লেখিকাসুমিচৌধুরী
শুভ্র পাগলের মতো পুরো মেলা তন্ন তন্ন করে খুঁজছে। মানুষের ভিড় ঠেলে এমাথা থেকে ওমাথা যাচ্ছে কিন্তু কোথাও রিদি আর রাসেলকে পাচ্ছে না। শুভ্রের মাথার ভেতর যেন দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে। চৈত্র বৈশাখের কড়া রোদে ওর সারা শরীর ঘামে ভিজে গেছে। চুলের গোছা ঘামে লেপ্টে কপালের ওপর এসে পড়ছে। শুভ্র বারবার নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে আর ওর চোয়াল রাগে শক্ত হয়ে আসছে। ও কিছুতেই মানতে পারছে না যে ও অত কড়া করে বারণ করার পরেও রিদি কীভাবে এত বড় সাহস পায় ওর অবাধ্য হওয়ার। রিদি কি জানে না ওর এই প্রেমিক পুরুষটা কতটা হিংসুটে। ও তো রিদির পাশে অন্য কোনো পুরুষের ছায়াও সহ্য করতে পারে না। বুকের ভেতরটা তীব্র এক যন্ত্রণায় ফেটে যাচ্ছে ওর। ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। রাগে দুঃখে দম বন্ধ হয়ে আসছে। শুভ্র নিজের মাথায় একটা থাপ্পড় মেরে প্রচণ্ড ক্ষোভে আর হতাশায় নিজের মনে বিড়বিড় করে উঠল।
শুভ্র দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিস করে রাগী গলায় বলল।
“আই উইল কিল হার। রিদি তুই একবার খালি আমার সামনে আয়। তোর এই অবাধ্য হওয়ার সাধ আমি চিরতরে মিটিয়ে দেব।”
অনেকক্ষণ ধরে মেলা তন্ন তন্ন করে খোঁজার পর শুভ্র যখন রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে মেলা থেকে বের হয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল। ঠিক তখনই হঠাৎ ওর তীক্ষ্ণ চোখ গেল মাঠের এক কোণের নিরিবিলি গলিটার দিকে। সেখানে রিদির এক পা হাঁটুতে তুলে রাসেল অত্যন্ত নিবিড় যত্ন নিয়ে তার পায়ে পায়েল পরিয়ে দিচ্ছে। রিদির ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা সেই তৃপ্তির হাসিটা দেখা মাত্রই শুভ্রের মনে হলো কেউ ওর জ্বলন্ত মস্তিষ্কে এক বালতি কেরোসিন ঢেলে দিল। মুহূর্তেই শুভ্রের পেশিগুলো পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেল। হাতের মুঠি পাকিয়ে এল। বুকের ভেতরটা তীব্র হিংসা আর এক অসহ্য ব্যথায় মোচড় দিয়ে উঠল। নিজের ভালোবাসার মানুষকে অন্য কোনো পুরুষের এত কাছে ও সহ্য করতে পারছে না। নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে শুভ্র হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ল।
শুভ্র সরাসরি বড় বড় পা ফেলে ঝড়ের বেগে রাসেলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। রাসেল বা রিদি কিছু বুঝে ওঠার আগেই শুভ্র এক ঝটকায় রাসেলের শার্টের কলারটা খপ করে ধরে ওকে ওপরের দিকে তুলে ধরল। শুভ্রের চোখ দুটো তখন টকটকে লাল। কপালে রাগের রগগুলো দপদপ করছে। শুভ্র একদম রাসেলের মুখের ওপর দাঁতে দাঁত চেপে চরম হুঙ্কারের স্বরে বলল।
“তোকে বলেছিলাম না রিদির থেকে দূরে থাকতে? বলেছিলাম না আমার জিনিসের দিকে নজর দিবি না? তারপরও তোর কলিজার সাহস কী করে হয় ওকে টাচ করার? আই উইল কিল ইউ বাস্টার্ড!”
রাসেল ব্যথায় কুঁকড়ে গিয়েও কোনোরকমে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল।
“কি বলছো তুমি এসব ব্রো? পাগল হয়ে গেছো নাকি?”
