Golpo romantic golpo অবাধ্য হৃৎস্পন্দন

অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৬২


অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৬২

সোফিয়া_সাফা

সতর্কবার্তা: এই পর্বে তীব্র মানসিক ও শারীরিক ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং কিছু সংবেদনশীল ও বোল্ড শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। এখানে ‘ফুল’ চরিত্রের সকল কার্যকলাপ পরিস্থিতি সাপেক্ষে বিবেচনা করার পরামর্শ রইল।
,
,
,
ডাক্তার ফুলের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে বসে আছেন। তিনি বুঝতেই পারছেন না উদ্যান ফুলকে এভাবে কেন মে’রেছে আর যখন মে’রেইছে তখন আবার তাকে কেন ডেকে এনেছে?

“আপনি কোন ভাবনায় ডুবে আছেন বলবেন? আপনি কি চাইছেন আমি অন্য কাউকে ডেকে নিই?” উদ্যানের শীতল কণ্ঠে ডাক্তার সংবিৎ ফিরে পেলেন।
​তিনি আতঙ্ক চেপে রেখে বললেন, “না মাস্টার, আসলে ওনার জামার হাতাগুলো লম্বা হওয়ার কারণে ক্ষতস্থানে মেডিসিন লাগানো যাচ্ছে না। আপনি যদি মেইডদের ডেকে ওনাকে স্লিভলেস কিছু পরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করতেন, তবে চিকিৎসা করতে সুবিধা হতো।”

উদ্যান ধপ করে খাটের একপাশে বসে পড়ল। নিস্পৃহ গলায় বলল, “মেডিসিন রেখে বের হোন, লাগানোর ব্যবস্থা আমিই করছি।”

“ঠিক আছে মাস্টার। তবে ওনার জ্ঞান খুব শিগগির ফিরবে বলে মনে হয় না। অতিরিক্ত শক আর পেইন মিলেমিশে ওনার ব্রেইন সেইফ মোডে চলে গেছে। পেইন কিলার কীভাবে খাওয়াবো?”

“তো? ইঞ্জেকশন নেই আপনার কাছে?” উদ্যানের ভ্রু কুঁচকে গেল।

“আছে মাস্টার, কিন্তু ইঞ্জেকশন দিলে জ্ঞান ফিরতে আরও সময় লাগবে।”

উদ্যান দুই আঙুলে নিজের কপাল ঘষতে ঘষতে বলল, “সমস্যা নেই। ওটা দিয়েই বিদায় হোন আপনি।”

ডাক্তার দ্রুত হাতে ব্যাথানাশক ইনজেকশন দিয়ে এবং কিছু প্রয়োজনীয় ঔষধ টেবিলের ওপর রেখে চলে গেলেন।

উদ্যান কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থেকে ফুলের ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকাল। মেয়েটার ঠোঁটের কোণে রক্ত জমাট বেঁধে আছে। বাঁ গালটা কালচে নীল হয়ে উঠেছে, স্পষ্ট আঙুলের ছাপ পড়ে আছে সেখানে।
উদ্যান আনমনেই নিজের হাতের দিকে তাকাল। সে কখন থাপ্পড় মেরেছে মনে করতে কষ্ট হলো। যখন মনে পড়ল তখন প্রায় নিঃশব্দে বলল, “তোর বোঝা উচিত ছিল আমি আগের ফর্মে ফিরে গেছি। যতটা সম্ভব চুপ থাকা উচিত ছিল কিন্তু তুই তো আমার ভালোমানুষির রূপটাতে একটু বেশিই অভ্যস্ত হয়ে গেছিস।”

উদ্যান হাত মুঠ করে নিল। ফুলের দিকে এগিয়ে বসে তার জামার হাতা চিরে ফেলল। তাকাল একবার ক্ষত-বিক্ষত হাত জোড়ার দিকে। পরক্ষনেই দৃষ্টি সরিয়ে অন্ধের মতো হাতদুটোয় মেডিসিন লাগিয়ে দিয়ে রুম ত্যাগ করলো।

বেশ কয়েকদিন পর!

“সায়মন রে কিছু কর।”

উদ্যান সামনে বসে থাকা সাইকিয়াট্রিস্টের উদ্দেশ্যে কথাখানা বলল। মিস্টার সায়মন হোসেন, বয়স একত্রিশ। এতো অল্প বয়সেই সে দেশের অন্যতম সাইকিয়াট্রিস্টের খেতাব অর্জন করেছিল। কিন্তু কে জানতো এই সফলতাই তার জীবনের কাল হয়ে দাঁড়াবে!

সায়মন শুকনো ঢোক গিলে বলল, “মাস্টার, আপনার কাজ তো শেষ হয়ে গেছে। মেয়েটার জীবন আপনি সাকসেসফুলি হেল করে দিয়েছেন। এবার দয়া করে ওনাকে ফেলে রেখে মেক্সিকো ফিরে যান।”

উদ্যান বিরক্ত হয়ে পেছনে হেলে পড়ল। সায়মন শুকনো ঢোক গিলে মনে মনে দোয়া দুরুদ পড়তে লাগল। তার এখনো বিয়ে হয়নি, অথচ এই সাইকোপ্যাথের পাল্লায় পড়ে এখন জীবন নিয়েই টানাটানি। সে জানে এই অন্ধকার বাংকারে দিন কাটানোর জন্য প্রচুর মানসিক শক্তির দরকার, সেই শক্তি আছে বলেই সে এখনো জীবিত আছে।

