অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ৪৮
নুসাইবা_ইভানা
পর্ব -৪৮
নয়না চৌধুরীর বাড়িতে পা রাখার ঠিক আধা ঘণ্টা পরেই খবর আসলো—জাহিন আর এই পৃথিবীতে নেই। যদিও এই বিষয়টি নিয়ে কেউ সিরিয়াস না; কারণ, একজন মৃত মানুষ যার কবর হয়ে গেছে বছর পেরিয়ে গেছে, তার মৃত্যুর সংবাদ নতুন করে কাউকে কি শোকাহত করবে!
মেহনুর চিৎকার করে বলল, “আম্মি, আমি সত্যি বলছি, জাহিন এতদিন বেঁচে ছিল! আজ কিছুক্ষণ আগেই আমাদের ছেড়ে চলে গেছে। কেন, কেন এভাবে চলে গেল আমার চোখের সামনে? নিজের স্বামীর এই করুণ মৃত্যুর সাক্ষী আমি কেন হলাম?” বলতে বলতে মেহনুর জ্ঞান হারালো।
কিছু সময় পূর্বে…
জিয়ান নয়নাকে নিয়ে চৌধুরী ম্যানশনে ফিরল। নাজিম চৌধুরী ও মমতা চৌধুরী দুজনেই সমাদরে গ্রহণ করল নয়নাকে। মমতা চৌধুরী নয়নাকে জড়িয়ে ধরে ক্ষমা চাইলেন। নয়নার মনে হচ্ছে, সব খারাপ দিন শেষে তার জীবনে সুখ ফিরে আসছে।
🌿
মেহনুর বোকার মতো তাকিয়ে রইল জাহিনের দিকে। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে চিৎকার করে বলল, “জাহিন!”
অন্তর জাহিনের খোলা চোখ দুটো নিজের হাতে বন্ধ করে দিল। অন্তরের চোখ থেকে টুপটুপ করে অশ্রু ঝরছে। কী করে ফেলল সে! এই পাপের ভার সারাজীবন কীভাবে বয়ে বেড়াবে অন্তর?
নিচ থেকে মেহনুরের চিৎকারের আওয়াজ পেয়ে সবাই ছুটে আসল বারান্দায়। মেহনুরের পাশে দাঁড়িয়ে কান্না করছে জারিফ। জিয়ান জারিফকে কোলে নিয়ে বলল, “কাঁদে না বাবা।” জারিফ তবুও কান্না করেই চলেছে।
মেহনুর কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলল, “জাহিন আর নেই বাবা, জাহিন আর নেই।”
সবাই ভাবল, অতি শোকে মেহনুর এমন উদ্ভট কথা বলছে। যখন সবার কাছে সবটা পরিষ্কার হলো, মমতা চৌধুরী কান্নায় ভেঙে পড়লেন। জিয়ান জারিফকে নয়নার কোলে দিয়ে বলল, “তুমি জারিফকে সামলাও, আমি অন্তরের কাছে যাচ্ছি।”
নাজিম চৌধুরী সাথে গেলেন জিয়ানের। মেহনুরকে ধরে নিয়ে বেডে শুইয়ে দেওয়া হয়েছে। মমতা বেগম কান্না করছেন। নয়না যেন এক পাথুরে মূর্তি। হুট করে কী হয়ে গেল! জাহিন কোথা থেকে আসল? তাহলে যাকে কবর দেওয়া হয়েছে সে কে! নয়না কিছু ভাবতে পারছে না। কেন বারবার সুখ তার হাতের কাছে এসেও পালিয়ে যায়? নয়না নিজের ফোন বের করে অনিকেতকে কল করল। অনিকেত বলল, “আমি এক্ষুনি আসছি।”
নয়না মেহনুরের পাশে জারিফকে বসিয়ে রেখে মেহনুরের চোখেমুখে পানির ঝাপটা দিল। এরপর আবার জারিফকে কোলে তুলে নিয়ে হাঁটতে লাগল। মেহনুরের জ্ঞান ফিরতেই জারিফকে নয়নার কোলে দেখতে পেয়ে নয়নার কোল থেকে তাকে ছিনিয়ে নিয়ে বলল, “আমার স্বামীকে কেড়ে নিয়ে মন ভরেনি? এখন আমার সন্তানের দিকে নজর দিয়েছিস? তুই একটা অপয়া, অভিশাপ! তুই আমাদের জীবনে অভিশাপ। বের হয়ে যা এখান থেকে!”