শুভ্রর চোখেমুখে তখন খুনি নেশা। ও রাসেলের শার্টের কলারটা আরও এক প্যাঁচ ঘুরিয়ে শক্ত করে ধরল। যেন রাসেলের দম বন্ধ হয়ে আসবে। শুভ্র দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিস করে বলল।
“হোয়াট এভার আই অ্যাম দ্যাট ইজ নান অফ ইওর বিজনেস। তোকে ওয়ার্নিং দিয়েছিলাম না রিদির থেকে দূরে থাকতে? ডিডন্ট আই টেল ইউ টু স্টে অ্যাওয়ে ফ্রম হার? তোর সাহস দেখে আমি নিজেই অবাক হয়ে যাচ্ছি। কোন হাত দিয়ে টাচ করেছিস ওকে? এই হাত দিয়ে না? দাড়া দেখাচ্ছি তোকে!”
বলেই শুভ্র বিদ্যুতের গতিতে রাসেলের ডান হাতটা ধরে সজোরে মুচড়ে দিল। হাড় মড়মড় করার মতো একটা শব্দ হলো বোধহয়। রাসেল যন্ত্রণায় বাঘের মতো আর্তনাদ করে উঠল। ওর মুখটা নীল হয়ে গেল ব্যথায়। রিদি পাশে দাঁড়িয়ে থরথর করে কাঁপছে। সে ভয়ে অস্ফুট স্বরে বলল।
“ভাইয়া এসব কি করছেন? পাগল হয়ে গেছেন? প্লিজ ছেড়ে দেন!”
শুভ্রর কানে তখন কোনো কথা ঢুকছে না। ওর মাথায় তখন একটাই চিন্তা রিদিকে কেন ও ছুুঁলো। এদিকে রাসেলও আর সহ্য করতে পারল না। অপমানে আর ব্যথায় ওর ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। ও শুভ্রর হাত থেকে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে চিৎকার করে বলল।
“ব্রো তুমি কিন্তু আমার সাথে অনেক বেশি করছো। বড় ভাই বলে রেসপেক্ট করি দেখে সবসময় তোমাকে ছাড় দিবো না।”
শুভ্র মুহূর্তের মধ্যে ওর হাত ছেড়ে দিল। ওর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল। যা রাসেলের কথা বলার সাহসের চেয়েও বেশি ভয়ানক। শুভ্র ওর একদম নাকের কাছে মুখ নিয়ে স্থির চোখে তাকিয়ে বলল।
“ওহ রিয়েলি? হোয়াট উইল ইউ ডু? মারবি আমায়? ডু ইউ থিংক ইউ ক্যান টাচ মি?”
রাসেল তখন অপমানে দিশেহারা। ও নিজের শার্টের কলারটা ঠিক করতে করতে গলার রগ ফুলিয়ে বলল।
“আমাকে মারলে আমিও মারবো। কাউকে বিনা কারণে মারার রাইট তোমার নেই!”
শুভ্রর হাত যেন কথা বলার আগেই চলতে শুরু করেছে। রাসেলের কথা শেষ হওয়ার আগেই শুভ্র সজোরে ওর গালে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিল। মেলার সেই হইচইয়ের মাঝেও থাপ্পড়ের শব্দটা বেশ জোরালো শোনাল। শুভ্র তাচ্ছিল্যের স্বরে হুঙ্কার দিয়ে উঠল।
“আই জাস্ট স্ল্যাপড ইউ। নাউ হোয়াট? মারবি আমায়? মার। শো মি ইওর গাটস!”
রাসেল এবার অপমানে আর রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। ও দাঁতে দাঁত চেপে বলল।
“এবার কিন্তু সত্যি সত্যি অনেক বেশি হয়ে যাচ্ছে শুভ্র ভাই। আমি আর সহ্য করবো না।”
শুভ্রর চোখেমুখে তখন পৈশাচিক আনন্দ। ও নিজের কলারটা একটু আলগা করে দিয়ে বলল।
“ইয়েস আই অ্যাম ডুইং টু মাচ। সো হোয়াট? কাম অন হিট মি!”