“আমার ওর কাছে যেতে ইচ্ছে করছে। কেন এমন হচ্ছে?” উদ্যান শান্ত গলায় বলল।

সায়মন থতমত খেয়ে গেল। এটা তার প্ল্যানের বাইরে ছিল। উদ্যান যদি কোনোভাবে দুর্বলতা অনুভব করে সবার প্রথমে এসে তাকে মা’রবে।

“চিন্তা করবেন না মাস্টার, এটা জাস্ট ফিজিক্যাল অ্যাট্রাকশন। সেই জন্যই আমি আপনাকে বলেছিলাম ওনার সাথে রাত কাটানোর আগে আরও কয়েকজনের সাথে কাটাতে। কিন্তু আপনি তো…”

“তুই কি কোনো ভাবে আমাকে দোষ দিচ্ছিস? আমার কাউকে পছন্দ হচ্ছিলো না সেটা কি আমার দোষ?” উদ্যানের কণ্ঠস্বর খাদে নামল।

সায়মন মনে মনে ভাবল, ‘অবশ্যই আপনারই তো দোষ।’ কিন্তু মুখে বলল, “না মাস্টার, আপনার কোনো দোষ নেই। একদম চিন্তা করবেন না আপনি। শুধু আমি যা বলবো তা এবার একটু শুনবেন, ঠিক আছে?”

“হু, বল শুনি।”

“আপনি ওনাকে রেখে চলে যান। ওনার দিকে আর একবারও তাকাবেন না প্লিজ। প্রয়োজনে পছন্দ না হলেও অন্য মেয়েদের সাথে রাত কাটান। তবুও দয়া করে ওনার কাছে যাবেন না।”

কথাটা উদ্যানের মনে ধরল না। সে ঘাড় কাত করে বলল, “বাট আই নিড হার। আই থিংক আর কয়েকবার গেলে কিছুই হবেনা।”

সায়মন গভীর চিন্তায় পড়ে গেল। সে ইনিয়ে-বিনিয়ে বলল, “মাস্টার আমি তো যেতে নিষেধই করবো। কারণ আপনি যা করতে চেয়েছিলেন তা করে ফেলেছেন। আমি চাইবো না আপনি কোনোভাবে মেয়েটার প্রতি উইক হয়ে পড়েন।”

উদ্যান থমকে গেল, “উইক হয়ে পড়বো?”

“হ্যাঁ মাস্টার, আপনিও নিশ্চয়ই সেটা চাইবেন না?”

উদ্যানের মনটা একটু খারাপ হয়ে গেল। তাকে অন্যমনস্ক হয়ে পড়তে দেখে সায়মন প্রশ্ন করল, “আপনি কবে ফিরে যাবেন মাস্টার?”

উদ্যান উঠে দাঁড়াল, “ডিসাইড করিনি এখনো।”

বলেই উদ্যান গটগট পায়ে বেরিয়ে গেল। সায়মন তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

বাংকার থেকে বেরিয়ে উদ্যান সরাসরি ডাইনিং টেবিলে এসে বসল। বাকিরা আগে থেকেই তার জন্য অপেক্ষা করছিল। সে বসতেই সবাই এক ধরণের যান্ত্রিক নীরবতায় খাওয়া শুরু করল। ফুল সবাইকে খাবার বেড়ে দিয়ে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াতেই উদ্যানের গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, “যতক্ষণ আমি খাবার খাবো, ততক্ষণ তুই এখানেই দাঁড়িয়ে থাকবি।”

ফুল বিনাবাক্যে পাশে এসে দাঁড়াল। উদ্যান একবার আঁড়চোখে তাকাল তার দিকে। দেখল, ফুলের চেহারায় কোনো অভিব্যক্তি নেই। ইদানীং তার চেহারাটা দেখলেই বোঝা যায় সে কতটা কষ্টে আছে। যেন কষ্টের ছাপ পড়ে গেছে চেহারাতেও।

উদ্যান মাত্র কয়েক লোকমা মুখে দিয়ে বাকি খাবারটুকু পাতে ফেলে রেখেই উঠে চলে গেল। লুহান আর মেলোও নিজেদের মতো খেয়েদেয়ে ডাইনিং হল ত্যাগ করল। সোহম খাওয়া শেষে দুজন মেইডকে ডেকে বলল, “বাকি কাজগুলো তোমরা শেষ করো। আর হেল্পফুল তুমি নিজের রুমে যাও।”

ফুল আলতো করে মাথা নেড়ে বিদ্রুপের সুরে বলল, “ধন্যবাদ সোহম স্যার কিন্তু আমি করে নিতে পারবো সব। আমি চাইনা মাস্টারের কথার অবাধ্য হতে।”

বলেই সে নিপুণ হাতে টেবিলের এঁটো প্লেটগুলো একত্র করে কিচেনের দিকে পা বাড়াল। ফুলের ছায়া মিলিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সোহমও নিজের রুমে চলে গেল।

কিছুক্ষণ পর উদ্যান নিচে নেমে ভারী কদমে অগ্রসর হলো কিচেনের দিকে। তার কিছু অরেঞ্জ জুস এবং আইস কিউব প্রয়োজন। যদিও সার্ভেন্টদের কাউকে বললেই পেয়ে যেতো সে। তবুও নির্দিষ্ট কাউকে এক নজর দেখার আশায় সে নিজেই চলে এসেছে।
অবশ্য উদ্যান মানেনা যে সে কাউকে দেখতে এসেছে, “জাস্ট ওয়াকিং করা হয়ে যাবে তাই এসেছে, নাথিং এলস।”

