শুভ্র আর রিদি পেছনের সিটে বসল আর ঈশান ও শুভ্রা বসল সামনে। কিছুদূর যাওয়ার পর গাড়ি একটা নির্জন অথচ সুন্দর জায়গায় এসে থামল। ততক্ষণে আকাশজুড়ে সন্ধ্যার বিষণ্ণ রঙ ছড়িয়ে পড়েছে। ঈশান গাড়ি থেকে নেমে শুভ্র ও রিদিকে নামিয়ে দিয়ে শুভ্রাকে নিয়ে আবার তাদের গন্তব্যে চলে গেল।
হঠাৎ শুভ্র নিজের পকেট থেকে একটা কালো রুমাল বের করল। রিদি কিছু বুঝে ওঠার আগেই শুভ্র তার চোখ দুটো বেঁধে দিল। রিদি অবাক হয়ে বলল।
“আরে? চোখ বাঁধলেন কেন।”
শুভ্র রিদির কানের কাছে মুখটা নামিয়ে আনল। তার উষ্ণ নিঃশ্বাস রিদির গলার কাছে এসে লাগল। শুভ্র নিচু অথচ রহস্যময় স্বরে বলল।
“কারণ এখন তোকে আমি মেরে ফেলব। রাস্তার ঠিক শেষ সীমান্তে নিয়ে গিয়ে তোকে ফেলে দেব। এখন চুপচাপ আমার সাথে চল।”
রিদি আত্মবিশ্বাসের সাথে শুভ্রের হাত শক্ত করে ধরে বলল।
“ওকে নিয়ে চলুন আমি চোখ বন্ধ করেই আপনার সাথে চলে যাব।”
শুভ্র কোনো কথা বলল না কেবল রিদির হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় আরও একটু শক্ত করে নিল। তার হাতের উষ্ণতা রিদির শিরদাঁড়া বেয়ে এক অদ্ভুত প্রশান্তি ছড়িয়ে দিল। ধীর পায়ে শুভ্র রিদিকে কোথাও একটা নিয়ে এল। জায়গাটা ভীষণ নীরব কিন্তু বাতাসের ভাঁজে ভাঁজে মিশে আছে বেলি আর রজনীগন্ধার এক মায়াবী ঘ্রাণ। শুভ্র আলতো করে রিদির চোখের কালো রুমালটা খুলে দিল।
চোখ খুলতেই রিদি স্তব্ধ হয়ে গেল। চারপাশটা ঘুটঘুটে অন্ধকার যেন কোনো গভীর শূন্যতা। কবরের মতো নিস্তব্ধতায় রিদি নিজের হৃদস্পন্দন শুনতে পাচ্ছিল। সে ভয়ে ভয়ে ফিসফিস করে বলল।
“এইটা কোথায়? এমন অন্ধকার কেন এখানে।”
কিন্তু শুভ্রের কোনো আওয়াজ পাওয়া গেল না। রিদি ভয়ের আবেশে দ্রুত পাশে হাত বাড়িয়ে দেখল না সেখানে শুভ্র নেই। লোকটা হুট করে গেল কোথায়? রিদির কণ্ঠস্বর তখন ভয়ে কাঁপছে।
“শুভ্র ভাইয়া? কোথায় আপনি? প্লিজ আমার খুব ভয় করছে? আমাকে এখান থেকে নিয়ে চলুন।”
রিদি যখন ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে নিজের দুহাত দিয়ে নিজেকে জড়িয়ে ধরছিল ঠিক তখনি হুট করে সব অন্ধকার চিরে রাজকীয় ঝাড়বাতির আলো জ্বলে উঠল। আর সাথে সাথে ওপর থেকে ঝিরঝির করে বৃষ্টির মতো নামতে লাগল হাজারো রক্তিম গোলাপের পাপড়ি। সেই আলোর ঝলকানিতে রিদি অবাক হয়ে সামনে তাকাতেই দেখল ঠিক তার সামনেই হাঁটু গেড়ে বসে আছে শুভ্র। পরনের সেই সাদা শার্ট আর ব্যান্ডানায় তাকে এখন আরো বলিউড সিনেমার নায়কের চেয়েও বেশি মায়াবী লাগছে।
শুভ্র ধীরে ধীরে তার পকেট থেকে মখমলের ছোট্ট বাক্সটা বের করল। রিদির ঠিক সামনে বাক্সটা ধরে সাবধানে সেটির ঢাকনা খুলল। খুলতেই ভেতর থেকে হিরের আংটি আলো প্রতিফলনে ঝিকমিক করে উঠল। রিদির চোখের দিকে তাকিয়ে শুভ্র তার বলিষ্ঠ অথচ কম্পিত কণ্ঠে আবেগমাখা গলায় বলল।
“Will you marry me Ridhi?”
রিদি অবাক হয়ে চারপাশটা দেখল। সবকিছুর সাজসজ্জা তার চারপাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে অনেক মানুষ যাদের প্রত্যেকের হাতে একটি করে লাল রঙের লাভ বেলুন আর সেই বেলুনের গায়ের সোনালী অক্ষরে লেখা।
~ I love you Ridhi ~
এবং ওপর থেকে রোবটের মাধ্যমে পাপড়ি ঝরার দৃশ্য দেখে রিদির বুঝতে বাকি রইল না যে এটি একটি নাইট ক্লাব। আর এত আয়োজন সব শুভ্রই করেছে। রিদির মনে হলো সে কোনো রূপকথার গল্পের ভেতরে ঢুকে পড়েছে? এত সুন্দর একটা দিন তার জীবনে আসবে তা সে বিশ্বাসই করতে পারছে না।
সে দুচোখ ভরে শুভ্রকে দেখল সেই মানুষটি যার জন্য সে আজ নিঃস্ব হতেও রাজি। রিদি এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে সমস্ত সংকোচ ঝেড়ে ফেলে হাসতে হাসতে তার ডান হাতটি শুভ্রের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে দৃঢ় অথচ মিষ্টি কণ্ঠে বলল।
“ইয়েস? অফকোর্স আই উইল মেরি ইউ।”
শুভ্রর চোখে তখন চিকচিক করছে আনন্দাশ্রু। সে পরম মমতায় রিদির আঙুলে আংটিটা পরিয়ে দিল। চারপাশের মানুষজন তখন উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ল করতালি আর খুশির চিৎকারে পুরো ক্লাব যেন কেঁপে উঠল। রিদির আঙুলে হিরের আংটিটা তখন আগুনের মতো জ্বলজ্বল করছে আর রিদির চোখের জল আনন্দের ধারায় গড়িয়ে পড়ছে শুভ্রর হাতের ওপর। শুভ্র উঠে দাঁড়িয়ে রিদিকে নিজের বুকে টেনে নিল যেন সমস্ত পৃথিবীর সুখ আজ এই দুজোড়া হৃদয়ের মিলনে এসে থমকে দাঁড়িয়েছে।
Share On:
TAGS: অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায়, সুমি চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় গল্পের লিংক
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৫৫
-
বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ৩
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৪০
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ১১
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৬
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ২৬
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৭৯
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৪১
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৭১