রাসেল এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। ও পুরো শক্তি দিয়ে শুভ্রের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। কিন্তু শুভ্র তো আগে থেকেই তৈরি ছিল। রাসেলের এলোপাতাড়ি ঘিলুহীন আক্রমণ শুভ্রকে খুব একটা কাবু করতে পারল না। বরং শুভ্র দক্ষ হাতে রাসেলের প্রতিটি আঘাত এড়িয়ে গিয়ে পাল্টা মার দিতে শুরু করল। শুভ্রর একেকটা ঘুষি যেন হাতুড়ির মতো রাসেলের গায়ে গিয়ে পড়ছে। রাসেল মার দেওয়ার সুযোগই পাচ্ছে না। উল্টো শুভ্রর ঝড়ের গতির মারের নিচে ও পিষ্ট হতে শুরু করল।
রিদি এই ভয়ানক দৃশ্য দেখে আতঙ্কে নীল হয়ে গেছে। ও দুই হাতে নিজের মাথা চেপে ধরে চিৎকার করে উঠল।
“ভাইয়া স্টপ। প্লিজ স্টপ ইট। রাসেল ভাইয়াকে ছাড়েন ও মরে যাবে তো। কেউ থামান এদের!”
কিন্তু শুভ্র তখন হিতাহিত জ্ঞানশূন্য। ওর কানে রিদির আর্তনাদ পৌঁছাচ্ছে না। ও রাসেলকে মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়ে একের পর এক ঘুষি মারতে লাগল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই রাসেলের নাক আর মুখ ফেটে রক্ত বের হতে শুরু করল। ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে শুভ্রর নিজের ঠোঁটও কেটে রক্ত ঝরছে। কিন্তু সেদিকে ওর বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই। মেলার সেই চঞ্চল পরিবেশ নিমেষেই থমকে গেল। এক বিশাল ভিড় জমে গেছে চারপাশে। কিন্তু কেউ এগিয়ে আসার সাহস পাচ্ছে না শুভ্রর সেই চণ্ডাল রূপ দেখে সবাই ভয়ে পিছিয়ে যাচ্ছে। কেউ কেউ মোবাইলে ভিডিও করছে। কেউ দূর থেকে ফিসফাস করছে। কিন্তু শুভ্রর ওই খুনি চাউনি দেখে কেউ থামানোর কথা চিন্তাও করছে না।
রাসেল তখন রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে। নিশ্বাস নিতেও ওর কষ্ট হচ্ছে। মেলার ধুলোয় ওর শরীর মাখামাখি। এই বীভৎস দৃশ্য দেখে রিদি আর চুপ থাকতে পারল না। ও আতঙ্কে আর রাগে শুভ্রর সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলল।
“শুভ্র ভাইয়া। আপনি কিন্তু এবার অনেক বেশি করে ফেলছেন। এটা কোন ধরনের আচরণ। একটা মানুষকে এভাবে পশুর মতো মারতে আপনার একটুও বাধল না?”
শুভ্রর কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছে। এলোমেলো চুলের গোছা চোখের ওপর এসে পড়েছে। রিদির মুখে রাসেলের জন্য ওকালতি শুনে ওর ভেতরের হিংসুটে সত্তাটা যেন আরও দ্বিগুণ বেগে জ্বলে উঠল। ও বন্য পশুর মতো হিংস্র চোখে রিদির দিকে তাকাল। শুভ্রর নজর পড়ল রিদির পায়ের দিকে যেখানে রাসেলের পরিয়ে দেওয়া সেই রূপোলী পায়েলটা এখনো চকচক করছে। শুভ্র এক লাফে রিদির সামনে গিয়ে ওর দুই গাল সজোরে চেপে ধরল। ওর আঙুলের চাপে রিদির নরম ফর্সা গাল মুহূর্তেই লাল হয়ে গেল। শুভ্র একদম রিদির চোখের ওপর চোখ রেখে হিসহিসিয়ে বলল।
“কেন? কষ্ট হচ্ছে রাসেলের জন্য? ইজ ইট হার্টিং ইউ সো মাচ?”