কিচেনের দরজার সামনে আসতেই উদ্যানের পা থেমে গেল। বেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে থালাবাসন ধুচ্ছে ফুল। ধোঁয়া শেষে ওড়নায় হাত মুছে পাশে রাখা প্লেটটা হাতে নিয়ে মেঝেতে বসে পড়ল সে। উদ্যান শুধু স্থির চোখে তাকিয়ে রইল তার দিকে। মেয়েটাকে ভ্রুক্ষেপহীন ভাবে এঁটো খাবার খেতে দেখে স্তব্ধ হয়ে গেল সে। মেয়েটা কি স্টকহোম সিনড্রোমে ভুগছে? উদ্যানের উচ্ছিষ্ট কেন খাচ্ছে?

উদ্যানের মাথায় আচমকাই রক্ত চড়ে গেল। হঠাৎ তার মনে হলো সে যেন ফুলের জায়গায় নিজেকেই দেখতে পাচ্ছে। পরপরই দ্রুত পায়ে হেঁটে গিয়ে প্লেট টা কেড়ে নিয়ে ছুড়ে ফেলে দিল উদ্যান। ফুলের গাল চেপে ধরে তাকে টেনে দাঁড় করিয়ে কিড়মিড়িয়ে বলল, “এই হারামজাদি, সোলার এস্টেটে কি দুর্ভিক্ষ চলছে? উচ্ছিষ্ট কেন খাচ্ছিস?”

ফুল কোনো উত্তর দিল না। এমনকি উদ্যানের দিকে তাকালোও না পর্যন্ত। উত্তর না পেয়ে আরও ক্ষুব্ধ হলো উদ্যান। তাকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরে গর্জে উঠল, “এন্সার মি, ড্যাম ইট।”

ফুল এবার ঠোঁট নাড়ল, “খাবার গুলো ফেলে দেবো তাই ভাবলাম খেয়ে ফেলি।”

“মিথ্যা বলছিস কেন? বাকিদের টা তো ফেলেই দিয়েছিস। শুধু আমার টাই কেন?”

ফুলের কণ্ঠস্বর বুজে এল, সে ফিসফিস করে বলল, “আমি নিজেও জানি না… আমার জাস্ট খেতে ইচ্ছে করল, তাই…”

উদ্যান এক ঝটকায় তাকে ছেড়ে দিয়ে দূরে সরে দাঁড়াল। আচ্ছা, সে কেন রিয়্যাক্ট করছে? এই মেয়ে যা ইচ্ছে করুক গিয়ে, তাতে তার কী? উদ্যান রাগে ফোঁস ফোঁস করতে করতে ফ্রিজ খুলে অরেঞ্জ জুস আর আইস কিউব বের করল। তারপর সজোরে একটা লাথি মেরে ফ্রিজের দরজাটা লাগিয়ে দিয়ে হনহনিয়ে বেরিয়ে গেল।

ফুলের শরীরটা আতঙ্কে একবার কেঁপে উঠল। সে কিছুক্ষণ নিথর দাঁড়িয়ে থেকে ভাঙা কাঁচের টুকরোগুলো পরিষ্কার করল। তারপর ধীর পায়ে নিজের রুমের দিকে এগিয়ে গেল।

এখন মাঝরাত, হঠাৎ ফুলের তন্দ্রা ভেঙে গেল এক শ্বাসরুদ্ধকর অনুভুতিতে। তার মনে হলো, কোনো এক বিশাল পাথরের ভারে তার শরীরটা পিষে যাচ্ছে, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে তার। সে চোখ মেলল। ডিম লাইটের হালকা আলোয় এক দীর্ঘকায় পুরুষের অবয়ব দেখে সে আতঙ্কে চিৎকার করতে চাইল, কিন্তু মুহূর্তেই এক জোড়া শক্ত হাত তার মুখ চেপে ধরল।

“আমি তেহজিব, ভয় পাস না।”

কণ্ঠস্বরটি চেনা, কিন্তু তাতে আজ এক ধরণের অস্বাভাবিক জড়তা। ফুল স্তব্ধ হয়ে গেল। উদ্যান কেন এই অসময়ে তার ঘরে এসেছে? সে নিজেকে ছাড়ানোর জন্য ছটফট করতেই উদ্যান হাত সরিয়ে নিল।

“ক… কেন এসেছেন?”

উদ্যান নিজের শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে ঘোরলাগা কণ্ঠে বলল, “তোর সাথে রাত কাটাতে। আই ব্যাডলি ওয়ান্ট টু ফা`ক ইউ।”

ফুলের মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠল। উদ্যানের শরীর থেকে অ্যালকোহলের উটকো গন্ধ আসছে। সে শিউরে উঠে বলল, “আপনি নেশা করেছেন, তাই না?”