নয়না চুপচাপ রুম থেকে বের হয়ে এল। জাহিনের রুমের পাশেই বিশাল বড় একটা লাইব্রেরি, যেখানে জাহিন নিজের একান্ত কাজ করত, সময় কাটাত। নয়না লাইব্রেরি রুমে ঢুকে চেয়ারে বসে পড়ল। টেবিলের উপর মাথা রেখে কান্না করতে লাগল। নিজেকে সত্যিই অপরাধী মনে হচ্ছে নয়নার। মনে হচ্ছে সব সমস্যার কারণ কেবল সে নিজেই। নয়না মনে মনে বলল, “সেদিন কেন আমি মরলাম না? আমার বেঁচে থাকাটাই ভুল।”
অন্ধকার রুমে নয়নার কেমন ভয় ভয় করছে। রুমের লাইট অন করে চারপাশে তাকাতে লাগল। আশ্চর্য, এই রুমে কোনো জানালা নেই! নয়নার হঠাৎ মনে হলো, এটা জাহিনের গোপন টর্চার সেল নয় তো? নিশ্চিত এখানে কোনো গোপন দরজা আছে। নয়না দরজা খুঁজতে লাগল। নাহ, তেমন কিছুই চোখে পড়ছে না। হুট করে দ্বিতীয় টেবিলের নিচে একটা গুপ্ত লকার চোখে পড়ল। নয়না দ্রুত সেটা খোলার চেষ্টা করল, কিন্তু অদ্ভুত—এটা তো আগে থেকেই খোলা! বন্ধ থাকলে এটার সন্ধান পাওয়া অসম্ভব ছিল। নয়না ভাবতে লাগল, কে এসেছিল এখানে? এটার মধ্যেই বা কী আছে?
নয়না নিজের ফোনের টর্চ অন করে লকারের ভেতর দেখতে লাগল। পিস্তল, টাকা, স্বর্ণ, হিরে, একটা ওড়না আর দুটো ডায়েরি রাখা। নয়না কাঁপা কাঁপা হাতে ওড়নাটা হাতে নিল। এটা নয়নার ওড়না! কিন্তু এখানে কী করে আসল?
এটা তো ক্লাস এইটে থাকতে স্কুল থেকে ফেরার পথে হারিয়ে গিয়েছিল! নয়না ওড়নাটার দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। এরপর ডায়েরি দুটো বের করে এনে লকার বন্ধ করে দিল। একটা ডায়েরির উপরে লেখা ‘ক্রাইম হিস্টোরি’, অন্য ডায়েরির উপরে লেখা ‘শুধু তোমারই জন্য’।
নয়না প্রথমে ‘ক্রাইম হিস্টোরি’ ডায়েরিটা ওপেন করল। কিছু মানুষের নাম সাথে কিছু কোড দেওয়া, কেস নং লেখা। নয়না ডায়েরি উল্টেপাল্টে দেখেও কিছুই বুঝতে পারল না।
এরপর দ্বিতীয় ডায়েরিটা খুলল। প্রথম পাতায় লেখা: “সুনয়না, আজকের আগে এই জাহিন চৌধুরী কারো জন্য থমকে দাঁড়ায়নি। জানো, তুমি তোমার নামের মতোই সুন্দর।” ডেটটা দেখে নয়না অবাক হয়ে গেল! এটা কবেকার? কিছুক্ষণ ভাবার পর মনে পড়ল—এটা তো বসুন্ধরা শপিং মলে যেদিন প্রথমবার জিয়ানের সাথে ধাক্কা লেগেছিল, সেই দিনের। তার মানে ওটা জাহিন ছিল!