রিদি গালের ব্যথায় কুঁকড়ে উঠে চোখ বন্ধ করে ফেলল। ও কাঁপা গলায় উত্তর দিল।
“একটা মানুষকে এভাবে অকারণে মারলে কার খারাপ না লাগে। আপনি কি সত্যিই পাগল হয়ে গেছেন। কেন মারলেন রাসেল ভাইয়াকে এভাবে। কি করেছেন উনি?”
শুভ্র রিদির গাল আরও জোরে চেপে ধরে ওর চেহারার একদম কাছে মুখ নিয়ে এল। ওর তপ্ত নিশ্বাস রিদির মুখে আছড়ে পড়ছে। শুভ্র চিৎকার করে বলল।
“ওহ সিরিয়াসলি? সো ইউ আর ফিলিং হিজ পেইন। পরপুরুষের জন্য খুব মায়া হচ্ছে তোর তাই না। একটু আগে তো দেখলাম খুব যত্ন করে পায়েল পরিয়ে দিচ্ছিল। তা পরপুরুষের ছোঁয়া আর তার দেওয়া গিফট নিতে খুব ভালো লাগে তাই না?”
শুভ্রের ওই কথাটা রিদির একদম নারীত্বের সম্মানে গিয়ে লাগল। পরপুরুষের ছোঁয়া নিয়ে ওর চরিত্র নিয়ে এমন কদর্য কথা শুভ্রর মুখে শুনবে সেটা ও কল্পনাও করেনি। রিদি নিজেও জানলো না ঠিক কী করে ফেলল। অজান্তেই শুভ্রের হাত থেকে নিজের গাল ছাড়িয়ে নিয়ে ‘ঠাস’ করে শুভ্রের গালে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিল। সেই একটা থাপ্পড়ে যেন পুরো পৃথিবী আকাশ-বাতাস আর নদী-নালা সবকিছুতে এক মুহূর্তের জন্য প্রলয়ংকরী তুফান শুরু হয়ে গেল। মেলার সেই শোরগোল মুহূর্তেই এক বীভৎস নিস্তব্ধতায় রূপ নিল। রিদি কী করে ফেলেছে সেটা বুঝতে পেরে মুহূর্তেই হাত নামিয়ে ফেলল। ও ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে তোতলা স্বরে বলল।
“শু-শুভ্র ভাই আ-আমি জানি না কি-কিরলাম… বি-বিশ্বাস করুন আমি…।”
শুভ্র নিজেও একদম পাথরের মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বড় হওয়ার পর আজ পর্যন্ত তার বাবাও কোনো ভুলের জন্য তার গায়ে হাত তোলেননি। আর রিদি কিনা এই ভরা মেলায় সবার সামনে তার গালে হাত তুলল। তাও কেন। কারণ শুভ্র তাকে পরপুরুষদের থেকে দূরে থাকতে বলেছে বলে।
শুভ্রের মাথায় তখন একটাই চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে সে কেন এমন করে। সে তো শুধু সহ্য করতে পারে না রিদির পাশে অন্য কোনো ছেলেকে। রিদি কেন ওর এই পাগলামিটা বোঝে না। কেন ওকে বুঝার চেষ্টা করে না। এসব ভাবতেই শুভ্রের ভেতরের দহনটা যেন সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেল। অপমানে আর রাগে অন্ধ হয়ে শুভ্র হাত তুলল রিদির গালে থাপ্পড় মারার জন্য।
রিদি ভয়ে কুঁকড়ে গিয়ে সাথে সাথে চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে ফেলল। ও ভাবল আজ বুঝি ওর শেষ রক্ষা নেই। কিন্তু না। শুভ্রের হাতটা রিদির গালের ঠিক ইঞ্চিখানেক দূরে এসে মাঝ পথেই থেমে গেল। শুভ্র পারল না। নিজের ভালোবাসার গায়ে এবার আঘাত করার শক্তি ওর হলো না। তবে ও হাতটা সরিয়েও নিল না। বরং রিদির নরম গালটা হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরল। ব্যথায় রিদির মুখটা কুঁচকে গেল। শুভ্র একদম রিদির মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ে দাঁতে দাঁত চেপে চরম আক্ষেপে বলল।