“করেছি বাট ডোন্ট ওয়ারি।”

ফুলের গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। রুদ্ধ স্বরে বলল, “আপনি আমাকে ভালোবাসেন না। তাই আমি চাইনা আপনি আমাকে টাচ করুন।”

“তোর চাওয়ার পরোয়া এখন করবো না আমি। কেননা আমি জানি তুই আমাকে ভালোবাসিস। এতে কোনো সন্দেহ নেই। ভালো বেসেই নিজেকে আমার হাতে তুলে দিয়েছিস। তাই আমি যা খুশি করতে পারি তোর সাথে, তোর করার কিছুই থাকবে না।”

ফুল কিছু বলার জন্য মুখ খুলতেই উদ্যান তাকে টেনে বসিয়ে তার ঠোঁট আঁকড়ে ধরল। কিছুক্ষণ চুমু খাওয়ার পর উদ্যান ফুলের ঘাড়ে মুখ ডোবাল। জামার নিচ দিয়ে চেপে ধরল তার মসৃণ কোমর। তার বলিষ্ঠ হাতের জোরালো চাপে ফুল ব্যাথায় ককিয়ে উঠল। উদ্যান তার চুলের ভাঁজে হাত গলিয়ে দিয়ে জামাটা একটানে ছিঁড়ে ফেলল। তারপর সেটা খুলে একদিকে ছুড়ে মারতেই ফুল দুহাতে নিজেকে ঢাকার আপ্রাণ চেষ্টা চালাতে লাগল। উদ্যান বিরক্ত হয়ে তাকে চেপে ধরল খাটের সাথে। হাতদুটো মাথার ওপরে নিয়ে পাশে থাকা ওড়নাটা দিয়ে শক্ত করে বেঁধে দিল।

তারপর পায়ের কাছে থাকা কমফোর্টারটা মুড়ো দিয়ে শুয়ে পড়ল ফুলের ওপর। আজ রাতে ফুলের আবারও মনে হলো ঘড়ির কাটা থেমে গিয়েছে। রাতটা অকারণেই দীর্ঘ হচ্ছে। আর বুঝি এই পৃথিবীতে ভোরের আলো ফুটবে না।

পরদিন দুপুর একটা।
​পুরো ঘর নিস্তব্ধ। উদ্যান যন্ত্রের মতো ফুলকে গোসল করিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিল। ফুলের মাঝে জ্ঞান আছে কিন্তু কিছু বলার বা করার মতো শক্তি নেই। ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পূর্বে উদ্যান ফুলের বিবর্ণ ঠোঁটে এক দীর্ঘ ও দহনকারী চুম্বন আঁকল।

​যাওয়ার সময় গম্ভীর গলায় শুধু বলে গেল, “ডাক্তার আসবে। মেডিসিন গুলো ঠিকমতো খেয়ে নিস।”

ফুল দুচোখের পাতা এক করেছে সবেমাত্র তখনই ডাক্তার এলো। সঙ্গে একজন মেইড এলো খাবার নিয়ে। ফুল আজ আর কোনো প্রশ্ন করল না। ডাক্তারের দেওয়া ঔষধ গুলো বিনাবাক্যে গিলে নিল।

“মিস্ট্রেসা…” ডাক্তার কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু ফুল তাকে মাঝপথেই থামিয়ে দিল। “আমি এখন আর মিস্ট্রেসা নই, ফুল বলে ডাকলেই খুশি হবো।”

ডাক্তার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “বলছিলাম কী, দুবার ইমার্জেন্সি পিল খেয়ে নিয়েছেন, ঠিক আছে। কিন্তু রেগুলার এই পিল নেওয়া আপনার জন্য ক্ষতিকর হবে। মাস্টারকে তো আমি প্রোটেকশন ইউজ করতে বলতে পারব না। আপনি চাইলে আমি রেগুলার পিল রেখে যাবো?”

ফুল মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে অত্যন্ত শক্ত গলায় বলল, “কোনো প্রয়োজন নেই।”

কয়েকদিন পর।
​সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। ফুল সবার জন্য চা আর নাস্তা সাজিয়ে ড্রয়িং রুমের টেবিলের ওপর রাখল। সোজা হয়ে মুখ তুলতেই তার শরীরটা যেন পাথর হয়ে গেল। উদ্যানের ঠিক পাশে সোফায় বসে আছে এক অপরিচিত মেয়ে। মেয়েটিকে দেখামাত্রই ফুলের মনে হলো সে কোনো আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, অথচ অবয়বটা তার নিজের নয়।

সোহম আর লুহানও একবার ফুলের দিকে আর একবার মেয়েটার দিকে পালাক্রমে তাকাচ্ছে। উদ্যান খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে এক কাপ চা মেয়েটার হাতে ধরিয়ে দিল। তারপর মৃদু গলা খাঁকারি দিয়ে ফুলের দিকে তাকিয়ে বলল, “কী হলো, ওভাবে ওর দিকে তাকিয়ে আছিস কেন?”

ফুল কিছু বলতে যাবে তার আগেই মেয়েটা উঠে এসে ওর সামনে দাঁড়াল। কয়েকবার পলক ঝাপটে বলল, “ওয়েট, তুমি তো অনেকটা আমার মতো দেখতে। হাউ স্ট্রেঞ্জ!”

ফুলের বিস্ময় এবার ক্রোধে রূপ নিল। সে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “শুনুন আমি আপনার মতো নই, উল্টো আপনি অনেকটা আমার মতো দেখতে। কে আপনি হুম? কোত্থেকে এসেছেন?”