নয়না পরের পৃষ্ঠা উল্টাল। “তুমি এত পিচ্চি কেন সুনয়না? তোমাকে নিজের করে পেতে অনেকগুলো বছর অপেক্ষা করতে হবে। তোমাকে ভালোবাসি কবে বলব? সুনয়না, তুমি দ্রুত বড় হয়ে যাও।”
নয়না ডায়েরি বন্ধ করে রাখল; আর পড়ার সাহস হচ্ছে না তার। কিছুক্ষণ পর আবার কিছু পাতা না উল্টে মাঝখান থেকে খুলল।
“যাকে নিয়ে আমার কল্পনার সংসার সাজানো, যার সাথে কল্পনায় কতগুলো বছর ধরে সংসার করে আসছি, কত কত রঙিন স্বপ্ন দেখেছি—সেই মেয়েটিকে কী করে নিজের ভাবি হিসেবে মেনে নেব? নিয়তি আমার প্রতি এত নিষ্ঠুর হলো? সুনয়না, তুমি আমাকে কেন ঠকালে? আমি কি তোমাকে কম ভালোবেসেছিলাম? এত ভালোবাসার মূল্য এভাবে দিলে? আমার এখন ইচ্ছে করছে নিজেকে শেষ করে দিতে। সব সময় রেজা কেন জিতে যায়? বাবার ভালোবাসা, পড়ালেখা—সব দিক থেকে রেজা এগিয়ে। আর আমি চিরকাল লুজার!”
নয়না ডায়েরিটা টেবিলের ড্রয়ারে রেখে দেওয়ার জন্য ড্রয়ার খুলল। তারপর কী মনে করে আরও কয়েকটা পৃষ্ঠা উল্টাল। “সুনয়না, তুমি কি জানো আমি আমাদের সন্তানের নাম ঠিক করে রেখেছি? ছেলে হলে নাম হবে জারিফ, মেয়ে হলে নাম হবে সুনেহরা। উফ সুনয়না, কবে তুমি বড় হবে, কবে আমার স্বপ্নগুলো সত্যি হবে!”
সুনয়না ডায়েরির শেষ পাতা উল্টাল। “অবশেষে সব শেষ। আমি নিজের হাতে নিজের জীবনটা ধ্বংস করে দিলাম। আমি শুধু ভালোবেসেছিলাম, শুধু ভালোবাসা চেয়েছিলাম। কিন্তু আমি কী করে এত জঘন্য কাজগুলো করলাম! আমি এত নিকৃষ্ট একজন মানুষে পরিণত হয়েছি যে রাস্তার কুকুরকে দেখতে পছন্দ করবে সবাই, তবুও আমাকে দেখতে চাইবে না। রেজার চেয়ে বড় হওয়ার লোভ আমাকে পশু বানিয়ে দিয়েছে।”
এরপরের পৃষ্ঠায় লেখা: আমি তোমাকে অন্য কারো হতে দেখেছি। তাই আমি জানি, ভালোবাসার মানুষকে অন্যের হতে দেখাটা মৃত্যুর যন্ত্রণার চেয়ে কম নয়। আমি সেই ভিলেন, যে তোমার ভালোবাসায় সর্বহারা হয়েছি। আমার কি দোষ, বলো? আমি তো শুধু তোমাকেই ভালোবেসেছিলাম। তোমার সঙ্গে সুন্দর একটা ভবিষ্যৎ কল্পনা করেছিলাম—যে কল্পরাজ্যের রাজা আমি, আর তুমি হলে রাজরানী। অথচ তুমি এখন অন্য কারো গল্পের রাজরানী, আর আমি সেই রাজ্যের রাজদ্রোহী।
তুমি আমায় কেন ভালোবাসলে না? তুমি যদি আমায় একটু ভালোবাসতে, আমি পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ হতাম। এভাবে মানুষের ঘৃণা নিয়ে বেঁচে থাকতে হতো না। আমার সুন্দর, গোছানো একটা জীবন হতো। ভালোবেসে ভালো থাকা যায় না—আমি শত চেষ্টা করেও তোমাকে ভালোবাসা ছাড়তে পারিনি। আমি জানি, তোমাকে ভালোবাসা পাপ, কারণ তুমি আমার নিজের ভাইয়ের ঘরনি। অথচ অবাধ্য মনটা বারবার তোমাকেই ভালোবাসতে চায়।
আমি কী করব, বলতে পারো? আমি যে নিরুপায়। তোমাকে ভালোবাসা বাদ দিয়ে আমাকে বেঁচে থাকার উপায় কোথায় পাব, বলো তো? মানুষ কী করে ভালোবাসার মানুষকে ভুলে যায়? আমি যে শেষ হয়ে যাচ্ছি তোমার ভালোবাসার দহনে।
“ভালোবাসলে কি সত্যিই মানুষ নিঃস্ব হয়? বলো? সুনয়না তালুকদার, তোমার ভালোবাসা আমাকে শুধু নিঃস্বই করেনি; নিঃশব্দে আমার সমস্ত স্বপ্ন, আমার পুরো জীবনটাই ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। আমি তো শুধু তোমাকেই ভালোবেসেছিলাম—নিঃস্বার্থ, নির্ভেজাল ভালোবাসা। তবুও দেখো, সেই ভালোবাসাই আজ আমার সবচেয়ে বড় অপরাধ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তোমাকে ভালোবাসার অপরাধে আজ আমি সর্বহারা, একেবারে শূন্য। বাবার অবহেলা আর তোমাকে ভালোবাসা—এই দুটো ভুল আমার ফুলের মতো জীবনটাকে নর্দমা বানিয়ে দিয়েছে।”
শেষে ইংরেজিতে লেখা: “Jahin Chowdhury’s life ends here.”