“আই কুডন’ট হিট ইউ… আই ডোন’ট নো হাই বাট টুডে মাই হার্ট ডিডন’ট লেট মি হার্ট ইউ… ইট স্টপড মি ফ্রম হার্টিং ইউ।”
কথাটা বলেই শুভ্র রিদিকে সজোরে একটা ধাক্কা মারল। নিজের ঠোঁটের কোণে জমাট বাঁধা রক্তটুকু হাতের উল্টো পিঠে মুছতে মুছতে ও মেলা আর মানুষের ভিড় ঠেলে ঝড়ের বেগে সেখান থেকে বের হয়ে গেল। শুভ্রের সেই চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে ভিড়ের মানুষগুলো একে একে সরতে শুরু করল। ওদিকে রাসেলকে অনেক মানুষ মিলে ধরাধরি করে মাটি থেকে তুলে সোজা করে দাঁড় করালো।
রিদি ওখানেই একদম পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ওর চারপাশের পৃথিবীটা যেন হঠাৎ থমকে গেছে। মাথার ভেতরটা ভোঁ ভোঁ করছে। ও শুধু ভাবছে কী হয়ে গেল এইসব। একটু আগেও তো সব ঠিক ছিল শুভ্র ওর টিকলি সোজা করে দিচ্ছিল ওর সাথে রাগ-অভিমানের খুনসুটি করছিল। তাহলে হঠাৎ কেন এমন হলো সবচেয়ে বড় প্রশ্নটা রিদির নিজের কাছেই তার হাতটা শুভ্রর গায়ে কীভাবে উঠল। কীভাবে তার কলিজাটা আজ এত বড় হয়ে গেল যে সে শুভ্রর মতো একটা মানুষকে সবার সামনে থাপ্পড় মেরে বসল।
মেলা থেকে ফিরতে ফিরতে প্রায় দুপুর হয়ে গেল। বাড়ির গুমোট পরিবেশে তখন এক চরম উত্তেজনা। শুভ্র যে মেলা থেকে কখন বেরিয়ে গেছে সেটা কেউ জানে না। তবে শুভ্র যেভাবে সবার সামনে রাসেলকে মেরেছে তা শুনে সোহান চৌধুরী ভীষণ খেপে গেছেন। তার রাগ যেন থামছেই না। ড্রয়িং রুমে দাঁড়িয়ে সোহান চৌধুরী রাগী গলায় চিৎকার করছেন। রাসেল তাকে সব বলেছে শুভ্র তাকে শুধু রিদির জন্য মেরেছে। এই একটা কথা সোহান চৌধুরীর মনে সন্দেহের দানা বাঁধিয়ে দিয়েছে। তিনি মনে মনে ভাবছেন “রিদির জন্য শুভ্র এত বড় কাণ্ড কেন করবে? রিদির সাথে ওর সম্পর্ক কী।”
বাড়ির সবাই মেলার ক্লান্তি আর মগজের দুশ্চিন্তা নিয়ে ড্রয়িং রুমের সোফায় শরীর ছেড়ে দিল। কিন্তু সবার মাঝে রিদি একদম চুপচাপ। সে ধীর পায়ে ভেতরে আসলো। তাকে দেখে মনে হচ্ছে দেহটা চলছে ঠিকই কিন্তু প্রাণটা অন্য কোথাও পড়ে আছে। ও যে কী করেছে তা ভেবেই ওর বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছে।
এদিকে ঈশান অস্থির হয়ে বাড়ির বাইরে বের হয়ে শুভ্রর নাম্বারে বারবার কল দিতে লাগল। কিন্তু প্রতিবারই ওপাশ থেকে যান্ত্রিক কণ্ঠ বলছে ফোনটি বন্ধ। ঈশান কপালে হাত দিয়ে বিড়বিড় করে উঠল “হোয়াট ইজ গোয়িং অন? বস এভাবে রাসেলকে মারবে এটা আমি ভাবতেও পারিনি!” ঈশান নিজেও অবাক হয়ে ভাবছে শুভ্র এখন কোথায় থাকতে পারে।