তখনই উদ্যান মেয়েটার পাশে এসে দাঁড়াল। শুধু দাঁড়ালই না একেবারে মেয়েটার কাঁধে হাত রেখে তাকে নিজের দিকে টেনে নিয়ে বলল, “ওর নাম ফ্লোরা, মেক্সিকো থেকে এসেছে।”

ফুলের কপালে ভাঁজ পড়ল। মনে পড়ে গেল রিহান ওকে ফ্লোরিতা বলে ডেকেছিল। বলেছিল এর মানেও ফুল। সে খুব সূক্ষ্মভাবে ফ্লোরাকে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল। মেয়েটার চুলে ‘ব্যাংস’ কাট, যা অনেকটা উদ্যানের হেয়ারস্টাইলের মতোই। গায়ের রং ফুলের চেয়ে সামান্য চাপা হলেও চোখ দুটো বেশ টানা টানা। উচ্চতায় সে ফুলের চেয়ে কিছুটা লম্বা। সবচেয়ে বেশি মিল আছে ঠোঁটে থাকা তিল আর চুলের সাথে। যদিও ফ্লোরার চুল তামাটে বর্ণের এবং তা পোনিটেল করে বাঁধা।

ফুল দাঁতে দাঁত চেপে নিচু স্বরে বলল, “নামটাও দেখছি আমার মতো, আর এই যে আপনি ওভাবে চিপকে দাঁড়ানোর কী আছে?”

উদ্যান ভ্রুকুটি করে বলল, “আমি তোর মাস্টার হই। এই যে আপনি কী হ্যাঁ?”

ফুল এক পা এগিয়ে গিয়ে জেদি গলায় বলল, “একটু সরে দাঁড়ান ওনার থেকে। দেখতে ভালো লাগছে না।”

উদ্যান শুনল না বরং আরও নিজের দিকে টেনে নিল ফ্লোরাকে। ফুলের মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল সঙ্গে সঙ্গেই। উদ্যান বাকিদের দিকে তাকিয়ে ঘোষণা করল, “লিসেন, মিট হার ও আমার গার্লফ্রেন্ড।”

লুহান অবাক হলো, “গার্ল…”

সোহমও একই ভঙ্গিতে বলল, “ফ্রেন্ড?”

উদ্যান অবিচল কণ্ঠে বলল, “ইয়েস, কয়েকদিন পর আমরা মেক্সিকো ফিরে যাচ্ছি।” তারপর ফুলের দিকে তাকাল, “যাওয়ার আগে তোকে ডিভোর্স দিয়ে যাবো। তারপর মেক্সিকো গিয়ে ওকে বিয়ে করবো।”

কথাটা শুনে ফুলের পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেল যেন। কান্না গুলো দলা পাকিয়ে গেল গলায়।
“আপনি… ইয়ার্কি করছেন, তাই না?”

উদ্যান তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, “একদমই না।”

অতঃপর ফ্লোরার হাত ধরে সিঁড়ি বেয়ে ওপর তলায় উঠে গেল উদ্যান। তার পিছু পিছু বাকিরাও এলো। ফুল যেই রুমে থাকতো সেই রুমটা ফ্লোরাকে দেখিয়ে দিয়ে উদ্যান বলল, “যেই কদিন বাংলাদেশে থাকবো সেই কদিন তুমি এই রুমেই থাকবে।”

ফ্লোরা হঠাত উদ্যানের বাহু জড়িয়ে ধরে আহ্লাদী সুরে বলল, “বাট তেহজিব, আমি তো তোমার সাথেই এক রুমে থাকতে চাই।”

উদ্যান একবার আড়চোখে ফুলের দিকে তাকাল। দেখল, মেয়েটি টলটলে চোখে তাদের দিকেই তাকিয়ে আছে। উদ্যান ফ্লোরার গালে হাত রেখে ফিসফিস করে বলল, “তোমার যখন মন চাইবে আমার কাছে চলে আসবে। নামের আলাদা রুমে থাকবো আমরা বুঝলে?”

ফ্লোরা সম্মতিতে মাথা নেড়ে উদ্যানের দিকে একটা ‘ফ্লাইং কিস’ ছুড়ে দিয়ে রুমে ঢুকে পড়ল। উদ্যান চোখের ইশারায় সোহম আর লুহানকেও নিজেদের কাজে যেতে বলল। তারা দুজন চলে যেতেই উদ্যান দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতে যাবে তখনই ফুল ভাঙা গলায় বলল, “আর কতো ভাবে টর্চার করবেন আমায়?”

উদ্যান ভ্রু কুচকে তাকাতেই তার সামনে হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে পড়ল ফুল। বলল, “দয়া করুন, আমি আপনাকে অন্য কারো সাথে সহ্য করতে পারবো না। ওনাকে চলে যেতে বলুন।”

উদ্যান ফুলের কথায় পাত্তা না দিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল। ফুল দরজার পাল্লা ধরে চিৎকার করে বলল, “শুনে রাখুন, আপনি যদি ওই মেয়ের কাছাকাছি যান, তবে আমি এই বাড়িতে আগুন জ্বালিয়ে দেব!”