🌿
জাহিনের লাশ চৌধুরী বাড়িতে পৌঁছাল রাত তিনটে বাজে। নয়না নীরবে কান্না করছে। ডায়েরির লেখাগুলো পড়ার পর থেকে মনে হচ্ছে, তুষি যদি এমনটা না করত, তাহলে জাহিনের জীবনের গল্পটা ভিন্ন হতো। একটা সামান্য ভুল, অথচ তার মাশুল কতগুলো মানুষের সুখ কেড়ে নিয়েছে। তুষিও এই ভুলের জন্য জীবন হারাল।
এলাকার মাইকে ঘোষণা হলো না। একজন মানুষের মৃত্যু ঘোষণা কয়বার হবে? নাজিম চৌধুরী নিজেই নিষেধ করেছেন ঘোষণা করতে। নীরবে চলছে জাহিনের শেষ বিদায়ের কাজ। নাজিম চৌধুরী জাহিনের দিকে তাকাতে পারছেন না। তার এত সুন্দর ছেলেটা, অথচ আজ তার দিকে তাকানো যাচ্ছে না। মমতা চৌধুরী কাঁদতে কাঁদতে বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন। তালুকদার বাড়ির সবাই এসেছে।
মেহনুর এখন আর কান্না করছে না; চুপচাপ দেখে চলেছে সবকিছু। মেহনুর শুধু একবার জাহিনের খাটিয়ার সামনে গিয়ে খাটিয়া ধরে বলেছে, “তুমি কেন আবার ফিরলে? আমাকে কতবার পোড়ালে বলো? তোমার সাথে সাথে আমাকে কেন মেরে ফেললে না? না, আমি এখন বাঁচতে চাই। আমার ছেলে জারিফের জন্য বাঁচতে চাই।”
মেহনুর তো জানে না, জাহিন নিজেই এই নাম ঠিক করে রেখেছিল তার ভবিষ্যৎ ছেলের জন্য। সেখানে গল্পটা ভিন্ন ছিল।
ফজরের আজানের আগেই জাহিনকে কবরস্থ করে সবাই মসজিদে এসেছে নামাজ পড়তে। হয়তো এই মৃত্যু শোক সবার সয়ে যাবে, কিন্তু অন্তর সারাজীবন নিজেকে কী করে ক্ষমা করবে? এক সময় জাহিন অন্তরকে ছাড়া একটা চকোলেটও খেত না, আর সেই বন্ধুর মৃত্যুর কারণ সে নিজেই। যেভাবেই হোক, সে তো দায়ী; কী করে এই বোঝা বয়ে বেড়াবে বাকিটা জীবন!
চলবে
বিঃদ্র অর্ধাঙ্গিনী বইটি পেয়ে যাবেন রকমারি সহ আপনার পছন্দের যেকোনো বুকশপে।
Share On:
TAGS: অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২, নুসাইবা ইভানা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব পর্ব ৩৬( সম্পূর্ণ)
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ৩২
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ৩০
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ৪৩
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ২৮
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ৯
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ৬
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ৩১
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ১৩
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ৪৫