দিন শেষ হয়ে রাত নামল। আর রাতের সাথে সাথে বাড়ির সবার দুশ্চিন্তা পাল্লা দিয়ে বাড়তে শুরু করল। শুভ্র এখনো ফেরেনি। ওর ফোনটাও সেই দুপুর থেকে বন্ধ। বাড়ির মুরুব্বিরা সবাই চিন্তিত মুখে বসে আছেন। কেউ বলতে পারছে না শুভ্র কোথায় গেছে। সব থেকে খারাপ অবস্থা রিদির। ওর মনটা তপ্ত কড়াইয়ের মতো ছটফট করছে। কোনো কিছুতেই শান্তি পাচ্ছে না সে। ও নিজের পায়ের দিকে তাকিয়ে দেখল সেই রূপোলী পায়েলটা এখনো পায়ে লেগে আছে। রিদির কাছে ওটা এখন বিষাক্ত মনে হচ্ছে। মুহূর্তের মধ্যে সে এক টানে পা থেকে পায়েলটা খুলে ছুঁড়ে ফেলে দিল। মনে মনে ও রাসেলকে একগাদা গালি দিল। ও তো ওই পায়েল নিতে চায়নি। ওই রাসেলই তো জোর করে দিল। অথচ এই সামান্য জিনিসের জন্য কত কি হয়ে গেল।
রাত বারোটা বেজে গেছে। চৌধুরী বাড়ির থমথমে ড্রয়িং রুমে কারো চোখে ঘুম নেই। সবার চোখেমুখে জমাট বাঁধা দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট। শুভ্র এখনো বাড়ি ফিরেনি। আর এই অনিশ্চয়তা যেন সবাইকে তিলে তিলে কুঁড়ে খাচ্ছে। সোহান চৌধুরী ড্রয়িং রুমে পায়চারি করছেন আর রাগে-উত্তেজনায় বারবার বলে উঠছেন।
“কি হয়েছে কি ওর? এইভাবে আমাদের টেনশনে ফেলে রাখছে কেন? একটা ফোন পর্যন্ত রিসিভ করার প্রয়োজন মনে করছে না!”
বাকি সবাই পাথরের মতো নিশ্চুপ হয়ে সোফায় বসে আছে। সাহেরা চৌধুরী এক কোণে বসে সবটা লক্ষ্য করছেন। তিনি মনে মনে নিশ্চিত যে রিদির সাথে আজ নিশ্চিত বড় কিছু একটা ঘটেছে। নয়তো শুভ্র এতটা অনিয়মিত আচরণ করার ছেলে নয়।
সবার এই উৎকণ্ঠার মাঝেই হঠাৎ সদর দরজার কবাট নড়ে উঠল। ধীর পায়ে ভেতরে প্রবেশ করল শুভ্র। সবাই একসাথে চট করে দরজার দিকে তাকাল। শুভ্রকে দেখা মাত্রই সবার বুকটা ধক করে উঠল। ওর চুলগুলো উস্কোখুস্কো হয়ে কপালের ওপর আছড়ে পড়ছে। চোখ দুটো অনিদ্রায় আর চরম ক্ষোভে টকটকে লাল হয়ে আছে। শুভ্র কাউকেই কোনো কথা বলার সুযোগ দিল না। এমনকি ড্রয়িং রুমে সবাইকে এভাবে বসে থাকতে দেখেও ও নির্বিকার। ও সরাসরি নিজের রুমের দিকে হাঁটা দিতেই পিছন থেকে সোহান চৌধুরী কড়া গলায় হুঙ্কার ছাড়লেন।
“কোথায় গিয়েছিলি তুই? আমরা যে সবাই এখানে দাঁড়িয়ে আছি তা কি দেখতে পাচ্ছিস না? কিছু না বলে হুট করে এসে রুমে চলে যাচ্ছিস। ফোন দিলাম ফোনটাও বন্ধ বলল বারবার।”
শুভ্রর পায়ের গতি থমকে গেল। ও খুব ধীরগতিতে ঘাড় ঘুরিয়ে বাবার দিকে তাকাল। ওর চাহনিতে আজ এক অদ্ভুত জেদ আর শূন্যতা। ও একদম নিস্পৃহ গলায় উত্তর দিল।
“একটা কাজ ছিল ব্যস্ত ছিলাম তাই ধরিনি। আর এইভাবে মাঝরাতে দাঁড়িয়ে না থেকে সবাই গিয়ে ঘুমান।”
বলেই শুভ্র আবার হাঁটা শুরু করলে সোহান চৌধুরী পুনরায় চড়া গলায় বলে উঠলেন।
“তা বুঝলাম। তো তুই রাসেলকে ওইভাবে মেরেছিস কেন?”