উদ্যান ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ঘড়িটা খুলল। আয়নায় ভেসে ওঠা ফুলের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়ে নির্লিপ্ত সুরে বলল, “লাভ হবে না। এস্টেটে ফায়ার স্প্রিংকলার সিস্টেম আছে। আগুন ছড়িয়ে পড়ার আগেই নিভে যাবে। স্রেফ পানি অপচয় হবে আর কিছু নয়।”

উদ্যানের এই যুক্তিতে ফুল হিতাহিতজ্ঞান হারিয়ে ফেলল। সে অনুমতি ছাড়াই ঝড়ের বেগে রুমে ঢুকে পড়ল। উদ্যান ব্যাপারটা ইগ্নোর করে নিজের গায়ের ব্লেজারটা খুলে হ্যাঙ্গারে রাখল।

“আমি ওই মেয়েটাকে মে’রে ফেলবো তাহলে।”

উদ্যান অলস ভঙ্গিতে বলল, “তুই ওর সাথে পারবি না। উল্টো ও তোর হাত-পাই ভেঙে ফেলবে।”

ফুল হঠাৎ তেড়ে এসে উদ্যানের সামনে দাঁড়াল। তার লাল লাল চোখজোড়া নজরে আসতেই উদ্যানের চাউনি স্থির হলো।

“অন্য কারো কাছে যাওয়ার আগে আমাকে মে’রে ফেলুন তবে।”

উদ্যান দুই পকেটে হাত গুঁজে তার খুব কাছে ঝুঁকে এল। “বাবা জীবিত আছেন তাই আমি তোকে মা’রতে পারবো না। বাট তুই চাইলে সুই’সা’ইড করতে পারিস।”

কথাটা শোনার সাথে সাথে ফুলের মনে হলো তার হৃদপিণ্ডে কেউ তপ্ত লাভা ঢেলে দিয়েছে। তার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল। সে কাঁপা গলায় বলল, “আমি ম’রে গেলেও এখন আর আপনার কিছুই যাবে আসবে না?”

উদ্যান চিবুক উঁচিয়ে বলল, “একদম না, আমি তো ইতোমধ্যেই তোকে ডিভোর্স দেওয়ার কথা ভেবে ফেলেছি। এমনিতেও তোর কাছে গেলে তুই যা নাটক করিস। সেই জন্যই তো ফ্লোরাকে অনেক যাচাই-বাছাই করে এনেছি। কয়েকদিন দেখবো ও কেমন পারফর্ম করে। দেন তোকে ডিভোর্স দিয়ে ওকে বিয়ে করবো।”

ফুল এবার কান্নায় ভেঙে পড়ল, “না! না, এমন করবেন না প্লিজ। আপনি যা বলবেন আমি তাই করবো।”

“সেটাই তো, ওকে কিছুই বলে দিতে হবেনা। ও নিজ ইচ্ছেতেই আমার কাছে আসবে।”

ফুল চোখের পানি মুছে নিয়ে মাথা তুলল। “আমিও… আমিও নিজ ইচ্ছেতেই আসবো।”

উদ্যানের চাউনি এবার নিগুঢ় হলো। সে ফুলের আপাদমস্তক একবার খুঁটিয়ে দেখে বিড়বিড়িয়ে বলল, “রিয়েলি? তুই নিজের ইচ্ছায় আসবি?”

ফুল মেঝেতে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়ল। উদ্যান বিড়বিড়িয়ে বলল, “ঠিক আছে, দেখা যাক। অ্যাকচুয়ালি, এই ব্যাপারে জোরাজুরি করতে আমার ভালো লাগেনা।”

ফুল প্রায় ফিসফিসিয়ে মৃদু গলায় বলল, “হুম, জোর করতে ভালো লাগেনা কিন্তু বাধ্য করতে খুব ভালো লাগে।”

কথাটা উদ্যানের গায়ে লাগল, “বাধ্য? আমি তোকে বাধ্য করছি?”

ফুল দ্রুত মাথা নাড়ল। “না না… আমি নিজের ইচ্ছেতেই আসব।” সে দরজার দিকে পা বাড়াতেই উদ্যান পেছন থেকে জিজ্ঞেস করল, “কখন আসবি?”

​ফুল একবার উদ্যানের দিকে ফিরে তাকাল। তার হাসিটা ছিল কান্নার চেয়েও করুণ। কাঁপা গলায় সে শুধু বলল, “রা… রাতে।”
,
,
,
“আমি অনেকভাবে ট্রাই করেছি বুঝলে, কিন্তু কোনভাবেই ফুলের সাথে যোগাযোগ করতে পারিনি।” অনিলার কথা শুনে উর্বী ভাবুক ভঙ্গিতে গালে হাত রেখে বলল, “রিদম আজ বলেছে ওনারা খুব শীঘ্রই ফিরে আসবে।”

অনিলা বলল, “আমি বুঝতে পারছিনা, একটু কথা বলতে দিলে কী এমন হয়ে যাবে। অনি কিছুতেই কথা বলতে দিচ্ছেনা।”

“আমাকেও। ব্যাপারটা নিয়ে কাল একদফা ঝগড়া হয়ে গেছে ওর সাথে। যদিও ঝগড়াটা আমি একাই করেছি। বলেছি নিয়ে চলো আমাকে বাংলাদেশে। ও এমন ভান করল যেন শোনেই নি আমার কথা।”

অনিলা মুখ গোমড়া করে ফেলল। “আমার এবার খটকা লাগছে উর্বী। ওরা এবার বাড়াবাড়ি করছে।”

উর্বী বিশ্লেষণী কণ্ঠে বলল, “হুম, কিছু তো একটা গোলমেলে আছেই এর মধ্যে। দেখি আরও কয়েকদিন যাক। তারপর আরও ভালোভাবে চাপ দেবো রিদমকে।”
,
,
,
রাতে খাবার টেবিলে খেতে বসেছে উদ্যান, সোহম, লুহান, মেলো ও ফ্লোরা। সেই ঘটনার পর থেকে উদ্যান আর খাবার পাতে রাখেনা। পুরোটাই শেষ করে ওঠে।

“তেহজিব, ডিনার শেষে তোমার রুমে আসব?” ফ্লোরার প্রশ্নে টেবিলের বাকিরা অদ্ভুত চোখে তাকাল তার দিকে। এস্টেটের প্রতিটা কোণ যেন আজ ফ্লোরার উপস্থিতিতে বিষিয়ে আছে। সোহম আর লুহানের চোখেমুখে বিরক্তি স্পষ্ট; তাদের চাউনি বলে দিচ্ছে ক্ষমতা থাকলে তারা ফ্লোরাকে এস্টেট থেকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিত।

ফুল তাকিয়ে ছিল উদ্যান কী বলবে তা শোনার আশায়। উদ্যান প্লেটে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেই বলল, “নো ফ্লোরা। আসলে আমি কাজে ব্যস্ত থাকবো তুমি বরং কাল বিকেলে এসো।”

ফ্লোরা বাচ্চাদের মতো ঠোঁট ফুলিয়ে জানতে চাইল, “কী এমন কাজ করবে শুনি যে আমি থাকলে সমস্যা হবে?”

উদ্যানের বোধহয় এবার মেজাজ খারাপ হলো। সে শান্ত চোখে তাকাতেই ফ্লোরার চপলতা নিমিষেই মিলিয়ে গেল।

উদ্যান চলে যাওয়ার পর একে একে সবাই বিদায় নিল। ফুল তড়িঘড়ি করে সব কাজ শেষ করল। পেটে খিদে থাকলেও আজ তার অনুভুতিগুলো অবশ। সে সোজা পা বাড়াল উদ্যানের ঘরের দিকে।
উদ্যান অ্যালেক্সকে আগে থেকেই ফুলের কথা বলে রেখেছিল। তাই সে নক করার সাথে সাথেই দরজা খুলে গেল। ভেতরে ঢুকেই ফুল উদ্যানকে দেখতে পেল না। মিনিট কয়েক পর, উদ্যান পাশের রুম থেকে বেরিয়ে এল। তার পরনে ব্যাগি প্যান্টস আর সিল্ক শার্ট।

“বাহ, এতো তাড়াতাড়ি এসে পড়বি ভাবিনি।”

ফুল এগিয়ে গিয়ে উদ্যানের সামনাসামনি দাঁড়াল। তাকে স্পর্শ করতে গিয়েও তার হাতটা মাঝপথে থমকে গেল। উদ্যান তার দ্বিধা বুঝতে পেরে কিছুটা ঝুঁকে হিসহিসিয়ে বলল, “ইউ ক্যান টাচ মি ইফ ইউ ওয়ান্ট। অ্যান্ড লিসেন, রাতে যখন আমার কাছে আসবি, তখন আমি তোর ‘মাস্টার’ নই।”

সঙ্গে সঙ্গেই ফুল আছড়ে পড়ল উদ্যানের প্রশস্ত বুকের ওপর। আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরল লোকটাকে। ঘোরের মাঝে তলিয়ে গিয়ে বিড়বিড়িয়ে বলল, “আই মিস ইউ তেহজিব।”

উদ্যান ধাক্কা খেল তার আবেগপ্রবণ কণ্ঠ শুনে। ফুল মুখ তুলে তাকাল, হাত রাখল দানবটার শার্টের ওপর। এক এক করে খুলে ফেলল সবগুলো বোতাম। উদ্যান নিজেই এবার শার্টখানা খুলে ফেলল। ফুল তার বুকের বাম পাশের কাটা জায়গায় হাত বুলিয়ে দিয়ে শুধাল, “এখানে কী হয়েছিল?”

“জাস্ট অ্যাক্সিডেন্ট।”

ফুল পাশে থাকা সবুজ রঙে লেখা Jardín নামটা লক্ষ্য করল।
“এটা কী?”

উদ্যান তার গালে স্লাইড করতে করতে বলল, “ইটস আ ট্যাটু।”

“জার্দিন কে?”

“ইটস হার্দিন নট জার্দিন।”

ফুল আরও কিছু জিজ্ঞেস করতেই যাবে। উদ্যান তার আগেই গলা চড়িয়ে বলল, “অ্যালেক্স, ডিম দ্যা লাইট ফার্স্ট দেন গো টু কমপ্লিটলি শাট ডাউন ফর টুনাইট।”

মুহূর্তেই শুভ্র আলো নিভে গিয়ে সবুজ আলো জ্বলে উঠল। উদ্যান এক ঝটকায় ফুলকে ঘুরিয়ে তার ওড়না সরিয়ে ঘাড়ে মুখ ডুবিয়ে দিল। তার বলিষ্ঠ হাতের চাপে ফুলের শরীর এলিয়ে পড়তে লাগল। উদ্যান বড্ড ক্ষুধার্ত, তার প্রতিটি স্পর্শে এক ধরণের উন্মাদনা।

দানবটা ফুলের মোমরঙা ঘাড়ে এবং গলায় দাগ বানাতে ব্যস্ত ছিল। ফুল একটু সুযোগ পেতেই আবারও ঘুরে গিয়ে জড়িয়ে ধরল তাকে। বুকের ওপর কয়েকটা চুমু বসিয়ে দিয়ে কান পাতলো সেখানে। পরপরই টের পেল দানবটার হৃৎপিণ্ড তাল হারাতে শুরু করেছে।

কিন্তু উদ্যান তাকে বেশিক্ষণ সেভাবে থাকতে দিল না। বরং দুপা পিছিয়ে গিয়ে আদেশ করল।

“স্ট্রিপ!”