শুভ্র এবার পুরো শরীর ঘুরিয়ে দাঁড়াল। মাথা নিচু করে ও ঘাড় ত্যাড়া করে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। যেন নিজেকে সামলাচ্ছে। তারপর অত্যন্ত শীতল গলায় জবাব দিল।
“হাত চুলকাচ্ছিল তাই মেরে দিয়েছি।”
ছেলের মুখে এমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ কথা শুনে সোহান চৌধুরীর ধমনীতে রক্ত টগবগ করে উঠল। তিনি এক পা সামনে এগিয়ে এসে বললেন।
“শুভ্র। আমি তোর বাবা হই ঠিক করে কথা বল আমার সাথে। তোর এই বেয়াদবি দিন দিন সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে!”
শুভ্রর মুখটা যন্ত্রণায় কুঁচকে গেল। ওর চেহারায় চরম অবসাদের ছাপ। ও দীর্ঘশ্বাস ফেলে খুব নিচু স্বরে কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল।
“ভালো লাগছে না আব্বু আমি এখন কথা বলতে চাচ্ছি না।”
সোহান চৌধুরী আর কথা বাড়ালেন না। তবে তার গুমোট মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছিল তিনি কতটা ক্ষুব্ধ। শুভ্র কারো দিকে ফিরেও তাকালো না। ঝড়ের বেগে সোজা নিজের রুমে চলে গেল। সাহেরা চৌধুরী আর স্থির থাকতে পারলেন না। অস্থির মনে তিনিও ছেলের পিছন পিছন রুমে ঢুকলেন।
রিদি এতক্ষণ ড্রয়িং রুমের এক কোণে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে সবটা দেখছিল। ও খুব স্পষ্ট খেয়াল করেছে শুভ্র একবারের জন্যও তার দিকে তাকায়নি। এমনকি যাওয়ার সময় ওর পাশ দিয়ে গেলেও শুভ্র এমন ভাব করল যেন রিদি সেখানে ছিলই না। রিদির বুক ফেটে কান্না আসছে। গলার কাছে একটা দলা পাকানো কষ্ট আটকে আছে। ওর খুব ইচ্ছে করছে শুভ্রর কাছে গিয়ে ক্ষমা চাইতে। হাজারটা কথা বলতে। কিন্তু শুভ্রর ওই পাথরের মতো শীতল রূপ দেখে ও এগোনোর সাহস পাচ্ছে না।
শুভ্র নিজের রুমে ঢুকেই এক ঝটকায় গায়ের রক্তমাখা শার্টটা খুলে ফ্লোরে ছুড়ে মারল। আলমারি খুলে অস্থির হাতে টি-শার্ট আর ট্রাউজার বের করতে লাগল। ঠিক তখনই সাহেরা চৌধুরী রুমে প্রবেশ করলেন। তিনি শুভ্রর বিধ্বস্ত চেহারার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন এবং খুব নরম স্বরে জিজ্ঞেস করলেন।
“কি হয়েছে তোর? এইভাবে কেন রেগে আছিস? রাসেলকে ওভাবে মারার কারণটা কি?”
শুভ্র মায়ের দিকে একবারও তাকালো না। কাপড়গুলো হাতে নিয়ে মুখ ঘুরিয়ে অত্যন্ত নিচু কিন্তু ধরা গলায় বলল।
“আম্মু আমার ভালো লাগছে না। আমি এখন কোনো বিষয়েই কথা বলতে চাচ্ছি না। প্লিজ আমাকে একটু একা থাকতে দাও।”
সাহেরা চৌধুরী ছেলের চোখের কোণে জমে থাকা রক্তাভ আভা আর চোয়ালের কঠিন ভঙ্গি দেখে বুঝলেন এখন জোর করা বৃথা। তিনি আবারও কিছু বলতে চাইলেন। কিন্তু শুভ্র তাকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে টি-শার্ট আর ট্রাউজার নিয়ে সটান ওয়াশরুমে ঢুকে গেল। সাহেরা চৌধুরী অপলক কিছুক্ষণ বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
দীর্ঘ প্রায় আধঘণ্টা শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে থাকার পর শুভ্র যখন বের হলো। দেখল রুমে তূর্য রিফাত আর ঈশান বসে আছে। ওদের চোখেমুখে রাজ্যের প্রশ্ন। কিন্তু শুভ্রর নির্বিকার ভঙ্গি দেখে সবাই কেমন যেন কুঁকড়ে আছে। শুভ্র কারো দিকে ফিরেও তাকালো না একদম নিঃশব্দে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। গায়ের টি-শার্টটা তখনো শাওয়ারের হিমেল পরশে কিছুটা ঠান্ডা হয়ে আছে। ও খুব ধীরলয়ে তোয়ালে দিয়ে নিজের চুলগুলো মুছতে লাগল। যেন রুমে ও একা ছাড়া আর কেউ নেই।
রিফাত আর ধৈর্য ধরতে না পেরে কিছুটা এগিয়ে এসে শুভ্রর কাঁধে হাত রাখল। খুব নিচু স্বরে কিন্তু চিন্তিত গলায় জিজ্ঞেস করল।
“কি হয়েছে তোর? রাসেলকে ওইভাবে মারলি কেন? এমন কি করেছিল ও?”
শুভ্র কোনো উত্তর দিল না। আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়ে ও নিস্পৃহভাবে চুল মুছে যেতে লাগল। ওর এই জমাট বাঁধা নীরবতা রিফাতকে বুঝিয়ে দিল যে এই ঘাড় ত্যাড়া আর একগুঁয়ে ছেলেটা এখন আকাশ-পাতাল এক করে ফেললেও মুখ খুলবে না। ওর বুকের ভেতর ঠিক কীসের দাবানল জ্বলছে তা জানার সাধ্য এখন কারোর নেই। অগত্যা কেউ আর কথা বাড়ালো না। গুমোট এক অস্বস্তি নিয়ে তূর্য রিফাত আর ঈশান যার যার জায়গায় শুয়ে পড়ল।
পুরো রুমের আলো নিভে গেল। শুভ্র ধীর পায়ে হেঁটে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়াল। রাতের নিস্তব্ধতা তখন চৌধুরী বাড়িকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরেছে। ও পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে ধরিয়ে নিল। সিগারেট শুভ্র নিয়মিত খায় না। তবে যখন ও প্রচণ্ড রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে কিংবা মনের গহীনে খুব বেশি চোট পায়। তখন এই নিকোটিনের ধোঁয়াকেই নিজের একমাত্র নিঃসঙ্গ সঙ্গী মনে করে।
অন্ধকারে সিগারেটের লাল আগুনটা আগ্নেয়গিরির লাভার মতো ধকধক করে জ্বলছে। শুভ্র লম্বা একটা টান দিয়ে বুকভর্তি ধোঁয়া ফুসফুসে জমা করল। তারপর অত্যন্ত ধীরগতিতে সেই ধোঁয়া রাতের আকাশের দিকে ছেড়ে দিল। ধোঁয়ার কুন্ডলীগুলো বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে। রাতের সেই নিস্তব্ধতা ভেঙে হঠাৎ একটা অতি পরিচিত মেয়েলী কণ্ঠ শুভ্রের কানে আছড়ে পড়ল।
“শু-শু-ভ্র ভাই… আ-আপনি সিগারেট খান?”
রানিং…!
Share On:
TAGS: অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায়, সুমি চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৮৬
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ২৫
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৭৩
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ১৭
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৭৫
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৮৪
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৩৫
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৬
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৫৬
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ১১