শব্দটা শুনে ফুলের বুকের ভেতর তোলপাড় শুরু হলো। তবুও ঠোঁটের কোণে এক বিষণ্ণ হাসি ধরে রেখে সে একে একে নিজেকে উন্মুক্ত করল। উদ্যান তাকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখে নিয়ে প্রবল ক্ষিপ্রতায় জাপ্টে ধরল। ফুলের তুলোর মতো শরীরটা তুলে নিয়ে এগিয়ে গেল খাটের দিকে।

সেখানে শুইয়ে দিয়ে উদ্যান ফুলের ঘাড়ে নাক ডুবিয়ে লম্বা শ্বাস টানলো। ঘোরলাগা কণ্ঠে বলল, “ইউ আর স্মেলিং টু গুড ফ্লাওয়ার। সো মাচ ডিলিশাস!”

নতুন এই ডাকনামে ফুলের শরীর শিরশির করে উঠল। তার ওপর উদ্যানের এলোমেলো স্পর্শে সে দিশেহারা। ঘাড় থেকে বুকে মুখ নামিয়ে নিতেই ফুল খামচে ধরল উদ্যানের চুল। তীব্র উত্তেজনায় চোখ উলটে গেল তার। মুখ ফসকে বেরিয়ে এলো, “উদ্যান… প্লিজ।”

উদ্যান আরও বেপরোয়া হয়ে উঠল। ক্ষুধার্ত বাঘের মতো আস্বাদন করতে লাগল তার শিকারকে। ফুলের আফসোস হতে লাগল তাকে এই নামে ডাকার জন্য কিন্তু সে যে অরক্ষিত মুহূর্তে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনা। কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানেই রুমটার বাতাস ফুলের অস্পষ্ট গোঙানির শব্দে ভারী হয়ে উঠল।
,
,
,
রাত তিনটা।
ফুলের অনাবৃত বুকে মুখ গুঁজে শুয়ে আছে উদ্যান। কম্ফোর্টারের আড়ালে তার শরীরের নিচে পিষ্ট হয়ে আছে ফুলের শরীরটা। ফুল শূন্য চোখে সিলিং এর দিকে তাকিয়ে অস্ফুটস্বরে বলল, “আপনি তো আমাকে একটুও ভালোবাসেন না। তবে কেন এতো কাছাকাছি আসা?”

উদ্যান মাথা না তুললেও তার ভারী কণ্ঠস্বর ফুলের কানে প্রতিধ্বনিত হলো, “সেদিন নেশার ঘোরে চলে গিয়েছিলাম, তাছাড়া তো তুই নিজেই আমার কাছে আসিস, তাই না? আমার কী দোষ? আর আমি কি একবারও বলেছি তোকে ভালবাসিনা?”

ফুলের মনে হলো তার শ্রবণশক্তি তাকে ধোঁকা দিচ্ছে। সে অবিশ্বাস্য গলায় শুধাল, “আমি ভুল শুনছি, নাকি আপনি ভুল বলছেন?”

“আমি সবসময় ঠিকই বলেছি, তুই ভুল শুনেছিস কিনা জানিনা।”

ফুল বিমূঢ় হয়ে পড়ল। উদ্যান এবার ধীরে ধীরে মুখ তুলে তার চোখের দিকে তাকাল।
“আমি ভালোবাসি তোকে… কষ্ট দিতে। আমি ভালোবাসি তোকে… কাঁদতে দেখতে। আমি ভালোবাসি তোকে… আমার সামনে অসহায় হয়ে পড়তে দেখতে। বর্তমানে আমি ভালোবাসি তোকে… এই অবস্থা দেখতে।”

উদ্যান তার কানের কাছে মুখ নিয়ে নিচু স্বরে বলল, “আই লাভ টু ফা`ক ইউ বেবিডল।”

ফুলের রূহ যেন কেঁপে উঠল। এক তীব্র আতঙ্কে তার শরীর হিম হয়ে এল। সে কাঁপা গলায় বলল, “এটাকে… এটাকে ভালোবাসা বলেনা। এটা জিঘাংসা।”

“আমার কাছে এটাই ভালোবাসা, আর আমি ভালোও বাসি তোকে।”

ফুলের মনে হলো উদ্যান যেন তার বুকটা পিষে ধরেছে। সে চোখ বন্ধ করে আর্তনাদ করল, “বলবেন না! এই কথাটা আর একবারও বলবেন না।”

“একশোবার বলবো। হাজারবার বলবো। আমি ভালোবাসি তোকে।”

ফুল এক অদৃশ্য যন্ত্রণায় কাতরাতে লাগল। উদ্যান সেসব খেয়াল করল না মোটেই। বরং আবারও নিজের শারীরিক ক্ষুধা মেটাতে তার সেই শ্রান্ত শরীরটাকে নিজের সত্তার সাথে মিশিয়ে নিতে তৎপর হয়ে উঠল।

চলবে,,,

শব্দসংখ্যা: ৩৫০০+

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply